শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, জন্মের পর থেকে বয়ঃসন্ধিকাল বা কিশোর বয়সের আগে পর্যন্ত ছেলেমেয়েরাই হচ্ছে শিশু। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সের নিচে সবাই শিশু। বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ এবং শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে ধরা হয়।
শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে শিশু অধিকার সনদ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি অংশে পরিণত হয়।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৫৪টি ধারায় শিশুকল্যাণ নিশ্চিত করা হয়েছে। সনদের কয়েকটি ধারা হলো ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুর মর্যাদা, সকল শিশুরই সমান অধিকার, প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার ইত্যাদি।
রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। সব শিশুর জন্য মাধ্যমিক এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের পক্ষে যদি এ সুযোগ বিনামূল্যে দেওয়া সম্ভবত না হয়, তাহলে প্রয়োজনবোধে সরকার আর্থিক সহায়তা দেবে।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হবে শিশুর মধ্যে ব্যক্তিত্ব, মেধা এবং শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানো। শিশুর মধ্যে তার মা-বাবা, শিক্ষক, বড় ও ছোটদের প্রতি, নিজের দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি এবং অন্যান্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা জন্মানো।
১৮ বছরের আগে যদি শিশু কোনো অপরাধমূলক কাজ করে তবে তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। বরং তাকে সংশোধনের জন্য শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো যাবে। সংশোধনের মাধ্যমে অপরাধমূলক আচরণ প্রতিকারের ব্যবস্থা করা, সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া।
অনেক শিশু বিদ্যালয়ে না গিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত হয়। অনেক শিশু আবার বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন রকম কাজ করে। এসব শিশু অর্থ উপার্জন করে মা-বাবার হাতে তুলে দেয় সংসার খরচের জন্য। শিশুরা বেঁচে থাকার প্রয়োজনে অর্থ উপার্জনের জন্য যে পরিশ্রম করে তাকেই শিশুশ্রম বলে।
অনেক শিশু এমন কাজ করে যার ফলে তাদের মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে। এ ধরনের কাজে নিয়োজিত শিশুদের শ্রমকে বলা হয় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম। এগুলো হলো- বোঝা বহন, ওয়ার্কশপের কাজ, বর্জ্য থেকে জিনিস সংগ্রহ, টেম্পুর সাহায্যকারী ইত্যাদি।
শিশুশ্রমরোধে আমাদের সকলের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। যেমন আমার নিজের এবং আমার আত্মীয়স্বজনের বাসায় যেসব শিশু কাজ করে তাদের সাথে ভালো আচরণ করা। অভিভাবকদের বলে তাদের পড়াশোনার' ব্যবস্থা করানো। বিভিন্ন উৎসব যেমন ঈদ বা পূজায় দরিদ্র শিশুদের নতুন কাপড় ও ভালো খাবার দেবে এবং বন্ধুদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করবে।
শিশু পাচারকারীরা অর্থের বিনিময়ে শিশু পাচার করে। শিশুদের আটক করে পিতামাতার কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে এবং শিশুদের বিভিন্ন অমানবিক কাজে ব্যবহার করে।
পাচারকারীরা শিশুর পিতামাতাকে বা অভিভাবককে না জানিয়ে যা প্রতারণা করে। ভয় বা লোভ দেখিয়ে অথবা জোরপূর্বক ধরে নিয়ে বা অপহরণ করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয় অথবা বিক্রি করে দেয়। একে শিশু পাচার বলে।
দূরে কোথাও বা নির্জন জায়গায় একাকী না যাওয়া। অপরিচিত যা অল্প পরিচিত কারও সাথে কোথাও না যাওয়া। অপরিচিত বা অল্প পরিচিত ব্যক্তির দেওয়া কোনো খাবার, খেলনা, টাকা-পয়সা ও কোনো জিনিস না নেওয়া।
পারিবারিক বাজেট পরিকল্পনা, মেনু পরিকল্পনা, বেড়াতে যাওয়া, দ্রব্য ক্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজস্ব মতামত শিশু দিতে পারে এবং পরিবারকে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। ৫ ও ৬ বছর বয়স থেকেই শিশুর ভালোমন্দ বোঝার বয়স হয়। এই সময় থেকে শিশুরা নানা ব্যাপারে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারে। দল গঠন বা দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার স্বাধীনতা আছে।
শিশু যদি তার মা-বাবা একজন বা উভয় হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তাদের দুজনের সাথেই যোগাযোগ করার অধিকার রয়েছে। আবার কোনো শিশুর মা-বাবার মৃত্যুর কারণে যদি 'পারিবারিক পরিবেশ থেকে আলাদা হয়, তাহলে সরকার শিশুটির জন্য ব্যবস্থা নেবে। শিশু হারিয়ে গেলে মা-বাবাকে খুঁজে বের করা এবং শিশুকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
মাদকদ্রব্য মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। ফলে পড়াশোনা ও কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। পারিবারিক শান্তি নষ্ট করে। মাদকদব্য মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে নষ্ট করে। ফলে অপরের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়।
যেসব জায়গায় মাদক্ পাওয়া যায় সেখানে যাওয়া উচিত নয়। যারা মাদক খায় তাদের সাথে মেলামেশা বা বন্ধুত্ব করা যাবে না। দোকানে বা পাড়ায় কোনো বন্ধুর সাথে আড্ডা দেওয়া উচিত নয়। যদি কোনো বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তি কোনো ট্যাবলেট, অপরিচিত কিছু খেতে দিয়ে বলে যে, এটি খেলে শরীরে বাড়তি শক্তি পাবে, শরীর চাঙ্গা হবে এসব না খাওয়া।
শিশুকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। আমরা পাঁচ বছরের ছেলেমেয়েকেও শিশু বলি, আবার দশ-এগারো বছরের ছেলেমেয়েকেও শিশু বলে থাকি। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা অবশ্য শিশুকালকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। তাঁদের মতে, জন্মের পর থেকে বয়ঃসন্ধিকাল বা কিশোর বয়সের আগে পর্যন্ত ছেলেমেয়েরাই হচ্ছে শিশু। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সের নিচে সবাই শিশু। বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ এবং শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সিদের শিশু হিসেবে ধরা হয়। তোমরা নিশ্চয়ই জাতিসংঘ সম্পর্কে জানো, জাতিসংঘ হচ্ছে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার পক্ষে সহযোগিতা দানের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা। শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে শিশু অধিকার সনদ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি অংশে পরিণত হয়। ইতিহাসে এটি হচ্ছে সবচেয়ে ব্যাপকভাবে গৃহীত মানবাধিকার চুক্তি। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৯১টি দেশ এই চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি।
Related Question
View Allসবচেয়ে ব্যাপকভাবে গৃহীত মানবাধিকার চুক্তি হলো শিশু অধিকার সনদ।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সের নিচে সবাই শিশু। আমাদের দেশের জাতীয় শিশুনীতিতে ১৪ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে ধরা হয়। সনদের সাথে এ অসামঞ্জস্যের ফলে বাংলাদেশের অনেক শিশুই সনদ অনুযায়ী সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রানা শিক্ষা লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আবদুল মালেক একজন রিক্সাচালক। তার বড় ছেলে রানার বয়স ১২ বছর। সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সে পড়ালেখায় ভালো। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবৎ তার বাবা অসুস্থ থাকায় ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। এ অবস্থায় আবদুল মালেক তার ছেলেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে গার্মেন্টসে কাজে লাগিয়ে দেন। ফলে সে স্কুলে যেতে পারছে না। শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং মাধ্যমিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। প্রয়োজনে সরকার তাদের আর্থিক সাহায্য দেবে। শিক্ষার অধিকার হলো শিশুর অন্যতম মৌলিক অধিকার।
শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর ব্যক্তিত্ব, শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যের পরিপূর্ণ বিকাশ হয়। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আবদুল মালেকের গৃহীত পদক্ষেপ জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় উপার্জন করতে পারছেন না। তাই তিনি তার ছেলেকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করেছেন। শিশুরা যদি অনাদর, অবহেলা ও শিক্ষার অভাবে অজ্ঞতায় ডুবে থাকে তবে তাদের জীবন বিপন্ন হবে।
শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী সব শিশুর সমান অধিকার রয়েছে। সরকারের দায়িত্ব শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। সরকারের পক্ষ থেকে এ সুযোগ বিনামূল্যে দেওয়া প্রয়োজন। যদি তা সম্ভব না হয় তবে তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। অনেক শিশু আর্থিক সমস্যার কারণে স্কুলে না গিয়ে কাজ করে। এই শিশুশ্রম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্দীপকে আব্দুল মালেক অসুস্থ হয়ে পড়ায় ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। যার কারণে পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। ফলে তিনি তার ছেলের লেখাপড়া বন্ধ করে তাকে গার্মেন্টসে কাজে লাগিয়ে দেন।
সুতরাং বলা যায় যে, তার গৃহীত পদক্ষেপটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
সংশোধনের জন্য শিশুদের কিশোর অপরাধ সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত।'
অতি শৈশব থেকেই যদি শিশু অবহেলা, অনাদরে জীবনযাপন করে, অপুষ্টি ও রোগের কারণে স্বাস্থ্যহীন হয়ে পড়ে, শিক্ষার অভাবে অজ্ঞতায় ডুবে থাকে তাহলে তার জীবন বিপন্ন হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!