অসীম দূরত্ব হতে একটি একক ধনাত্মক আধান বা চার্জকে গতিশীল করে কোনো আধানযুক্ত বা চার্জিত বস্তুর পাশে কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কাজ করতে হয় তাকে ঐ বিন্দুর তড়িৎ বিভব বলে। দুটি ধাতব বস্তুতে বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য বিভব পার্থক্য থাকতে হবে। যতক্ষণ বিভব পার্থক্য থাকে ততক্ষণ ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়।
কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয় তাই হলো তড়িৎ প্রবাহ। মূলত ইলেকট্রনের প্রবাহকে তড়িৎ প্রবাহ বলে। কোনো পরিবাহীর মধ্যদিয়ে মুক্ত ইলেকট্রন চলাচল করে। তড়িৎ প্রবাহ দ্বারা যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের পরিবাহীর মধ্য দিয়ে একক সময়ে কী পরিমাণ ইলেকট্রন প্রবাহিত হয় তাকে বুঝায়।
প্রতি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎ ক্ষেত্রের এক বিন্দু হতে অন্য বিন্দুতে সমবেগে স্থানান্তর করতে সম্পন্ন কাজের পরিমাণ হলো ঐ বিন্দু দুটির বিভব পার্থক্য। দুটি বিন্দুর মধ্যে বিভব পার্থক্য না থাকলে তড়িৎ প্রবাহিত হতে কোনো কাজও সম্পন্ন হবে না।
আধুনিক ইলেকট্রন তত্ত্ব অনুসারে, প্রত্যেক ধাতব পদার্থে কিছু মুক্ত ইলেকট্রন থাকে, যারা ঐ পদার্থের মধ্যে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। যখন দুটি ধাতব পদার্থকে তার দ্বারা সংযুক্ত করা হয় তখন এই দুই ধাতব বস্তুর মধ্যে বিভব পার্থক্য থাকলে কেবল ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়। ইলেকট্রন প্রবাহ হচ্ছে তড়িৎ প্রবাহ। বিভব পার্থক্য না থাকলে ইলেকট্রন প্রবাহিত হয় না অর্থাৎ তড়িৎ প্রবাহিত হয় না। এজন্য তড়িৎ প্রবাহের জন্য বিভব পার্থক্য প্রয়োজন।
DC প্রবাহ মানে Direct কারেন্ট, যে প্রবাহে সময়ের সাথে দিকের কোনো পরিবর্তন হয় না অর্থাৎ তড়িৎ প্রবাহ সবসময় একই দিকে প্রবাহিত হয়। তাই DC প্রবাহকে একমুখী প্রবাহ বলে

যদি সময়ের সাথে তড়িৎ প্রবাহের দিক বারবার পরিবর্তিত হয় তবে সেই তড়িৎ প্রবাহকে এসি প্রবাহ বলে এবং যদি দিক পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময় স্থির থাকে তবে এটিকে পর্যাবৃত্ত প্রবাহ বলে। বর্তমান বিশ্বের সকল দেশের তড়িৎ প্রবাহ হচ্ছে পর্যাবৃত্ত প্রবাহ। এটি উৎপন্ন ও সরবরাহ করা সহজ এবং সাশ্রয়ী।

এসি ও ডিসি প্রবাহের পার্থক্য হলো-
| এসি (AC) প্রবাহ | ডিসি (DC) প্রবাহ |
| ১. তড়িৎ প্রবাহের দিক সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় | ১. তড়িৎ প্রবাহের দিক সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না বরং একই থাকে। |
| ২. ডায়নামো হতে এসি প্রবাহ পাওয়া যায়। | ২. তড়িৎ কোষ বা ব্যাটারি হতে ডিসি প্রবাহ পাওয়া যায়। |
কোনো পরিবাহীর দুইপ্রান্তে বিভব পার্থক্য থাকলে ইলেকট্রন নিম্ন বিভব হতে উচ্চ বিভবে প্রবাহিত হয়। এই ইলেকট্রন স্রোত পরিবাহীর মধ্য দিয়ে চলার সময় পরিবাহীর অভ্যন্তরস্থ অণু-পরমাণুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফলে এর গতি বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং বিদ্যুৎপ্রবাহও বিঘ্নিত হয়। পরিবাহীর এই বাধাদানের ধর্মই হলো রোধ।
তড়িৎ প্রবাহ যে যে বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করে তা হলো-
১১. পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য
২. পরিবাহীর রোধ
৩. পরিবাহীর তাপমাত্রা
৪. পরিবাহীর আকৃতি ও উপাদান
ও'মের সূত্রটি হলো- তাপমাত্রা স্থির থাকলে কোনো নির্দিষ্ট পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহের মান পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যর সমানুপাতিক। কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য V এবং তড়িৎ প্রবাহ I
হলে। সূত্রানুসারে I V
বা
বিভব পার্থক্য বেশি হলে তড়িৎ প্রবাহ বেশি হবে এবং কম হলে তড়িৎপ্রবাহ কম হবে।
আমরা জানি, অ্যাম্পিয়ার
তড়িৎ প্রবাহ 2 অ্যাম্পিয়ার।
একটি পরিবাহীর বিভব পার্থক্য 4V বলতে বুঝায় একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের এক বিন্দু হতে অন্য বিন্দুতে স্থানান্তর করতে সম্পন্ন কাজের পরিমাণ হলো 4V।
আমরা জানি,
Ι α V
বা
কোনোভাবে যদি ধাতব বস্তুদ্বয়ের মধ্যবর্তী বিভব পার্থক্য (V) বজায় রাখা যায় তবে তড়িৎ প্রবাহ (1) নিরবিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়।
তড়িৎ প্রবাহ 10A এর অর্থ হলো- কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে 10 কুলম্ব চার্জ প্রবাহিত হয়।
মানুষের চলার জন্য যেমন পথের প্রয়োজন, তড়িৎ প্রবাহের জন্যও প্রয়োজন নির্দিষ্ট পথ। তড়িৎ প্রবাহ চলার এই সম্পূর্ণ পথকে বলে তড়িৎ বর্তনী। যখন একটি ব্যাটারির দুই প্রান্তকে এক বা একাধিক রোধ, তড়িৎ যন্ত্র বা উপকরণের সাথে যুক্ত করা হয়, তখন তড়িৎ বর্তনী তৈরি হয়।
তড়িৎ বর্তনীতে তড়িৎপ্রবাহ চালু এবং বন্ধ করার জন্য সুইচ ব্যবহার করা হয়। বর্তনীতে সুইচ বন্ধ থাকলে বর্তনী সম্পূর্ণ হবে এবং তড়িৎ প্রবাহিত হবে। সুইচ খোলা থাকলে বর্তনী সম্পূর্ণ হবে না এবং তড়িৎ প্রবাহিত হবে না।
বর্তনীতে রোধ দু'ভাবে সংযোগ করা যায়। যথা-
১. শ্রেণি সংযোগ ও
২. সমান্তরাল সংযোগ।
কোনো বর্তনীতে যদি রোধ, তড়িত্যন্ত্র বা উপকরণসমূহ এমনভাবে সংযুক্ত করা হয় যেন প্রথমটির এক প্রান্তের সাথে দ্বিতীয়টির অন্য প্রান্ত, দ্বিতীয়টির অপর প্রান্তের সাথে তৃতীয়টির একপ্রান্ত এবং এরূপে সব কয়টি পর্যায়ক্রমে সাজানো থাকে, তবে সেই সংযোগকে শ্রেণি সংযোগ বর্তনী বলা হয়।

কোনো বর্তনীতে দুই বা ততোধিক রোধ, তড়িৎ উপকরণ বা যন্ত্র এমনভাবে সংযুক্ত থাকে যে সবকয়টির একপ্রান্ত একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্তগুলো অপর একটি সাধারণ বিন্দুতে সংযুক্ত থাকে, তবে সেই সংযোগকে সমান্তরাল সংযোগ বর্তনী বলে।

শ্রেণি সংযোগে দুটি বাল্ব সংযোগ করলে তা কম উজ্জ্বলভাবে জ্বলে। কারণ শ্রেণিসংযোগে দুটি বান্ধে একই তড়িৎ প্রবাহিত হয়। ফলে প্রতিটি বাল্বের প্রান্তদ্বয়ের বিভব প্রার্থক্য আলাদা হবে। ফলে একটি বাল্ব যত উজ্জ্বলভাবে জ্বলে বিভব কমে যাওয়ায় পরেরটি আরো কম উজ্জ্বলভাবে জ্বলবে।
সমান্তরাল সংযোগে প্রত্যেকটি বাম্বের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথে তড়িৎ প্রবাহিত হয়। তাই একটি বাল্ব নষ্ট হলেও অন্যটি জ্বলবে এবং প্রতিটি বাল্বই আলাদাভাবে জ্বালানো বা নেভানো যায়। প্রতিটি বাম্বে প্রান্তদ্বয়ের বিভব পার্থক্য একই। ফলে প্রতিটি বান্ধই সমানভাবে জ্বলবে। তাই বাসাবাড়িতে সমান্তরাল সংযোগ সুবিধাজনক।
অ্যামিটার একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র। এর সাহায্যে বর্তনীর তড়িৎ প্রবাহ সরাসরি অ্যাম্পিয়ার এককে পরিমাপ করা যায়। অ্যামিটার A-বর্তনীর সাথে শ্রেণি সংযোগে যুক্ত থাকে। অ্যামিটারকে চিহ্ন দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
ভোল্টমিটার একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র যার সাহায্যে বর্তনীর যেকোনো দুই বিন্দুর মধ্যকার বিভব পার্থক্য ভোল্ট এককে পরিমাপ করা হয়। বর্তনীর যে দুই বিন্দুর বিভব পার্থক্য পরিমাপ করতে হবে, ভোল্টমিটারকে সেই দুই বিন্দুর সাথে সমান্তরালে সংযুক্ত করতে হয়।
যে যন্ত্রের সাহায্যে বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহের অস্তিত্ব ও পরিমাণ নির্ণয় করা যায় তাকে গ্যালভানোমিটার বলে। ভোল্টমিটার বা অ্যামিটারের মধ্যে গ্যালভানোমিটার থাকে। অ্যামিটার বা ভোল্টমিটারের কাজ মূলত গ্যালভানোমিটার করে থাকে।
বৈদ্যুতিক দূর্ঘটনা এড়ানোর জন্য বর্তনীতে যে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয় তা হলো ফিউজ। ফিউজ সাধারণত টিন ও সীসার একটি সংকর ধাতুর তৈরি ছোট সরু তার। এটি একটি চিনামাটির কাঠামোর উপর দিয়ে আটকানো থাকে। এর গলনাঙ্ক কম। এর মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে তা পুড়ে যায়।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা যেসব তড়িৎ যন্ত্রপাতি যেমন ইলেকট্রিক কেটলি, ইস্ত্রি ইত্যাদি ব্যবহার করি সেগুলোর মধ্য দিয়ে একটি নির্দিস্ট মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে তা নষ্ট হয়ে যায়। বাসা-বাড়ির তড়িৎ বর্তনীতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে সেটি হতে আগুন লাগতে পারে। এ ধরনের দুর্ঘটনা জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ বিশেষ ব্যবস্থা হলো ফিউজ তার ব্যবহার করা। একেই নিরাপত্তা ফিউজ বলে।
ফিউজ টিন ও সীসার একটি সংকর ধাতুর তৈরি ছোট তার। তারটি সরু এবং এর গলনাংক কম। বর্তনীতে ফিউজ সিরিজ বা শ্রেণি সংযোগে থাকে। তাই বর্তনীতে অতিরিক্ত মাত্রার তড়িৎ প্রবাহিত হলে এটি উত্তপ্ত হয়ে গলে যায়। ফলে তড়িৎ বর্তনী বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি রক্ষা পায়। তাই বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সুরক্ষায় ফিউজের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
৩০ অ্যাম্পিয়ার ফিউজ বলতে বুঝায় এর মধ্য দিয়ে ৩০ অ্যাম্পিয়ারের বেশি তড়িৎ প্রবাহিত হলে তারটি গলে যাবে।
বিদ্যুতের অপচয় রোধে তিনটি পদক্ষেপ হলো-
১. সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহারে স্ব-উদ্যোগী হওয়া
২. সাধারণ বাল্বের পরিবর্তে এনার্জি বাল্ব ব্যবহার করা
৩. বড় ফ্যাক্টরিগুলোতে নিজেদের জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা।
গ্যালভানোমিটার একটি সুবেদী যন্ত্র। গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে বেশি পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহিত হলে এটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি পুড়ে যেতে পারে। তাই গ্যালভানোমিটারকে রক্ষা করার জন্য ফিউজ তার সমান্তরালে সংযোগ করা হয়।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!