খতিয়ানের হিসাবগুলোর গাণিতিক নির্ভুলতা যাচাই করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনে একখানা পৃথক খাতায় বা কাগজে সকল হিসাবের উদ্বৃত্তগুলোকে ডেবিট ও ক্রেডিট এই দুই ভাগে বিভক্ত করে যে বিবরণী প্রস্তুত করা হয়, তাকেই রেওয়ামিল বলে।
কোনো নির্দিষ্ট দিনে হিসাবের উদ্বৃত্তগুলোকে ডেবিট ও ক্রেডিট এ দুই ভাগে বিভক্ত করে রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। রেওয়ামিলের ডেবিট দিকের যোগফল ক্রেডিট দিকের যোগফলের সমান হলে ধরে নেওয়া হয় খতিয়ান নির্ভুল। দুইদিকের যোগফল সমান না হলে বুঝতে হবে খতিয়ানে ভুল হয়েছে। এভাবে ডেবিট এবং ক্রেডিটের সমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে রেওয়ামিল গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করে।
আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের পূর্বে হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করতে রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। রেওয়ামিল প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক নয়। International Accounting Standard Commitee (IASC) কর্তৃক প্রদত্ত রেওয়ামিলের কোনো স্বীকৃতি ছকও নেই। আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতিতে ভুলত্রুটি এড়ানোর জন্য রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। অর্থাৎ বলা যায়, রেওয়ামিল হিসাবের কোনো অংশ নয়।
প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান বছর শেষে তার আর্থিক কার্যাবলির ফলাফল নির্ণয় করার জন্য আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করে থাকে। সঠিক ফলাফল পেতে হলে অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া উচিত যে, সারা বছরের লেনদেনগুলো হিসাবের বইতে নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সে কারণে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের পূর্বে হিসাবের বইয়ের নির্ভুলতা যাচাই করার জন্য রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়।
রেওয়ামিল প্রস্তুতের দুটি উদ্দেশ্য হলো-
(i)জাবেদা ও খতিয়ানে লেনদেনগুলো সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে কি না তা যাচাই করা।
(ii) আর্থিক বিবরণী তথা বিশদ আয় বিবরণী ও আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত সহজতর করা।
আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের পূর্বে খতিয়ানের হিসাবগুলোর গাণিতিক নির্ভুলতা যাচাই করে নিতে হয়। হিসাব গাণিতিকভাবে শুদ্ধ না থাকলে প্রতিষ্ঠানের সঠিক আর্থিক তথ্য পাওয়া যায় না। তাই আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের পূর্বে হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করার জন্য রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়।
দু'তরফা দাখিলা পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতিটি লেনদেন জাবেদা বইতে লিপিবদ্ধ করা হয়। ফলে প্রতিটি লেনদেনের ডেবিট ও ক্রেডিট টাকার পরিমাণ সমান হয়। এরপর জাবেদা বই হতে খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। আর খতিয়ানের উদ্বৃত্ত নিয়ে রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। ফলে খতিয়ানের প্রতিটি উদ্বৃত্ত সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হলে রেওয়ামিলের দুই পক্ষ মিলে যায়।
রেওয়ামিল তৈরি করার জন্য সর্বপ্রথম লেনদেনগুলোকে তারিখের ক্রমানুসারে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয়। এরপর প্রত্যেকটি হিসাবের আলাদা আলাদা শিরোনামের মাধ্যমে খতিয়ানে স্থানান্তর করা হয়। খতিয়ানের সব হিসাবের উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয়। সবশেষে, একটি পৃথক কাগজে বা খাতায় ডেবিট উদ্বৃত্তগুলোকে ডেবিট দিকে এবং ক্রেডিট উদ্বৃত্তগুলোকে ক্রেডিট দিকে লিপিবদ্ধ করে রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়।
সমাপনী মজুদ পণ্যকে রেওয়ামিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। কারণ প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য এবং ক্রয়কৃত পণ্যের একটি অংশই হলো সমাপনী মজুদ পণ্য। এছাড়া সমাপনী মজুদ পণ্য খতিয়ানের উদ্বৃত্ত নয়। ফলে সমাপনী মজুদ পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করলে রেওয়ামিল শুদ্ধ হবে না।
সমন্বিত ক্রয় বা বিক্রীত পণ্যের ব্যয় থাকলে সমাপনী মজুদ পণ্য রেওয়ামিলের ডেবিট কলামে অন্তর্ভুক্ত হয়। সাধারণত রেওয়ামিল প্রস্তুতিতে সমাপনী মজুদ পণ্য আসে না। কিন্তু সমন্বিত ক্রয় = প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য + নিট ক্রয়- সমাপনী মজুদ পণ্য হওয়ায় সমাপনী মজুদকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য একটি ব্যয় হিসাব। তাই সাধারণত এটি রেওয়ামিলে ডেবিট কলামে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু রেওয়ামিলে যখন সমন্বিত ক্রয় বা বিক্রীত পণ্যের ব্যয় থাকবে তখন প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য আসবে না। এর কারণ হলো সমন্বিত ক্রয়ের মধ্যেই প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে।
সমন্বিত ক্রয় রেওয়ামিলে ডেবিট কলামে অন্তর্ভুক্ত হয়। সমন্বিত ক্রয় নির্ণয়ের সূত্র হলো প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য + নিট ক্রয়- সমাপনী মজুদ পণ্য। অর্থাৎ, সমন্বিত ক্রয়ে প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য ও নিট ক্রয় অন্তর্ভুক্ত থাকে কিন্তু সমাপনী মজুদ পণ্য বাদ দেওয়া হয়। তাই রেওয়ামিল প্রস্তুতের সময় সমন্বিত ক্রয় থাকলে সমাপনী মজুদ পণ্য আসবে। কিন্তু প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য ও নিট ক্রয় অন্তর্ভুক্ত হবে না
সাধারণত প্রারম্ভিক মজুদ পণ্যকে খরচ হিসেবে গণ্য করে রেওয়ামিলের ডেবিট দিকে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর সমাপনী মজুদ পণ্য লিপিবদ্ধ করা হয় না। কেননা সমাপনী মজুদ পণ্য প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য এবং ক্রয়কৃত পণ্যের অংশবিশেষ। কিন্তু যখন সমন্বিত ক্রয় বা বিক্রীত পণ্যের ব্যয় রেওয়ামিলের অন্তর্ভুক্ত হয় তখন প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য লিপিবদ্ধ হয় না। তখন সমাপনী মজুদ পণ্যকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করে রেওয়ামিলের ডেবিট দিকে লিপিবদ্ধ করতে হয়। এভাবে মজুদ পণ্য লিপিবদ্ধকরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।
রেওয়ামিল প্রস্তুতিতে হাতে নগদ, ব্যাংক জমা, দেনাদার, পাওনাদার প্রভৃতি হিসাবের সমাপনী উদ্বৃত্ত অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এসব হিসাবের প্রারম্ভিক উদ্বৃত্ত কখনো রেওয়ামিলে অন্তর্ভুক্ত হবে না। এর মূল কারণ হলো, এই হিসাবগুলোর সমাপনী উদ্বৃত্তের সাথে প্রারম্ভিক উদ্বৃত্ত সমন্বিত থাকে। ফলে প্রারম্ভিক এবং সমাপনী উভয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হলে রেওয়ামিল শুদ্ধ হবে না।
সম্পদের বিপরীতে বিভিন্ন সঞ্চিতি সৃষ্টি করা হয়। যেমন-কুঋণ সঞ্চিতি, প্রাপ্য বিলের বাট্টা সঞ্চিতি, দেনাদার বাট্টা সঞ্চিতি ইত্যাদি। এসব সঞ্চিতি সম্পদের পরিমাণ হ্রাস করে। তাই রেওয়ামিলের এই সঞ্চিতিগুলো ক্রেডিট পার্শ্বে বসে।
দায়ের বিপরীতে কিছু সঞ্চিতি ধার্য করা হয়। যেমন-পাওনাদারের বাট্টা সঞ্চিতি, প্রদেয় বিলের বাট্টা সঞ্চিতি ইত্যাদি। এই সঞ্চিতিগুলো রেওয়ামিলের ডেবিট দিকে বসে। এই সঞ্চিতিগুলো দিয়ে মূলত দায় হ্রাস পেতে পারে এমন সম্ভাবনাকে বোঝায়। তবে হিসাববিজ্ঞানের "রক্ষণশীলতার নীতি" অনুযায়ী দায়ের বিপরীতে সঞ্চিতি ধার্য অনুচিত। তাই দায়ের বিপরীতে সঞ্চিতি ধার্য পরিহার করাই উত্তম।
হিসাববিজ্ঞানের 'রক্ষণশীলতার প্রথা' অনুযায়ী দায়ের বিপরীতে সঞ্চিতি ধার্য অনুচিত। যদি হিসাবের বইতে ধার্যকৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তবে রেওয়ামিলের ডেবিট কলামে লেখা যেতে পারে। দায়ের বিপরীতে সঞ্চিতি ধার্য পরিহার করাই উত্তম।
দায়ের বিপরীতে বিভিন্ন সঞ্চিতি সৃষ্টি করা যায়। যেমন-পাওনাদারের বাট্টা সঞ্চিতি, প্রদেয় বিলের বাট্টা সঞ্চিতি ইত্যাদি। এই সঞ্চিতিগুলো দায়ের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, দায়ের স্বাভাবিক ব্যালেন্স ক্রেডিট হওয়ায় তার হ্রাসকে ডেবিট দিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে 'রক্ষণশীলতার নীতি' অনুসারে দায়ের বিপরীতে সঞ্চিতি ধার্য না করাই উত্তম।
রেওয়ামিলে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চিতি যেমন কুঋণ সঞ্চিতি, দেনাদারের বাট্টা সঞ্চিতি, প্রাপ্য বিলের বাট্টা সঞ্চিতি, প্রদেয় বিলের বাট্টা সঞ্চিতি, পাওনাদারের বাট্টা সঞ্চিতি অন্তর্ভুক্ত হয়। এক্ষেত্রে সম্পদের বিপরীতে সৃষ্ট সঞ্চিতি যেমন: কুঋণ সঞ্চিতি, দেনাদারের বাট্টা সঞ্চিতি, প্রাপ্য বিলের বাট্টা সঞ্চিতি রেওয়ামিলের ক্রেডিট দিকে বসে। অন্যদিকে, দায়ের বিপরীতে সৃষ্ট সঞ্চিতি যেমন: পাওনাদারের বাট্টা সঞ্চিতি, প্রদেয় -বিলের বাট্টা সঞ্চিতি রেওয়ামিলের ডেবিট দিকে বসে।
কিছু হিসাবের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত বা প্রদত্ত কোনোটিই উল্লেখ করা থাকে না। যেমন- ভাড়া, সুদ, বাট্টা, কমিশন ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে এই হিসাবগুলোকে প্রদত্ত হিসেবে ধরে নিতে হবে। প্রদত্ত ভাড়া, প্রদত্ত সুদ, প্রদত্ত বাট্টা, প্রদত্ত কমিশন প্রতিষ্ঠানের খরচ বা ব্যয়। তাই এসব হিসাব রেওয়ামিলের ডেবিটে বসবে।
সম্ভাব্য দায় ও সম্ভাব্য সম্পদ বলতে সেই সমস্ত দায় ও সম্পদকে বোঝায় যা পাওয়া যেতে পারে অথবা পরিশোধ করতে হতে পারে। সম্ভাব্য দায় ও সম্ভাব্য সম্পদ নিশ্চিতরূপে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা যায় না। তাই এগুলো রেওয়ামিলের ভেতর অন্তর্ভুক্ত হয় না। কিন্তু রেওয়ামিলের নিচে পদটীকায় সম্ভাব্য দায় এবং সম্পদ উল্লেখ করা যায়।
রেওয়ামিলে অন্তর্ভুক্ত হবে না, এমন পাঁচটি লেনদেন হলো-প্রারম্ভিক হাতে নগদ, প্রারম্ভিক ব্যাংক জমা, সমাপনী মনিহারি, সম্ভাব্য সম্পদ, সম্ভাব্য দায়।
সতর্কতা অবলম্বনের পরও অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু ভুল হতে পারে যার কারণে রেওয়ামিল অমিল হয়। এই ভুলগুলো হলো বাদ পড়ার ভুল, লেখার ভুল, টাকার অঙ্কে ভুল, খতিয়ানের উদ্বৃত্ত নির্ণয়ে ভুল, খতিয়ানের উদ্বৃত্ত রেওয়ামিলে স্থানান্তরে ভুল রেওয়ামিলের ডেবিট ও ক্রেডিট দিকের যোগফল নির্ণয়ে ভুল। খুব সহজেই এই ভুলগুলো উদঘাটন করে সংশোধন করা যায়।
রেওয়ামিল মিলে যাওয়া বলতে কেবল ডেবিট ও ক্রেডিটের সামগ্রিক পরিমাণ সমান হওয়া বোঝায়। যা ভুল শনাক্ত করার সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয় না। সাধারণত নীতিগত ভুল ও করণিক ভুল হলেও রেওয়ামিল মিলে যায়। ফলে হিসাবের নির্ভুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এগুলোকে রেওয়ামিলের অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা বলে। এভাবে রেওয়ামিল মিলে গেলেও ভুল থেকে যায়।
কিছু ভুল রয়েছে যা রেওয়ামিলে ধরা পড়ে না। রেওয়ামিলে এসব ভুল প্রধানত দুই ধরনের। যথা- ১. করণিক ভুল; ২. নীতিগত ভুল। হিসাবরক্ষক অসাবধানতাবশত যে ভুলগুলো করেন তাকে করণিক ভুল বলে। করণিক ভুলগুলো হলো- বাদ পড়ার ভুল, লেখার ভুল, বেদাখিলার ভুল। আবার, নীতিগত ভুল হলো ঐ সব ভুল যা হিসাববিজ্ঞানের স্বীকৃত নীতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। উভয় ভুলের ক্ষেত্রেই রেওয়ামিল মিলে যাবে।
রেওয়ামিলে ধরা পড়ে এমন দুটি ভুল হলো-
(১) বাদ পড়ার ভুল: জাবেদা থেকে খতিয়ানে স্থানান্তরের সময় কোনো একটি হিসাব বাদ পড়ে গেলে অথবা শুধু একটি পক্ষ হিসাবভুক্ত করলে অথবা খতিয়ানের উদ্বৃত্ত রেওয়ামিলে স্থানান্তর না করা হলে।
(২) লেখার ভুল: জাবেদা থেকে খতিয়ানে স্থানান্তরের সময় যদি এক হিসাবের ডেবিট অন্য হিসাবের ক্রেডিট দিকে অথবা ক্রেডিট হিসাবকে ডেবিট দিকে লেখা হলে অথবা খতিয়ানে দুবার লেখা হলে।
সাধারণত রেওয়ামিল মিলে গেলে ধরে নেওয়া হয় যে হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা ঠিক আছে। কিন্তু হিসাবের মধ্যে এমন কিছু ভুল থেকে যায়, যেগুলো রেওয়ামিলের মাধ্যমে ধরা পড়ে না। এগুলোকে রেওয়ামিলের অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা বলে।
রেওয়ামিলের সীমাবদ্ধতাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
যথা- (i) করণিক ভুল,
(ii) নীতিগত ভুল।
করণিক ভুলকে চার ভাগে ভাগ করা। যথা- (i) বাদ পড়ার ভুল, (ii) লিখার ভুল, (iii) বেদাখিলার ভুল, (iv) পরিপূরক ভুল।
লেনদেন সংঘটিত হওয়ার পর তা ভুলে প্রাথমিক হিসাবের বইয়ে লেখা না হলে খতিয়ানের কোনো হিসাবেই লিপিবদ্ধ হবে না। আবার লেনদেন প্রাথমিক বইয়ে লিপিবদ্ধ হলেও তা খতিয়ানের কোনো দিকেই তথা ডেবিট বা ক্রেডিট কোথাও লিপিবদ্ধ করা হলো না। এই জাতীয় ভুলকেই বাদ পড়ার ভুল বলা হয়। এই ধরনের ভুলের কারণে রেওয়ামিলের উভয় দিকে কম টাকা লেখা হবে, ফলে রেওয়ামিল মিলে যাবে কিন্তু ভুল থেকে যাবে।
প্রাথমিক হিসাবের বই হতে খতিয়ানে স্থানান্তরের সময় একটি হিসাবের পরিবর্তে অন্য একটি হিসাবের সঠিক দিকে টাকার অঙ্কে লেখা হলে যে ভুল হয় তাকে বেদাখিলার ভুল বলে। এই জাতীয় ভুল রেওয়ামিলে ধরা পড়বে না। যেমন- কালাম ট্রেডার্সের নিকট হতে ২০,০০০ টাকা নগদ পাওয়া গেল। এটা ডেবিট দিকে ঠিকই লেখা হয়েছে কিন্তু ক্রেডিট দিকে কালাম ট্রেডার্সের পরিবর্তে সালাম ট্রেডার্সের হিসাবে ক্রেডিট করা হয়েছে। এতেও রেওয়ামিল মিলে যাবে।
হিসাবরক্ষকের অজ্ঞাতসারে একটি ভুল অন্য একটি ভুল দাখিলা দ্বারা উভয় দিকে সমান হয়ে গেলে উহাকে স্বয়ংসংশোধক বা পরিপূরক ভুল বলা হয়। যেমন- শিহাব ট্রেডার্স হিসাবে ৫,০০০ টাকা ডেবিট হওয়ার কথা ছিল। ভুলে তা ৫০০ টাকা ডেবিট হয়েছে। আবার জামিল ট্রেডার্স হিসাবে ৫,০০০ টাকা ক্রেডিট হওয়ার কথা ছিল। ভুলে ৫০০ টাকা ক্রেডিট করা হয়েছে। ফলে উভয় হিসাবে ৪,৫০০ টাকা কম লেখা হয়েছে। কিন্তু এই ভুলের জন্য রেওয়ামিল মিলে যাবে।
হিসাববিজ্ঞান জ্ঞানের অজ্ঞতার কারণে অথবা হিসাববিজ্ঞানের স্বীকৃত রীতিনীতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে যে ভুল সংঘটিত হয়ে থাকে, তাকেই নীতিগত ভুল বলে। নীতিগত ভুল নিম্নোক্তভাবে হতে পারে। যেমন- মূলধনজাতীয় ব্যয়কে মুনাফাজাতীয় এবং মুনাফাজাতীয় ব্যয়কে মূলধনজাতীয় ব্যয় হিসাবে লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে নীতিগত ভুল হয় এবং এই ভুলের কারণে রেওয়ামিল মিলে যাবে কিন্তু ভুল থেকে - যাবে। কারণ যেকোনো প্রকার খরচেরই ডেবিট উদ্বৃত্ত হয়ে থাকে।
অনিশ্চিত হিসাবের মাধ্যমে রেওয়ামিলের ডেবিট-ক্রেডিট পাশের গরমিল দূর করা হয়। রেওয়ামিলের মূল উদ্দেশ্য গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করা। কিন্তু কিছু ভুল-ত্রুটির কারণে অনেক সময় এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তখন রেওয়ামিলের উভয় পাশ সমান করার সাময়িক সময়ের জন্য অনিশ্চিত হিসাব খোলা হয়। এভাবে রেওয়ামিলের গরমিল দূর করা হয়।
রেওয়ামিলের দুদিকের যোগফল অসমান হলে হিসাব বইয়ের ভুল খুঁজে বের করা দরকার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এ ভুল খুঁজে বের করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ হতে পারে এবং আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করার কাজটি ততদিন স্থগিত রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। এমতাবস্থায় রেওয়ামিলের দুদিকের যোগফলের পার্থক্যটি অনিশ্চিত হিসাবে দেখিয়ে সাময়িকভাবে রেওয়ামিলের উভয়দিকের যোগফলের সমতা আনা হয়। অর্থাৎ, রেওয়ামিলের দুই পার্শ্ব সমান করার জন্য যে হিসাব খোলা হয়, তাকেই অনিশ্চিত হিসাব বলে।
রেওয়ামিলের উভয় পার্শ্ব সমান করার জন্য সাময়িকভাবে অনিশ্চিত হিসাব খোলা হয়। ভুল উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত এই সাময়িক বা অস্থায়ী হিসাব বন্ধ করা হয় না। পরবর্তীতে ভুল খুঁজে পেলে সংশোধনী জাবেদার মাধ্যমে ভুল সংশোধন করে অনিশ্চিত হিসাব বন্ধ করা হয়।
খতিয়ানের ডেবিট ও ক্রেডিট ব্যালেন্সসমূহের তালি রেওয়ামিল বলে।
রেওয়ামিল হলো খতিয়ান হিসাবসমূহের জেরের বা বিবরণী।
রেওয়ামিল হিসাবচক্রের পঞ্চম স্তর।
রেওয়ামিল প্রকৃতপক্ষে কোনো হিসাব নয়।
রেওয়ামিল প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক নয়।
রেওয়ামিল প্রস্তুতের উদ্দেশ্য হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করা।
রেওয়ামিল তৈরি করা হয় নির্দিষ্ট হিসাবকাল শেষে বা কোনো নির্দিষ্ট তারিখে।
খতিয়ানের জের গাণিতিকভাবে নির্ভুল ধরা হয় রেওয়ামিল মিললে।
রেওয়ামিলের মাধ্যমে সহজেই উদঘাটিত হয় হিসাব সংরক্ষণের ভুল-ত্রুটি।
জাবেদা ও খতিয়ানে লেনদেনগুলোর লিপিবদ্ধকরণ যাচাই রেওয়ামিলের মুখ্য উদ্দেশ্য।
বিশদ আয় বিবরণী ও আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত সহজ করে রেওয়ামিল।
জাবেদা ও খতিয়ানের ভুল-ত্রুটি উদঘাটন ও সংশোধন করে রেওয়ামিল।
আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতে সময় ও শ্রমের অপচয়রোধ রেওয়ামিলের উদ্দেশ্য।
ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায় রেওয়ামিলের সাহায্যে
রেওয়ামিল লিপিবদ্ধ করা হয় জাবেদা ও খতিয়ান করার পর।
সমাপনী মজুদ বসে না রেওয়ামিলে।
কোনো নির্দিষ্ট ছক নেই রেওয়ামিলের।
চলতি সম্পদ ও চলতি দায়ের প্রারম্ভিক উদ্বৃত্ত অন্তর্ভুক্ত হয় না। রেওয়ামিলে।
দায়ের বিপরীতে সঞ্চিতি ধার্য অনুচিত রক্ষণশীল নীতি অনুযায়ী।
হিসাবের সাথে প্রদত্ত বা প্রাপ্ত উল্লেখ না থাকলে প্রদত্ত ধরতে হয়।
বিক্রয় খতিয়ানের উদ্বৃত্তকে বিবেচনা করা হয় দেনাদার প্রাপ্য হিসাবে।
ক্রয় খতিয়ানের উদ্বৃত্তকে বিবেচনা করা হয় পাওনাদার/ প্রদেয় হিসাবে।
সম্ভাব্য দায় ও সম্ভাব্য সম্পদ অন্তর্ভুক্ত হয় না রেওয়ামিলে।
রেওয়ামিলের ছকে মোট ঘরের সংখ্যা ৫টি।
রেওয়ামিলের ডেবিট ঘরে বসে যাবতীয় সম্পত্তি, খরচ, ক্ষতি, অগ্রিম প্রদত্ত খরচ, প্রাপ্য আয়, অবচয়, অবলোপন, ক্রেডিট জেরের সুদ ইত্যাদি।
রেওয়ামিলে ক্রেডিট ঘরে বসে যাবতীয় দায়, আয়, লাভ, প্রাপ্ত আয়, প্রদেয় খরচ, অগ্রিম আয়, ডেবিট জেরের সুদ
সাধারণ সঞ্চিতি ও কুষাণ সঞ্চিতি একই কথা নয়।
রেওয়ামিলে আসে না সমাপনী মজুদ পণ্য, প্রারম্ভিক হাতে নগদ, প্রারম্ভিক ব্যাংক জমা।
রেওয়ামিলের ডেবিট কলামের যোগফল সর্বদা ক্রেডিট কলামের যোগফলের সমান হবে।
রেওয়ামিলের ডেবিট ও ক্রেডিট কলামের যোগফল সমান হলে খতিয়ানের গাণিতিক শুদ্ধতা প্রকাশ করে।
রেওয়ামিলে প্রধানত ভুল হতে পারে ৬ প্রকার।
যেসব ভুল রেওয়ামিলে ধরা পড়ে বাদ পড়ার ভুল, লেখার ভুল, টাকার অঙ্কের ভুল, খতিয়ানের উদ্বৃত্ত নির্ণয়ের ভুল, খতিয়ান উদ্বৃত্ত রেওয়ামিলে স্থানান্তরের ভুল ও রেওয়ামিলের ডেবিট ও ক্রেডিট ঘরের যোগফল নির্ণয়ে ভুল।
যেসব ভুল রেওয়ামিলে ধরা পড়ে না বাদ পড়ার ভুল, লেখার ভুল, পরিপূরক ভুল, বেদাখিলার ভুল, নীতিগত ভুল।
করণিক ভুল ৪ প্রকার। যথা- (১) বাদ পড়ার ভুল, (২) লেখার ভুল, (৩) বেদাখিলার ভুল, (৪) পরিপূরক ভুল।
কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের অসাবধানতা যে ভুলের সৃষ্টি করে তাকে বলে লেখার ভুল।
মুনাফাজাতীয় খরচকে মূলধনজাতীয় খরচ এবং মূলধনজাতীয় হিসাবকে মুনাফাজাতীয় হিসাব লেখাকে বলে নীতিগত ভুল।
অশুদ্ধ রেওয়ামিল শুদ্ধ করার ধাপ ৭টি।
অশুদ্ধ রেওয়ামিল শুদ্ধ করার ক্ষেত্রে নেই স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম।
রেওয়ামিলের গরমিল নির্দেশ করে হিসাবরক্ষণে ভুল হয়েছে।
খতিয়ানের উদ্বৃত্ত স্থানান্তরের সঠিকতা যাচাই হয় রেওয়ামিল শুদ্ধ করতে।
রেওয়ামিল শুদ্ধ করার সময় পার্থক্যকে ভাগ করতে হয় ২ দ্বারা।
অনিশ্চিত হিসাবের আরেক নাম Suspense Account.
অনিশ্চিত হিসাব বসবে যোগফল কমের পাশে।
অনিশ্চিত হিসাব বন্ধ করা হয় ভুল খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথে।
অনিশ্চিত হিসাব একটি অস্থায়ী বা সাময়িক বা গরমিল হিসাব।
অনিশ্চিত হিসাব রেওয়ামিলে ডেবিট ও ক্রেডিট কলামের পার্থক্য নির্দেশ করে।
ব্যবসায়ের লাভ ক্ষতি ও আর্থিক অবস্থা নির্ণয়ের পূর্বে লিপিবদ্ধকৃত হিসাবের নির্ভুলতা যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন। গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই না করেই যদি আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়, তবে প্রস্তুতকৃত বিবরণী সঠিক তথ্য না-ও প্রকাশ করতে পারে। হিসাব সংরক্ষণে যে সকল ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে খতিয়ানের উদ্বৃত্ত দ্বারা রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। খতিয়ানের ডেবিট উদ্বৃত্তসমূহের যোগফল ক্রেডিট উদ্বৃত্তসমূহের যোগফলের সমান হলে ধরে নেয়া হয় হিসাব গাণিতিকভাবে নির্ভুল হয়েছে। রেওয়ামিল প্রস্তুতের ফলে সহজেই ভুল উদ্ঘাটিত হয় এবং ভুল সংশোধনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।

এই অধ্যায় শেষে আমরা-
- হিসাবের উদ্বৃত্ত দিয়ে যথাযথ ছকে রেওয়ামিল প্রস্তুত করে হিসাবের গাণিতিক নির্ভুলতা পরীক্ষা করতে পারব।
- হিসাব লিখনের ভুলগুলোর মধ্যে কোন ভুলগুলো রেওয়ামিলের গরমিল ঘটাবে এবং কোন ভুলগুলো গরমিল ঘটাবে না, তা শনাক্ত করতে পারব।
- অনিশ্চিত হিসাবের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- অনিশ্চিত হিসাব খুলে সাময়িকভাবে রেওয়ামিলের উভয় দিকে মেলাতে পারব।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!