আসমানি কিতাবসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করা ইমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আসমানি কিতাবসমূহে বিশ্বাস স্থাপন না করলে ইমানের মূল বিশ্বাসই দুর্বল হয়ে যায়। কেননা আসমানি কিতাবগুলোর মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহ তায়ালা, নবি-রাসুল, ফেরেশতা, পরকাল ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পেরেছে। এসব বিষয় সম্পর্কে পবিত্র আল-কুরআনের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। যদি কেউ আসমানি কিতাবসমূহ ও তাতে বর্ণিত বিষয়সমূহে অবিশ্বাস করে তবে স্বভাবতই সে ইমানের অন্যান্য বিষয়গুলোও অস্বীকার করে। সুতরাং ইমানের পরিপূর্ণতার জন্য আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা অপরিহার্য।
নিফাক শব্দের আভিধানিক অর্থ ভণ্ডামি, কপটতা, দ্বিমুখীভাব, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, Dobulė Standrad Policy ইত্যাদি। এর ব্যবহারিক অর্থ হলো অন্তরে একরকম ভাব রেখে বাইরে এর বিপরীত অবস্থা প্রকাশ করা। অর্থাৎ অন্তরে বিরোধিতা গোপন রেখে বাইরে আনুগত্য প্রদর্শন করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, অন্তরে কুফর ও অবাধ্যতা গোপন করে মুখে ইসলামকে স্বীকার করার নাম হলো নিফাক।
শাফাআত শব্দের অর্থ সুপারিশ করা, অনুরোধ করা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় কল্যাণ ও ক্ষমার জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট নবি-রাসুল ও নেক বান্দাগণের সুপারিশ করাকে শাফাআত বলে।
মুসলিম হওয়ার জন্য সর্বপ্রথম ইসলামের কতিপয় মৌলিক বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। যেমন- আল্লাহ তায়ালা, নবি-রাসুল, ফেরেশতা আখিরাত ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। ইসলামের এসব মৌলিক বিষয়ে ওপর বিশ্বাসকে আকাইদ বলা হয়।
আকাইদ শব্দটি বহুবচন। একবচনে 'আকিদাহ'; যার অর্থ বিশ্বাস। সুতরাং আকাইদ শব্দের অর্থ বিশ্বাসমালা। ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলির ওপর বিশ্বাসকে আকাইদ বলা হয়। আকাইদ হলো ইসলামের প্রধান ভিত্তি।
মুসলিম হওয়ার জন্য সর্বপ্রথম ইসলামের মৌলিক কতিপয় বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলি হলো- আল্লাহ তায়ালা, নবি-রাসুল, আসমানি কিতাব, ফেরেশতা, আখিরাত, তাকদির, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ইত্যাদি।
ইমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্বাসকেই ইমান বলা হয়। প্রকৃত অর্থে আল্লাহ তায়ালা, নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আখিরাত, তাকদির ইত্যাদি বিষয় মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা ও মেনে নেওয়াই হলো ইমান।
আল্লাহ তায়ালা, নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আখিরাত, তাকদির ইত্যাদি বিষয় মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা ও মেনে নেওয়াই হলো ইমান। যে ব্যক্তি এসব বিষয়কে বিশ্বাস করেন তিনি হলেন মুমিন।
ইমানের তিনটি দিক রয়েছে। এগুলো হলো-
১. অন্তরে বিশ্বাস করা,
২. মুখে স্বীকার করা এবং
৩. তদনুসারে আমল করা।
ইসলামের যাবতীয় বিষয়ের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও তদনুযায়ী আমল করার নাম হলো ইমান। প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য এ তিনটি বিষয় থাকা জরুরি।
ইমান বা বিশ্বাসের মৌলিক বিষয় স্নাতটি। যথা- ১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস; ২. ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস; ৩. আসমানি কিতাবের প্রতি বিশ্বাস; ৪. নবি-রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস; ৫. আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস; ৬. তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস এবং ৭. মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস।
ইমানের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয় হলো আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস। আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। তার সত্তা, গুণাবলি ও সকল ক্ষমতাসহ বিশ্বাস করাই হলো ইমানের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয়।
আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি আমাদের রব, মালিক, সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা, সাহায্যকারী, জন্ম ও মৃত্যুর মালিক। তিনি পবিত্র, ক্ষমাশীল, দয়াবান, পরম দয়াময়, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান, সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তিনি চির বিরাজমান। তিনিই একমাত্র সত্তা। তাঁর সমকক্ষ, সমতুল্য বা শরিক কেউ নেই। একমাত্র তিনিই সকল গুণের আধার।
ফেরেশতাগণ নুরের তৈরি। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা সর্বদা আল্লাহ তায়ালার জিকির ও তাসবিহ পাঠে রত। তাঁরা আল্লাহ তায়ালার আদেশ অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত।
ফেরেশতাগণ অদৃশ্য। তাঁদের সংখ্যা অগণিত। একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কেউই তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা জানেন না। ফেরেশতাগণের মধ্যে চারজন হলো প্রসিদ্ধ। তাঁরা হলেন হযরত জিবরাইল (আ.), হযরত মিকাইল (আ.), হযরত আজরাইল (আ.) এবং হযরত ইসরাফিল (আ.)।
মানবজাতির কল্যাণের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবি-রাসুলগণের নিকট যে কিতাব নাজিল করেছেন। যেগুলো হলো আল্লাহ তায়ালার পবিত্র বাণীসমষ্টি। আল্লাহ তায়ালা বাণীসমষ্টি সংবলিতte Win গ্রন্থকে আসমানি কিতাব বলা হয়।
নবি-রাসুলগণ ছিলেন মানবজাতির মহান শিক্ষক। মানবজাতির হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে বহু নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন। তাঁরা সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় শিক্ষা দিতেন। কোন পথে চললে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করবে তা দেখিয়ে দিতেন।
তাকদির অর্থ ভাগ্য। তাকদির আল্লাহ তায়ালা থেকে নির্ধারিত ভালো-মন্দ যা কিছু হয় সবই আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হয়। সুতরাং দুনিয়াতে ভালো কিছু লাভ করলে আনন্দে আত্মহারা হওয়া যাবে না। বরং এটি আল্লাহরই দান। তাই আল্লাহ তায়ালার শুকুর বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। আবার বিপদ-আপদ ক্ষতি এগুলোও আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এরূপ বিশ্বাসই হলো তাকদির।
মৃত্যুর পর আমাদের পুনরায় জীবিত করা হবে। দুনিয়ার প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আসবে সকলকেই আল্লাহ তায়ালা জীবিত করবেন। একেই বলা হয় পুনরুত্থান।
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের লাভের মাধ্যম হলো ইমান। ইমান আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত। মুমিন ব্যক্তি দুনিয়াতে শ্রদ্ধা, সম্মান, কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করেন। সকলেই তাঁকে ভালোবাসে। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের ভালোবাসেন। আখিরাতে তিনি মুমিনদের চিরশান্তির জান্নাত দান করবেন।
নিফাক শব্দের অর্থ ভন্ডামি, কপটতা, প্রতারণা, দ্বিমুখী নীতি ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় মুখে ইমানের স্বীকার ও অন্তরে অবিশ্বাস করাকে নিফাক বলা হয়।
ইসলামি পরিভাষায় মুখে ইমানের স্বীকার ও অন্তরে অবিশ্বাস করাকে নিফাক বলা হয়। যে ব্যক্তি এরূপ করে তাকে বলা হয় মুনাফিক। এক কথায় দ্বিমুখী নীতিবিশিষ্ট ব্যক্তিকে মুনাফিক বলা হয়।
মুনাফিক ব্যক্তির নিদর্শন তিনটি। যথা-
১. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে।
২. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং
৩. আমানতের খিয়ানত করে।
নিফাক জঘন্যতম পাপ। এটা মানুষের চরিত্র ধ্বংস করে ফেলে। নিফাকের ফলে মানুষ অন্যায় ও অশ্লীল কাজে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়। নিফাকের দ্বারা মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
নিফাক পরিহারের উপায় হলো- ১. কথা বলার সময় সত্য কথা বলবে, মিথ্যা কথা বলবে না। ২. কাউকে কথা দিলে তা রক্ষা করবে। ৩. আমানত রক্ষা করবে। যেমন কারো কাছে কোনো জিনিস ও সম্পদ আমানত রাখলে তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবে এবং ফেরত দিবে। কারো সাথে কথা দিলে তা রক্ষা করবে।
আল-আসমাউল হুসনা শব্দদ্বয়ের অর্থ সুন্দরতম নামসমূহ। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামসমূহকে একত্রে আসমাউল হুসনা বলা হয়। আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালার এরূপ বহু গুণবাচক নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আল-আসমাউল হুসনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এ নামগুলো আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ও ক্ষমতার প্রকাশ ঘটায়। এ নামগুলোর মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তায়ালার গুণ ও বৈশিষ্ট্য জানতে পারি। ফলে তার আদেশ-নিষেধ পালন করতে সহজ হয়। আল্লাহ তায়ালার গুণরাচক নামসমূহ আমাদের উত্তম চরিত্রবান হতে অনুপ্রাণিত করে।
গাফ্ফার শব্দের অর্থ অতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ্ গাফ্ফারুন অর্থ আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা অপরিসীম। "এবং আমি অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল তার প্রতি যে তাওবা করে, ইমান আনে, সৎকর্ম করে ও সৎপথে অবিচল থাকে।" (সূরা তা-হা: ৮২)
সামাদুন শব্দের অর্থ অমুখাপেক্ষী। আল্লাহু সামাদুন অর্থ আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। আল্লাহ তায়ালা কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। আল কুরআনে তিনি নিজেই বলেছেন آل العمد অর্থ: "আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।" (সূরা আল-ইখলাস: ২০)
রাউফুন শব্দের অর্থ অতিশয় দয়াবান, পরম দয়ালু, অতি স্নেহশীল। আল্লাহ্ রাউফুন অর্থ- আল্লাহ অতি দয়াবান, অত্যন্ত স্নেহশীল। আল্লাহ তায়ালার দয়া ও করুণার শেষ নেই। আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার দয়া ও করুণার শেষ নেই। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এরপর তিনি দয়া ও স্নেহের মাধ্যমে আমাদের প্রতিপালন করেন।
আল্লাহ্ হাসিবুন' অর্থ আল্লাহ হিসাব গ্রহণকারী। মহান আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন মানুষের সব কাজকর্মের হিসাব নিবেন। হাশরের ময়দানে তিনিই হবেন একমাত্র বিচারক। সবাইকে সেদিন আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। সেদিন আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তি দিবেন। এজন্যই তিনি হাসিব বা সূক্ষ্ম হিসাব গ্রহণকারী।
মুহাইমিনুন শব্দের অর্থ নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী, আশ্রয়দাতা। আল্লাহু মুহাইমিনুন অর্থ আল্লাহ আশ্রয়দাতা। আল্লাহ তায়ালা হলেন প্রকৃত রক্ষাকর্তা। তিনিই একমাত্র এবং সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। আল্লাহ তায়ালাই আমাদের রক্ষক।
রিসালাত অর্থ সংবাদ বহন, খবর বা চিঠি পৌঁছানো। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার বাণী, আদেশ-নিষেধ মানুষের নিকট পৌঁছানোকে রিসালাত বলে। যাঁরা এ সংবাদ পৌঁছানোর কাজ করেন তাঁরা হলেন নবি-রাসুল
আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য বহু নবি-রাসুল এ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি ছিল না যেখানে আল্লাহ তায়ালা নবি-রাসুল প্রেরণ করেননি। আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "আর প্রত্যেক জাতির জন্য পথপ্রদর্শক রয়েছে।" (সূরা আর-রা'দ: ৭)
নবি-রাসুলগণ ছিলেন মানুষের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নিয়ামতস্বরূপ। তাঁরা সকলকে তাওহিদের পথে ডাকতেন। কুফর, শিরক, নিফাক থেকে সতর্ক করতেন। উত্তম চরিত্র ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করতেন। নবিগণের দাওয়াতের মূলকথা আল্লাহর একত্ববাদ, এবং তাঁর বিধিবিধান প্রচার করা।
আল্লাহ তায়ালা যাঁদের প্রতি আসমানি কিতাব নাযিল করেছেন কিংবা নতুন শরিয়ত প্রদান করেছেন, তারা হলেন রাসুল। আর যাঁদের প্রতি কোনো কিতাব অবতীর্ণ হয়নি কিংবা নতুন শরিয়ত দেওয়া হয়নি তাঁদেরকে নবি বলা হয়। নবিগণ পূর্ববর্তী রাসুলগণের শরিয়ত প্রচার করতেন। রাসুলগণ একই সাথে রিসালাত ও নবুয়ত দুই দায়িত্ব পালন করতেন আর নবিগণ শুধু নবুয়তের দায়িত্ব পালন করতেন। সে কারণে প্রত্যেক রাসুলই নবি কিন্তু প্রত্যেক নবি রাসুল নন।
খতম শব্দের অর্থ শেষ, সমাপ্ত। আর নবুয়ত অর্থ পয়গম্বরি, নবিগণের দায়িত্ব ইত্যাদি। সুতরাং খতমে নবুয়ত অর্থ নবিগণের দায়িত্বের পরিসমাপ্তি বা নবুয়তের সমাপ্তি। মানবজাতির হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে বহু নবি-রাসুল প্রেরণ করেন। নবুয়ত তথা নবি-রাসুল আগমনের এ ক্রমধারাটির সমাপ্তিকেই খতমে নবুয়ত বলা হয়।
খতমে নবুয়তে বিশ্বাস ইমানের অংশ। আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবি। তিনি হলেন খাতামুন নাবিয়িয়ন। তাঁর পর আজ পর্যন্ত কোনো নবি আসেননি। খতমে নবুয়তের উপর বিশ্বাস করা অপরিহার্য। এতে বিশ্বাস না করলে মানুষ ইমানদার হতে পারে না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি মহানবি (স.)-কে খাতামুন নাবিয়্যিন বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেন- "মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন। বরং তিনি তো আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবি।" (সূরা আল-আহযাব: ৪০)
বহু হাদিসে খতমে নবুয়তের প্রমাণ রয়েছে। নিচে একটি হাদিস লেখা হলো- নবি করিম (স.) বলেন, "বনি ইসরাইলে নবিগণই নেতৃত্ব দিতেন। যখনই কোনো নবি ইন্তিকাল করতেন তখনই পরবর্তী নবি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। কিন্তু আমার পর আর কোনো নবি আসবেন না।" (বুখারি)
আখিরাত হলো মৃত্যুর পরবর্তী জীবন। বাংলা ভাষায় একে পরকাল বলা হয়। ইসলামি পরিভাষায় মৃত্যুর সাথে সাথে মানুষের যে নতুন জীবন শুরু হয় তা-ই পরকাল বা আখিরাত। এ জীবনের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। এটি অনন্ত ও চিরস্থায়ী জীবন।
দুটি বস্তুর মধ্যবর্তী পর্যায়কে বারযাখ বলে। মানুষের মৃত্যু থেকে কিয়ামত বা পুনরুত্থান পর্যন্ত সময়কে বারযাখ বলে। এটি কিয়ামত ও দুনিয়ার জীবনের মধ্যবর্তী পর্দাস্বরূপ। মানুষের মৃত্যুর পর এ জীবনের শুরু হয়।
কিয়ামত অর্থ দন্ডায়মান হওয়া, উঠা। ইসলামি পরিভাষায় কবর থেকে মানুষ উঠে সেদিন আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হবে, তাই একে বলা হয় কিয়ামত। কিয়ামতে মানুষকে পুনরায় জীবিত করা হবে। এরপর নেককারদের জান্নাতে এবং পাপীদের জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে।
আখিরাত আকাইদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আখিরাতের প্রতি ইমান আনা অপরিহার্য। আখিরাতে বিশ্বাস না করলে মানুষ ইমানদার হতে পারে না। আখিরাতে বিশ্বাস মানুষকে সৎকর্মশীল করে তোলে। এর ফলে মানুষ উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতার গুণাবলি অনুশীলন করে।
শাফাআত শব্দের অর্থ সুপারিশ করা, অনুরোধ করা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় কল্যাণ ও ক্ষমার জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট সুপারিশ করাকে শাফাআত বলে।
কিয়ামতের দিন সাধারণত দুটি কারণে শাফাআত করা হবে।
যথা- ১. পাপীদের ক্ষমা ও পাপ মার্জনার জন্য; ২. পুণ্যবানদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও কল্যাণ লাভের জন্য।
কিয়ামতের দিন সব মানুষকে এক বিশাল ময়দানে সমবেত করা হবে। সেদিন সূর্য খুব নিকটবর্তী হবে। মানুষ অসহনীয় দুঃখকষ্টে নিপতিত থাকবে। এমতাবস্থায় তারা মহানবি (স.)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য আল্লাহর নিকট শাফাআত করার জন্য অনুরোধ করবে। তখন মহানবি (স.) আল্লাহ তায়ালার নিক্ট বিচারকার্য শুরু করার জন্য সুপারিশ করবেন। এটাই হলো শাফাআতে কুবরা।
কিয়ামতের দিন পাপীদের ক্ষমা ও পুণ্যবানদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য শাফাআত করা হবে। এটাই হলো শাফাআতে সুপরা। নবি-রাসুল, ফেরেশতা, শহিদ, আলিম, হাফিজ এ শাফাআতের সুযোগ পাবেন। আল কুরআন ও সিয়াম (রোযা) কিয়ামতের দিন শাফাআত করবে বলেও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাফাআতে সুগরার দুটি বিষয় হলো-
১. যেসব মুমিন পাপের কারণে জাহান্নামের উপযুক্ত হবে তাদের মাফ করে জান্নাতে দেয়ার জন্য শাফাআত।
২. যেসব মুমিন পাপের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য শাফাআত।
জান্নাত শব্দের অর্থ বাগান, উদ্যান, আবৃত স্থান। ফারসি ভাষায় একে বলা হয় বেহেশত। বাংলায় একে বলা হয় স্বর্গ। ইসলামি পরিভাষায় আখিরাতে ইমানদার ও নেককার বান্দাদের জন্য যে চিরশান্তির আবাসস্থল তৈরি করে রাখা হয়েছে তাকে জান্নাত বলা হয়।
জান্নাতের বিবরণ দিয়ে রাসুল (স.) বলেন, "আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, 'আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য জান্নাতে এমন সব বস্তু তৈরি করে রেখেছি যা কোনো চোখ কোনোদিন দেখেনি, কোনো কান কোনোদিন শোনেনি, আর মানুষের অন্তরও যা কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি।” (বুখারি)
জান্নাত মোট আটটি। এগুলো হলো- ১. জান্নাতুল ফিরদাউস, ২. জান্নাতুল মাওয়া, ৩. দারুল মাকাম, ৪. দারুল কারার, ৫. দারুন নাইম, ৬. দারুল খুলদ, ৭. দারুস সালাম ও ৮. জান্নাতু আদন।
জান্নাত হলো মুমিনদের ও পুণ্যবানদের বাসস্থান। জান্নাত লাভের জন্য দুনিয়াতে সর্বপ্রথম ইমান আনতে হবে। আকাইদের সব বিষয়ের উপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। অতঃপর নেক কাজ করতে হবে। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায সুন্দরভাবে আদায় করতে হবে।
জাহান্নাম হলো আগুনের গর্ত, শাস্তির স্থান। একে দোযখ বা নরকও বলা হয়। ইসলামি পরিভাষায় আখিরাতে কাফির, মুশরিক, মুনাফিক ও পাপীদের শাস্তির জন্য যে স্থান নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে তাকে জাহান্নাম বলা হয়।
জাহান্নামের বিবরণ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "যারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করবে অচিরেই আমি তাদেরকে (জাহান্নামের) আগুনে প্রবেশ করাব। সেখানে যখনই তাদের চামড়া জ্বলে যাবে তখনই এর স্থলে নতুন চামড়া সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে পারে।" (সূরা আন-নিসা: ৫৬)
জাহান্নাম মোট সাতটি। এগুলো- ১. জাহান্নাম, ২. হাবিয়া, ৩. জাহিম, ৪. সাকার, ৫. সাইর, ৬. হুতামাহ ও ৭. লাযা।
ইমান হলো বিশ্বাস। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করাকে ইমান বলা হয়। যে ব্যক্তি ইমান আনে তাকে বলা হয় মুমিন। আর নৈতিকতা হলো নীতিসম্বন্ধীয়, নীতিমূলক কাজে-কর্মে, কথাবার্তায় নীতি ও আদর্শের অনুসরণই হলো নৈতিকতা
নৈতিকতা বলতে সুনীতি তথা নীতিমূলক কাজ-কর্ম এবং কথাবার্তায় নীতি ও আদর্শের অনুসরণকে বোঝায়। ইমান ও নৈতিকতার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নৈতিকতার অনুসরণ ব্যতীত কোনো মানুষই পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারে না। নৈতিকতা মানুষকে সচ্চরিত্রবান হতে শিখায়।
ইমান ও নৈতিকতার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নৈতিকতার অনুসরণ করা মুমিন ব্যক্তির অপরিহার্য দায়িত্ব। নীতি-নৈতিকতা না মানলে কোনো ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারে না। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমা, পরস্পর সহযোগিতা, সাম্য-মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদি সৎগুণ ইমানদার ব্যক্তির থাকা প্রয়োজন। এগুলো নৈতিকতার প্রধান দিকসমূহের অন্যতম।
Related Question
View Allফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস বলতে বোঝায় আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। তাঁরা নুরের তৈরি। তাঁরা সদাসর্বদা আল্লাহর যিকির ও তাসবিহ পাঠে রত, আল্লাহ যা তাদের হুকুম করেন, তাঁরা তাই বিনা বাক্য ব্যয়ে সম্পাদন করেন। ফেরেশতাগণ নারী ও পুরুষ কোনোটাই নন। তাঁদের দেখা যায় না। আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁরা যেকোনো আকৃতি ধারণ করতে পারেন। তাদের আহার নিদ্রার প্রয়োজন হয় না। তাঁরা অগণিত। ফেরেশতাগণের মধ্যে ৪ জন হলেন প্রসিদ্ধ।
জায়েদের কর্মকান্ডকে ইমান হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।
ইমানের জন্য ৭টি মৌলিক বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় এবং মুখে তার স্বীকৃতি দিতে হয়। পাশাপাশি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি অনুসারে আমল করার চেষ্টা করতে হয়। ইমানের মৌলিক বিষয়গুলোকে কেউ যদি শুধু অন্তরে বিশ্বাস করে কিন্তু মুখে স্বীকার না করে, তবে সে প্রকৃত ইমানদার হতে পারবে না। আবার মুখে স্বীকৃতি দিয়ে অন্তরে বিশ্বাস না করলেও ইমানদার হতে পারবে না। বস্তুত আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও তদনুযায়ী আমলের সমষ্টিই হলো প্রকৃত ইমান। জায়েদ আল্লাহ, রাসুল, ফেরেশতা, আখিরাত, তাকদির, পুনরুত্থান ইত্যাদি বিষয়কে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এবং মুখে স্বীকার করে। সে তার বিশ্বাস অনুসারে আমল করতে যথাসম্ভব চেষ্টা করে। সুতরাং জায়েদের কর্মকাণ্ডে প্রকৃত ইমানদারের পরিচয় ফুটে উঠেছে। তাই তার কর্মকাণ্ডকে ইমান হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।
নয়নের কর্মকান্ডের পরিণতি নিশ্চয়ই খারাপ" বক্তব্যটি যথার্থ।
উদ্দীপকে উল্লিখিত নয়নের কর্মকান্ডে মুনাফিকি প্রকাশ পেয়েছে। মুনাফিকদের পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয় মুনাফিকদের স্থান জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে" (সূরা আন-নিসা: ১৪৫) পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, যখন মুনাফিকরা ইমানদারদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা ইমান এনেছি। যখন তারা গোপনে তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি, আমরা তাদের সাথে শুধু ঠাট্টা-তামাশা করে থাকি। (সূরা আল-বাকারা: ১৪) কুরআনে বর্ণিত এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে নয়নের কর্মকান্ডের পুরো মিল রয়েছে। আর এজন্যই সে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। এছাড়া পৃথিবীতে নিফাকি জঘন্য পাপ হিসেবে গণদ হয়। এটা মানুষের চরিত্র ধ্বংস করে ফেলে। নিফাকের ফলে মানুষ অন্যায় ও অশ্লীল কাজে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়। এটি মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহের সৃষ্টি করে। ফলে সমাজে মারামারি ও অশান্তির সৃষ্টি হয়।
উদ্দীপকের নয়ন জায়েদের সাথে ইমানদার সুলভ আচরণ করে কিন্তু তার অন্য ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সাথে থাকাকালীন তাদেরকে বলে, আমি তোদের ধর্মকেই বিশ্বাস করি। জায়েদের সাথে সালাত আদায় করি ওকে খুশি করার জন্য।
সুতরাং নয়নের কর্মকান্ডে নিফাকি প্রকাশ পেয়েছে। আর নিফাকির শাস্তি হলো জাহান্নাম। নিফাকির কারণে মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্ব নিম্নস্তরে থাকবে। তাই উদ্দীপকে উল্লিখিত বক্তব্যটি যথার্থ।
তাকদির অর্থ ভাগ্য। তাকদির আল্লাহ তায়ালা থেকে নির্ধারিত। ভালোমন্দ যা কিছু হয় সবই আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হয়। এ বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করাকে তাকদিরে বিশ্বাস বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!