উপনিবেশিকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি দেশ অন্য দেশকে অর্থনৈতিক শোষণ এবং লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দখলে আনে। দখলকৃত দেশটি দখলকারী দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। বাংলাও প্রায় দুইশ বছর ইংরেজদের অধীনে উপনিবেশ ছিল।
বাংলায় মানব বসতি প্রাচীনকাল থেকেই শুরু হয়। এই অঞ্চল ধনসম্পদে ভরপুর থাকায় বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে এসে বসতি গড়ে তোলে। বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই ছিল বহিরাগতদের আকর্ষণের প্রধান কারণ।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় দীর্ঘ সময় ধরে কোনো শক্তিশালী শাসক না থাকায় অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই সময়কে মাৎস্যন্যায় যুগ বলা হয়। এটি সংস্কৃত ভাষায় 'বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে' এমন অরাজকতার সময় নির্দেশ করে। এ সময়ে বাংলা বহু রাজ্য বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।
বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের সূচনা হয় ১৩৩৮ সালে। সোনারগাঁওয়ের শাসনকর্তা ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লির সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন।
সুলতানি আমলে বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন সুলতান - শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তিনি বাংলার বৃহদাংশ অধিকার করে 'শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান' উপাধি গ্রহণ করেন। তার শাসনকালে বাংলার ঐক্য, 'স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়
সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ বাংলার ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বাংলার শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনকালে বাংলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করে।
বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এবং সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ উল্লেখযোগ্য। তারা ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং বাংলার সংস্কৃতি ও অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মোগল শাসনের সময় ঢাকার নামকরণ করা হয়েছিল 'জাহাঙ্গীরনগর'। ১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকা অধিকার করেন এবং তৎকালীন দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ঢাকার নাম জাহাঙ্গীরনগর করেন।
মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে ঢাকার নামকরণ করা হয়েছিল 'জাহাঙ্গীরনগর'। ১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মোগল শাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে।
বারোভূঁইয়া ছিল পূর্ব বাংলার একদল শক্তিশালী জমিদার, যারা মোগল আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। তাদের নেতা ছিলেন ঈশা খাঁ। মোগল শাসক আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বারোভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধ করেও সফল হতে পারেননি।
আকবরের সময়ে মোগলরা বাংলার পশ্চিম এবং উত্তরাংশ দখল করতে সক্ষম হয়। তবে পূর্ব বাংলায় বারো ভূঁইয়ারা মোগলদের আক্রমণ প্রতিহত করেন। আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁকে প্রথমে পরাজিত করতে পারেননি।
বাংলার মোগল শাসনের সম্পূর্ণ অধিকার অর্জিত হয় ১৬১০ সালে। মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি বারোভূঁইয়াদের পরাজিত করে ঢাকাকে মোগল প্রশাসনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলায় মোগল শাসনের অবসান ঘটে ১৭৫৭ সালে। পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে মোগল শাসনের চূড়ান্ত পতন ঘটে। এরপর বাংলার ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায় এবং ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়।
বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনা হয় ১৭৫৭ সালে। পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের ফলে মোগল শাসনের অবসান ঘটে। এরপর বাংলার শাসনক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়। এই ঔপনিবেশিক শাসন চলে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত।
১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীন শাসনের অবসান ঘটে। মোগল শাসনের চূড়ান্ত পতন হয় এবং বাংলার শাসন ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়। এটি ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করে।
ভাস্কো-দা-গামা ১৪৯৮ সালে সমুদ্রপথে দক্ষিণ ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান। এটি ছিল ইউরোপীয়দের জন্য ভারতবর্ষে বাণিজ্য বিস্তারের প্রথম পদক্ষেপ। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ বিশ্ব বাণিজ্যের প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতবর্ষের ধনী অঞ্চলগুলো, বিশেষত বাংলার সিল্ক, মিহি কাপড় এবং মসলার ব্যবসা। এই পণ্যগুলোর চাহিদা ইউরোপে অনেক বেশি ছিল, যা বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর জন্য মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে।
সতেরো শতকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভারতবর্ষে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (হল্যান্ড), ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ফ্রেণা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
বিদেশি বণিকরা বাংলায় স্থানীয় শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে বড়ো বড়ো শিল্পকারখানা স্থাপন করত। এসব কারখানায় তারা সিল্ক ও মিহি কাপড় উৎপাদন করে প্রচুর মুনাফা করত। এভাবে রাংলার অর্থনৈতিক সম্পদ ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের ১৬৬৬ সালে বাংলার বাণিজ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ওলন্দাজরা কাশিমবাজারে তাদের সিল্ক ফ্যাক্টরিতে ৭০০ থেকে ৮০০ শ্রমিক নিয়োগ করত। বার্নিয়ের আরও লিখেছেন, শুধু কাশিমবাজারে বছরে ২২ হাজার বেল সিল্ক উৎপাদিত হতো।
জব চার্নক ১৬৯০ সালে কলকাতা, সুতানটি এবং গোবিন্দপুর গ্রামগুলো ১২০০ টাকায় ক্রয় করেন। এই গ্রামগুলো পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে কলকাতা নামে পরিচিত হয়। কলকাতা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক উদ্যোগ, কূটকৌশল এবং শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর মাধ্যমে অন্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর তুলনায় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। তারা কুঠি এবং কারখানা তৈরি করে ব্যবসার পাশাপাশি বাংলার সম্পদ দখলে নেয়।
সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে বাংলার নবাব হন। নবাব হওয়ার পর তাঁকে উদীয়মান ইংরেজ শক্তি, বর্গিদের আক্রমণ এবং ঘসেটি বেগম ও মীর জাফরের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়। পাশাপাশি দেশীয় বণিকশ্রেণির বিরোধিতাও তাঁকে সামলাতে হয়।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে ঘসেটি বেগম, মীর জাফর, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ এবং ইংরেজরা জড়িত ছিল। এরা নবাবের অভ্যন্তরীণ শাসন দুর্বল করে তাকে পরাজিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
বাংলার দেশীয় বণিক সমাজের মধ্যে রাজপুতানা থেকে আগত মারওয়াড়ি বণিকরা ছিল উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদ নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা ইংরেজদের সমর্থন দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার পতনে ভূমিকা রাখে।
পলাশির যুদ্ধ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর ফলে বাংলা স্বাধীনতা হারায় এবং শাসনক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়।
পলাশির যুদ্ধের পরে মীর জাফরকে নবাব হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে নবাব হওয়ার পরেও তিনি প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাহীন ছিলেন। আসল ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে থাকে, এবং রবার্ট ক্লাইভসর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন।
পলাশির যুদ্ধ বাংলার স্বাধীনতার সমাপ্তি এবং ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা চিহ্নিত করে। এই যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে, এবং ইংরেজরা বাংলার অর্থনীতি ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
রবার্ট ক্লাইভ পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের নেতৃত্ব দেন এবং 'বাংলার শাসনক্ষমতা ইংরেজদের হাতে তুলে আনেন। বিজয়ের পর তিনি সর্বেসর্বা হয়ে বাংলার অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করেন।
বক্সারের যুদ্ধ ১৭৬৪ সালে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে মীর কাশিম ও তাঁর মিত্ররা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন। এর মাধ্যমে বাংলার শাসন ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়।
সিরাজউদ্দৌলার পতনের প্রধান কারণ ছিল তার দুর্বল শাসন এবং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র। ইংরেজদের উন্নত সামরিক শক্তি, কূটকৌশল এবং দেশীয় নেতৃত্বের অভাবও তাদের বিজয়ে সহায়তা করে। এছাড়া প্রজাদের নিষ্ক্রিয়তাও একটি বড়ো কারণ ছিল।
ইংরেজরা বাংলায় উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ রণকৌশল ব্যবহার করে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। এছাড়া দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে জোট বেঁধে এবং নবাবদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে।
পলাশির যুদ্ধে বাংলার সাধারণ মানুষ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। প্রজাদের শাসকের প্রতি সমর্থন না থাকায় তারা নবাব সিরাজউদ্দৌলার পাশে দাঁড়ায়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা ইংরেজদের সহজ বিজয়ে পরোক্ষভাবে সাহায্য করে।
পলাশির যুদ্ধ বাংলার স্বাধীনতার অবসান ঘটায় এবং ইংরেজ শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে। অন্যদিকে, বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিমের পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার শাসন ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের তে চলে যায়।
১৭৬৫ সালে মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর রবার্ট ক্লাইভের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে দ্বৈতশাসন প্রবর্তিত হয়। এতে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব কোম্পানির হাতে থাকে এবং বিচার ও শাসনের দায়িত্ব নবাবের ওপর ন্যস্ত হয়।
দ্বৈতশাসনের ফলে ইংরেজরা প্রজাদের ওপর অতিরিক্ত কর চাপিয়ে চরম শোষণ চালায়। এর মধ্যে পর পর তিন বছরের খরার কারণে ১৭৭০ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়, কিন্তু কোম্পানি কর কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রধান কারণ ছিল পর পর তিন বছরের খরা ও ফসলহানি। কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী অতিরিক্ত করের চাপে নিঃস্ব হয়ে পড়ে এবং তাদের খাদ্যের অভাব চরমে ওঠে। এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক অনাহারে মারা যায়।
১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকে বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলা হয়। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মারা যায়। এ অবস্থায় কোম্পানি কর আদায় বন্ধ না করায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
১৭৭৩ সালের পর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নরদের পদবি হয় গভর্নর জেনারেল। এই পদবির মাধ্যমে তারা প্রশাসনিক ও সামরিক কার্যক্রমে আরও বেশি ক্ষমতা অর্জন করে। এতে কোম্পানির শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়।
কোম্পানি শাসনকালে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তি, বাল্যবিবাহ রোধ এবং বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করা হয়। রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে এই সংস্কার সম্ভব হয়। এছাড়া শিক্ষা বিস্তার ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সূচনা হয়।
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্যে বিভিন্ন সংকট দেখা দেয়। দিল্লির দুর্বল অবস্থার সুযোগে-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেনাবাহিনী দিয়ে বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে মোগল সাম্রাজ্য তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সিপাহিদের বিদ্রোহ। এটি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম বড় সামরিক আন্দোলন। বিদ্রোহ দমনের পর ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন পাশ হয়। এর ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে।
১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে এবং সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনা করে।
ব্রিটিশ শাসনে বাংলার কৃষি ও তাঁতশিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। কৃষকরা জমিদারদের শোষণের শিকার হয় এবং বণিক শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্রিটিশদের শোষণমূলক নীতির ফলে বাংলার শিল্পায়ন স্থবির হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতি মন্দার দিকে যায়।
ব্রিটিশ শাসনে বাংলার নারীসমাজ সামাজিকভাবে পিছিয়ে ছিল। তাদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। রাজী রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে নারীদের জন্য কিছু সংস্কার কার্যক্রম চালু হয়।
ব্রিটিশ শাসনে বাংলার কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। ব্রিটিশ পণ্য আমদানি করে বাংলার বাজার দখল করা হয় এবং স্থানীয় শিল্পের উন্নয়নের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলার তাঁতশিল্প ও অন্যান্য ক্ষুদ্র শিল্পের শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। বাণিজ্যে ব্রিটিশদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দুদের জন্য ১৭৯১ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার জন্য। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত একটি শ্রেণি তৈরি হয়।
ইংরেজরা তাদের শাসন পাকাপোক্ত করার জন্য একটি ইংরেজি শিক্ষিত অনুগত শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিল। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটায়। এর মাধ্যমে স্থানীয়দের মধ্যে ইংরেজ শাসনের প্রতি আনুগত্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
ইংরেজ ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৩ সালে প্রস্তাব রাখেন যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হবে। ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ করা হবে। যুক্তি থাকলেও বস্তুত এর মধ্য দিয়ে বাংলায় ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বিভক্ত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশ শাসনের 'ভাগ করো, শাসন করো' নীতির বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশরা এই নীতির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। এর ফলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। তবে এটি হিন্দু-মুসলমান সমাজে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
বঙ্গভঙ্গের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। ব্রিটিশরা সুশাসনের অজুহাতে বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা করে। এই বিভাজনের মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। বঙ্গভঙ্গ 'ভাগ করো, শাসন করো' নীতির উদাহরণ।
বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমান নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাঁরা বুঝতে পারেন তাদের নিজস্ব একটি রাজনৈতিক সংগঠন থাকা দরকার। এই উপলব্ধির ফলস্বরূপ ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বঙ্গভঙ্গের সময় মুসলমান নেতারা বুঝতে পারেন, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠন প্রয়োজন। ফলে ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মুসলমানদের দাবি আদায়ে কাজ করে।
১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। এতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। মুসলমান নেতারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
বঙ্গভঙ্গের ফলে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগ্রত হয়। তারা সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, প্রীতিলতা প্রমুখ যুবকরা স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেন। তাদের এই সাহসিকতা জাতীয় আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে।
সিপাহি বিদ্রোহের কারণ ছিল ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং সৈন্যদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। এটি ব্রিটিশবিরোধী প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে পরিচিত। বাংলায় মঙ্গল পান্ডে ও রজব আলী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন।
সিপাহি বিদ্রোহে বাংলার মঙ্গল পাণ্ডে ও রজব আলী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। এছাড়া ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই এবং মহারাষ্ট্রের তাঁতিয়া টোপি এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। তারা ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের নেতৃত্ব ভারতীয়দের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা উজ্জীবিত করে।
স্বদেশি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বিলেতি পণ্য বর্জন এবং দেশীয় পণ্য ও শিক্ষার প্রচলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। বাঙালিরা বিলেতি পণ্য ত্যাগ করে নিজস্ব পণ্য ব্যবহার শুরু করে। এর মাধ প্রতি প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
বাংলার বিপ্লবীদের মধ্যে ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, মাস্টারদা সূর্যসেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার উল্লেখযোগ্য। তাঁরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলার মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করে। বিপ্লবী আন্দোলন দেশের স্বাধীনতার জন্য বড় ভূমিকা রাখে।
লাহোর প্রস্তাবটি ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে ভারতের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলো নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এটি এদেশের মানুষ ব্যাপকভাবে সমর্থন করে। পরবর্তীতে এই প্রস্তাব সংশোধিত হয়ে পাকিস্তান প্রস্তাবে রূপান্তরিত হয়।
লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র- ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ভারত ভাগের সাথে সাথে বাংলা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সাথে এবং পশ্চিম বাংলা ভারতের সাথে যুক্ত হয়।
লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে মুসলিম লীগ তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট করে এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করে। এটি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের পৃথক জাতিসত্তার দাবি জোরালো করে। এর ফলে ভারত ভাগের পথ আরও সুগম হয়।
লাহোর প্রস্তাব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি স্পষ্ট হয়। পরবর্তীতে এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
শরৎ বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অখন্ড বাংলা রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তারা চেয়েছিলেন ধর্মীয় বিভাজন এড়িয়ে একটি স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। তবে তাদের এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
বাংলার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অনেক নেতারা বাংলা ভাগকে সমর্থন করেননি। তাদের অনেকেই ধর্মীয় বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন। বিশেষ করে শরৎ বসু ও সোহরাওয়ার্দী বাংলা বিভাজনের বিপক্ষে অবস্থান নেন।
বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের আগমন ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে হলেও পরে তারা আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। এদের মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। ১৭৫৭ সালে বাংলা-বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে তারা ক্ষমতা দখল করে নেয়। বাংলায় ইংরেজদের শাসন চলে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। এভাবে ১৭৫৭ সালের পরে বাংলায় যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় সাধারণত আমরা তাকে ঔপনিবেশিক শাসন বলি। আর ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজ শাসনামলকে ঔপনিবেশিক যুগ বলি ।
এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-
উপনিবেশ কী তা ব্যাখ্যা করতে পারব;
উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার বিস্তার ও অবসানের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব;
বাংলায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের আগমন ও বাণিজ্য বিস্তার সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব;
বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারব; বাংলায় ইংরেজ শাসনের কার্যক্রম ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন করতে পারব;
ইংরেজ কোম্পানি শাসনের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারব;
ইংরেজ কোম্পানি শাসনকালে বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থা বর্ণনা করতে পারব; ইংরেজ কোম্পানি শাসনের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারব;
ব্রিটিশ শাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যাখ্যা করতে পারব;
তৎকালীন বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থা বর্ণনা করতে
ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব মূল্যায়ন করতে পারব,; বাংলার জাগরণের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব।
Related Question
View Allউপনিবেশিকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি দেশ অন্য দেশকে অর্থনৈতিক শোষণ এবং লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দখলে আনে। দখলকৃত দেশটি দখলকারী দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। বাংলাও প্রায় দুইশ বছর ইংরেজদের অধীনে উপনিবেশ ছিল।
বাংলায় মানব বসতি প্রাচীনকাল থেকেই শুরু হয়। এই অঞ্চল ধনসম্পদে ভরপুর থাকায় বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে এসে বসতি গড়ে তোলে। বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই ছিল বহিরাগতদের আকর্ষণের প্রধান কারণ।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় দীর্ঘ সময় ধরে কোনো শক্তিশালী শাসক না থাকায় অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই সময়কে মাৎস্যন্যায় যুগ বলা হয়। এটি সংস্কৃত ভাষায় 'বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে' এমন অরাজকতার সময় নির্দেশ করে। এ সময়ে বাংলা বহু রাজ্য বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।
বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের সূচনা হয় ১৩৩৮ সালে। সোনারগাঁওয়ের শাসনকর্তা ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লির সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন।
সুলতানি আমলে বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন সুলতান - শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তিনি বাংলার বৃহদাংশ অধিকার করে 'শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান' উপাধি গ্রহণ করেন। তার শাসনকালে বাংলার ঐক্য, 'স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়
সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ বাংলার ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বাংলার শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনকালে বাংলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!