জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়া বিরাজ করে। যেমন- শীতকালে অতি শৈত্য বা কম শৈত্য পড়া, গ্রীষ্মকালে অতি উচ্চ তাপমাত্রা, খরা, লবণাক্ততা, বন্যা ইত্যাদি। এসব বিরূপ আবহাওয়া ফসল উৎপাদনে প্রতিকূল অবস্থা তৈরি করে।
প্রতিকূল পরিবেশে বা বিরূপ আবহাওয়াতে ফসল ফলানোর পূর্বশর্ত হলো উপযোগী ফসল বা ফসলের জাত নির্বাচন করা। বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়া বা প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু ফসল বা ফসলের জাত রয়েছে। উপযোগী ফসল বা ফসলের জাত ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিবেশ এড়ানো সম্ভব।
দুটি শৈত্য সহিষ্ণু ফসলের নাম হলো-
১. গোলআলু ও ২. গম।
দুটি শীত সহিষ্ণু ধানের জাতের নাম হলো-
১. ব্রিধান ৩৬, ২. ব্রিধান ৫৫।
শুষ্ক মৌসুমে একটানা ২০ দিন বা তার অধিক দিন কোনো বৃষ্টিপাত না হলে তাকে খরা বলে। খরা অবস্থায় জমিতে পানি থাকে না। ফলে উদ্ভিদের দেহে প্রয়োজনীয় পানির ঘাটতি দেখা দেয় যা তীব্র হলে গাছ মারা যেতে পারে। এ অবস্থাকে খরা কবলিত বলা হয়।
রোপা আমন ও বোরো ধানে চিটা হওয়ার ২টি কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো-
১. পরাগায়ন ও দানা গঠনের সময় অতিরিক্ত শৈত্য।
২. পরাগায়ন ও দানা গঠনের সময় অতিরিক্ত গরম।
খরা সহিষ্ণু ফসলের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো:
১. ফসলের মূল খুব দৃঢ় ও শাখা-প্রশাখাযুক্ত এবং গভীরমূলী হয়।
২. ফসলের পাতা ছোট, সরু বা পেঁচানো হয়ে থাকে।
দুটি খরা সহিষ্ণু ফসলের নাম হলো: ১. খেজুর ও ২. অড়হর।
দুটি খরা সহিষ্ণু ধানের জাতের নাম হলো:
১. ব্রি ধান ৫৬ ও ২. ব্রি ধান ৫৭।
ব্রি ধান ৫৭ এর দুটি বৈশিষ্ট্য হলো:
১. সর্বোচ্চ ৮ ১৪ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন ক্ষতি হয় না।
২. গাছের উচ্চতা ১১০ ১১৫ সেমি জীবনকাল ১০০ ১০৫ দিন।
খরা সহিষ্ণু দুটি গমের জাতের নাম হলো:
১. বারি গম ২৪ (প্রদীপ) ও ২. বারি গম ২০ (গৌরব)।
বারি গাম ২৪-এর অপর নাম প্রদীপ। এর দুটি বৈশিষ্ট্য হলো:
১. গাছ মধ্যম খাটো, উচ্চ ফলনশীল এবং খরা সহিষ্ণু।
২. এ জাতের পাতা চওড়া, বাঁকানো ও হালকা সবুজ বর্ণের।
চারটি খরা সহিষ্ণু ফসলের জাতের নাম হলো:
১, বারি গম ২৪,
২. ঈশ্বরদী ৩৫ আখ,
৩. বারি বেগুন ৮,
৪. বারি হাইব্রিড টমেটো ৩।
লবণাক্ততার ফলে ফসল মাটি হতে পানি সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলন ব্যাহত হয়। এছাড়াও অনেক ফসল লবণাক্ত পরিবেশে জন্মাতে পারে না। তাই লবণাক্ততা ফসলের জন্য ক্ষতিকর।
চারটি লবণাক্ততা সংবেদনশীল ফসলের নাম হলো:
১. শিম, ২. লেবু, ৩. পেঁয়াজ ও ৪. মসুর।
চারটি লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের নাম হলো:
১. ধান, ২. নারিকেল, ৩. খেজুর ও ৪. তুলা।
লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের দুটি স্থানীয় জাতের নাম হলো: ১. রাজাশাইল ও ২. কাজলশাইল।
লবণাক্ততা সহিষ্ণু একটি গোল আলু হলো বারি আলু ২২ (সৈকত)। আলুর আকার লম্বাটে গোল এবং লাল বর্ণের। জাতটির ফলন ২৫-৩০ টন/হেক্টর।
ঈশ্বরদী ৪০ একটি লবণাক্ততা সহিষ্ণু আখের জাত। লবণাক্ততার পাশাপাশি জাতটি বন্যা ও খরা সহ্য করতে পারে। এ জাতটি উচ্চ ফলনশীল, দ্রুত বর্ধনশীল এবং আগাম পরিপক্বতা গুণসম্পন্ন। উপরোক্ত কারণেই লবণাক্ত এলাকায় এ জাতটি চাষ করা হয়।
লবণাক্ততা সহিষ্ণু মিষ্টি আলু হলো বারি মিষ্টি আলু-৬ এবং
৭। এর দুটি বৈশিষ্ট্য হলো:
১. আলুর খোসার রং গাঢ় কমলা রঙের, ভিতরটা হালকা কমলা রঙের।
২. আলুতে শুষ্ক পদার্থ বেশি থাকে।
বারি সরিষা-১০ জাতটি দুটি বৈশিষ্ট্য হলো:
১. এ জাতের সরিষার গাছ ছোট হয়।
২. জাতটি লবণাক্ততার পাশাপাশি খরাও সহ্য করতে পারে।
বন্যাপ্রবণ এলাকার প্রধান ফসল ধান কারণ বন্যার পানির উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে গাছের উচ্চতাও বাড়তে থাকে। কিছু কিছু জাত ৪ মিটার গভীরতায় অব্দি বেঁচে থাকতে পারে। সাথে কিছু জাতের ধান জোয়ার ভাটা অঞ্চলে ৫০ সেমি উচ্চতার প্লাবন সহ্য করতে পারে।
দুটি গভীর পানির আমন ধান হলো:
১. বাজাইল ও ২. ফুলকুঁড়ি।
দুটি নাবী জাতের আমন ধান হলো:
১. বি আর ২২ (কিরণ) ও ২. বিআর ২৩ (দিশারি)।
বন্যার পানি নেমে গেলে নাবী জাতের আমন ধান চাষ করে বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। নাবী জাতের মধ্যে রয়েছে বিআর ২২ (কিরণ) ও বিআর ২৩ (দিশারী)।
বন্যা সহিষ্ণু দুটি আখের জাতের নাম হলো:
১. ঈশ্বরদী ৩২.ও ২. ঈশ্বরদী ৩৮।
নানান কারণে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। এর মধ্যে নগরায়ন, বৃক্ষনিধন, জ্বালানি তেল ও কয়লার ব্যবহার অন্যতম। এছাড়াও কলকারখানা প্রসার, যান্ত্রিক সভ্যতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদির কারণে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিভিন্ন কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রধান দুটি
কারণ হলো:
১. গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি।
২. নগরায়ন, অতিরিক্ত বৃক্ষনিধন, কল-কারখানার প্রসার ইত্যাদি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদাপন্ন দেশ বলে চিহ্নিত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দুর্যোগের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
IPCC সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুটি প্রভাব হলো:
১. বাংলাদেশের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা প্রতি বছর একটু একটু করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুটি বিরূপ অবস্থা হলো:
১. গ্রীষ্মকালে অতি উচ্চ তাপমাত্রা।
২. অনিয়মিত ও অসময়ে বৃষ্টিপাত।
ধানের ফুল ফোটার সময় তাপমাত্রার প্রভাব ব্যাপক। এ সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হলে ধানে চিটার পরিমাণ বেড়ে যায়। নিম্ন তাপমাত্রার কারণে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, চারা দুর্বল হয়।
নিম্ন তাপমাত্রার কারণে ধানগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দুর্বল মানের চারা উৎপন্ন হয় ফলে ফলন কমে যায়। এছাড়াও ধানগাছ হলদে বর্ণ ধারণ করে এবং ফসলের জীবনকাল বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে ফসল উৎপাদনে খরা অন্যতম একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়ে গড় বৃষ্টিপাতের অভাবে মাটিতে পানি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কম বৃষ্টিপাত ও অধিক হারে মাটি থেকে পানি বাষ্পীভূত হওয়ার ফলে কৃষিক্ষেত্রে খরার প্রভাব দেখা দেয়।
খরা হলো মাটিতে পানি শূন্যতা। খরা অবস্থায় সকল ধরনের ফসল চাষ করা যায় না। যেসকল ফসল ফলানো সম্ভব এর ফলন নির্ভর করে খরার তীব্রতা, খরার স্থিতিকাল এবং ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়ের উপর।
ফসলের ক্ষতির মাত্রার উপর নির্ভর করে খরাকে তিন ভাগে
ভাগ করা হয়। যেমন: ১. তীব্র খরা, ২. মাঝারি খরা ও ৩. সাধারণ খরা।
ফসল উৎপাদন মৌসুমের উপর ভিত্তি করে খরাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ভাগগুলো হলো: ১. রবি খরা, ২. খরিপ-১ খরা ও ৩. খরিপ-২ খরা।
খরা অবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল হিসেবে চাষ পদ্ধতি পরিবর্তন, কম পানি লাগে এমন ফসলের চাষ, জাবড়া প্রয়োগ ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। খরাসহিষ্ণু স্থানীয় জাতের চাষ উন্নয়ন করতে হবে। খরার কারণে ধান লাগাতে দেরি হলে নাবি ও খরাসহিষ্ণু ধানের জাত লাগাতে হবে। খরা সহিষ্ণু ফসল যেমন ছোলা চাষ, তিলের চাষ করতে হবে।
বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততার প্রভাব বেশি দেখা যায়। সেখানে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং প্রবল জোয়ারের ফলে সৃষ্ট বন্যায় জমি ডুবে যায়। ফলে জমিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে এ যায়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির বাষ্পীভবনের মাধ্যমে মাটির নিচেজ্ঞ লবণ উপরে উঠে আসে। ফলশ্রুতিতে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়
লবণাক্ততার মাত্রার উপর ভিত্তি করে লবণাক্ততা আক্রান্ত মাটিকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়। যা হলো:
১. খুব সামান্য লবণাক্ততা আক্রান্ত মাটি;
২. সামান্য লবণাক্ততা আক্রান্ত মাটি;
৩. মধ্যম লবণাক্ততা আক্রান্ত মাটি;
৪. তীব্র লবণাক্ততা আক্রান্ত মাটি এবং
৫. খুব তীব্র লবণাক্ততা আক্রান্ত মাটি।
বাংলাদেশে লবণাক্ততায় আক্রান্ত চারটি জেলার নাম হলো:
১. খুলনা, ২. সাতক্ষীরা, ৩. পটুয়াখালী ও.৪. বরিশাল।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাত কমে। যেতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে লবণাক্ততা বৃদ্ধির। হার বেড়ে যায়। এছাড়াও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে ফলে অনেক এলাকায় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়বে।
আমন মৌসুমে চাষকৃত দুটি লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাতের নাম হলো: ১. ব্রি ধান ৪০ এবং ২. ব্রি ধান ৪১।
বোরো মৌসুমে চাষকৃত দুটি লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাতের নাম হলো: ১. ব্রি ধান ৪৭ এবং ২. বিনা ধান।
দেশের প্রায় ২৫ ভাগ জমি বিভিন্ন সময় বন্যায় প্লাবিত হয়। বিশেষত মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে হওয়া বন্যায় ফলে ধান চাষ বাধাগ্রস্ত হয়। বন্যার ফলে কৃষককে স্থানীয় আমন ধান চাষ করতে হয় ফলে ফলন কমে যায়। এছাড়াও অনেক সময় পাকা বোরোধান কর্তনের পূর্বে বন্যায় প্লাবিত হয়ে ধানের ফলন নষ্ট হয়।
বন্যা পরবর্তী সময়ে নাবি ধান চাষ করতে হবে। দুটি নাবি ধানের জাতের নাম হলো: ১. নাইজারশাইল ও ২. ব্রি ধান ৪৬।
প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য উদ্ভিদ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ও জৈব-রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। এই কৌশলকে অভিযোজন বলে। ফসলের অভিযোজন কৌশল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কৃষিবিজ্ঞানীরা প্রতিকূল পরিবেশে চাষযোগ্য ফসলের জাত উদ্ভাবন করেন।
ফসল দুই উপায়ে খরা অভিযোজন কৌশল অবলম্বন করে।
যথা: ১. খরা এড়ানো ও ২. খরা প্রতিরোধ।
বৃষ্টিপাত শুরু হওয়া ও খরা অবস্থা শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে জীবনচক্র শেষ করে খরা কবলিত না হওয়ার কৌশলকে খরা এড়ানো বলে। এখানে ফসল খরা অবস্থা যাওয়ার পূর্বেই দৈহিক বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ফুল, ফল ধারণ সম্পন্ন করে ফেলে।
ফসলের খরা সহ্যকরণের দুটি উপায় হলো-
১. উদ্ভিদকোষের পানিশূন্যতা রোধকরণ ও
২. প্রোটিন ও প্রোলিন জমাকরণ।
কোনো প্রজাতি তার পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার | কৌশলকে অভিযোজন বলে। অভিযোজন পরিবেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু 1 দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। পরিবেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ইত্যাদি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হলে ফসল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। কিন্তু হঠাৎ করে আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে ফসল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। অর্থাৎ ফসল তাদের অভিযোজন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
কোষের পানিশূন্যতা রোধ করার মাধ্যমে কোষের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ দ্রাব জমা থাকে। ফলে কোষাভ্যন্তরে উচ্চতর অভিস্রবণ চাপ বজায় থাকে। কোষ থেকে পানি শুকিয়ে যায় এবং কোষ চুপসে যায় না। ফলে কোষ জীবিত থাকে এবং খরা পরিস্থিতিতে সহ্যশীল হয়।
ফসলের খরা সহ্যকরণে প্রোটিন ব্যতীত অন্য উপাদানটি হলো প্রোলিন। খরার প্রভাবে উদ্ভিদ দেহের প্রোটিন ভেঙে বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। উদ্ভিদ দেহে প্রোটিন বেশি মজুদ থাকলে তা খরা প্রতিরোধে সাহায্য করে কিন্তু প্রোটিন ভেঙে নানা বিষাক্ত পদার্থ সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য কিছু উদ্ভিদ প্রোলিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি করে যা এ বিষাক্ততার মাত্রা কমিয়ে ফসলকে খরা সহ্যশীল করে।
উদ্ভিদের অঙ্গভেদে খরা সহ্য করার সামর্থ্যে পার্থক্য দেখা যায়। উদ্ভিদের যেসব অঙ্গে কোনো কোষ গহ্বর থাকে না সেসব অঙ্গ বেশি খরা সহনশীল হয়। যেমন- খরার কারণে কোনো উদ্ভিদের পাতা মরে গেলেও পত্রমুকুল মরে না।
পত্ররন্দ্র খোলা বা বন্ধ হওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে ফসল খরা অবস্থা মোকাবেলা করে। সেক্ষেত্রে উদ্ভিদ সকালের দিকে অল্প সময়ের জন্য পত্ররন্দ্র খোলা রাখে সালোকসংশ্লেষণ এর জন্য। এছাড়া দিনের বাকি সময় পত্ররন্দ্র বন্ধ রেখে পানির অপচয় রোধ করে। এছাড়াও অনেক ফসলে পত্ররন্ধ্র এর সংখ্যা কম হয় ফলে প্রস্বেদন কম হয়, পানি সংরক্ষিত থাকে।
প্রস্বেদনের হার কমিয়ে উদ্ভিদ খরা মোকাবেলা করে। অনেক ফসল খরায় পতিত হলে পাতার উপর লিপিড জমা করে প্রস্বেদন হারকে কমিয়ে দেয়। আবার সাথে অনেক ফসল পাতার উপরে মোম বা ঘন রোমের আচ্ছাদন সৃষ্টি করে প্রস্বেদন হ্রাস করে, ফলে পানির অপচয় কম হয়।
খরাকবলিত অবস্থায় কিছু কিছু উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার হার কমিয়ে দেয়। এ অবস্থায় পাতার কোষ নেতিয়ে পড়লেও রক্ষী-কোষ বিভিন্ন প্রকার দ্রাব জমিয়ে রেখে রসস্ফীতি চাপ বজায় রাখে এবং স্বল্পমাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রবেশ করিয়ে সীমিত - পর্যায়ে সালোকসংশ্লেষণ বজায় রাখে। এভাবে খরাকালীন অবস্থায় | উদ্ভিদের কোনো রকম বেঁচে থাকাকে উদ্ভিদের উপোসকরণ বলা হয়।
খরার প্রভাবে উদ্ভিদ দেহের প্রোটিন ভেঙে বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। উদ্ভিদ দেহে প্রোটিন বেশি মজুদ - থাকলে তা খরা প্রতিরোধে সাহায্য করে। আবার প্রোটিন ভেঙে নানা রকম বিষাক্ত দ্রব্য উৎপন্ন হতে পারে। এজন্য কিছু কিছু উদ্ভিদ প্রোলিন । নামক এক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি করে যা এ বিষাক্ততার! 'মাত্রাকে কমিয়ে ফসলকে খরা সহ্যশীল করে তোলে।
উদ্ভিদ খরাকবলিত অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য পাতার আকার হ্রাস করে। পাতার আকার হ্রাস করার ফলে প্রস্বেদন কমে যায়। এবং পানি সংরক্ষিত থাকে। পাতার কিনারা বা অগ্রভাগ পুড়িয়ে অনেক উদ্ভিদ পাতার আকার হ্রাস করে।
খরার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে অনেক ফসল নিচ থেকে পুরাতন পাতা ঝরিয়ে প্রস্বেদন হ্রাস করে। খরার ফলে উদ্ভিদে বেশি পরিমাণ ইথিলিন এনজাইম উৎপন্ন হয় এবং এই ইথিলিন এনজাইম উদ্ভিদের পাতা ঝরাতে সাহায্য করে।
উদ্ভিদ পাতার মাধ্যমে খাদ্য উৎপন্ন করে একই সাথে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় পানি বের করে। সেক্ষেত্রে উদ্ভিদ নানান উপায়ে পাতার পরিবর্তনের মাধ্যমে খরা অবস্থা মোকাবেলা করে। যেমন- পাতা ঝরানো, পাতা মোড়ানো, পাতা কুঞ্চিতকরণ, পাতার দিক পরিবর্তন ইত্যাদি।
খরা অবস্থা মোকাবেলায় উদ্ভিদের দক্ষমূলতন্ত্র অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এ সময় উদ্ভিদ মূলের দৈর্ঘ্য সংখ্যা ও ঘনত্ব বাড়িয়ে অধিক পরিমাণ পানি আহরণ করে থাকে। যেমন- ভুট্টা, তুলা ও গম ইত্যাদি। আবার মূলের অধিক গভীরতা ও ঘনত্ব একই ফসলে হলে সে ফসল অধিক খরা প্রতিরোধী হয়। যেমন- জোয়ার ও বাজরা। আবার গভীরমূলী ফসলও খরা প্রতিরোধী হয়। যেমন- চীনাবাদাম, অড়হর ইত্যাদি।
খরা অবস্থা মোকাবেলায় উদ্ভিদের দক্ষমূলতন্ত্র অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এ সময় উদ্ভিদ মূলের দৈর্ঘ্য সংখ্যা ও ঘনত্ব বাড়িয়ে অধিক পরিমাণ পানি আহরণ করে থাকে। যেমন- ভুট্টা, তুলা ও গম ইত্যাদি। আবার মূলের অধিক গভীরতা ও ঘনত্ব একই ফসলে হলে সে ফসল অধিক খরা প্রতিরোধী হয়। যেমন- জোয়ার ও বাজরা। আবার গভীরমূলী ফসলও খরা প্রতিরোধী হয়। যেমন- চীনাবাদাম, অড়হর ইত্যাদি।
উদ্ভিদ খরা অবস্থায় সূর্যালোকের সাথে বা খাড়াভাবে পাতার দিক পরিবর্তন করে। এর কারণ হলো উদ্ভিদের প্রস্বেদনের হার হ্রাস পায়। প্রস্বেদনের হার হ্রাস পেলে উদ্ভিদের পানির অপচয় রোধ হয় এবং পানি সাশ্রয় হয়।
লবণাক্ততার প্রতি সাড়া প্রদানের ভিত্তিতে ফসলকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: ১. হ্যালোফাইটস ও ২. গ্লাইকোফাইটস।
দুটি হ্যালোফাইটস উদ্ভিদ হলো গোলপাতা ও কেওড়া এবং দুট গ্লাইকোফাইটস উদ্ভিদ হলো সুগারবিট ও শিম।
গ্লাইকোফাইটস ও হ্যালোফাইটস উদ্ভিদের মধ্যে দুটি পার্থক্য
হলো:
গ্লাইকোফাইটস | হ্যালোফাইটস |
১. লবণাক্ত পরিবেশে জন্মাতে পারে না | ১. লবণাক্ত পরিবেশে জন্মাতে পারে। |
২. উদাহরণ- সুগারবিট, শিম। | ২. উদাহরণ- গোলপাতা, কেওড়া। |
লবণাক্ত এলাকার মৃত্তিকা পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদির ক্যালসিয়াম ও সালফেট লবণ দ্রবীভূত থাকায় পানির ঘনত্ব বেশি হয়। ফলে উদ্ভিদকে টিকে থাকতে হলে উদ্ভিদ কোষ রসের ঘনত্ব মৃত্তিকা পানির ঘনত্ব থেকে বেশি হতে হয়। বেশি না হলে উদ্ভিদ মাটি পানি বা খাদ্যশোষণ করতে পারে না, - উল্টা পানি হারিয়ে নেতিয়ে পড়ে।
লবণাক্ত পরিবেশের মাটিতে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, সালফেট | ইত্যাদি আয়ন বেশি থাকে যা উদ্ভিদ গ্রহণ করে। এতে উদ্ভিদের দেহাভ্যন্তরে আয়নের আধিক্য ঘটে। এক্ষেত্রে হ্যালোফাইটস উদ্ভিদের পাতায় এক ধরনের জালিকা থাকে যার মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ন বের করে দিতে পারে। আবার অনেক প্রজাতি পাতার আয়তন বাড়িয়ে শরীরের লবণের ঘনত্ব কমিয়ে নেয়। এছাড়াও কোনো কোনো প্রজাতিতে পাতার কোষে অতিরিক্ত আয়ন জমিয়ে রাখার বিশেষ ব্যবস্থা থাকে।
কিছু কিছু উদ্ভিদ আছে যারা লবণাক্ত পরিবেশে আয়ন আহরণ না করে অন্য উপায় অবলম্বন করে। এক্ষেত্রে উদ্ভিদের মূলের কোষের রসস্ফীতি বজায় রাখার জন্য কোষ গহ্বরে বিভিন্ন প্রকার জৈব দ্রাব জমা করে রাখে। ফলে কোষ গহ্বরের আয়তন কোষের মোট আয়তনের ৯৫% হয়ে থাকে। জমাকৃত জৈব দ্রব্যের মধ্যে সালোক-সংশ্লেষণ জাত দ্রব্যই বেশি থাকে।
ধান পানি পছন্দকারী উদ্ভিদ। ধান গাছে এ্যারেনকাইমা টিস্যু থাকে। এ টিস্যুর মধ্যে প্রচুর বায়ুকুঠুরি থাকে, যেখানে অক্সিজেন জমা থাকে। ফলে ধান গাছ ডুবে না গেলে বন্যা বা জলাবদ্ধ অবস্থায় বেঁচে থাকে এবং ভালো ফলন দেয়।
গভীর পানির আমন ধান বন্যার পানি বাড়ার সাথে সাথে উচ্চতায় বাড়তে থাকে। এসব জাতের ধানগাছের পর্ব মধ্যে এক - ধরনের ভাজক কলা থাকে। যা বন্যার পানি বাড়ার সাথে দ্রুত বিভাজিত হয়ে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে বন্যা মোকাবেলা করে।
সাধারণত লবণাক্ত এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানি বাষ্পীভূত হওয়ার সাথে লবণ ওপরে উঠে আসে। একইভাবে, বৃষ্টিপাত হলে সেসব লবণ পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যায় এবং পুনরায় তা ধুয়ে মাটির নিচে চলে যায়। তাই বৃষ্টি হলে লবণাক্ততা কমে যায়।
জলজ উদ্ভিদ ব্যতীত অধিকাংশ ফসল বন্যা বা জলাবদ্ধ অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে না। কারণ এ অবস্থায় মাটিতে অক্সিজেনের অভাব হয়। ফলে উদ্ভিদের মূল শ্বসনকাজ চালাতে পারে না। যত দ্রুত মাটি বা পানিস্থ দ্রবীভূত অক্সিজেন শেষ হয়ে যায় উদ্ভিদ তত দ্রুত মারা যায়।
উচ্চ তাপমাত্রায় উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বসনের হার কমে যায়। তবে শ্বসনের তুলনায় সালোকসংশ্লেষনের হার বেশি কমে যায়। ফলে উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করতে পারে না। এমন অবস্থায় শ্বসনের কারণে উদ্ভিদের প্রোটিন ভেঙে যায়, পানির অপচয় হয়। ফলে উদ্ভিদের আয়ুষ্কাল তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়।
বিশেষ ধরনের প্রোটিন তৈরির মাধ্যমে তাপ সহনশীল উদ্ভিদ উচ্চ তাপমাত্রায় বেঁচে থাকে। তাপ সহনশীল উদ্ভিদে উচ্চ তাপমাত্রায় বিশেষ ধরনের স্থিতিশীল প্রোটিন সৃষ্টি হয়। যা উদ্ভিদের দেহ থেকে ভেঙে যাওয়া প্রোটিনকে সরিয়ে দিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত কমে গেলে অথবা বৃষ্টিপাত শুরু হতে দেরি হলে পোনা ছাড়তে দেরি হয়। আবার দেরিতে পোনা ছাড়ার পর পুকুর শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। ফলে চাষের সময় কমে যায়। মাছ বড় হওয়ার আগেই ছোট মাছ বাজারজাত "করতে হয়। ফলে মাছ চাষ অলাভজনক হয়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কম বৃষ্টিপাতের ফলে হ্যাচারিতে মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রজননের অনুকূল পরিবেশ না পাওয়া ও তাপমাত্রা বেশি থাকায় কৃত্রিম প্রজননে সারা দিচ্ছে না। পেটে ডিম আসলেও ডিম ছাড়ছে না। অথবা ডিম ছাড়লেও তা নিষিক্ত হচ্ছে না। আবার নিষিক্ত ডিম ফোটার হারও কম হচ্ছে। এভাবে হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাছ চাষ ও পোনা উৎপাদনে দুটি প্রভাব হলো:
১. বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পুকুরের গভীরতা কমে যাচ্ছে ফলে মাছ রোগাক্রান্ত হচ্ছে।
২. তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অনাবৃষ্টি বা অপর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। এ সমস্ত কারণে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দিন দিন প্রাকৃতিকভাবে মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার ফলে নদীতে পানি কমে যাচ্ছে। ফলে অল্প পানিতে সহজেই মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে। এতে করে ছোট-বড়, প্রজননক্ষম সব মাছ ধরা পড়ছে। ফলে নদীতে মাছের জীববৈচিত্র্য ও স্থায়ী উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে মূল ভূখণ্ডের দিকে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাদুপানির মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। সেই সাথে উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে একমাত্র হালদা নদীতে প্রাকৃতিকভাবে রুই জাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে। বৈশাখ মাসে প্রচণ্ড গরমের পর ভারী বৃষ্টি শুরু হলে এরা ডিম ছাড়ে। তখন নদী থেকে জেলেরা নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করে এবং এ ডিম ফুটিয়ে পোনা উৎপাদন করে। জলবায়ুর পরিবর্তনে তাপমাত্রার বৃদ্ধির ফলে রুইমাছের ডিমের পরিপক্কতা এগিয়ে আসছে। অন্যদিকে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার সময় দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে করে মাছের শারীরবৃত্তীয় অবস্থার সাথে বৃষ্টিপাতের সময়ের অমিল হচ্ছে। ফলে ডিম পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসছে।
বায়ুমণ্ডলে দিন দিন কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে বেড়ে যাচ্ছে বাতাসের ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা। ফলে বাতাসের গতি প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে, বৃষ্টির ধরনও পরিবর্তন হচ্ছে। এতে করে সাগরে মাছের বিচরণ ও উৎপাদনশীলতায় প্রভাব পড়ছে। ফলে সমুদ্রের কোনো অংশে মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। আবার মাছের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র বলে খ্যাত কিছু এলাকা মাছশূন্য হয়ে যেতে পারে।
কোরাল রীফ বা প্রবাল সামুদ্রিক মাছের উৎকৃষ্ট আবাসস্থল। এখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ বাস করে এবং এটি প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে। পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঢেউয়ের তারতম্য, সমুদ্রের অম্লত্ব বৃদ্ধি, দূষণ, স্রোতের গতি পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে প্রবাল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য তথা মৎস্য বৈচিত্র্যের উপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মাছ উত্তপ্ত অঞ্চল থেকে শীতল অঞ্চলের দিকে অভিবাসন করছে। এর ফলে প্রজননক্ষেত্র, উৎপাদনক্ষেত্র এবং বিস্তরণক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটছে। ফলে, সমুদ্রের যে অঞ্চলে আগে মাছের প্রাচুর্য ছিল, সেসব এলাকায় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে এবং নতুন এলাকাগুলোতে মাছ আহরণ করতে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির কারণে বাতাসের ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাতাসের গতি প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে, বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। এতে করে সাগরের মাছের বিচরণ ও উৎপাদশীলতায় প্রভাব পড়ছে। ফলে সমুদ্রের কোনো অংশে মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে অন্যদিকে মাছের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র বলে খ্যাত কিছু এলাকা মাছশূন্য হয়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমন্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাতাসের ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাতাসের গতি প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে, বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। এতে করে সমুদ্রের কোনো অংশে মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে মাছের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র বলে খ্যাত কিছু এলাকা মাছশূন্য হয়ে যেতে পারে।
দুটি লবণাক্ততা সহনশীল মাছ হলো:
১. ভেটকি ও ২. পরসে
বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যার সময় পানি উপরে উঠে আসে ফলে মাছ বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই বন্যাপ্রবণ এলাকায়। পুকুরের পাড় উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে যেনো বন্যার পানি প্রবেশ না করে। অথবা পুকুরের পাড় নেট দিয়ে ঘেরাও দিতে হবে যেনো মাছ বেরিয়ে যেতে না পারে
দুটি তাপমাত্রা সহনশীল মাছের নাম হলো:
১. মাপুর ও
২. রুই।
পুকুরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে পুকুরের পানি গরম হয়ে গেলে পুকুরের নির্দিষ্ট স্থানে বাঁশের ফ্রেম তৈরি করে তাতে টোপাপানা রাখা যেতে পারে। এতে করে মাছ গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এর নিচে অবস্থান নিতে পারবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এ লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য লবণাক্ততা সহনশীল মাছের চাষ এবং পোনা উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ লবণাক্ততা সহনশীল মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভেটকি, বাটা, পরশে ইত্যাদি। এছাড়াও যেসব জলাশয়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে সেখানে চিংড়ি এবং কাঁকড়ার চাষও করা যেতে পারে।
তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে পুকুরের পানি গরম হয়ে যায়। তখন পুকুরে নির্দিষ্ট স্থানে বাঁশের ফ্রেম তৈরি করে তাতে টোপাপানা
রাখা যেতে পারে। এতে করে মাছ গরম থেকে রক্ষার জন্য ফ্রেমের নিচে অবস্থান নিতে পারবে। এছাড়াও পানির উপর লতানো উদ্ভিদ লাগানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বাইরে থেকে ঠান্ডা পানি সেচ দেওয়া যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে করণীয় দুটি অভিযোজন কৌশল
হলো:
১. লবণাক্ততা বেড়ে গেছে এমন জলাশয়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করা।
২. বন্যাপ্রবণ এলাকায় পুকুরের পাড় উঁচু করে সমাজভিত্তিক মৎস্য পোনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা।
বন্যাপ্রবণ এলাকায় মৎস্য ক্ষেত্রে দুটি অভিযোজন কলাকৌশল ব্যাখ্যা করা হলো:
১. বন্যাপ্রবণ এলাকায় পুকুরের পাড় উঁচু করে সমাজভিত্তিক মৎস্য পোনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা। যা বন্যা-পরবর্তী সময়ে মজুদ করা যাবে।
২. বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যার সময়টাতে খাঁচায় মাছ চাষ করা।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলাকরণে দুটি দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী ব্যবস্থার নাম হলো ১. উপকূলীয় বনায়ন পরিকল্পনা ও ২. দেশের নদ-নদী খাল উদ্ধার ও পুনঃখনন।
পশুপাখির উপর প্রভাব ফেলে এমন দুটি জলোচ্ছ্বাসজনিত
সমস্যা হলো:
১. জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের ফলে বহু গবাদিপশু ও জীবজন্তু তাৎক্ষণিক মারা যায়।
২. পশু খাদ্যের অভাব দেখা দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম দুটি কারণ হলো:
১. পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও
২. মানুষ কর্তৃক পরিবেশ ধ্বংস।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সংঘটিত যেকোনো চারটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম হলো:
১. জলোচ্ছ্বাস, ২. সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, ৩. বন্যা ও ৪. খরা।
বন্যা পরিস্থিতিতে দেখা দেওয়া বিভিন্ন সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-
১. দেশের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে যায়।
২. পানি দূষিত এবং জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
৩. পশুপাখি রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যার সৃষ্টি হয়।
৪. বিভিন্ন সংক্রামক রোগ এবং কৃমির আক্রমণ বৃদ্ধি পায়।
পশুপাখির অভিযোজন ক্ষমতা বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে।
যেমন: পরিবেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ ও বায়ুর উপাদান, সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে উচ্চতা, শারীরিক গঠন ও দৈহিক অবস্থা ইত্যাদি।
হঠাৎ জলবায়ু ব্যাপক পরিবর্তন হলে মানুষ বুদ্ধি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু পশুপাখি সেই পরিবেশে নিজেকে অভিযোজন করতে পারে না। কারণ পশুপাখি অসহায় ও নিরীহ প্রাণী।।
হঠাৎ জলবায়ু পরিবর্তনে অনেক প্রজাতির বিলুপ্তিও ঘটতে পারে।
হঠাৎ জলবায়ু ব্যাপক পরিবর্তন হলে মানুষ বুদ্ধি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারে কিন্তু পশুপাখি সেই পরিবেশে নিজেকে অভিযোজন করতে পারে না। কারণ পশুপাখি অসহায় ও নিরীহ প্রাণী। ফলে সেই পরিবেশে পশুপাখিকে খাপ খাওয়ানোর জন্য মানুষের সাহায্য প্রয়োজন।
খরায় পশুপাখিকে রক্ষার জন্য দুটি উপায় হলো:
১. পশুকে কাঁচা ঘাসের সম্পূরক খাদ্য খাওয়াতে হবে।
২. গবাদিপশুকে নিয়মিত সংক্রামক রোগের টিকা দিতে হবে
খরার সময় গবাদিপশুকে গাছের পাতা খাওয়াতে হবে। সেজন্য, কাঁঠাল, ইপিল ইপিল, বাবলাসহ বিভিন্ন গাছের চাষ বৃদ্ধি করতে হবে। খরা আসার পূর্বে সাইলেজ বা হে তৈরি করে সেই খাদ্য প্রদান করতে হবে। শুষ্ক খড় না খাইয়ে ইউরিয়া খড় বা ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ানো যেতে পারে। খরার সময় গবাদিপশুকে পর্যাপ্ত দানাদার খাদ্য প্রদান করতে হবে।
বন্যার সময় গবাদিপশুকে খাদ্য হিসেবে খড়, চালের কুঁড়া, ভুসি ও খৈল বেশি পরিমাণ খাওয়াতে হবে। এ সময় কচুরিপানা, দলঘাস, লতাগুল্ম এমনকি কলাগাছ খাওয়াতে হবে। কাঁচা ঘাসের বিকল্প হিসেবে হে ও সাইলেজ খাওয়ানো যেতে পারে।
জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে রক্ষার জন্য গবাদিপশুকে ভাতের মাড় ও জাউ, শুকনো খড় এবং দানাদার খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। কাঁচাঘাসের পরিবর্তে বিভিন্ন গাছ ও লতাপাতা খাওয়াতে হবে। দানাদার খাদ্য হিসেবে ভুসি, কুঁড়া, খৈল ও প্রয়োজনমতো লবণ খাওয়াতে হবে
Related Question
View Allযেসব ফসল বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে সেসব ফসলকে লবণাক্ত সহিষ্ণু ফসল বলে।
তাপমাত্রা হলো ফসল উৎপাদনে প্রভাব বিস্তারকারী অন্যতম জলাবায়ুগত উপাদান।
বীজ বপনের পর মাটির তাপমাত্রা হ্রাস পেলে বীজের অঙ্কুরোদগম ভালো হয় না। ফসলের দৈহিক বৃদ্ধির সময় তাপমাত্রা হ্রাস পেলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়াও তাপমাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধিতে ফসল বিভিন্ন পোকা ও রোগে আক্রান্ত হয়। এভাবে তাপমাত্রা কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করে।
সুজিত বাবুর সিদ্ধান্ত ছিল বিনা ধান-৮ চাষ করা।
সুজিত বাবুর বাড়ি সমুদ্র উপকূলবর্তী সাতক্ষীরা জেলায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততার মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং প্রবল জোয়ারের ফলে সৃষ্ট বন্যায় সরাসরি লবণাক্ত পানি দ্বারা জমি ডুবে যাওয়ায় মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির বাষ্পীভবনের মাধ্যমে মাটির নিচের লবণ উপরে উঠে আসে। উপকূলীয় এলাকায় ধান উৎপাদন করতে হলে উন্নত জাতের ধান চাষ করতে হবে যা লবণাক্ততা সহিষ্ণু। এসব জাতের ধান গাছ কোষের রসস্ফীতি বজায় রেখে মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পানি শোষণের মাধ্যমে লবণাক্ত পরিবেশে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে। এসব লবণাক্ততা সহনশীল জাতের মধ্যে একটি হলো বিনা ধান-৮। এ জাতটির জীবনকাল ১৩০-১৩৫ দিন। লবণাক্ত এলাকায় এ জাতটি চাষ
করে হেক্টর প্রতি প্রায় ৫ টন ধান উৎপাদন করা সম্ভব। কাজেই সুজিত বাবুর বিনা ধান-৮ চাষের সিদ্ধান্তটি সঠিক।
সাতক্ষীরা জেলা বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। এ অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততার প্রভাব খুব বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কম বৃষ্টিপাতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ধারা আরও বাড়ছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে আরও অনেক এলাকায় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু ফসল সম্পর্কে ধারণা নেই বলে তারা স্থানীয় জাতের ফসল চাষ করে। ফলশ্রুতিতে তারা ভালো ফলন পেতে ব্যর্থ হয় এবং লাভবান হতে পারে না। লবণাক্ত সহিষ্ণু ফসলের চাষ উপকূলীয় এলাকায় জনপ্রিয় করতে সেসব ফসলের চাষ পদ্ধতি চিত্রের মাধ্যমে প্রদর্শনের কার্যক্রমটি বেশ
কার্যকরী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুজিত বাবুর এলাকায় আমন মৌসুমে লবণাক্ত সহিষ্ণু বিআর ২৩, ব্রি ধান ৪০, ব্রি ধান ৪১, বোরো মৌসুমে ব্রি ধান ৪৭, বিনা ধান -৮ এবং বারি আলু-২২, বারি মিষ্টি আলু ৬ ও ৭, আখের জাত-ঈশ্বরদী ৩৯ ও ৪০ ইত্যাদি বিভিন্ন ফসলের চাষ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে। এতে এলাকাবাসী নিজে উৎসাহিত হয়ে এসব নতুন জাতের ফসল চাষ করে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং অন্যকেও উৎসাহিত করতে সক্ষম হবে।
তাই বলা যায়, সুজিত বাবুর এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম সঠিক ছিল।
কোনো স্থানের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ, সূর্যকিরণ, বায়ুর চাপ, কুয়াশা প্রভৃতির দৈনিক সামগ্রিক অবস্থাকে আবহাওয়া বলে।
পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার একটি ক্ষতিকর দিক হলো খরা। শুষ্ক মৌসুমে একটানা ২০ দিন বা তার অধিক দিন কোনো বৃষ্টিপাত না হলে তাকে খরা বলে। এটি একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে উদ্ভিদ দেহে প্রয়োজনীয় পানির ঘাটতি দেখা যায়। ফলে শতকরা ১৫- ৯০ ভাগ ফলন ঘাটতি হয়ে থাকে। খরার ফলে মাাটির উর্বরতা কমে এবং পরিবেশ বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!