"একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি"- ঋগ্বেদ এর শ্লোক ।
'নেহ নানাস্তি কিঞ্চন'-এ কথার অর্থ ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয় ।
দেব-দেবীগণ ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন শক্তি বা গুণের অধিকারী ।
ঈশ্বর জগতের নিধান-আধার ও আশ্রয় ।
হল কর্ষণ করে পৃথিবীকে অমৃতময় করেন বলরাম ।
ভগবান বামন রুপ ধারণ করে রাজা বলির দর্প চূর্ণ করেন ।
ভগবান বিষ্ণু মৎস্য রূপে বেদ উদ্ধার করেন ।
ভগবান বিষ্ণু বরাহ রূপে পৃথিবীকে দন্তে ধারণ করেন ।
ভগবান বিষ্ণুর কল্কিরূপে অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ধর্ম ও সত্য প্রতিষ্ঠা করা ।
অবতার তিন পর্যায়ের হয়ে থাকে ।
কলিযুগের অন্তে কল্কি আবির্ভূত হবেন ।
ভগবানের পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণ ।
মৎস্য, বরাহ যে অবতার তা লীলাবতার ।
শাস্ত্র অনুযায়ী বর্তমান যুগকে কলি যুগ বলা হয় ।
ভগবান বিষ্ণু একুশবার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়হীন করে ।
অবতারবাদ হিন্দুধর্মের ধর্মের অন্যতম বিশ্বাস ।
অবতার শব্দের অর্থ উপর থেকে নিচে নামা ।
ঈশ্বর চৈতন্যময় সত্তা ।
'গীতগোবিন্দ' কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা জয়দেব ।
দশ অবতারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।
চতুরাশ্রমের প্রথম আশ্রম ব্রহ্মচর্যাশ্রম ।
মানবজীবনে সর্বশেষ আশ্রম সন্ন্যাস ।
মানুষের জীবনের চারটি আশ্রমের প্রতিটির সময়কাল পঁচিশ বছর ।
নৃযজ্ঞ বলতে বোঝায় অতিথি সেবা ।
পাঁচ বছর বয়সে ব্রহ্মচর্য জীবন শুরু করতে হয় ।
কলিযুগে গার্হস্থ্য আশ্রমে থেকে জীবনযাপন করাই ভালো ।
প্রতিদিন পাঁচটি যজ্ঞ করতে হবে ।
মানুষের জীবনের সময়সীমাকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে ।
শতবর্ষের জীবনকে চারটি আশ্রমে বিভক্ত করা হয় ।
পাখি ও অন্যান্য জীবজন্তুর আহার প্রদানসহ নানা প্রকার পরিচর্যাকে ভূতযজ্ঞ বলে ।
জীবনের তৃতীয় পর্যায়ে বানপ্রস্থ আশ্রমের কথা আসে ।
জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সংযোগকে যোগসাধনা বলে ।
যোগ সাধনার সর্বোচ্চ স্তর সমাধি ।
যোগ' শব্দটির সাধারণ অর্থ সংযোগ ।
'যম'-এর সাধন পাঁচটি ।
অপরিগ্রহ যম সাধনের অঙ্গ ।
সাধনার শেষ স্তর সমাধি ।
মোক্ষলাভের জন্য প্রথমে আত্মোপলব্ধি প্রয়োজন ।
প্রাণায়াম তিন প্রকার ।
শ্বাস ত্যাগ করে বাইরে স্থির রাখার নাম রেচক ।
নিয়মিত গতিরোধ করে শ্বাস ভিতরে ধরে রাখার নাম কুম্ভক ।
দেহের ইন্দ্রয়গুলোকে নিজ নিজ বিষয় হতে মুক্ত করে চিত্তের অনুগামী করার নাম প্রত্যাহার ।
সন্ন্যাস শব্দের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ ।
জীবাত্মাকে আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হয় না মোক্ষ লাভ হলে ।
"মোক্ষলাভের জন্য কর্ম তাদের প্রয়োজন নাই"- বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ ।
মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি মোক্ষলাভ ।
কর্ম বলতে বোঝায় যা কিছু করা হয় ।
যখন বিশেষ কোনো ফলের আশায় কর্ম করা হয় তখন তাকে সকাম কর্ম বলে ।
শ্রীমদভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে জ্ঞানীর বিশটি লক্ষণের কথা বলা হয়েছে ।
ঈশ্বর জ্ঞানীর কাছে ব্রহ্ম রূপ ।
জ্ঞানীর কর্মে বন্ধন থাকে না ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের নাম ভক্তিযোগ ।
ভক্তিযোগের মূল কথা ভগবানের শ্রীচরণে আত্মসমর্পণ করা ।
ভক্তরা ব্রহ্মকে বিভিন্ন নামে ও রূপে অভিহিত করেছেন ।
ভক্তির মাধ্যমে ভক্ত ভগবানের অনুগ্রহ পেয়ে থাকেন ।
নারদীয় ভক্তিসূত্রে ভগবানে ঐকান্তিক প্রেম বা ভালোবাসাকে ভক্তি বলে ।
হিন্দুধর্মে বহু দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার বিভিন্ন পদ্ধতি অনুশীলিত হলেও মূলত এক পরমেশ্বরেরই উপাসনা করা হচ্ছে। কেননা, অবতার ও দেব-দেবীরা এক ঈশ্বরেরই বিভিন্ন প্রকাশ। ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। তিনি একাধিক নন। এই যে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, একে বলা হয় একেশ্বরবাদ।
হিন্দুধর্মের বিশ্বাসসমূহের মধ্যে মৌল বিশ্বাস হচ্ছে ঈশ্বরের বিশ্বাস। ঈশ্বরে বিশ্বাস বলতে বোঝায় ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র বিরাজিত, তিনি এক ও অভিন্ন অনন্য পরমসত্তা। তিনি নিরাকার তবে প্রয়োজনে সাকার রূপ ধারণ করতে পারেন।
'একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি'- অর্থাৎ সবস্তু এক, বিপ্রগণ তাকে বহুপ্রকার বলে বর্ণনা করেছেন। ব্রহ্ম থেকে পৃথক কিছুই নেই। ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। অবতার ও দেব-দেবীগণ এক পরমেশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন গুণ ও শক্তির প্রকাশ মাত্র। তিনিই জগতের নিধান, আধার ও আশ্রয়।
হিন্দুধর্মাবলম্বীরা বহু ঈশ্বরবাদী নয়, একেশ্বরবাদী। হিন্দুধর্মানুষ্ঠান ও ধর্মাচার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সেখানে যেমন এক ঈশ্বরের ধারণা তেমনি বহু অবতার ও দেব-দেবীর উপাসনা। এই অবতার ও দেব-দেবীগণ ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন গুণ বা শক্তির অধিকারী। কিন্তু ব্রহ্ম বা ঈশ্বর সেই একজনই। এটি একেশ্বরবাদের ধারণা।
অবতার-এর অর্থ হচ্ছে উপর থেকে নিচে নামা বা অবতরণ করা। মনুষ্য সমাজে যখন ধর্মে বিনাশ ঘটে, অধর্ম বেড়ে যায় এবং দুষ্কৃতকারীদের অত্যাচার-অনাচার সমাজজীবনকে কলুষিত করে তোলে তখন ভগবান স্বয়ং জীব মূর্তি ধারণ করে পৃথিবীতে নেমে আসেন। একেই অবতার বলা হয়।
অবতার তিন পর্যায়ের হয়ে থাকে। যথা- গুণাবতার, লীলাবতার ও আবেশাবতার। পরমেশ্বর ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বররূপে সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ করেন। এরা গুণাবতার। মৎস্য, কুর্ম, বরাহ প্রভৃতি স্থূল দেহধারী জীবের মূর্তিতে যে লীলা তা লীলাবতার। এবং শ্রীচৈতন্য; রামকৃষ্ণ প্রভৃতি ভগবানের জ্ঞানাদি শক্তির দ্বারা আবিষ্ট। তারা আবেশাবতার।
হিন্দুধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অবতারবাদে বিশ্বাস। মনুষ্য সমাজে মাঝে মাঝে ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা দেখা দেয় এবং ধার্মিকদের জীবনে নেমে আসে নিপীড়ন-নির্যাতন। তখন ভগবান স্বয়ং জীবের ন্যায় পৃথিবীতে নেমে আসেন। যাকে অবতার বলা হচ্ছে। আর অবতার সম্পর্কে যে দার্শনিক চিন্তাভাবনা, তা অবতারবাদ নামে পরিচিত।
শ্রীমদ্ভগবত পুরাণে বলা হয়েছে, অবতার অসংখ্য। তবে ভগবান বিষ্ণুর দশ অবতার সর্বাধিক পরিচিত।
তাঁরা যথাক্রমে-১. মৎস্য, ২. কূর্ম, ৩. বরাহ, ৪. নৃসিংহ, ৫. বামন, ৬. পরশুরাম, ৭. রাম, ৮. বলরাম, ৯. বুদ্ধ ও ১০. কল্কি।
'কৃষ্ণচ্ছু ভগবান দ্বয়ম্'- অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। দশ অবতারের মধ্যে তিনি অন্তর্ভুক্ত নন। ঈশ্বরের সমস্ত গুণ তাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিদ্যমান। তাই শ্রীকৃষ্ণকে ভগবানের পূর্ণাবতার বলা হয়। দশ অবতারের মধ্য দিয়ে তাঁরই শক্তি প্রকাশিত হয়েছে। তাই তাকে মহা-অবতারও বলা হয়।
ঈশ্বরের পূর্ণস্বরূপ ধারণার অতীত। তবে অবতার পুরুষের মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের স্বরূপ সম্পর্কে জানতে পারে। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বত্র বিরাজিত। অবতাররূপে দেহ ধারণ করে অসীম অনন্ত সসীমরূপ ধারণ করেন। তাই হিন্দুদের নিকট অবতার স্বয়ং ভগবানেরই এক মুক্ত প্রকাশ।
স্বাভাবিকভাবে মানুষের জীবনকাল ১০০ বছর ধরা হয়। এই শত বর্ষের জীবনকে চারটি স্তরে বা আশ্রমে বিভক্ত করা হয়। জীবনের এ চারটি স্তরকে চতুরাশ্রম বলে। প্রতিটি স্তরের সময়সীমা ২৫ বছর। প্রথম ২৫ বছরকে ব্রহ্মচর্য, দ্বিতীয় ২৫ বছরকে গার্হস্থ্য, তৃতীয় ২৫ বছরকে বানপ্রস্থ এবং শেষ ২৫ বছরকে সন্ন্যাস বলা হয়।
হিন্দুধর্মে দুটি দিক প্রত্যক্ষ করা যায়: ব্যবহারিক ও পারমার্থিক। ব্যবহারিক জীবনের কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক বা পারমার্থিক উন্নয়নের লক্ষ্য থাকে। এ কারণে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা ঈশ্বর ও তাঁর বিভিন্ন শক্তি দেব-দেবীর উপাসনা করে থাকে। মানবজীবনকে সার্থক ও বিকশিত করে তোলার চেষ্টা করে।
স্বাভাবিকভাবে মানুষের জীবিত থাকার সময়কে একশত বছর ধরে জীবনকে ৪টি স্তরে বা আশ্রমে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি বিভাগের গড় সময়সীমা পঁচিশ বছর। প্রথম পঁচিশ বছরকে বলা হয় ব্রহ্মচর্য আশ্রম। দ্বিতীয় পঁচিশ বছর গার্হস্থ্য আশ্রম। তৃতীয় পঁচিশ বানপ্রস্থ এবং শেষ পঁচিশ বছরকে সন্ন্যাস আশ্রম বলা হয়।
প্রতিটি আশ্রমেই সুনির্দিষ্ট কর্তব্য কর্ম রয়েছে। মানুষের পাঁচ বছর বয়স হলে গুরুগৃহে গিয়ে ব্রহ্মচর্য জীবন শুরু করতে হয়। গুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ এবং গুরুর তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করতে হয়। গুরুর নির্দেশে বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন, আত্মসংযম, পরিশ্রমের জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হয়। এটিই ব্রহ্মচর্য আশ্রম।
ব্রহ্মচর্য শেষে বিবাহ করে সংসারধর্ম পালন করাকে গার্হস্থ্য আশ্রম বলা হয়। বিবাহের মাধ্যমে সন্তান-সন্ততি লাভ এবং তাদের ভরণপোষণ পারিবারিক জীবনে প্রতিদিন পাঁচটি যজ্ঞকর্মের অনুশীলন করতে হয় এ আশ্রমে। এই পাঁচটি যজ্ঞ হচ্ছে- পিতৃযজ্ঞ, দৈবযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, নৃযজ্ঞ ও ঋসিযজ্ঞ।
মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রকৃতির দান গ্রহণ করতে হয়। এই দানের কর্তা হলেন স্বয়ং ভগবান। প্রকৃতির মধ্য দিয়ে ভগবানের মহত্ত্ব প্রকাশিত। তাই প্রকৃতিপ্রদত্ত বস্তুকে ভোগ করার সময় মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে ভগবানকে তার ভোগ্যবস্তু নিবেদন করে থাকে। আর এ কর্মটিকেই বলা হচ্ছে দৈবযজ্ঞ।
মানুষ জন্মগ্রহণ করে পিতা-মাতার মাধ্যমে এবং পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে ও সেবাশুশ্রুষায় বড় হতে থাকে। এজন্য মা-বাবার প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা, সেবাযত্ন সন্তানের প্রধান কর্তব্য। আর এ কর্তব্যগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে একজন সন্তান পিতৃযজ্ঞ সম্পন্ন করে থাকে। এই যজ্ঞ 1. পালন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, মা-বাবার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। জীবনের প্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্য ও সেবাই সমাজের নিকট গ্রহণ করে দৈনন্দিন চাহিদা- খাদ্য, বস্তু, চিকিৎসা প্রভৃতি। তাই সামাজিক চাহিদার কারণে মানুষ মঠ, মন্দির ও উপাসনালয়, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয় স্থাপন করে সেবাধর্ম অনুশীলন করে এবং সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব কর্ম সম্পাদন করে।
সন্ন্যাস শব্দের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ। আশ্রম জীবনের চতুর্থ পর্যায়ে আসে সন্ন্যাস। এই আশ্রমে সন্ন্যাসী একাকী জীবনধারণ করেন। এ সময় তার স্ত্রীও সাথে থাকবেন না। মাত্র একবেলা আহার ও দুবেলা ফল বা দুধ খাবেন। সন্ন্যাসী জাগতিক সকল কর্ম পরিত্যাগ করে কেবল ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকবেন।
মানুষের জীবনের তৃতীয় পর্যায় হচ্ছে বানপ্রস্থ। সেখানে মানুষ সংসারের দায়-দায়িত্ব সন্তানের উপর ন্যস্ত করে নির্জন পরিবেশে অবসর জীবনযাপন করে। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকতে পারেন, তবে সংযম, ত্যাগ, নির্লোভ আচরণের বিধান থাকে। বনে যাওয়ার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সেবা-পূজার মাধ্যমে বৈরাগ্যময় জীবনযাপন করতে পারে।
সন্ন্যাস শব্দের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ। সন্ন্যাস আশ্রমে এসে সন্ন্যাসী একাকী জীবনধারণ করেন। তিনি জাগতিক সকল কর্ম পরিত্যাগ করবেন। অতীত জীবনের স্মৃতি পরিহার করে এবং মনে এক 'ধ্যান ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকবেন। সন্ন্যাস গ্রহণ করলেই মানুষ নারায়ণ বা দেবতা হয়ে যায়। আশ্রম জীবনের চতুর্থ পর্যায় হল সন্ন্যাস।
সন্ন্যাস গ্রহণের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে কর্ম-ফলাসক্তি ও ভোগাসক্তি ত্যাগ। এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে-কর্মফলের বাসনা না করে যিনি কর্তব্যকর্ম করেন, তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী। শুধু গৃহাদি কর্ম বা শরীর ধারণের উপকরণ সংগ্রহে কর্মত্যাগই সন্ন্যাস নয়। তবে সর্বদাই ঈশ্বরের চিন্তা করা উচিত।
বর্তমান যুগ কলিযুগ। এখানে স্বল্পায়ু মানুষের চারটি আশ্রমের অনুশীলন সম্ভব নয়।
বর্তমানে ব্রহ্মচর্য ও বানপ্রস্থ নেই বললেই চলে। আবার গার্হস্থ্য জীবনে স্ত্রী, পুত্র, মাতা-পিতা এদের ত্যাগ করে বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস গ্রহণে উৎসাহিত করা হয় না। তাই কলিযুগে গার্হস্থ্য আশ্রমে থেকে জীবনযাপন করাই ভালো। এতেই জীবন সার্থক হয়।
যোগ শব্দটি সাধারণভাবে 'সংযোগ' অর্থই ব্যক্ত করে। একের সঙ্গে অপরের সংযোগকে যোগ বলা হয়। কিন্তু সাধনক্ষেত্রে এই যোগের অর্থ আরও গভীরে নিহিত। জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সংযোগই যোগসাধনা। যোগসাধনা মুক্তি লাভের একটি বিশেষ উপায়। মুক্তিলাভ হলে আর ফিরে আসতে হয় না।
পতঞ্জলির যোগদর্শনে বলা হয়েছে- 'যোগঃ চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ'। অর্থাৎ চিত্তবৃত্তির নিরোধকে যোগ বলা হয়। যোগসাধনা মুক্তি লাভের এক বিশেষ উপায়। আর মোক্ষ লাভের জন্য প্রথমে প্রয়োজন আত্মোপলব্ধির। আর আত্মোপলব্ধির জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ, স্থির ও প্রশান্ত মন যা যোগের মাধ্যমে সম্ভব হয়।
যম শব্দটি মূলত সংযম অর্থ প্রকাশক। মুক্তিলাভের জন্য সাধক দৈনন্দিন জীবনের আচার-আচরণে সংযমী হবেন। তাকে অহিংসা, সত্য, অস্তেয় ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ -এ পাঁচটি বিষয়ের অনুশীলন করতে হবে। এই পাঁচটিকে বলা হয় যম। অষ্টাঙ্গযোগের প্রথম ধাপ হচ্ছে 'যম'।
দেহ ও মনকে সুস্থ ও স্থির রাখার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেহভঙ্গি বা দেহাবস্থানকে বলে আসন। যোগসাধনায় আসন অনুশীলন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই আসন অনুশীলনের মাধ্যমে যোগীপুরুষ নিজ দেহ ও মনকে ঈশ্বর চিন্তায় নিবিষ্ট করার যোগ্যতা অর্জন করে। আসন বিভিন্ন প্রকারের যেমন- পদ্মাসন, গোমুখাসন প্রভৃতি।
শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতিকে নিয়ন্ত্রণ এবং নিজ আয়ত্তে আনাই প্রাণায়াম। প্রাণায়াম তিন প্রকার- রেচক, পূরক ও কুম্ভক। শ্বাস ত্যাগ করে সেটি বাইরে স্থির রাখার নাম রেচক। শ্বাস গ্রহণের নাম পূরক এবং নিয়মিত গতিরোধ করে শ্বাস ভেতরে রাখার নাম কুম্ভক। অভিজ্ঞ গুরুর নিকট প্রাণায়াম অভ্যস্ত করতে হয়।
শৌচ দুই প্রকারের হয়- বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ। স্নানাদির মাধ্যমে দেহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে বাহ্যিক শৌচ লাভ হয়। আবার সৎ চিন্তা, মৈত্রী, দয়া, শুদ্ধবৃদ্ধি প্রভৃতির দ্বারা অভ্যন্তরীণ শৌচ লাভহয়ে থাকে। সর্বঅবস্থাতেই শুচিতা গুরুত্বপূর্ণ।
দেহের ইন্দ্রিয়গুলোকে নিজ নিজ বিষয় হতে মুক্ত করে চিত্তের অনুগামী করার নাম প্রত্যাহার। ইন্দ্রিয়গুলোকে নিজ নিজ বিষয় হতে মুক্ত করা কষ্টসাধ্য বটে কিন্তু অসাধ্য নয়। দৃঢ় সংকল্প ও অভ্যাসের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলোকে অর্ন্তমুখী করা যায়। ইন্দ্রিয়গুলো অন্তর্মুখী হলে চিত্তে বিষয়-আসক্তি নষ্ট হয়। এমতাবস্থায় চিত্ত আরাধ্য বস্তুতে নিবিষ্ট হতে পারে।
দেহের ইন্দ্রিয়গুলোকে নিজ নিজ বিষয় হতে মুক্ত করে চিত্তের অনুগামী করার নাম প্রত্যাহার। দৃঢ়সংকল্প ও অভ্যাসের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলোকে অন্তর্মুখী করা যায়। তখন চিত্তের বিষয় আসক্তি নষ্ট হয় এবং চিত্ত আরাধ্য বস্তুতে নিবিষ্ঠ হতে পারে। এ কারণেই যোগসাধনায় প্রত্যাহার গুরুত্বপূর্ণ।
ধারণা' ও ধ্যান দুটি গভীর সম্পর্কযুক্ত। ধারণার দ্বারা মনকে লক্ষ্যবস্তুতে স্থির রাখা যায়। আর ধারণার সে স্থির অবস্থটি ধ্যানে আরও নিবিড় হয়। যে বিষয়ে মনকে স্থির রাখা হয়েছে সে বিষয়ে অবিচ্ছিন্ন ভাবনাকে ধ্যান বলে। তাই ধ্যান ও ধারণা দুটোই গভীর সম্পর্কযুক্ত।
যোগসাধনার সর্বোচ্চ স্তর হলো সমাধি। সমাধিতে যোগীর চিত্ত আরাধ্য বস্তুতে সম্পূর্ণভাবে লীন হয়ে যায়। সে সময় যোগীর চিত্ত স্পির নিষ্ক্রিয় অবস্থায় উন্নীত হয়। এই অবস্থায় ধ্যানীয় নিজস্ব কোনো অনুভূতি থাকে না, আরাধ্য বস্তুর সাথে একীভূত হয়। এটিই সমাধির চরম অবস্থা।
অষ্টাঙ্গযোগের স্তরগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়-বহিরাঙ্গ সাধন ও অন্তরাণ সাধন। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহার এই পাঁচটি যোগের বহিরাঙ্গ সাধন। ধারণা, ধ্যান ও সমাধিকে বলা হয় অন্তরাঙ্গ সাধন। যোগসাধনার মাধ্যমে যোগী মুক্তি লাভ করেন।
মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ঈশ্বর লাভ। ঋষিগণ এজন্য তিনটি সাধন পথের নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ। এই তিনটি সাধন পদ্ধতির যে কোনো একটি নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করলে সাধক তার গন্তব্যে পৌছাতে পারেন। অর্থাৎ সাধক সিদ্ধিলাভ করেন।
কর্ম দুই প্রকার যথা- সকাম কর্ম ও নিষ্কাম কর্ম। যখন বিশেষ কোনো ফলের আশায় কর্ম করা হয় তখন তাকে সকাম কর্ম বলে। অর্থাৎ কামনা-বাসনা, কর্মকর্তার কর্তৃত্বাভিমান এবং ফলাকাঙ্ক্ষাযুক্ত কর্মই সকাম কর্ম। আর কর্তা যখন কোনো রকম ফলের আশা না নিয়ে কর্ম করে এবং কোনো রকম কর্তাভিমান থাকে না তখন সেই কর্মকে নিষ্কাম কর্ম বলে।
ফলের আশা ত্যাগ করে যে কর্ম করা হয় তাকে নিষ্কাম কর্ম বলে। আমাদের সমগ্র জীবনই কর্মময়। জীবনধারণের জন্য কর্ম করতে হয়। এ কর্ম দুরকম- সকাম ও নিষ্কাম কর্ম। ফল লাভের আশায় যে কর্ম সেটা সকাম কর্ম আর ফল লাভের আশা ত্যাগ করে যে কর্ম করা হয় সেটা নিষ্কাম কর্ম। নিষ্কাম কর্ম করলে ঈশ্বর লাভ বা মোক্ষপ্রাপ্তি সম্ভব ।
বিশেষ কোনো ফলের আশায় যখন কর্ম করা হয় তখন তাকে বলে সকাম কর্ম। অর্থাৎ কামনা-বাসনাযুক্ত কর্মই হচ্ছে সকাম কর্ম। এ কর্মে কর্মকর্তার কর্তৃত্বাভিমান থাকে, ফলাকাঙ্ক্ষা থাকে। এমন বোধ হয় যে, কর্ম আমি করেছি; ফল ভোগের অধিকারও আমার। সকাম কমে বন্ধন হয়। এজন্য আমাদের সকলের সকাম কর্ম পরিহার করতে হবে।
নিষ্কাম কর্মে কর্তা কোনো ফলের আশা রাখে না। এখানে কর্মকর্তার কোনো কর্তাভিমান থাকে না। নিষ্কাম কর্মের ফল কর্মকর্তাকে স্পর্শ করতে পারে না। অন্যদিকে, সকাম কর্ম এর সম্পূর্ণ বিপরীত। নিষ্কাম কর্মে মোক্ষলাভ হয় কিন্তু সকাম কর্মে বন্ধন হয়। নিষ্কাম কর্মই যোগসাধনার ক্ষেত্রে কর্মযোগ। কর্মকে যোগে অর্থাৎ ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত করলে অভীষ্ট মোক্ষলাভ সম্ভব।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লেখ করা হয়েছে, 'ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি'। এর অর্থ হলো- পুণ্য ক্ষয় হলে মানুষ পুনরায় মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করে। সকামকর্মের বা পুণ্যকর্মের সর্বোচ্চ ফলপ্রাপ্তি হিসেবে স্বর্গ লাভের কথা জানা যায়। কিন্তু সেটিও ক্ষণস্থায়ী। পুণ্যফল ভোগের শেষে স্বর্গ থেকে চলে এসে পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয়।
উপনিষদের ঋষিগণ কর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণের উপদেশ দেন। তাঁদের বক্তব্য- কর্ম করলেই কর্মফল উৎপন্ন হবে। ঐ কর্মফল ভোগের জন্য কর্মকর্তাকে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হতে হয়। এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সন্ন্যাস গ্রহণ আবশ্যক। কারণ মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো মোক্ষলাভ। সেজন্য সন্ন্যাসবাদীদের মতে, মোক্ষলাভের জন্য সন্ন্যাস গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
মানবজীবনের পরম পুরুষার্থ হচ্ছে মোক্ষলাভ। ঋষিগণ এ মোক্ষলাভের উপায় হিসেবে তিনটি সাধন পথের নির্দেশ দিয়েছেন। কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের যেকোনো একটি নিষ্ঠার সাথে অনুশীলন করে একজন সাধক পরম পুরুষার্থ বা মোক্ষলাভ করতে পারে।
কর্মই জীবন। তবে এই আবশ্যিক কর্মের মাধ্যমে মানুষ মুক্তি লাভ। করতে পারে না। কর্মকে যোগে বা নিষ্কাম কর্মে পরিণত করতে হবে। মনে! করতে হবে বিশ্বজগৎ ঈশ্বরের এক বিরাট কর্মক্ষেত্র। আর এই কর্ম করার জন্য ঈশ্বর জীবদের নিয়োগ করেছেন। তবে ফলের আশায় নয়, ঈশ্বরের নিয়োজিত ব্যক্তি হিসেবে কর্ম করা। ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জিত এই কর্মই হচ্ছে কর্মযোগ।
কর্মযোগ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শ্লোকটি সরলার্থসহ নিম্নরূপ-
'কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদচান।
মা কর্মফলহেতুর্ভূমা তে সঙ্গোহত্ত্বকর্মাণি।" (২/৪৭)
সরলার্থ: কর্মে তব অধিকার, ফলে কভু নয়। ফলাসক্তি ত্যাগ কর, কর্ম ত্যাজ্য নয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় কর্মযোগের নির্দেশসমূহ হলো-
১. কর্মকর্তাকে কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করতে হবে। আমি কর্ম করছি, এরূপ অনুভূতি বা অভিমান থাকবে না।
২. প্রত্যেকর্কে নিজ নিজ কর্ম অবশ্যই নিষ্পন্ন করতে হবে।
৩. ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করতে হবে।
৪. তখন ভগবানের প্রতি ভক্তির উদয় হয় এবং এভাবে কর্ম করার ফলে ভগবানের অনুগ্রহের মানুষের মুক্তি লাভ হয়।
মোক্ষলাভের অন্যতম উপায় হচ্ছে জ্ঞানযোগ। শাস্ত্রে আত্মতত্ত্ব ও পরমার্থতত্ত্ব জানাকে জ্ঞান বলা হয়েছে। জ্ঞানের অনুশীলন দ্বারা পরম সত্তায় উপনীত হওয়ার পদ্ধতি জ্ঞানযোগ। তাই জ্ঞানের পথে স্রষ্টাকে জানার যে সাধনা তাকে বলে জ্ঞানযোগ। জ্ঞানযোগের অনুশীলনকারীকে জ্ঞানযোগী বলা হয়।
জ্ঞানী জগৎ ও জীবের প্রকৃতি ও পরিণতি জেনে সৃষ্টির ঊর্ধ্বে স্রষ্টাকে অন্তরে অনুভব করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর নিজের মধ্যে এবং বিশ্বের সকল প্রাণীর মধ্যে একই চেতনা অবস্থান করছে। জগতের সবকিছু সেই পরম চৈতন্যের দ্বারা চৈতন্যময়। এই চৈতন্য আত্মা বা জীবাত্মা। জ্ঞানীর দৃষ্টিতে ও অনুভবে পরমাত্মার অবস্থান ধরা পড়ে বিশ্ব চরাচরের মধ্যে।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে পরমতত্ত্ব ধরা পড়ে না। কারণ, ঈশ্বরের মায়া শক্তি দ্বারা জীব আচ্ছন্ন থাকে। তার নিকট আত্মতত্ত্ব বা পরমতত্ত্ব প্রকাশিত হয় না। তবে ঈশ্বর অনুগ্রহে যখন মায়ার প্রভাব এ কেটে যায় তখন জীব আত্মতত্ত্বজ্ঞ এবং ব্রহ্মজ্ঞ হতে পারে।
ঈশ্বর-অনুগ্রহে যখন মায়ার প্রভাব কেটে যায় তখন জীব আত্মতত্ত্বন্দ হতে পারে। তখন তার সর্বত্র সমবুদ্ধি জন্মে, বাসনা শুদ্ধ হয়, সুন্দর হয় তার আচরণ। তখন সাধকের অহংকার থাকে না. হিংসা থাকে না। গুরু-সেবা, দেহ-মনে পবিত্র থাকা, জ্ঞানের বিষয়ে জানার আগ্রহ- এ সকল গুণ তাঁর মধ্যে প্রকাশ পায়।
ভক্তমাত্রই ঈশ্বরের প্রিয় পাত্র হলেও গীতায় জ্ঞানী ভক্তই ভগবানের বেশি প্রিয়। পরমতত্ত্ববিষয়ক জ্ঞান অর্জনের জন্য শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নির্দেশ হচ্ছে- তত্ত্বদর্শী গুরুর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রণাম বন্দনা করতে হবে, তারপর সেবা কর্ম দ্বারা তাঁকে তুষ্ট করতে হবে এবং বিনীতভাবে তাঁকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে। সেবাকর্মে তুষ্ট আত্মতত্ত্বজ্ঞ গুরু তখন জ্ঞানপ্রার্থীকে উপদেশ প্রদান করেন।
জ্ঞানযোগ সম্পর্কিত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শ্লোকটি সরলার্থসহ নিম্নরূপ-
শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।
জ্ঞানং লম্বা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি। (৪/৩৯)
সরলার্থ: যিনি শ্রদ্ধাবান, একনিষ্ঠ সাধন তৎপর এবং জিতেন্দ্রিয়, তিনি জ্ঞান লাভ করেন। আত্মজ্ঞান লাভ করে শীঘ্রই তিনি পরম শান্তি লাভ করেন।
জ্ঞানযোগের ফলাফল নিম্নরূপ-
১. জ্ঞান পরম পবিত্র। সকল অপবিত্রতাকে দূর করে দেওয়ার ক্ষমতা জ্ঞানের রয়েছে।
২. জ্ঞানীর পাপ বিনষ্ট হয়। জ্ঞানের উদয়ে অজ্ঞানতা থাকতে পারে না।
৩. জ্ঞানের কর্মবন্ধন থাকে না। তাই জ্ঞানী পরম সুখে অবস্থান করেন।
জ্ঞান লাভের বিশেষ করে পরমতত্ত্ব বিষয়ক জ্ঞানের জন্য আমরা সবাই যত্নশীল হব।
ভক্তিকে অবলম্বন করে যে ঈশ্বর আরাধনা তাকে ভক্তিযোগ বলে। ভক্তিকে অবলম্বন করে ভগবানের সঙ্গে যোগসূত্র রচনা করাই ভক্তিযোগ। ভক্তির অশেষ শক্তি, ভক্তিতেই মুক্তি। ভক্তি মানব হৃদয়ের একটি সুকুমার বৃত্তি। আর নারদীয় সূত্রানুযায়ী ভক্তি হলো ভগবানে ঐকান্তিক প্রেম বা ভালোবাসা। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের নাম ভক্তিযোগ।
ভক্তি মানব হৃদয়ের একটি সুকুমার বৃত্তি। নারদীয় সূত্রে বলা হয়েছে ভগবানে ঐকান্তিক প্রেম বা ভালোবাসাকে ভক্তি বলে। শাণ্ডিল্য, সূত্রে বলা হয়েছে, ভগবানের পদে যে একান্ত রতি, তারই নাম ভক্তি। ভক্তির অশেষ শক্তি, ভক্তিতেই মুক্তি। ভক্তির দ্বারাই কেবল ভগবানকে জানা যায় এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করা যায়।
ঈশ্বরকে যাঁরা সাকারে, গুণময়রূপে আরাধনা করেন তাঁরাই মূলত ভক্তি পথের সাধক। ভক্তিকে অবলম্বন করে যিনি সাধনা করেন তিনিই ভক্ত। ভক্ত সম্বন্দ্বে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যে ব্যক্তি আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ ত্যাগ করে তাঁর শরণাপন্ন হন, সৈ ব্যক্তি ভগবদ্ভাব লাভ করেন। ভক্তের পাপ-তাপ, দুঃখবেদনা থাকে না।
ভক্তিকে অবলম্বন করে ভগবানের আরাধনাই হলো ভক্তিযোগ। ভক্তির মাধ্যমে ভক্ত ভগবানের অনুগ্রহ পেয়ে থাকেন। ভগবানের শ্রীচরণে আত্মসমর্পণই ভক্তিযোগের মূলকথা। ভক্তির মূলে থাকবে গভীর বিশ্বাস-ঈশ্বর বা ভগবান সর্বশক্তিমান, তিনি করুণাময়, তিনি ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু।
ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়-এ বিশ্বাসকেই বলা হয় একেশ্বরবাদ।
'একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি'- ঋগ্বেদে বলা হয়েছে।
হিন্দুধর্মের মূলে আছেন ঈশ্বর।
ঈশ্বরের কোনো গুণ বা শক্তিকে ঈশ্বর যখন আকার দেন, তখন তাকে দেবতা বা দেব-দেবী বলে।
বিভিন্ন অবতার, দেব-দেবী একই ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের সাকার রূপ।
বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে, ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।
ঋগ্বেদে ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু, উষা প্রভৃতি দেব-দেবীর স্তুতি রয়েছে।
ঋগ্বেদে ঈশ্বর সম্পর্কে উপলব্ধি হচ্ছে-
একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি'।
অর্থাৎ সবস্তু এক, বিপ্রগণ তাঁকে বহুপ্রকার বলে বর্ণনা করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতে একেশ্বর সম্পর্কে বলা হয়েছে- 'প্রভাব:প্রলয়: স্থানং নিধানং বীজমব্যয়ম্'। অর্থাৎ তাঁর থেকে জগতের উৎপত্তি, তাঁর দ্বারা স্থিতি এবং তাঁতেই হচ্ছে লয়। তিনিই জগতের নিধান-আধার ও আশ্রয়।
কঠোপনিষদে ঈশ্বর সম্পর্কে উপলব্ধি হলো 'নেহ নানাস্তি কিঞ্চন' অর্থাৎ ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়।
কবি জয়দেব রচিত কৃষ্ণপ্রস্তুতিমূলক কাব্যগ্রন্থের নাম 'গীতগোবিন্দ'।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপর যুগে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
অবতার সম্পর্কে যে দার্শনিক চিন্তাভাবনা, তা অবতারবাদ নামে পরিচিত
ভগবান বিষ্ণু যখন বিভিন্ন রূপ ধরে পৃথিবীতে অবতরণ করেন, তখন তাকে অবতার বলে ।
অবতার তিন প্রকার/দশ প্রকার।
অবতার শব্দের অর্থ হচ্ছে উপর থেকে নিচে নামা বা অবতরণ করা।
বৈষ্ণব ধর্মে ভগবান হিসেবে পূজিত হন শ্রীকৃষ্ণ।
ভগবান বিষ্ণু মৎস্যরূপ ধারণ করে বেদ উদ্ধার করেন।
মহাঅবতারী হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
ভগবান পৃথিবীতে অবতাররূপে আগমন করেন।
সংস্কৃত অব-তৃ ধাতুর সঙ্গে ঘঞ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে অবতার শব্দটি এসেছে ।
পৌরাণিক যুগে অবতারবাদের সূচনা লক্ষ্য করা যায়।
পৃথিবীতে মৎস্য, কূর্ম, বরাহ প্রভৃতি স্থূল দেহধারী জীবের মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়ে যে কর্মকান্ড করেন তাকে লীলাবতার বলে।
পৃথিবী জলপ্লাবিত হলে কূর্মরূপে ভগবান পৃথিবীকে পৃষ্ঠে ধারণ করেন বলে তাঁকে কুর্মাবতার বলে।
দশ অবতারের মধ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্ভূক্ত নন।
ভগবানের অংশ অবতার হলেন দশ অবতার। অর্থাৎ মৎস, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রামচন্দ্র, বলরাম, বুদ্ধ এবং কল্কি ।
ভগবানের পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণ।
শাস্ত্রীয় যুগবিভাগ অনুসারে বর্তমানে কলিযুগ চলছে।
অতিথি সেবাকে বলা হয় নৃযজ্ঞ।
আশ্রম চার প্রকার।
মানুষের জীবনের প্রথম পঁচিশ বছরকে বলা হয় ব্রহ্মচর্য আশ্রম।
হিন্দুধর্মে জীবনকে সার্থক ও গৌরবময় করার জন্য ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস-এ চারটি স্তরই হচ্ছে চতুরাশ্রম।
শাস্ত্র অনুযায়ী যা থেকে অভ্যুদয় অর্থাৎ সাংসারিক উন্নতি ও নিঃশ্রেয়স্ অর্থাৎ নিশ্চিত মঙ্গল লাভ হয়, তার নাম ধর্ম।
মানুষের পাঁচ বছর বয়স হলেই তাকে গুরু গৃহে গমন করে - ব্রহ্মচর্য জীবন শুরু করতে হয় ।
গুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ এবং গুরুর তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করাকেই ব্রহ্মচর্যাশ্রম বলা হয়।
বিদ্যাশিক্ষা সমাপ্ত হলে গুরুর নির্দেশে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করে ব্রহ্মচারী গার্হস্থ্য জীবনে প্রবেশ করে।
প্রকৃতিদত্ত বস্তু ভোগ করার সময় মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে প্রকৃতি ভগবানকে তাঁর ভোগ্যবস্তু নিবেদন করার কর্মকে দৈবযজ্ঞ বলে।
ভূতযজ্ঞ হলো পাখিসহ অন্যান্য জীবজন্তুর আহার প্রদানসহ নানা প্রকার পরিচর্যা।
পদ্ধতিগতভাবে বেদসহ প্রয়োজনীয় গ্রন্থাদি পাঠের দ্বারা জ্ঞান ও নৈতিকতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে ঋষিযজ্ঞ বলে।
সামাজিক চাহিদার কারণে মানুষ মঠ, মন্দির উপাসনালয়, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয় ইত্যাদি স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেবাধর্ম অনুশীলন করে। এসব কর্মের মধ্য দিয়ে সমাজের প্রতি তার কর্তব্য সম্পাদন করাকে গার্হস্থ্য আশ্রমের কর্ম বলে।
আশ্রম জীবনের তৃতীয় পর্যায় হলো বানপ্রস্থ আশ্রম।
আশ্রম জীবনের চতুর্থ পর্যায় হলো সন্ন্যাস।
সন্ন্যাস শব্দের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ।
সন্ন্যাস গ্রহণ করলে মানুষ নারায়ণ বা দেবতা হয়ে যায়।
সন্ন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হল কর্মফলাসক্তি ও ভোগাসক্তি ত্যাগ।
যোগ দর্শনের প্রণেতা মহর্ষি পতঞ্জলি।
অদ্বিতীয় লক্ষ্যবস্তুতে মনকে ধারণ বা স্থাপিত করার নাম ধারণা।
দেহের ইন্দ্রিয়গুলোকে নিজ নিজ বিষয় হতে মুক্ত করে চিত্তের। অনুগামী করাকে প্রত্যাহার বলে।
যোগসাধনা হচ্ছে জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার সংযোগ।
যোগ শব্দটির অর্থ হচ্ছে সংযোগ।
শ্বাস ত্যাগ করে সেটি বাইরে স্থির রাখাকে রেচক বলে।
দেহ, মন ও বাক্যের দ্বারা কোনো জীবকে হত্যা না করা বা নির্যাতন না করাকে অহিংসা বলে ।
বিনা প্রয়োজনে কোনো দ্রব্য গ্রহণ করা যাবে না, একে অপরিগ্রহ বলে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতিকে নিয়ন্ত্রণ এবং নিজ আয়তে আনাকে প্রাণায়াম বলে।
হিন্দুধর্মশাস্ত্রে 'যোগ' শব্দের অর্থ 'মিলন'।
মুক্তিলাভের বিশেষ উপায় হচ্ছে যোগসাধনা।
কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ-এর যে কোনো একটির। সাধনপথ নিষ্ঠার সাথে অনুশীলন করলেই মানুষ মুক্তিলাভ করতে পারে।
'যোগ' শব্দটি সাধারণভাবে সংযোগ অর্থই ব্যক্ত করে। তবে একের সাথে অপরের সংযোগকে যোগ বলা হয়।
শাস্ত্রানুযায়ী যোগ হচ্ছে চিত্তবৃত্তির নিরোধ।
'যম' শব্দটি মূলত সংযম অর্থ প্রকাশক।
স্নানের মাধ্যমে দেহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে বাহ্যিক শৌচ লাভ হয়।
সৎ চিন্তা, মৈত্রী, দয়া প্রভৃতি ভাবনার দ্বারা অভ্যন্তরীণ শৌচ লাভ হয়।
স্বাভাবিকভাবে যা পাওয়া যায় তাতে সন্তুষ্ট থাকাই হল সন্তোষ।
শ্রদ্ধার সাথে শাস্ত্র নির্ধারিত ব্রত উদ্যাপন করাকে তপস্যা বলে।
স্বধর্মের ধর্মশাস্ত্র নিয়মিত অধ্যয়ন করাই হলো স্বাধ্যায়।
ঈশ্বরকে সর্বক্ষণ চিন্তা করার নাম ঈশ্বর প্রণিধান।
দেহ ও মনকে সুস্থ ও স্থির রাখার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেহভঙ্গি বা দেহাবস্থানকে আসন বলে।
নিয়মিত গতিরোধ করে শ্বাস ভিতরে দীর্ঘ সময় রুদ্ধ রাখার নাম কুম্ভক ।
যে বিষয়ে মনকে স্থির রাখা হয়েছে সে বিষয়ে অবিচ্ছিন্ন ভাবনাকে ধ্যান বলে।
যোগ সাধনার সর্বোচ্চ স্তর হলো সমাধি।
যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম এবং প্রত্যাহার এই পাঁচটিকে যোগ সাধনায় বহিরঙ্গ বলা হয়।
ধারণা, ধ্যান এবং সমাধি এই তিনটিকে যোগ সাধনায় অন্তরঙ্গ সাধন বলা হয়।
মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ঈশ্বর বা মোক্ষলাভ।
মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি মোক্ষলাভের জন্য যোগী যখন সকল কর্ম ও কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করেন এবং ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে সাধনা করেন তখন তাকে কর্মযোগ বলে।
যা কিছু করা হয়, তাকে কর্ম বলে। অর্থাৎ আমরা প্রতিনিয়ত জীবন ধারণের জন্য যে কাজ করি তাই কর্ম।
যখন বিশেষ কোনো ফলের আশায় কর্ম করা হয়, তখন তাকে সকাম কর্ম বলে।
যখন বিশেষ কোনো ফলের আশা না করে কর্ম করা হয়, তখন তাকে নিষ্কাম কর্ম বলে।
সকাম কর্মে বন্ধন হয়।
নিষ্কাম কর্মে মোক্ষলাভ হয়।
কর্মকে যোগে পরিণত করে তা অনুশীলন করলে অভীষ্ট মোক্ষলাভ সম্ভব হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লেখ আছে, 'ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশত্তি।' অর্থাৎ পুণ্য ক্ষয় হলে মানুষ পুনরায় মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কর্ম সম্পর্কে বলেছেন, 1 "কর্মে তব অধিকার, ফলে কভু নয়। ফলাসক্তি ত্যাগ কর, কর্ম ত্যাজ্য নয়।"
জ্ঞানের পথে স্রষ্টাকে জানার জন্য যে সাধনা করা হয়, তাকে জ্ঞানযোগ বলে।
মোক্ষলাভের অন্যতম উপায় হচ্ছে জ্ঞানযোগ ।
শাস্ত্রে আত্মতত্ত্ব ও পরমার্থতত্ত্ব জানাকে জ্ঞান বলে।
শাস্ত্র নিষিদ্ধ যে সকল কর্ম করা হয়, তাকে বিকর্ম বলে।
কোনো কাজ না করাকে অকর্ম বলে।
ভগবানে ঐকান্তিক প্রেম বা ভালোবাসাকে ভক্তি বলে।
ভক্তিকে অবলম্বন করে যে ঈশ্বর আরাধনা তাকে ভক্তিযোগ বলে।
দেব-দেবীর আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্ত ঈশ্বরের করুণা পায়।
নারদীয় ভক্তিসূত্রে, ভগবানে ঐকান্তিক প্রেম বা ভালবাসাকে ভক্তি বলে।
শান্ডিল্যসূত্রে ভক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ভগবপদে যে একান্ত রতি, তারই নাম ভক্তি।
ঈশ্বরকে যারা সাকারে গুণময়রূপে আরাধনা করেন, তারাই ভক্তিপথের সাধক।
ভক্তিকে অবলম্বন করে যিনি সাধনা করেন, তিনিই ভক্ত ।
যে ব্যক্তি আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ ত্যাগ করে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হয়, সে ব্যক্তি ভগবদ্ভাব লাভ করেন।
ভগবানে শরণাগত বা আত্মসমর্পণই ভক্তিযোগের সারকথা।
একেশ্বরবাদ হলো ঈশ্বর সম্পর্কীয় এক ধরনের মতবাদ। বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। দেব-দেবীগণ মূলত এক ঈশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন গুণ বা শক্তির প্রকাশ মাত্র। হিন্দুধর্মে এই এক ঈশ্বরে বিশ্বাসই একেশ্বরবাদ বলে পরিচিত।
বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে, "ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।" ঋগ্বেদে ঋষিদের উপলব্ধি হলো, "একং সদৃ"। অর্থাৎ সবস্তু এক। কঠোপনিষদে দেখা যায় 'নেহ নানাস্তি কিঞ্চন"। অর্থাৎ ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়। তাই ব্রহ্ম বা ঈশ্বর একাধিক নন। এই যে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, তাই একেশ্বরবাদ।
ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ' বলতে বোঝায় ধর্মকে যিনি রক্ষা করেন, ধর্মই তাকে রক্ষা করেন।
ধর্মীয় নিয়মকানুন মেনে যারা চলেন তারা ধার্মিক মানুষ। ধার্মিক ব্যক্তি সকলেরই পুজনীয় ও শ্রদ্ধেয়। যখন তারা কোনো সমস্যায় পড়েন তখন ধর্মই তাদের এগিয়ে এসে রক্ষা করেন।
শাস্ত্র অনুযায়ী মানুষের জীবনের চারটি স্তর বা আশ্রমের মধ্যে প্রথম আশ্রমটি হলো ব্রহ্মচর্যাশ্রম। প্রতিটি মানুষের পাঁচ বছর বয়স হলেই গুরুগৃহে ব্রহ্মচর্য জীবন শুরু করতে হয়। গুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণ এবং তার তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করতে হয়। এটিই ব্রহ্মচর্যাশ্রম। এ আশ্রমেই গুরুর নির্দেশে শিষ্য বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করে এবং গুরুর কাছ থেকে আত্মসংযমী, পরিশ্রমী ও কঠোর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার শিক্ষালাভ করে।
'ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শেষ করতে হয়। মানুষের পাঁচ বছর বয়স হলেই তাকে গুরুগৃহে গমন করে শিক্ষাজীবন শুরু করতে হয়। এ সময় গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ, তার তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করতে হয় এবং শিষ্যকে গুরুর নির্দেশ, আত্মসংযম, শাস্ত্র অধ্যয়ন করা থেকে শুরু করে বিবিধ কঠোর জীবনযাপন করতে হয়।
লেখাপড়া শেখানো হয় ব্রহ্মচর্যাশ্রমে। প্রতিটি আশ্রমেই সুনির্দিষ্ট কর্তব্যকর্ম রয়েছে। মানুষের পাঁচ বছর বয়স হলেই তাকে গুরুগৃহে গমন করে ব্রহ্মচর্য জীবন শুরু করতে হয়। গুরুর নিকট। দীক্ষাগ্রহণ, গুরুর তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করতে হয়। এটিই ব্রহ্মচর্যাশ্রম। এ আশ্রমে থেকে শিষ্যকে গুরুর নির্দেশে বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন, আত্মসংযম, পরিশ্রম ও কঠোর জীবনযাপনে অভ্যন্ত হতে হয়।
বানপ্রস্থ আশ্রমে মানুষ সংসারের সব দায়-দায়িত্ব সন্তানের ওপর ন্যস্ত করে নির্জন পরিবেশে অবসর জীবনযাপন করে। এখানে সংসার জীবনের সঙ্গী স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারেন তবে তাঁদের জীবন চর্চায় সংযম, ত্যাগ, নিলোর্ড আচরণের বিধান থাকে। তাছাড়া ডজন, পূজন, কীর্তন, জপ, ধ্যান প্রভৃতি ধর্মীয় কর্মে মগ্ন থেকেও বানপ্রস্থের জীবন স্তর কাটানো যায়।
দেহ ও মনকে সুস্থ ও স্থির রাখার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেহভঙ্গি বা দেহাবস্থানকে বলে আসন। যোগ সাধনায় আসন অনুশীলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আসন বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- পদ্মাসন, সুখাসন, হলাসন, গোমুখাসন ইত্যাদি। এ আসন অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যোগীপুরুষ নিজ দেহ ও মনকে ঈশ্বর চিন্তায় নিবিষ্ট করার যোগ্যতা অর্জন করে।
প্রাণায়াম পদ্ধতিতে শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতি নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রাণায়াম তিন প্রকার। যেমন- রেচক, পূরক এবং কুম্ভক। প্রাণায়াম যোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রাণায়ামে যেমন সুফল পাওয়া যায় তেমনি খ্যাতির সম্ভাবনা থাকে। তাই অভিজ্ঞ গুরুর নিকট প্রাণায়াম শিক্ষা নিতে হয়।
ব্রহ্মচর্য শব্দের আভিধানিক অর্থ বেদাদি শাস্ত্রানুশীলন এবং পবিত্র সংযত জীবনযাপন। জীবনে ব্রহ্মচর্য প্রতিষ্ঠা করলে দেহে শক্তি ও মনে সাহস পাওয়া যায়, বুদ্ধি বিকশিত হয়। ব্রহ্মচর্যে যোগীর জীবনে জ্ঞানের আলো জ্বলে ওঠে। তখন তাঁর ঈশ্বর দর্শন সহজ হয়। ব্রহ্মচর্য রক্ষার মাধ্যমে সহজেই ভক্তি, কর্ম ও জ্ঞানযোগের সমন্বয় করা যায় বলে মোক্ষলাভের পথ সহজ হয়।
যোগ সাধনার সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে সমাধি। সমাধিতে এসে যোগীর ধ্যানলব্ধ চিত্তে স্থিরতা আরো গভীর হয়। সমাধিতে যোগীর চিত্ত আরাধ্য বস্তুতে সম্পূর্ণভাবে লীন হয়ে যায়। সে সময় যোগীর চিত্তটি স্থির নিষ্ক্রিয় অবস্থায় উন্নীত হয়। তখন ধ্যান-কর্তা, ধ্যানের বিষয় এবং ধ্যান প্রক্রিয়া- এ তিনটি মিশ্রিত হয়ে একাকার হয়ে যায়। এই একাকার অবস্থায় ধ্যানীর নিজস্ব কোনো অনুভূতি থাকে না; আরাধ্য বস্তুর সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। এটিই সমাধির চরম অবস্থা।
যোগসাধনায় সর্বোচ্চ স্তর হল সমাধি। সমাধিতে এসে যোগীর ধ্যানলব্ধ চিত্তে স্থিরতা গভীর হয়। সমাধিতে যোগীর চিত্ত আরাধ্য বস্তুতে সম্পূর্ণভাবে একাকার হয়ে যায়। এই একাকার অবস্থায় ধ্যানীর নিজস্ব কোনো অনুভূতি থাকে না। এটাই সমাধির চরম অবস্থা এবং যোগীর পরম প্রাপ্তি।
যা কিছু করা হয় তাকেই কর্ম বলে। আমরা প্রতিনিয়ত জীবন ধারণের জন্য যে কাজ করি তার সকলই কর্ম। দেহধারী জীবের পক্ষে সম্পূর্ণরূপে কর্মকে ত্যাগ করা সম্ভব নয়। যারা মুক্তিলাভের প্রত্যাশায় জাগতিক কর্মকাণ্ড ত্যাগ করেন, তারাও কিন্তু আধ্যাত্মিক কর্ম অনুশীলন করতে থাকেন। দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে স্বয়ং বলেছেন যে, মোক্ষলাভের জন্য কর্মত্যাগের প্রয়োজন নেই। তবে অবশ্যই কর্ম নিষ্কামভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
"ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি"- বাক্যটির অর্থ হলো পুণ্য ক্ষয় হলে মানুষ পুনরায় মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করে। এ অবস্থায় মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ মোক্ষলাভ সম্ভব হয় না। তাই উপনিষদের ঋষিগণ কর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণের উপদেশ দেন।
কামনা-বাসনা মুক্ত কর্মের ফল কর্মকর্তাকে স্পর্শ করে না কারণ এ ধরনের কর্মে ফলাকাঙ্ক্ষা থাকে না। কামনা-বাসনা মুক্ত বা নিষ্কার্ম কর্মে কর্তা কোনো রকম ফলের আশা না করেই কর্ম করে। তিনি মনে করেন কর্মের কর্তা আমি নই, কর্মফলও আমার নয়। এ নিষ্কাম কর্মই যোগসাধনার ক্ষেত্রে কর্মযোগ। নিষ্কাম কর্মে মোক্ষলাভ হয়। ফলাকাঙ্ক্ষা থাকে না বলেই কামনা-বাসনামুক্ত কর্মের ফল কর্মকর্তাকে স্পর্শ করে না।
মোক্ষলাভের জন্য প্রথম প্রয়োজন আত্মোপলব্ধি। মানবজীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মোক্ষলাভ করা। আর এ মোক্ষলাভের জন্য নিষ্কামভাবে ঈশ্বরের আরাধনা করা প্রয়োজন। তার জন্য নিজের উপলব্ধি হওয়া বা ইন্দ্রিয়সংযম করা জরুরি। তাই মোক্ষলাভের জন্য প্রথম প্রয়োজন হলো আত্মোপলব্ধি।
জ্ঞানযোগ হলো সৃষ্টিকর্তাকে জানা বা চেনার একটি পদ্ধতি। অর্থাৎ জ্ঞান অনুসন্ধানের মাধ্যমে বা তার সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁকে জানার নাম জ্ঞানযোগ। জ্ঞানযোগের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার মহিমা ফুটে ওঠে। তাছাড়া জ্ঞানযোগের জ্ঞান দ্বারা পারলৌকিক জ্ঞান লাভ হয়।
ভগবানে ঐকান্তিক প্রেম বা ভালোবাসাকে ভক্তি বলে। ঈশ্বরকে নিষ্ঠাসহকারে সেবা, ভক্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতি প্রেমভাব জাগ্রত হয়। ভক্ত গভীর ভালোবাসার মাধ্যমে তাঁকে নিজের চোখে অবলোকন করতে পারে। সে তাঁর উপাস্য ঈশ্বর বা ভগবানকে সেবার দ্বারা গভীর আনন্দানুভূতি লাভ করেন। সেই আনন্দে তার প্রেমাণু বাহিত হয়। সে সুখে কিংবা দুঃখে যেভাবেই থাকুক, সে ঈশ্বরের প্রেমে ডুবে থাকে।
ভগবান ভক্তের অধীন। ভক্তের চিত্তে ভগবানের প্রতি থাকে গভীর বিশ্বাস। এই বিশ্বাস অবলম্বন করে ভক্ত ভগবানকে একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করেন। এজন্য ভগবানের একান্ত কৃপা লাভের আশায় ভক্তগণ ভগবানকে সমস্ত ভোগ্যবস্তু নিবেদন করেন।
ভক্তিযোগে ভক্তের চিত্তে ভগবানের অশেষ করুণা ও সর্বশক্তি সত্তায় থাকে গভীর বিশ্বাস। এ বিশ্বাস অবলম্বন করে ভক্ত ভগবানকে একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করেন। ভগবান একমাত্র গতি এ অনুভূতি নিয়ে ভক্ত নিজেকে আত্মসমর্পণ করেন। যার মাধ্যমে ভক্তও ভগবানের মিলনসূত্র স্থাপিত হয়। ফলে মোক্ষলাভ ঘটে। তাই একমাত্র ভক্তিতেই মুক্তি।
Contribute high-quality content, help learners grow, and earn for your efforts! 💡💰'
Related Question
View Allঅবতার ও দেব-দেবী একই ঈশ্বরের বিভিন্ন প্রকাশ, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় এ বিশ্বাসকে একেশ্বরবাদ বলা হয়।
যোগের সাধন প্রক্রিয়ায় মনকে শুদ্ধ ও শান্ত করার জন্য যোগ দর্শনে আট প্রকার সাধন ক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। তন্মধ্যে প্রত্যাহার অন্যতম। দেহের ইন্দ্রিয়গুলোকে নিজ নিজ বিষয় হতে তুলে এনে চিত্তের অনুগামী করার নাম প্রত্যাহার। দৃঢ় সংকল্প ও অভ্যাসের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলোকে অন্তর্মুখী করা হলে চিত্ত আরাধ্য বস্তুকে নিবিষ্ট হতে পারে।
দ্বিজেন্দ্রনাথ একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। তাঁর বয়স ৭৫ বছর। এসময় তিনি বানপ্রস্থ আশ্রম শেষ করেছেন। বানপ্রস্থ আশ্রমের সময় তিনি সংসারে থেকেও অত্যন্ত সংযমী ছিলেন। তিনি সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পুত্রের হাতে অর্পণ করে মন্দিরে মন্দিরে ঈশ্বর ধ্যানে মগ্ন থাকেন।
বানপ্রস্থে বনে নির্জন পরিবেশে অবসর জীবনযাপন করতে হয়। তবে সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষ বনবাসী না হয়ে গৃহত্যাগ করে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে বৈরাগ্যময় জীবনযাপন করতে পারেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ এ পর্যায়ে ভজন, পূজন, কীর্তন, জপ, ধ্যান প্রভৃতি ধর্মীয় কর্মে থেকে বানপ্রস্থ জীবন অতিক্রান্ত করেছেন।
দ্বিজেন্দ্রনাথ একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। তিনি বানপ্রস্থ জীবন শেষ করেছেন। এতে তাঁর আত্মতৃপ্তি হয়নি। তাই জীবনের পরম প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তিনি সংসার ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। আলোচ্য অংশে সন্ন্যাস আশ্রমে যাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। সন্ন্যাস শব্দের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ। এ আশ্রমে এসে সন্ন্যাসী একাকী জীবনধারণ করবেন। সন্ন্যাস আশ্রমে অতীত জীবনের স্মৃতি সব পরিহার করে এক মনে এক ধ্যানে ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকতে হয়। শাস্ত্র বচনে জানা যায়-
"দন্ড গ্রহণমাত্রেণ নরো নারায়ণো ভবেৎ” অর্থাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করলেই মানুষ নারায়ণ বা দেবতা হয়ে যায়। তবে সন্ন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হল কর্মফলাসক্তি ও ভোগাসক্তি ত্যাগ। এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে-
"অনাশ্রিতঃ কর্মফলং কার্যং কর্ম করোতি যঃ।
স সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নির্ন চাক্রিয়ঃ ॥” (৬/১)
অর্থাৎ কর্মফলের বাসনা না করে যিনি কর্তব্যকর্ম করেন তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী। শুধুমাত্র গৃহাদি কর্ম বা শরীর ধারণের উপকরণ সংগ্রহে কর্মত্যাগই সন্ন্যাস নয়।
তাই সার্বিক আলোচনার বিষয়বস্তু অনুযায়ী আমি মনে করি, জীবনের পরম প্রাপ্তি লাভে দ্বিজেন্দ্রনাথের সিদ্ধান্তটিই ছিল যৌক্তিক।
ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জিত কর্মকে কর্মযোেগ বলে।
কামনা-বাসনা মুক্ত কর্মের ফল কর্মকর্তাকে স্পর্শ করে না কারণ এ ধরনের কর্মে ফলাকাঙ্ক্ষা থাকে না। কামনা-বাসনা মুক্ত বা নিষ্কার্ম কর্মে কর্তা কোনো রকম ফলের আশা না করেই কর্ম করে। তিনি মনে করেন কর্মের কর্তা আমি নই, কর্মফলও আমার নয়। এ নিষ্কাম কর্মই যোগসাধনার ক্ষেত্রে কর্মযোগ। নিষ্কাম কর্মে মোক্ষলাভ হয়। ফলাকাঙ্ক্ষা থাকে না বলেই কামনা-বাসনামুক্ত কর্মের ফল কর্মকর্তাকে স্পর্শ করে না।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!