যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা সামাজিক শিক্ষা আয়ত্ত করে সমাজের উপযুক্ত সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হই তাকে সামাজিকীকরণ বলে। সামাজিকীকরণ একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। শিশুর জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন শিশুর প্রাথমিক অভাব পুরণ করে তার মা। এ কারণে মা শিশুর অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হয়। কিছুকাল পরে শিশু বাবাসহ অন্যান্য মানুষের উপস্থিতি উপলব্ধি করে এবং তার সামাজিক সম্পর্কের গণ্ডি আরও বিস্তৃত হয়। পরবর্তীকালে শিশু প্রতিবেশী, সমবয়সী, খেলা ও পড়ার সাথি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাহনের মাধ্যমে সামাজিক জীবে পরিণত হয়।
সামাজিকীকরণের প্রধান প্রধান বাহনুগলো হলো- পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সঙ্গীদল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ইত্যাদি। এই বাহনগুলোর মাধ্যমে শিশু সামাজিক জীবে পরিণত।
মানুষ সমাজের মানুষের সাহায্যে বেঁচে থাকে। সমাজ বাদ দিয়ে মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা মানব স্বভাবের একটি প্রয়োজনীয় দিক। এজন্য মানুষকে সামাজিক জীব বলা হয়।
সমাজে আমরা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যা শিখি সেটাই সামাজিক শিক্ষা। সামাজিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে- সমাজের নিয়ম-নীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আদর্শ ইত্যাদি।
সমাজজীবনে সামাজিকীকরণের প্রভাব অনেক। এ প্রক্রিয়া শিশুকে সামাজিক মানুষে পরিণত করে। সুস্থ ও সুন্দরভাবে বিকশিত হতে ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। শিশুকে সমাজের দায়িত্বশীল সদস্যে পরিণত হতে এবং সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
শিশুর দক্ষতা বিকাশে সামাজিকীকরণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতারও বিকাশ ঘটায়। অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শিশু নিজ জীবনের অনেক ঝুঁকি ও সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে।
শিশুর সামাজিকীকরণ শুরু হয় পরিবার থেকে। শিশুর চারিত্রিক গুণাবলি পারিবারিক পরিবেশে বিকশিত হয়। সহযোগিতা, সহিষ্ণুতা, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মত্যাগ, ভালোবাসা প্রভৃতি সামাজিক শিক্ষা শিশু পরিবার থেকে অর্জন করে।
আমাদের রাড়ির আশপাশে যারা বসবাস করেন তারা হলো আমাদের প্রতিবেশী। সামাজিকীকরণে প্রতিবেশীর কাছ থেকে শিশুরা পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সমতা ও ঐক্য শিক্ষার্জন করে থাকে।
শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি কতগুলো সামাজিক আদর্শও শিখে থাকে। এসব আদর্শ হচ্ছে শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্ববোধ, নিয়মানুবর্তিতা, শ্রদ্ধাবোধ, সহযোগিতা, সমর্মিতা, পারস্পরিক ভালোবাসা ইত্যাদি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে শিশু বৃহত্তর সমাজের আদব-কায়দা, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধও শিখে থাকে।
পরিবারের পরে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে শিশু সুঅভ্যাস গঠন ও পরার্থ শিক্ষা লাভ করতে পারে স্কুল থেকে। এছাড়া পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুও শিশুর আচরণকে প্রভাবিত করে। সামাজিকীকরণে তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
খেলা ও পড়ার সাথি যেমন আমাদের সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে, তেমনি কিছু নেতিবাচক প্রভাবও ফেলে। মন্দ খেলা ও পড়ার সাথি অনেক সময় শিশুকে বিপথগামী করতে পারে। তাই খেলা ও পড়ার সাথি নির্বাচনে আমরা সচেতন হব।
শিশুর সামাজিকীকরণে খেলা ও পড়ার সাথির ভূমিকা কম নয়। শিশু খেলা ও পড়ার সাথির সাথে মেলামেশা করে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে পারবে। ভালো-মন্দ গুণাবলির সমালোচনা করে সমাজের কাঙ্ক্ষিত আচরণ করতে শেখে।
ধর্ম হচ্ছে এক ধরনের বিশ্বাস, যা নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রতিটি ধর্মেরই মূল বিষয় হচ্ছে ব্যক্তিকে ন্যায় ও কল্যাণের প্রতি আহ্বান করা এবং অন্যায় ও অকল্যাণ থেকে দূরে রাখা। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা প্রভৃতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
ধর্ম আমাদের সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হতে শিক্ষা দেয়। আমরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এবং অন্যকেও তার ধর্ম মেনে চলার সুযোগ দিলে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব হবে।
জনগণের কাছে সংবাদ, মতামত, বিনোদন প্রভৃতি পরিবেশন করার মাধ্যমকে বলা হয় গণমাধ্যম। গণমাধ্যমসমূহ যেমন-সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনে সমাজের মূল্যবোধ, প্রথা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা প্রভৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য থাকে যা শিশুর সামাজিকীকরণে ভূমিকা পালন করে। বেতার নানা ধরনের বিনোদনমূলক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে শিশুর সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে।
উপার্জন করার জন্য কাজ করতে গিয়ে শিশুরা বিপদ, ঝুঁকি, শোষণ ও বঞ্চনার সম্মুখীন হলে সে কাজকে শিশুশ্রম বলা হয়। বাংলাদেশে শিশুশ্রম বেআইনি।
আমাদের দেশের অনেক শিশু বাসাবাড়িতে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে। এছাড়া কলকারখানায় যেমন- চুড়ি, বিড়ি, ব্যাটারি, জুতা তৈরির কাজ করে। গাড়ি বা টেম্পুর সাহায্যকারী হিসেবেও কাজ করছে শিশুরা, যা শিশুশ্রমের অন্তর্ভুক্ত।
ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। অতিরিক্ত শ্রমের কারণে নানা ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়া অপুষ্টি, অনিদ্রা, বিশ্রামহীন জীবন শিশু শ্রমিকের বিকাশে বাধাগ্রস্ত করে।
শিশুশ্রমের কারণ অনেক। অনেক অভিভাবক দরিদ্রতা বা পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে শিশুদের স্কুলের পরিবর্তে কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়। আবার মা-বাবা অসুস্থ হলে কিংবা তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে অনেক সময় শিশুরা অর্থ উপার্জনে বাধ্য হয়।
আমাদের তাদের প্রতি ভালো' ব্যবহার করতে হবে। তাদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে হবে। বাসায় কোনো শিশু কাজ করলে তার কাজে সাহায্য করতে পারি। কোনো সময়ে শিশুটি অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা ও সেবাযত্ন করে তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারি।
Related Question
View Allভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য মা-বাবার বা পরিবারের সদস্যদের কোনো কাজে সহায়তা করা শিশুদের জন্য উপযোগী।
প্রতিবন্ধকতা শিশুর জন্য কাম্য নয়। কারণ প্রতিবন্ধকতা শিশুর জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিশুর প্রতি নির্দয় আচরণ শিশুর শারীরিক-মানসিক-নৈতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় মা-বাবার অত্যধিক প্রত্যাশাও শিশুর ওপর এক ধরনের মানসিক পীড়ন তৈরি করে যা শিশুমনে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। এতে করে শিশু ক্ষীণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ও খিটখিটে মেজাজের হয়।
উদ্দীপকে মোহনের কাজ শিশুশ্রম ধারণাকে প্রতিফলিত করে।
সাধারণত দরিদ্রতা বা পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক সময় শিশুরা বিদ্যালয়ে না গিয়ে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ১৮ বছর বয়সের কম বয়সি কোনো শিশু যদি উপার্জন করার জন্য কাজ করতে গিয়ে বিপদ, ঝুঁকি, শোষণ ও বঞ্চনার সম্মুখীন হলে সে কাজকে শিশুশ্রম বলা হয়। উদ্দীপকের মোহন তেরো বছর বয়সে জুতার কারখানায় কাজ করে। তার এ শ্রম স্পষ্টতই শিশুশ্রম। আমাদের দেশের শিশুরা বাসাবাড়ির বাইরে বিভিন্ন কলকারখানায় যেমন- চুড়ি, বিড়ি, ব্যাটারি ও জুতা তৈরির কারখানায় কাজ করছে। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য তৈরির কারখানায়, লেদ ও ওয়েল্ডিং মেশিনেও কাজ করছে। গাড়ি বা টেম্পুর সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করছে। উদ্দীপকে মোহন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি জুতা তৈরির কারখানায় কাজ করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
অতএব মোহনের কাজ শিশুশ্রমের ধারণাকে প্রতিফলিঅন্তরে করে ।
উদ্দীপকে মলির কর্মক্ষেত্রে তার প্রতি যে আচরণ করা হয় তা শিশুশ্রমের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের বহিঃপ্রকাশ।
শ্রমজীবী শিশুর প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। তাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করতে হবে। তাদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। ভালো খাবার, পোশাক ইত্যাদি দিতে হবে যাতে এসব শিশু ভালো পরিবেশে বেড়ে উঠে পরিবার ও সমাজের প্রতি তারা দায়িত্বশীল হয়ে উঠে।
উদ্দীপকে মলির কাজ শিশুশ্রমের পর্যায়ে পড়ে। সাধারণত শিশুরা যেখানে শ্রমিক হয়ে কাজ করে সেসব জায়গায় তারা নানারকম বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হয়। কিন্তু উদ্দীপকের মলি তার কর্মক্ষেত্রে ভালো খাবার খেতে পায়, বেড়াতে যেতে পারে, ঈদের সময় পছন্দের জামা পায়। এসব কর্মকাণ্ড একজন শিশু শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া মলি কাজের অবসরে লেখাপড়ারও সুযোগ পায়। এতে তার মানসিক বিকাশ ঘটে। মলির প্রতি ভালো আচরণের কারণে সে মানবিক গুণসম্পন্ন একজন নাগরিক হয়ে উঠবে। অতএব বলা যায়, কর্মক্ষেত্রে মলির প্রতি আচরণ প্রশংসনীয়। এরূপ আচরণ প্রতিটি কর্মজীবী শিশুর প্রতি কাম্য। এরূপ আচরণই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক।
যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা সামাজিক শিক্ষা আয়ত্ত করে সমাজের উপযুক্ত সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় তাই সামাজিকীকরণ।
ব্যক্তির সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ ব্যক্তিকে আদর্শ সামাজিক মানুষে পরিণত করবে। ওর দ্বারা ব্যক্তি কাঙ্ক্ষিত আদর্শ, মূল্যবোধ, রীতিনীতি ইত্যাদি আয়ত্ত করবে। এতে করে ব্যক্তি যেমন আদর্শ মানুষে পরিণত হবে তেমনি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণেও তার ভূমিকা সহায়ক হবে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
