খাদ্যের দুটি কাজ হলো-
১. খাদ্য দেহের পুষ্টি-চাহিদা পূরণ করে ও শক্তি যোগায়।
২. রোগ প্রতিরোধ, সুস্থতা বিধান ও শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
পুষ্টি উপাদান হচ্ছে প্রতিদিনের খাবারের গুণসম্পন্ন যেসব উপাদান, যা দেহের শক্তি ও যথাযথ বৃদ্ধি নিশ্চিত করে মেধা ও বুদ্ধি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ করে, অসুখ-বিসুখ থেকে তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে সাহায্য করে এবং মানুষকে কর্মক্ষম করে।
খাদ্যবস্তু খাওয়ার পর পুষ্টি প্রক্রিয়ায় পরিপাক হয় এবং জটিল খাদ্য উপাদানগুলো ভেঙে শোষণ উপযোগী সরল উপাদানে পরিণত হয়। দেহ এসব সরল উপাদান শোষণ করে নেয়। শোষণের পরে খাদ্য উপাদানগুলো দেহের সকল কোষে পৌছায়। এর ফলে দেহের প্রতিটি অঙ্গের ক্ষয়প্রাপ্ত কোষের পুনর্গঠন ও দেহের বৃদ্ধির জন্য নতুন কোষ গঠন করে।
কোনো খাদ্য উপাদানের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে হলে ঐ খাদ্যের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। খাদ্যের প্রকৃতি বলতে এটা কি মিশ্র খাদ্য, নাকি বিশুদ্ধ খাদ্য তাকে বোঝায়। মিশ্র খাদ্যে একের অধিক পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকে। যেমন- দুধ, ডিম, খিচুরি, পেয়ারা ইত্যাদি। অন্যদিকে বিশুদ্ধ খাদ্যে শুধুমাত্র একটি উপাদান থাকে। যেমন- চিনি, গ্লুকোজ। এতে শর্করা ছাড়া আর কোনো উপাদান থাকে না।
মিশ্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাদ্যের মধ্যে দুটি পার্থক্য হলো-
| মিশ্র খাদ্য | বিশুদ্ধ খাদ্য |
| ১. মিশ্র খাদ্যে একের অধিক পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকে | ১. বিশুদ্ধ খাদ্যে শুধুমাত্র একটি উপাদান থাকে। |
| ২ .উদাহরণ- দুধ, ডিম, খিচুরি। | ২. উদাহরণ- চিনি, মুকোজ। |
খাদ্য অনেকগুলো রাসায়নিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এ রাসায়নিক উপাদানগুলোকে খাদ্য উপাদান বলা হয়। কেবলমাত্র একটি উপাদান নিয়ে গঠিত এমন খাদ্যবস্তুর সংখ্যা খুবই কম। উপাদান অনুযায়ী খাদ্যবস্তুকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- আমিষ, শর্করা ও স্নেহ।
শর্করার দুটি বৈশিষ্ট্য হলো-
১. শর্করা সহজপাচ্য।
২. সব শর্করাই কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন সমন্বয়ে গঠিত।
রাসায়নিক গঠন পদ্ধতি অনুসারে সব শর্করাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
১. মনোস্যাকারাইড (সরল শর্করা),
২. ডাই স্যাকারাইড (দ্বি-শর্করা) ও
৩. পলিস্যাকারাইড (বহু শর্করা)।
সরল শর্করা হলো মনোস্যাকারাইড যা একটি মাত্র শর্করা অণু নিয়ে গঠিত। মানবদেহে পরিপুষ্টির জন্য সরল শর্করা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানবদেহ শুধুমাত্র সরল শর্করা গ্রহণ করতে পারে।
তিনটি শর্করার নাম উল্লেখ করা হলো-
১. গ্লুকোজ, ২. ফ্রুকটোজ ও ৩. গ্যালাকটোজ।
বয়স, দেহের ওজন, উচ্চতা, পরিশ্রমের মাত্রার উপর শর্করার চাহিদা নির্ভর করে। একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দৈনিক শর্করার চাহিদা তার দেহের প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের ৪.৬ গ্রাম হয়ে থাকে। একজন ৬০ কেজি ওজনের পুরুষ মানুষের গড়ে দৈনিক শর্করার চাহিদা = (৬০ ৪.৬) গ্রাম ও বা ২৭৬ গ্রাম। আমাদের মোট প্রয়োজনীয় ক্যালরির শতকরা ৬০-৭০ ভাগ শর্করা হতে গ্রহণ করা দরকার।
শর্করা মানবদেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান। তবে আহারে কম বা বেশি শর্করা গ্রহণ উভয়ই দেহের জন্য ক্ষতিকর। শর্করার অভাবে অপুষ্টি দেখা দেয়। রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে গেলে দেহে বিপাক ক্রিয়ার সমস্যা সৃষ্টি হয়। রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়।
হাইপোগ্লাইসেমিয়ার দুটি লক্ষণ হলো-
১. অতিরিক্ত ঘামানো ও
২. তৃৎকম্পন হঠাৎ বেড়ে বা কমে যায়।
আমিষের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো-
১. কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও সালফারের সমন্বয়ে আমিষ গঠিত।
২. আমিষে ১৬% নাইট্রোজেন থাকে।
যে সকল অ্যামাইনো এসিড দেহের অভ্যন্তরে তৈরি হয় না কিন্তু প্রোটিন তৈরির জন্য অপরিহার্য তাদেরকে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড বলে। এ অ্যামাইনো এসিডগুলো খাদ্য থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড ৯টি। যথা-
১. আইসোলিউসিন, ২. মিথিওনিন, ৩, ভ্যালিন, ৪. লাইসিন,
৫. লিউসিন, ৬. প্রিওনিন, ৭. ফিনাইল অ্যালানিন, ৮. হিস্টিডিন,
৯. ট্রিপটোফ্যান।
দেহে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিডের অভাব ঘটলে নানা রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন- বমি বমি ভাব, মূত্রে জৈব এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, নাইট্রোজেনের ভারসাম্য বজায় না থাকা ইত্যাদি।
শিশুদের ক্ষেত্রে আমিষের অভাবজনিত দুটি রোগের নাম হলো-
১. কোয়াশিয়রকর ও ২. মেরাসমাস।
কোয়াশিয়রকর রোগের চারটি লক্ষণ হলো-
১. শিশুদের খাওয়ায় অরুচি হয়।
২. পেশি শীর্ণ ও দুর্বল হতে থাকে।
৩. ত্বক এবং চুলের মসৃণতা ও রং নষ্ট হয়ে যায়।
৪. পেট বড় হয়।
ফ্যাটি এসিড ও গ্লিসারল সমন্বয়ে গঠিত যৌগকে স্নেহস্পদার্থ বলা হয়। একে শক্তি উৎপাদনকারী উপাদান বলা হয়। এতে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকে। কার্বনের দহন ক্ষমতা বেশি থাকায় স্নেহ পদার্থের অণু থেকে বেশি তাপশক্তি উৎপন্ন হয়।
স্নেহ পদার্থের দুটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-
১. এটি ফ্যাটি এসিড ও গ্লিসারলের সমন্বয়ে গঠিত যৌগ।
২. এতে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকে
স্নেহ পরিপাক হয়ে ফ্যাটি এসিড ও গ্লিসারলে পরিণত হয়। ফ্যাটি এসিড দুই প্রকার। যথা- ১. অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড ও ২. সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড।.
সাধারণ তাপমাত্রায় যেসব স্নেহ পদার্থ তরল অবস্থায় থাকে তাকে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বলা হয়। যেমন- তেল, সয়াবিন ইত্যাদি।
যেসব খাদ্যে সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বেশি থাকে সে সকল খোদ্যগুলোতেws স্নেহবহুল খাদ্য বলা হয়। যেমন- মাংস, মাখন, পনির ইত্যাদি
সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের মধ্যে দুটি পার্থক্য হলো-
| সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড | অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড |
| ১. সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন অবস্থায় থাকে। | ১. সাধারণ তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। |
| ২. উদাহরণ- সয়াবিন তেল, সূর্যমুখী তেল। | ২. উদাহরণ- মাখন, পনির। |
দুই ধরনের ফ্যাটি এসিডের মধ্যে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড অন্যতম। যে স্নেহ জাতীয় খাদ্যে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বেশি থাকে তা বেশি উপকারী। কারণ, এ জাতীয় ফ্যাটি এসিড রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত করতে পারে। প্রদাহ কমাতে পারে এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এ কারণে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডকে উপকারী বলা হয়।
স্নেহ পদার্থের অভাবজনিত দুটি লক্ষণ হলো-
১. ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হয়ে দেহের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।
২. শিশুদের একজিমা রোগ হয়।
শর্করা ও আমিষের মধ্যে দুটি পার্থক্য হলো-
| শর্করা | আমিষ |
| ১. শর্করা শক্তি উৎপাদনকারী খাদ্য। | ২. আমিষ দেহের গঠন উপাদান। |
| ২. কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন সমন্বয়ে গঠিত। | ২. কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও সালফারের সমন্বয়ে গঠিত। |
আমাদের দেহে ১ গ্রাম শর্করা থেকে ৪ কিলোক্যালরি, ১ গ্রাম আমিষ থেকে ৪ কিলোক্যালরি এবং ১ গ্রাম চর্বি থেকে ৯ কিলোক্যালরি শক্তি উৎপন্ন হয়।
আমাদের দেহে দুই ভাবে শক্তি ব্যয় হয়। যথা-
১. পরিশ্রমের কাজে ও
২. দেহের অভ্যন্তরীণ কাজে অর্থাৎ মৌলবিপাকে।
প্রতিদিন কার কত ক্যালরি বা তাপ শক্তির প্রয়োজন তা নির্ভর করে প্রধানত বয়স, দৈহিক উচ্চতা এবং দৈহিক ওজনের উপর। এছাড়াও বিভিন্ন পেশা এবং স্ত্রী-পুরুষভেদে দৈনিক ক্যালরি চাহিদা কম বা বেশি হয়ে থাকে।
একজন লোকের দৈনিক কী পরিমাণ শক্তির দরকার তা প্রধানত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যথা- ১. মৌল বিপাক; ২. দৈহিক পরিশ্রম ও ৩. খাদ্যের প্রভাব।
খাদ্য নির্বাচনের সময় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে খাদ্য থেকে দেহ যেন প্রয়োজনীয় পরিমাণ ক্যালরি পেতে পারে এবং ভিটামিন, খনিজ লবণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো যেন এতে থাকে।
দ্রবণীয়তার গুণ অনুসারে ভিটামিনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. স্নেহ জাতীয় পদার্থে দ্রবণীয় ভিটামিন, যেমন- এ, ডি, ই এবং কে।
২. পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন, যেমন- ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স এবং সি।
ভিটামিনের দুটি উৎস হলো- ১. গাঝের সবুজ পাতা; ২. হলুদ ও সবুজ বর্ণের সবজি।
মাছের তেল ও প্রাণিজ স্নেহে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন 'এ' পাওয়া যায়। ক্যারোটিন সমৃদ্ধ বা শাকসবজি যেমন- লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, টমেটো, গাজর, বীট ও মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরনের ফল যেমন- পেঁপে, আম, কাঁঠালে ভিটামিন 'এ' থাকে। এছাড়াও মলা ও ঢেলা মাছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন 'এ' থাকে।
ভিটামিন 'এ'-এর দুটি ভূমিকা হলো-
১. দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখা।
২. ত্বক ও শ্লেষাঝিল্লিকে সুস্থ রাখা।
ভিটামিন 'এ'-এর অভাবজনিত দুটি রোগ হচ্ছে-
১. রাতকানা ও ২. জেরপথালমিয়া।
জেরপথালমিয়ার দুটি লক্ষণ নিম্নরূপ-
১. চোখ শুকিয়ে যায় এবং পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায়।
২. চোখে পুঁজ জমে এবং চোখের পাতা ফুলে যায়।
রাতকানা রোগের লক্ষণ হলো স্বল্প আলোতে বিশেষ করে রাতে আবছা আলোতে দেখতে না পাওয়া। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে- সবুজ শাকসবজি ও রঙিন ফলমূল খেতে হবে।
ভিটামিন 'এ' দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখে ও রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন 'এ' এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়। এর অভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে চোখের কর্নিয়ার আচ্ছাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যাকে জেরপথালমিয়া বলা হয়। এতে ব্যক্তি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যায়। তাই অন্ধত্ব প্রতিরোধে ভিটামিন 'এ' জরুরি।
জেরপথালমিয়া হলো চোখের রোগ। আমরা জানি, ভিটামিন 'এ' এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়। এর অভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে চোখের কর্নিয়ায় আলসার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থাকেই জেরপথালমিয়া বলা হয়। এতে কোনো ব্যক্তি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
শিশুদের জন্য ভিটামিন 'এ' অধিক প্রয়োজন। কারণ এটি শিশুর রাতকানা বা অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে এবং দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য শিশুদের ভিটামিন এlows ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়।
পানিতে দ্রবণীয় ১২টি ভিটামিনের গুচ্ছকে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স বলে। এর কাজ হলো বিশেষ বিশেষ এনজাইমের অংশ হিসেবে আমিষ, শর্করা ও স্নেহ পদার্থকে বিশ্লিষ্ট করে এদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে মুক্ত হতে সাহায্য করা।
থায়ামিনের দুটি কাজ হলো-
১ . শর্করা বিপাকে অংশগ্রহণ করে শক্তিমুক্ত করা।
২. স্বাভাবিক ক্ষুধা বজায় রাখা এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করা।
ভিটামিন বি২ এর দুটি কাজ হলো-
১. লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি ও উৎপাদনে সহায়তা করে।
২. শ্বেত রক্তকণিকা ও অনুচক্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহাযতা করা।
ভিটামিন 'সি' এর দুটি কাজ হলো-
১. পেশি ও দাঁত মজবুত করে।
২. ক্ষত নিরাময় ও চর্মরোগ রোধে সহায়তা করে।
ভিটামিন 'সি' এর দুটি বৈশিষ্ট্য হলো-
১. ভিটামিন 'সি' পানিতে দ্রবীভূত হয়।
২. এটি সামান্য তাপেই নষ্ট হয়ে যায়।
ভিটামিন 'সি' সমৃদ্ধ পাঁচটি ফলে নাম হলো-
১. আমলকী, ২. লেবু, ৩. পেয়ারা, ৪. আনারস ও ৫. আমড়া।
ভিটামিন 'সি' এর অভাবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়-
১. হাড়ের গঠন শক্ত ও মজবুত হতে পারে না।
২. হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়।
৩. ত্বক খসখসে হয় ও চুলকায় এবং ত্বকে ঘা হলে সহজে তা শুকাতে চায় না।
শিশুদের রিকেটস রোগ প্রতিরোধে শিশুকে ভিটামিন 'ডি' সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানো উচিত। সূর্যরশ্মির প্রভাবে আমাদের ত্বকের কোলেস্টেরল থেকে ভিটামিন 'ডি' পাওয়া যায়। তাই শিশুকে কিছুক্ষণের জন্য রৌদ্রে খেলাধুলা করতে দেওয়া উচিত।
বয়স্কদের রিকেটস অস্টিওম্যালেশিয়া নামে পরিচিত। এ
রোগের দুটি লক্ষণ হলো-
১. ভিটামিন 'ডি' এর অভাবে ক্যালসিয়াম শোষণে বিঘ্ন ঘটে।
২. ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের সঞ্চয় কমতে থাকে।
ভোজ্য তেল ভিটামিন 'ই'-এর ভালো উৎস। এছাড়াও শস্যদানা, যকৃৎ, মাছ-মাংসের চর্বিতে ভিটামিন 'ই' পাওয়া যায়।
ভিটামিন 'ই' এর দুটি কাজ উল্লেখ করা হলো-
১. ভিটামিন 'ই' কোষ গঠনে সহায়তা করে।
২. শরীরের কিছু ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে।
ভিটামিন হলো খাদ্যের ঐসব জৈব রাসায়নিক পদার্থ যা খাদ্যে সামান্য পরিমাণে উপস্থিত থাকে। ভিটামিনসমূহ প্রত্যক্ষভাবে দেহ গঠনে অংশগ্রহণ না করলেও এদের অভাবে দেহের ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধিসাধন বা তাপশক্তি উৎপাদন ইত্যাদি ক্রিয়াগুলো সুসম্পন্ন হতে পারে না। এমনকি এর অভাবে শরীর সহজেই বেরিবেরি, স্কার্ভি, রিকেটস, রাতকানা প্রভৃতির রোগে আক্রান্ত হয়। এ কারণেই শরীরের জন্য ভিটামিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পানিতে দ্রবণীয় ১২টি ভিটামিনের গুচ্ছকে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স বলে। দেহে রক্তকণিকার বৃদ্ধি ও উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় রাখা, দেহকোষে বিপাকীয় কাজ, শক্তি উৎপাদন ইত্যাদি কাজগুলো সঠিকভাবে সম্পাদন না হলে দেহের স্বাভাবিক সুস্থতা বজায় থাকে না। ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স দেহের এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করার মাধ্যমে দেহের স্বাভাবিক সুস্থতা বজায় রাখে। এজন্য দেহের সুস্থতার জন্য ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স অতি আবশ্যক।
স্কার্ভি রোগের দুটি লক্ষণ হলো-
১. দাঁতের মাড়ি ফুলে নরম হয়ে যায়।
২. দাঁতের গোড়া আলগা হয়ে যায় এবং গোড়া থেকে রক্ত পড়ে।
শরীরে ভিটামিন 'সি' এর গুরুতর ঘাটতি হলে স্কার্ভি নামক রোগ হয়। এ রোগ থেকে বাঁচতে হলে পরিমিত পরিমাণে ভিটামিন 'সি' যুক্ত খাদ্যগ্রহণ করতে হবে। আমলকী ভিটামিন 'সি' এর অন্যতম উৎস। আমলকী খেলে ভিটামিন 'সি' এর ঘাটতি পূরণ হয়ে স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ হবে।
ভিটামিন 'ডি' এর দুটি কাজ হলো-
১. অস্থি ও দাঁতের কাঠামো গঠন করে।
২. অন্ত্রে ক্যালসিয়াম শোষণ বাড়ায়।
ভিটামিন 'ডি' এর উৎসগুলো হচ্ছে- দুগ্ধ ও দুগ্ধজাতীয় খাদ্য, ভোজ্য তেল, বিভিন্ন মাছের তেল, ডিমের কুসুম, মাখন, ঘি, চর্বি এবং ইলিশ মাছ।
ভিটামিন 'ডি' এর অভাবজনিত দুটি রোগ হচ্ছে-
১. রিকেটস ও ২. অস্টিওম্যালেশিয়া।
রিকেটস রোগের দুটি লক্ষণ হলো-
১. হাত পায়ের অস্থিসন্ধি বা গিট ফুলে যায়।
২. বুকের বা পাঁজরের হাড় বেঁকে যায়।
সবুজ রঙের শাকসবজি, লেটুস পাতা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ডিমের কুসুম, সয়াবিন তেল এবং যকৃতে ভিটামিন 'কে' পাওয়া যায়।
ভিটামিন 'কে'-এর অভাবে ত্বকের নিচে ও দেহাভ্যন্তরে রক্ত ক্ষরণ হয়। এটি বন্ধ করার ব্যবস্থা না নিলে রোগী মারা যেতে পারে। এই ভিটামিনের অভাবে অপারেশনের রোগীর রক্তক্ষরণ সহজে বন্ধ হতে চায় না। এতে রোগীর জীবন নাশের আশঙ্কা বেশি থাকে।
খনিজ লবণ দেহ গঠন ও দেহের অভ্যন্তরীণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, অস্থি, দাঁত, এনজাইম ও হরমোন গঠনের জন্য খনিজ লবণ - অপরিহার্য উপাদান, স্নায়ু উদ্দীপনা ও পেশি সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করে, দেহের জলীয় অংশে সমতা রক্ষা করে ও বিভিন্ন এনজাইম সক্রিয় রাখে।
ক্যালসিয়ামের দুটি কাজ হলো-
১. দাঁত ও হাড় গঠনে সাহায্য করে।
২. রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে
মানবদেহে ফসফরাসের দুটি গুরুত্ব হলো-
১. দাঁত ও হাড় গঠন করে।
২. ফসফোলিপিড তৈরি করে।
লৌহের দুটি কাজ উল্লেখ করা হলো-
১. লৌহ রক্তের লোহিত রক্তকণিকা গঠন করে।
২. এনজাইমের কার্যকারিতায় সহায়তা করে।
লৌহ রক্তের একটি প্রধান উপাদান। খাদ্যের মাধ্যমে দেহে লৌহের চাহিদা পূরণ হয়। যদি খাদ্যে লৌহের ঘাটতি থাকে তবে রক্তের হিমোগ্লোবিনের গঠন ব্যাহত হয়ে লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যায়। ফলে দেহে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
যখন আমাদের রক্তের কোনো কারণে আয়োডিনের অভাব ঘটে, তখন গলায় অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি ক্রমশ আকারে বড় হতে থাকে এবং গলা ফুলে যায়। একে গলগণ্ড বা ঘ্যাগ বলে
গলগন্ড রোগের দুটি লক্ষণ হলো-
১. থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
২. গলার আওয়াজ ফ্যাঁসফেসে হয়ে যায়।
ক্রোটিনিজম-এর দুটি লক্ষণ হলো-
১. দেহের বৃদ্ধি ধীরে হয়।
২. পুরু ত্বক, মুখমন্ডলের পরিবর্তন দেখা দেয়।
ক্রোটিনিজম রোগ সাধারণত শিশুদের হয়। আয়োডিনের অভাবে শিশুদের এ রোগ দেখা দেয়।
সাধারণত আয়োডিনের অভাবে শিশুদের ক্রোটিনিজম হয়। যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা করা হলে শিশুদের দৈহিক অসুবিধাগুলো দূর হয় ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠিক রাখা যায়। আর খাবারে আয়োডিনযুক্ত লবণ দিয়ে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
এ্যানিমিয়া রোগ প্রতিকারের দুটি ব্যবস্থা উল্লেখ করা হলো-
১. লৌহসমৃদ্ধ শাকসবজি, ফল, মাংস, ডিমের কুসুম, যকৃৎ ও বৃক্ক ইত্যাদি বেশি করে খাওয়া।
২. প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করা।
পানি খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানবদেহের জন্য পানি অপরিহার্য। আমাদের দেহের প্রায় ৬০ - ৭০ ভাগই পানি।
দেহের গঠন এবং অভ্যন্তরীণ কাজ পানি ছাড়া চলতে পারে না। আমাদের রক্ত, মাংস, স্নায়ু, দাঁত, হাড় ইত্যাদি প্রতিটি অঙ্গ গঠনের জন্য পানি প্রয়োজন।
পানির দুটি কাজ উল্লেখ করা হলো-
১. পানির জন্যই রক্ত সঞ্চালন ও তাপ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়।
২. পানি দেহ থেকে দূষিত পদার্থ অপসারণ করে। যেমন- মূত্র ও ঘাম।
শস্য স্যালাইন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র কর্তৃক আবিষ্কৃত একটি স্যালাইন। ১ লিটার পানি, ৫০ গ্রাম চালের গুঁড়া ও এক চিমটি লবণ মিলিয়ে এ স্যালাইন তৈরি করা হয়।
কোনো কারণে দেহে পানির পরিমাণ কমে গেলে কোষগুলোতে পানির স্বল্পতা দেখা দেয়। কোষের পানি কমে গেলে অতিরিক্ত পিপাসা হয়, রক্তের চাপ কমে যায়, রক্ত সঞ্চালনের অসুবিধা হয়, বিপাক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে।
দেহে পানির অভাবে সৃষ্ট দুটি সমস্যা হলো-
১. দেহের ওজন কমে যায় এবং পেশি ও স্নায়ুকোষ দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. দেহে স্বাভারিক কাজে বিঘ্ন ঘটে।
রাফেজের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো-
১. রাফেজ সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর।
২. রাফেজ পৌষ্টিক নালির ভিতর দিয়ে সরাসরি স্থানান্তরিত হয়।
যে সমস্ত খাদ্যবস্তু দেহের ক্যালরি চাহিদা পূরণ করে, টিস্যু কোষের বৃদ্ধি ও গঠন বজায় রাখে এবং দেহের শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলিকে সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাকে সুষম খাদ্য বলে। অর্থাৎ সুষম খাদ্য বলতে বোঝায় ৬টি উপাদান বিশিষ্ট পরিমাণ মতো খাবার, যা ব্যক্তিবিশেষের দেহের চাহিদা মেটায়।
সুষম খাদ্যের শর্তসমূহ হচ্ছে-
১. প্রতিবেলার খাবারে আমিষ, শর্করা, স্নেহ পদার্থ এই তিনটি শ্রেণির খাবার অন্তর্ভুক্ত করে খাদ্যের ছয়টি উপাদানের অন্তর্ভুক্তিকরণ নিশ্চিত করা।
২. প্রত্যেক শ্রেণির খাদ্য বয়স, লিঙ্গ ও জীবিকা অনুযায়ী সরবরাহ করা।
৩. দৈনিক ক্যালরি ৬০-৭০% শর্করা, ১০% আমিষ ও ৩০-৪০% স্নেহ জাতীয় পদার্থ থেকে গ্রহণ করা।
শরীর বৃদ্ধিকারক দুটি খাবার হচ্ছে-
১. সব ধরনের ডাল, ২. শিমের বিচি।
রোগ প্রতিরোধক দুটি খাবার হচ্ছে-
১. মৌসুমি ফল।
২. সবুজ, হলুদ ও অন্যান্য রঙিন শাকসবজি।
পাঁচটি শক্তিদায়ক খাবারের নাম হলো-
১. ভাত ২. রুটি, ৩. মিষ্টি আলু, ৪. হালুয়া, ৫. বিস্কুট।
বর্তমানে পৃথিবীতে বাস করছে লাখ লাখ বিভিন্ন জাতের প্রাণী। এদের আকার-আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য যেমন ভিন্নতর তেমন বিচিত্র এদের জীবনধারা, স্বভাব, খাদ্য ও খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি। দেহের বৃদ্ধি, শক্তি ও বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি প্রাণীর খাদ্য অপরিহার্য। অতএব মানবদেহকে সুস্থ-সকল রাখার জন্যও খাদ্য অপরিহার্য। খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা অর্জন করা দেহকে সুস্থ রাখার পূর্বশর্ত। আমিষ, শর্করা, জেল ও চ ইত্যাদি জৈবযৌগ আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। আর এ সকল খাদ্য থেকে পুষ্টি পাই। খাদ্য বলতে সেই সকল জৈব উপাদানকে বোঝায় যেগুলো জীবের দেহ গঠন, ক্ষয়পূরণ ও শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। আার এ খাদ্য থেকে জীৰ পুষ্টি লাভ করে।
এ অধ্যায় পাঠ শেষে আম-
• বিভিন্ন খাদ্যের পুষ্টিগুণ ব্যাখ্যা করতে পারব;
• পুষ্টির অভাবজনিত রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধের উপায় বর্ণনা করতে পারব;
• চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করতে পারব।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!