পাঠ শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গুরুগৃহ থেকে নিজ গৃহে ফিরে আসার অনুষ্ঠানকে সমাবর্তন বলে ।
ষষ্ঠ মাসে পুত্রের অন্নপ্রাশন হয় ।
পঞ্চম, অষ্টম বা দশম মাসে কণ্যা সন্তানের অন্নপ্রাশন করা হয় ।
'উপনয়ন' শব্দের সহজ অর্থ পৈতা ধারণ ।
স্মৃতিশাস্ত্রে দশটি সংস্কারের উল্লেখ আছে ।
ঐতিহ্য অনুসরণ করে হিন্দুদের সমগ্র জীবনে যে সকল মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয় সেগুলোকে বলা হয় সংস্কার ।
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার দশম, একাদশ, দ্বাদশ ও শততম দিবসে করণীয় হলো নামকরণ ।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গুরু শিষ্যকে অনেক উপদেশ দিতেন ।
বর্তমান সমাজে ব্রাহ্ম বিবাহটি প্রচলিত ।
'বিবাহ' শব্দের অর্থ বিশেষ রূপে ভার বহন করা ।
মানব মনের সুকুমার বৃত্তিগুলো পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয় বিবাহ সংস্কারের মাধ্যমে ।
মাল্যবিনিময়ের মাধ্যমে যে বিবাহ তার নাম গান্ধর্ব বিবাহ ।
মহাভারতের দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার বিবাহ গান্ধর্ব বিবাহ ।
সনাতন ধর্মে দশবিধ সংস্কারের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিবাহ ।
সমগ্র জীবনে যে দশটি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান রয়েছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিবাহ ।
স্ত্রীকে বাদ দিয়ে পুরুষের কোনো ধর্মকার্যই সম্পন্ন হয় না ।
বহু ধাতুর অর্থ বহন করা ।
'বি' উপসর্গের অর্থ বিশেষরূপে ।
স্মৃতিশাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ মনুসংহিতায় আট প্রকার বিবাহের উল্লেখ আছে ।
বিবাহের মূল পর্ব সম্প্রদান ।
গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেহ শুদ্ধিকরণ হয় ।
যিনি কন্যা সম্প্রদান করবেন তিনি উত্তরমুখী হয়ে বসেন ।
এয়োস্ত্রী বলতে বোঝায় সধবা মহিলা ।
বরপক্ষের আশীর্বাদকে আঞ্চলিক ভাষায় বলে স্বর্ণ বস্ত্র ।
হিন্দু সমাজে অধিবাস আচারটি বিবাহের একদিন পূর্বে পালিত হয় ।
অধিবাসের দিন বর ও কনে নিরামিষ আহার করে ।
অধিবাসের সময় হলে এয়োস্ত্রীগণ বর-কনেকে হলুদ মাখায় ।
বিবাহ উপলক্ষ্যে কর-কনে উভয় কর্তৃক উভয়ের পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রাদ্ধতর্পণ করাকে বলা হয় বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ ।
গায়ে হলুদের মধ্য দিয়েই বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ।
গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানটি বর-কনের স্ব-স্ব বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় ।
অধিবাসের পর পরই গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানটি করতে হয় ।
গায়ে হলুদ মূলত দেহ শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান ।
পর পর তিনবার বর-কনে পরস্পরের মালা বদল করে ।
সম্প্রদান পর্বে বরকে পূর্বমুখী হয়ে বসতে হয় ।
সম্প্রদান অনুষ্ঠানে বর-কনেকে মুখোমুখি বসাতে গিয়ে কনেকে পশ্চিমমুখী করে বসাতে হয় ।
সম্প্রদান পর্বের পরে সেখানে বর্গাকার আকারের যজ্ঞক্ষেত্র তৈরি করা হয় ।
যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে অগ্নিদেব কাছে বর-কনে আমৃত্যু বাঁধা হয়ে থাকে ।
একজন হিন্দু নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সিঁদুর দিয়ে বিবাহ চিহ্ন পড়ানো ।
সোহাগজল অনুষ্ঠানে স্বামীর বাম পাশে বসে স্ত্রী ।
বিয়ের আগের দিন এয়োতী নারীরা সাত ঘাট ঘুরে জল এনে সযত্নে রেখে দেন ।
স্থানভেদে সোহাগজলের অপর নাম শান্তিজল ।
বাসি বিয়েতে পাঁচ পুকুরের জল এনে বর-কনেকে স্নান করানো হয় ।
বাসি বিয়ের দিন সধবা-বিধবার মধ্যে স্বর্ণের আংটি নিয়ে লুকোচুরি খেলা হয় ।
সাধারণত বিয়ের তৃতীয় দিনে যে অনুষ্ঠানটি হয় তার নাম বৌ-ভাত ।
পণ প্রথার অপর নাম যৌতুক প্রথা ।
ইষ্টি শব্দের অর্থ যজ্ঞ ।
সাধারণত মৃতদেহের মুখাগ্নি করেন জ্যেষ্ঠপুত্র ।
দুটি শব্দ মিলে 'অন্ত্যেষ্টি' শব্দটি গঠিত ।
অন্ত্য' শব্দের অর্থ শেষ ।
'অন্ত্যেষ্টি' শব্দের অর্থ শেষযজ্ঞ ।
মৃত্যুর পর দেহটিকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় ।
শাশানে মৃতদেহের মাথা দক্ষিণদিকে রেখে তাকে কুশের উপর শয়ন করানো হয় ।
মৃতের দাহ শেষ হলে দ্বাদশ আঙুলি পরিমিত আমকাঠ নিয়ে সাতবার চিতা প্রদক্ষিণ করতে হয় ।
মৃতের দাহ শেষে শ্মশানবন্ধুগণ প্রত্যেকে তিন বা সাত কলস জল দিয়ে চিতার আগুন নিভিয়ে দেবেন ।
শাস্ত্রে মৃতদেহের সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য ।
পিতা-মাতা বা জ্ঞাতির মৃত্যুতে আমরা অশৌচ পালন করি ।
সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত জ্ঞাতিত্ব বর্তমান ।
সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত জননাশৌচ ও মরণাশৌচ পালনের বিধান আছে ।
অশৌচ দুই প্রকার ।
'অশৌচ' শব্দের অর্থ শুচিতার অভাব ।
'শৌচ' শব্দের অর্থ শুচিতা ।
পূরক পিন্ড দিতে হয় মোট দশটি ।
মৃত্যুর পর যে অশৌচ হয় তার নাম মরণাশৌচ ।
শ্রাদ্ধের প্রবর্তক নিমি ।
আদ্যশ্রাদ্ধের পূর্ণ নাম আদ্য একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ ।
"চাতুর্বন্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ"- এ বাণীটি করেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।
"চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ" শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা গ্রন্থের অন্তর্গত ।
তমঃ' গুণ দ্বারা প্রভাবিত শূদ্র বর্ণের লোক ।
ব্রাহ্মণ বর্ণের কোনো ব্যক্তি সোমবারে মৃত্যুবরণ করলে বৃহস্পতিবার তার আদ্যশ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান হবে ।
ব্রাহ্মণ সন্তান তমঃগুণে প্রভাবিত হলে সে শূদ্র বর্ণ বলে গণ্য হয় ।
দত্তাত্রেয় মুণির পুত্রের নাম নিমি ।
'শ্রদ্ধা' শব্দের সঙ্গে অণু প্রত্যয়যোগে 'শ্রাদ্ধ' শব্দ গঠিত ।
কেউ মারা গেলে পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন দেখতে এসে মৃত ব্যক্তির আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ।
গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমিই চারটি বর্ণ সৃষ্টি করেছি"- বলেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।
ঐতিহ্য অনুসরণ করে হিন্দুদের সমগ্র জীবনে যেসব মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয় সেসব অনুষ্ঠানকে সংস্কার বলে। স্মৃতিশাস্ত্রে দশবিধ সংস্কারের উল্লেখ আছে। যেমন: গর্ভধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, সমাবর্তন, উপনয়ন ও বিবাহ। দশবিধ সংস্কারের মধ্যে বর্তমানে গর্ভাধান, পুংসবন ও সীমান্তোন্নয়ন প্রভৃতি সংস্কার লুপ্তপ্রায়।
দশবিধ সংস্কারের মধ্যে অন্নপ্রাশন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। সন্তান জন্ম নেওয়ার পর তার মুখে প্রথম অন্ন বা ভাত তুলে দেওয়ার যে অনুষ্ঠান তাকে বলা হয় অন্নপ্রাশন। অর্থাৎ এদিন থেকেই সন্তান ভাতসহ অন্যান্য কিছু খেতে পারে। পুত্রের ষষ্ঠ মাসে এবং কন্যার পঞ্চম, অষ্টম বা দশম মাসে পুজাদি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অন্নপ্রাশন সম্পন্ন করতে হয়।
জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য হিন্দুধর্মের যে দশটি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান পালন করা হয় তাই দশবিধ সংস্কার। স্মৃতিশাস্ত্রে দশবিধ সংস্কারের উল্লেখ আছে। যেমন- গর্ভধান, পুংসবণ, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, সমাবর্তন, উপনয়ন ও বিবাহ। এই দশবিধ সংস্কার পালনের মধ্য দিয়ে আমাদের জীবন সুন্দর ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।
জন্মের পর পিতা যব, যষ্ঠিমধু ও ঘৃতদ্বারা সন্তানের জিহ্বা স্পর্শ করে মন্ত্রোচ্চারণ করেন একে বলা হয় জাতকর্ম। এ আচারটি পালন করার ফলে সন্তান সদাচারী ও মিষ্টভাষী হয়।
লেখাপড়া বা পাঠ শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গুরুগৃহ থেকে নিজ গৃহে ফিরে আসার যে অনুষ্ঠান তাকে বলা হয় সমাবর্তন। প্রাচীনকালে পাঠ শেষে গুরুগৃহ থেকে ফিরে আসার সময় সমাবর্তন অনুষ্ঠান করা হতো। এসময় গুরু শিষ্যকে অনেক মূল্যবান উপদেশ দিতেন। যা শিষ্যদের পরবর্তী সারা জীবনের জন্য পাথেয়।
বিবাহ হলো ধর্মীয় জীবনের চর্চা। 'বিবাহ' শব্দটি 'বি' পূর্বক 'বহ্' ধাতু ও ঘঞ প্রত্যয়যোগে গঠিত। 'বহ্' ধাতুর অর্থ 'বহন করা' এবং 'বি' উপসর্গের অর্থ বিশেষরূপে। সুতরাং 'বিবাহ' শব্দের অর্থ বিশেষরূপে ভার বহন করা। বিবাহের ফলে পুরুষকে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ এবং মানসম্ভ্রম রক্ষার সার্বিক ভার বহন করতে হয়।
মনুসংহিতায় ৮ প্রকার বিবাহের উল্লেখ রয়েছে। গান্ধর্ব বিবাহ তার মধ্যে একটি। নারী-পুরুষ পরস্পর শপথ করে মাল্যবিনিময়ের মাধ্যমে যে বিবাহ করে তাকে গান্ধর্ব বিবাহ বলে। এ ধরনের বিবাহ সাধারণত কোনো মন্দির বা আশ্রমে হয়ে থাকে। এতে কোনো আড়ম্বর থাকে না। এ বিবাহের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো মহাভারতের দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার বিবাহ।
বিবাহের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্রটি হলো-
'যদেতৎ হৃদয়ং তব তদন্তু হৃদয়ং মম।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদন্তু হৃদয়ং তব।'
(ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ)
সরলার্থ : তোমার হৃদয় আমার হোক, আমার হৃদয় হোক তোমার।
হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী দশবিধ সংস্কারগুলোর মধ্যে বিবাহ শ্রেষ্ঠ। বিবাহের দ্বারা স্বামী সন্তানের জনক হয়ে লাভ করে পিতৃত্ব এবং স্ত্রী জননীরূপে লাভ করেন মাতৃত্ব। বিবাহের মাধ্যমে মাতা-পিতা, পুত্র-কন্যা, সকলকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ে ওঠে এবং মানবমনের সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকশিত হয়। এভাবে গড়ে ওঠে আলোকিত মানুষ গড়ার সূতিকাগার। তাই বিবাহকে হিন্দুধর্মে সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কার বলা হয়েছে।
হিন্দু বিবাহের কিছু বিধিবিধান শাস্ত্রীয়, কিছু অনুষ্ঠান স্ত্রী-আচার। শুভলগ্নে নারায়ণ, অগ্নি, গুরু, পুরোহিত, আত্মীয় এবং আমন্ত্রিত অতিথিগণকে সাক্ষী রেখে মঙ্গলমন্ত্রের উচ্চারণ, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিবাহ অনুষ্ঠানের কতকগুলো পর্ব রয়েছে। যেমন- আশীর্বাদ, অধিবাস, বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ, গায়ে হলুদ, শুভদৃষ্টি, মালাবদল সম্প্রদান, সাতপাক, সিঁদুরদান প্রভৃতি।
হিন্দু সমজে অধিবাস আচারটি বিবাহের একদিন পূর্বে পালিত হয়। অধিবাসের সময় বর কনেকে হলুদ মাখিয়ে মঙ্গলঘটের জল দিয়ে স্নান করায়। স্নানের পর তারা অধিবাসের আসনে উপবেশ করে গুরুজনদের প্রণাম করে। ঐদিন বর ও কনে নিরামিষ আহর করে। এ আচারের মধ্যে বর-কনের ভবিষ্যৎ সুন্দর জীবন ও কল্যাণকর হয়।
বিবাহ অনুষ্ঠানের কতকগুলো পর্বের মধ্যে বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। বিবাহের দিন কিংবা তার আগের দিন উভয় পক্ষই নিজ নিজ ঘরে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁদের আশীর্বাদ কামনা করেন। উভয় কুলের পিতৃপুরুষদের প্রতি এই শ্রাদ্ধতর্পণ করাকে বলা হয় বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ।
বিবাহে গায়ে হলুদ গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়েই বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এটি মূলত দেহ শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান। কাঁচা হলুদের সাথে মেথি, সুন্ধা, সরিষা, চন্দন প্রভৃতি থাকে। এগুলো সবই সৌভাগ্যের প্রতীক। সুদৃঢ় বিবাহিত জীবন, নবদম্পতির সুখ-শান্তি কামনা করাই এ অনুষ্ঠানের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। তাই হিন্দু বিবাহে গায়ে হলুদ একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব। বিবাহের মূল পর্বই হচ্ছে সম্প্রদান পর্ব। বিবাহের নির্দিষ্ট পোশাক পরে বর-কনে পূর্ব-পশ্চিমমুখী হয়ে মুখোমুখি বসে। পুত্তলি অঙ্কিত, আম্রপল্লবে শোভিত, গঙ্গাজলপূর্ণ ঘটের উপর বরের চিৎ করা ডান হাতে কনের ডান হাত রেখে লাল গামছা, ফল, কুশপত্র আর ফুলের মালা দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়। সম্প্রদানকর্তা দেবতার নাম উচ্চারণ করে কন্যা সম্প্রদান করেন।
বিবাহের মূল পর্ব হলো সম্প্রদান পর্ব। বিবাহের নির্দিষ্ট পোশাক পরে বিয়ের পিড়িতে বর পূর্বমুখী আর কনে পশ্চিমমুখী বসে। কন্যা সম্প্রদানকারী উত্তরমুখী হয়ে বসেন। সামনে পুরোহিত উপাচার নিয়ে মন্ত্রপাঠ করেন। সম্প্রদান কর্তা দেবতাদের নাম উচ্চরণ করে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে কন্যা সম্প্রদান করেন।
বিবাহের মূল পর্ব হলো সম্প্রদান পর্ব। বিবাহের নির্দিষ্ট পোশাক পরে বিয়ের পিড়িতে বর পূর্বমুখী আর কনে পশ্চিমমুখী বসে। কন্যা সম্প্রদানকারী উত্তরমুখী হয়ে বসেন। সামনে পুরোহিত উপাচার নিয়ে মন্ত্রপাঠ করেন। সম্প্রদান কর্তা দেবতাদের নাম উচ্চরণ করে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে কন্যা সম্প্রদান করেন।
হিন্দু বিবাহে সম্প্রদানের পর যজ্ঞানুষ্ঠান করা হয়। একটি বর্গাকার যজ্ঞক্ষেত্রে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে মনের অহংকার, মান- অভিমান, হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণাসহ সকল অসাধু চিন্তারূপী ঘি-মাখা আমপাতা আগুনে আহুতি দিতে হয়। এই যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে নবদম্পতি অগ্নিদেবের আশীর্বাদ লাভ করে অগ্নিকে সাক্ষী রেখে আমৃত্যু বাঁধা হয়ে থাকে।
হিন্দু বিবাহে সম্প্রদান ও যজ্ঞানুষ্ঠান পর্ব শেষে বর কনের মাথায় সিঁদুর পরিয়ে দেয়। সিঁদুর দিয়ে বিবাহ চিহ্ন পরানো একজন হিন্দু নারীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর মধ্য দিয়েই কন্যা অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর জীবিতাবস্থায় সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পারবে। স্ত্রীরা প্রতিদিন সকালে স্নান করে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে সিঁদুর পরে স্বামীর মঙ্গল ও আয়ু কামনা করে।
বিবাহে যজ্ঞানুষ্ঠানের পরে দেব পুরোহিত অগ্নিকে পর পর। সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয় ও প্রণাম করতে হয়। এভাবেই সাতপাকে বেঁধে নবদম্পতি বিশুদ্ধ জীবন লাভ করে। বর সম্মুখে, কনে তার পিছনে, বর তার বাঁ হাত দিয়ে কনের ডান হাত ধরে বিবাহ আসর ঘোরে। এর পাশাপাশি দুজনের কাপড়ের কোনা একত্র করে গিঁটও দেওয়া হয়। যা স্বামী-স্ত্রীর সারাজীবনের বন্ধনকে নির্দেশ করে।
সিঁদুর দিয়ে বিবাহ চিহ্ন পরানো একজন হিন্দু নারীর জীবনে - সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। হিন্দু বিবাহে সম্প্রদান ও যজ্ঞানুষ্ঠান শেষে বর কনের সিঁথিতে সিঁদুর রাঙিয়ে দেয় এবং তারপর থেকেই একজন কন্যা বা স্ত্রী তাঁর স্বামীর জীবিতাবস্থায় সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পারবে। সিঁদুর পরার মাধ্যমে স্ত্রী তার স্বামীর আয়ু ও মঙ্গল কামনা করে। তাই একজন নারীর জীবনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কন্যাকে পাত্রস্থ করার সময় বরপক্ষকে যদি নগদ অর্থসম্পদ প্রভৃতি দিতে হয় তাহলে তাকে বলে পণ। যাকে যৌতুকও বলা হয়। এই পণপ্রথা বা যৌতুক একটি সামাজিক অপরাধ। বহুকাল ধরেই এটি আমাদের ক্ষতি করছে। পণ গ্রহণ এবং প্রদান দুটোই সমান অপরাধ। এর মূলে রয়েছে অশিক্ষা, অসচেতনতা, পিতৃতান্ত্রিক ও পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থা।
পণপ্রথা বা যৌতুক প্রথা একটি সামাজিক ব্যাধি। কন্যাকে পাত্রস্থ করার সময় যদি বরপক্ষকে নগদ অর্থসম্পদ প্রভৃতি দিতে হয় তাকে পণ বলে। অনেক সময় কন্যার পিতার সামর্থ্য না থাকলেও ঋণগ্রস্ত হয়ে দিতে হয়, বা না দিতে পারলে বিবাহ ভেঙে যায়। অনেকক্ষেত্রে স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ফলে অনেক মেয়ে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নেয়। তাই পণপ্রথাকে অধর্ম বলা হয়ে থাকে।
'অন্ত' শব্দের অর্থ শেষ এবং 'ইষ্টি' শব্দের অর্থ যজ্ঞ। সুতরাং 'অন্ত্যেষ্টি' শব্দের অর্থ শেষযজ্ঞ। অর্থাৎ অগ্নিতে মৃতদেহকে আহুতি দেওয়া। আত্মা দেহ থেকে অন্তর্হিত হলে দেহ একটি প্রাণহীন অচল পদার্থে পরিণত হয় এবং দেহ পচে যায়। তাই শাস্ত্রে মৃত দেহের সৎকারের বিধান রয়েছে। এ সৎকারই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নামে পরিচিত।
মৃত্যুর পর দেহটিকে বস্ত্রাবৃত ও মালা চন্দনে বিভূষিত করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃতদেহকে কুশের উপর দক্ষিণ দিকে মাথা করে শোয়ানো হয়। দাহাধিকারী স্নান করে এসে মৃতের গায়ে কাঁচা হলুদ তেল মেখে স্নান করিয়ে নতুন কাপড়, মালা ও কপালে চন্দন দিয়ে মৃতদেহের সপ্তছিদ্র স্বর্ণ বা কাঁসা দিয়ে বন্ধ করতে হয়। তারপর পিন্ডদান করে মৃতদেহকে চিতায় শয়ন করিয়ে দাহকার্য সম্পন্ন করা হয়।
মৃত্যু মানে দেহ থেকে আত্মার বহির্গমন। আত্মা দেহ থেকে অন্তর্হিত হলে সেই দেহ একটি প্রাণহীন অচল পদার্থে পরিণত হয় এবং ক্রমে এটি পচতে শুরু করে। ভূপৃষ্ঠে পড়ে থাকলে তখন ভীতির সঞ্চার হয় এবং পরিবেশও নষ্ট হয়। তাই শাস্ত্রে মৃতদেহের সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটি ধর্মীয় বিধানও।
'অন্ত্যেষ্টি' শব্দের অর্থ 'শেষযজ্ঞ' অর্থাৎ অগ্নিতে মৃতদেহকে আহুতি দেওয়া। শাস্ত্রে মৃতদেহের সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মন্ত্রের সরলার্থ হলো- জেনে বা না জেনে তিনি হয়তো দুষ্কার্য করেছেন। এখন মৃত্যুকালবশে তিনি পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। ধর্ম, অধর্ম, লোভ ও মোহচ্ছন্ন তার শরীর দগ্ধ করুন। তিনি দিব্যলোক গমন করুন।
আত্মা দেহ থেকে নির্গত হলে দেহ একটি অচেতন জড় বস্তুতে পরিণত হয় এবং প্রাকৃতিক নিয়মে এটি পচতে শুরু করে। তখন ভূপৃষ্ঠে পড়ে থাকলে তা ভীতির সঞ্চার করে এবং এর ফলে পরিবেশও নষ্ট হয়। তাই শাস্ত্রে মৃতদেহের সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটি ধর্মীয় বিধানও বটে। তাই শবদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া একটি ধর্মীয় বিধান। মৃত্যু হলো দেহ থেকে আত্মার বহির্গমন। আত্মা দেহ থেকে অন্তর্হিত হলে দেহ একটি প্রাণহীন অচল পদার্থে পরিণত হয় এবং ক্রমে ক্রমে দেহ পচে যায়। ভূপৃষ্ঠে তা পড়ে থাকলে ভীতির সঞ্চার হয় এবং পরিবেশ নষ্ট হয়। তাই শাস্ত্রে মৃতদেহের সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে।
'শৌচ' শব্দের অর্থ 'শুচিতা'। সুতরাং, 'অশৌচ' শব্দের অর্থ শুচিতা বা পবিত্রতার অভাব। মাতা-পিতা বা জ্ঞাতিবর্গের মৃত্যুতে আমাদের অশৌচ হয়। কারণ প্রিয়জনের মৃত্যুতে আমাদের মন শোকে আচ্ছন্ন হয়। ফলে চিত্ত সাধনভজনের উপযোগী থাকে না। তখন আমরা অশুচি হই বা অশৌচ পালন করি।
মাতা-পিতা বা জ্ঞাতিবর্গের মৃত্যুতে আমাদের অশৌচ হয়। অশৌচকালে উঠানে একটি তুলসি গাছ রোপণ করে যেখানে প্রতিদিন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে জল ও দুগ্ধ প্রদান করতে হয় এবং পিতা-মাতার মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনে ও দশম দিনে পিন্ড দান করতে হয়। এই পিন্ডকে বলা হয় পূরকপিণ্ড। পূরকপিন্ড দিতে হয় মোট দশটি।
'অশৌচ' অর্থ শুচিতা বা পবিত্রতার অভাব। অশৌচ দুই প্রকার। যথা- জননাশৌচ ও মরণাশৌচ। কেউ জন্মগ্রহণ করলে যে অশৌচ হয় তার নাম জননাশৌচ এবং মৃত্যুর পরে যে অশৌচ হয় তার নাম মরণাশৌচ। সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত জ্ঞাতিত্ব বর্তমান থাকে। সুতরাং সপ্তম পুরুষ পর্যন্তই অশৌচ পালন করার নিয়ম রয়েছে।
অশৌচ পালনে বর্ণপ্রথার প্রভাব লক্ষণীয়। উচ্চবর্ণের চেয়ে নিম্নবর্ণের লোকদের অশৌচ পালনের দিবস সংখ্যা বেশি। যেমন-ব্রাহ্মণের দশ দিন, ক্ষত্রিয়ের বারো দিন, বৈশ্যের পনেরো দিন এবং শূদ্রের ত্রিশ দিন। তবে বর্তমানে প্রায় সকল বর্ণের বা গোত্রের মানুষ দশদিন অশৌচ পালন করে একাদশ কিংবা ত্রয়োদশ দিবসে | শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকে।
'অশৌচ' অর্থ শুচিতা বা পবিত্রতার অভাব। অশৌচ পালন যে শুধু শাস্ত্রীয় বিধান তাই নয়, সামাজিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব রয়েছে। নিকটজনের মৃত্যুতে আমাদের মন শোকাচ্ছন্ন হয়। চিত্ত সাধন ভজনের উপযোগী থাকে না। ঈশ্বরের প্রতি একাগ্রতা আসে না। তাই মনকে শান্ত ও সাধন ভজনের উপযোগী করা এবং মৃতের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অশৌচ পালন গুরুত্বপূর্ণ।
'শ্রদ্ধা' শব্দের সঙ্গে 'অন' প্রত্যয়যোগে 'শ্রাদ্ধ' শব্দটি গঠিত। শ্রদ্ধার সঙ্গে যে দান করা হয় তাই শ্রাদ্ধ। সুতরাং যেখানে শ্রদ্ধার সংযোগ নেই সেখানে আড়ম্বর থাকলেও শ্রদ্ধা হয় না। অশৌচকাল উত্তীর্ণ হলে পরদিন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রথম এই শ্রাদ্ধ করণীয় বলে তাকে বলা হয় আদ্যশ্রাদ্ধ।
শ্রদ্ধার সঙ্গে যে দান তাকে বলা হয় শ্রাদ্ধ। সুতরাং যেখানে শ্রদ্ধার সংযোগ নেই, সেখানে আড়ম্বর থাকলেও শ্রাদ্ধ হয় না। একজন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হয় এবং মৃত ব্যক্তির আত্মাকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন সামগ্রী দান করতে হয় শ্রদ্ধার সহিত। যার মাধ্যমে সেই মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করা হয় ।
আদ্য একোদ্দিস্ট শ্রাদ্ধের প্রথমে প্রদীপ প্রজ্বলিত করে বাস্তুপুরুষ যজ্ঞেশ্বর ও ভূম্বামীর পূজা করা হয়। অতঃপর শ্রাদ্ধ করতে হয়। এই সময় ছাতা, পাদুকা, বস্ত্র, অন্ন, জল, তাম্বুল, মালা, বিছানা প্রভৃতি মৃত ব্যক্তির নামে মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক উৎসর্গ করা হয়। পরে পিন্ডদান করে শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করতে হয়।
কেউ মারা গেলে পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন যেমন দেখতে আসেন তেমনি মৃত ব্যক্তির আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তার পরিবার, জ্ঞাতিবর্গের দুঃখের সাথে একাত্ম হন। সকলেই সমব্যথী হন। এতে মানুষের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। অন্যজনের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা বেড়ে যায় ও সামাজিকতার বীজ অঙ্কুরিত হয়। তাই আদ্যশ্রাদ্ধের গুরুত্ব রয়েছে।
গুণ ও কর্ম অনুসারে ভগবান চারটি বর্ণের সৃষ্টি করেছেন। ব্রাহ্মণ সন্তান হলেই যে একজন ব্রাহ্মণ বলে গণ্য হবেন, এমন নয়। সত্ত্বগুণ প্রভাবিত কোনো শূদ্রের সন্তানও ব্রাহ্মণ পদবাচ্য হতে পারেন। আবার কোনো ব্রাহ্মণ সন্তান তমঃ গুণে প্রভাবিত হলে সে শূদ্র বলে গণ্য হবেন। তাই গীতায় ভগবান গুণ ও কর্ম অনুসারে চারটি বর্ণের কথা উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কে আমিও একমত।
জন্মের পর পিতা যব, যষ্ঠিমধু ও ঘৃত দ্বারা সন্তানের জিহ্বা। স্পর্শ করে মন্ত্রোচ্চারণ করেন একে বলে জাতকর্ম।
পাঠ শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গুরুগৃহ থেকে নিজগৃহে ফিরে আসার সময় যে অনুষ্ঠান হয় তাকে সমাবর্তন বলে।
ঐতিহ্য অনুসরণ করে হিন্দুদের সমগ্র জীবনে যেসব মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয় সেগুলোকে বলা হয় সংস্কার।
পুত্র সন্তানের অন্নপ্রাশন ষষ্ঠ মাসে করতে হয়।
পুত্রের ষষ্ঠ মাসে এবং কন্যার পঞ্চম, অষ্টম বা দশম মাসে প্রথম অন্নভোজনের নাম অন্নপ্রাসন।
আগমশাস্ত্রের প্রবক্তা বলা হয় শিবকে।
মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথম অন্নভোজনকে বলে অন্নপ্রাশন ।
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার দশম, একাদশ, দ্বাদশ ও শততম দিবসে সন্তানের নামকরণ করা হয়।
বিবাহ হলো একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের মধ্যে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় বন্ধন।
বর্তমান সমাজে ব্রাহ্মবিবাহ অধিক প্রচলিত।
দশবিধ সংস্কারের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে বিবাহ।
স্মৃতিশাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ মনুসংহিতায় আট প্রকার বিবাহের উল্লেখ আছে।
বিবাহ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কার।
বিবাহ শব্দের অর্থ বিশেষরূপে ভার বহন করা।
কন্যাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন করে এবং অলংকার দ্বারা সজ্জিত করে বিদ্বান সদাচারী বরকে স্বয়ং আমন্ত্রণ করে কন্যা দান করাকে প্রাজাপত্য বিবাহ বলে।
নারী-পুরুষ পরস্পর শপথ করে মাল্য বিনিময়ের মাধ্যমে যে বিবাহ করে, তাকে গান্ধর্ব বিবাহ বলে।
বিবাহের দ্বারা পুরুষ সন্তানের জনক হয়ে পিতৃত্ব লাভ করেন।
বিবাহের দ্বারা নারী জননীরূপে মাতৃত্ব লাভ করেন।
বরপক্ষের অভিভাবকগণ একটি আবশ্যকীয় লাল শাড়ির সাথে সাধ্যমত স্বর্ণালঙ্কারসহ নানাবিধ উপঢৌকন প্রদানপূর্বক ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। আঞ্চলিক ভাষায় একে স্বর্ণ-বস্ত্র বলে।
বিবাহের মূল পর্ব হচ্ছে সম্প্রদান পর্ব।
কন্যাকে পাত্রস্থ করার সময় বরপক্ষকে যদি নগদ অর্থ, সম্পদ প্রভৃতি দিতে হয় তাহলে তাকে বলে পণ।
অধিবাস বিয়ের একদিন পূর্বে পালিত হয়।
বিবাহের দিন কিংবা তার আগের দিন বর ও কনে উভয় পক্ষ পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পিতৃপুরুষদের প্রতি এ শ্রাদ্ধতর্পণ করাকে বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ বলে।
বৌভাত অনুষ্ঠানে নববধূকে স্বামী 'আজ থেকে তোমার ভাত - কাপড়ের সমস্ত দায়িত্ব নিলাম' বলে বরণ করে।
বিয়ের দশদিনের মধ্যে যে কোনো একদিন নববধূকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাওয়াকে অষ্টমঙ্গলা বলে।
মৃত্যু মানে হচ্ছে দেহ থেকে আত্মার বহির্গমন।
'ইষ্টি' শব্দের অর্থ হচ্ছে যজ্ঞ।
'অন্ত্যেষ্টি' শব্দের অর্থ শেষযজ্ঞ অর্থাৎ অগ্নিতে মৃতদেহকে আহুতি দেওয়া।
শাস্ত্রমতে মৃতদেহের সৎকারের বিধানই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নামে পরিচিত।
পিতা-মাতার মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনে ও দশম দিনে যে পিন্ড দান করতে হয়, তাকে পূরকপিণ্ড বলে।
'শোচ' শব্দের অর্থ শুচিতা।
অশৌচ মূলত দু প্রকার। জন্মশৌচ ও মরণাশৌচ।
'অশৌচ' শব্দের অর্থ শূচিতা বা পবিত্রতার অভাব।
আদ্যশ্রাদ্ধের পূর্ণ নাম আদ্য একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ।
শ্রদ্ধার সাথে যে দান করা হয় তাকে শ্রাদ্ধ বলে।
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রথমে যে শ্রাদ্ধ করণীয় তাকে আদ্যশ্রাদ্ধ বলে।
শ্রাদ্ধ বাসরে মহাভারতের বিরাট পর্বটি পাঠ করা হয়।
দত্তাত্রেয় মুনির পুত্র নিমি শ্রাদ্ধের প্রবর্তক ছিলেন।
একজন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান হয় বলে, তাকে একোদিষ্ট শ্রাদ্ধ বলে ।
পাঠ শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গুরুগৃহ থেকে নিজ গৃহে ফিরে আসার সময় যে অনুষ্ঠান হয় তার নাম সমাবর্তন। এই অনুষ্ঠানে শিক্ষক মহাশয় বা গুরু শিক্ষার্থীকে অনেক মূল্যবান উপদেশ দেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থী গুরুগৃহে পাঠ শেষ করে নিজ গৃহে ফিরে আসার জন্য সমাবর্তন অনুষ্ঠান করা হয়।
স্মৃতিশাস্ত্রে দশবিধ সংস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি সংস্কার হলো অন্নপ্রাশন। অন্নপ্রাশন হচ্ছে সন্তান জন্মগ্রহণের পর তার মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার প্রথম যে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। পুত্রের ষষ্ঠ মাসে এবং কন্যার পঞ্চম, অষ্টম বা দশম মাসে পূজাদি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথম অন্নভোজের প্রক্রিয়াই হলো অন্নপ্রাশন। এর পরেই শিশুরা অন্নসহ অন্যান্য কিছু খাওয়ার যোগ্যতা লাভ করে।
সন্তান জন্মের পর পিতা যব, যষ্ঠিমধু ও ঘৃত দ্বারা সন্তানের জিহ্বা স্পর্শ করে মন্ত্রোচ্চারণ করে জাতকর্ম করেন। এ আচারটি পালন করার ফলে সন্তান সদাচারী ও মিষ্টভাষী হয়। সে যেন সকলের সাথে মধুর ভাষায় কথা বলে, সকলের সাথে ভালো ব্যবহার করে বাবা-মা গুরুজনদের সাথে যেন শ্রদ্ধার সাথে কথা বলে। পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে যেন মিশুক আচরণ করে এ উদ্দেশ্যে পিতা সন্তানের মুখে যষ্ঠিমধু স্পর্শ করে।
প্রাচীনকালে পাঠ শেষে গুরুগৃহ থেকে নিজ গৃহে ফিরে আসার সময় যে অনুষ্ঠান হতো, তাকে সমাবর্তন বলে। এ অনুষ্ঠানে গুরু শিষ্যকে অনেক মূল্যবান উপদেশ দিতেন। যা পরবর্তী জীবনের পাথেয়।
প্রাচীনকালে পাঠ শেষে গুরুগৃহ থেকে নিজ গৃহে ফিরে আসার সময় যে অনুষ্ঠান হতো, তাকে সমাবর্তন বলে। এ অনুষ্ঠানে গুরু শিষ্যকে অনেক মূল্যবান উপদেশ দিতেন। যা পরবর্তী জীবনের পাথেয়।
আমাদের জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণকর করে গড়ে তোলাই ধর্মীয় সংস্কারের ইতিবাচক দিক। ধর্ম সবসময় আমাদের কল্যাণের জন্যই বিধিবিধান, আচার-অনুষ্ঠান প্রচলন করে। হিন্দুধর্মের প্রাচীন ঋষিগণ আমাদের জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণকর রূপে গড়ে তোলার জন্য এ সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাঝে ইহকালীন জীবনযাপন পদ্ধতি যেমন অন্তর্ভুক্ত তেমনি পারলৌকক কৃত্যও অন্তর্ভুক্ত। তাই ধর্মীয় সংস্কারের মাধ্যমে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধিত হয়।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে সমগ্র জীবনে যে দশটি সংস্কার বা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান রয়েছে তন্মধ্যে বিবাহ শ্রেষ্ঠ। বিবাহের দ্বারা পুরুষ সন্তানের জনক হয়ে লাভ করেন পিতৃত্ব এবং নারী জননীরূপে লাভকরেন মাতৃত্ব। বিবাহের মাধ্যমে মাতা, পিতা, পুত্র, কন্যা, সকলকে নিয়ে গড়ে ওঠে সুখের সংসার, যাকে কেন্দ্র করে প্রেমপ্রীতি, স্নেহ, বাৎসল্য প্রভৃতি মানবমনের সুকুমার বৃত্তিগুলো পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয়। এভাবে গড়ে ওঠে আলোকিত মানুষ তৈরির সূতিকাগার। একারণে দশবিধ সংস্কারের মধ্যে বিবাহ শ্রেষ্ঠ।
বিবাহের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্রটি হলো-
'যদেতৎ হৃদয়ং তব তদন্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।'
(ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ)
অর্থাৎ, "তোমার হৃদয় আমার হোক, আমার হৃদয় হোক তোমার।" এ মন্ত্রের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর একাত্মতার সম্পর্ক। জীবন হয় একসূত্রে গাঁথা। আমৃত্যু তারা সুখে-দুঃখে একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞা করে এবং জীবনের নতুন অধ্যায়ে শুরু হয় পথ চলা।
বিবাহ অনুষ্ঠানে শুভদৃষ্টি ও যজ্ঞানুষ্ঠান করা হয়। কেননা শুভদৃষ্টির মাধ্যমে বর কনে বিবাহের বেদিতে একে অপরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ও দৃষ্টি বিনিময় করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে। যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে মনের অহংকার, মান-অভিমান, হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণাসহ সকল অসাধু চিন্তারূপী ঘি-মাখা আমপাতা আগুনে আহুতি দিতে হয়। এই যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে অগ্নিদেবের কাছে বর কনে আমৃত্যু বাঁধা হয়ে থাকে।
বিবাহের দিন কিংবা তার আগের দিন উভয় পক্ষই নিজ নিজ ঘরে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাদের আশীর্বাদ কামনা করে। উভয়কূলের পিতৃপুরুষদের প্রতি এ শ্রাদ্ধতর্পণ করাকে বলা হয় বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ।
গায়ে হলুদ হিন্দু বিবাহের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব। এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বর-কনের স্ব-স্ব বাড়িতে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠিত হয়। বর বা কনেকে একটি আসনের ওপর বসানো হয়। বড়রা ধান, দূর্বা প্রভৃতি দিয়ে আশীর্বাদ করে আর ছোটরা নমস্কার করে গায়ে কপালে, হাতে হলুদ মাখিয়ে দেয়। এটি মূলত দেহশুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান। সুদৃঢ় বিবাহিত জীবন, নবদম্পতির সুখশান্তি কামনা করাই এ অনুষ্ঠানে অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
বিবাহের সময় যজ্ঞের অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সাত পাকে ঘোরার মাধ্যমে বর-কনে আমৃত্যু বাঁধা হয়ে যায়। সম্প্রদান পর্বের পরে সেখানে বর্গাকার যজ্ঞক্ষেত্র তৈরি করা হয়। বেদমন্ত্র উচ্চারণ। করে মনের অহংকার, মান-অভিমান, হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণাসহ সকল। অসাধু চিন্তারূপী ঘি-মাখা আমপাতা আগুনে আহুতি দিতে হয়। এরপর দেবপুরোহিত অগ্নিকে পরপর সাতবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করতে। হয়। এভাবেই সাতপাকে বেঁধে নবদম্পতি আমৃত্যু বাঁধা হয়ে যায়।
বিয়ের পরদিন সিঁদুর পরানোর অনুষ্ঠান পালিত হয়। বিয়ের পর দিনকে বলা হয় বাসি বিয়ের দিন। আমাদের দেশে অনেক স্থানে বাসি বিয়ের দিন অর্থাৎ বিয়ের পরদিন সিঁদুর পরানোর অনুষ্ঠান হয়। তবে অনেক স্থানে বিয়ের দিনই সিঁদুর পরানোর অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে।
হিন্দু নারীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো সিঁথিতে বিবাহ চিহ্ন পরানো। সম্প্রদানপর্ব ও যজ্ঞানুষ্ঠান শেষে বর কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। এটি একজন হিন্দু নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এরপর থেকেই কন্যা অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর জীবিতাবস্থায় সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পারবে।
বিবাহের মূল পর্ব হচ্ছে সম্প্রদান। বিবাহের নির্দিষ্ট পোশাক পরে বর-কনেকে বিয়ের পিড়িতে মুখোমুখি- (বর পূর্বমুখী আর কনে পশ্চিমুখী) বসাতে হয়। যিনি কন্যা সম্প্রদান করবেন তিনি উত্তরমুখী হয়ে বসেন। পুত্তলি অঙ্কিত, আম্রপল্লবে সুশোভিত গঙ্গাজলপূর্ণ একটি ঘটের উপর কনের ডানহাত রাখা হয়। তার উপর লাল গামছায় বাঁধা পাঁচটি ফল কুশপত্র আর ফুলের মালা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। সম্প্রদানকর্তা ও দেবতাদের নাম উচ্চারণ করে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে কন্যা সম্প্রদান পর্ব শেষ হয়।
গায়ে হলুদ মূলত দেহশুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বর-কনের স্ব-স্ব বাড়িতে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠিত হয়। বর বা কনেকে একটি আসনের উপর বসানোর 1 পর বড়রা ধান, দূর্বা প্রভৃতি দিয়ে আশীর্বাদ করে আর ছোটরা নমস্কার 1 করে গালে, কপালে, হাতে হলুদ মাখিয়ে দেয়। সাথে সাথে মিষ্টিমুখও করানো হয়। সুদৃঢ় বিবাহিত জীবন, নবদম্পতির সুখ-শান্তি কামনা করাই এ অনুষ্ঠানের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
বিবাহের সময় বরপক্ষকে কন্যা পক্ষ থেকে নগদ অর্থসম্পদ দিতে হয় পণ বা যৌতুক হিসেবে। যা একটি সামাজিক ব্যাধি। অনেক সময় কন্যার পিতার সামর্থ্য না থাকলেও ঋণগ্রস্ত হয়ে বাধ্যতামূকভাবে দিতে হয়। আর না দিলে অনেক সময় বিবাহ ভেঙে যায় আর না হয় বিবাহের পর বধূকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যাচার করা হয়। যার ফলে অনেক মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। পিতা কন্যার দুর্দশার কথা চিন্তা করে ধারদেনা করে পণ প্রদান করে নিজে আরও বিপদের মধ্যে পড়ে। তাই বলা যায় পণপ্রথা অধর্ম।
গায়ে হলুদ হিন্দু বিবাহ পর্বের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব। এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এটি মূলত দেহশুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান। কাঁচা হলুদের সাথে মেথি, গিলা, সুন্ধা, সরিষা, চন্দন প্রভৃতি থাকে। এগুলো সবই সৌভাগ্যের প্রতীক। সুদৃঢ় বিবাহিত | জীবন, নবদম্পতির সুখ-শান্তি কামনা করাই এ অনুষ্ঠানের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
সোহাগজল পর্বটি একটি মেয়েলি আচার। এ পর্বে বিয়ের আগের দিন ত্রয়োতী (সদবা) নারীরা সাতঘাট ঘুরে জল এনে সযত্নে । রেখে দেয়। দুজনের মুকুট থেকে সামান্য একটু শোলা নিয়ে জলে ছেড়ে দেয়া হয়। উপস্থিত রমনীগণের মধ্যে নেতৃস্থানীয় একজন ঐ শোলার টুকরা দুটি ভাসমান অবস্থায় জলে আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে স্রোতের সৃষ্টি করে। স্রোতে ঘুরতে ঘুরতে যখন শোলার টুকরা দুটি একত্র হয় তখন সবাই উলুধ্বনি দিয়ে আনন্দে হৈ-হুল্লোড় করতে থাকে। তারপর ঐ পবিত্র জল সবার মাথায় ও বুকে ছিটিয়ে সোহাগ করা হয়। এ পবিত্র জলকেই বলা হয় সোহাগজল।
বিবাহ কার্য সমাপ্ত হওয়ার পর বাসি বিয়ের পর্বে উঠানে বেদি, নকল পুকুর তৈরি করা হয়। এতে দুধ অথবা জল ঢেলে তার মধ্যে স্বর্ণ আংটি নিয়ে লুকোচুরি খেলা হয়। এটি মূলত মেয়েলি আচার। নতুন স্বামী আংটি লুকিয়ে রাখবে আর নতুন বউ তা খুঁজে বের করবে। আবার স্ত্রী লুকিয়ে রাখলে স্বামী খুঁজে বের করে। এটাই হচ্ছে বিবাহের আংটি খেলা।
আত্মা দেহ থেকে নির্গত হলে দেহটি একটি জড়বস্তুতে পরিণত হয় এবং প্রাকৃতিক নিয়মে ধীরে ধীরে এটি পচতে শুরু করে। ভূপৃষ্ঠে পড়ে থাকলে তখন ভীতির সঞ্চার হয় এবং পরিবেশ নষ্ট হয়। তাই শাস্ত্রে মৃতদেহের সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শবদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া একটি ধর্মীয় বিধিবিধান। তাই এটি সংস্কার করা প্রয়োজন।
আত্মা দেহ থেকে নির্গত হলে দেহটি একটি জড়বস্তুতে পরিণত হয় এবং প্রাকৃতিক নিয়মে ধীরে ধীরে এটি পচতে শুরু করে। ভূপৃষ্ঠে পড়ে থাকলে তখন ভীতির সঞ্চার হয় এবং পরিবেশ নষ্ট হয়। তাই শাস্ত্রে মৃতদেহের সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শবদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া একটি ধর্মীয় বিধিবিধান।
পুরক পিন্ড হচ্ছে অশৌচ পালনকালে মৃত ব্যক্তির উদ্দ্যেশে প্রদানের একটি বিধান। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনে ও দশম দিনে যে পিন্ড প্রদান করা হয় তাই হচ্ছে পূরক পিন্ড। পূরক পিন্ড দিতে। হয় মোট দশটি। এসব পিন্ড প্রদান করা শ্রাদ্ধাধীকারীর একান্ত কর্তব্য।
মৃত্যুর পর দেহটিকে বস্ত্রাবৃত ও মালা চন্দনাদি দ্বারা বিভূষিত করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মৃতদেহের মাথা দক্ষিণ দিকে রেখে তাকে কুশের উপর শয়ন করানো হয় এবং দাহাধিকারী স্নান করে এসে মৃতদেহের গায়ে তেল ও কাঁচা হলুদ মেখে তাকে স্নান করান।
'অন্ত্য' ও 'ইষ্টি' এ দুটি শব্দ মিলেই অন্ত্যেষ্টি শব্দটি গঠিত। 'অন্ত্য' শব্দের অর্থ শেষ এবং 'ইষ্টি' শব্দের অর্থ যজ্ঞ। সুতরাং অন্ত্যেষ্টি শব্দের অর্থ 'শেষযজ্ঞ' অর্থাৎ অগ্নিতে মৃতদেহকে আহুতি দেওয়া।
অশৌচ পালন শাস্ত্রীয় বিধিবিধান এবং সামাজিক দিক থেকেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মাতাপিতা বা জাতিবর্গের মৃত্যুতে আমাদের অশৌচ হয়। প্রিয়জনের মৃত্যুতে মন শোকে আচ্ছন্ন হওয়ায় আমাদের চিত্ত সাধনভজনের উপযোগী থাকে না। এসময় বিচলিত মনে ঈশ্বরকে আরাধনায় পূর্ণ একাগ্রতা আসে না। এজন্য শান্তমন এবং সময়ের প্রয়োজন। অশৌচ পালন অবশ্য কর্তব্য। এতে ধীরে ধীরে মন শান্ত হয় এবং মনে প্রশান্তি ফিরে আসে। এছাড়া মৃত ব্যক্তির পরিবার ও জাতিবর্গ অশৌচ পালন করে মৃতের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।
'অশৌচ' শব্দের অর্থ শুচিতা বা পবিত্রতার অভাব। মাতা-পিতা বা জ্ঞাতিবর্গের মৃত্যুতে অশৌচ দু'প্রকার। কেউ জন্মগ্রহণ করলে জননাশৌচ এবং মৃত্যুর পর মরণাশৌচ হয়। অশৌচান্তে মস্তক মুণ্ডন করে নববস্ত্র পরিধান করা হয় এবং এর পরদিন শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়।
অশৌচ পালন শাস্ত্রীয় বিধিবিধান এবং সামাজিক দিক থেকেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মাতাপিতা বা জাতিবর্গের মৃত্যুতে আমাদের অশৌচ হয়। প্রিয়জনের মৃত্যুতে মন শোকে আচ্ছন্ন হওয়ায় আমাদের চিত্ত সাধনভজনের উপযোগী থাকে না।
এসময় বিচলিত মনে ঈশ্বরকে আরাধনায় পূর্ণ একাগ্রতা আসে না। এজন্য শান্তমন এবং সময়ের প্রয়োজন। এভাবে একটা নির্দিষ্ট সময় অশৌচ পালন অবশ্য কর্তব্য। এতে ধীরে ধীরে মন শান্ত হয় এবং মনে প্রশান্তি ফিরে আসে। এছাড়া মৃত ব্যক্তির পরিবার ও জাতিবর্গ অশৌচ পালন করে মৃতের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।
'চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ' উক্তিটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন। 'চাতুর্বর্ণাং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ- অর্থাৎ গুণ
ও কর্মের বিভাগ অনুসারে ভগবান নিজেই চারটি বর্ণ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) সৃষ্টি করেছেন। ব্রাহ্মণ সন্তান হলেই যে ব্রাহ্মণ বলে গণ্য হবে এমন নয়। সত্ত্বগুণ প্রভাবিত কোনো শূদ্রের সন্তানও ব্রাহ্মণ পদবাচ্য হতে পারেন। আবার ব্রাহ্মণ সন্তান তমঃ গুণে প্রভাবিত হলে সে শূদ্র বলে গণ্য হবেন। সুতরাং বলা যায়, বর্ণভেদ কোনো জন্মগত ও জাতিগত নয়, বরং গুণ ও কর্মের প্রভাব।
আদ্যশ্রাদ্ধ হচ্ছে মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো অনুষ্ঠান। আদ্যশ্রাদ্ধের পূর্ণ নাম আদ্য একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ। একজন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে এই শ্রাদ্ধ করা হয় বলে একে একোদ্দিস্ট শ্রাদ্ধ বলে। অর্থাৎ আদ্যশ্রাদ্ধ হলো একজনের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার সাথে দান করা।
আদ্যশ্রাদ্ধের পূর্ণনাম আদ্য একোদ্দিস্ট শ্রাদ্ধ।
একজন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে এ শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করা হয় বলে এর নাম একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ। এখানে মাত্র একজনের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার সাথে দান করা হয়। এ সময় আসন, ছাতা, অন্ন, জল, তাম্বুল, মালা, বিছানা প্রভৃতি মৃত ব্যক্তির নামে মন্ত্রোচ্চারণসহ উৎসর্গ করা হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে 'জন্মভেদে নয়, বরং কর্মভেদেই বর্ণ বিভাজন'- অর্থাৎ যে যে রকম পেশায় নিয়োজিত তার বর্ণটি সে অনুসারে হয়। ব্রাহ্মণ সন্তান হলেই যে একজন ব্রাহ্মণ বলে গণ্য হবে, এমনটি নয়। সত্ত্বগুণ প্রভাবিত কোনো শূদ্রের সন্তানও ব্রাহ্মণ পদবাচ্য হতে পারবেন। আবার কোনো ব্রাহ্মণ সন্তান তমঃ গুণে প্রভাবিত হলে সে শুদ্র বলে গণ্য হবেন।
সুতরাং বলা যায়, 'জন্মভেদে নয়, বরং কর্মভেদেই বর্ণ বিভাজন।'
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রথমে যে শ্রাদ্ধ করণীয় তাকে বলা হয় আদ্যশ্রাদ্ধ। আদ্যশ্রাদ্ধের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কেউ মারা গেলে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন যেমন দেখতে আসেন তেমনি মৃত ব্যক্তির আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তার পরিবার, জ্ঞাতিবর্গের -দুঃখের সাথে একাত্ম হন। এতে মানুষের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক বন্দন সুদৃঢ় হয়। পাশাপাশি এ অনুষ্ঠান আত্মীয়-স্বজনের একটি মিলনমেলাও ঘটে। এখানে একজনের প্রতি আরেকজনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বেড়ে যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সামাজিকতার বীজ - অঙ্কুরিত হয়।
Related Question
View Allঐতিহ্য অনুসরণ করে হিন্দুদের সমগ্র জীবনে যেসব মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয়, সেসব অনুষ্ঠানকে সংস্কার বলা হয়।
স্মৃতিশাস্ত্রে দশবিধ সংস্কারের উল্লেখ আছে। তন্মধ্যে অন্নপ্রাশন অন্যতম। মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের জন্য অন্নপ্রাশন করা হয়। পুত্রের ষষ্ঠ মাসে এবং কন্যার পঞ্চম, অষ্টম বা দশম মাসে প্রথম আত্মভোজনের নাম অন্নপ্রাশন।
উদ্দীপকের মিতার বিবাহ পদ্ধতিটি হচ্ছে ব্রাহ্মবিবাহ। কারণ এ বিবাহে মিতার সম্মতিতে পিতা নিজে বরের হাতে মেয়েকে সম্প্রদান করেন।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে সমগ্র জীবনে যে দশটি সংস্কার বা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান রয়েছে তন্মধ্যে বিবাহ শ্রেষ্ঠ। স্মৃতিশাস্ত্রের মনুসংহিতায় আট প্রকার বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম, দৈব, আট ও প্রাজাপত্য উল্লেখযোগ্য। বর্তমান সমাজে ব্রাহ্মবিবাহ প্রচলিত। উদ্দীপকের মিতার বিবাহ পদ্ধতিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার বাবা বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন করে এবং অলঙ্কার দ্বারা সজ্জিত করে বিদ্বান ও সদাচারী বরকে স্বয়ং আমন্ত্রণ করে মিতাকে বরের হাতে সম্প্রদান করেন যা ব্রাহ্মবিবাহের কার্যকলাপকে নির্দেশ করে। সুতরাং আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি মিতার বিবাহ পদ্ধতিটি ব্রাহ্মবিবাহ।
বিবাহের মূল পর্ব হলো সম্প্রদান পর্ব। বিবাহের নির্দিষ্ট পোশাক পরে বর কনেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। সম্প্রদানকর্তা দেবতাদের নাম উচ্চারণ করে, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিসহ আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে কন্যা সম্প্রদান করেন। সম্প্রদান পর্বের পর সেখানে বর্গাকার যজ্ঞক্ষেত্র তৈরি করা হয়।
বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে মনের অহংকার, মান অভিমান, হিংসা বিদ্বেষ, ঘৃণাসহ সকল অসাধু চিন্তারূপী ঘি-মাখা আমপাতা আগুনে আহুতি দিতে হয়। এরপর দেবপুরোহিত অগ্নিকে পর পর সাতবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করতে হয়। এ যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে অগ্নিদেবের কাছে বর কনে আমৃত্যু বাঁধা হয়ে থাকে। মিতার বিবাহ কার্য সম্পাদনেও পুরোহিত মন্ত্রপাঠ ও যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহকার্য সম্পন্ন করেন। তাছাড়া এ যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে নবদম্পতি বিশুদ্ধ নব-জীবন লাভ করে। তাই বিবাহ কার্যসম্পাদনে যজ্ঞানুষ্ঠানের যৌক্তিকতা অপরিসীম।
বিবাহের মূল পর্ব হলো সম্প্রদান পর্ব। বিবাহের নির্দিষ্ট পোশাক পরে বর কনেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। সম্প্রদানকর্তা দেবতাদের নাম উচ্চারণ করে, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিসহ আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে কন্যা সম্প্রদান করেন। সম্প্রদান পর্বের পর সেখানে বর্গাকার যজ্ঞক্ষেত্র তৈরি করা হয়।
বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে মনের অহংকার, মান অভিমান, হিংসা বিদ্বেষ, ঘৃণাসহ সকল অসাধু চিন্তারূপী ঘি-মাখা আমপাতা আগুনে আহুতি দিতে হয়। এরপর দেবপুরোহিত অগ্নিকে পর পর সাতবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করতে হয়। এ যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে অগ্নিদেবের কাছে বর কনে আমৃত্যু বাঁধা হয়ে থাকে। মিতার বিবাহ কার্য সম্পাদনেও পুরোহিত মন্ত্রপাঠ ও যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহকার্য সম্পন্ন করেন। তাছাড়া এ যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে নবদম্পতি বিশুদ্ধ নব-জীবন লাভ করে। তাই বিবাহ কার্যসম্পাদনে যজ্ঞানুষ্ঠানের যৌক্তিকতা অপরিসীম।
পাঠ শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা গুরুগৃহ থেকে নিজগৃহে ফিরে আসার সময় যে অনুষ্ঠান হয় তাকে সমাবর্তন বলে।
নারীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো সিঁথিতে বিবাহ চিহ্ন পরানো। সম্প্রদানপর্ব ও যজ্ঞানুষ্ঠান শেষে বর কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। এটি একজন হিন্দু নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এরপর থেকেই কন্যা অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর জীবিতাবস্থায় সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পারবে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!