নিধিকুণ্ড' শব্দের অর্থ নির্জন বা গোপন স্থানে ধন সঞ্চয়। এ সূত্রের শিক্ষা হলো ভোগসম্পদের চেয়ে পুণ্যসম্পদ অর্জন করাই শ্রেয়। নিধিকুন্ড সূত্রে বুদ্ধ প্রকৃত ধন ধারণা প্রদান করেন। দান. শীল, ভাবনা এবং আত্মসংযম দ্বারা অর্জিত পুণ্যসম্পদই প্রকৃত ধন।
নিধিকে যে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে তার অন্যতম হলো অনুগামী নিধি। অনুগামী নিধি বলতে বোঝায় শীলপালন, ধর্ম শ্রবণ, দানময়, ভাবনাময় জীবন। অনুগামী নিধির মাধ্যমে সুখ লাভ করা যায়।
ভিক্ষু তিষ্য শ্রাবস্তীর কাছেই নিগম গ্রামে বাস করতেন। তিনি কখনও অনাথপিণ্ডকের মতো শ্রেষ্ঠীদের মহাদান বা কোশলরাজ প্রসেনজিতের বড় দান উৎসবে যেতেন না। তিনি ছিলেন অল্পতে তুষ্ট।
'নিধিকুণ্ড সূত্র' ত্রিপিটকের অন্তর্গত খুদ্দকপাঠ গ্রন্থে বর্ণিত আছে। এখানে প্রকৃত সম্পদ বা পুণ্য সম্পদ সমন্ধে বলা হয়েছে, যা মানবজীবনের একান্ত কাম্য। এই প্রকৃত সম্পদ কোনগুলো এবং কীভাবে তা লাভ করা যায় সেই নিধি প্রদর্শন করতে গিয়ে বুদ্ধ 'নিধিকুন্ড সূত্র' দেশনা করেন।
নির্ধিকুন্ড সূত্র (পালি এবং বাংলা) :
এসো নিধি সুনিহিতো অজেয্যো অনুগামিকো,
পহায গমনীযেসু এতং আদায গচ্ছতি।
বাংলা অনুবাদ : সেই ধনই প্রকৃত সুনিহিত, অজেয় ও অনুগামী হয়, এই ধন নিয়েই মানুষ পরলোকে গমন করে।
নিধি' অর্থ ধন; আর 'কুন্ড' অর্থ নির্জন স্থান। অর্থাৎ নিধিকুন্ড শব্দের অর্থ হচ্ছে নির্জন বা গোপন স্থানে ধন সঞ্চয় করে রাখা। সাধারণত টাকা পয়সা, অলংকার, জমি, গাড়ি, বাড়ি প্রভৃতি বোঝায়। যা মানুষ ভবিষ্যতের সুখের আশায় সুরক্ষা হেতু গোপনে সঞ্চয় করে রাখে। তবে এসব ধন সুরক্ষিত নয়।
নিধিকুন্ড সূত্রে বুদ্ধ প্রকৃত ধন বা নিধি সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রদান করেন। দান, শীল, ভাবনা ও আত্মসংযম দ্বারা অর্জিত পুণ্য সম্পদই প্রকৃত ধন। চৈত্য, সংঘ, শীলবান ব্যক্তি, অতিথি, মাতা-পিতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবায় অর্জিত পুণ্য সম্পদই প্রকৃত ধন। এসব স্বয়ং সুরক্ষিত। অর্থাৎ পুণ্য সম্পদই হচ্ছে প্রকৃত নিধি।
নিধি বা সম্পদ চার প্রকার। যথা-
১. স্থাবর নিধি: ভূমি, সোনা, হীরা, অর্থ, বস্ত্র প্রভৃতি হস্তান্তরযোগ্য সম্পদ।
২. জঙ্গম নিধি: দাস-দাসী, হাতি, গরু প্রভৃতি পশু।
৩. অঙ্গ-সম নিধি: কর্ম, শিল্প, বিদ্যা, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রভৃতি।
৪. অনুগামী নিধি: দানময়, শীলময়, ভাবনাময়, ধর্ম প্রভৃতি যা অনুগমন করে সুখ লাভ হয়।
'অপ্রমাদ' শব্দের অর্থ হচ্ছে উদ্যম, উৎসাহ, উত্থানশীলতা, পরাক্রম, জাগ্রতভাব, স্মৃতিমান, সংযমশীলতা প্রভৃতি। অর্থাৎ কীভাবে জগতে অপ্রমত্ত বা অবিচল থেকে সৎকাজ করা যায় এবং চিত্তকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাঁর নির্দেশনাই হচ্ছে 'অপ্রমাদ বর্গ'। অপ্রমাদ বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষার ভিত্তি ও মূলনীতি।
যিনি অবিচল থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে সৎকাজ করেন তিনি অপ্রমত্ত ব্যক্তি। তিনি সংযত, শান্ত, অচঞ্চল, ধীর এবং প্রজ্ঞাবান হয়ে থাকেন। অপ্রমত্ত ব্যক্তি রাগ-দ্বেষ-মোহ দ্বারা বশীভূত হন না। ধর্মাচারণে তৎপর থেকে সর্বদা কুশলকর্ম সম্পাদন করেন। অবশেষে তিনি জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল ছিন্ন করে নির্বাণ লাভ করেন।
অপ্রমাদ বর্গে বুদ্ধ নানা সূত্র দেশনা করেছেন। একটি বাংলা অনুবাদ হলো-
যখন পণ্ডিত ব্যক্তি অপ্রমাদ দ্বারা প্রমাদকে দূর করেন, তখন তিনি প্রজ্ঞারূপ প্রাসাদে আরোহণ করেন, নিজে শোকহীন হয়ে শোকগ্রস্ত লোকদের অবলোকন করন। যেমন পর্বত শিখরস্থ কেউ ভূমিতে স্থিত সবকিছু দেখেন।
না। নিধিকুণ্ড সূত্র ও অপ্রমাদ বর্গ দুটি আলাদা বিষয়। নিধিকুণ্ড সূত্রের মাধ্যমে আমরা প্রকৃত সম্পদ বা পুণ্য সম্পদ কী তাঁর সম্যক ধারণা পাই। আর অপ্রমাদ বর্গ পাঠের মাধ্যমে জানতে পারি, কুশলকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে কীভাবে আমরা সেই প্রকৃত সম্পদ বা পুণরাশি অর্জন করতে পারি।
নিধিকুণ্ড সূত্র ও অপ্রমাদ বর্গ হতে আমরা নৈতিক জীবন গঠনের শিক্ষা পাই। নিধিকুণ্ড সূত্রে বর্ণিত সকল কাজই নৈতিক জীবন গঠনের উপাদান আর অপ্রমাদ বর্গে ঐ কাজগুলো সম্পাদন করতে যেরূপ আচরণ অনুশীলন অর্থাৎ রাগ-দ্বেষ, ঈর্ষা, লোভমুক্ত হয়ে সংযম চর্চা করতে বলা হয়েছে।
দান, শীল, ভাবনা এবং আত্মসংযম দ্বারা অর্জিত পুণ্যসম্পদই প্রকৃত ধন বা নিধি। চৈত্য, সংঘ, শীলবান ব্যক্তি, অতিথি, মাতা-পিতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবায় অর্জিত পুণ্যসম্পদই প্রকৃত ধন। এসব ধন স্বয়ং সুরক্ষিত। এ ধনসম্পদ কেউ হরণ করতে পারে না, কখনও বিনষ্ট হয় না। প্রয়োজনে উপকারে আসে এবং সবখানে অনুগমন করে। অতএব, পুণ্যসম্পদই প্রকৃত এবং সুরক্ষিত ধন বা নিধি।
বুদ্ধের সময় শ্রাবস্তীতে এক ধনাঢ্য ব্যক্তি বাস করতেন। একদিন তিনি ভিক্ষুসঙ্ঘসহ বুদ্ধকে পিন্ডদানে ব্যস্ত ছিলেন। সে সময় কোশল রাজ্যের রাজার অর্থের প্রয়োজন হয়। তিনি শ্রেষ্ঠীকে নিয়ে যাবার জন্য দূত প্রেরণ করেন। যখন শ্রেষ্ঠী বুদ্ধ ও ভিক্ষুসঙ্ঘের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন তখন দূত এসে তাঁকে রাজার আদেশ জ্ঞাপন করেন। তখন শ্রেষ্ঠী দূতকে বলেন, 'এখন যাও, আমি ধন সঞ্চয়ে ব্যস্ত আছি।' শ্রেষ্ঠী এখানে ধন বলতে পুণ্যসম্পদকে বুঝিয়েছেন। অতঃপর, ভগবান বুদ্ধ ভোজন সমাপন করে পুণ্যসম্পদকে যথার্থ নিধি হিসেবে প্রদর্শন করতে নিধিকুণ্ড সূত্র দেশনা করেন।
কুশলকর্মের মধ্যে অপ্রমাদই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রমাদ ব্যতীত স্মৃতির অনুশীলন সম্ভব নয়। অপ্রমাদ স্মৃতিকে জাগ্রত করে। যাঁরা স্মৃতিকে জাগ্রত রাখেন তারা নির্বাণ লাভ করেন। অপ্রমাদ বর্গে অপ্রমত্ত এবং প্রমত্ত ব্যক্তির স্বরূপ সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়। যিনি অবিচল থেকে নিষ্ঠার সাথে সৎকাজ করেন তিনি অপ্রমত্ত ব্যক্তি। অপ্রমত্ত ব্যক্তি রাগ-দ্বেষ-মোহ দ্বারা বশীভূত হন না। তিনি সর্বদা জাগ্রত থাকেন। ধর্মাচরণে তৎপর থাকেন। কর্তব্যকর্মে অবিচল থাকেন এবং সর্বদা কুশলকর্ম সম্পাদন করেন। তিনি সংযত শান্ত, অচঞ্চল, ধীর এবং প্রজ্ঞাবান হন। তিনি জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল ছিন্ন করে নির্বাণ লাভ করতে সক্ষম হন। এজন্য তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী।
অপরদিকে, প্রমত্ত ব্যক্তি অসংযত, অস্থির এবং আলস্যপরায়ণ হন। তিনি রাগ-দ্বেষ-মোহ দ্বারা বশীভূত হন। তিনি হিংসা ও আক্রোশের বশে অন্যের ক্ষতি করেন। প্রমাদ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তার পক্ষে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল ছিন্ন করা সম্ভব নয়। তিনি নির্বাণ লাভকরতে পারেন না। প্রমত্ত ব্যক্তির অবর্ণ, অকীর্তি, দুর্নাম, দৈনন্দিন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এজন্য প্রমত্ত ব্যক্তি জীবিত থেকেও মৃতবৎ। বুদ্ধগণ প্রমাদকে সর্বদা নিন্দা করেন। অপ্রমাদকে সর্বদা প্রশংসা করেন।
'নিধিকুন্ড সূত্র' ত্রিপিটকের অন্তর্গত খুদ্দকপাঠ গ্রন্থে বর্ণিত আছে। প্রকৃত সম্পদ বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গৌতম বুদ্ধ নিধিকুন্ড সূত্রটি দেশনা করেন। অপ্রমাদ বর্গ ত্রিপিটকের ধর্মপদ গ্রন্থে পাওয়া যায়। অপ্রমাদ বর্গে কীভাবে জগতে অপ্রমত্ত বা অবিচল থেকে সৎকাজ করা যায় এবং চিত্তকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা বর্ণিত আছে। নিধিকুণ্ড সূত্র এবং অপ্রমাদ বর্গের গাথাগুলো মানুষের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ সাধন করে। এ অধ্যায়ের প্রথম অংশে আমরা নিধিকুন্ড সূত্র এবং দ্বিতীয় অংশে অপ্রমাদ বর্গ পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- নিধিকুন্ড সূত্রের পটভূমি বর্ণনা করতে পারব।
- প্রকৃত নিধিসমূহ কী উল্লেখ করতে পারব।
- সূত্রটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারব।
- অপ্রমাদের ব্যাখ্যা দিতে পারব।
- অপ্রমত্ত থাকার সুফল মূল্যায়ন করতে পারব।
- নিধিকুন্ড সূত্র ও অপ্রমাদ বর্গের তুলনামূলক আলোচনা করতে পারব।
Related Question
View Allঅপ্রমাদ বর্গে ১২টি গাথার কথা উল্লেখ আছে।
'অপ্রমাদ' শব্দের অর্থ হচ্ছে উদ্যম, উৎসাহ, উত্থানশীলতা, জাগ্রতভাব, স্মৃতিমান, সংযমশীলতা ইত্যাদি। অপ্রমাদ বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষার ভিত্তি ও মূলনীতি। নির্বাণ লাভের জন্য অপ্রমাদ অত্যাবশ্যক। সুতরাং অপ্রমাদ বর্গের গাথাগুলোর মাধ্যমে উপযুক্ত বিষয়ে জ্ঞানার্জন লাভ করা যায়।
উদ্দীপকে ঘটনা-১ এ অপ্রমাদ বর্গের ১নং থেকে ৩নং গাথার ইঙ্গিত বহন করে। ঘটনা-১ বর্গের ১ থেকে ৩নং গাথার সাথে সংগতিপূর্ণ।
বুদ্ধ অপ্রমাদ বর্গের ১ হতে ৩নং গাথা ভাষণ করেছিলেন কৌশাম্বীর অন্তর্গত ঘোষিতারামে অবস্থানকালে। সেসময় মহারাজ উদয়নের প্রধান মহিষী ছিলেন শ্যামাবতী। তিনি ছিলেন বুদ্ধ ভক্ত। তিনি প্রত্যহ বুদ্ধের ধর্ম শ্রবণের জন্য ঘোষিতারামে যেতেন। রাজার অপর রানি ছিলেন মাগন্ধিয়া, সে বুদ্ধবিদ্বেষী। তিনি রানি শ্যামাবতীর বুদ্ধভক্তি একদম সহ্য করতে পারতেন না। তাই শ্যামাবতীর প্রাসাদে আগুন দেয়। এতে শ্যামাবতীসহ পাঁচশ সহচরী পুড়ে মারা যায়। রাজা রানি মাগন্ধিয়াকে প্রাণদণ্ড দেন। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের ঘটনা-১ এর মাধ্যমে অপ্রমাদ বর্গের ১ থেকে ৩নং গাথার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
উদ্দীপকের বিকাশ চাকমার কর্মটি ১২নং গাথার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ঘটনা-২ এ অপ্রমাদ বর্গটির ১২ নম্বর গাথার প্রতিচ্ছবি।
ভিক্ষু তিষ্য শ্রাবস্তীর কাছেই নিগম গ্রামে বাস করতেন। বাইরের জগতের সাথে তাঁর কোনো সংস্রব ছিল না বললেই চলে। নিজের কয়েকজন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ভিক্ষা করে যা পেতেন তাতেই তার প্রয়োজন মিটতো। এর বেশি আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না। এ কারণে শ্রেষ্ঠীদের মহাদান বা কোশলরাজ প্রসেনজিতের বড় দান উৎসবে তিষ্যকে কখনো দেখা যায়নি। এ নিয়ে লোকে তাঁকে নিন্দা করত এবং বলত তিষ্য শুধু তার স্বজনদেরকেই ভালোবাসেন। বুদ্ধ তিষ্যের এ অল্পে তুষ্ট আর লোভহীনতার কথা শুনে বেশ প্রশংসা করে অপ্রমাদ বর্গের ১২নং গাথাটি ভাষণ করেছিলেন।
উদ্দীপকে বিকাশ চাকমার ধর্মকর্মের সাথে ভিক্ষু তিষ্যের সাদৃশ্যতা রয়েছে। সুতরাং বলা যায়, ঘটনা-২ অপ্রমাদ বর্গের ১২ নম্বর গাথার প্রতিচ্ছবি।
অনুগামী নিধি হলো দানময়, শীলময়, ভাবনাময়, ধর্ম শ্রবণময়, ধর্মদেশনাময় পুণ্য। অনুগামী নিধি সবখানে সবসময় অনুগমন করে সুখ লাভ করা যায়। অনুগামী নিধি অর্জন করতে হলে দানশীল, ভাবনাময়, ধর্মশ্রবণ ও ধর্মদেশনাময় পুণ্য করতে হবে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!