গৃহ সাজানো যখন উদ্দেশ্য পূরণ করে তখন সেটি শিল্পের মর্যাদা পায়। শিল্প হচ্ছে যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টা বা অনুভূতি, যা মানুষকে আনন্দ দেয়। মানুষের কল্যাণের জন্য সুন্দর উদ্দেশ্য নিয়ে শিল্পের সৃষ্টি হয়। গৃহকে সাজানোর কাজটি যখন এসব উদ্দেশ্য পূরণ করে তখন সেটি শিল্পের মর্যাদা পায়। এবং এই গৃহ সাজানোকে শিল্প বলতে পারি।
যা কিছু দিয়ে শিল্প সৃষ্টি করা হয় তাই শিল্প উপাদান। শিল্প উপাদানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রং, রেখা, আকার ও জমিন। আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি, তার প্রতিটিতে রং, আকার, উপরিভাগ বা জমিন এবং কিছু রেখা থাকে, এগুলো শিল্প সৃষ্টির উপাদান।
রংঙের দুটি প্রকার হলো-
১. প্রাথমিক রং যে রং অন্য কোনো রং থেকে তৈরি করা যায় না, সেগুলোই প্রাথমিক রং।
২. মাধ্যমিক রং একই পরিমাণে দুটি প্রাথমিক রং মেশানো হলে যে রং সৃষ্টি হয় তা মাধ্যামিক রং।
১২টি রং চক্রাকার সাজিয়ে বর্ণবক্র তৈরি করা হয়। বর্ণচক্র দিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, সংমিশ্রত রঙের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট বোঝা যায়। এ থেকে খুব সহজেই গৃহের আসবাবপত্রের রং, গৃহসজ্জার অন্যান্য উপকরণের রং নির্বাচন করা যায়।
বর্ণচক্রের উজ্জ্বল রংগুলোকে গরম বা উষ্ণ রং বলা হয়। যেমন- লাল, হলুদ, কমলা। উষ্ণ রঙের ব্যবহার পরিবেশে গরম ভাব আনে। উষ্ণ রং দৃষ্টির সামনের বস্তুকে কাছে নিয়ে আসে। উষ্ণ বা উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার ঘরের আকৃতি ছোট মনে হয়।
বর্ণচক্রের হালকা রংগুলো ঠান্ডা বা শীতল রং বলা হয়। যেমন- নীল, নীলচে সবুজ, সবুজ। শীতল রঙের ব্যবহার ঠান্ডা, শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশের অনুভূতি দেয়। শীতল রং দৃষ্টির সামনের বস্তুকে দূরে নিয়ে যায়। শীতল বা হালকা রঙের ব্যবহারে ঘরকে বড় দেখায়।
কোনো কিছুর সামগ্রিক গঠনকে আকার বলে। দুই ধরনের আকার রয়েছে। যথা- মুক্ত আকার-জ্যামিতিক আকার ছাড়া সব ধরনের আকার মুক্ত আকার। যেমন- গাছের আকার, ফুলের আকার। জ্যামিতিক আকার-বৃত্ত, চতুর্ভুজ, ত্রিভুজ, আয়তক্ষেত্র ইত্যাদি।
চোখে দেখে এবং স্পর্শ করে জমিনের বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। জমিন শিল্প সৃষ্টির অন্যতম উপাদান। বস্তুর উপরিভাগের বৈশিষ্ট্যই এটি। গরম ও ঠান্ডা পরিবেশ সৃষ্টির জন্য জমিন বড় ভূমিকা পালন করে।
শিল্প সৃষ্টির জন্য যে নীতিগুলো অনুসরণ করার দরকার হয় সেগুলোই শিল্প নীতি। শিল্পনীতিগুলো হলো- (ক) সমানুপাত (Proportion); (খ) ভারসাম্য (Balance); (গ) মিল (Harmony); (ঘ) ছন্দ (Rythm) ও (ঙ) প্রাধান্য (Emphasis) |
সৃষ্টিকে আকর্ষণীয় ও মজবুত করার জন্য সমানুপাত নীতি অনুসরণ করা হয়। একটি অংশের সাথে আরেকটি অংশের আকার-আকৃতি ও অনুপাতের সামঞ্জস্য থাকাই সমানুপাত। এটি অনুধাবনের ব্যাপার। যখন কোন বৈশিষ্ট্যের আধিক্য থাকে না, আবার স্বল্পতাও থাকে না, তখনই আমাদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয়।
ভারসাম্য নীতির উপর ভিত্তি করে ঢেঁকিতে চড়া খেলা হয়। ঢেঁকির দুইদিকে যদি সমান ওজন না হয় তাহলে ঢেঁকি খেলা সম্ভব হয় না। আবার একদিকে বেশি ভারী হলে অন্যদিকে হাল্কা ওজনের দুইজন বসেও খেলাটা চালিয়ে নেওয়া যায়। এটিই ভারসাম্যের নীতি।
কোনো ঘরে প্রবেশ করলে যখন দেয়াল থেকে শুরু করে মেঝে, আসবাবপত্র, পর্দা, আলো ইত্যাদি সবকিছুর মধ্যে একটা সম্পর্ক ফুটে উঠে, দেখতে কোনো রকম অসমন্বয় লাগে না, তখন বুঝতে হবে ঘর সাজানোতে মিল রয়েছে। এটি হতে পারে একটি জিনিসের বিভিন্ন অংশের মিল।
কোনো কিছু পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে ছন্দ সৃষ্টি করা হয়। শিল্পকে প্রানবন্ত ও চলমান করতে ছন্দের দরকার হয়। ছন্দ একটি আকর্ষণীয় 'গতিশীল অবস্থা। কোনো শিল্প দেখার সময় চোখ কোনো কিছুতে যেন বাধাপ্রাপ্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার।
আসবাবপত্র ক্রয়ে বা সংস্থাপনের আগে প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করা উচিত। প্রতিটি কক্ষের কাজ অনুযায়ী আসবাবপত্র সাজাতে হয়। আসবাবপত্র এমনভাবে সাজাতে হবে যেন চলাচলে অসুবিধা না হয়। আসবাব সংস্থাপনে শিল্পনীতি অনুসরণ করতে হবে।
ঘরের দেয়াল, মেঝে, ছাদ ও আসবাবপত্রের রঙের সাথে মিল রেখে পর্দার রং নির্বাচন করতে হয়। হালকা রঙের পর্দা ব্যবহারে ঘরকে বড় দেখায়। হালকা রঙের পর্দা বিশ্রামের ঘরগুলো ঠান্ডা পরিবেশ সৃষ্টি করে। পর্দার জমিনের জন্য কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক তন্তুর কাপড় নির্বাচন করা যেতে পারে।
কক্ষসজ্জার অন্যতম একটি উপকরণ হলো দেয়ালচিত্র। দেয়ালের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দেয়ালে নানা ধরনের পেইন্টিং এবং ছবি ঝোলানো হয়। দেয়ালে ঝোলানো এই পেইন্টিংকে দেয়ালচিত্র বলা হয়।
ছবির আকৃতির সাথে দেয়ালের আকৃতির সামঞ্জস্য থাকতে হরে। একের অধিক ছবি দিয়েও বড় দেয়াল সাজানো যায়। ঘরের সব ছবি একই উচ্চতায় টাঙাতে হবে, ঘরের কর্মকান্ডের সাথে মিল রেখে ছবির বিষয়বস্তু হবে। দেয়ালে ছবি এমনভাবে টাঙাতে হবে যাতে কোনো তার, দড়ি, সুতা দৃষ্টিগোচর না হয়।
পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ঘরে প্রবেশের জন্য জানালা বা দরজায় গ্লাস ব্যবহার করা হয়। ঘরে প্রাকৃতিক আলো আসার ব্যবস্থা করা কাজের জন্য ভালো ও স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
প্রাচ্যরীতি এবং পাশ্চাত্যরীতি অনুসরণ করে ফুল সাজানো হয়। প্রাচ্য রীতিতে ফুল সাজানো বলতে জাপানি পদ্ধতি অনুসরণ করাকে বোঝায়। পাশ্চাত্য পদ্ধতি ফুল সাজানোতে অনেক ফুল ব্যবহার করা হয়।
ইকেবানা পদ্ধতিতে ফুলদানিতে তিনটি প্রধান ডাল থাকে। সবচেয়ে উঁচু ডালটি হলো স্বর্গ, দ্বিতীয় উচ্চতার ডালটি মানুষ এবং ছোট ডালটি পৃথিবীর প্রতীক হিসেবে ফুল সাজানো হয়। প্রথম ডালটির উচ্চতা ফুলদানির ব্যাস ও উচ্চতায় যোগফলের সমান। প্রধান ডাল তিনটি ছাড়া আশপাশের ডাল, পাতা, ফুলকে ফিলার বলা হয়।
গৃহকে মনোরম ও আকর্ষণীয় করার কাজটি শিল্পের একটি ক্ষেত্র। শিল্প হচ্ছে যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টা বা অনুভূতি যা মানুষকে আনন্দ দেয়। এই প্রচেষ্টা কোনো কিছু সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হতে পারে, আবার আচরণের মধ্যে দিয়েও হতে পারে। মানুষের কল্যাণের জন্য সুন্দর উদ্দেশ্য নিয়ে শিল্পের সৃষ্টি হয়। গৃহকে সাজানোর কাজটি যখন এসব উদ্দেশ্য পূরণ করে তখন সেটা শিল্পের মর্যাদা পায়। এখন প্রশ্ন হলো, গৃহকে আমরা আকর্ষণীয় করব কীভাবে? এর জন্য গৃহ পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্তভাবে গৃহকে সাজানো। এটি অভ্যন্তরীণ গৃহসজ্জা (Interior Decoration) নামে পরিচিত। গৃহকে মনোরম ও আকর্ষনীয় করে তুলতে হলে, যে বিষয়গুলো শেখা দরকার তা এই অধ্যায়ে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো-
Related Question
View Allগৃহের ভেতরের পরিবেশ সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে সাজানোকে, অভ্যন্তরীণ গৃহসজ্জা বলে।
গৃহ ও গৃহের আশেপাশে যা আছে সব নিয়েই গৃহ পরিবেশ গঠিত। পরিবারের সুখ-শান্তি, স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্য নির্ভর করে সুষ্ঠু গৃহ পরিবেশের ওপর।
সালেহা গৃহসজ্জায় পর্দার রঙকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
পর্দা ঘরের আব্রু রক্ষা এবং রোদ ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা করে। দেয়াল, মেঝে, ছাদ ও আসবাবপত্রের রঙের সাথে মিল রেখে পর্দার রং নির্বাচন করতে হয়। সালেহার বসার ঘরটি ছোট। তিনি তার বসার ঘরে আকাশি রঙের পর্দা ব্যবহার করেন। তিনি তার বসার ঘরটিকে আপাতদৃষ্টিতে বড় দেখানোর জন্য হালকা রঙের পর্দা ব্যবহার করেছেন। ঘরকে বড় দেখানো ছাড়াও হালকা রঙের পর্দা ঘরগুলোতে ঠান্ডা, শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই বলা যায়, সালেহা বেগম গৃহসজ্জায় রঙকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
গৃহসজ্জায় হালিমা পারদর্শী নন।
সালেহা ও হালিমা একই আয়তনের ফ্ল্যাটে থাকেন। প্রতিবেশী মারিয়া সালেহার বাসা থেকে হালিমার বাসায় গিয়ে মন্তব্য করেন হালিমার বসার ঘরটি ছোট। হালিমা বসার ঘরে লাল রঙের ফুলের ছাপার পর্দা ব্যবহার করেন। লাল একটি উষ্ণ রং। এ রঙের পর্দা ব্যবহারের কারণে ঘরের আকৃতি ছোট মনে হয় আর ছাপার পর্দাও আপাতদৃষ্টিতে ঘরের আকৃতিকে ছোট করে তোলে। এছাড়া তিনি দরজার পাশে বড় আকারের একটি টব রেখেছেন। এতে কেউ দরজা খুলে ঘরে ঢোকার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তিনি টবটি দরজার কাছে না রেখে ঘরের অন্য কোথাও স্থাপন করলে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হতো না। সঠিকভাবে সমন্বয় ও গৃহসজ্জার শিল্প উপাদানের প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি তার বসার ঘরটি আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারতেন। এ থেকে বোঝা যায়, গৃহসজ্জায় হালিমা পুরোপুরি পারদর্শী নন।
সুন্দর, সহজ ও আকর্ষণীয় সব কিছুই হলো শিল্প।
সংমিশ্রিত রং বলতে বোঝায় সমপরিমাণ একটি প্রাথমিক রং ও একটি মাধ্যমিক রঙের সংমিশ্রণ। যেমন: লাল + কমলা = লালচে কমলা, হলুদ + সবুজ = হলদে সবুজ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!