কৃষিকাজ করার জন্য যেসব ধারণা, পদ্ধতি, যন্ত্র বা জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলোই হচ্ছে কৃষি প্রযুক্তি। বিভিন্ন ফসলের উচ্চফলনশীল জাত, বিরূপ আবহাওয়া সহনশীল জাত, বিভিন্ন ধরনের চাষ পদ্ধতি, বিভিন্ন প্রযুক্তি যেমন- ট্রাক্টর, সবুজ সার ইত্যাদি কৃষি প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত।
ফসল বলতে চাষাবাদযোগ্য উদ্ভিদ অথবা কৃষিজাত উৎপাদিত পণ্যকে বোঝায়। বীজ, শাকসবজি কিংবা ফলমূল এগুলো সবই ফসল বা শস্যরূপে বিবেচিত। মানুষের ব্যবহার্য যেকোনো উদ্ভিজ্জ যা ফলানো বা সংগৃহীত হয়, তা সবই ফসলের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ খাদ্য, ফাইবার, জ্বালানি বা অন্যান্য উদ্দেশ্যে ফসল চাষ করে থাকে। সামগ্রিকভাবে ফসল চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত; খাদ্য ফসল, পশু খাদ্য, আঁশফসল ও বিবিধ।
ধান চাষোপযোগী মাটির বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ-
১. কংকর ও বেলেমাটি ছাড়া সবমাটিই ধান চাষের উপযোগী।
২. প্রকারভেদে উঁচু, মাঝারি, নিচু সব ধরনের জমিতেই চাষ করা যায়।
৩. মাটির অম্লাত্মক থেকে নিরপেক্ষ অবস্থা ধান চাষের অনুকূল।
ধান চাষোপযোগী মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য মাটিতে জৈব পদার্থ কম হলে কম্পোস্ট ব্যবহার করে এর মাত্রা বাড়াতে হবে। মাটির নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ, জিঙ্ক, সালফার ইত্যাদির মাত্রা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যায়।
মাটির বৈশিষ্ট্য বলতে মাটির শ্রেণি, জৈব পদার্থের মাত্রা, পটাশজাত খনিজের মাত্রা, pH মাত্রা এবং মাটির বন্ধুরতাকে বোঝায়। জমি চাষাবাদ, ফসল উৎপাদন ও মৃত্তিকা উর্বরতা ব্যবস্থাপনায় মাটির বৈশিষ্ট্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গম চাষোপযোগী মাটির দুটি বৈশিষ্ট্য-
১. উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি গম চাষের জন্য উপযোগী।
২. যে মাটিতে pH মাত্রা ৬.০ ৭.০ সেসব মাটিতে গম ভালো হয়।
ডাল চাষোপযোগী মাটির দুটি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ-
১. উঁচু ও মাঝারি জমিতে দোআঁশ, বেলে দোআঁশ, এঁটেল দোআঁশ এবং পলি দোআঁশ মাটিতে ডালজাতীয় ফসল ভালো জন্মে।
২. ডাল নিরপেক্ষ বা ক্ষারীয় চুনযুক্ত মাটিতে ভালো হয়।
শুষ্ক ও ঠান্ডা আবহাওয়া ও হালকা বৃষ্টিপাত ডাল চাষের জন্য ভালো। বেলে দোআঁশ মাটিতে বৃষ্টির পানি জমে থাকে না। আবার জমি একদম খটখটে শুকনো হয়েও থাকে না। তাই বেলে দোআঁশ মাটিতে ডাল ভালো জন্মে।
ডাল জাতীয় ফসল অতিরিক্ত পানি বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই বিনা চাষে ডাল ফসল উৎপাদনের জন্য নিচু ও মাঝারি জমি নির্বাচন করতে হবে। জমি থেকে বর্ষার পানি নেমে গেলে ভেজা মাটিতে ডাল ফসলের বীজ বোনা হয়।
ডাল জাতীয় ফসল অতিরিক্ত পানি বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে মূল পচে গিয়ে ডাল ফসল মারা যায়। এ কারণে ডাল চাষের জন্য দ্রুত পানি নিষ্কাশিত হয় এমন মাটিই প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে দোআঁশ, বেলে দোআঁশ, এঁটেল দোআঁশ এবং পলি দোআঁশ মাটি নির্বাচন করা হয়।
কোনো জমিতে জৈব পদার্থ প্রয়োগ করলে মাটির ভৌত এবং রাসায়নিক গুণাবলি উন্নত হয় এবং মাটি নরম ও ঝুরঝুরে হয়। গোল আলু যেহেতু মাটির নিচে বৃদ্ধি পায়। সেক্ষেত্রে আলু বড় হওয়ার জন্য নরম ও ঝুরঝুরে মাটি প্রয়োজন। একারণেই গোল আলুর জমিতে প্রচুর জৈব পদার্থ থাকা দরকার।
গোল আলু চাষোপযোগী মাটির বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ-
১. দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি আলু উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী।
২. আলুর জন্য বায়ু চলাচল করতে পারে এরূপ নরম ও ঝুরঝুরে মাটি দরকার। এতে আলু বড় হওয়ার সুযোগ পায়।
৩. গোল আলুর মাটিতে প্রচুর জৈব পদার্থ থাকা দরকার।
৪. মাটির pH মাত্রা ৬-৭ এর মধ্যে থাকা ভালো।
টমেটো চাষ উপযোগী মাটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-
১. যেকোনো মাটিতে টমেটোর চাষ করা যায়। তবে বেলে ও কংকরময় মাটিতে টমেটোর চাষ করা যায় না।
২. দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি টমেটো চাষের উপযোগী।
৩. মাটির pH মাত্রা নিরপেক্ষ হলে টমেটো চাষ ভালো হয়।
মাটির গঠন ও প্রকৃতি অনুযায়ী ৩০টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চলকে
৫টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটি অঞ্চল।
২. কাদা মাটি অঞ্চল।
৩. বরেন্দ্র ও মধুপুর অঞ্চল।
৪. পাহাড়ি ও পাদভূমি অঞ্চল।
৫. উপকূলীয় অঞ্চল।
কোনো একটি কৃষি পরিবেশ অঞ্চল প্রকৃতপক্ষে ঐ অঞ্চলের মাটির প্রতিনিধিত্ব করে। কৃষি কর্মকান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হলো মাটির বৈশিষ্ট্য ও বন্ধুরতা অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করা। কেননা এ কাজটি নিখুঁতভাবে করার ওপর কৃষিকাজের ফলাফল নির্ভর করে। এ কারণেই বাংলাদেশকে ত্রিশটি কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে।
মাটির বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ মাটির শ্রেণি, জৈব পদার্থের মাত্রা, পটাশজাত খনিজের মাত্রা, অম্লমান মাত্রা ও মাটির বন্ধুরতা অনুযায়ী বাংলাদেশকে ৩০টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে সেগুলোই হলো কৃষি পরিবেশ অঞ্চল।
পলি মাটি সাধারণত নদীবাহিত পলি দ্বারা গঠিত হয়। এ মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে। এছাড়া এ মাটির পানি পরিশোষণ ও ধারণ ক্ষমতাও বেশি। এসব কারণে পলি মাটিতে ফসল ভালো হয়।
দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটি অঞ্চলের মধ্যে দুটি পার্থক্য নিম্নরূপ:
দোআঁশ অঞ্চল | পলি দোআঁশ অঞ্চল |
১. জৈব পদার্থের মাত্রা অল্প থেকে মাঝারি। | ১. জৈব পদার্থের মাত্রা খুবই সামান্য। |
২. pH মাত্রা ৫.২ থেকে ৬.২ পর্যন্ত। | ২. pH মাত্রা ৪.৯ থেকে ৬.১ পর্যন্ত। |
দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটি অঞ্চলের সেচনির্ভর ফসলগুলো
নিম্নরূপ-
রবি মৌসুম: বোরো, আখ, আখ আলু, আখ + যুগ, পিয়াজ, রসুন, গম, আলু, মুগ, সরিষা ইত্যাদি
খরিপ-১ : রোপা আউশ, তোষাপাট, তিল, ভুট্টা।
খরিপ-২ : রোপা আমন।
মধুপুর অঞ্চল সমতল ও উঁচু ভূমিবিশিষ্ট। এ অঞ্চলের মাটি দোআঁশ প্রকৃতির। মাটিতে নিম্নমাত্রার জৈব পদার্থ ও পটাশজাত খনিজ পদার্থ রয়েছে। মাটির pH মাত্রা ৫.৫-৬.৫।
বরেন্দ্র ও মধুপুর অঞ্চলে বৃষ্টিনির্ভর ফসলের তালিকা নিম্নরূপ-
রবি মৌসুম: বোরো, আখ, আলু, সরিষা, মসুর, ছোলা, বার্লি ও শীতকালীন শাকসবজি।
খরিপ-১ : বোনা আউশ, পাট, কাউন, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি।
খরিপ-২ : রোপা আমন।
রাঙামাটি পাহাড়ি ও পাদভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত। এ অঞ্চলভুক্ত
হওয়ায় রাঙামাটির মাটিতে-
১. জৈব পদার্থ ও পটাশজাত খনিজের মাত্রা সামান্য।
২. মাটির pH মাত্রা ৫ - ৫.৭।
যেকোনো ফসল চাষের জন্য প্রয়োজন উন্নত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মাটি। দোআঁশ মাটি তেমনই এক উন্নত বৈশিষ্ট্যের মাটি যার পানি ধারণ ক্ষমতা ভালো এবং মাটিতে পুষ্টি উপাদানও বেশি। এ মাটি ফসল চাষের জন্য আদর্শ মাটি। পাহাড়ি ও পাদভূমি অঞ্চলের মাটি দোআঁশ হওয়াতে এ অঞ্চলে নানাবিধ ফসল উৎপাদন হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলে সেচ নির্ভর ফসল নিম্নরূপ-
রবি মৌসুম: বোরো, টমেটো, আলু, সরিষা, মুগ, মরিচ, তরমুজ।
খরিপ-১ : রোপা আউশ।
খরিপ-২ : রোপা আমন।
উপকূলীয় অঞ্চলে মাঝারি ভূমির আধিক্য বেশি। এর মাটি দোআঁশ এবং বেলে ও পলি দোআঁশ প্রকৃতির। এই অঞ্চলের মাটির pH মাত্রা ৭.০ - ৮.৫। অন্যদিকে তরমুজ নিরপেক্ষ বা ক্ষারীয় এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনযোগ্য মাটিতে ভালো জন্মে যা উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির বৈশিষ্ট্যে বিদ্যমান। এজন্য উপকূলীয় অঞ্চলে তরমুজ ভালো জন্মে।
গমের মাটি ঝুরঝুরা করে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। কারণ ঝুরঝুরা মাটি গমের অঙ্কুরোদগমের জন্য খুবই উপযোগী। মাটি ঝুরঝুরা না হলে গম বীজের অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হয়। এজন্য ৩ থেকে ৪ বার আড়াআড়ি জমি চাষ দিয়ে বার কয়েক মই দিয়ে মাটি ঝুরঝরে করতে হয়।
ভূমি কর্ষণের সাথে জড়িত দুটি প্রযুক্তি হলো-
১. বীজকে অঙ্কুরোদগমের জন্য উপযুক্ত স্থানে ও সঠিক গভীরতায় স্থাপন করা।
২. মাটিতে বায়ু চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধি করা
মুলা একটি কন্দ জাতীয় ফসল। এটি মাটির নিচে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। তাই বড় আকারের মূলা পাওয়ার জন্য মাটি ঝুরঝুরা হতে হয়। এ কারণে অর্থাৎ মাটি ঝুরঝুরা বা আলগা করার জন্য মুলা চাষের জমিতে ষোলটি চাষ দিতে হয়।
জমিতে নালা তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য হলো পানির অপচয় না করেই পুরো জমিতে সঠিকভাবে পানি বণ্টন করা। নালা থাকার কারণে জমির পানি নিষ্কাশনের সুবিধা হয়।
শুষ্ক মৌসুমে এবং শীতকালে প্রকৃতিতে বৃষ্টি-বাদল কম হয়। যার কারণে মাটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ কম থাকে। এই অবস্থায় জমিতে গভীর চাষ দেওয়া অনুচিত। কারণ মাটিতে গভীর চাষ দিলে - আর্দ্রতার অভাব দেখা দিবে এবং ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে
নিবিড় শস্য চাষে একটা ফসল তুলেই আর একটা ফসল লাগানো হয়। তখন জমিতে গভীর চাষের দরকার পড়ে না। কারণ তখন জমির মাটি এমনিতেই আলগা থাকে।
ভূমি কর্ষণের চারটি উদ্দেশ্য নিম্নরূপ-
১. মাটি বীজের অঙ্কুরোদগম অবস্থায় আনয়ন।
২. মাটি, সার ও জৈব পদার্থের মিশ্রকরণ।
৩. ভূ-অভ্যন্তরস্থ কীটপতঙ্গ দমন।
৪. মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ।
ফসলের জমিতে বীজ বপনের পূর্বে জমিতে চাষ দিতে হয় অর্থাৎ ভূমি কর্ষণ করতে হয়। সব জমির মাটির অবস্থা একরকম নয়। কোনো মাটিতে রস কম থাকে, মাটিতে রস থাকলে চাষের সময় 'মাটি সহজেই ঝুরঝরা হয় আর রস না থাকলে বড় বড় ঢেলা হয়।
মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য জমিতে সার এবং জৈব পদার্থ প্রয়োগ করতে হয়। ভূমি কর্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মাটির সাথে সার ও জৈব পদার্থের মিশ্রণ ঘটানো। এজন্য দুই একবার চাষ দেওয়া হলে গোবর বা কম্পোস্ট ছিটাতে হয়। পরবর্তী চাষের সময় এগুলো মাটিতে মিশে যায়।
ভূমি কর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো উঁচু-নিচু জমিকে সমতল করা এবং আঁটসাঁট করা। তাতে বৃষ্টি বা সেচের পানি গড়িয়ে অন্যত্র যেতে পারে না। যার ফলে মাটি পানির সাথে কোথাও স্থানান্তরিত হয় না বিধায় মাটি ক্ষয়প্রাপ্তও হয় না। এভাবে ভূমিকর্ষণ মাটির ক্ষয়রোধ করে।
অকর্ষিত ভূমি থেকে পানি তাড়াতাড়ি বাষ্প হয়ে যায় বা গড়িয়ে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু কর্ষিত জমিতে সেচের পানি আটকা পড়ে যা মাটি শুষে নেয়। এ কারণেই চাষ দিলে মাটির পানিধারণ ক্ষমতা বাড়ে।
ভূমি কর্ষণ মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অকর্ষিত ভূমি থেকে পানি তাড়াতাড়ি বাষ্প হয়ে যায় অথবা পানি গড়িয়ে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু কর্ষিত জমিতে সার বা সেচের পানি আটকা পড়ে যা পরে মাটি শুষে নেয়। অর্থাৎ কর্ষিত জমির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
ফসল মাটি থেকে তার পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে থাকে। মাটির পুষ্টিগুণ নির্ভর করে মাটিতে বিদ্যমান জৈব পদার্থের ওপর। মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা ও অন্যান্য গুণকেও নিয়ন্ত্রণ করে। মাটির এসব গুণ বৃদ্ধি করার জন্য কম্পোস্ট সার ব্যবহার করা হয়।
ভূমি কর্ষণের সময় ভূ-অভ্যন্তরস্থ পোকা, পুত্তলি, ডিম ইত্যাদি মাটির উপর উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং পাখি খেয়ে ফেলে। এভাবেই ভূমি কর্ষণ করে পোকামাকড় দমন করা যায়।
মাটিতে বিদ্যমান দুটি অণুজীব হলো-
১. ছত্রাক ও ২. ব্যাকটেরিয়া।
মাটির ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া মাটি থেকে মাটির জৈব পদার্থ পচনে সাহায্য করে। ভালোভাবে ভূমি কর্ষণ করলে মাটিম্ব জীবাণুগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। ফলে গাছ সহজে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে ও ফলন অনেক ভালো হয়।
ভূমি ভালোভাবে কর্ষণ করলে উঁচু-নিচু জমি সমতল ও আঁটসাঁট হয়। এর ফলে বৃষ্টি বা সেচের পানি গড়িয়ে অন্যত্র যেতে পারে না। এতে পানির অপচয় হয় না ও ভূমিক্ষয় রোধ হয়।
জমি চাষ কেমন হবে তা নির্ভর করে কৃষক কি ধরনের ফসল ফলাবেন। একেক ধরনের ফসলের ক্ষেত্রে জমি চাষ একেক রকম। যেমন- ধান চাষের জন্য কয়েকবার আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে জমি কর্দমাক্ত হতে হয়। আখ ও আলু চাষের জন্য গভীরভাবে জমি চাষ করতে হয়। কিন্তু মুলা, মরিচ ইত্যাদির জন্য মাটি মিহি ঝুরঝুরা করে চাষ করতে হয়।
জমি চাষে মাটির প্রকার বিবেচনা করতে হয়। কারণ, কাদা মাটিতে বেশি আর্দ্রতা বা ভেজা থাকলে চাষ করা যায় না। মাটির 'জো' আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আবার হালকা মাটি যেমন দোআঁশ, পলি দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটিতে আর্দ্রতা একটু বেশি থাকলেও চাষ করা যায়। এই মাটিগুলো চাষের জন্য খুব ভালো।
জমি চাষের বিবেচ্য বিষয়গুলো নিম্নরূপ-
১. ফসলের প্রকার,
২. মাটির প্রকার,
৩. আবহাওয়া ও
৪. খামারের প্রকার।
মাটির আর্দ্রতার তারতম্যে আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। বৃষ্টি-বাদল কম হলে, অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুম বা শীতকালে মাটিতে আর্দ্রতার অভাব দেখা যায়। অন্যদিকে বর্ষাকালে যখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় তখন মাটিতে প্রচুর আর্দ্রতা থাকে।
বিভিন্ন প্রকার ফসলের বীজের আকার বিভিন্ন রকম। যেসব বীজের আকার ছোট তারা শক্ত মাটিতে সহজে অঙ্কুরোদগম করতে পারে না। তাদের জন্য নরম ও ঝুরঝুরে মাটি প্রয়োজন। এ কারণেই ফসলভেদে চাষের ধরন আলাদা হয়।
কাদামাটিতে বেশি আর্দ্রতা বা ভেজা থাকলে চাষ দেওয়া যায় না। কেননা এতে মাটি ঝুরঝুরে হয় না। এ কারণেই চাষ দেওয়ার পূর্বে মাটিতে জো আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ভূমিক্ষয়ের প্রধান চারটি কারণ হলো-
১. বৃষ্টিপাত,
২. ঘূর্ণিবাত্যা,
৩. নদীর স্রোত ও
৭৪. বন জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ
ভূমিক্ষয় দুই প্রকার। যথা-
১। প্রাকৃতিক ভূমিক্ষয় ও
২। মনুষ্য কর্তৃক ভূমিক্ষয়।
প্রাকৃতিক ভূমিক্ষয়কে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(ক) বৃষ্টিপাতজনিত ভূমিক্ষয় এবং
(খ) বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়।
প্রকৃতিতে ব্যাপকভাবে ভূমিক্ষয় হয়। ভূ-সৃষ্টির শুরু থেকেই এর ক্ষয় শুরু হয়েছে। দীর্ঘকালের এই ক্ষয়ের ফলেই নদীর মোহনায় বা সমুদ্র চর সৃষ্টি হয়েছে বা দ্বীপ গড়ে উঠেছে। এই ভূমিক্ষয়ের ফলে পৃথিবীর অনেক অঞ্চল উর্বর হয়েছে, আবার অনেক অঞ্চল অনুর্বর হয়েছে।
বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাত প্রাকৃতিক ভূমিক্ষয়ের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। এগুলো চলার পথে ভূপৃষ্ঠের মাটির কণা বহন করে নিয়ে যায়। এজন্য যে পরিমাণ মাটির ক্ষয় হয় তা খুবই নগণ্য এবং দৃষ্টিগোচর হয় না। এই কারণে প্রাকৃতিক ভূমিক্ষয়কে স্বাভাবিক ক্ষয় বলা হয়।
বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশে ব্যাপক ভূমিক্ষয় হয়। এই ভূমিক্ষয়কে নিচের চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-
১. আস্তরণ ভূমিক্ষয়,
২. রিল ভূমিক্ষয়,
৩. নালা বা গালি ভূমিক্ষয় ও
৪. নদী ভাঙন।
যখন বৃষ্টির পানি বা সেচের পানি উঁচু স্থান থেকে ঢাল বেয়ে জমির উপর দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয় তখন জমির উপরিভাগের নরম ও উর্বর মাটির কণা কেটে পাতলা আবরণের বা আন্তরণের মতো চলে যায়। একেই আস্তরণ ভূমিক্ষয় বলা হয়।
নালা ভূমিক্ষয় আস্তরণ ভূমিক্ষয়ের তৃতীয় ধাপ। অর্থাৎ রিল ভূমিক্ষয় থেকেই নালা বা গালি ভূমিক্ষয়ের উদ্ভব। দীর্ঘকাল রিল ভূমিক্ষয়ের ফলে এর ছোট ছোট নালাগুলো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর ফসলের মাটিও বেশি ক্ষয় হতে থাকে। এক সময় এগুলো নর্দমা বা ছোট নদীর মতো দেখায়। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যত বেশি হয় নালা বা গালি ভূমিক্ষয় ততই বেশি হয়। নালা ভূমিক্ষয়! বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে দেখা যায়।
আস্তরণ ভূমিক্ষয়ের কারণ হলো যখন বৃষ্টির পানি বা সেচের পানি উঁচু স্থান থেকে ঢাল বেয়ে জমির উপর দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয় তখন জমির উপরিভাগের নরম ও উর্বর মাটির কণা কেটে পাতলা আবরণের বা আস্তরণের মতো চলে যায়। এর ফলে আস্তরণ ভূমিক্ষয়ের সৃষ্টি হয়। বৃষ্টির ফলে এ ভূমিক্ষয় হয় তাই সহজে। চোখে পড়ে না। কিন্তু কয়েক বৎসর পর বোঝা যায় যে জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে। আর এর কারণ হলো আস্তরণ ভূমিক্ষয়।
রিল ভূমিক্ষয়ের ফলে হাতের রেখার মতো রেখা সৃষ্টি হয়। রিল ভূমিক্ষয় হলো আস্তরণ ভূমিক্ষয়ের দ্বিতীয় ধাপ। প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে পানি বেশি হলে জমির ঢাল বরাবর লম্বাকৃতির রেখা সৃন্টি হয়। যা অনেকটা হাতের রেখার মতো। এই ছোট ছোট রেখা কালক্রমে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বড় হতে থাকে।
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে নালা বা গালি ভূমিক্ষয় দেখা যায়। নালা ভূমিক্ষয় আস্তরণ ভূমিক্ষয়ের তৃতীয় ধাপ। দীর্ঘকাল ধরে রিল ভূমিক্ষয়ের ফলে এর ছোট ছোট নালাগুলো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর ফসলের মাটিও ক্ষয় হতে থাকে। একসময় এগুলো নর্দমা বা ছোট নদীর মতো দেখায়।
নালা বা গালি ভূমিক্ষয়ের ফলে জমিকে ছোট নদীর মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়। এই ভূমিক্ষয়টি রিল ভূমিক্ষয় থেকে উদ্ভব হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে রিল ভূমিক্ষয়ের ফলে এর ছোট ছোট নালাগুলো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর ফসলের মাটিও বেশি ক্ষয় হয়ে থাকে। একসময় এগুলো নর্দমা বা ছোট নদীর মতো দেখায়।
পার্বত্য অঞ্চল ঢালু হওয়ায় সেখানে পানি বেশি বেগে প্রবাহিত হয়, ফলে রিল ভূমিক্ষয়ে সৃষ্ট রেখাগুলো সহজেই বড় হয়ে নালা বা নদীর আকার ধারণ করে। এটিই পার্বত্য অঞ্চলে নালা ভূমিক্ষয় বেশি হওয়ার কারণ।
নদীভাঙন বাংলাদেশের ভূমিক্ষয়ের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। বর্ষার শুরুতে কিংবা বর্ষার শেষে নদীতে প্রবল স্রোত সৃস্টি হয়। যা নদী তীরে আছড়ে পড়ে। এর ফলে নদী তীরের কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদীভাঙনে চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জ, গোয়ালন্দ প্রভৃতি অঞ্চলে প্রতিবছরই শত শত হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
বাত্যাজনিত ভূমিক্ষয় হলো গতিশীল বায়ুপ্রবাহ কর্তৃক এক স্থানের মাটি অন্যত্র বয়ে নেওয়া। যেসব এলাকা সমতল, তুলনামূলকভাবে গাছপালা কম এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কম সেসব এলাকায় বাত্যাজনিত ভূমিক্ষয়ের প্রকোপ দেখা যায়।
বেলে ও বেলে দোআঁশ মাটি আলগা ও হালকা। কাজেই প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হলে এসব মাটি সহজেই উড়ে যায়। আবার যে স্থানের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ একেবারেই কম সে স্থানের বায়ুজনিত ভূমিক্ষয় আরও বেশি হয়।
ভূমিক্ষয়ের দুটি ক্ষতিকর দিক হলো:
১. ভূমিক্ষয়ের কারণে জমির পুষ্টিসমৃদ্ধ উপরের স্তরের মাটি অন্যত্র চলে যায়। ফলে মাটির উর্বরতার ব্যাপক অপচয় হয়।
২. ভূমিক্ষয়ের ফলে মাটিতে পুষ্টির অভাব দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে ফসলের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে।
ভূমিকর্ষণ, পানি সেচ, পানি নিষ্কাশন ইত্যাদি কাজ কৃষিকাজের মূল অংশ। এ কাজগুলো দ্বারা মাটিকে প্রতিনিয়ত উৎপীড়ন করা হচ্ছে। ফলে ভূমিগুলো প্রাকৃতিক শক্তির তথা বৃষ্টি ও বাভাসের নিকট উন্মোচিত করছে এবং ক্ষয় হচ্ছে। মাটিকে যত ব্যবহার করা হবে ততই এর ক্ষয় হতে থাকবে।
ভূমিক্ষয়ের ফলে ক্ষয়িত মাটির এক বিরাট অংশ নদীতে জমা হয়। এতে নদীতে তলানি পড়ে নদীর গভীরতা কমে যায় এবং নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
ক্রমাগত ভূমিক্ষয়ের ফলে ধুয়ে যাওয়া মাটি নদীনালা, হাওর, বিল ইত্যাদির তলদেশে জমা হয়। এতে করে এদের গভীরতা ও পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই এর আশপাশের এলাকা প্লাবিত করে অর্থাৎ বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে।
মাটি যখন পানি শোষণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন অতিরিক্ত পানি একটি প্রবাহ সৃষ্টির মাধ্যমে উপর থেকে অপেক্ষাকৃত নিচের দিকে ধাবিত হয়। যাওয়ার পথে পানির সঙ্গে আলগা ও নরম মাটি স্থানান্তরিত হয়। এভাবে পানি প্রবাহের মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ঘটে।
যেসব ফসল মাটি ঢেকে রাখে তাদের আচ্ছাদিত ফসল বলে।
দুটি আচ্ছাদিত ফসল হলো-
১. চীনাবাদাম ও
২. মাষকলাই।
ভূমিক্ষয় রোধের দুটি পদ্ধতি নিম্নরূপ-
১। পানি প্রবাহ হ্রাসকরণ।
২। পানি নিষ্কাশনের সুবন্দোবস্তকরণ।
পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে ফসল চাষ করাকে জুম চাষ বলে। জুম চাষ করার ফলে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যায় ফলে মুষল ধারায় বৃষ্টি হলে সেখানকার মাটি অধিক পরিমাণে ধুয়ে চলে যায় ও পাহাড়ে ধস নামে।
জমিতে পানি জমা থাকলে এর সাথে বৃষ্টির পানি যুক্ত হয়ে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে এবং জমির মাটি আলগা হয়ে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু ঢাল অনুসারে কয়েক খণ্ডে চাষ করা হলে ভূমির এরূপ ক্ষয় রোধ করা যায়। কেননা এর ফলে প্রতি খণ্ড হতে আলাদা করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা যায়।
জৈব পদার্থ হলো মাটির প্রাণ। জমিতে জৈব পদার্থ অধিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে মাটির দানাবন্ধন ভালো হয়। তখন বৃষ্টির পানি মাটিকে ক্ষয় না করে সহজেই নিচের দিকে চলে যেতে পারে। ফলে মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।
পাহাড়ের ঢালে আড়াআড়ি সমন্বিত লাইনে সিঁড়ি বা ধাপ তৈরি করে ফসল উৎপাদন পদ্ধতিই হলো কন্টোর চাষ বা ধাপ চাষ।
বীজ সংরক্ষণ বলতে বীজের উৎপাদন, শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, বিপণন যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাকে বুঝায়। বীজ উৎপাদন থেকে বীজ সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শেষ হয়। অর্থাৎ বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে তা শুকানো পরিবহন মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রেখে দেওয়াই হচ্ছে বীজ সংরক্ষণ।
বীজ শস্য উৎপাদনে বীজের ক্ষেত থেকে আগাছা দমন, ভিন্ন জাতের গাছ তোলা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রব ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বীজের ক্ষেত ঘন ঘন পরিদর্শন করতে হয়।
বীজের জীবনীশক্তি হ্রাস পাওয়ার কারণ হলো অপর্যাপ্ত তাপে বীজ শুকানো এবং বেশি তাপমাত্রায় বীজ শুকানো। অপর্যাপ্ত তাপে বীজ শুকালে বীজে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থেকে যায় আবার বেশি তাপে বীজ শুকালে বীজ শক্ত হয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। এই দুটি কারণেই বীজের জীবনীশক্তি ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা হ্রাস পায়।
বীজ সংগ্রহের সময় এর আর্দ্রতা থাকে ১৮% ৪০% পর্যন্ত। এই আর্দ্রতা' বীজের জীবনীশক্তিকে দ্রুত নষ্ট করে দেয় হাই। বীজকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য বীজের আর্দ্রতা কমানো হয়।
দুই প্রকারে বীজ শুকানো যায়। যথা- ১. প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক বাতাসে শুকানো এবং ২. উত্তপ্ত বাতাসে শুকানো। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে সাধারণত বীজকে খোলা জায়গায় রেখে শুকানো হয় কিন্তু উত্তপ্ত বাতাসে বীজ শুকানোর সময় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উত্তপ্ত বাতাস উৎপন্ন করে বীজ শুকানো হয়।
বীজ শুকানোর সময় নির্ভর করে-
১. বীজের আর্দ্রতার মাত্রা,
২. বাতাসের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মাত্রা,
৩. বাতাসের গতি এবং
৪. বীজের পরিমাণের উপর।
বীজের জীবনীশক্তি ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতার উপর তাপমাত্রার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বেশি তাপমাত্রায় বীজ শুকালে বীজের সমূহ ক্ষতি হয়। যেমন- বীজের জীবনীশক্তি ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা হ্রাস - পায়। অন্যদিকে অপর্যাপ্ত তাপে বীজ শুকালেও একই রকম ফর্তি হয়। অর্থাৎ বীজের জীবনীশক্তি ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা হ্রাস পায়।
বীজ সংরক্ষণের চারটি শর্ত হলো-
১. বীজ উৎপাদন,
২. বীজ শুকানো,
৩. বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও
৪. বীজের মান নিয়ন্ত্রণ।
বীজ শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-
১. কেবল বীজের জন্যই ফসল চাষ করা।
২. নির্বাচিত জমির আশপাশের জমিতে ঐ নির্দিষ্ট বীজ ফসলের অন্য জাতের আবাদ না করা।
বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বীজ ফসলের পরিপক্ষতার দিকে দৃষ্টি রাখা। কারণ, ফসল পরিপক্ক হওয়ার সাথে সাথে তা সংগ্রহ করতে হয়। না হলে পশুপাখি রোগজীবাণু ও পোকার আক্রমণে বীজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং বীজের গুণগতমান কমে যায়।
পরিমিত তাপে দক্ষতার সাথে বীজ শুকালে-
১. সর্বোচ্চ মানের বীজ পাওয়া যায়।
২. বীজ দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা যায়।
৩. বীজের ব্যবসায় আর্থিক লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
বীজকে সুষ্ঠুভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে যেসব সুফল পাওয়া যায় তা হলো-
১. বীজের বিশুদ্ধতা বৃদ্ধি পায়।
২. বীজ দেখতে আকর্ষণীয় হয়।
৩. বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বাড়ে।
বীজের মান নিয়ন্ত্রণ বলতে কৃষিতাত্ত্বিক কলাকৌশল প্রয়োগ করে বীজ উৎপাদন হয়েছে কিনা, সঠিকভাবে ফসল কর্তন, মাড়াই ও ঝাড়াই হয়েছে কি না, সঠিকভাবে বীজ শুকিয়ে নির্দিষ্ট আর্দ্রতায় আনা হয়েছে বোঝায়।
বীজের মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি নমুনা বীজের মধ্যে বিশুদ্ধ বীজ, ঘাসের বীজ, অন্যান্য শস্যের বীজ ও পাথর থাকে। এদের মধ্যে বিশুদ্ধ বীজের শতকরা হার বের করাই হলো বীজের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা।
নমুনা বীজের শতকরা কতটি বীজ গজায় তা বের করাই হলো বীজের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা। যখন বীজের আর্দ্রতা ৩৫ ৬০% বা তার উপর হয় তখন অঙ্কুরোদগম শুরু হয়। এর হার শতকরায় প্রকাশ করা হয়।
নমুনা বীজের শতকরা কতটি বীজ গজায় তা বের করাই বীজের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা। এর হার শতকরায় প্রকাশ করা হয়। বীজের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষার জন্য ১০০টি বীজ গুণে একটি বেলে মাটিপূর্ণ মাটির পাত্রে রেখে পানি দ্বারা ভিজিয়ে রাখতে হবে। প্রতিদিন দেখতে হবে পানি যেন শুকিয়ে না যায়। নির্ধারিত সময় পরে বীজের অঙ্কুরোদগম শুরু হবে। যতটি বীজ গজাবে ততটি হবে বীজের অঙ্কুরোদগম হার।
বীজ থেকে আর্দ্রতা বের করে দিয়ে তাতে কতটুকু আর্দ্রতা আছে তা জানার পদ্ধতিকে বীজের আর্দ্রতা পরীক্ষা বলা হয়। তাঁ শতকরা হারে নিম্নোক্ত সূত্র দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
সূত্র: আর্দ্রতার শতকরা হার
=নমুনা বীজের ওজন - নমুনা বীজ শুকানোর পর ওজন × ১০০
নমুনা বীজের ওজন
বীজ সংরক্ষণের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো বীজের গুণগতমান রক্ষা করা এবং যেসব বিষয় বীজকে ক্ষতি করতে পারে সেগুলো সম্পর্কে সতর্ক হওয়া ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা।
বীজ নষ্ট হওয়ার দুটি কারণ নিম্নরূপ-
১. ফসল বাছাই, মাড়াই ও পরিবহনকালে বীজ নস্ট হয়।
২. ইঁদুর, পাখি, ছত্রাক, আর্দ্রতা ইত্যাদির কারণে বীজ নষ্ট হয়।
বীজ ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ। সঠিকভাবে বীজ সংরক্ষণ না করা হলে বীজের গুণগতমান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি সংরক্ষিত বীজে পোকার আক্রমণও হতে পারে। এজন্য বীজের বস্তায় বিষকাটালি মেশানো হয় যাতে পোকার উপদ্রব থেকে বীজ রক্ষা। পেশায়te
বীজ উৎপাদনের পর তা জমিতে রোপণের পূর্বে এর বিশুদ্ধতা জানা প্রয়োজন। কোনো বীজের বিশুদ্ধতা ৯০% এর কম হলে ভা বীজ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কেননা এ বীজ বপন করা হলে ভালো ফলন পাওয়া যায় না, এ কারণেই বীজের বিশুদ্ধতার হার নির্ণয় করা প্রয়োজন।
মটকা গ্রাম বাংলায় বহুল পরিচিত মাটি নির্মিত একটি গোলাকার পাত্র। মটকার বাইরে মাটি বা আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া হয়। গোলাঘরের মাচার নির্দিষ্ট স্থানে মটকা রেখে এর ভিতর শুকনো বীজ পুরোপুরি ভর্তি করা হয়। অতঃপর ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে উপরে মাটির প্রলেপ দিয়ে বায়ুরোধক করা হয়। এভাবে মটকায় বীজ সংরক্ষণ করা হয়।
অতিরিক্ত তাপমাত্রায় খাদ্যের পুষ্টিমান নষ্ট হয়। আবার কম তাপমাত্রায় পোকা-মাকড়সমূহ খুব ভালো জন্মায় ও খাদ্য খেয়ে ফেলে। তাদের মলমূত্র দ্বারা ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে। সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবেও খাদ্যের ভিটামিন নষ্ট হয়। তাই খাদ্যের এন্টাল তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল
খাদ্য সংরক্ষণ ও গুদামজাতকরণের সময় বাতাসের আপেক্ষিক | আর্দ্রতা ৬৫% বা এর নিচে থাকতে হবে। কারণ বাতাসে আপেক্ষিক । আর্দ্রতা ৬৫% এর বেশি থাকলে খাদ্যে ছত্রাক বা পেকামাকড় জন্মাতে পারে। যার ফলে খাদ্যের গুণগতমান এবং ওজন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মাছ চাষের ক্ষেত্রে পুকুরে বিভিন্ন খাবার দেওয়া হয়। তবে যে ধরনের খাদ্যই মাছ চাষের পুকুরে ব্যবহার করা হোক না কেন তার গুণগতমান ভালো হওয়া আবশ্যক। খাবারের গুণগতমান ভালো না হলে সুস্থ সবল পোনা ও মাছ হবে না, মাছ সহজেই রোগাক্রান্ত হবে এবং মাছের মৃত্যু হার অনেক বেড়ে যাবে। এমনকি মাছের বৃদ্ধিও আশানুরূপ হবে না।
আর্দ্রতা সংরক্ষিত খাদ্যের উপর, গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আর্দ্রতার উপর সংরক্ষিত খাদ্যের গুণগত মান নির্ভর করে। সংরক্ষিত খাদ্যে আর্দ্রতার পরিমাণ ১০% এর বেশি থাকলে খাদ্যে ছত্রাক বা পেকা-মাকড় জন্মাতে পারে। এতে করে খাদ্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে এবং গুণগতমান নষ্ট হতে পারে।
যে ধরনের খাদ্যই মাছ চাষের পুকুরে ব্যবহার করা হোক না কেন তার গুণগতমান ভালো হওয়া আবশ্যক। খাবারের গুণগতমান ভালো না হলে সুস্থ সবল পোনা ও মাছ তৈরি হবে না, মাছ সহজেই রোগাক্রান্ত হবে এবং মাছের মৃত্যুহার অনেক বেড়ে যাবে। আবার মাছের বৃদ্ধিও আশানুরূপ হবে না। ফলে মাছ চাষ লাভজনক হবে না। তাই মাছের খাবারের গুণগত মান ভালো হওয়া প্রয়োজন।
তাপমাত্রা খাদ্যের গুণগতমান নিয়ন্ত্রণে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কারণ, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় খাদ্যের পুষ্টিমান নষ্ট হয়। পোকা মাকড়সমূহ
২৬ ৩০° সে. তাপমাত্রায় খুব ভালো জন্মাতে পারে এবং এরা খাদ্য খেয়ে ফেলে ও তাদের মলমূত্র দ্বারা ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে। এভাবে তাপমাত্রা খাদ্যের গুণগতমান বিনষ্টে ভূমিকা পালন করে।
খোলা অবস্থায় খাদ্য রাখলে বাতাসের অক্সিজেন খাদ্যের রেন্সিডিটি বা চর্বির জারণ ক্রিয়া ঘটাতে পারে যা খাদ্যের গুণগতমানকে নষ্ট করে। এছাড়াও বাতাসের অক্সিজেন ছত্রাক ও পোকামাকড় জন্মাতেও সহায়তা করে।
গুদাম ঘরে সংরক্ষিত খাদ্য মেঝেতে রাখা উচিত নয়। কারণ, মেঝেতে রাখলে মেঝের আর্দ্রতায় খাদ্য দ্রব্যে আর্দ্র বা ভেজাভাব আসবে যা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া আক্রমণে সহায়তা করবে। এজন্য। খাদ্যের সঠিক গুণগতমান বজায় রাখতে খাদ্যকে মেঝেতে না রেখে ১২- ১৫ সে. মি. উপরে কাঠের পাটাতনের উপর রাখতে হবে।
খাদ্য সংরক্ষণের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে খাদ্যকে রোগজীবাণু ও পচনের হাত থেকে রক্ষা করা।
সাইলেজ ব্যবহারের সুবিধা হলো:
১. দীর্ঘদিন পুষ্টিমান অক্ষুণ্ণ থাকে।
২. এতে হে এর তুলনায় কম পুষ্টিমান অপচয় হয়।
৩. ঘাসের জমি সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়।
৪. সাইলেজ ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়াতেও করা যায়।
বাংলাদেশে প্রাপ্ত গবাদি পশুর খাদ্যের বেশিরভাগ কৃষি শস্যের উপজাত। এসব উপজাত শস্য মাড়াই বা শস্যদানা প্রক্রিয়াজাত করার পর পাওয়া যায়। বর্ষা মৌসুমে অনেক ঘাস উৎপাদিত হওয়ায় তা গবাদি পশুকে খাওয়ানোর পরও অতিরিক্ত থেকে যায়। আবার শীতকালেও অতিরিক্ত শিমগোত্রীয় ঘাস উৎপাদন হয়। এসব ঘাস সংরক্ষণ করে রাখলে যখন ঘাসের অভাব হয় তখন পশুকে সরবরাহ করা যায়।
পশুখাদ্য সংরক্ষণের দুটি পদ্ধতি হলো-
১. হে ও ২. সাইলেজ।
সাইলেজ তৈরির জন্য উপযোগী দুটি ঘাস হলো-
১. ভুট্টা ও ২. নেপিয়ার।
সবুজ ঘাসকে শুকিয়ে এর আর্দ্রতা ২০% বা তার নিচে নামিয়ে হে প্রস্তুত করা হয়। হে তৈরির সময় গাছকে সঠিকভাবে শুকানো হয় যাতে করে মোল্ডমুক্ত ও অতিরিক্ত তাপমুক্ত অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। এতে করে ভালো মানের হে তৈরি সম্ভব হয়।
শিম গোত্রীয় ঘাস যেমন- সবুজ খেসারি, মাষকলাই ইত্যাদি সংরক্ষণের উপযুক্ত পদ্ধতি হলো হে তৈরি করা। এজন্য ফুল আসার সময় ঘাস কেটে রোদে শুকিয়ে আর্দ্রতা ১৫-২০% এর মধ্যে নামিয়ে মাচার উপর স্তূপাকারে বা চালাযুক্ত ঘরে সংরক্ষণ করা হয়।
যে সম্পূরক খাবারে আমিষ, স্নেহ, শর্করা, খনিজ লবণ, ভিটামিন ইত্যাদি সকল পুষ্টি উপাদান যথাযথ মাত্রায় রেখে তৈরি করা হয় তাকে সুষম সম্পূরক খাদ্য বলে।
উদ্ভিদভোজী দুটি মাছ হলো-
১. সরপুঁটি ও ২. গ্রাসকার্প।
আমরা জানি, আমিষ হচ্ছে দেহ গঠনকারী খাদ্য উপাদান। এটি দেহের গঠন ও বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করে। মাছের সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে দ্রুত বড় আকারের মাছ পেতে সম্পূরক খাদ্যে আমিষের পরিমাণ বেশি রাখতে হয়। এজন্য মাছের পুষ্টি চাহিদা বলতে প্রধানত আমিষের চাহিদাকে বোঝায়।
সুস্থ সবল মাছ ও এর দৈহিক বৃদ্ধির জন্য মাছের খাবারে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকা আবশ্যক। এসব উপাদানের মধ্যে আমিষ বা প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ, এটি খাবারে বেশি মাত্রায় প্রয়োজন, এজন্য মাছের পুষ্টি চাহিদা বলতে প্রধানত আমিষের চাহিদাকে বোঝায়।
মাছের FCR নির্ণয়ের সূত্রটি হচ্ছে-
FCR = মাছকে প্রদানকৃত খাদ্য /দৈহিক বৃদ্ধি
দৈহিক বৃদ্ধি = আহরণকালীন মোট ওজন = মজুদকালীন মোট ওজন।
খৈলে এমন কিছু বিষাক্ত উপাদান থাকে যা মাছের জন্য ক্ষতিকর। খৈলকে পানিতে একদিন ভিজিয়ে রাখলে এ ক্ষতিকর উপাদান পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যায়। এ কারণে সেই খৈল ভেজানো পানি মাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা উচিত নয়।
FCR হলো Food Conversion Ratio. FCR বলতে প্রয়োগকৃত খাদ্য এবং খাদ্য গ্রহণের ফলে জীবের দৈহিক বৃদ্ধির অনুপাতকে বোঝায়। একটি খাদ্যের FCR সবসময় ১ থেকে বড় হয়। FCR এর মান কম হওয়ার অর্থ হলো অল্প পরিমাণ খাদ্য প্রয়োগ করে বেশি উৎপাদন পাওয়া। অর্থাৎ খাদ্য গুণগতমান সম্পন্ন হওয়ায় অল্প খাদ্যে উৎপাদন বেশি হয়েছে।
পোনা মাছ চাষের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ১ বার এবং মিশ্রচাষের ক্ষেত্রে ১৫ দিন বা মাসে ১ বার জাল টেনে কয়েকটি মাছের গড় ওজন নিয়ে পুকুরে সর্বমোট যতটি মাছ ছাড়া হয়েছিল তা দিয়ে গুণ করলে পুকুরে মোট মাছের ওজন পাওয়া যাবে। এভাবে দৈহিক বৃদ্ধির সাথে সমন্বয় করে খাবারের পরিমাণ ঠিক করে নিতে হবে।
খৈলে কিছু বিষাক্ত উপাদান থাকে যা মাছের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু খৈল একদিন পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এ বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায় ও বিষাক্ত উপাদান পানির সাথে বের হয়ে যায়। তাই খৈল একদিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে ব্যবহার করতে হয়।
সরপুঁটি হলো একটি উদ্ভিদভোজী মাছ। অর্থাৎ এটি উদ্ভিদাংশ খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই সরপুঁটি চাষের পুকুরে অতিরিক্ত খাদ্য সরবরাহের জন্য খুদিপানা দেওয়া হয়। এছাড়াও কুটিপানা, সবুজ ঘাস, হেলেঞ্চা, কচুরিপানার নরম অংশ ও বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতা যেমন-বাঁধাকপি, পুঁইশাক, কলাপাতা কেটে পুকুরে সরবরাহ করা হয়।
মাছের উপযুক্ত পুষ্টি লাভ ও দৈহিক বৃদ্ধির জন্য বাইরে থেকে খাবার দিতে হয়। আর তা দিতে হবে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে। এতে করে মাছ কর্তৃক খাদ্যের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে ও খাদ্যের অপচয় কম হবে।
শীতকালে মাছের বৃদ্ধি কম হয়। তাই খাদ্যের অপচয় রোধে ২ পুকুরে সম্পূরক কম মাত্রায় খাদ্য দিতে হয়। এ সময় খাদ্য প্রয়োগের ৪ হার স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেক বা তিন ভাগের এক ভাগ কমিয়ে আনতে হয়।
পশুপাখি পালনে সম্পূরক খাদ্যের অধিক গুরুত্ব রয়েছে। পশুপাখির উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এদেরকে প্রচলিত খাবারের সাথে বিশেষ খাদ্য সরবরাহ করা হয়। এতে পশুপাখির দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে এবং পরিপুষ্টি লাভ করে। এছাড়াও পশুপাখির মাংস, ডিম ও দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
ইউরিয়া মোলাসেস খড় এক ধরনের সম্পূরক খাদ্য। এটি খাওয়ালে গবাদিপশুর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে এবং পশু পরিপুষ্টি লাভ করে। এছাড়াও পশুর মাংস, দুধ ইত্যাদির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটে। এ কারণেই গরুকে ইউরিয়া মোলাসেস খড় খাওয়ানো হয়।
ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক এক ধরনের সম্পূরক খাদ্য। গবাদিপশুর উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এদেরকে প্রচলিত খাবারের সাথে সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ করা হয়। ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ালে গবাদিপশুর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে এবং পশু পরিপুষ্টি লাভ করে। এছাড়া গবাদিপশুর মাংস, দুধ ইত্যাদি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গবাদিপশুকে ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ানো হয়। তাই গবাদিপশু পালনে সম্পূরক খাদ্যের অধিক গুরুত্ব রয়েছে।
অ্যালজির পানি ব্যবহার করে কম খরচে গরুর মাংস এবং দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। সব বয়সের গরুকে সাধারণ পানির পরিবর্তে অ্যালজির পানি খাওয়ানো যায়। তবে পুষ্টিকর এ অ্যালজির পানিকে গরম করে খাওয়ানো উচিত নয় কারণ এতে অ্যালজির। খাদ্যমান নষ্ট হতে পারে।
গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত অ্যালজির মধ্যে প্রধান হলো ক্লোরেলা। এরা সূর্যালোক, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জৈব নাইট্রোজেন আহরণ করে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বেঁচে থাকে। এরা বাংলাদেশের মতো উষ্ণ জলবায়ুতে দ্রুত বর্ধনশীল।
অ্যালজি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পুষ্টিকর খাদ্য যা বিভিন্ন ধরনের আমিষ জাতীয় খাদ্য যেমন- খৈল, শুঁটকি, মাছের গুঁড়া ইত্যাদির বিকল্প হতে পারে। শুষ্ক অ্যালজিতে শতকরা ৫০ ৭০ ভাগ আমিষ। ২০২২ ভাগ চর্বি এবং ৮ ২৬ ভাগ শর্করা থাকে। এছাড়াও অ্যালজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন ধরনের বি ভিটামিন থাকে। অ্যালজি পানি ব্যবহার করে কম খরচে গরুর মাংস এবং দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এসব কারণে গরুকে অ্যালজি খাওয়ানো হয়।
যখন অ্যালজি পুকুরে পানির রং স্বাভাবিক গাঢ় সবুজ রং থেকে বাদামি রং হয়ে যায় তখন বুঝতে হবে যে উক্ত কালচারটি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে নতুন করে কালচার শুরু করতে হবে।
পশুপাখির উৎপাদন চলমান রাখার জন্য এদেরকে বাজারে তৈরি বিভিন্ন সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তন্মেধ্যে দুটি
সম্পূরক খাদ্য হলো-
১. আমিষ সম্পূরক খাদ্য- যেমন, প্রোটিন কনসেনটেট।
২. খনিজ সম্পূরক খাদ্য- ভিটামিন ও খনিজ প্রিমিক্স।
Related Question
View Allভূ-পৃষ্ঠের নরম স্তর যেখানে ফসল জন্মায়, বন সৃষ্টি হয়, গবাদিপশু বিচরণ করে তাকে মাটি বলে।
FCR (Food Conversion Ratio) হলো প্রয়োগকৃত খাদ্য ও খাদ্য গ্রহণের ফলে জীবের দৈহিক বৃদ্ধির অনুপাত। অর্থাৎ, ১ কেজি মাছ পেতে যত কেজি খাবার খাওয়াতে হয়, তাই FCR। FCR-এর মান কম হওয়ার অর্থ অল্প পরিমাণ খাদ্য প্রয়োগ করে অধিক উৎপাদন। যদি কম খাবার খেয়েও মাছের দ্রুত বৃদ্ধি হয় তবে বুঝতে হবে খাদ্যের গুণগত মান ভালো। সুতরাং, FCR-এর মান যত কম খাদ্যের গুণগত মান তত ভালো।
বীজ থেকে আর্দ্রতা বের করে দিয়ে তাতে কতটুকু আর্দ্রতা আছে তা নির্ণয় করার পদ্ধতিকে বীজের আর্দ্রতা পরীক্ষা বলে।
সফিক সাহেবের সংগ্রহকৃত নমুনা বীজের ওজন = ১০০ গ্রাম। আর্দ্রতা বের করার পর ওজন = ৯০ গ্রাম।
সুতরাং, সফিক সাহেবের বীজের আর্দ্রতার হার
= নমুনা বীজের ওজন – নমুনা বীজ শুকানোর পর ওজন/নমুনা বীজের ওজন × ১০০
অতএব, সফিক সাহেবের বীজের আর্দ্রতার হার ছিল ১০%।
সফিক সাহেব গমের আবাদ করার জন্য বীজের আর্দ্রতা, অঙ্কুরোদগম ও সতেজতা পরীক্ষা করেন।
সফিক সাহেবের বীজ পরীক্ষার কার্যক্রমটি তার সচেতনতার পরিচয় বহন করে। এই সচেতনতার কারণেই তিনি ভালো মানের বীজ বপন করে কাঙ্ক্ষিত ফলন পান। মূল জমিতে বপনের পূর্বে তিনি বীজের আর্দ্রতা পরীক্ষা করে নেন। গমের ক্ষেত্রে বীজের আর্দ্রতা ১২-১৩% রাখা ভালো। বীজের আর্দ্রতার হার যত বেশি হবে বীজের গজানোর ক্ষমতা ও তেজ ততই হ্রাস পাবে। তাই বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ও জীবনীশক্তি বাড়াতে উপযুক্ত আর্দ্রতায় শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর তিনি বীজের অঙ্কুরোদগম ও সতেজতা পরীক্ষা করেন। নমুনা বীজের শতকরা যতটি বীজ গজায় তাই বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা। ভালো বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা থাকে প্রায় ৮০% এর উপরে। অপরদিকে বীজের সতেজতা হলো প্রতিকূল পরিবেশে বীজের অঙ্কুরিত হওয়ার ক্ষমতা।
বীজের সতেজতা ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মানের না হলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে না।
পরিশেষে বলা যায়, সফিক সাহেব উল্লিখিত পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে বীজের মান নির্ধারণ করে উন্নত বীজ ব্যবহার করতে সক্ষম হন এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন পান। অর্থাৎ, তার বীজ পরীক্ষার কার্যক্রমটি যথার্থ ছিল।
প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য যে অতিরিক্ত খাদ্য দেওয়া হয় তাকে সম্পূরক খাদ্য বলে।
দেহের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য মাছ পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে ফাইটোপ্লাংকটন (উদ্ভিদকণা) ও জু-প্লাংকটন (প্রাণীকণা) খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু, মাছ চাষের ক্ষেত্রে অধিক উৎপাদন পাওয়ার জন্য পুকুরে অধিক ঘনত্বে পোনা ছাড়া হয়। এ অবস্থায় শুধু প্রাকৃতিক খাদ্য মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটাতে পারে না। এমনকি সার প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক খাদ্য বৃদ্ধি করলেও তা যথেষ্ট হয় না।
মাছকে প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশপাশি সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়। সম্পূরক খাদ্যে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের মাত্রা চাহিদা অনুযায়ী থাকে। যা মাছের দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে অধিক মুনাফা অর্জনে সহযোগিতা করে। অর্থাৎ, মাছ চাষে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক উৎপাদন পাওয়ার জন্য প্রাকৃতিক খাদ্য যথেষ্ট নয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!