সাধারণ অর্থে যেকোনো কাজের কর্মপ্রচেষ্টাই উদ্যোগ। উদ্যোগের সাথে নতুন কোনো চিন্তা বা নতুন কিছু করার বিষয় জড়িত। যা প্রয়োজন অথচ নেই; যা নতুন করে শুরু করলে তা ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য, দেশ ও দশের জন্য, ব্যবসায়ের জন্য বা সার্বিকভাবে কল্যাণকর হবে- এমন কিছু করার চেষ্টা ও প্রচেষ্টাকে উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোনো কিছু শুরু করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো উদ্যোগ। উদ্যোগ যেকোনো বিষয়ে হতে পারে। যেমন: নাটক আয়োজন। উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে নতুন কিছু সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এজন্য বলা হয়, যেকোনো কাজের কর্মপ্রচেষ্টাই উদ্যোগ।
মুনাফা অর্জনের উদ্দেশে ঝুঁকি নিয়ে নতুন ব্যবসায় গঠন বা নতুন পণ্য, সেবা, পদ্ধতি বা বাজার সামনে রেখে একজন ব্যবসায়ীর। উদ্যোগ গ্রহণের কাজকে ব্যবসায় উদ্যোগ বলে। ব্যবসায় উদ্যোগের ! বিষয়বস্তু নতুন ব্যবসায় শুরুর সাথে সম্পর্কিত। এটি সম্পূর্ণ নতুন ! ব্যবসায় হতে পারে, আবার নতুন পণ্য বা সেবা ব্যবসায়ে সংযুক্ত 'করার প্রয়াস হতে পারে, নতুন প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি চালু করা হতে পারে, নতুন বাজারে প্রবেশের প্রচেষ্টা হতে পারে- এর সবকিছুর সাথেই যেহেতু নতুন চিন্তা যুক্ত তাই এগুলো ব্যবসায় উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত।
যিনি ব্যবসায়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনিই ব্যবসায় উদ্যোক্তা। লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করাই হলো ব্যবসায় উদ্যোগ। আর একটি কারবার প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির ভাবনা থেকে শুরু করে এর বাস্তবায়ন এবং কারবারি প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের দ্বারে পৌছে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজ সম্পাদনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকেই ব্যবসায় উদ্যোক্তা বলা হয়। ব্যবসায় উদ্যোক্তা ব্যবসায়ে প্রাথমিক ঝুঁকি ও দায়-দায়িত্ব বহন করেন। একটি দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তি হলেন ব্যবসায় উদ্যোক্তা।
উদ্যোক্তা লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করেন। এরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার করেন। আর এ কাজ যথাযথভাবে করার জন্য কর্মী নিয়োগ করে তাদের দক্ষ করে তোলা হয়। ফলে দেশের বেকার জনগোষ্ঠী মানবসম্পদে পরিণত হয়। এভাবে উদ্যোক্তা দেশের সব সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার করে থাকেন।
ব্যবসায় উদ্যোগ ও উদ্যোক্তার দুটি পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো-
ব্যবসায় উদ্যোগ | ব্যবসায় উদ্যোক্তা |
১. লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করা হলো ব্যবসায় উদ্যোগ। | ১. যিনি লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করেন তিনি ব্যবসায় উদ্যোক্তা। |
২. ব্যবসায় উদ্যোগ বলতে উদ্যোক্তার কাজকে বোঝায়। | ২. ব্যবসায় উদ্যোক্তা বলতে উদ্যোগ নিয়েছেন এমন ব্যক্তিকে বোঝায়। |
যেকোনো কাজের কর্মপ্রচেষ্টা হলো উদ্যোগ। কিন্তু মুনাফার আশায় ঝুঁকি নিয়ে কোনো উদ্যোগ নিলে তা ব্যবসায় উদ্যোগ' বলে অভিহিত হয়। আব্যর ব্যবসায় উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা হলেও অন্যান্য উদ্যোগের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ। এজন্য বলা হয়, যেকোনো উদ্যোগই ব্যবসায় উদ্যোগ নয়।
উদ্যোগ ও ব্যবসায় উদ্যোগের মধ্যে ২টি পার্থক্য নিম্নরূপ:
পার্থক্যের বিষয় | উদ্যোগ | ব্যবসায় উদ্যোগ |
সংজ্ঞা | যেকোনো কাজের কর্মপ্রচেষ্টাকে উদ্যোগ বলে। | নতুন ব্যবসায় গঠন বা নতুন পণ্য, সেবা, পদ্ধতি বা বাজার সামনে রেখে একজন ব্যবসায়ীর উদ্যোগকে ব্যবসায় উদ্যোগ বলে। |
মুনাফা' অর্জন | উদ্যোগে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকা বাধ্যতামূলক নয়। | উদ্দেশ্য থাকা বাধ্যতামূলক। ব্যবসায় উদ্যোগে মুনাফা অর্জনের। |
নতুন কিছু শুরু করার কর্মপ্রচেষ্টা হলো উদ্যোগ। উদ্যোক্তা তার সৃজনশীলতা ব্যবহার করে সবসময় নতুন কিছু তৈরি করেন। উদ্যোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর সমন্বয় করে নতুন পণ্য বা সেবা উৎপাদন করা যায়। তাই বলা হয়, উদ্যোগ মানেই নতুন কিছু সৃষ্টি।
লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায় স্থাপন ও পরিচালনা করা হলো ব্যবসায় উদ্যোগ। ব্যবসায় উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন। একজন উদ্যোক্তা নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি ব্যবসায় শুরু করেন। অতঃপর কঠোর পরিশ্রম করে উক্ত ব্যবসায় পরিচালনা করেন।
তাই একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হলো ব্যবসায় উদ্যোগের প্রথম ফলাফল।
সরকারের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেও দেশে শিল্প কারখানা স্থাপন, পরিচালনা ও সম্প্রসারণ হয়ে থাকে। ফলে নতুন পণ্য সেবা, বাজার ও পদ্ধতির নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। যেখানে প্রতিনিয়ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এভাবেই ব্যবসায় উদ্যোগ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নতুন ব্যবসায় গঠন বা নতুন পণ্য, সেবা, পদ্ধতি বা বাজার সামনে রেখে একজন ব্যবসায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে নতুন সম্পদ সৃষ্টি হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি দেশের খনিজ সম্পদ যদি মাটির নিচেই পড়ে থাকে তবে তা জাতীয় উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। এক্ষেত্রে নতুন নতুন ব্যবসায় উদ্যোগের ফলে দেশের অব্যবহৃত প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়। যা নতুন সম্পদ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্যবসায় উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসায় হতে মুনাফা আসে এবং সেই মুনাফার একটি অংশ সঞ্চয় হিসেবে জমা হয়। অতঃপর উক্ত জমাকৃত সঞ্চয়গুলোকে একত্রিত করে মূলধন গঠন করা হয়। এভাবেই ব্যবসায় উদ্যোগ মুনাফা অর্জন এবং সঞ্চয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মূলধন গঠন করে থাকে
গুণাবলি হলো উদ্যোক্তার সফলতার চাবিকাঠি। আধুনিক ব্যবসায় জগৎ অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায় জগতে সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা অনেকাংশে উদ্যোক্তার গুণাবলির ওপর নির্ভর করে। আর এজন্যই ব্যবসায় সফলতার ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তার কতিপয় গুণ থাকা আবশ্যক; যা উদ্যোক্তাকে সফল হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।
ঝুঁকির পরিমাণ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ন্যূনতম ঝুঁকি নেওয়া হলো পরিমিত পরিমাণ ঝুঁকি। এ ধরনের ঝুঁকি একজন উদ্যোক্তা এমন মাত্রায় গ্রহণ করেন যা তিনি সহজেই পরিকল্পনামাফিক । হ্রাস করতে পারেন। যেমন উদ্যোক্তা ধারণা করলেন আগামী বছর পণ্যের বিক্রয়ের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তাই তিনি ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে দিলেন। ঝুঁকি হ্রাসের এই পদ্ধতি হলো পরিমিত পরিমাণ ঝুঁকি।
উদ্যোক্তা হওয়ার কিছু ব্যক্তিগত গুণাবলি অনেকে জন্মসূত্রেই পেয়ে থাকেন। যেমন- আত্মবিশ্বাস, ঝুঁকি গ্রহণ, স্বাধীনচেতা, উদ্যম, সাহস, সৃজনশীলতা প্রভৃতি। এগুলো তারা পরবর্তী সময়ে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় বা অন্যান্য ক্ষেত্রে সফলতা পান। তাই বলা হয়, উদ্যোক্তাগণ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা।
যিনি নতুন কিছু আবিষ্কার বা তৈরি করেন তাকে উদ্ভাবনকারী বলা হয়। উদ্যোক্তা তার উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে নতুন শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। বাজারে চাহিদা আছে কিন্তু আবিষ্কৃত হয়নি এমন পণ্য বা সেবা উদ্যোক্তারা উদ্ভাবন করেন। এজন্য উদ্যোক্তাকে উদ্ভাবনকারী বলা হয়।
বিশেষ জ্ঞান দ্বারা ভবিষ্যতকে উপলব্ধি করতে পারার সামর্থ্য হলো দূরদর্শিতা। ভবিষ্যৎ সবসময়ই অনিশ্চিত। দূরদর্শিতার মাধ্যমে উদ্যোক্তা সহজে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির সম্ভাব্য কারণ ও মাত্রা অনুমান করতে পারেন। ফলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। এজন্য | উদ্যোক্তাকে দূরদর্শী হতে হয়।
উদ্যোগ গ্রহণমূলক কাজে সবসময় সফলতা আসবে এমন নয়। ব্যর্থ হলে একজন উদ্যোক্তাকে কারণ খুঁজে বের করতে হয়। ফলে তিনি সমস্যা বুঝতে পেরে তা সমাধানের জন্য নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে পারেন। তাই উদ্যোক্তাকে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
জ্ঞানচক্ষু বা বিশেষ জ্ঞান (প্রজ্ঞা) দ্বারা ভবিষ্যৎকে অনুধাবন করার সামর্থ্যকে দূরদৃষ্টি বলে। একজন উদ্যোক্তার চিন্তা-চেতনা, ভবিষ্যৎ অনুমান করার ক্ষমতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ ও বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা, দূরদৃষ্টি প্রভৃতি সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু ভিন্নতর হয়ে থাকে। তিনি তার দূরদৃষ্টি দিয়ে বাজারে অব্যবহৃত সুযোগ-সুবিধা খুঁজে বের করে তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। তাছাড়া তিনি বর্তমান সময়ের চাহিদা বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ সুযোগ-সুবিধা মূল্যায়ন। করেন এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেন। আর এভাবেই তিনি ভবিষ্যৎ। দূরদৃষ্টির মাধ্যমে ব্যবসায়িক সাফল্য বয়ে আনেন।
আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাই হলো ঝুঁকি। এই ক্ষতি মেনে নেয়ার মতো মনকেই উদ্যোক্তার ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা বলা হয়। উদ্যোক্তাকে অবশ্যই ঝুঁকি গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। কেননা ঝুঁকি ছাড়া কোনো প্রকার উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। যেখানে মুনাফার সম্ভাবনা যত বেশি, সেখানে ঝুঁকির সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে। সাফল্য আসবেই এবং কখনই ক্ষতি স্বীকার করতে হবে না এমন. চিন্তা উদ্যোক্তাকে বাস্তবতার গুণ বর্জিত করে তোলে। একজন উদ্যোক্তা তার সময়, শ্রম ও পুঁজিকে সমন্বিত করে এবং বিভিন্ন দায়ের বোঝা মাথায় নিয়ে উদ্যোগকে এগিয়ে নেন। আর এক্ষেত্রে উদ্যোক্তার ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাব বৈশিষ্ট্যটি তাকে সাহস যোগায়।
যেকোনো ব্যবসায় শুরু ও সফলভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবসায় উদ্যোগের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুবিধার্থে ব্যবসায় উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়াও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জাতীয় আয় বৃদ্ধি, সম্পদের সদ্ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য ব্যবসায় । উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
ব্যবসায় উদ্যোগ নতুন নতুন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তা লাভবান হওয়ার আশায় লোকসানের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যায় এবং সফলভাবে ব্যবসায় পরিচালনা করে। এতে একজন ব্যক্তি অন্যের অধীনে কাজ না করে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে সক্ষম হন।
ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণ করার ফলে নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে দেশে অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং বেকারত্ব হ্রাস পায়। আর বেকারত্ব হ্রাসের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়; যা জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই বলা যায়, ব্যবসায় উদ্যোগের ফলে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়।
ব্যবসায় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য যেসকল আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা, যেমন- বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যাতায়াত ব্যবস্থা দরকার; সেগুলোই মূলত উন্নত অবকাঠামোগত উপাদান। এসব উপাদানের সুষ্ঠু ও কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ব্যবসায়ী তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পাদন করতে সক্ষম হন।
দেশ ও জনগণের কল্যাণে গৃহীত উদ্যোগ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে ঐ দেশের সরকার কর্তৃক যে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয় তাকেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বলা হয়। সাধারণত সরকার বা সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কোনো সৎ প্রচেষ্টা, উদ্যোগ বা কর্মকান্ডকে সহায়তা করার জন্য প্রদত্ত সাহায্যকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা হিসেবে গণ্য করা হয়। সরকার মূলত কর মওকুফ, ভর্তুকি প্রদান, কর অবকাশ, বিনা সুদে মূলধন সরবরাহ প্রভৃতি উপায়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবসায় উদ্যোগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
দক্ষ মানবসম্পদ একটি দেশের অপরিহার্য উপাদান বা চালিকাশক্তি। কারণ এটি অন্যান্য সব উপাদানকে কার্যকর করে তোলে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলে দেশের বিশাল - জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত করা যাবে। এজন্য বাংলাদেশে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি প্রয়োজন।
উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। দেশের সম্পদের সঠিক ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, জাতীয় আয় বাড়ানো, বেকারত্ব কমানো প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি দেশের জন্য সুফল বয়ে আনেন। তাই বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে সফল উদ্যোক্তার প্রয়োজন।
মুনাফার সাথে ঝুঁকির সম্পর্ক ধনাত্মক। কোনো ব্যবসায়ের ঝুঁকি কম, আবার কোনোটির বেশি। যে ব্যবসায়ের ঝুঁকি কম সেখানে মুনাফাও। কম। আর ঝুঁকি বেশি এমন ব্যবসায়ে লাভের সম্ভাবনাও বেশি।
মুদি দোকানে ঝুঁকি কম হলে মুনাফা কম হবে। কারণ যে ব্যবসায়ে ঝুঁকি কম, সে ব্যবসায়ে মুনাফার পরিমাণও সীমিত। মুদি দোকানো আয় সীমিত এবং ঝুঁকিও কম। এজন্য এ ব্যবসায়ে মুনাফার পরিমাণ কম হয়।
নিচের ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে দুটি পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
পার্থক্যের বিষয় | ব্যবসায়িক ঝুঁকি | আর্থিক ঝুঁকি |
সংজ্ঞা | ভবিষ্যতে যেকোনো কারণে ব্যবসায়ের পণ্য বা সেবার চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে মুনাফা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাকে ব্যবসায়িক ঝুঁকি বলে। | বছর শেষে উদ্যোক্তার প্রত্যাশিত নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হওয়া বা কম মুনাফা অর্জন করাকে আর্থিক ঝুঁকি বলে |
ঝুঁকি সৃষ্টির কারণ | ব্যবসায়ের পরিচালন ব্যয়; যেমন- কাঁচামাল ক্রয়, শ্রমিকের বেতন, অফিস ভাড়া প্রভৃতি পরিশোধের অক্ষমতা থেকে ব্যবসায়িক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। | ব্যবসায়ের দায় পরিশোধের অক্ষমতা থেকে আর্থিক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। যেমন-ঋণের সুদ। |
ব্যবসায় উদ্যোগের সাথে ঝুঁকির সম্পর্ক ধনাত্মক। কারণ প্রত্যেক ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বিদ্যমান। কোনো ব্যবসায়ের ঝুঁকি কম, আবার কোনোটির বেশি। যে ব্যবসায়ের ঝুঁকি কম সেখানে লাভের সম্ভাবনাও কম। আর ঝুঁকি বেশি এমন ব্যবসায়ে লাভের সম্ভাবনাও বেশি। তাই ঝুঁকির সাথে ব্যবসায় উদ্যোগের ধনাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান।
প্রশিক্ষণ হলো সর্বস্তরের কর্মীদেরকে কার্যোপযোগী ও দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং উন্নত মানসিকতা বিকাশের এক অবিরাম প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে একজন কর্মীকে কোনো বিষয়ে বা বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এটি এমন একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কর্মীদের বিশেষ কার্যদক্ষতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং কর্মীকে অধিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম করে তোলে।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার অভাবে যে প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বলে। এমন অস্থিরতা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার স্থিতিশীলতা এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয় এবং ব্যবসায় কর্মকান্ড ব্যাহত হয়। ফলে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাগণ নতুন কিছু করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে; যা দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তাকে ঝুঁকি, গ্রহণ করতে হয়। যা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রহণ করতে পারে না। এজন্য তারা ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এছাড়া বাংলাদেশের মানুষের ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণের অনাগ্রহের কারণ হলো। পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব, দক্ষতার অভাব, প্রশিক্ষণের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি।
প্রাচীনকাল থেকেই এদেশের মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে শিল্প ও ব্যবসায় বাণিজ্যের ওপর তাদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। তাছাড়া প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদেরকে চাকরির প্রতি অধিকভাবে আগ্রহী করে তোলে। ফলে তারা ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণ করতে সাহস পায় না। তাই ব্যবসায় উদ্যোগ উন্নয়নে 'চাকরির প্রতি আগ্রহ' একটি অন্যতম বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর ও তাত্ত্বিক শিক্ষাক্রমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি মেধাবী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ব্যবসায় উদ্যোগ সম্পর্কে তাদের জানার সুযোগ কম। এজন্য 'শিক্ষাজীবন শেষেও তাদের ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণের অভ্যাস গড়ে ওঠে না।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়। এতে ব্যবসায়ের প্রসার সম্ভব হয় না। ফলে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা নতুন কিছু করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আবার, এ ধরনের সমস্যার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়। এসব কারণে দেশের প্রবৃদ্ধি কমে যায়।
ব্যবসায় উদ্যোগ উন্নয়নে বাধা দূরীকরণের জন্য কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য দেশব্যাপী প্রচার-প্রচারণা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ পরামর্শ, সহজ শর্তে অর্থসংস্থান ও রাজনৈতিক স্থিতিশলিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাক্রমে শিল্পোদ্যোগ উন্নয়ন বিষয়টি অন্তর্ভুক্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে 1 হবে।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
