বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত তহবিলের ব্যয়কে মূলধন ব্যয় বলে। এক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে মূলধনের যোগান দেওয়া হলে ব্যাংকের সুদ, আবার শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে মূলধনের যোগান দেওয়া হলে শেয়ারমালিকদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশ মূলধন ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
কাম্য ঋণনীতি বলতে প্রতিষ্ঠানের মোট মূলধনের কত অংশ-ধার বা ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হয় তাকে বোঝায়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই কাম্য ঋণনীতি বিদ্যমান থাকে। এ নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মালিকের মূলধন এবং ঋণকৃত মূলধন এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করা হয়।
সাধারণত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে। এগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ মূলধন, অগ্রাধিকার শেয়ার মূলধন, সাধারণ শেয়ার মূলধন এবং সংরক্ষিত আয় অন্যতম। মূলত এসব মূলধনের সংমিশ্রণকেই মূলধন মিশ্রণ বলা হয়
কর-সমন্বয়কৃত ঋণ মূলধন ব্যয়ের সূত্রটি হলো:
কর-সমন্বয়কৃত ঋণ মূলধন ব্যয় ঋণের সুদের হার (১- কর হার) × ১০০
সংরক্ষিত আয় নিজেদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ না করে অন্য কোথাও বিনিয়োগ করলে যে আয় অর্জন করা সম্ভব হতো সেটাই সংরক্ষিত আয়ের সুযোগ ব্যয়। কোনো কোম্পানি যদি তাদের অর্জিত মুনাফার পুরোটাই শেয়ারমালিকদের মধ্যে বণ্টন করে এবং শেয়ারমালিকরা সেই অর্থ অন্যত্র বিনিয়োগ করে ১৩% হারে আয় করে তবে উক্ত ১৩% হবে কোম্পানির সংরক্ষিত আয়ের সুযোগ ব্যয়।
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উৎস থেকে যে অর্থ সংস্থান করে থাকে, তাকে তহবিল বলা হয়। তহবিল বিভিন্ন খাত যেমন- শেয়ার ইস্যু করে, কিংবা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এ তহবিল কাঙ্ক্ষিত লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জন করে থাকে।
বিভিন্ন উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর লক্ষ্য অর্জনে যে ন্যূনতম পরিমাণ আয় করতে হয় তাকে প্রত্যাশিত আয় বলে। একজন বিনিয়োগকারী অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রথমত মূলধন খরচ নির্ধারণ করেন। এ মূলধন খরচ মেটাতে বিনিয়োগের ওপর সর্বনিম্ন যে হারে আয় প্রয়োজন হয় তা হলো প্রত্যাশিত আয়।
মূলধন ব্যয় হচ্ছে সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয় আয়ের হার। নতুন কোনো প্রকল্পের আয়ের হারের সাথে মূলধন ব্যয়ের তুলনা করে বিনিয়োগ সিন্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাই মূলধন ব্যয় নির্ণয় প্রয়োজন
পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে যেকোনো সময়ের জন্য সংগৃহীত তহবিল হলো দীর্ঘমেয়াদি তহবিল। দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের উৎসগুলো হলো দীর্ঘমেয়াদি ঋণ মূলধন, অগ্রাধিকার শেয়ার মূলধন, সাধারণ শেয়ার মূলধন এবং সংরক্ষিত আয়।
সাধারণ শেয়ার মূলধন ব্যয় বলতে লভ্যাংশ ও শেয়ারমূল্য বৃদ্ধিজনিত লাভ থেকে প্রত্যাশিত আয়ের হারকে বোঝায়। অন্যভাবে, সাধারণ শেয়ারের ব্যয় বলতে বিনিয়োগকারীদের সাধারণ শেয়ার বিনিয়োগ হতে প্রত্যাশিত আয়ের হারকে বোঝায়। এছাড়া সাধারণ শেয়ারের ব্যয়ের সাথে শেয়ার ইস্যু ও বিক্রয়জনিত খরচ জড়িত।
প্রথমত, অন্যান্য উৎসের ন্যায় কোম্পানি ইক্যুইটি মূলধনের ওপর সবসময় লভ্যাংশ দিতে বাধ্য থাকে না। দ্বিতীয়ত, লভ্যাংশ দিলেও প্রদত্ত লভ্যাংশের পরিমাণ বা হার সবসময় সমান থাকে না। এসব কারণে সাধারণ শেয়ার মূলধনের ব্যয় নির্ধারণ অন্যান্য উৎসের ব্যয় নির্ধারণ থেকে আলাদা।
সাধারণ শেয়ার মূলধন ব্যয় নির্ণয়ের দুটি অসুবিধা নিম্নরূপ:
(i) ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত লভ্যাংশ নির্ধারণ করা জটিল কাজ যেহেতু লভ্যাংশের হার নির্দিষ্ট থাকে না।
(ii) ভবিষ্যতে কোম্পানির আয় এবং লভ্যাংশ বৃদ্ধির হার অনুমান করা আরেকটি জটিল কাজ
সাধারণ শেয়ার মূলধন ব্যয় নির্ণয়ের পদ্ধতি দুটি। যথা: শূন্য লভ্যাংশ বৃদ্ধি পদ্ধতি ও স্থিরহারে লভ্যাংশ বৃদ্ধি পদ্ধতি।
শূন্য লভ্যাংশ বৃদ্ধি পদ্ধতি বলতে বোঝায় কোম্পানি বর্তমান বছরে যে লভ্যাংশ দিয়েছে, ভবিষ্যৎ বছরগুলোতেও সমপরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করবে। অর্থাৎ শেয়ার মালিকদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশের কোনো পরিবর্তন হবে না। এটি মূলধন ব্যয় নির্ণয়ের একটি সহজ পদ্ধতি।
কোম্পানির লভ্যাংশ প্রতি বছর একই হারে বৃদ্ধি পেলে তাকে স্থির হারে লভ্যাংশ বৃদ্ধি পদ্ধতি বলে। অর্থাৎ যখন কোম্পানির শেয়ার মালিকরা এমনভাবে লভ্যাংশ পায় যে, প্রতি বছর লভ্যাংশ বৃদ্ধি এবং স্থির হারে বাড়বে তখন তাকে স্থির হারে লভ্যাংশ বৃদ্ধি পদ্ধতি বলে।
প্রতিষ্ঠানের ঋণকৃত মূলধনের বিপরীতে যে সুদ প্রদান করা হয় তাকে ঋণ মূলধন ব্যয় বলে। ব্যবসায় সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মালিকের নিজস্ব মূলধন এবং ঋণকৃত মূলধনের প্রয়োজন হয়। যে প্রতিষ্ঠানের ঋণ মূলধন বেশি সে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকিও তত বেশি হয়। ঋণ মূলধন ব্যয় সবসময় করপরবর্তী ধরা হয় বিধায় প্রতিষ্ঠানের সার্বিক মূলধন ব্যয় হ্রাস পায়।
ঋণ মূলধন ও অগ্রাধিকার শেয়ারের মধ্যে পার্থকা নিম্নরূপ:
| ঋণ মূলধন ব্যয় | অগ্রাধিকার শেয়ারের ব্যয় |
| ১. ঋণ মূলধন সরবরাহকারীরা সাধারণত নির্দিস্ট মেয়াদের জন্য সুদ পেয়ে থাকে। | ১. অগ্রাধিকার শেয়ারমালিকরা নির্দিস্ট হারে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য লভ্যাংশ পেয়ে থাকে। |
| ২. ঋণদাতাদের কোম্পানি সুদ বাধ্য থাকে। | ২. কোম্পানি সর্বদা অগ্রাধিকারশেয়ারমালিকদের লভ্যাংশ দিতে বাধ্য থাকে না। |
ঋণ মূলধনের প্রধান উৎস হলো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত ঋণ। আবার বড় বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের পাশাপাশি বন্ড বা ঋণপত্র বিক্রির মাধ্যমে অর্থের সংস্থান করে থাকে।
ঋণের সুদের ওপর কর সুবিধা পাওয়া যায় অর্থাৎ ঋণের সুদ করবাদযোগ্য ব্যয়। তবে সাধারণ শেয়ার কিংবা অগ্রাধিকার শেয়ারের লভ্যাংশ করবাদযোগ্য নয়। তাই ঋণ মূলধন ব্যয় তুলনামূলক কম 1 হয়।
সমন্বয় করতে হয়। ঋণের সুদ করপূর্ব মুনাফা থেকে বাদ দিয়ে ! করযোগ্য মুনাফা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানকে কম কর দিতে হয়। এ সুবিধা বিবেচনায় ঋণ মূলধন ব্যয় নির্ণয়ে কর-সমন্বয় এ করা হয়।
সংরক্ষিত আয় বলতে কোম্পানি অর্জিত মুনাফার যে অংশ শেয়ারমালিকদের মধ্যে বণ্টন না করে ব্যবসায়ে সংরক্ষণ করে তাকে বোঝায়। কোম্পানি অর্জিত মুনাফা বা আয় বণ্টন না করলে শেয়ারমালিকরা উক্ত অর্থের অন্যত্র বিনিয়োগে প্রাপ্ত আয় থেকে বঞ্চিত হয়। এখানে অর্থের অন্যত্র বিনিয়োগে প্রাপ্ত আয় থেকে বঞ্চিত হওয়াটাকে সংরক্ষিত আয়ের সুযোগ ব্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
গড় মূলধন ব্যয় বলতে একটি কোম্পানির বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত মূলধনের গড় ব্যয়কে বোঝায়। মূলত দীর্ঘমেয়াদে ফার্মের সার্বিক মূলধন ব্যয় হলো গুরুত্ব প্রদত্ত মূলধন ব্যয়। এর মাধ্যমে মূলধন কাঠামোর খরচ নির্ণয় করে কাম্য মূলধন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
ইক্যুইটি মূলধন ও ঋণ মূলধনের মিশ্রণকে মূলধন কাঠামো । বলা হয়। ইক্যুইটি ও ঋণ মূলধনের মিশ্রণের অনুপাতের ওপর মূলধন । কাঠামোর খরচ নির্ভর করে। বিকল্প অনুপাতে মূলধন ব্যয় কম হলে সে মূলধন কাঠামো গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
প্রতিটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূলধন ব্যয় থাকে। মূলধন ব্যয় বলতে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত তহবিলের ব্যয় বুঝায়। সাধারণত তহবিলের যোগানদাতাদের প্রত্যাশিত আয় প্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধন ব্যয় হিসেবে গণ্য হয়। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উৎস থেকে প্রয়োজনীয় তহবিলের সংস্থান করে। তহবিলের বিভিন্ন উৎসের মূলধন ব্যয় সমান হয় না। ফলে প্রতিটি উৎসের পৃথকভাবে মূলধন ব্যয় নির্ণয়ের প্রয়োজন হয়। এ অধ্যায়ে আমরা মূলধন ব্যয়, মূলধন ব্যয় নির্ণয়ের গুরুত্ব, তহবিলের বিভিন্ন উৎসের মূলধন ব্যয় নির্ণয় এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব।

এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা -
- মূলধন ব্যয়ের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- মূলধন ব্যয় নির্ণয়ের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারব।
- মূলধন খরচ নির্ণয় করতে পারব।
- মূলধন খরচের ভিত্তিতে বিভিন্ন উৎসের মূল্যায়ন করতে পারব।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!