নিচে মুজিবনগর সরকারের কাঠামোটি ছকে উপস্থাপন করা হলো-

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ও সংস্কৃতি কর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন। পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকাসমূহ ছিল নিম্নরূপ-
ক. সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান পাকবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন বন্ধ এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে আহবান জানান।
খ. সোভিয়েত পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমগুলো বাংলাদেশে পাকবাহিনীর নির্যাতনের কাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি প্রচার করে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে সহায়তা করে এবং
গ. জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব সোভিয়েত ইউনিয়ন 'ভেটো' প্রদান করে বাতিল করে দেয়।
নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। তারপর প্রায় ১৯০ বছর আমরা ছিলাম ইংরেজ শাসন ও শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট। সময়ের বিবর্তনে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও আমরা পাকিস্তানি শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তি পাইনি। পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতি সর্বদিক দিয়ে বৈষম্যের পাহাড় গড়ে তোলে। স্বাধীনতা ব্যতীত আমাদের অন্যকোনো পথ ছিল না। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালে নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম করে আমরা অর্জন করি আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। অতএব, স্বাধীনতা আমাদের দেশ ও জনগণের সবচেয়ে বড় অর্জন।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং স্বাধীনতার সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
দীর্ঘ নয় মাস এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১। সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৯৩ হাজার সদস্য ঐদিন আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় ঘটে।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকার অধিবেশনে যোগদান করতে অস্বীকার করেন এবং অন্যান্য সদস্যকেও হুমকি দেন। ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ ভুট্টোর ঘোষণাকে অজুহাত দেখিয়ে ৩রা মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
৩রা মার্চের অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ২রা মার্চ ঢাকাসহ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ছাত্রসমাবেশে আ.স.ম আব্দুর রবের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।
৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হলে সকল কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে বহুলোক হতাহত হয়। এমন প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দাে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ভাষণে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-শাসন, বঞ্চনার ইতিহাস, নির্বাচনে জয়ের পর বাঙালির, সাথে প্রতারণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরেন।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ এক স্মরণীয় দলিল। এ ভাষণ বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইউনেস্কো ২০১৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের এ ভাষণকে 'ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ' (World Documentary Heritage) 'বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
১৯৭১ সালের ১৭ই মার্চ টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামক কর্মসূচির মাধ্যমে বাঙালির ওপর নৃশংস হত্যাকান্ড পরিচালনার নীলনকশা তৈরি করে। ২৫ মার্চ রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম গণহত্যা 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৫ মার্চের রাতকে 'কালরাত্রি' বলা হয়। কারণ এ পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণ চালায় ও নৃশংসভাবে গণহত্যা ঘটায়।
২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। কারণ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণ চালায় ও নৃশংসভাবে গণহত্যা ঘটায়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ২৭ মার্চ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় পাকিস্তানি সশস্ত্র সেনাদের সঙ্গে বাঙালি, আনসার ও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের এক অসম লড়াই, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধ নামে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। এটি ছিল প্রথম বাংলাদেশ সরকার।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। ঐ দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় 'বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আদেশ'। মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৯৭১ সালের ১৭এপ্রিল। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী ন্যাপ) মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ন্যাশনাল আওয়ামী 'পার্টির (মোজাফ্ফর ন্যাপ) অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মণি সিং, জাতীয় কংগ্রেসের শ্রী মনোরঞ্জন ধর, তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী) ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ (বাংলাদেশ 'সরকারের পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী)-কে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারে মোট ৬ সদস্য বিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়।
মুজিবনগর সরকারের মোট ১২টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ছিল। এগুলো হলো- প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়, সাধারণ প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিভাগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন ও যুব ও অভ্যর্থনা শিবির নিয়ন্ত্রণ বোর্ড।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাগণ মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে দেশকে পাকিস্তানিদের দখলমুক্ত করার জন্য রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছেন, দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, - আনসার, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের বাঙালি অংশগ্রহণ করে। তাই এ যুদ্ধকে 'গণযুদ্ধ' বা 'জনযুদ্ধ'ও বলা যায়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র-ছাত্রী, পেশাজীবী, নারী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।
পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে বাঙালি জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এদেশের ছাত্রসমাজ। ১৯৪৮-১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে ১১ দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বিরাট অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। মুক্তিবাহিনীতে একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখার এক বিরাট অংশ ছিল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের মহান আত্মত্যাগ ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হতো।
সাধারণ অর্থে যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত তারাই হলেন পেশাজীবী। পেশাজীবীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, সাহিত্যিক, প্রযুক্তিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পেশাজীবীদের ভূমিকা ছিল অনন্য ও গৌরবদীপ্ত। পেশাজীবীদের বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পেশাজীবীরা মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ, সাহায্যের আবেদন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য প্রদান, শরণার্থীদের উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্রচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অপরদিকে, নারী মুক্তিসেনারা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষা, মুক্তিযোত্থানের আশ্রয়দান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে।
সাধারণ জনগণের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বাধীনতার প্রতি ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষার ফলেই মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুষ্টিমের এদেশীয় দোসর ব্যতীত সবাই কোনো না কোনোভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় নিয়েছে, শত্রুর অবস্থান ও চলাচলের তথ্য দিয়েছে, খাবার ও ঔষধ সরবরাহ করেছে, সেবা দিয়েছে ও খবরাখবর সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর জনগণও অংশগ্রহণ করে।
প্রবাসী বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন দেশে তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট সদস্যদের নিকট ছুটে গিয়েছেন। তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন। এক্ষেত্রে ব্রিটেন ও আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।
মুক্তিযুদ্ধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন সংস্কৃতি কর্মীর অবদান ছিল খুবই প্রশংসনীয়। পত্র-পত্রিকায় লেখা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ, দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, কবিতা পাঠ, নাটক, কথিকা ও অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী ও স্বাধীনতাবিরোধী তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা সংঘটিত লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হয়। বিভিন্ন দেশ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি সমর্থন জানার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। তারা লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, অস্ত্র সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করে। ভারত ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী 'যৌথ কমান্ড' গড়ে তোলে। যৌথ বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনাসহ জেনারেল এ কে নিয়াজী নিঃশর্তে যৌথ কমান্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের পর সর্বাধিক অবদান রাখে অধুনা বিলুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন, বর্তমান রাশিয়া। সোভিয়েত প্রচার মাধ্যমগুলো বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি প্রচার করে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে সহায়তা করে। জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধবদের প্রস্তাব দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন 'ভেটো' (বিরোধিতা করা) প্রদান করে তা বাতিল করে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন জানায়। এক্ষেত্রে কিউবা, যুগোশ্লাভিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি প্রভৃতি রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ব্রিটেনের প্রচার মাধ্যম বিশেষ করে বিবিসি এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন এবং বাঙালিদের সংগ্রাম ও প্রতিরোধ, ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের করুণ অবস্থা, পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে বিশ্ব জনমতকে জাগ্রত করে তোলে।
ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে খুবই. সহানুভূতিশীল ছিল। উল্লেখ্য, লন্ডন ছিল বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারের প্রধান কেন্দ্র। তাছাড়া ব্রিটিশ নাগরিক বিখ্যাত সংগীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবি শংকর ও আলী আকবর খান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি ও দানসহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান যখন বাঙালি নিধনে তৎপর, তখন জাতিসংঘ বলতে গেলে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যা বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। এর মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণ হলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের নিপীড়িত, স্বাধীনতাকামী জনগণকে অনুপ্রাণিত করে।
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধ এ অনালের বাঙালি এবং এ ভূখণ্ডে বসবাসকারী অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর জনগণের মধ্যে নতুন যে দেশপ্রেমের জন্ম দেয়, তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধ শেষে জনগণ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করে।
বিশ্ব ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের প্রথম দেশ, যে দেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। জনগণ সর্বপ্রকার অত্যাচার, শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। কিন্তু এ ভূখন্ডের সন্ধানী মানুষ এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।
অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদে ৩রা মার্চ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়।
ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।
১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।
আ.স.ম আব্দুর রবের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
১৯৭১ সালের ২রা মার্চ সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানের সমাবেশে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রনেতা শাহজাহান সিরাজ।
রেসকোর্স ময়দানের বর্তমান নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
৭ই মার্চের ভাষণ থেকে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা পায়।
'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'-বক্তব্যটি শেখ মুজিবুর রহমানের
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো 'ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ' বা 'বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর যে বর্বরতম হত্যাকান্ড চালিয়েছিল তার নাম ছিল অপারেশন সার্চলাইট।
স্বাধীনতা ঘোষণার সময় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটির নাম ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
১৭ই মার্চ, ১৯৭১ টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলী 'অপারেশন সার্চলাইট' বা বাঙালির ওপর নৃশংস হত্যাকান্ড পরিচালনার নীলনকশা তৈরি করে।
২৫শে মার্চ রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম গণহত্যা 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হয়।
২৫ মার্চ রাত্রিকে কালরাত্রি বলা হয়।
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র চালু হয়।
স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র চট্টগ্রামে চালু হয়।
২৬শে মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।
মুজিবনগর সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সঠিকভাবে যুদ্ধ পরিচালনা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেশি-বিদেশি জনমত গঠনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করা।
মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম. মনসুর আলী।
মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
মুক্তিযুদ্ধে প্রতিটি সেক্টরেই নিয়মিত সেনা, গেরিলা ও সাধারণ যোদ্ধা ছিল; তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিফৌজ নামে পরিচিত ছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ছিলেন কর্নেল (অব.) মোঃ আতাউল গনী ওসমানী (এমএজি ওসমানী)।
মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ই এপ্রিল।
মুজিবনগর সরকারের ১২টি বিভাগ বা মন্ত্রণালয় ছিল।
বর্তমান মেহেরপুর জেলায় মুজিবনগর অবস্থিত।
মুজিবনগর সরকার বাঙালি কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল।
সাধারণ অর্থে যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত তারাই হলেন পেশাজীবী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, সাহিত্যিক, প্রযুক্তিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইলো চরমপত্র।
যে যুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করে তাকে গণযুদ্ধ বলে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ।
মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গর রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে।
মুক্তিবাহিনীতে এককগোষ্ঠী হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।
মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটেন ও আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের, মহান আত্মত্যাগ ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন ছিল।
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবস্থান ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত লক্ষাধিক মা-বোনকে সরকারিভাবে বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
ভারত ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি . প্রদান করে।
যৌথ কমান্ড হলো মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বাহিনী।
জর্জ হ্যারিসন লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী সংগীত শিল্পী ছিলেন যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সমর্থনে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' এর আয়োজক ও গায়ক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের পর সর্বাধিক অবদান রাখে সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া)।
৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে পাকিস্তানি সৈনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে।
বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারের প্রধান কেন্দ্র ছিল লন্ডন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' এর আয়োজন করা হয়েছিল।
জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো বিশ্বশান্তিও নিরাপত্তা রক্ষা করা।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ হলো মুক্তিযুদ্ধ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের নিপীড়িত ও স্বাধীনতাকামী জনগণকে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলমান অসহযোগ আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রথম পর্ব। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়া ন্যায়সংগত হলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি শুরু করেন এবং ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সমগ্র পূর্ব বাংলায় হরতালের ডাক দেন। মূলত ১ মার্চ থেকেই পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। ভুট্টো ঢাকায় অধিবেশনে যোগদান করতে অস্বীকার করেন, অন্যান্য সদস্যদেরও হুমকি প্রদান করেন। এসবই ছিল ভুট্টো-ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্রের ফল। ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ ভুট্টোর ঘোষণাকে অজুহাত দেখিয়ে ৩ মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা না করে অধিবেশন স্থগিত করায় পূর্ববাংলার জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। ফলে সকল সরকারি কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। হরতাল চলাকালে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে বহুলোক হতাহত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের 'স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ভাষণের মূল বক্তব্য ছিল এ ভূখন্ডের স্বাধীনতার ডাক। তিনি এ ভাষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, শাসন, বঞ্চনার ইতিহাস, নির্বাচনে জয়ের পর বাঙালির সাথে প্রতারণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরেন। তিনি এ ভাষণে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা দেন। ফলে বাঙালি জাতির সামনে একটি গন্তব্য নির্ধারণ হয়ে যায়।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-শাসন, বঞ্চনার ইতিহাস, নির্বাচনে জয়ের পর বাঙালির সাথে প্রতারণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ ভাষণ এক স্মরণীয় দলিল। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব ঐতিহাসিক ভাষণের নজির আছে ৭ মার্চের ভাষণ তার মধ্যে অন্যতম; পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষের নিকট এ ভাষণ অমর হয়ে থাকবে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে বাঙালি ছাত্র, জনতা, পুলিশ, ইপিআর সাহসিকতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিনা প্রতিরোধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাঙালিরা ছাড় দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ সর্বস্তরের বাঙালি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ গণযুদ্ধে রূপলাভ করে।
সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়েছিল বিধায় মুক্তিযুদ্ধকে গণযুদ্ধ বলা হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, পেশাজীবী, নারী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধকে 'গণযুদ্ধ' বা 'জনযুদ্ধ' বলা হয়।
২৫ মার্চ বাঙালির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে দেশব্যাপী শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা। ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে হানাদার বাহিনী চালাতে থাকে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ। তারা ঢাকাসহ অন্যান্য শহরেও হাজার হাজার নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ কারণে ২৫ মার্চকে ইতিহাসে কালরাত্রি হিসেবে অভিহিত করা হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালায় সেটি 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে পরিচিত। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানি সামারিক বাহিনী এ হত্যাকান্ড চালায়। বাংলার ইতিহাসে এটি '২৫ মার্চের কালরাত্রি' নামে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে উপদেশ ও পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, কমরেড মণি সিং, শ্রী মনোরঞ্জন ধর, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে নিয়ে মোট ৬ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঁচটি প্রধান রাজনৈতিক দল থেকে মোট ৬ সদস্যবিশিষ্ট গঠিত এ উপদেষ্টা পরিষদের গুরুত্ব ছিল অত্যধিক।
মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন করার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। এটি ছিল প্রথম বাংলাদেশ সরকার।
বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ; অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন এ এইচ এম কামারুজ্জামান। উক্ত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তাছাড়া মুজিবনগর সরকারের ৬ (ছয়) সদস্য বিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদ ছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে 'মুজিবনগর সরকার' গঠন করা হয়। মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজিবনগরে (মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে) সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিরাট অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখার বিরাট অংশ ছিল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারা স্বাধীনতার বিজয় পতাকা ছিনিয়ে আনতে সহায়তা করে। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজ বিজয় অর্জনকে ত্বরান্বিত করে।
বিশ্ব ইতিহাসে বাংলাদেশ হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে প্রথম' দেশ, যে দেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের ত্যাগ ও অংশগ্রহণে, মা-বোনের লুণ্ঠিত ইজ্জত, ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদানে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তার ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের ঋণ কোনো কিছুর বিনিময়ে, কোনোদিন কেউ শোধ করতে পারবে না।
জাতি মুক্তিযোদ্ধাদের সূর্যসন্তান মনে করার কারণ মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। বহু মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গণে শহিদ হয়েছেন। তারা ছিলেন দেশপ্রেমিক, অসীম সাহসী এবং আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের এ ঋণ জাতি কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। তাই চিরকাল জাতি মুক্তিযোদ্ধাদের সূর্যসন্তান হিসেবে মনে করে।
প্রবাসী বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন দেশে তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে পার্লামেন্ট সদস্যদের নিকট ছুটে গিয়েছেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন, পাকিস্তানকে অস্ত্রগোলাবারুদ সরবরাহ না করতে সরকারের নিকট আবেদন করেছেন। এক্ষেত্রে ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা । বিশেষভাবে উল্লেখ্য। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে তারা কাজ করেছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন। পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি 'দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করেছে গণমাধ্যম। এছাড়া মুজিবনগর সরকারের প্রচার সেলের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। মুক্তিযোদা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্রচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু পাকসেনা কর্তৃক ধর্ষিত হয় প্রায় তিন লক্ষ নারী। তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযাত্রী এবং তাদের ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ২০১৬ সালে বীরাঙ্গনা - নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ও সংস্কৃতি কর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন। পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবোধক গাঁন, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালালে বাংলাদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। বাঙালি ছাত্রজনতা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ, ইপিআর, সেনাবাহিনীর সদস্য, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, মাঝি সবাই দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করে। স্বাধীনতার এ যুদ্ধে সব শ্রেণি পেশার মানুষই কমবেশি আহত-নিহত হন। তাই এ যুদ্ধকে বলা হয় গণযুদ্ধ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর বিরাট অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। অনেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করে। মুক্তিবাহিনীতে একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখার বিরাট অংশ ছিল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সমাজের মহান আত্মত্যাগ ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হতো।
মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তথাপি যুদ্ধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের অবদান ছিল খুবই প্রশংসনীয়। পত্রপত্রিকার লেখা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ, দেশাত্মবোধক গান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, কবিতা পাঠ, নাটক, কথিকা, এম. আর আকতার মুকুলের অত্যন্ত জনপ্রিয় 'চরমপত্র' অনুষ্ঠান এবং 'জল্লাদের দরবার' ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। এসব রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক ও নৈতিক বল ধরে রাখতে সহায়তা করছে, সাহস জুগিয়েছে, জনগণকে শত্রুর বিরুদ্ধে দুর্দমনীয় করেছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল।
১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তাতে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযুদ্ধ শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্র চালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এছাড়া সহযোদ্ধা হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এদেশের নারী মুক্তিসেনারা।।
মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন সংস্কৃতি কর্মীর অবদান ছিল প্রশংসনীয়। পত্র-পত্রিকায় লেখা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ, দেশপ্রেমবোধক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, কবিতা পাঠ, নাটক, কথিকা ও অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।
সাধারণ জনগণের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বাধীনতার প্রতি ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষার ফলেই মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক দোসর ব্যতীত সবাই কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, শত্রুর অবস্থান ও চলাচলের তথ্য দিয়েছে, খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করেছে, সেবা দিয়েছে, ও খবরাখবর সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি আদিবাসী জনগণও এতে অংশগ্রহণ করে। অনেকে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ, শহিদের মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যা ছিল বেশি। এদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীন মানচিত্র, লাল-সবুজ পতাকা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য নয়। কারণ; এর স্থায়ী পাঁচটি ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিধর দেশের ভেটো ক্ষমতার উর্ধ্বে-এর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ পাঁচ স্থায়ী শক্তির অন্যতম প্রধান দুটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিকে সমর্থন করায় বাংলাদেশের সে ক্রান্তিকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক সর্ববৃহৎ এ সংগঠনটি কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান যখন বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে বাঙালি নিধনে তৎপর হয়ে ওঠে, তখন জাতিসংঘ এর প্রতিবাদ না করে নীরবতা পালন করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নারকীয় হত্যাকান্ড, মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। প্রকৃতপক্ষে 'ভেটো' ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি বৃহৎ শক্তির রাষ্ট্রের বাইরে জাতিসংঘের নিজস্ব উদ্যোগে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা ছিল সীমিত।
জর্জ হ্যারিসন নিউইয়র্কের প্রখ্যাত ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' এ গান গেয়ে জাগিয়েছিলেন গোটা বিশ্বকে। হ্যারিসন সেদিন অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন তার গানের কনসার্টের মাধ্যমে। তিনি তার বিবেকী শিল্পী সত্তাকে মানবতার কল্যাণে, মুক্তি সংগ্রামের সপক্ষে নিবেদিত করেছিলেন সব রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে। বিশ্ববাসী এ. কনসার্টের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল পাকবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা। তাই মুক্তিযুদ্ধে জর্জ হ্যারিসনের ভূমিকা চিরস্মরণীয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন সরকার ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের কার্যকলাপের প্রতি সমর্থন প্রদান করে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, মুক্তিযুদ্ধের তীব্র গতিকে থামিয়ে দেওয়া এবং পশ্চিম। পাকিস্তানকে রক্ষা করা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত তাদের সপ্তম নৌবহরকে বাংলাদেশ অভিমুখে প্রেরণ করে। তবে মার্কিন জনগণ, প্রচার মাধ্যম, কংগ্রেসের অনেক সদস্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার ছিল। এ প্রসঙ্গে সিনেটের এডওয়ার্ড কেনেডির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিশ্বইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সর্বপ্রকার অত্যাচার, ( শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। কিন্তু এ ভূখন্ডের সংগ্রামী মানুষ এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যা বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের নিপীড়িত, স্বাধীনতাকামী জনগণকে অনুপ্রাণিত করে।
আওয়ামী লীগ
১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ
পাকিস্তান পিপলস পার্টি
১৯৭১ সালের ২ মার্চ
ছাত্র নেতা আ.স.ম আব্দুর রব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
পল্টন ময়দানে।
ছাত্রনেতা শাহজাহান সিরাজ।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ
১ মার্চ ১৯৭১
শেখ মুজিবুর রহমান
২৫ মার্চ ১৯৭১
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন মেজর জিয়াউর রহমান
৯ মাস
১৬ ডিসেম্বর
৯৩ হাজার
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান
১৭ মার্চ
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ
২৫শে মার্চ
চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে
২৫ মার্চ
মেহেরপুর
১০ এপ্রিল, ১৯৭১
১৭ এপ্রিল
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
তাজউদ্দীন আহমদ
খন্দকার মোশতাক আহমেদ
এম. মনসুর আলী
ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী
স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসংখ্যা ছিল ৬ জন ।
কর্ণেল (অব.) এম.এ.জি ওসমানী
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ১১জন সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়
মুক্তিযুদ্ধে ৩টি ব্রিগেড ফোর্স গঠন করা হয়
মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ
মুক্তিবাহিনীতে একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্রদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল ।
১৯৬৪ সালে
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ
বীরাঙ্গনা
২০১৬ সালে
চট্টগ্রামে
ভারত
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর
ভারত
যৌথবাহিনী
৯৩ হাজার পাকসেনা নিঃশর্তে যৌগ কমান্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে
সোভিয়েত ইউনিয়নের বর্তমান নাম রাশিয়া
সোভিয়েত ইউনিয়ন
বিবিসি
লন্ডন
গান গেয়ে
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর
Related Question
View Allবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে 'গণযুদ্ধ' বা 'জনযুদ্ধ' নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। ওই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা আদেশ'।
আরিফার বাবা স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার একটি গণমাধ্যম। অর্থাৎ, আরিফার বাবা গণমাধ্যমে কাজ করতেন। মুক্তিযুদ্ধে উক্ত মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন। পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে। এছাড়া মুজিবনগর সরকারের প্রচার সেলের তত্ত্বাবধানে 'জয় বাংলা' পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অতএব বলা যায়, আরিফার বাবার মতো সংস্কৃতিকর্মী এবং প্রচারমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে আরিফার মায়ের মতো অনেক নারীর ভূমিকাই ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে উল্লিখিত আরিফার মা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে খাবার সরবরাহ করতেন। মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করতেন। আরিফার মায়ের ন্যায় মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তাতে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্রচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অপরদিকে, সহযোদ্ধা হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষা, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এদেশের অগণিত নারী মুক্তিসেনা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হন প্রায় তিন লক্ষ মা-বোন। তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযাত্রী এবং ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারিভাবে তাদেরকে 'বীরাঙ্গনা' উপাধিতে ভূষিত করেন।
উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে আরিফার মায়ের মতো অনেক নারীই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যে তহবিল থেকে প্রসূত নারীদের অনুদান প্রদান করা হয় সেই তহবিল হচ্ছে 'ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল'।
কোনো দেশের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে যে পরিষদ বা কমিটি গঠন করা হয়, তাকে গণপরিষদ (Constituent Assembly) বলে। যেমন- স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু 'বাংলাদেশ গণপরিষদ' নামে একটি আদেশ জারি করেন। এ আদেশবলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণ গণপরিষদের সদস্য বলে পরিগণিত হন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!