সৃষ্টির সময় পৃথিবী ছিল একটি উত্তপ্ত গ্যাসপিন্ড। উত্তপ্ত অবস্থা থেকে এটি শীতল ও ঘনীভূত হয়। এই সময় পৃথিবীর বাইরের ভারী উপাদানগুলো এর কেন্দ্রের দিকে জমা হয়। আর হালকা উপাদানগুলো ভরের তারতম্য অনুসারে নিচের থেকে উপরে স্তরে স্তরে জমা হয়। পৃথিবীর এই বিভিন্ন স্তরকে মণ্ডল বলে।
পৃথিবীর বহিরাংশে ভূত্বকের পুরুত্ব কম হওয়ায় তাপ বিকিরণের ফলে সহজেই শীতল হয়ে কঠিন আকার ধারণ করেছে।
সূর্যের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ কালক্রমে তাপ বিকিরণ করে বর্তমান পৃথিবীর আকার ধারণ করেছে। ভূঅভ্যন্তরের অন্যান্য স্তরের তুলনায় ভূত্বকের পুরুত্ব সবচেয়ে কম, গড়ে ২০ কিলোমিটার। এ কারণে তাপ বিকিরণ করে পৃথিবীর বহিরাংশ কালক্রমে শীতল হয়ে কঠিন ভূত্বকের আকার ধারণ করেছে।
সৃষ্টির সময় পৃথিবী একটি উত্তপ্ত গ্যাসপিণ্ড ছিল। ধীরে ধীরে এটি শীতল ও ঘনীভূত হয়। ভারী উপাদানগুলো সেসময় কেন্দ্রে জমা হয়। হালকা উপাদানগুলো ভরের তারতম্যের কারণে স্তরে স্তরে জমা হয়। এজন্য পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ স্তরে স্তরে সজ্জিত।
ভূত্বকের নিচে প্রায় ২,৮৮৫. কিলোমিটার পর্যন্ত পুরুমণ্ডলকে গুরুমণ্ডল বলে। গুরুমণ্ডল মূলত ব্যাসল্ট শিলা দ্বারা গঠিত। এ অংশে রয়েছে সিলিকা, ম্যাগনেসিয়াম, লোহা, কার্বন ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ।
গুরুমণ্ডল দুই ধরনের। ঊর্ধ্ব গুরুমণ্ডল এ নিম্ন গুরুমণ্ডল। ঊর্ধ্ব গুরুমণ্ডল যা ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এ মন্ডল প্রধানত লোহা ও ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ সিলিকেট খনিজ দ্বারা গঠিত। আর নিম্ন গুরুমণ্ডল প্রধানত আয়রন অক্সাইড, ম্যাগনেসিয়াম এবং সিলিকন ডাইঅক্সাইড সমৃদ্ধ খনিজ দ্বারা গঠিত।
সমুদ্র তলদেশের ভূত্বক প্রধানত ব্যাসল্ট জাতীয় শিলায় গঠিত, যা শিয়াল স্তরের তুলনায় ভারী এবং এর প্রধান খনিজ উপাদানের নাম সিলিকন (Si) এবং ম্যাগনেসিয়াম (Mg); যা সাধারণভাবে সিমা (Sima) নামে পরিচিত।
শিলা হলো এক বা একাধিক খনিজের মিশ্রণ বা খনিজ পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। ভূত্বক গঠনকারী সকল কঠিন ও কোমল পদার্থই শিলা। উদাহরণস্বরূপ নুড়ি, কাঁকর, গ্রানাইট, কাদা, বালি প্রভৃতি। পঠনপ্রণালি অনুসারে আগ্নেয় শিলা, পাললিক শিলা ও রূপান্তরিত শিলা এ তিন ধরনের শিলা রয়েছে।
খনিজ হলো একটি প্রাকৃতিক' অজৈব পদার্থ, যার সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন আছে। এক বা একাধিক বৃনিজের সংমিশ্রণে শিলা তৈরি হয়। শিলা গঠনকারী প্রতিটি খনিজের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে। তাই শিলাকে এক বা একাধিক খনিজের মিশ্রণ বলা হয়।
কতকগুলো মৌলিক উপাদান প্রাকৃতিক উপায়ে মিলিত হয়ে যে যৌগ গঠন করে তাই খনিজ। খনিজ হলো একটি প্রাকৃতিক অজৈব পদার্থ যার সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন এবং ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম রয়েছে। খনিজ দুই বা ততোধিক মৌলের সমন্বয়ে গঠিত হলেও কিছু কিছু খনিজ একটিমাত্র মৌল দ্বারাও গঠিত হতে পারে। যেমন- হীরা, সোনা, তামা, রুপা, পারদ ও গন্ধক।
নিচে খনিজ ও শিলার মধ্যে দুটি পার্থক্য দেখানো হলো-
খনিজ | শিলা |
১. খনিজ এক বা একাধিক মৌলিক পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। | ১. শিলা এক বা একাধিক খনিজ পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। |
২. খনিজের ধর্ম এর গঠনকারী মৌলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। | ২. শিলার ধর্ম এর গঠনকারী খনিজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। |
এক বা একাধিক মৌলিক পদার্থের সমন্বয়ে খনিজ গঠিত। আর এক বা একাধিক খনিজের সমন্বয় শিলা গঠিত। খনিজ সমসত্ব অজৈব পদার্থ। অন্যদিকে শিলা অসমসত্ত্ব পদার্থ। তাই, ভূত্বক গঠনকারী উপাদান হওয়া সত্ত্বেও শিলা ও খনিজ আলাদা।
নিচের ছকাকারে খনিজ ও শিলার দুটি বৈশিষ্ট্য দেখানো হলো-
খনিজ | শিলা |
১. খনিজ কঠিন ও স্ফটিকাকার হয়। | ১. কিছু কিছু শিলা কঠিন হলেও স্ফটিকাকার হয় না। |
২. খনিজের নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংকেত আছে। | ১. কিছু কিছু শিলা কঠিন হলেও স্ফটিকাকার হয় না। |
জন্মের প্রথমে পৃথিবী একটি উত্তপ্ত গ্যাসপিন্ড ছিল। এই গ্যাসপিন্ড ক্রমান্বয়ে তাপ বিকিরণ করে তরল হয়। পরে আরও তাপ বিকিরণ করে এর উপরিভাগ শীতল ও কঠিন আকার ধারণ করে। এভাবে গলিত অবস্থা থেকে ঘনীভূত বা কঠিন হয়ে যে শিলা গঠিত হয় তাকে আগ্নেয় শিলা বলে। আগ্নেয়গিরি বা ভূমিকম্পের ফলে অনেক সময় ভূত্বকের দুর্বল অংশে ফাটলের সৃষ্টি হয়। তখন পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে উত্তপ্ত গলিত লাভা নির্গত হয়ে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি করে। এভাবে ব্যাসল্ট ও গ্রানাইট শিলার সৃষ্টি হয়।
ভূগর্ভের উত্তপ্ত তরল পদার্থ ম্যাগমা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা অন্য কোনো কারণে বেরিয়ে এসে শীতল হয়ে জমাট বেঁধে বহিঃজ আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি হয়, এদের দানা খুব সূক্ষ্ম এবং রং গাঢ়। এই - শিলার উদাহরণ হলো ব্যাসল্ট, রায়োলাইট, অ্যান্ডিসাইট ইত্যাদি।
উত্তপ্ত ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের বাইরে না এসে ভূগর্ভে জমাট বাঁধলে তৈরি হয় অন্তঃজ আগ্নেয় শিলা। এর দানাগুলো স্থূল ও হালকা রঙের হয়। গ্রানাইট, গ্যাব্রো, ডলোরাইট, ল্যাকোলিথ, ব্যাথোলিথ, ডাইক ও সিল এ শিলার অন্যতম উদাহরণ।
পলি সঞ্চিত হয়ে যে শিলা গঠিত হয়েছে তাকে পাললিক শিলা বলে। বৃষ্টি, বায়ু, তুষার, তাপ, সমুদ্রের ঢেউ প্রভৃতি শক্তির প্রভাবে আগ্নেয় শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত ও বিচূর্ণীভূত হয়ে রূপান্তরিত হয় এবং কাঁকর, কাদা, বালি ও ধূলায় পরিণত হয়। ক্ষয়িত শিলাকণা জলস্রোত, বায়ু এবং হিমবাহ দ্বারা পরিবাহিত হয়ে পলল বা তলানিরূপে কোনো নিম্নভূমি, হ্রদ এবং সাগরগর্ভে সঞ্চিত হতে থাকে। পরবর্তীতে ঐসব পদার্থ ভূগর্ভের উত্তাপে ও উপরের শিলাস্তরের চাপে জমাট বেঁধে কঠিন শিলায় পরিণত হয়।
পাললিক শিলা যৌগিক, জৈবেনিক বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হতে পারে। এর মধ্যে জৈবেনিক প্রক্রিয়ায় পাললিক শিলা গঠিত হলে তাকে জৈব শিলা বলে। জীবদেহ থেকে উৎপন্ন হয় বলে কয়লা ও খনিজ তেলকে জৈব শিলা বলা হয়।
আগ্নেয় ও পাললিক শিলা যখন প্রচণ্ড তাপ, চাপ ও রাসায়নিক ক্রিয়ার ফলে রূপ পরিবর্তন করে নতুন রূপ ধারণ করে তখন তাকে রূপান্তরিত শিলা বলে। ভূআন্দোলন, অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, রাসায়নিক ক্রিয়া কিংবা ভূ-গর্ভস্থ তাপ আগ্নেয় ও পাললিক শিলাকে রূপান্তরিত করে। যেমন- চুনাপাথর রূপান্তরিত হয়ে মার্বেল, কাদা ও শেল রূপান্তরিত হয়ে স্লেটে রূপান্তরিত
পৃথিবীর কঠিন ভূত্বকের কোনো কোনো অংশ প্রাকৃতিক কোনো কারণে কখনো কখনো অল্প সময়ের জন্য হঠাৎ কেঁপে ওঠে। ভূত্বকের এরূপ আকস্মিক কম্পনকে ভূমিকম্প বলে। ভূকম্পন সাধারণত কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয় আবার কখনো কিছু সময় পর পর অনুভূত হয়। এ কম্পন কখনো অত্যন্ত মৃদু আবার কখনো অত্যন্ত প্রচণ্ড হয়।
নিচে ভূমিকম্পের প্রধান দুটি কারণ উল্লেখ করা হলো-
- পৃথিবীর উপরিভাগ কতকগুলো ফলক/প্লেট দ্বারা গঠিত। এই প্লেটসমূহের সঞ্চালন প্রধানত ভূমিকম্প ঘটিয়ে থাকে।
- অগ্ন্যুৎপাতের ফলে প্লেটসমূহের উপর ভূকম্পন সৃষ্টি হয়।
নিচে ভূমিকম্পের অপ্রধান দুটি কারণ উল্লেখ করা হলো-
- কোনো কারণে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে বড় ধরনের শিলাচ্যুতি ঘটলে বা শিলাতে ভাঁজের সৃষ্টি হলে ভূমিকম্প হয়।
- ভূত্বক তাপ বিকিরণ করে সংকুচিত হলে ফাটল ও ভাঁজের সৃষ্টি হয়ে ভূমিকম্প হয়।
ভূমিকম্পের ফলে বহুবিধ পরিবর্তন ঘটে থাকে। তন্মধ্যে একটি পরিবর্তন বা ফলাফল তুলে ধরা হলো-
ভূমিকম্পের ফলে অনেক সময় সমুদ্রতল উপরে উত্থিত হয়, পাহাড়-পর্বত বা দ্বীপের সৃষ্টি করে। আবার কোথাও স্থলভাগের অনেক স্থান সমুদ্রতলে ডুবে যায়। ১৮৯৯ সালে ভারতের কচ্ছ উপসাগরের উপকূলে প্রায় ৫,০০০ বর্গকিলোমিটার স্থান সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়।
সুনামি হলো পানির এক মারাত্মক ঢেউ যা সমুদ্রের মধ্যে বা বিশাল হ্রদে ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সৃস্টি হয়ে থাকে। পানির নিচে কোনো পারমাণবিক বা অন্যকোনো বিস্ফোরণ, ভূপাত ইত্যাদি কারণেও সুনামি হতে পারে। সুনামির ক্ষয়ক্ষতি সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর আশেপাশে সুনামির ধ্বংসাত্মক লীলা সংঘটিত হয়।
সুনামির পানির ঢেউগুলো একের পর এক উঁচু হয়ে আসতেই থাকে তাই সুনামিকে ঢেউয়ের রেলগাড়ি বা ওয়েভ ট্রেন বলে। সুনামির পানির ঢেউ সমুদ্রের স্বাভাবিক ঢেউয়ের মতো নয়। এটা সাধারণ ঢেউয়ের চেয়ে অনেক বিশালাকৃতি একের পর এক উঁচু হয়ে ঢেউয়ের রেলগাড়ির ন্যায় আসতে থাকে।
ভূপৃষ্ঠের দুর্বল অংশের ফাটল বা সুড়ঙ্গ দিয়ে ভূগর্ভের উষ্ণ বায়ু, গলিত শিলা, ধাতু, ভন্ম, জলীয়বাষ্প, উত্তপ্ত পাথরখণ্ড, কাদা, ছাই প্রভৃতি প্রবলবেগে উর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হয়। ভূপৃষ্ঠে ঐ ছিদ্রপথ বা ফাটলের চারপাশে ক্রমশ জমাট বেঁধে যে উঁচু মোচাকৃতি পর্বত সৃষ্টি করে তাকে আগ্নেয়গিরি বলে।
নিচে আগ্নেয়গিরি অগ্নুৎপাতের দুটি কারণ উল্লেখ করা হলো- ভূত্বকে দুর্বল স্থান বা ফাটল দিয়ে ভূঅভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা, ভস্ম, ধাতু প্রবলবেগে বেয় হয়ে অগ্নুৎপাত ঘটায়। ভূআন্দোলনের সময় পার্শ্বচাপে ভূত্বকের দুর্বল অংশ ভেদ করে এ উত্তপ্ত তরল লাভা উপরে উত্থিত হয়। এভাবে আন্দোলনের ফলেও অগ্নুৎপাত হয়।
আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে ভূঅভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা, ভস্ম, ধাতু প্রবলবেগে বের হয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়। যেসব আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত অনেককাল আগে বন্ধ হয়ে গেছে তাদেরকে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বলে। জাপানের ফুজিয়ামা এরূপ একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি।'
ভূমিরূপ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক শক্তি যেমন- সূর্যতাপ, বায়ু, বৃষ্টি, নদী প্রভৃতি দ্বারা খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে নতুন ভূমিরূপে পরিণত হয়। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে ধীর পরিবর্তন বলে। এতে সূর্যতাপ, বায়ু, বৃষ্টি, নদী প্রভৃতি শক্তি খুব ধীরে ধীরে ভূত্বকের ক্ষয়সাধন করে থাকে। ফলে ভূত্বকের উপরিস্থিত শিলা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। এই শিলা অপসারিত হয়, আবার নতুন করে শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।
পর্বত বা হ্রদ থেকে যেসব ছোট নদী উৎপন্ন হয়ে কোনো বড় নদীতে পতিত হয় তাকে সেই নদীর উপনদী বলে। বাংলাদেশের তিস্তা ও করতোয়া হলো যমুনা নদীর উপনদী। তিস্তা ও করতোয়া এভাব . উৎপন্ন হয়ে যমুনা নদীতে পতিত হয়েছে।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ যেমন- বায়ুপ্রবাহ, নদীস্রোত, হিমবাহ প্রভৃতি দ্বারা শিলারাশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় একে ক্ষয়ীভবন বলে। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত শিলারাশি অপসারণ প্রক্রিয়ায় এক স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়।
বায়ুপ্রবাহ, নদীস্রোত, হিমবাহ প্রভৃতি শক্তির প্রভাবে নানাস্থান থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাগুলো যে প্রক্রিয়ায় কোনো একস্থানে এসে জমা হয়ে নতুন ভূমিরূপ সৃষ্টি করে তাকে অবক্ষেপণ বলে। যেসব প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ক্ষয়ীভবনের মধ্যদিয়ে ধীর পরিবর্তন সংঘটিত হয় তাদের মধ্যে বায়ু, বৃষ্টিপাত, নদী, হিমবাহ প্রভৃতি প্রধান।
মৃত্তিকা পাত বলতে এখানে মৃত্তিকা ক্ষয়কে বোঝানো হয়েছে। বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক শক্তি যেমন- ভূমিকম্প, ভূআলোড়ন, বায়ু, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা প্রভৃতি দ্বারা মাটির যে ক্ষয় হয় তাকে মৃত্তিকা ক্ষয় বা মৃত্তিকা পাত বলে। মৃত্তিকা পাতের ফলে পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, সমভূমি প্রভৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়েছে।.
নদীর ক্ষয়ক্রিয়ার ফলে সর্পিল বাঁকের সৃষ্টি হয়। কালক্রমে নদীচ্ছেদনের ফলে বক্রপথ পরিত্যাগ করে নদী সোজা পথে চলতে শুরু করে। তখন বাঁকের দুই মুখে ধীরে ধীরে পলি সঞ্চিত হতে থাকে। এভাবে কালক্রমে সর্পিল বাঁকের মুখ একেবারে বন্ধ হয়ে যায় এবং তা মূল নদী থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়। ঘোড়ার খুরের মতো দেখতে বলে এরূপ প্রাকৃতিক জলাশয়ের নাম অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ।
ঊর্ধ্বগতি অবস্থায় নদীর প্রবল স্রোত খাড়া পর্বতগাত্র বেয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এতে ভূপৃষ্ঠ ক্ষয় হয় এবং ভূত্বক থেকে শিলাখণ্ড ভেঙে পড়ে। শিলাগুলো পরস্পরের সঙ্গে এবং নদীখাতের সঙ্গে সংঘর্ষে মসৃণ হয়ে অনেক দূর চলে যায়। এসব পাথরের সংঘর্ষে নদীর খাত গভীর ও সংকীর্ণ হতে থাকে। নদীর দুপাশের ভূমিক্ষয় কম হলে বা না হলে এসব খাত খুব গভীর ও সংকীর্ণ হয়ে গিরিখাত সৃষ্টি করে। তাই সিন্ধু নদের গিরিখাতটি গভীর হয়।
পার্বত্য অঞ্চলে বেশ গভীর, সংকীর্ণ এবং খাড়া ঢালবিশিষ্ট ভূমিরূপকে গিরিখাত বলে। ঊর্ধ্বগতি অবস্থায় নদীর প্রবল স্রোত খাড়া পর্বতগাত্র বেয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এতে ভূপৃষ্ঠ ক্ষয় হয় এবং ভূত্বক থেকে শিলাখন্ড ভেঙে পড়ে। শিলাগুলো পরস্পরের সঙ্গে এবং নদীখাতের সঙ্গে সংঘর্ষে মসৃণ হয়ে অনেক দূর চলে যায়। এসব পাথরের সংঘর্ষে নদীর খাত গভীর ও সংকীর্ণ হতে থাকে। নদীর দুপাশের ভূমি ক্ষয় কম হলে বা না হলে এসব খাত খুব গভীর ও সংকীর্ণ হয়ে গিরিখাত সৃষ্টি করে। সিন্ধু নদের গিরিখাতটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গিরিখাত।
উর্ধ্বগতি অবস্থায় নদীর পানি যদি পর্যায়ক্রমে কঠিন শিলা ও নরম শিলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তাহলে কোমল শিলাস্তরটিকে বেশি পরিমাণে ক্ষয় করে ফেলে। এর ফলে নরম শিলাস্তরের তুলনায় কঠিন শিলাস্তর অনেক উপরে অবস্থান করে এবং পানি খাড়াভাবে নিচের দিকে পড়তে থাকে। পানির এরূপ পতনকে জলপ্রপাত বলে।
পাহাড়িয়া নদী অনেক সময় পাহাড়ের পাদদেশে পলি সঞ্চয় করে বিশাল সমভূমি গড়ে তোলে। একে পাদদেশীয় পলল সমভূমি বলে। বাংলাদেশের তিস্তা, আত্রাই, করতোয়া সংলগ্ন রংপুর ও দিনাজপুর জেলাল অধিকাংশ স্থানই পলল সমভূমি দ্বারা গঠিত। এসব নদী উত্তরের হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে সহজেই পাহাড় থেকে পলল বহন করে এ অঞ্চলে সঞ্চয় করে পাদদেশীয় পলল সমভূমি গঠন করেছে।
পর্বত থেকে নিচু কিন্তু সমভূমি থেকে উঁচু খাড়া ঢালযুক্ত ঢেউ খেলানো বিস্তীর্ণ সমতলভূমিকে মালভূমি বলে। মালভূমির উচ্চতা শত মিটার থেকে কয়েক হাজার মিটার পর্যন্ত হতে পারে। পৃথিবীর বৃহত্তম মালভূমির উচ্চতা ৪,২৭০ থেকে ৫,১৯০ মিটার। স্থানভেদে মালভূমির ভিন্নতা রয়েছে।
উচ্চ পর্বত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এর পাদদেশে তলানি জমে যে মালভূমির সৃষ্টি হয় তাকে পাদদেশীয় মালভূমি বলে। আমেরিকার পাতাগোনিয়া মালভূমি এভাবে সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির যেমন- নদীপ্রবাহ, বায়ুপ্রবাহ এবং হিমবাহের ক্ষয়ক্রিয়ার ফলে কোনো উচ্চভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ক্ষয়জাত সমভূমির সৃষ্টি হয়। অ্যাপালেশিয়ান পাদদেশীয় সমভূমি, ইউরোপের ফিনল্যান্ড ও সাইবেরিয়া সমভূমি এ ধরনের ক্ষয়জাত সমভূমি। বাংলাদেশের মধুপুরের চত্বর ও বরেন্দ্রভূমি ক্ষয়জাত সমভূমির উদাহরণ।
বর্ষাকালে পানির বৃদ্ধির কারণে যখন নদীর উভয় কূল প্লাবিত হয় তখন তাকে প্লাবন বা বন্যা বলে। বন্যা শেষে নদীর দু'পাশের ভূমিতে খুব পুরু স্তর কাদা, পলি দেখতে পাওয়া যায়। এভাবে অনেকদিন পলি জমতে জমতে যে বিস্তৃত সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে প্লাবন সমভূমি বলে।
নিচে পাহাড় ও পর্বতের মধ্যে তিনটি পার্থক্য দেখানো হলো-
পাহাড় | পর্বত |
১. ভূপৃষ্ঠে অল্প উচ্চতবিশিষ্ট শিলাস্তূপকে পাহাড় বলে। | ১. ভূপৃষ্ঠের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সুউচ্চ শিলাস্তূপকে পর্বত বলে। |
২. পাহাড়ের উচ্চতা সাধারণত ৬০০০ মিটার হয়ে থাকে। | ২. পর্বত উচ্চতায় সমুদ্র সমতল হতে কয়েক হাজার মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। |
৩. অল্প উচ্চতা ও ঢাল পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য। | ৩. অধিক উচ্চতা, অধিক বিস্তৃত ও খাড়া ঢাল পর্বতের বৈশিষ্ট্য। |
Related Question
View Allযে খাতের মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হয় সে খাতকে নদী উপত্যকা বলে।
উর্ধ্বগতি অবস্থায় নদীর স্রোতের বেগ প্রবল হওয়ার কারণে নদী বড় বড় শিলাখন্ডকে বহন করে নিচের দিকে অগ্রসর হয়। পর্বতগুলো কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত হলেও মাঝে মাঝে নরম শিলাও থাকে। নদীখাতে পার্শ্ব অপেক্ষা নিম্নদিকের শিলা বেশি কোমল বলে পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয় বেশি হয়। এভাবে ক্রমশ ক্ষয়ের ফলে নদী উপত্যকা অনেকটা ইংরেজি 'V' আকৃতির হয়।তাই একে 'V' উপত্যকা বলা হয়।
প্রবাহিত নদী খাতকে উক্ত নদীর উপত্যকা বলে।
ঊর্ধ্বগতিতে নদীর পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয় বেশি হয় বলে উপত্যকা 'V' আকৃতির হয়।
ঊর্ধ্বগতি অবস্থায় নদীর স্রোতের বেগ প্রবল হওয়ায় তা বড় বড় শিলাখণ্ডকে বহন করে নিচের দিকে অগ্রসর হয়। পর্বতগুলো কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত হলেও মাঝে মাঝে নরম শিলাও থাকে। নদীখাতে নিচের শিলা বেশি কোমল বলে পার্শ্ব অপেক্ষা নিম্নক্ষয় বেশি হয়। এভাবে ক্রমশ ক্ষয়ের ফলে নদী উপত্যকা অনেকটা ইংরেজি 'V' আকৃতির হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!