এ মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা পরস্পরকে যে বলে আকর্ষণ করে তাকে মহাকর্ষ বল বলে। দুটি বস্তুকণার এ আকর্ষণ বলের মান বস্তুকণাদ্বয়ের ভর এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের উপর নির্ভর করে। এদের আকৃতি, প্রকৃতি কিংবা মাধ্যমের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে না।
যেমন- পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী আকর্ষণ বল হচ্ছে মহাকর্ষ বল।
মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলের মান বস্তুকণাদ্বয়ের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক এবং এ বল বস্তুকণাদ্বয়ের সংযোজক সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।
মহাকর্ষ বল যে যে বিষয়ের উপর নির্ভর করে-
১. বস্তুকণার ভরের উপর
২. বস্তুকণার মধ্যবর্তী দূরত্বের উপর
মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের মান মহাবিশ্বের সকল স্থানে একই। তাই মহাকর্ষীয় ধ্রুবককে সর্বজনীন বলা হয়। চাঁদ এমনকি মঙ্গল গ্রহেও মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G এর মান একই থাকে। এটি স্থানের উপর নির্ভর করে না।
আমরা জানি, Fa
যদি দুটি বস্তুর মধ্যবর্তী দূরত্ব ও গুণ করলে মহাকর্ষ বল হবে।
মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষন বল হচ্ছে মহাকর্ষ বল। নিউটনের সূত্রানুসারে মহাকর্ষ বল ভরের গুণফলের সমানুপাতিক। ভর বৃদ্ধি পেলে বলও বৃদ্ধি পাবে। তাই দুটি বস্তুর ভর বৃদ্ধি পেলে মহাকর্ষ বল বৃদ্ধি পায়।
এ মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে আকর্ষণ করে। এ বলকে বলা হয় মহাকর্ষ বল। এ মহাবিশ্বের দুটি বস্তুর মধ্যে যদি একটি পৃথিবী হয়, তবে পৃথিবী বস্তুটিকে যে বলে আকর্ষণ করে তাকে অভিকর্ষ বল বলে। পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে আকর্ষণ বল হলো অভিকর্ষ বল।
একটি ক্রিকেট বলকে উপরে নিক্ষেপ করলে তা আবার ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। কারণ পৃথিবী ক্রিকেট বলকে অভিকর্ষ বলে আকর্ষণ করে। যার জন্য বলটি ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। আবার পৃথিবীর ভর ক্রিকেট বলের ভরের চেয়ে অনেক বেশি। তাই পৃথিবীর আকর্ষণ বলও অনেক বেশি।
আমরা জানি, বল প্রয়োগ করলে কোনো বস্তুর বেগের পরিবর্তন হয়। সময়ের সাথে বস্তুর বেগ বৃদ্ধির হারকে ত্বরণ বলে। অভিকর্ষ বলের প্রভাবেও বস্তুর ত্বরণ তথা বেগ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং অভিকর্ষ বলের প্রভাবে কোনো স্থানে মুক্তভাবে পড়ন্ত কোনো বস্তুর বেগ বৃদ্ধির হারকে অভিকর্ষজ ত্বরণ বলে।
আমরা জানি, g =
অভিকর্ষজ ত্বরণ বা ৪ বস্তুর ভরের উপর নির্ভর করে না। তাই বস্তু নিরপেক্ষ।
অভিকর্ষজ ত্বরণ ৪ এর মান পৃথিবীর কেন্দ্র হতে বস্তুর দূরত্ব এ এর উপর নির্ভর করে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এ এর মান বিভিন্ন রকম হয়। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ৪ এর মানও বিভিন্ন হয়।
অভিকর্ষজ ত্বরণ, g এর মান পৃথিবীর ব্যাসার্ধ, R এর উপর নির্ভর করে। পৃথিবী সম্পূর্ণ গোলাকার নয়, মেরু অঞ্চলে একটুখানি চাপা। মেরু অঞ্চলে পৃথিবীর কেন্দ্র হতে R এর দূরত্ব সবচেয়ে কম বলে এখানে অভিকর্ষজ ত্বরণের মান অধিক হয়।
পৃথিবী সম্পূর্ণ গোলাকার নয়। মেরু অঞ্চলে একটুখনি চাপা। তাই মেরু অঞ্চলে ব্যাসার্ধ সবচেয়ে কম হয়। কিন্তু মেরু হতে বিষুবীয় অঞ্চলের দিকে গেলে ব্যাসার্ধ বেড়ে যায়। অভিকর্ষজ ত্বরণ পথিবীর ব্যাসার্ধের উপর নির্ভর করে। তাই মেরু অঞ্চল হতে বিষুবীয় অঞ্চলে গেলে অভিকর্ষজ ত্বরণের মানও কমে যায়।
প্রত্যেক বস্তু পদার্থ দ্বারা গঠিত। ভর হলো কোনো বস্তুতে পদার্থের পরিমাণ। বস্তুর ভর এর অবস্থান, আকৃতি বা গতি পরিবর্তনের জন্য পরিবর্তিত হয় না। যে পরমাণু বা অণু দ্বারা বস্তুটি গঠিত তার সংখ্যা ও সংযুক্তির উপর বস্তুর ভর নির্ভর করে। ভরের আন্তর্জাতিক একক হলো কিলোগ্রাম বা কেজি (kg)।
কোন বস্তুকে পৃথিবী যে বলে আকর্ষণ করে তাকে ঐ বস্তুর ওজন বলে। কোনো বস্তুর উপর শুধু অভিকর্ষজ বল কাজ করলে এবং পৃথিবীর কোনো স্থানে অভিকর্ষজ ত্বরণ g ও বস্তুর ভর m হলে, ঐ স্থানে বস্তুটির ওজন, W = mg হবে।
আমরা জানি,
W= mg=60 x 9.8 = 588 N
∴ ঐ ব্যক্তির ওজন হবে 588 N।
ভর ও ওজনের দুইটি পার্থক্য নিচে উল্লেখ করা হলো-
ভর | ওজন |
১. ভর হলো কোনো বস্তুতে পদার্থের পরিমাণ। | ১. কোনো বস্তুকে পৃথিবী যে বলে আকর্ষণ করে তাকে ঐ বস্তুর ওজন বলে। |
২. ভর বস্তুর স্থান পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় না। | ২. ওজন অভিকর্ষজ ত্বরণের উপর নির্ভর করে বিধায় স্থান পরিবর্তনে এটি পরিবর্তিত হয়। |
বস্তুর মধ্যে পদার্থের পরিমাণই হচ্ছে ভর। ভর ধ্রুব রাশি যা ভূপৃষ্ঠে বা ভূপৃষ্ঠের উপরে বস্তুর অবস্থান পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয় না। তাই চাঁদে বস্তুর ভর অপরিবর্তিত থাকে।
বস্তুর যে ধর্ম সর্বদা অপরিবর্তিত থাকে তাকে মৌলিক ধর্ম বলে। যেমন ভর বস্তুর মৌলিক ধর্ম। ওজন বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন হয়। সব সময় পরিবর্তনশীল। তাই ওজন বস্তুর মৌলিক ধর্ম নয়।
g এর পরিবর্তন হয় সেসব কারণে বস্তুর ওজনও পরিবর্তন হয়। পাহাড়ে উঠলে পৃথিবীর কেন্দ্র হতে বস্তুর মধ্যবর্তী দূরত্ব এ বৃদ্ধি পায় ফলে ৪ এর মান কমে। 'তাই পাহাড়ে উঠলে বস্তুর ওজন কমে যায়।
বস্তুর ওজন অভিকর্ষজ ত্বরণের উপর নির্ভর করে। অভিকর্ষজ ত্বরণ পৃথিবীর ব্যাসার্ধের উপর নির্ভর করে। পৃথিবীর কেন্দ্রে ব্যাসার্ধ শূন্য। তাই অভিকর্ষজ ত্বরণও শূন্য হয়। এ কারণে পৃথিবীর কেন্দ্রে বস্তুর ওজন শূন্য হয়।
W = 9.8N বলতে বুঝায় পৃথিবী একটি বস্তুকে তার কেন্দ্রের দিকে 9.8N বলে আকর্ষণ করে।
বস্তুর ওজন পরিবর্তনের কারণগুলো নিম্নরূপ-
১. পৃথিবীর আকৃতির জন্য
২. পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য
৩. মেরু থেকে কৌণিক দূরত্বের জন্য
৪. ভূপৃষ্ঠ হতে উচ্চতর কোনো স্থানে
৫. পৃথিবীর অভ্যন্তরে কোনো স্থানে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে যত নিচে যাওয়া যায় অভিকর্ষজ ত্বরণের মান ততই কমতে থাকে। এর ফলে পৃথিবীর যত অভ্যন্তরে যাওয়া যায় বস্তুর ওজনও তত কমতে থাকে। এ কারণে খনিতে কোনো বস্তুর ওজন কম হয়।
স্থির লিফটের ভিতরে একজন আরোহী 'লিফটের মেঝের উপর তার প্রকৃত ওজনের সমান বল প্রয়োগ করেন। লিফটের মেঝেও আরোহীর উপর সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে। তাই লিফটের ভিতর আরোহীর ওজন তার প্রকৃত ওজনের সমান হবে।
একটি উর্ধ্বমুখী লিফট ত্বরণযুক্ত হয়ে উপরে উঠলে (লিফট ও আরোহীর মোট ওজনের বেশি) একটি অতিরিক্ত উর্ধ্বমুখী বল লিফটের উপরের দিকে প্রযুক্ত হয়। এক্ষেত্রে ত্বরণ (g+ a) হয়। ফলে লিফটের মেঝে আরোহীকে তার প্রকৃত ওজনের বেশি বল প্রয়োগ করে। তাই আরোহী বেশি ওজন অনুভব করে।
মহাশূন্যচারীরা মহাশূন্যযানে করে পৃথিবীকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় বৃত্তাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে থাকেন। এ বৃত্তাকার গতির জন্য মহাশূন্যযানের ওজন ও মহাশূন্যচারীর ওজন দায়ী এবংমহাশূন্যযান ও মহাকাশচারী উভয়ই একই ত্বরণে গতিশীল থাকে। এজন্য মহাশূন্যযানে দেয়াল সাপেক্ষে মহাশূন্যচারীর ত্বরণ শূন্য হয় এবং মহাশূন্যচারী মহাশূন্যযানে কোনো বল প্রয়োগ করে না। ফলে তিনি তার ওজনের বিপরীত কোনো প্রতিক্রিয়া বলও অনুভব করেন না। তাই মহাশূন্যযানে মহাশূন্যচারীরা ওজনহীনতা মনে করেন।
মুক্তভাবে পড়ন্ত লিফট আরোহীর উপর কোনো বল প্রয়োগ করে না। ফলে আরোহী নিজেকে ওজনহীন মনে করে।
সমবেগে উপরে বা নিচে গতিশীল লিফটের আরোহীও একই সাথে গতিশীল থাকেন। ফলে আরোহীর উপর শুধু তার প্রকৃত ওজন (পৃথিবীর আকর্ষণ বল) ক্রিয়া করে। আরোহী লিফটের উপর প্রকৃত ওজনের সমান বল প্রয়োগ করেন ও লিফটের মেঝে এর সমান প্রতিক্রিয়া বল আরোহীর উপর প্রয়োগ করে। ফলে আরোহীর অনুভূত ওজন তার প্রকৃত ওজনের সমান মানের হয়।
একটি ত্বরণযুক্ত লিফট নিচের দিকে নামলে লিফটের তারের মাধ্যমে প্রযুক্ত টানকে (লিফট ও আরোহীর মোট ওজনের থেকে) কমিয়ে দেয়। লিফটের সাথে সাথে নিচে চলমান আরোহীর উপর লিফটের মেঝে আরোহীর প্রকৃত ওজনের চেয়ে কম মানের বল প্রয়োগ করে। ফলে আরোহী তার প্রকৃত ওজনের চেয়ে কম ওজন অনুভব করে।
কোনো বস্তুর উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বলই হচ্ছে ওজন। পৃথিবী যেমন বস্তুকে আকর্ষণ করে ঠিক তেমনি বস্তুও পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। বস্তু ওজন অনুভব করে যখন এটি পৃথিবীতে ওজন বল ক্রিয়া করে এবং পৃথিবীও একই প্রতিক্রিয়া বল তার উপর প্রয়োগ করে। বস্তুর উপর প্রতিক্রিয়া বল শূন্য হলে বস্তু ওজন শূন্যতা অনুভব করবে। এই ঘটনাকে ওজনহীনতা বলা হয়।
এ মহাবিশ্বের প্রতিটি কন্তু একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বল কি সকল ক্ষেত্রে সমান? কিসের উপর এই বলের মান নির্ভর করে। পৃথিবীর আকর্ষণের ফলে পড়ন্ত বস্তুর যে ত্বরণ হয় তার মান কত, এই মান কেন পরিবর্তিত হয়। এই অধ্যায়ে আমরা মহাকর্ষ, অভিকর্ষ, অভিকর্ষজ ত্বরণ, ভর ও ওজন নিয়ে আলোচনা করব।
এই অধ্যার পাঠ শেষে জামা-
• মহাকর্ষ ব্যাখ্যা করতে পারব :
• মহাকর্ষ ও অভিকর্ষের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারব,
• অভিকর্ষজ ত্বরণ ব্যাখ্যা করতে পারব;
• ভর ও ওজনের পার্থক্য করতে পারব;
• অভিকর্ষজ ত্বরণের প্রভাবে কস্তুর ওজনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে পারব;
• আমাদের জীবনে অভিকর্ষজ ত্বরণের অবদান উপলব্ধি করব।
Related Question
View Allকোনো বস্তুতে পদার্থের মোট পরিমাণকে ঐ বস্তুর ভর বলে।
বস্তুর ওজন অভিকর্ষজ ত্বরণg এর উপর নির্ভর করে। g এর মান বৃদ্ধি পেলে বস্তুর ওজন বৃদ্ধি পায় এবং g এর মান হ্রাস পেলে বস্তুর ওজন হ্রাস পায়। অন্যদিকে অভিকর্ষজ ত্বরণ g এর মান পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্বের উপর নির্ভর করে। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে g এর মানের পরিবর্তন হয়। মেরু অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ সবচেয়ে কম বলে সেখানে g এর মান সবচেয়ে বেশি। যার ফলে মেরু অঞ্চলে বস্তুর ওজনও সবচেয়ে বেশি হয়।

ঝুলন্ত বস্তুটির রশি ছিড়ে গেলে বস্তুটি ওজনহীন হয়ে পড়বে।নিচে যুক্তিসহ তা ব্যাখ্যা করা হলো-
পৃথিবীতে যেকোনো ব্যক্তি বা বস্তুর উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল থাকবেই। ফলে তার ওজন থাকবেই কিন্তু ব্যক্তি বা বস্তুটি সেই ওজন অনুভব করবে কেবলমাত্র তখনই যখন তার ওজনের সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল তার উপর প্রযুক্ত হবে। ঝুলন্ত অবস্থায় বস্তুটি পৃথিবীর কেন্দ্রমুখী আকর্ষণ বলের কারণে রশিটির উপর নিম্নমুখী বল প্রয়োগ করে। অন্যদিকে রশিটিও বস্তুটির উপর সমান ও বিপরীতমুখী (উর্ধ্বমুখী) প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করবে। যার ফলে ঝুলন্ত অবস্থায় বস্তুটির ওজন অনুভূত হবে। কিন্তু বস্তুটি রশি ছিড়ে মুক্তভাবে নিচে পড়তে থাকলে বস্তুটির ত্বরণ হবে (g-g) অর্থাৎ শূন্য।
ফলে বস্তুটি রশির উপর কোনো বল প্রয়োগ করবে না এবং বস্তুটির উপরও কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া বল কাজ করবে না। এক্ষেত্রে বস্তুটির ওজন হবে শূন্য এবং বস্তুটি ওজনহীন অনুভূত হবে।
ভর হলো কোনো বস্তুতে পদার্থের মোট পরিমাণ। কোনো বস্তুর ভর ১০ কিলোগ্রাম বলতে বুঝায় বস্তুটিতে পদার্থের পরিমাণ ১০ কিলোগ্রাম। বস্তুর এই ১০ কিলোগ্রাম ভর নির্ভর করে যে পরমাণু ও অণু দ্বারা বস্তুটি গঠিত তার সংখ্যা ও সংযুক্তির উপর।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!