মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে উৎপাদন ও বণ্টনসহ সকল বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে ব্যবসায় বলে। এর মাধ্যমে সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সহজ হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এটি মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতাকে বৃদ্ধি করে মূলধন গঠনে সহায়তা করে।। উক্ত মূলধন দ্বারা নতুন নতুন শিল্পকারখানা গঠিত হয়, যা দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে উৎপাদন ও বণ্টনসহ সকল বৈধ অর্থনৈতিক কাজকে ব্যবসায় বলে। কেউ যদি উদ্দেশ্যবিহীনভাবে খেলাধুলা করে, মানসিক সন্তুষ্টির জন্য গান-বাজনা করে তবে তার কাজকে ব্যবসায় বলা যাবে না। ব্যবসায় হতে হলে সেখানে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকতে হবে। কেননা ব্যবসায়ের প্রধান উদ্দেশ্যই। হচ্ছে মুনাফা অর্জন।
মানুষের ভালো-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিকটি গ্রহণ করাই নৈতিকতা। ব্যবসায়িক নৈতিকতা বলতে সত্য, ন্যায় ও আদর্শের মাঝে থেকে সততার ভিত্তিতে ব্যবসায়ের বিভিন্ন কাজ। পরিচালনা করাকে বোঝায়। ব্যবসায়িক নৈতিকতার মাধ্যমে ন্যায়বিচার, আদর্শ, সততা, বিশ্বস্ততা, আইনগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে ব্যবসায়িক কাজ পরিচালনা করা যায়।
সমাজ ও সমাজসংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের প্রতি ব্যবসায়ের কর্তব্য পালনের দায় হলো ব্যবসায়ের সামাজিক দায়বদ্ধতা। উৎপাদক, সরবরাহকারী, ক্রেতা, ভোক্তা, এলাকা, সরকার, মধ্যস্থ ব্যবসায়ী প্রভৃতি উপাদানের সমষ্টি হলো সমাজ। ব্যবসায়কে সমাজের এসব পক্ষের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হয়। সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই ব্যবসায়ী সফল হতে পারে।
ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশের ধারা তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়।
যথা-
(১) প্রাচীন যুগ: সভ্যতার ছোঁয়া লাগার পূর্ব থেকে অর্থের প্রচলন পর্যন্ত সময় কালকে প্রাচীন যুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
(২) মধ্যযুগ: শিল্প বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়কালকে মধ্যযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
(৩) আধুনিক যুগ: শিল্পবিপ্লবের সময় (১৭৫০- ১৮৫০) থেকেই ব্যবসায়ের আধুনিক যুগের গোড়াপত্তণ হয়।
যে যুগে মানুষ প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল ছিল ঐ যুগকে ব্যবসায়ের প্রাচীন যুগ বলে। এ সময়ে মানুষ বনে-বাদাড়ে ঘুরে ফলমূল সংগ্রহ করে এবং পশু ও মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। এরপর তারা পশুপালন ও কৃষিকাজ শুরু করে দ্রব্যাদি একে অপরের সাথে বিনিময় করত। এটি বিনিময় প্রথা নামে পরিচিত ছিল। এ প্রথার সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য মানুষ শামুক-ঝিনুক, স্বর্ণ-রৌপ্য, | কড়ি-পাথর ও বিভিন্ন ধাতব মুদ্রার ব্যবহার শুরু করে।
যে যুগে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করে ঐ যুগকে ব্যবসায়ের মধ্যযুগ বলে। এ সময়ে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয় এবং চিন্তা-চেতনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসতে থাকে। এছাড়া কামার, কুমার, তাঁতি, স্বর্ণকার শ্রেণির উদ্ভব হয় এ সময়েই। রাস্তাঘাট, বাজার ও শহর গড়ে উঠতে থাকে। এ সময়ে সর্বজন স্বীকৃত মাধ্যম হিসেবে অর্থ ও মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন হয়। এ যুগেই একমালিকানা, অংশীদারি, ব্যবসায়ী সংঘ, কারিগরি সংঘ ও উৎপাদক সংঘের উদ্ভব ঘটে।
যে যুগে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয় ঐ যুগকে ব্যবসায়ের আধুনিক যুগ বলে। এ সময়ে গড়ে উঠে নতুন নতুন কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময়েই ব্যাংক ও বিমা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, এটিএম কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং-এর প্রচলন হয়। তাছাড়া এ সময়ে কোম্পানি সংগঠন, ব্যবসায় জোট, রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় ও যৌথ উদ্যোগে ব্যবসায়ের ব্যাপক প্রসারের পাশাপাশি বহুজাতিক সংস্থাগুলোও বিশ্বের সব জায়গায় সম্প্রসারিত হতে থাকে।
অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে মানুষ যেসব কাজ করে (চাকরি, ব্যবসায়, আত্মকর্মসংস্থান) তার সবই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। অভাব পূরণের লক্ষ্যেই মানুষ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন প্রচেষ্টায় জড়িত হয়। ক্রয়, বিক্রয়, উৎপাদন, বণ্টন, বিপণন, চাকরি প্রভৃতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই সংঘটিত হয়ে থাকে। দিনে দিনে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওতাও বাড়তে থাকে।
যান্ত্রিকশক্তি আবিষ্কারের ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ইউরোপের শিল্পজগতে উৎপাদন ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন সাধিত হয়, তাকে শিল্পবিপ্লব বলে। ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত সময়কে শিল্পবিপ্লব যুগ বলা হয়। এ সময়ে ইউরোপের কলকারখানায় উৎপাদন ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু হয়। ফলে পারিবারিক উৎপাদন ব্যবস্থাগুলো বড় শিল্পকারখানায় রূপ নেয়। আর যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে কম সময়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়।
সাধারণত মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই সমাজে ও দেশে দেশে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিনিময় প্রথা চালু হয়ে এসেছে। চাহিদা মিটাতে সমাজের মানুষজন নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত দ্রব্যাদি অপরের সাথে বিনিময় করত। আর এই দ্রব্যের পরিবর্তে দ্রব্যের আদান-প্রদানকেই বিনিময় প্রথা বলা হয়ে থাকে।
ব্যবসায়ের ৪টি বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:
১. ব্যবসায়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য।
২. ব্যবসায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আইনগত বৈধতা।
৩. আর্থিক মূল্য ব্যবসায়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য।
৪. ঝুঁকির সম্পর্ক ব্যবসায়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আধুনিক ব্যবসায়কে প্রধানত তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. শিল্প: যে প্রক্রিয়ায় কাঁচামালকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্যে রূপান্তর করা হয় তাকে শিল্প বলে।
২. বাণিজ্য: শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বা সেবা সামগ্রী ভোক্তাদের নিকট পৌছানোর সকল কার্যাবলিই বাণিজ্য।
৩. প্রত্যক্ষ সেবা: পেশাজীবী কর্তৃক বিভিন্ন রকম সেবা অর্থের বিনিময়ে প্রদান করাই হলো প্রত্যক্ষ সেবা।
যে প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করে এবং এতে রূপগত উপযোগ সৃষ্টি করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্যে পরিণত করা হয় তাকে শিল্প বলে। শিল্প ব্যবসায়ের উৎপাদনকারী শাখা। প্রকৃতি প্রদত্ত, সম্পদগুলো মানুষ সবসময় সরাসরি ভোগ বা ব্যবহার করতে পারে না। এক্ষেত্রে শিল্প উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদগুলোর রূপ পরিবর্তন করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্যে পরিণত করে।
উৎপাদিত পণ্য বা সেবার বণ্টনসংক্রান্ত কাজের (ক্রয়, বিক্রয়, পরিবহন, গুদামজাতকরণ প্রভৃতি) সমষ্টি হলো বাণিজ্য। বাণিজ্য ব্যবসায়ের পণ্য বণ্টনকারী শাখা হিসেবে বিবেচিত। উৎপাদিত। পণ্যসামগ্রী বা সেবা ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন বাধার (স্থানগত, ব্যক্তিগত, সময়গত, ঝুঁকিগত) সম্মুখীন হতে হয়। এসব বাধা দূর করে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়াই বাণিজ্যের কাজ।
গ্রাহকদের প্রয়োজন পূরণে সমর্থ এমন কোনো কাজ বা তৃপ্তিকে প্রত্যক্ষ সেবা বলে। অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে স্বাধীন পেশায় নিয়োজিত ডাক্তার, উকিল, প্রকৌশলী প্রভৃতি পেশাজীবীরা বিভিন্ন রকম সেবাকর্ম অর্থের বিনিময়ে প্রদান করে থাকেন। এ সকল সেবাকর্ম বা বৃত্তি প্রত্যক্ষ সেবা হিসেবে পরিচিত। যেমন: ডাক্তারি ক্লিনিক, আইন চেম্বার, প্রকোশলী ফার্ম, অডিট ফার্ম ইত্যাদি। প্রত্যক্ষ সেবা আধুনিক ব্যবসায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।
শিল্পকে প্রধানত পাঁচভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(১) প্রজনন শিল্প (২) নিষ্কাশন শিল্প (৩) নির্মাণ শিল্প (৪) উৎপাদন শিল্প (৫) সেবা শিল্প।
অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্বাচিত উদ্ভিদ ও প্রাণীর বংশ বিস্তারের প্রক্রিয়াকে প্রজনন শিল্প বলে। এই শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীকে পুনরায় উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন: নার্সারিতে সৃষ্ট চারা পরবর্তীতে গাছ বা ফলমূল উৎপাদন করে, পোলট্রি ফার্মে ডিম বা বাচ্চা উৎপাদিত হয়, হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদিত হয় যার সবকিছুই পরবর্তী উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে থাকে।
যে শিল্পের মাধ্যমে ভূগর্ভ, পানি বা বায়ু থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করা হয় তাকে নিষ্কাশন শিল্প বলে। নিষ্কাশন শিল্পের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে খনিজ তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদি উত্তোলন এবং সমুদ্র। থেকে মৎস্য, মূল্যবান পাথর সংগ্রহ করা হয়।.
যে শিল্প প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাস্তাঘাট, সেতু, বাঁধ, দালানকোঠা ইত্যাদি তৈরি করা হয় তাকে নির্মাণ শিল্প বলে। ছোট থেকে বড় বিভিন্ন ধরনের নির্মাণের সাথে দেশি-বিদেশি নির্মাণ কোম্পানিসমূহ কাজ করে। এ সকল নির্মাণ কোম্পানি ফরমায়েশের ভিত্তিতে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, মনোরেল, সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন ছোট-বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর উদাহরণ।
যে শিল্প প্রচেষ্টায় শ্রম ও যন্ত্রের সাহায্যে কাঁচামাল বা অর্ধ প্রস্তুত জিনিসকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্যে প্রস্তুত করা হয় ঐ শিল্পকে উৎপাদন শিল্প বলে। যেমন: তুলা থেকে কাপড় ও বস্ত্র উৎপাদন, খনি থেকে প্রাপ্ত লৌহ আকরিক ব্যবহার করে লৌহ ও ইস্পাত সামগ্রী উৎপাদন। এছাড়াও চিনি শিল্প, সিমেন্ট শিল্প, প্রকৌশল শিল্প, আসবাবপত্র শিল্প ইত্যাদি এরূপ শিল্পের আওতাভুক্ত।
যে শিল্প মানুষের জীবনযাত্রাকে আরামদায়ক ও সহজ করেছে তাকে সেবা শিল্প বলে। যেমন: গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ইত্যাদি সেবা | সরবরাহকৃত প্রতিষ্ঠান এরূপ শিল্পের আওতাভুক্ত। সড়ক, নৌ ও বিমানপথের যাত্রী, পর্যটন, চলচ্চিত্র এবং পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানসমূহও এ ধরনের শিল্পের অন্তর্গত।
শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যাদি মানুষের অভাব ও চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়, যতক্ষণ না সেবাদানকারী ব্যবসায়সমূহের কার্যক্রম সম্পাদিত হয়। সেবা শিল্প বিভিন্ন প্রকার সেবা প্রদানের মাধ্যমে মানুষের | জীবনযাত্রা সহজ ও আরামদায়ক করে। যেমন- বিদ্যুৎ ও গ্যাস, গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি। কৃষি, প্রজনন, উত্তোলন, নির্মাণ এবং উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যের যথাযথ বণ্টনের জন্য সেবা শিল্পের প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক।
মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পণ্যদ্রব্য বা সেবাসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত কাজকে পণ্য বিনিময় বলে। এটি বাণিজ্যের প্রধান শাখা হিসেবে গণ্য। এর কাজ হলো পণ্য বণ্টনকালে ব্যক্তিসংক্রান্ত বাধা। অপসারণ করে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা। এছাড়াও এর মাধ্যমে ক্রেতা অর্থের বিনিময়ে পণ্যের মালিকানাস্বত্ব গ্রহণ করে এবং বিক্রেতা পণ্যের মালিকানাস্বত্ব ক্রেতাকে হস্তান্তর করে। সুতরাং পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে পণ্যের মালিকানা পরিবর্তন হয় এবং এর মাধ্যমে দুটি পক্ষের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় কার্য সম্পন্ন হয়।
দুটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পণ্য বা সেবার কেনা-বেচা করাকে ব্যবসায় টু ব্যবসায় বলে। চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পণ্য বণ্টনের ক্ষেত্রে উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী- এ তিন পক্ষের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন করা। আর তিনটি পক্ষই ব্যবসায়ী হিসেবে পরিগণিত হয়। এছাড়া বাণিজ্যের বিভিন্ন সহায়ক কার্যাবলি (পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিমা, বিজ্ঞাপন প্রভৃতি) সম্পাদনেও ব্যবসায়ীরা 1 নিয়োজিত থাকে। এক্ষেত্রে বাণিজ্যের যাবতীয় কাজে একজন ব্যবসায়ী আরেকজন ব্যবসায়ীর কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাণিজ্যকে ব্যবসায় টু ব্যবসায় বা Business to Business বলা হয়।
এক দেশের প্রয়োজনে অন্য দেশ থেকে পণ্য ক্রয় করে আনাকে আমদানি বলা হয়। যখন এক দেশ অন্য কোনো দেশ থেকে পণ্য বা সেবা অর্থের বিনিময়ে আনয়ন করে তখন এটি হয় আমদানি বাণিজ্য। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যখন বিদেশ থেকে ঔষধ, যন্ত্রপাতি বা শিল্পজাত পণ্যদ্রব্য আনয়ন করি তখন তা হয় আমাদের দেশের জন্য। আমদানি বাণিজ্য।
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধাগুলো নিচে দেওয়া হলো: (১) স্বত্বগত, (২) স্থানগত বাধা, (৩) সময়গত বাধা, (৪) অর্থগত বাধা, (৫) ঝুঁকিগত বাধা, (৬) তথ্যগত বাধা।
নিচে বাণিজ্যের উপাদানগুলোর কাজ উল্লেখ করা হলো:
বাণিজ্যের উপাদান | কাজ |
পণ্য বিনিময় | মালিকানাসংক্রান্ত বাধা দূর করে |
পরিবহন | স্থানগত বাধা দূর করে |
গুদামজাতকরণ | সময়গত বাধা দূর করে |
ব্যাংকিং | অর্থসংক্রান্ত বাধা দূর করে |
বিমা | ঝুঁকিসংক্রান্ত বাধা দূর করে |
বিজ্ঞাপন | তথ্য ও প্রচারসংক্রান্ত বাধা দূর করে |
বাণিজ্য ৬ ধরনের উপযোগ সৃষ্টি করে। পণ্য বিনিময়ের মাধমে ব্যবসায়ে স্বত্বগত, পরিবহনের মাধ্যমে স্থানগত, গুদামজাতকরণের মাধ্যমে সময়গত, ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে অর্থগত, বিমার মাধ্যমে ঝুঁকিগত এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তথ্যগত উপযোগ সৃষ্টি করে।
নির্দিস্ট মূল্যের বিনিময়ে পণ্যের মালিকানা হস্তান্তরকার্যই ক্রয় বিক্রয় নামে অভিহিত। পণ্য-দ্রব্য বা সেবাসামগ্রী ক্রয়ের মাধ্যমে পণ্যের মালিকানা সৃষ্টি হয়। আর বিক্রয়ের মাধ্যমে পণ্যের মালিকানা বিক্রেতার নিকট থেকে ক্রেতার নিকট হস্তান্তরিত হয়। তাই বলা যায়, ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে পণ্যের মালিকানাসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হয়।
উৎপাদনস্থল থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য প্রেরণে স্থানগত উপযোগ সৃষ্টির কাজকেই পরিবহন বলে। পরিবহন ব্যবসায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিশ্বায়নের এ যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তে পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে আর তা ব্যবহার বা ভোগ করছে পৃথিবীর নানান প্রান্তের মানুষ। পরিবহন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় প্রকার বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ, পরিবহনসংক্রান্ত কার্যাবলির মাধ্যমে স্থানগত উপযোগ সৃষ্টি হয়
উৎপাদন ও ভোগের মধ্যবর্তী সময়ে বিনষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য ব্যবসায়িগণ পণ্য সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা গড়ে তোলে তাকে গুদামজাতকরণ বলে। গুদামজাতকরণের মাধ্যমে ব্যবসায়ের সময়গত উপযোগ সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পণ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করে রাখা যায়। ফলে পণ্যসামগ্রীকে পরিমাণগত ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যায়। অর্থাৎ এক মৌসুমের ফসল অন্য মৌসুমেও ভোগ বা ব্যবহার করা যায়।
বিজ্ঞাপন পণ্য ও সেবাসামগ্রীর তথ্য ও প্রচারসংক্রান্ত বাধা দূর করে থাকে। সাধারণ পণ্যসামগ্রী উৎপাদনের পর পর ক্রেতারা পণ্য সম্পর্কে অবগত থাকেন না। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্যের উৎপত্তি, গুণাগুণ, সুবিধা ও দাম সম্পর্কে ক্রেতাদেরকে জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। এর মাধ্যমে ক্রেতাদের তথ্যগত বাধা দূর হয়; যা বিজ্ঞাপনে মাধ্যমেই সম্ভব।
অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে গ্রাহকদের সরাসরি কোনো সুবিধা বা সেবা দেওয়ার সাথে জড়িত ব্যবসায় হলো প্রত্যক্ষ সেবা। সেবাকে কেন্দ্র করে এর আর্থিক কাজ পরিচালিত হয়। এটি দেখা বা স্পর্শ করা যায় না। কিন্তু সেবা মানুষের প্রয়োজন পূরণে সক্ষম। একজন ডাক্তার সরাসরি রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেন। তাই ডাক্তারি একধরনের প্রত্যক্ষ সেবামূলক ব্যবসায়।
গ্রাহকদের সরাসরি কোনো সুবিধা বা সেবা দেওয়ার সাথে জড়িত অর্থনৈতিক কাজ হলো প্রত্যক্ষ সেবা। একজন আর্কিটেক্ট তার ফার্মের মাধ্যমে গ্রাহকদের বাড়ির ডিজাইন করে দেন। সেবা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি অর্থ উপার্জন করেন। এই সেবা পেয়ে গ্রাহকরা উপকৃত হয়। তাই আর্কিটেক্ট ফার্মকে প্রত্যক্ষ সেবা বলা হয়।
মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে উৎপাদন ও বণ্টনসহ সকল বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে ব্যবসায় বলে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড হিসেবে ব্যবসায় গণ্য হলেও যেকোনো দেশের আর্থ-সামাজিক বা জাতীয় উন্নয়নে ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এর মাধ্যমে সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সহজ হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এটি মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতাকে বৃদ্ধি করে মূলধন গঠনে সহায়তা করে। উক্ত মূলধন দ্বারা নতুন নতুন শিল্পকারখানা গঠিত হয়; যা দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেশে বেকার সমস্যার সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নতুন পণ্য তৈরি ও বিপণন করে থাকে। এতে ভোক্তারা নতুন পণ্য ভোগের সুযোগ পেয়ে উপকৃত হয়। আবার, এটি চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা করে। অন্যদিকে, ব্যবসায় কর্মসংস্থানের সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের আয় বাড়ায়। এভাবে ব্যবসায় জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।
নতুন কিছু তৈরি করা বা বিদ্যমান কোনো কিছুকে নতুন রূপদান করাই হলো সৃজনশীলতা। ক্রেতা-ভোক্তার চাহিদা সর্বদাই পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তিত চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ের নতুন কোনো পণ্য উদ্ভাবন বা বিদ্যমান পণ্যের উন্নয়ন ঘটাতে হয়। এভাবে ব্যবসায় সৃজনশীল কাজের উন্নয়ন ঘটায়।
ব্যবসায়ের মাধ্যমে মূলধন গঠন ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার হয়। এতে ব্যবসায়ীরা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের কাজেরও ব্যবস্থা করতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত ও জাতীয় আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এভাবে ব্যবসায় দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখে।
নিচে ব্যবসায়ের ৩টি গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:
১. ব্যবসায়ের মাধ্যমে সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সহজ হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
২. ব্যবসায়ের ফলে সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়, মূলধন গঠিত হয় ও জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়।
৩. ব্যবসায়ের মাধ্যমে বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ব্যবসায় পরিবেশের উপাদানসমূহকে ছয়ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-(১) প্রাকৃতিক পরিবেশ (২) অর্থনৈতিক পরিবেশ (৩) সামাজিক পরিবেশ (৪) রাজনৈতিক পরিবেশ (৫) আইনগত পরিবেশ (৬) প্রযুক্তিগত পরিবেশ।
প্রাকৃতিক পরিবেশের ৩টি উপাদান হলো-
(১) জলবায়ু (২) ভূমি (৩) নদনদী অর্থনৈতিক পরিবেশের ৩টি উপাদান হলো-
(১) সঞ্চয় ও বিনিয়োগ, (২) মূলধন এবং (৩) অর্থ ও ব্যাংকিং।
রাজনৈতিক পরিবেশের ৪টি উপাদান হলো-
(১) সরকার
(২) সার্বভৌমত্ব
(৩). আইন শৃঙ্খলা
(৪) রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা।
আইনগত পরিবেশের ৪টি উপাদান হলো-
(১) বাণিজ্যিক আইন
(২) শিল্প আইন
(৩) পরিবেশ সংরক্ষণ আইন
(৪) ভোক্তা আইন।
যেসব প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক উপাদান দ্বারা ব্যবসায় সংগঠনের গঠন, কার্যাবলি, উন্নতি, অবনতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয় সেগুলোর সমষ্টিকে ব্যবসায় পরিবেশ বলে। পরিবেশ দ্বারা মানুষের জীবনধারা, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ব্যবসায় প্রভাবিত হয়। সাধারণত কোনো স্থানের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উন্নতি নির্ভর করে ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর। 1 ব্যবসায়িক পরিবেশের সার্বিক অবস্থা অনুকূল হলে ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি সাবলীল হয়। আবার যদি ব্যবসায়িক সার্বিক পরিবেশ প্রতিকূল হয় তবে ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়।
পরিবেশের প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে ব্যবসায় প্রভাবিত হয়। এক্ষেত্রে অনুকূল উপাদানগুলোর প্রভাবে ব্যবসায়ে সহজে সফলতা পাওয়া যায়। আবার, এগুলোর প্রতিকূল প্রভাবে ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই ব্যরসায়কে লোকসানের ঝুঁকি. থেকে রক্ষা করতে এর পরিবেশ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা রাখা প্রয়োজন।
কোনো দেশের জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, নদনদী, দেশীয় আয়তন, দেশীয় অবস্থান ইত্যাদির সমন্বয়ে যে পরিবেশ গড়ে উঠে তাকে প্রাকৃতিক পরিবেশ বলে। একটা দেশের ব্যবসায় বাণিজ্য, মানুষের জীবনযাত্রা, পোশাক পরিচ্ছদ, খাওয়াদাওয়া সবকিছুই প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিশেষভাবে কৃষি, শিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে।
কোনো দেশের জনগণের আয় ও সঞ্চয়, অর্থ ও ঋণ ব্যবস্থা বিনিয়োগ, মূলধন ও জনসম্পদ ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তাকে অর্থনৈতিক পরিবেশ বলে। ব্যবসায় হলো পণ্যদ্রব্য ও সেবাসামগ্রী উৎপাদন, 'বণ্টন ও এর সহায়ক কাজের সমষ্টি। ভূমির উন্নয়ন, দালানকোঠা নির্মাণ, মালামাল সংগ্রহ ও বিভিন্ন প্রয়োজনে মূলধনের সংস্থান ব্যবসায়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব, সরকারের স্থিতিশীলতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিমালা, রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব ও তাদের চিন্তাভাবনা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি মিলিয়ে যে পারিপার্শ্বিকতার জন্ম নেয় তাকে রাজনৈতিক পরিবেশ বলে। অনুন্নত ও অসহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ দেশের ব্যবসায় পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। রাজনৈতিক পরিবেশ মূলত কোনো দেশের রাজনীতির চর্চার ধরন ও চিন্তাধারার সাথে জড়িত।
কোনো দেশের জনসংখ্যা, ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দেশীয় ঐতিহ্য, দেশের সুনাম ইত্যাদি নিয়ে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তাকে সামাজিক পরিবেশ বলে। মানুষের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যানধারণা পশ্চাৎপদ হলে সেখানে ব্যবসায়সহ সকল কাজই বাধাগ্রস্ত হয়। উত্তম শিক্ষা ছাড়া দক্ষ মানব সম্পদ পাওয়া যায় না। জনসংখ্যাকে ঘিরে দেশের বাজার ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। মানুষের নীতি-নৈতিকতা ব্যবসায়কে প্রভাবিত করে। দেশের ঐতিহ্য একটি জাতিকে এগিয়ে নেয়। যার সবই সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কিত। তাই এরূপ পরিবেশ ব্যবসায় বাণিজ্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
কোনো দেশের বাণিজ্যিক আইন, শিল্প আইন, পরিবেশসংক্রান্ত আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তাকে আইনগত পরিবেশ বলে। এরূপ পরিবেশ ব্যবসায়কে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। কেননা সাধারণ মানুষের -মতো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসমূহকেও রাষ্ট্রের তৈরি আইনের বিধিমালা মেনে ব্যবসায় করতে হয়।
কোনো দেশের বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা, এতদসংক্রান্ত গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রযুক্তি আমদানির সুযোগ ইত্যাদি মিলিয়ে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তাকে প্রযুক্তিগত পরিবেশ বলে। শিল্প-বাণিজ্য সব কর্মকাণ্ডই প্রযুক্তির হাত ধরে এগিয়ে চলছে। বিজ্ঞান আমাদেরকে নতুন নতুন জ্ঞান শিক্ষা দেয়। কিন্তু এ জ্ঞানের ব্যবহার ঘটে প্রযুক্তির মাধ্যমে। তাই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে কম খরচে নতুন নতুন পণ্য ও সেবার উৎপাদন সম্ভব হয় এবং এর মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সহজতর করা যায়।
অর্থনৈতিক বিভিন্ন উপাদান নিয়ে যে পরিবেশ গঠিত হয়, তাকে অর্থনৈতিক পরিবেশ বলে। অর্থনৈতিক পরিবেশের উপাদানগুলো ব্যবসায়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক উপাদানের উপস্থিতি যেকোনো দেশকে ব্যবসায়-বাণিজ্যে উন্নত এবং অর্থনৈতিক উপাদানের অনুপস্থিতি যেকোনো দেশকে ব্যবসায়-বাণিজ্যে পেছনে ফেলে দিতে পারে। সুতরাং অর্থ ব্যবসায়ের প্রাণস্বরূপ বিধায় ব্যবসায় স্থাপনে অর্থনৈতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
নিচে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের দুটি পার্থক্য দেখানো হলো
পার্থক্যের বিষয় | প্রাকৃতিক পরিবেশ | অর্থনৈতিক পরিবেশ |
সংজ্ঞা | কোনো দেশের ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, নদনদী, প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদির সমন্বয়ে যে পরিবেশ গড়ে ওঠে তাকে প্রাকৃতিক পরিবেশ বলে। | কোনো দেশের জনগণের আয় ও সঞ্চয়, অর্থ ও ঋণ ব্যবস্থা, মূলধন, মানব সম্পদ ইত্যাদির সমন্বয়ে যে পরিবেশ গড়ে ওঠে তাকে অর্থনৈতিক পরিবেশ বলে। |
নিয়ন্ত্রণ | প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। | অর্থনৈতিক পরিবেশের উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য। |
বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। এটি ব্যবসায়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশের প্রায় মাঝখান দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করায় এখানে ক্রান্তীয় জলবায়ু বিরাজ করে। কিন্তু মৌসুমি বায়ুর প্রভাব এখানে এত বেশি যে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু নামে পরিচিত। আবার ক্রান্তীয় অঞ্চলে হলেও সমুদ্রের নৈকট্য এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এদেশে তেমন শীত বা গ্রীষ্ম পরিলক্ষিত হয় না। এরূপ জলবায়ু বাংলাদেশের ব্যবসায় বাণিজ্যকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানানভাবে প্রভাবিত করে।
কোনো দেশের জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, মাটি, নদনদী, আয়তন, অবস্থান প্রভৃতি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশ হলো প্রাকৃতিক পরিবেশ। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চল নদীবিধৌত পলি দিয়ে গঠিত। ফলে সহজে এখানে শিল্প ও ভোগ্য পণ্যের কাঁচামাল উৎপাদিত হয়। এছাড়া এখনকার প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ কয়লা, চুনাপাথর, কঠিন শিলা, খনিজ তেল প্রভৃতি প্রাকৃতিক উপাদান শিল্প স্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
দেশে বিরাজমান কার্যকর অর্থ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কৃষি ও শিল্পের অবদান, জনগণের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ মানসিকতা এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবসায় পরিবেশের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর কয়েকটির ভিত্তি বেশ মজবুত হলেও অনেকগুলোর ভিত্তি তেমন সুদৃঢ় নয়। চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব, গ্রামীণ জনগণের ব্যাংকিং সেবা ও ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে শহরের তুলনায় কম সুবিধা, প্রশাসনিক জটিলতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ইত্যাদি প্রতিকূল অবস্থা কাটাতে পারলে বাংলাদেশ ব্যবসায় বিকাশে আরও দ্রুত অগ্রসর হতে পারবে বলে আশা করা যায়।
রাজনৈতিক পরিবেশের উপাদানগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়। সরকার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারি নীতিমালা, আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে এ পরিবেশ গঠিত হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিন্তে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় করতে পারেন। এভাবে উন্নত রাজনৈতিক পরিবেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে।
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সহজতর করে। বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞানসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার প্রভৃতির সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় প্রযুক্তিগত পরিবেশ। প্রযুক্তিগত পরিবেশ উন্নত হলে কম খরচে ও শ্রমে বেশি পণ্য উৎপাদন করা যায়। প্রযুক্তির কারণে পণ্যের গুণগত মানও ভালো হয়।
অনলাইনে বই কেনা ব্যবসায়ের প্রযুক্তিগত পরিবেশকে নির্দেশ করে। বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞানসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার প্রভৃতির সমন্বয়ে সৃষ্ট হয় প্রযুক্তিগত পরিবেশ। অনলাইনে বই কিনতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সহায়তা প্রয়োজন হয়। গ্রাহকরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে ঘরে বসেই বই অর্ডার করতে পারে। এটি প্রযুক্তিগত পরিবেশের একটি উপাদান।
Related Question
View Allমসলিন বস্ত্রের জন্য বাংলাদেশের খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ব্যবসায়ের গঠন, পরিচালনা ও সম্প্রসারণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে এমন সব পারিপার্শ্বিক উপাদানের সমষ্টি হলো ব্যবসায় পরিবেশ।
একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা এলাকার পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায় গড়ে ওঠে। এসব পারিপার্শ্বিক অবস্থা (আবহাওয়া ওজলবায়ু, অর্থ ব্যবস্থা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সরকারি আইন প্রভৃতি) ব্যবসায়ের ওপর প্রভাব ফেলে। এগুলো ব্যবসায়ের ওপর কখনো অনুকূল, আবার কখনো প্রতিকূল প্রভাব ফেলে। এসব প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান মিলে ব্যবসায় পরিবেশ গড়ে ওঠে।
সামাজিক পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে উদ্দীপকে উল্লিখিত শ্রমিক ও কারিগরদের সৃজনশীল রচনামূলকতা বিকাশ সম্ভব।
কোনো দেশের জনসংখ্যা, তাদের ধর্ম, বিশ্বাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রীতি- নীতি ও দেশীয় ঐতিহ্য প্রভৃতির সমন্বয়ে সামাজিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। এসব উপাদান মূলত মানুষের সৃষ্টি ও তাদের কাজের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। এটি ব্যবসায়ের লাভ-ক্ষতিকে প্রভাবিত করে।
উদ্দীপকে মসলিন বস্ত্রের কথা বলা হয়েছে। এদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে এ বস্ত্র উৎপাদনে দক্ষ ছিল। বর্তমানে এ বস্ত্র উৎপাদনের জন্য দক্ষ শ্রমিক ও কারিগরের অভাব দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী করা গেলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সহজ হবে। এতে শ্রমিক ও কারিগররা পুরনো ঐতিহ্য মসলিন কাপড় সম্পর্কে জানতে পারবে। পাশাপাশি উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকরলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা ও মানবসম্পদ সামাজিক পরিবেশের উপাদান। সুতরাং, সামাজিক পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রমিক ও কারিগরদের সৃজনশীল রচনামূলকতা বিকাশ সম্ভব।
বর্তমানে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে উদ্দীপকে উল্লিখিত ব্যবসায়ের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি বলে আমি মনে করি।
আর্থিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। উন্নত যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে প্রযুক্তিগত পরিবেশ। দেশের সার্বভৌমত্ব, সরকারি নীতিমালা, আইনশৃঙ্খলা প্রভৃতি উপাদানের সমন্বয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। আর অদক্ষ কর্মী ও অস্থিতিশীল রাজনীতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে আমাদের দেশে মসলিন কাপড়ের ব্যবসায় প্রসারের জন্য অনুকূল পরিবেশ আছে। কিন্তু মূলধনের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, ধর্মঘট ও দক্ষ কর্মীর অভাব আছে। এসব কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহী হচ্ছেন না। ফলে প্রচুর বৈদেশিক চাহিদা থাকার পরও মসলিন কাপড়ের ব্যবসায়ের প্রসার হচ্ছে না। শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির জন্য সুষ্ঠু ব্যবসায় পরিবেশ আবশ্যক। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উৎসাহী হবেন। ফলে ব্যবসায়ের সম্প্রসারণ হবে। সরকার অনুকূল শিল্পনীতি প্রণয়ন করলে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। এভাবে পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে মসলিন কাপড়ের ব্যবসায়ের প্রসার করা যাবে।
ব্যবসায় বা শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল উৎপাদকের কাছে পৌঁছানো কিংবা শিল্পে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সব কাজ (ক্রয়, বিক্রয়, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিজ্ঞাপন) হলো বাণিজ্য।
উৎপাদনের বাহন হলো শিল্প।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্য উৎপাদন করা হয়। আর এ উৎপাদন সংক্রান্ত কাজ শিল্পের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। তাই শিল্পকে উৎপাদনের বাহন বলা হয়
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
