ঈশ্বর নিরাকার হলেও মানবকল্যাণে তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। ঈশ্বর যখন নিজের কোনো গুণ বা ক্ষমতাকে কোনো বিশেষ আকার বা রূপে প্রকাশ করেন তখন তাঁকে দেব-দেবী বলা হয়। যেমন- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা প্রভৃতি।
দেব-দেবীরা হলেন ঈশ্বরের বিভিন্ন গুণ ও ক্ষমতার প্রকাশ। তাঁরা পরিপূর্ণ ঈশ্বর না হলেও ঈশ্বরের মহান গুণে গুণান্বিত। আমরা ঈশ্বরের বিভিন্ন গুণ ও শক্তি অর্জনের জন্য স্বতন্ত্রভাবে দেব-দেবীর পূজা করি। তাছাড়া দেব-দেবীর পুজা করলে ঈশ্বর খুশি হন এবং ভক্তের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেন।
নিচে তিন প্রকার। দেব-দেবীর পরিচয় দেওয়া হলো-
১. বৈদিক দেবতা : যেসকল দেবতার নাম বেদে উল্লেখ রয়েছে। যেমন- ইন্দ্র, উষা, প্রভৃতি।
২. পৌরাণিক দেবতা: যেসকল দেবতার নাম পুরাণে উল্লেখ রয়েছে। যেমন- দুর্গা, কালি প্রভৃতি।
৩. লোকিক দেবতা : যে সকল দেবতা বেদে বা পুরাণে উল্লেখ নেই, লৌকিকভাবে পূজিত হয়। যেমন- শীতলা মনসা।
'পূজা' শব্দের অর্থ হলো প্রশংসা করা বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। ঈশ্বরের প্রতীক বা তাঁর রূপকে (দেব-দেবী) সন্তুষ্ট করার জন্য ভক্তিসহকারে ফুল, দুর্বা, তুলসীপাতা, চন্দন, ধূপ-দীপ, নৈবেদ্য প্রভৃতি উপকরণ সহযোগে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করাকে পূজা বলে।
'পার্বণ' শব্দের অর্থ হলো পর্ব বা উৎসব। উৎসব মানে আনন্দানুষ্ঠান। হিন্দুধর্মের বিধিবিধান অনুসারে বিভিন্ন দেব-দেরীর পূজায় বিভিন্ন ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হয়। একেই বলে পার্বণ। এগুলো পূজারই অঙ্গ।
পূজা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নানারকম উপকরণ সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হয়। যেমন- প্রতিমা নির্মাণ, ঢাক, ঢোল, ঘন্টা, ফুল, বেলপাতা, তুলসীপাতা, বিভিন্ন নৈবদ্য, ধূপ-দীপ, ভক্ত, পুরোহিতসহ আরও বহুবিধ উপকরণ। পূজায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
না, পূজা ও পার্বণ দুটো সমার্থক নয়। দেব-দেবীকে পুষ্পপত্র, নৈবেদ্য ইত্যাদি দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করাকে পূজা বলে। আর হিন্দুধর্মের বিধিবিধান অনুসারে, বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিভিন্ন ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হয়। একেই বলে পার্বণ।
হিন্দুধর্মে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করা হয়ে থাকে। এসব দেব-দেবীর পূজা সঠিকভাবে করার জন্য পূজার বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করতে হয়, যাকে পূজাবিধি বলে। অভীষ্ট ফল লাভের জন্য পূজাবিধি গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা সঠিকভাবে করার জন্য ও পূজার রীতিনীতিসমূহ সঠিকভাবে পালন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর প্রয়োজন হয়ে থাকে। এসব পূজা সামগ্রীকে পূজার উপকরণ বা উপাচার বলে। নৈবেদ্যও পূজার উপাচার।
পূজার একটি উপকরণ প্রদীপ। প্রদীপ সৃষ্ট আলো সকল অন্ধকারকে দূর করে বলে একে জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। প্রদীপ আমাদের জীবনের আলো ও আত্মাকে নির্দেশ করে
শঙ্খ মঙ্গলসূচক পূজা উপকরণ যা সৃষ্টির পবিত্র ধ্বনি সৃষ্টি করে। শঙ্খের সুরেলা ধ্বনি যেন সকলকে জ্ঞানের জগতে, ভক্তির জগতে আহ্বান জানায়- তোমরা এস দেবতার কাছে আনত হও, আত্মনিবেদন কর। আর তাই শঙ্খকে পূজার উপকরণ করা হয়েছে।
কলস বা ঘটকে মঙ্গলের প্রতীক বলা হয়। পূজার উপকরণ হিসেবে মাটির বা ধাতুর তৈরি ঘট ব্যবহার করা হয়। পূজার সময় এটি প্রবাহমান পরিষ্কার নদীর জল দ্বারা পূর্ণ করা হয়, যা নির্মলতাকে নির্দেশ করে। তাই একে মঙ্গলঘটও বলা হয়।
কলসের সবচেয়ে চওড়া অংশ পৃথিবীকে নির্দেশ করে। এর কেন্দ্র জলকে নির্দেশ করে। কলসের ঘাড় অগ্নিকে নির্দেশ করে এবং কলসের মুখের খোলা অংশ বায়ুকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ সবই। মঙ্গলসূচক বস্তুর নির্দেশ করে।
কলস বা ঘট মঙ্গলের প্রতীক। একে পৃথিবী ও মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আবার কলসের মুখে আমপল্লব ও তার উপর একটি সবুজ নারিকের স্থাপন করা হয়, যা সজীবতার বা শ্যামলতার নির্দেশ দিয়ে থাকে।
প্রদীপ বা প্রদীপসৃষ্ট আলোকে জ্ঞানের প্রতীক বলা হয়। প্রদীপ পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। প্রদীপসৃষ্ট আলো সকল অন্ধকার দূর করে বলে একে জ্ঞানের প্রতীক ধরা হয়। প্রদীপ আমাদের জীবনের আলো ও আত্মাকে নির্দেশ করে।
শঙ্খ একটি মঙ্গলসূচক পূজা উপকরণ, যা পবিত্র ধ্বনির সৃষ্টি করে। এর সুরেলা ধ্বনি যেন সকলকে জ্ঞানের জগতে, ভক্তির জগতে আহ্বান জানায় যে তোমরা এসো ঈশ্বরের কাছে, দেব-দেবীর কাছে আনত হও, আত্মনিবেদন কর।
প্রতিটি পূজায় উপকরণ হিসেবে পান-সুপারি ব্যবহার করা হয়। পানের মধ্যে বিভিন্ন দেব-দেবীর অধিষ্ঠান কল্পনা করা হয়। সুপারির কঠিন অংশ আমাদের অহংবোধের প্রতীক, যা পূজার শেষে দেবতাদের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করা হয়।
ধর্মগ্রন্থে গঙ্গার জলকে পবিত্র বলা হয়েছে। দেব-দেবীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য পবিত্র গঙ্গার জল ব্যবহার করা হয়। এ জলে রোগ-পীড়া ভালো করার ক্ষমতা ছাড়াও এ জল আধ্যাত্বিক চিন্তাচেতনা ও বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক।
ধূপ এক ধরনের সুগন্ধযুক্ত ধোঁয়া সৃষ্টিকারী পূজা উপকরণ; যা আমাদেরকে খারাপ শক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত করে বলে বিবেচনা করা হয়। আর ধূপকাঠি আমাদের ইচ্ছাসমূহকে নির্দেশ করে, যা পূজার সময় বিশেষ পাত্রে প্রজ্জ্বলন করা হয়।
চন্দন কাঠকে মঙ্গলজনক ও নান্দনিক পূজা উপকরণ বলা হয়। চন্দন কাঠ সুগন্ধি, যা জলে ঘষে অনুলেপন তৈরি করা হয়। এর গন্ধ পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ কারণেই দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে সচন্দন পুষ্প বা বিল্বপত্র নিবেদন করা হয়।
হলুদকে দেবী দুর্গার প্রতীক বলা হয়। পূজায় হলুদ একটি পুরুত্বপূর্ণ পূজা উপকরণ। হলুদ পরিশুদ্ধ চিন্তাকে নির্দেশ করে এবং আমাদের মনকে আকর্ষণ করে। হলুদে ভেষজ গুণও রয়েছে। এটি সৌভাগ্যের ধারক ও বাহক।
একেকটি পূজায় ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের পূজার উপকরণ ব্যবহৃত হয়। কারণ প্রত্যেকটি উপকরণের আলাদা আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে। আর উপকরণ ছাড়া পূজা সম্পন্ন হয় না। তাই দেব-দেবীর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মূলত পূজায় বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
মনসা সর্পের দেবী। তিনি সর্পকুলের জননী। তিনি আমাদের স্পভয় থেকে রক্ষা করেন। তিনি উর্বরতা ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবেও পরিচিত। বাংলাদেশসহ পূর্ব ও পশ্চিম ভারতে মনসাদেবীর পূজা করা হয়ে থাকে।
মনসা মূলত লৌকিক দেবী। পরে পৌরাণিক দেবী রূপে পরিগণিত হয়েছেন। মনসা সর্পের দেবী। তিনি স্পকুলের জননী। ৫. তিনি আমাদের সাপের ভয় থেকে রক্ষা করেন এবং সাপের বিষ হরণ করেন। তাই মনসাকে বিষহরি বলা হয়।
মনসা দেবীকে উর্বরতার দেবী বলা হয়। মনসা সর্পের দেবী। তিনি সর্পকূলের জননী, তিনি আমাদের সর্পভয় থেকে রক্ষা করেন। মনসা দেবী লৌকিক দেবী। মনসা দেবী পরে পৌরাণিক দেবীরূপে পরিগণিত হয়েছেন।
ব্রহ্মার উপদেশে ঋষি বশিষ্ঠ স্পমন্ত্রের সৃষ্টি করেন এবং তাঁর তপস্যার দ্বারা মন থেকে সেই মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে মনসা দেবীর আবির্ভাব ঘটে। আর মন থেকে সাকার রূপ লাভ করেছিলেন বলে নাম হয় মনসা।
মনসাদেবীর চার হাত এবং তিনি গৌরবর্ণা। চন্দ্রের মতো সুন্দর এবং প্রসন্ন তার মুখমণ্ডল। অরুণ বর্ণের অর্থাৎ ভোরের সূর্যের আলোর মতো লাল রঙের কাপড় তিনি পরিধান করেন। কয়েকটি সাপ তাকে এমনভাবে জড়িয়ে থাকে, যেন তাঁর অলংকার।
দেবী মনসার পিতার নাম কশ্যপ মুনি এবং মাতার নাম কদু। পুরাণমতে তিনি জগৎকারু মুনির পত্নী, আস্তিক মুনির মাতা এবং সর্পরাজ বাসুকির বোন। মনসা সর্পকুলের দেবী ও জননী। তাই তাঁকে নাগমাতাও বলা হয়ে থাকে।
আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপঞ্চমী তিথিকে বলা হয় নাগপঞ্চমী। এ সময় বাড়ির উঠানে সিজগাছ স্থাপন করে মনাসাপূজা করা হয়ে থাকে। আবার ভাদ্রমাসের কৃষ্ণাপঞ্চমী তিথিতেও মনসা পূজার বিধান আছে। বর্তমানে সর্বজনীনভাবে মন্দিরেও পূজা করা হয়ে থাকে।
মনসা সর্পের দেবী। তিনি সর্পকুলের জননী। মনসা পূজার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সাপের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া। কেননা তিনি সর্পভয় দূর করেন। এছাড়াও তিনি উর্বরতা ও সমৃদ্ধির দেবী। তাই আমরা মনসা পূজা করে থাকি।
মনসাদেবীর প্রণামমন্ত্র-
আস্তিকন্তু মুনের্মাতা ভগিনী কসুকেস্তথা। জরৎকারুমুনেঃ পত্নী মনসাদেবী নমোহস্তুতে ।
মনসাদেবীর পূজা করলে সাপের ভয় থাকে না। তাছাড়া সাপ সম্পর্কে ধাণার সুযোগ ঘটে এবং বিষধর সাপের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। মনসা পূজার শিক্ষার মাধ্যমে শত্রুকে সুপথে ফিরিয়ে এনে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়।
বিষ্ণুর সহস্র নামের মধ্যে ২৪৫তম নাম নারায়ণ। 'নার' বা 'নারা' শব্দের অর্থ মানুষ এবং 'অয়ন' শব্দের অর্থ আশ্রয়। সুতরাং নারায়ণ শব্দের অর্থ সকল মানুষ বা সকল জীবের আশ্রয়স্থল। হিন্দুধর্ম অনুসারে নারায়ণ পরমব্রহ্ম, পরমাত্মা ও পরমেশ্বর নামে পরিচিত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও পুরাণ অনুসারে নারায়ণকে সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ভগবান বিষ্ণুই হচ্ছে নারায়ণ বা হরি। ধর্মগ্রন্থ অনুসারে ভগবান বিষ্ণু শ্যামবর্ণ। তার চার হাত। এক হাতে পদ্ম, এক হাতে শঙ্খ, 'এক হাতে চক্র এবং এক হাতে গদা। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুসারে নারায়ণের বিশ্বরূপ দর্শন রয়েছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও পুরাণ অনুসারে নারায়ণকে সর্বশ্রেষ্ট দেবতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। নারীয়ণ পরমব্রহ্ম, পরমেশ্বর ও পরমাত্মা। নারায়ণকে সকল জীবের আশ্রয়স্থল বলা হয় এবং তিনি সকল জীবের পালনকর্তাও। তাই নারায়ণকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।
ভগবান নারায়ণ সকল জীবের পরম আশ্রয়স্থল এবং তিনিই পরমাত্মা। তিনি সকল জীবকে পালন করেছেন। নারায়ণ পূজার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো ভগবানকে সন্তুষ্ট করা ও আশীর্বাদ লাভ করা এবং তাঁর কৃপায় পারিবারিক সুখ-শান্তি অর্জন করা।
শালগ্রাম শিলা এক প্রকার সামুদ্রিক জীবাশ্ম, যা ভারতের গণ্ডকী নদীর তীরে শালগ্রাম নামক গ্রামে পাওয়া যায়। এই জীবাশ্মটি কালো ও গোল রঙের হয়ে থাকে। এই শিলাকে নারায়ণচক্র বা নারায়ণের প্রতিরূপ বলা হয়।
প্রতিমারূপে, শালগ্রাম শিলারূপে তাম্রপাত্রে বা জলে নারায়ণ পূজা করা হয়। নারায়ণ পূজায় অন্যান্য পূজার মতোই সাধারণ পূজাবিধি অনুসরণ করে ও নির্ধারিত মন্ত্রে পূজা করা হয়। যেকোনো সময় বা মাসে নারায়ণপূজা করা যায়। তবে বৈশাখ মাসে নারায়ণ পূজার প্রচলন দেখা যায়।
নারায়ণের প্রণাম মন্ত্র:
ওঁ নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণহিতায় চ। জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ।
হিন্দুধর্ম অনুসারে নারায়ণ পরম-ব্রহ্ম, পরমাত্না ও পরমেশ্বর নামে পরিচিত। নারায়ণ প্রতিপালনের দেবতা। তাই নারায়ণদেবের কাছ থেকে আমরা আমাদের সন্তান-সন্ততি তথা সকল জীবকে দায়িত্বের সঙ্গে পালন করার শিক্ষা পাই।
নারায়ণকে স্মরণ করলে পাপ দূরীভূত হয়। হৃদয় পবিত্র হয়। মনে শক্তির সঞ্চার হয়। নারায়ণ পূজার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। ভক্তরা নারায়ণের আশীর্বাদ লাভের মাধ্যমে জীবনকে সুখ ও সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে তোলে
হিন্দুধর্মে অন্যান্য দেবতার মতো শনিদেবও একজন উপাস্য দেবতা। তিনি সূর্য এবং ছায়ার পুত্র এবং নবগ্রহের মধ্যে অন্যতম। জীবন চলার ক্ষেত্রে যেসব বাধা-বিপত্তি আসে, শনিদেব তা দূর করেন। শকুন শনিদেবের বাহন।
শনি দেবতার নাম অনুসারে শনিবারে তাঁর পূজা করা হয়। সাধারণত মন্দিরে বা পারিবারিক পর্যায়ে সূর্যাস্তের পরে শনিপূজা করা হয়। গৃহের অভ্যন্তরে শনিপূজা করা যায় না, তাই আঙ্গিনাকে বেঁছে নেওয়া হয় এবং অন্যান্য পূজার মতো সাধারণ বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়।
শনিপূজায় ভোগ হিসেবে পাঁচপ্রকারের ঋতু ভিত্তিক ফল এবং পাঁচ রকমের ফুল নিবেদন করা হয়। কোথাও খিচুড়ি, মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। এছাড়াও পূজার উপকরণ হিসেবে পান-সুপারি, মধু, মাসকলাই, কালো বা বেগুনি ফুল, কালো তিল প্রয়োজন হয়।
শনিদেবের প্রণামমন্ত্রের অর্থে বলা হয়েছে-তোমার দেহ নীলবর্ণ, তুমি সূর্যদেবতার পুত্র। ছায়ার গর্ভে তোমার জন্ম, তোমাকে আমি নমস্কার জানাই। জীবন চলার পথে যেসব বাঁধা-বিপত্তি আসে শনিদেব তা দূর করেন।
মা যেমন সন্তানকে গভীর ভালোবাসা সত্ত্বেও সংশোধনের জন্য শাস্তি দেন, তেমনি শনিদেবও কখনো কখনো আমাদের কস্ট দিয়ে সংশোধন করেন এবং অধর্মের পথ থেকে আমাদের ধর্ম পথে ফিরিয়ে আনেন। ভক্তদের রক্ষা করেন।
শনিদেবের পূজা করলে আমাদের আপদ-বিপদ দূর হয়। আমাদেশ দায়িত্বহীনতা, অপবিত্রতা ও পাপের কারণে শনিদেব রুষ্ঠ হন। তখন আমরা কষ্ট পাই। কষ্টের মধ্য দিয়ে আমাদের উপলব্ধি ঘটে এবং দায়িত্বশীলতা ও পবিত্রতার প্রতি মনোযোগী হই। এজন্যই শনিপূজা নিয়মিত ধর্মকৃত্য।
হিন্দুধর্মে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করা হয়। দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করার মাধ্যমে তাঁদের সন্তুষ্টি লাভ হয় এবং জাগতিক ও পারমার্থিক কল্যাণ লাভ করা যায়। ফলে ঈশ্বর ও দেব-দেবীর প্রতি ভক্তি, একাগ্রতা, গভীর শ্রদ্ধাবোধ এবং নিজেদের মধ্যেও পূজার অনুষ্ঠানে সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি ও সংহতি সৃষ্টি হয়। সুতরাং বলা যায়, নিজেদের মনোবাসনা পূরণের জন্য সকলের মঙ্গল কামনার জন্য এবং দেব-দেবীর সন্তুষ্টির লাভের মাধ্যমে এসব জিনিস পেতেই দেব-দেবীর পূজা করা হয়।
পূজার রীতিনীতি বা বিধি অনুসারে অভীষ্ট দেবতা বা দেবীর জন্য সমর্পিত বস্তুই হলো নৈবেদ্য। নৈবেদ্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফল, মিষ্টি বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের প্রয়োজন হয়। এগুলোকে পূজার উপকরণ রা উপাচারও বলা হয়।
নারায়ণপূজার তিনটি সুফল হলো-
১. পারিবারিক সুখ-শান্তি অর্জন করা।
২. হৃদয়কে পবিত্র করা ও
৩. দৈনন্দিন জীবনকে সুখ ও সমৃদ্ধিময় করে তোলা।
ব্যাখ্যা: নারায়ণ দেবের পূজা করলে তাঁর আশীর্বাদ লাভ করা যায় এবং এসব সুফল লাভ করা যায়। নারায়ণ সকল জীবের আশ্রয়স্থল এবং গৃহদেবতা। তাঁর পূজার মাধ্যমে তাই পারিবারিক সুখ-শান্তি অর্জিত হয়, হৃদয় পবিত্র হয় এবং দৈনন্দিন জীবনও সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজ করে এবং মানুষের জীবনও সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ হয়।
শালগ্রাম শিলা হলো এক প্রকার সামুদ্রিক জীবাশ্ম যা ভারতের গণ্ডকী নদীর তীরে শালগ্রাম নামক গ্রামে পাওয়া যায়। এ জীবাশ্যুটি গোল, কালো রঙের হয়ে থাকে। এ শিলাকে নারায়ণ চক্রও বলা হয়। কেননা, শালগ্রাম শিলারূপেও নারায়ণপূজা করা হয়ে থাকে।
শনিদেবের পূজায় কী-কী উপকরণ ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: শনি পূজায় শনির ভোগ হিসেবে পাঁচ প্রকারের. ঋতুভিত্তিক ফল এবং পাঁচ রকমের ফুল নিবেদন করা হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে প্রসাদ হিসেবে খিচুড়ি, দুধ, চিনি, বাতাসা, কলা, গুড়, মিষ্টান্ন ও ময়দার ফলার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়াও পূজার উপকরণ হিসেবে পান-সুপারি, মধুর বাটি, মাসকলাই, কালো তিল, বেগুনি বা কালো রঙের ফুলের প্রয়োজন হয়।
Related Question
View Allআষাঢ় মাসের কৃষ্ণাপঞ্চমী তিথিকে নাগপঞ্চমী বলে।
পার্বণ' বলতে বোঝায় হিন্দুধর্মের বিধি-বিধান অনুসারে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিভিন্ন ধরনের উৎসবের আয়োজন করা। 'পার্বণ' শব্দের অর্থ হলো পর্ব বা উৎসব। পূজা উপলক্ষে প্রতিমা নির্মাণ, ভক্তদের সাথে ভাব বিনিময়, পরিচ্ছন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান, নানা ধরনের খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি আয়োজন করা হয়ে থাকে। এগুলো সবই পার্বণের অন্তর্ভুক্ত।
তাপসী দেবীর ছেলে পূজার যে উপকরণ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল তা হলো শঙ্খ। কেননা শঙ্খই পবিত্র ধ্বনি সৃষ্টি করে আমাদেরকে দেবতার কাছে নত হতে উদ্বুদ্ধ করে। হিন্দুধর্মে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করা হয়। পূজা করার বিভিন্ন রীতিনীতি আছে, যাকে পূজাবিধি বলে। বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা সঠিকভাবে করার জন্য ও পূজার রীতিনীতিসমূহ সঠিকভাবে পালন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। এসকল পূজাসামগ্রীকে পূজার উপকরণ বা উপচার বলে। এসব উপকরণের মধ্যে শঙ্খ অন্যতম। উদ্দীপকে তাপসী দেবীর ছেলে পূজার যে উপকরণ সম্পর্কে জানতে চেয়েছে তার শব্দ আমাদের দেবতার কাছে নত হতে এবং আত্মসমর্পণ করতে বলে। এর দ্বারা বোঝা যায়, এখানে শঙ্খের কথাই বলা হয়েছে। শঙ্খ মঙ্গলসূচক পূজা-উপকরণ, যা সৃষ্টির পবিত্র ধ্বনি সৃষ্টি করে। এর সুরেলা ধ্বনি যেন সকলকে জ্ঞানের জগতে, ভক্তির জগতে আহ্বান জানায়- তোমরা এস, দেবতার কাছে আনত হও, আত্মনিবেদন কর। উদ্দীপকে তাপসী দেবীর ছেলে পূজার এ উপকরণ সম্পর্কেই জানতে চেয়েছিল যা তার মায়ের বর্ণনা থেকে ধারণা করা যায়।
পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে উদ্দীপকে উল্লিখিত দেবতা বা শনিদেবের পূজার প্রভাব অপরিসীম।
হিন্দুধর্মে অন্যান্য দেবতার মতো শনিদেবও একজন উপাস্য দেবতা। জীবনে চলার পথে যেসব বাধা-বিপত্তি আসে, শনিদেব তা দূর করেন। উদ্দীপক তাপসী দেবী নবগ্রহের অন্যতম যে দেবতার পূজা করেন তিনি হলেন শনিদেব। প্রতিবছর সপ্তাহের এক বিশেষ দিন বা শনিবারে তিনি এ পূজা করেন। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এ পূজার গভীর প্রভাব রয়েছে। শনিদেবের পূজা করলে আমাদের আপদ-বিপদ দূর হয়। আমাদের দায়িত্বহীনতা, অপবিত্রতা ও পাপের কারণে শনিদেব খুব রুষ্ট হন। তখন আমরা কষ্ট পাই। কষ্টের মধ্য দিয়ে আমাদের উপলব্ধি ঘটে। আমরা তখন দায়িত্বশীলতা ও পবিত্রতার প্রতি মনোযোগী হই। মা যেমন সন্তানকে গভীর ভালোবাসা সত্ত্বেও সংশোধনের জন্য শাস্তি দেন, তেমনি শনিদেবও কখনো কখনো আমাদের কষ্ট দিয়ে সংশোধন করেন এবং অধর্মের পথ থেকে ধর্মের পথে ফিরিয়ে আনেন। তাই প্রতি সপ্তাহের শনিবার শনিপূজা করা হিন্দুদের একটি নিয়মিত ধর্মকৃত্য।
যে সকল দেবতার নাম বেদে উল্লিখিত হয়েছে, তাদের বৈদিক দেবতা বলে।
দেব-দেবীর পূজা সঠিকভাবে করার জন্য ও পূজার রীতি-নীতিসমূহ সঠিকভাবে পালন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। এ সকল পূজা সামগ্রীকে পূজার উপকরণ বা উপাচার বলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পূজার রীতিনীতি বা বিধি অনুসারে অভীষ্ট দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য সমর্পণ করতে হয়। নৈবেদ্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফল, মিষ্টি বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের প্রয়োজন হয়।
এগুলোকে পূজার উপকরণ বা উপাচার বলে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!