ইমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস। ইসলামি পরিভাষায়, শরিয়তের যাবতীয় বিধিবিধান অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং তদনুযায়ী আমল করাকে ইমান বলে। ইমানের পরিচয় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, "ইমান হচ্ছে- আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, পরকাল এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।” (মুসলিম)
কারিম (گریم) শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ- দয়াময়, মহানুভব, উদার ইতাদি। দয়া, কৃপা, ক্ষমা, সহনশীলতা, মহানুভবতা, উদারতা প্রভৃতি গুণাবলির সমাবেশ 'পূর্ণমাত্রায় যে সত্তার মধ্যে বিদ্যমান তাকেই বলা হয় কারিম। আর এসবের সমাবেশ পূর্ণমাত্রায় একমাত্র আল্লাহ পাকের মধ্যেই বিদ্যমান। আল্লাহ কারিম মানে আল্লাহ মহানুভব, মহামহিম, উদার ও দয়াময়। আল্লাহ তায়ালার দয়া ও দানের সাথে কারও তুলনা হয় না।
হাশর শব্দের অর্থ- সমাবেশ, ভিড়, চাপ ইত্যাদি। পুনরুত্থানের পর ভীত-শঙ্কিত জিন ও মানুষ একজন আহ্বানকারী ফেরেশতার ডাকে এক বিশাল ময়দানে সমবেত হবে। একে বলা হয় হাশর। হাশরের ময়দানে আল্লাহ তায়ালার সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের সমস্ত কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। ইহকালে যারা ইমান এনেছে ভালো কাজ করেছে, তারা আল্লাহর রহমত পাবে, আরামে থাকবে, চিরশান্তির জান্নাত লাভ করবে। আর যারা ইমান আনেনি, ভালো কাজ করেনি, তাদের কঠিন শাস্তি হবে।
'আকাইদ' আরবি শব্দ। এটি বহুবচন। এর অর্থ হলো বিশ্বাসমালা। এর একবচন হলো (কর্মী) 'আকিদাহ' যার অর্থ বিশ্বাস। ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের প্রতি বিশ্বাসকেই 'আকাইদ' বলা হয়।
তাওহিদ আরবি শব্দ। বাংলা ভাষায় একে বলা হয় একত্ববাদ। আল্লাহ্ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করাকে তাওহিদ বা একত্ববাদ বলা হয়।
তাওহিদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন (সকলেই তার মুখাপেক্ষী)। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেওয়া হয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা আল-ইখলাস: ১-৪)
আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সত্তাগতভাবে যেমন-একক, তেমনি গুণাবলিতেও তুলনাহীন। তিনি সকল গুণের আধার। তিনি চিরস্থায়ী, চিরঞ্জীব, শাশ্বত ও সত্য। তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ইত্যাদি। তার তুলনা একমাত্র তিনি নিজেই।
আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালা। যেমন- বিশাল আকাশ, চন্দ্র, সূর্য, ফুল, ফল গাছপালা, নদীনালা, পাহাড় পর্বত ইত্যাদি।
তাওহিদ বা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদে বিশ্বাস আকাইদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইমান ও ইসলামের মূলভিত্তি হলো তাওহিদ। তাওহিদে বিশ্বাস না করলে কেউ মুমিন বা মুসলিম হতে পারে না।
তাওহিদে বিশ্বাস মানুষকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করে। আর তাওহিদে বিশ্বাসীগণ আখিরাতে জান্নাত লাভ করবেন।
আকাইদের সর্বপ্রথম ও প্রধান বিষয় হলো তাওহিদ। তাওহিদ অর্থ আল্লাহ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করা, তার সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।
তাওহিদের দুটি শিক্ষা হলো-
১. 'আমরা আল্লাহ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করব এবং তার সাথে কাউকে শরিক করব না।
২. আমরা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত করব, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদাত করব না।
কালিমা তায়্যিবা অর্থ হলো- পবিত্র বাক্য। এটি তাওহিদ, ইমান ও ইসলামের মূলভিত্তি। কালিমা তায়্যিবাহ-এর মূলকথা হলো- "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা মাবুদ নেই, মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসুল।
'লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ' অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা মাবুদ নেই। অর্থাৎ পৃথিবীতে ইলাহ বা ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি ব্যতীত আর কেউ উপাস্য হতে পারে না।
কালিমা তায়্যিবা দ্বিতীয় অংশ দ্বারা বুঝানো হয়েছে মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসুল। অর্থাৎ মুহাম্মদ (স.) আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত নবি ও রাসুল। একথার উপর বিশ্বাস করা ইমানের অংশ।
কালিমা শাহাদাত হলো সাক্ষ্যদানের বাক্য। অর্থাৎ এ কালিমা দ্বারা ইমানের সাক্ষ্য দেওয়া হয়। কালিমা শাহাদাত এ যে সাক্ষাৎ দেওয়া হয় তা হলো-
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (স.) তার আল্লাহর) বান্দা ও রাসুল।
কালিমা শাহাদাতের প্রথম অংশ দ্বারা তাওহিদ বা একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়া হয়। অর্থাৎ আমরা এর দ্বারা সাক্ষ্য দিই যে, মহান আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি তার সত্তা ও গুণাবলিতে একক। তার কোনো শরিক বা অংশীদার নেই। ইবাদতের ক্ষেত্রে আমরা কাউকে তাঁর শরিক করি না।
কালিমা শাহাদাতের দ্বিতীয় অংশ দ্বারা রিসালাতের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ আমরা স্বীকার করি যে, হযরত মুহাম্মদ (স.) আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রাসুল।
আমানতু বিল্লাহি কামা হুয়া বি আসমাইহি ওয়া সিফাতিহি ওয়া কাবিলতু জামি'আ আহকামিহি ওয়া আরকাহিনি।
অর্থ: আমি 'ইমান' আনলাম আল্লাহর উপর, ঠিক তেমনি যেমন আছেন তিনি, তার সকল নাম ও গুণসহ। আর আমি তাঁর সকল হুকুম ও বিধিবিধান গ্রহণ করে নিলাম।
'ইমান' শব্দের অর্থ বিশ্বাস। আর 'মুজমাল' অর্থ সংক্ষিপ্ত। অতএব, ইমান মুজমাল অর্থ সংক্ষিপ্ত বিশ্বাস। সংক্ষেপে আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ও আনুগত্য স্বীকার করাকে ইমান মুজমাল বলা হয়।
আল-আসমাউল হুসনা আরবি শব্দ। আল-আসমা শব্দের অর্থ নামসমূহ। আর হুসনা অর্থ সুন্দরতম। অতএব, আল-আসমাউল হুসনা অর্থ সুন্দরতম নামসমূহ। আল্লাহ তায়ালার সুন্দর সুন্দর নামকে একত্রে আল-আসমাউল হুসনা বলা হয়।
আল্লাহ তায়ালা সকল গুণের আধার। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাকের অনেকগুলো গুণাবলি উল্লেখ আছে। তার মধ্যে কয়েকটি গুণ হলো- তিনি সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা, ক্ষমাশীল, দয়াবান, ধৈর্যশীল, সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান; প্রতিপালক ইত্যাদি।
আল্লাহ তায়ালা সকল কিছুর মালিক। মালিক অর্থ অধিকারী। তিনি আসমান, জমিন, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র পাহাড়, পর্বত, গাছপালা, নদী, সাগর সবকিছুর অধিপতি। সকল কিছুই তার নির্দেশে পরিচালিত হয়। কোনো কিছুই তার আদেশ লঙ্ঘন করে না। এক কথায় বিশ্বজগতে যা কিছু আছে সবকিছুরই মালিক হলেন মহান আল্লাহ।
আলিম আরবি শব্দ। এর অর্থ সর্বজ্ঞ অর্থাৎ যিনি সবকিছু জানেন বা যিনি, সকল জ্ঞানের অধিকারী। আল্লাহ তায়ালা হলেন আলিম। তিনি সকল জ্ঞানের আধার, তার জ্ঞান অসীম। তার জ্ঞানের পরিমাপ করা যায় না। কোনো কিছুই তার জ্ঞানের বাইরে নয়।
হাকিম আরবি শব্দ। এর অর্থ প্রজ্ঞাময়, হিকমতের অধিকারী, সুবিজ্ঞ, সুনিপুণ কর্মদক্ষ। মহান আল্লাহর গুণবাচক নাম হিসেবে হাকিম অর্থ আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়, সুদক্ষ, সুনিপুণ ও হিকমতের মালিক। এই মহাবিশ্ব তিনি যেমন সর্বোত্তম দক্ষতার সাথে সৃজন করেছেন, তেমন মহা প্রজ্ঞা, সুনিপুণ ও সুদক্ষ কৌশলের সাথে আবহমানকাল থেকে পরিচালনা করছেন।
রিসালাত শব্দটি আরবি। এর অর্থ বার্তা, খবর, চিঠি বা সংবাদ বহন। রাসুলগণ যে কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করেন তাকে বলা হয় রিসালাত। আল্লাহ তায়ালা নবি-রাসুলগণকে নানা দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন। রাসুলগণের সকল দায়িত্বকে এক কথায় রিসালাত বলা হয়।
নবি-রাসুলগণ হলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ বা মনোনীত বান্দা। নবুয়ত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁদের নির্বাচিত করেছেন। যিনি নবুয়তের দায়িত্ব পালন করেন তিনি হলেন নবি। আর রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারীকে বলা হয় রাসুল।
নবি-রাসুলগণের দায়িত্ব ছিল মানুষের নিকট আল্লাহ তায়ালার পরিচয় তুলে ধরা। তাঁরা মানুষকে মহান আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিতেন। মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের শিক্ষা দিতেন। তাঁরা মানুষের নিকট আল্লাহ তায়ালার বাণী ও বিধান পৌছে দিতেন। আল্লাহ পাকের আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে মানুষকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিতেন।
নবি ও রাসুলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যিনি নবুয়তের দায়িত্ব পালন করেন তিনি হলেন নবি। আর রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারীকে বলা হয় রাসুল। যাঁদের নিকট আসমানি কিতাব এসেছিল তাঁরা ছিলেন রাসুল। আর যাঁদের নিকট কোনো আসমানি কিতাব আসেনি তাঁরা হলেন নবি।
মহান আল্লাহ নানা কারণে মানুষের মধ্যে নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন। নিচে দুটি প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হলো-
১. নবি-রাসুলগণ মানুষকে আল্লাহ পাকের পরিচয় জানিয়েছেন।
২. তাঁরা আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালা ও সত্য দীনের প্রতি আহ্বান করতেন।
আখিরাত অর্থ পরকাল। মানুষের দুনিয়ার জীবনকে বলা হয় ইহকাল। আর ইহকালের পরের জীবনই হলো পরকাল। আরবিতে পরকালকে বলা হয় আখিরাত। মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে বলা হয় আখিরাত। এ জীবনের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।
আখিরাতে বিশ্বাস মানুষকে চরিত্রবান ও সৎকর্মশীল করে তোলে। আখিরাতে বিশ্বাস করলে মানুষ ভালো কাজ করতে উৎসাহিত - হয়, মন্দ কাজ করা থেকে বিরত থাকে। আখিরাতে বিশ্বাস মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালনা করে।
পরকালীন জীবনের প্রথম ধাপ বা পর্যায় হলো কবর। একে 'আলমের বারযাখ'ও বলা হয়। মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে এ জীবনের শুরু হয়। এরপর কিয়ামত বা হাশর পর্যন্ত কবরের জীবন চলতে থাকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর তাদের সামনে বারযাখ থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।" (সূরা আল-মু'মিনূন: ১০০)
মুনকার-নাকির ফেরেশতারা কবরে তিনটি প্রশ্ন করবেন। এগুলো হলো- তোমার রব কে? তোমার দীন কী? এবং তোমার নবি কে? যেসব লোকের কবর দেওয়া হয় না তারারাও প্রশ্ন থেকে রেহাই পায় না।
কিয়ামত অর্থ মহাপ্রলয়। পৃথিবীতে এমন একসময় আসবে যখন মানুষ আল্লাহ তায়ালাকে ভুলে যাবে। দুনিয়াতে আল্লাহ বলার মতো কোনো লোক থাকবে না। সে সময় আল্লাহ পাক দুনিয়া ধ্বংস করে দেবেন। তাঁর নির্দেশে হযরত ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁক দেবেন। ফলে মহাপ্রলয় ঘটবে। এ দুনিয়ায় যা কিছু আছে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এ ভয়ংকর অবস্থাই হলো কিয়ামত।
মিযান হলো, পরিমাপক যন্ত্র। যা দিয়ে হাশরের ময়দানে মানুষের পাপপুণ্যের ওজন করা হবে। যাদের পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। যাদের মিযানে পাপের পাল্লা ভারী হবে তারা হবে জাহান্নামী।
নৈতিকতা হলো নীতির অনুশীলন। অর্থাৎ কথা ও কাজে উত্তম রীতিনীতির অনুশীলন করা, মার্জিত ও বিনয়ী হওয়া, উত্তম চরিত্রবান হওয়া ইত্যাদি। অন্যায়, অশ্লীল ও অশালীন বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করাও নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত।
আকাইদ ও নৈতিকতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আকাইদ বা ইসলামি বিশ্বাসসমূহ মানুষকে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি আকাইদের বিষয়গুলো ভালোভাবে বিশ্বাস করে তার চরিত্র সুন্দর হয়। সে সবসময় নীতি ও উত্তম আদর্শের অনুসরণ করে। অন্যায়, অত্যাচার, অশ্লীলতা থেকে সে সর্বদা দূরে থাকে।
ইসলামের মূল বিষয়সমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার নামই আকাইদ। আকাইদের প্রথম বিষয় হলো তাওহিদ। আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদে বিশ্বাস হলো তাওহিদ। তাওহিদের পরই আসে রিসালাত। রাসুলগণের বিশ্বাস হলো রিসালাত। আর আখিরাতে বিশ্বাস আকাইদের অন্যতম অংশ। মানুষের দুনিয়ার জীবন শেষে যে জীবন শুরু তাই আখিরাত।
আকাইদ অর্থ বিশ্বাসমালা।
আল্লাহ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করাকে তাওহিদ বা একত্ববাদ বলা হয়।
কালিমা তায়্যিবা অর্থ হলো পবিত্র বাক্য।
লা ইলাহা অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
ইমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস।
ইমান মুজমাল অর্থ সংক্ষিপ্ত বিশ্বাস।
হুসনা অর্থ হলো সুন্দর।
আল্লাহ তায়ালার সুন্দর সুন্দর নামকে একত্রে আসমাউল হুসনা বলা হয়।
আল্লাহ তায়ালার উল্লেখযোগ্য ৯৯টি গুণবাচক নাম রয়েছে।
খালিক অর্থ সৃষ্টিকর্তা।
মালিক অর্থ অধিকারী।
কারিম অর্থ দয়াময়, মহানুভব ও উদার।
আলিম (عَلِيمٌ) অর্থ সর্বজ্ঞ
হাকিম (حَكِيمُ) অর্থ প্রজ্ঞাময়।
রাসুলগণ যে কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করেন তাই রিসালাত।
যাঁদের নিকট কোনো আসমানি কিতাব আসেনি তারা হলেন নবি।
যাঁদের নিকট আসমানি কিতাব এসেছিল তাঁরা হলেন রাসুল।
আখিরাত অর্থ হলো পরকাল।
মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে বলা হয় আখিরাত।
আখিরাতে মানুষ জান্নাতের শান্তি বা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।
আখিরাতের শস্যক্ষেত্র হলো দুনিয়া।
পরকালীন জীবনের প্রথম ধাপ হলো কবর।
কবরে আগমনকারী দুই ফেরেশতার নাম মুনকার-নাকির।
মৃত ব্যক্তিকে কবরে মুনকার-নাকির তিনটি প্রশ্ন করেন।
কিয়ামত অর্থ হলো মহাপ্রলয়।
আল্লাহর নির্দেশে শিঙ্গায় ফুঁক দিবেন ইসরাফিল (আ.)।
হাশর শব্দের অর্থ সমাবেশ, ভিড়।
ইমানের মূলভিত্তি হলো তাওহিদ।
ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের প্রতি বিশ্বাসই হলো আকাইদ।
সংক্ষেপে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ও আনুগত্য স্বীকার করাকে ইমান মুজমাল বলা হয়।
আসমা শব্দের অর্থ- নামসমূহ।
রিসালাত শব্দের অর্থ হলো বার্তা, খবর, চিঠি, সংবাদ বহন ইত্যাদি।
তাওহিদ শব্দের অর্থ হলো- একত্ববাদ।
পরকালীন জীবনের প্রথম ধাপ বা পর্যায় হলো কবর। একে আলমে বারযাখও বলা হয়। মানুষের মৃত্যুর পর এ জীবনের শুরু হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত এ জীবন চলতে থাকে।
আল্লাহ তায়ালা সকল কিছুর মালিক। তিনি আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, নদী-সাগর সবকিছুর অধিপতি। সকল কিছুই তাঁর নির্দেশে পরিচালিত হয়। কোনোকিছুই তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করে না। পশুপাখি, কীটপতঙ্গের মালিকও তিনিই। পৃথিবীতে বড়-ছোট সকল বস্তুই তাঁর মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহকে মালিক বলা হয়।
আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য নবি-রাসুল প্রেরণ করেন। নবি--রাসুলগণ আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ও সত্য দ্বীনের প্রচার করেন মানুষের মাঝে। মানুষের নিকট আসমানি কিতাবসমূহ পৌঁছে দিতেন। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদির পার্থক্য শিক্ষা দিতেন। উত্তম চরিত্র গঠনের জন্য আল্লাহর বিধানসমূহ হাতে-কলমে শিক্ষা দিতেন। সর্বোপরি জান্নাতে যাওয়ার পথ নির্দেশ ও জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার পন্থা শিক্ষা দিতেন।
হাশর শব্দের অর্থ-সমাবেশ, ভিড়, চাপ ইত্যাদি। কিয়ামতের পর বহুকাল একমাত্র আল্লাহ তায়ালা বিদ্যমান থাকবেন। অতঃপর তিনি পুনরায় সমস্ত প্রাণীকে জীবিত করবেন। তাঁর হুকুমে ইসরাফিল (আ.) দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁক দিবেন। ফলে সকল প্রাণী পুনরায় জীবিত হবে। একে বলা হয় মৃত্যুর পর পুনরুত্থান। এসময় একজন ফেরেশতা সবাইকে আহ্বান করবেন। ফলে সকলে একটি বিশাল ময়দানে সমাবেত হবে। একে বলা হয় হাশর।
নীতিহীন মানুষ পশুর সমান। পশুর কোনোরূপ নীতিবোধ নেই। সে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। ভালো-খারাপ, কল্যাণ-অকল্যাণ কোনোকিছুরই সে পরোয়া করে না। নীতিহীন মানুষও ঠিক তেমনি। সে কোনো রূপ আইনকানুন, বিধিবিধান মানে, না। নিজের লাভের জন্য সে অপরের ক্ষতি সাধন করে থাকে। মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকা দেওয়া, পরচর্চা ইত্যাদি তার চরিত্রে ফুটে ওঠে।
কালিমা তায়ি্যবার অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ বা ইলাহ নেই, মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসুল।
কালিমা শাহাদাতের অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া, আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক তার কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
তাওহিদ (تَوْجِيدٌ) আরবি শব্দ। বাংলা ভাষায় একে বলা হয় একত্ববাদ। আল্লাহ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করাকে তাওহিদ বা একত্ববাদ বলা হয়।
কালিমা তায়্যিবা আরবিতে - لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللَّهِ
নৈতিকতা এবং আকাইদের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নৈতিকতার শিক্ষা আকাইদের সাথে সম্পৃক্ত। আকাইদ মানুষকে নৈতিকতা অবলম্বনের জন্য তাগিদ দেয়। নৈতিকতা ব্যতীত আকাইদ সঠিক হয় না।
নবি-রাসুলগণ হলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ বা মনোনীত বান্দা। নবুয়ত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁদের নির্বাচিত করেছেন। যিনি নবুয়তের দায়িত্ব পালন করেন তিনি হলেন নবি। আর রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারীকে বলা হয় রাসুল।
ইমান ও ইসলামের মূলভিত্তি হলো তাওহিদ। তাওহিদে বিশ্বাস না করলে কেউ মুমিন বা মুসলিম হতে পারে না। পৃথিবীতে আগত সকল নবি-রাসুল (আ.) তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছেন। তাওহিদে বিশ্বাস মানুষকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করে। আর তাওহিদে বিশ্বাসীগণ আখিরাতে জান্নাত লাভ করবেন।
আখিরাতের পর্যায় তিনটি। যথা- করব, কিয়ামত ও হাশর। কবর হলো মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কাল। কিয়ামত হলো ধ্বংসপর্ব। এ সময় সবকিছু ধ্বংস করা হবে এবং বিচারের জন্য পুনরুত্থিত করা হবে। আর হাশর হলো বিচারালয়। এ দিনে মানুষ নিজ কৃতকর্মের আলোকে শাস্তি পাবে অথবা স্থায়ী শান্তি লাভ করবে।
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ বা ইলাহ নেই। অর্থাৎ পৃথিবীতে ইলাহ বা ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি ব্যতীত আর কেউ উপাস্য হতে পারে না। চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি, পাহাড়-পর্বত, বাঘ-সিংহ, রাজা-বাদশা কেউই ইবাদতের যোগ্য নয়। বরং এসবের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালাই হলেন একমাত্র মাবুদ।
ইমান মুজমাল-
أمَنْتُ بِاللَّهِ كَمَا هُوَ بِأَسْمَائِهِ وَصِفَاتِهِ وَقَبِلْتُ جَمِيعَ أَحْكَامِهِ وَ أَرْكَانِهِ
অর্থ: আমি ইমান আনলাম আল্লাহর ওপর, ঠিক তেমনি যেমন আছেন তিনি, তাঁর সকল নাম ও গুণসহ। আর আমি তাঁর সকল হুকুম-আহকাম ও বিধিবিধান গ্রহণ করে নিলাম।
Related Question
View Allকালিমা তাইয়্যিবার অর্থ হলো- আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসুল।
রিসালাত বলতে নবি রাসুলগণ যে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেসব দায়িত্বকে বোঝায়। রিসালাত শব্দের অর্থ বার্তা, খবর, চিঠি, সংবাদবহন প্রভৃতি। আল্লাহ তায়ালা নবি-রাসুলগণকে অনেক দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন। যেমন, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, সত্য দীন প্রচার করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা ইত্যাদি। নবি রাসুলগণের এসব দায়িত্বকেই রিসালাত বলা হয়।
মামার নিকট মেজবাহর প্রশ্নটি আকাইদের তাওহিদ বিষয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রিযিকদাতা। তিনি ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। তিনিই হলেন একমাত্র ইলাহ। আল্লাহর প্রতি এরূপ বিশ্বাসকে তাওহিদ বলে।
মেজবাই তার মামার সাথে সুন্দরবন বেড়াতে যায়। সুন্দরবনের গাছগাছালি ও সমুদ্রতীরের মনোরম দৃশ্যাবলি তাকে মুগ্ধ করে। সে অবাক হয়ে তার মামার কাছে জানতে চায়- এসব কিছুর স্রষ্টা কে? জবাবে মামা তাকে বলেন, এসবকিছুর স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা। কারণ সুন্দরবনের গাছগাছালি কোনো মানুষ রোপণ করেনি। সাগর সৃষ্টি করাও মানুষের কাজ নয়। এগুলো প্রকৃতিরও সৃষ্টি নয়। বরং এসব কিছু আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি যখন কোনোকিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন তিনি বলেন, 'কুন' (হয়ে যাও) তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে যায়। আর এগুলো লালন পালনও তিনি করেন। যদি এসব কিছু সৃষ্টি ও লালন-পালনে একাধিক স্রষ্টা থাকত তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ রাজত্ব নিয়ে পৃথক হয়ে যেত। অথবা রাজত্ব পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এ থেকে বোঝা যায়, স্রষ্টা একজন যা – তাওহিদকে প্রকাশ করে।
সুতরাং বলা যায়, মেজবাহর প্রশ্নটি আকাইদের তাওহিদ বিষয়ের বিষয়ের সাথে সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মেজবাহর প্রশ্নের জবাবে তার মামা বলেছিল, এ পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র এবং গাছগাছালি, জলপ্রপাত, সমুদ্রের জলরাশি সবই একজনের সৃষ্টি। মেজবাহর মামার এ উত্তরটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত।
বস্তুত আল্লাহ তায়ালাই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্তা। মহাজগতের নিয়ম-শৃঙ্খলা তাঁরই দান। আর পশুপাখি, গাছপালাসহ সবকিছুর-নিয়ন্ত্রকও তিনি। তিনিই সবকিছু করেন। বরং তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয়। এসব কিছুতে যদি একের বেশি নিয়ন্তা থাকত, তবে নানারকম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةً إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
অর্থ : 'যদি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে, আল্লাহ ব্যতীত বহু ইলাহ থাকত, তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত।' (সূরা আল-আম্বিয়া: ২২)
একটু চিন্তা করলেই আমরা বিষয়টি বুঝতে পারব। যেমন মহাজগতের সৃষ্টিকর্তা ও বিধানদাতা যদি একাধিক হতেন, তাহলে মহাজগৎ এত সুশৃঙ্খলভাবে চলত না। একজন স্রষ্টা চাইতেন সূর্য পূর্বদিকে উঠুক। আরেকজন চাইতেন পশ্চিম দিকে। আবার অন্যজন দক্ষিণ বা উত্তর দিকে সূর্যকে উদিত করতে চাইতেন। ফলে এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত।
এমনিভাবে আম গাছে আম না হয়ে কোনো কোনো সময় কাঁঠাল, জাম ইত্যাদিও হতে পারত। এতে আমরা বেশ অসুবিধায় পড়তাম। বস্তুত একাধিক স্রষ্টা বা নিয়ন্ত্রক থাকলে বিশ্বজগতের সুন্দর সুশৃঙ্খল অবস্থা বিনষ্ট হয়ে যেত। আল-কুরআনের অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ إِذًا لَذَهَبَ كُلُّ إِلَهُ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ
অর্থ : 'আর তাঁর (আল্লাহর) সাথে কোনো ইলাহ নেই। যদি তা থাকত, তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করত।' (সূরা আল-মুমিনুন : ৯১)
উল্লিখিত আলোচনা হতে এটাই প্রমাণিত হয়, সব কিছুর স্রষ্টা ও নিয়ন্তা হলেন মহান আল্লাহ তায়ালা। এজন্য মেজবাহর মামার উত্তরটি সঠিক ও যৌক্তিক।
আখিরাত শব্দের অর্থ- পরকাল। মৃত্যুর পরবর্তী অনন্ত জীবনই হলো আখিরাত।
নৈতিকতা বলতে সুনীতির অনুশীলন করাকে বোঝায়, অর্থাৎ কথা ও কাজে উত্তম রীতিনীতির অনুশীলন করা, মার্জিত ও বিনয়ী হওয়া, উত্তম চরিত্রবান হওয়া ইত্যাদি। এর পাশাপাশি অন্যায় কাজ, অশ্লীল ও অশালীন কাজ, পাপাচার প্রভৃতি অসৎ চরিত্র পরিত্যাগ করাও নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!