প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল ও আর্থিক অবস্থা, জানার জন্য যে বিবরণীসমূহ প্রস্তুত করা হয়, ঐ বিবরণীসমূহকে একত্রে আর্থিক বিবরণী বলে। আর্থিক বিবরণী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল, আর্থিক অবস্থা ও নগদ প্রবাহ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী, বন্ডহোল্ডার তথা হিসাববিজ্ঞান তথ্যের অন্যান্য ব্যবহারকারীর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের প্রধান দুটি লক্ষ্য হলো-
i. একটি নির্দিষ্ট হিসাবকালের আর্থিক ফলাফল নির্ণয় করা।
ii. একটি নির্দিষ্ট তারিখে প্রতিষ্ঠানের মোট সম্পদ, দায় ও মালিকানাস্বত্ব নিরূপণ করা।
আন্তর্জাতিক হিসাব মান- ০১ অনুযায়ী ৫ প্রকারের আর্থিক
বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। যথা-
i. বিশদ আয় বিবরণী,
ii. মালিকানাম্বত্বে পরিবর্তন বিবরণী,
iii. আর্থিক অবস্থার বিবরণী,
iv. নগদ প্রবাহ বিবরণী,
V. আর্থিক অবস্থার বিবরণীতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় নোট ও গুরুত্বপূর্ণ হিসাবের নীতিমালা।
ব্যবসায়ের আর্থিক ফলাফল তথা লাভ-ক্ষতি নিরূপণ করা হয় বিশদ আয় বিবরণী হতে। প্রতিষ্ঠানের সকল মুনাফাজাতীয় আয়-ব্যয়ের সমন্বয়ে বিশদ আয় বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। এই বিবরণী প্রস্তুতের মাধ্যমে ব্যবসায়ের বিক্রীত পণ্যের ব্যয়, মোট লাভ, নিট লাভইত্যাদি জানা যায়। বিভিন্ন আর্থিক বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশদ আয় বিবরণীর মাধ্যমে ব্যবসায়ের নিট লাভ জানা যায়। ব্যবসায়ের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নিট লাভের পরিমাণ জানা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর ফলে মালিক নিট লাভের অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে না। আবার বিশদ আয় বিবরণী আয়-ব্যয় সম্পর্কেও তথ্য দিয়ে থাকে। ফলে তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ব্যয় কমিয়ে নিট লাভ বাড়ানো যায়।
নির্দিষ্ট হিসাবকালের শেষে লাভ-ক্ষতি নিরূপণের জন্য যে বিবরণী প্রস্তুত করা হয় তাকে বিশদ আয় বিবরণী বলে। এ বিবরণীতে মুনাফাজাতীয় আয় এবং ব্যয় শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। এ বিবরণী হতে বিক্রীত পণ্যের ব্যয়, মোট মুনাফা বা মোট ক্ষতি, পরিচালন ব্যয়, পরিচালন মুনাফা বা ক্ষতি, অন্যান্য আয়-ব্যয়, নিট মুনাফা বা নিট ক্ষতি ইত্যাদির পরিমাণ জানা যায়।
বিশদ আয় বিবরণীর প্রধান দুটি উদ্দেশ্য হলো-
i. বিশদ আয় বিবরণীর মাধ্যমে ব্যবসায়ের নিট লাভ বা ক্ষতি জানা যায়।
ii. এই বিবরণীর মাধ্যমে বিভিন্ন আয় এবং ব্যয়গুলো বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে কীভাবে আয় বাড়িয়ে এবং ব্যয় কমিয়ে নিট মুনাফা বাড়ানো যায় তার ব্যবস্থা করা যায়।
পণ্য ক্রয়-বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের মূল পরিচালন আয় হলো পণ্য বিক্রয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বিশদ আয় বিবরণী তিনটি ধাপে প্রস্তুত করা হয়। প্রথম ধাপে নিট বিক্রয় থেকে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বাদ দিয়ে মোট মুনাফা নির্ণয় করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে মোট মুনাফা থেকে পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে পরিচালন মুনাফা নির্ণয় করা হয়। সর্বশেষ ধাপে পরিচালন মুনাফার সাথে অন্যান্য আয় ও ব্যয় সমন্বয় করে নিট লাভ নির্ণয় করা হয়।
কোনো নির্দিষ্ট সময়ে যে পণ্য বিক্রি হয়, তার জন্য ব্যয়িত খরচের সমষ্টিকে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বলা হয়। বিক্রীত পণ্যের ব্যয় = প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য + নিট ক্রয় ক্রয়সংক্রান্ত অন্যান্য খরচ- সমাপনী মজুদ পণ্য।
বিক্রীত পণ্যের সাথে যেসব খরচ সরাসরি জড়িত, তাকে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বলে। বিক্রীত পণ্যের ব্যয় নির্ণয়ে প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য, পণ্য ক্রয় এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষ খরচ যোগ করা হয়। তারপর সেখান থেকে সমাপনী মজুদ পণ্য বিয়োগ করে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় নির্ণয় করা হয়। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের নিট বিক্রয় থেকে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বাদ দিয়ে মোট মুনাফা নির্ণয় করা হয়।
সম্পদের দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে বিমা করা হয়। দালানকোঠা, যন্ত্রপাতি, মজুদ পণ্য ইত্যাদির দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি হলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই আর্থিক ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থাকেই বিমা বলা হয়। বিমা সুরক্ষার জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়। একে বিমা প্রিমিয়াম বলে।
দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে স্থায়ী সম্পত্তির ক্ষয় বা মূল্যহ্রাস হয়। এই মূল্যহ্রাসকে অবচয় বলে। অবচয়ের ফলে সম্পদের কার্যকারিতা কমাতে লিখিত মূল্য হ্রাস পায়। আবার অবচয় একটি খরচের ফলে ব্যবসায়ের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তাই প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জানার জন্য অবচয়ের হিসাব রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের সম্পদ ব্যবহার করে। যেমন- দালানকোঠা, যন্ত্রপাত্রি, মজুদ পণ্য ইত্যাদি। এসব সম্পত্তির দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণের জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাকে বিমা বলে। বিমা করার জন্য ব্যবসায়ীকে প্রতিবছর বিমা প্রিমিয়াম দিতে হয়।
ধারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দেনাদারের নিকট থেকে যে টাকা আদায় হবে না বলে নিশ্চিত, সেটিকে কুঋণ বলা হয়। দেনাদারের মৃত্যু, দেউলিয়া, নিখোঁজ প্রভৃতি কুঋণের কারণ।
ধারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দেনাদারের নিকট থেকে যে টাকা আদায় হবে না বলে সন্দেহ রয়েছে তাকে কুঋণ সঞ্চিতি বা সম্ভাব্য কুঋণ বলে। কুঋণ সঞ্চিতিকে ক্ষতি বিবেচনা করে বিশদ আয় বিবরণীর পরিচালন ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হয়।
কুঋণ ও কুঋণ সঞ্চিতির মধ্যে দুটি পার্থক্য হলো-
| কুঋণ | কুঋণ সঞ্চিতি |
i. কুঋণ একটি নিশ্চিত ক্ষতি। ii. কুঋণ রেওয়ামিলের ডেবিট পার্শ্বে দেখানো হয়। | i. কুঋণ সঞ্চিতি সম্ভাব্য ক্ষতির বিপক্ষে আগাম ব্যবস্থা। ii. কুঋণ সঞ্চিতি রেওয়ামিলের ক্রেডিট পার্শ্বে দেখানো হয়। |
কোনো ব্যবসায়ের মোট সম্পদের ওপর মালিকের দাবিকে মালিকানাস্বত্ব বলে। মালিকের এই দাবি মালিকানাস্বত্বের সমাপনী উদ্বৃত্তের মাধ্যমে জানা যায়। আর মালিকানাস্বত্বে পরিবর্তন বিবরণীর মাধ্যমে এই উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয়। মূলধনের সাথে অতিরিক্ত মূলধন, নিট মুনাফা এবং সাধারণ সঞ্চিতি যোগ করা হয় এবং নিট ক্ষতি, উত্তোলন, আয়কর বাদ দিয়ে মালিকানাস্বত্বের সমাপনী উদ্বৃত্ত অথবা মালিকের দাবি নির্ণয় করা হয়।
যে বিবরণীর মাধ্যমে হিসাবের শেষ দিনে মালিকানাস্বত্বের সমাপনী উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয় তাকে মালিকানাস্বত্ব বিবরণী বলে। প্রারম্ভিক মূলধনের সাথে অতিরিক্ত মূলধন, নিট মুনাফা/নিট ক্ষতি এবং উত্তোলন হিসাব সমন্বয় করে মালিকানাস্বত্ব বিবরণী প্রস্তুত করা হয়।
মালিকানাস্বত্বের প্রারম্ভিক উদ্বৃত্তের সঙ্গে অতিরিক্ত মূলধন আনয়ন, নিট লাভ/ক্ষতি ও উত্তোলন সমন্বয়ের পর বছরান্তে/হিসাবকালের শেষ দিন মালিকানাস্বত্বের সমাপনী উদ্বৃত্ত নির্ণয় করার জন্যই মালিকানাস্বত্বে পরিবর্তন বিবরণী প্রস্তুত করা হয়।
ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা জানা যায় সম্পদ, দায় ও মূলধনের সঠিক পরিমাণ হতে। সম্পদ, দায় ও মূলধনের সমন্বয়ে যে বিবরণী প্রস্তুত করা হয় তাকে আর্থিক অবস্থার বিবরণী বলে। আর্থিক অবস্থার বিবরণীর বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী এবং ব্যবস্থাপক আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। দায়-দেনা সম্পদের কত অংশ, চলতি সম্পদ চলতি দায় মেটাতে যথেষ্ট কি না ইত্যাদি তথ্য ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়।
ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা জানার জন্য হিসাবকালের শেষ দিনে ব্যবসায়ের সকল সম্পদ, দায় ও মূলধন নিয়ে যে বিবরণী প্রস্তুত করা হয় তাকে আর্থিক অবস্থার বিবরণী বলে। আর্থিক অবস্থার বিবরণী থেকে স্থায়ী ও চলতি সম্পদ, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি দায় এবং মালিকের মূলধনের পরিমাণ জানা যায়।
আর্থিক অবস্থার বিবরণীতে দুই স্তরে তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রথম স্তরে সম্পদসমূহ এবং দ্বিতীয় স্তরে মালিকানাস্বত্ব ও দায়সমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়।
আর্থিক অবস্থার বিবরণী সম্পদ, দায় ও মালিকানাস্বত্ব নিয়ে প্রস্তুত করা হয়। আর্থিক অবস্থার বিবরণীর দুটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তরে সম্পদসমূহ যথা- ১. স্থায়ী সম্পদ; ২. দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ; ৩. চলতি সম্পদ; ৪. অলীক সম্পদ লিপিবদ্ধ করা হয়। দ্বিতীয় স্তরে মালিকানাস্বত্ব ও দায় যথা- ১. মালিকানাস্বত্ব: ২. দীর্ঘমেয়াদি দায়; ৩. চলতি দায় লিপিবদ্ধ করা হয়। এভাবে সকল উপাদানের সমন্বয়ে আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত করা হয়।
আর্থিক অবস্থার বিবরণীর সম্পদসমূহকে চারটি ভাগে
দেখানো হয়। যথা-
i. স্থায়ী সম্পদ,
ii. দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ,
iii. চলতি সম্পদ,
iv. অলীক সম্পদ।
আর্থিক অবস্থার বিবরণীতে সম্পদ ও দায়কে দুটি পদ্ধতিতে সাজানো যায়। যথা-
i. স্থায়ী অগ্রাধিকার পদ্ধতি।
ii. তারল্যের অগ্রাধিকার পদ্ধতি।
বিশদ আয় বিবরণী ও আর্থিক অবস্থার বিবরণীর মধ্যে দুটি
পার্থক্য হলো-
| বিশদ আয় বিবরণী | আর্থিক অবস্থার বিবরণী |
i. আর্থিক ফলাফল (লাভ-ক্ষতি) নির্ণয়ের জন্য এ বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। ii. মুনাফাজাতীয় আয় ও মুনাফাজাতীয় ব্যয়সমূহ নিয়ে এ বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। | ⅰ.. আর্থিক অবস্থা প্রদর্শনের জন্য এ বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। ii. সম্পদ, দায় ও মূলধনসমূহ নিয়ে এ বিবরণী প্রস্তুত করা |
ব্যবসায়ে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ ও দায় রয়েছে। এদের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং ব্যবহার ভিন্ন রকমের। কোনো সম্পদ দ্রুত নগদে রূপান্তর করা হয় আবার কোনো সম্পদ স্থায়িভাবে ব্যবহার করা হয়। কোনো দায় তাড়াতাড়ি পরিশোধ করা হয় আবার কোনো দায় দেরিতে পরিশোধ করা হয়। সম্পদ এবং দায়ের শ্রেণি জানা থাকলে এদের ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। তাই সম্পদ ও দায়ের শ্রেণিবিভাগ জানা প্রয়োজন।
যে সকল সম্পদ দীর্ঘকাল ধরে ব্যবসায়ে ব্যবহৃত হয়, ঐ সকল সম্পদকে স্থায়ী সম্পদ বলে। যেমন- সুনাম, জমি, দালানকোঠা, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ইত্যাদি।
যে সকল সম্পদ এক বছর বা তার কম সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত হয়ে নিঃশেষিত হয়ে যায় অথবা যে সকল সম্পদকে এক বছর বা তার কম সময়ের মধ্যে নগদ টাকায় রূপান্তর করা যায় সে সকল সম্পদকে চলতি সম্পদ বলে। যেমন- নগদ অর্থ, ব্যাংক জমা, মজুদ পণ্য, দেনাদার প্রভৃতি।
যেসব সম্পদ পুনরায় বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয় না, দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয় এবং যে সম্পদ থেকে ভবিষ্যতে আর্থিক সুবিধা লাভের সুযোগ আছে তাকে স্থায়ী সম্পদ বলা হয়। স্থায়ী সম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক. দৃশ্যমান বা স্পর্শনীয় স্থায়ী সম্পদ এবং
খ. অদৃশ্যমান বা অস্পর্শনীয় স্থায়ী সম্পদ।
অলীক সম্পদ আসলে কোনো সম্পদ নয়। প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি খরচ মাত্র। যেমন- প্রাথমিক খরচ, বিলম্বিত বিজ্ঞাপন, শেয়ার বা ঋণপত্রের অবহার, অবলেখকের কমিশন ইত্যাদি।
যেসব দায়ের অর্থ দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধযোগ্য অর্থাৎ যার পরিশোধের মেয়াদকাল এক বছরের অধিক সময় হয় তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদি দায় বলে। যেমন- ঋণপত্র, বন্ধকি ঋণ, অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ইত্যাদি।
বন্ধকি ঋণ একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়। যে দায় দীর্ঘ সময়ের জন্য নেওয়া হয় তাকে দীর্ঘমেয়াদি দায় বলে। এসব দায়ের দায়বদ্ধতাও দীর্ঘ হয়ে থাকে। বন্ধকি ঋণ দীর্ঘ সময়ের জন্য গ্রহণ করা হয় এবং এর পরিশোধকালও দীর্ঘ হয়। তাই এটি দীর্ঘমেয়াদি দায়।
যেসব দায়ের অর্থ দ্রুত পরিশোধযোগ্য অর্থাৎ যার পরিশোধের মেয়াদকাল এক বছর বা তার কম সময় হয় তাদেরকে চলতি দায় বলে। যেমন- প্রদেয় হিসাব, প্রদেয় নোট, বকেয়া খরচসমূহ, অগ্রিম আয়, ব্যাংক জমাতিরিক্ত ইত্যাদি।
বকেয়া খরচ হলো ব্যবসায়ের চলতি দায়। এসব দায় দ্রুত পরিশোধ করা হয়। চলতি দায় সাধারণত এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করা হয়। বকেয়া খরচ এমন এক ধরনের দায় যা এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করা হয়। তাই বকেয়া খরচ একটি চলতি দায়।
ব্যবসায়ে ব্যবহারের ফলে স্থায়ী সম্পদ যেমন দালানকোঠা, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এই ক্ষয় বা ক্ষতিকে অবচয় বলে। এছাড়া মডেল পরিবর্তন, ব্যবহারকারীর রুচির পরিবর্তন, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখার কারণেও কোনো সম্পদের অবচয় হতে পারে।
নির্ভুল আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করতে হিসাববিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি মানা না হলে প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করা হবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এছাড়া সঠিকভাবে লাভ-ক্ষতি এবং সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ নিরূপণে এসব নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা আবশ্যক।
ব্যবসায়িক সত্তা নীতিতে মালিক এবং ব্যবসায়কে পৃথক বিবেচনা করা হয়। তাই মালিকের নামে হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না; বরং প্রতিষ্ঠানের নামে সকল হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। এই নীতি অনুসারে মালিকের মূলধন ব্যবসায়ের দায় হিসেবে গণ্য হয়। এবং মালিক কর্তৃক উত্তোলন ব্যবসায়ের নিজস্ব খরচ বিধায় মূলধনকে কমিয়ে দেয়।
ব্যবসায়ের মালিককে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক বিবেচনা করা হয়। তাই মালিকের নামে হিসাব না রেখে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নামে যাবতীয় হিসাব রাখা হয়। এজন্য মালিক কর্তৃক প্রদত্ত মূলধন ব্যবসায়ের একটি দায়। একই কারণে মালিক কর্তৃক উত্তোলন তার নিজস্ব খরচ, যা তার মূলধনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
চলমান প্রতিষ্ঠান ধারণা অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট মেয়াদি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানসমূহ অনির্দিষ্টকাল ধরে চলমান থাকবে বলে ধরে নেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর চলবে এবং ভবিষ্যতে এ ব্যবসা বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
চলমান নীতি অনুযায়ী ব্যবসায়ের নির্দিষ্ট কোনো আয়ুষ্কাল নেই। কিন্তু আর্থিক অবস্থা জানতে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা যায় না। তাই প্রতি বছরই আর্থিক অবস্থা জানার জন্য বিশদ আয় বিবরণী ও আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। প্রতিষ্ঠানের অনন্ত আয়ুষ্কালকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমান অংশে ভাগ করে নেওয়া হয়। একেকটি ভাগকে হিসাবকার বলে।
রক্ষণশীলতার নীতি অনুযায়ী মুনাফা নির্ণয়ে রক্ষণশীল হতে হবে অর্থাৎ যত দূর সম্ভব মুনাফা কম দেখাতে হবে। তাই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সকল ব্যয় ও ক্ষতিকে আয় বিবরণীতে লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু আয়ের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা থাকলে চলবে না বরং নিশ্চিত হতে হবে, নিশ্চিত আয়কেই আয় বিবরণীতে দেখাতে হবে।
ক্রয়মূল্য নীতি অনুযায়ী স্থায়ী সম্পদসমূহ যে মূল্যে ক্রয় করা হয়েছিল, সেই মূল্যেই প্রতিবছর আর্থিক অবস্থার বিবরণীতে দেখানো হয়। বাজারমূল্যে দেখানো হয় না, কারণ স্থায়ী সম্পদ বিক্রির জন্য নয় বরং দীর্ঘকাল ব্যবসায়ে ব্যবহারের জন্য ক্রয় করা হয়। ক্রয়মূল্য বলতে সম্পত্তি অর্জনে প্রদত্ত অর্থ ও ব্যবহার উপযোগী করার জন্য আনুষঙ্গিক খরচ উভয়কে বোঝায়।
অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের সম্পদকে খরচ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয় বস্তুনিষ্ঠতার ধারণা অনুসারে। প্রতিটি লেনদেন লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করা হয়। বস্তুনিষ্ঠতার ধারণা অনুসারে হিসাবরক্ষক তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে লেনদেনের প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে কম মূল্যের সম্পদ যেমন- ঘড়ি, স্ট্যাপলার, পাঞ্চিং মেশিন, ক্যালর Page 48 দি/সম্পদ হিসেবে না লিখে খরচ হিসেবে লেখা হয়।
বস্তুনিষ্ঠতার ধারণা বলতে হিসাবরক্ষকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা লেনদেনসমূহ হিসাবভুক্তকরণকে বোঝায়। হিসাবরক্ষককে প্রাসঙ্গিকতা ও অপ্রাসঙ্গিকতা বিচার করে হিসাবের বইতে লেনদেন লিপিবদ্ধ করতে হয়। এই ধারণা অনুযায়ী কোনো সম্পদের মূল্য অপেক্ষাকৃত কম হলে সেই সম্পদকে খরচ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। যেমন- ঘড়ি, স্ট্যাপলার, ক্যালকুলেটর ইত্যাদি। এসব সম্পদ দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহৃত হলেও মূল্য কম হওয়ায় তা সংশ্লিষ্ট বছরে খরচ হিসেবে দেখানো হয়।
ব্যবসায়ের সকল লেনদেন নগদে সম্পন্ন হয় না। অগ্রিম এবং বকেয়া ভিত্তিতেও লেনদেন সম্পন্ন হতে পারে। সমন্বয় দাখিলার মূল উদ্দেশ্য হলো আয়-ব্যয়কে সঠিক হিসাবকালে প্রদর্শন করা। এর ফলে কোনো বছরের আয়-ব্যয় অন্য বছরে প্রদর্শিত হয় না। সমন্বয় দাখিলা একটি হিসাবকালের সঠিক আয়-ব্যয় নিরূপণে প্রয়োজন।
সমাপনী মজুদ পণ্য বিক্রীত পণ্যের ব্যয়কে প্রভাবিত করার মাধ্যমে মোট মুনাফার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটায়। সমাপনী মজুদ পণ্যের হ্রাসে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। আবার সমাপনী মজুদের পরিমাণ বাড়লে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। পণ্য ক্রয় বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের মোট মুনাফা নির্ণয়ে বিক্রয় থেকে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বাদ দেওয়া হয়। ফলে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে মোট মুনাফা কমে এবং হ্রাস পেলে মোট মুনাফা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সমাপনী মজুদ পণ্য কমলে মোট মুনাফা কমবে, বাড়লে মোট মুনাফা বাড়বে।
যে আয় অর্জিত হয়েছে কিন্তু নগদে পাওয়া যায়নি তাকে প্রাপ্য আয় বলে। প্রাপ্য আয় একটি সম্পদ। উদাহরণ: প্রাপ্য বিনিয়োগের সুদ, প্রাপ্য বাড়িভাড়া।
ব্যবসায়ে যে সকল খরচ সংঘটিত হয়েছে কিন্তু নগদে প্রদান করা হয়নি তাকে বকেয়া ব্যয় বলে। যেমন- বকেয়া বেতন, বকেয়া ভাড়া, অপ্রদত্ত মজুরি ইত্যাদি।
ব্যবসায়ে যে সকল ব্যয় বা খরচ সংঘটিত হয়নি তবে ভবিষ্যৎ খরচের জন্য পূর্বেই টাকা প্রদান করা হয়েছে, এ সকল খরচকে অগ্রিম খরচ বলা হয়। যেমন- অগ্রিম বিমা প্রিমিয়াম, অগ্রিম বাড়িভাড়া প্রদান ইত্যাদি।
আয় অর্জিত হওয়ার পূর্বেই যেসব আয় হিসাবের খাতায় দায় হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে অনুপার্জিত আয় বলে। অগ্রিম প্রাপ্ত উপভাড়া, অগ্রিম শিক্ষানবিশ সেলামি ইত্যাদি।
প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনের ক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য দুটি * অনুপাত নির্ণয় করা হয়। যথা-

চলতি সম্পদ এবং চলতি দায়ের তুলনা করে অর্থাৎ চলতি সম্পদ ও চলতি দায়ের অনুপাত নির্ণয় করে ব্যবসায়ের চলতি দায় পরিশোধ ক্ষমতা জানা যায়। এর জন্য সাধারণত দুটি অনুপাত নির্ণয় করা হয়। যথা-

মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি যে তহবিল ব্যবহার করা হয় তাকে বিনিয়োজিত মূলধন বলে। প্রতিষ্ঠানের মোট সম্পত্তি থেকে চলতি দায় বাদ দিয়ে বিনিয়োজিত মূলধন নির্ণয় করা হয়। প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োজিত মূলধন দ্বারা কী পরিমাণ আয় অর্জিত হচ্ছে তা বিনিয়োজিত মূলধনের আয় অনুপাতের মাধ্যমে জানা যায়। এটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জন ক্ষমতা পরিমাপের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা জানা যায় আর্থিক বিবরণীর মাধ্যমে।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল ও আর্থিক অবস্থা জানার কাঠামোবদ্ধ সুশৃঙ্খল ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে বলে আর্থিক বিবরণী।
আর্থিক বিবরণীর ধাপ হলো বিশদ আয় বিবরণী, মালিকানাস্বত্ব বিবরণী, আর্থিক অবস্থার বিবরণী, নগদ প্রবাহ বিবরণী ও আর্থিক অবস্থার বিবরণীতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় নোট ও গুরুত্বপূর্ণ হিসাবের নীতিমালা।
বিশদ আয় বিবরণীর ইংরেজি রূপ Statement of comprehensive Income.
আর্থিক অবস্থার বিবরণী পূর্বে নাম ছিল উদ্বর্তপত্র।
আর্থিক অবস্থা বিবরণীর ইংরেজি রূপ Statement of Financial Position.
বিশদ আয় বিবরণীতে বিশ্লেষিত হয় সকল আয় ও ব্যয়।
কোন নির্দিষ্ট সময়ে যে পণ্যদ্রব্য বিক্রয় হয় তার জন্য ব্যয়িত খরচের যোগফলকে বলা হয় বিক্রীত পণ্যের মূল্য।
আর্থিক বিবরণীতে দেখানো হয় A.L.E. (সম্পদ, দায় ও মালিকানাস্বত্ব)।
সম্পদকে চার ভাগে। দেখানো হয়
স্বল্পকাল স্থায়ী এবং দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তরযোগ্য সম্পত্তিকে বলা হয় চলতি সম্পত্তি।
রেওয়ামিল বহির্ভূত বিভিন্ন তথ্য আর্থিক বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় সমন্বয় সাধন ।.
ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা জানা যায় বিশদ আয় বিবরণী ও আর্থিক অবস্থার বিবরণীর মাধ্যমে।
একাধিক বছরের আর্থিক অবস্থার তুলনামূলক মূল্যায়ন সম্ভব অনুপাত বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
নিট মুনাফার হার নির্ণয়ের সূত্র/ নিট মুনাফা /নিট বিক্রয়/× ১০০।
বিনিয়োজিত মূলধনের ওপর মুনাফার হার নির্ণয়ের সূত্র নিট মুনাফা/বিনিয়োজিত মূলধন /× ১০০
বিনিয়োজিত মূলধন মোট সম্পত্তি চলতি দায়
চলতি অনুপাতের সূত্র /চলতি সম্পত্তি/চলতি দায়
তারল্যের অনুপাতের সূত্র চলতি সম্পত্তি - (মজুদ পণ্য + অগ্রিম খরচ)
চলতি দায়
তারল্য অনুপাত নির্ণয়ে অগ্রিম ব্যয় বাদ দিতে হয় কারণ এটি আদায়যোগ্য নয় বলে।
চলতি অনুপাতের আদর্শমান ২:১।
তারল্য অনুপাতের আদর্শমান ১:১।
অস্পর্শনীয় ও অদৃর্শনীয়/অদৃশ্যমান সম্পত্তি সুনাম, ট্রেডমার্ক, প্যাটেন্ট ইত্যাদি।
স্পর্শনীয় সম্পত্তি ভূমি, দালানকোঠা, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি।
স্থায়ী সম্পত্তি ভূমি, দালানকোঠা, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, ইজারা সম্পত্তি ইত্যাদি।
চলতি সম্পত্তি হাতে নগদ, ব্যাংক জমা, বকেয়া আয়, অগ্রিম ব্যয়, প্রাপ্য বিল, দেনাদার, সমাপনী মজুদ পণ্য ইত্যাদি।
স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি দায় ঋণ, ঋণপত্র, বন্ধকিাশ।
চলতি বা স্বল্পমেয়াদি দায় পাওনাদার, প্রদেয় বিল, ব্যাংক জমাতিরিক্ত, পেনশন তহবিল, বিমা তহবিল ইত্যাদি।
আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয় রেওয়ামিলের ভিত্তিতে।
আর্থিক বিবরণী প্রণয়নের সময় নীতির প্রতি দৃষ্টি রাখা হয় ৮টি।
হিসাববিজ্ঞানের নীতিগুলো হলো ব্যবসায়িক স্বত্বা নীতি, চলমান প্রতিষ্ঠান ধারণা, হিসাবকাল ধারণা, বকেয়া ধারণা, রক্ষণশীলতার নীতি, ক্রয়মূল্য নীতি, সামঞ্জস্যতা নীতি ও বস্তুনিষ্ঠতা ধারণা।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
