'নির্বাণ' শব্দের অর্থ হচ্ছে 'নিবৃত্তি' বা তৃষ্ণার ক্ষয়। 'নি' উপসর্গের সাথে 'বাণ' শব্দটি যুক্ত হয়ে 'নির্বাণ' শব্দটির বুৎপন্ন হয়েছে। সুতরাং, . নির্বাণ বলতে সর্বতৃষ্ণার অবসানকে বোঝায়।
নির্বাণদশী মুক্ত পুরুষ পঞ্চস্কন্ধের বিনাশ করে যখন পরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন তখন তাকে 'অনুপাদিসেস নির্বাণ বলে। অর্থাৎ শারীরিক ধাতু বা পঞ্চস্কন্ধসমূহ ত্যাগ করে জন্ম-মৃত্যুর নিরোধ অবস্থাই অনুপাদিসেস নির্বাণ। বুদ্ধ ৪৫ বছর ধর্ম প্রচারে কুশীনগরের যমক শাল বৃক্ষের নিচে অনুপাদিসেস নির্বাণ লাভ করেন।
সোপাদিসেস নির্বাণ হচ্ছে পঞ্চস্কন্ধের বিদ্যমান অবস্থায় তৃষ্ণাক্ষয় করে মুক্ত পুরুষ হয়ে অবস্থান করা। সুতরাং সোপাদিসেস নির্বাণের কতিপয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যথা-
ক. পঞ্চস্কন্ধের বিদ্যমান থাকবে।
খ. পঞ্চস্কন্ধের বিদ্যমান মুক্তিলাভ।
গ. তৃষ্ণাক্ষয়ে আনন্দে অবস্থান করা।
ঘ. জীবিত অবস্থায় জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর নিরোধ করা।
ঙ. আনন্দ, বেদনা রহিত হওয়া।
চ. চতুরার্য সত্য উপলব্ধিতে সম্যক মার্গে গমন।
ছ. এ জ্ঞানলাভে শেষ জন্ম।
উদাহরণস্বরূপ আমরা বুদ্ধের বোধিজ্ঞান লাভের সময়কে উল্লেখ করতে পারি। বুদ্ধ জ্ঞানলাভের পরই সোপাদিসেস নির্বাণ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
মিলিন্দ প্রশ্ন' নামক গ্রন্থে নির্বাণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, নির্বাণ অনির্বচনীয়, তুলনাবিহীন, স্থান-কাল-পাত্র, যুক্তি প্রমাণ কিংবা উপমা দ্বারা নির্বাণ প্রকাশযোগ্য নয়। তবে নির্বাণ সুখদায়ক।
প্রশ্নেল্লিখিত অলৌকিক অবস্থাটি হলো নির্বাণ। জীবের জীবন জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং কার্যকারণ সম্বন্ধসঞ্জাত। আর যেখানে জন্ম-মৃত্যু বা কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে সেখানে দুঃখ বার বার আঘাত। হানে। নির্বাণ হচ্ছে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খলমুক্ত, কার্যকারণ প্রবাহ রুদ্ধ এবং দুঃখমুক্ত এক সুখকর অবস্থা। নির্বাণ এক অলৌকিক অবস্থা, যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন।
নির্বাণ কারণসম্ভূত নয় বিধায় অবিনশ্বর। নির্বাণ লাভের পর আর জন্মগ্রহণ করতে হয় না। ফলে দুঃখও ভোগ করতে হয় না। তাই বৌদ্ধদের পরম লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাণ।
তথাগত বুদ্ধের নির্বাণতত্ত্ব যুগ যুগ ধরে অসংখ্য মানুষের মনের কালিমা দূর করে জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করে আসছে। অসংখ্য মানুষের তৃষ্ণা নির্বাপিত করে দুঃখ নিবৃত্তি করে আসছে। অতএব বলা যায়, নির্বাণের গুরুত্ব অপরিসীম।
নির্বাণ শব্দের অর্থ 'নির্বাপিত হওয়া'। 'নি' উপসর্গের সঙ্গে 'বাণ' শব্দটি যুক্ত হয়ে 'নির্বাণ' শব্দটি ব্যুৎপন্ন হয়েছে। 'নি' উপসর্গটি অভাব, নাই, ক্ষয়, শেষ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'বাণ' শব্দটির আভিধানিক অর্থ ধনুকের তীর। বৌদ্ধ শাস্ত্রে তৃষ্ণা বোঝাতে 'বাণ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অতএব, 'নির্বাণ' বলতে তৃষ্ণার ক্ষয় বোঝায়।
যিনি নির্বাণ সাক্ষাৎ করেন তিনি তৃষ্ণামুক্ত হন। তাঁর তৃষ্ণাজাত রাগ-দ্বেষ-মোহাগ্নি নির্বাপিত হয়। তাঁর জন্ম-মৃত্যুর প্রবাহ নিরুদ্ধ হয়। ফলে তিনি সর্বপ্রকার দুঃখ হতে মুক্ত হন।
যে ধর্ম প্রত্যক্ষ করলে তৃষ্ণার ক্ষয় হয়, রাগ-দ্বেষ-মোহাগ্নি নির্বাপিত হয়, জন্ম-মৃত্যুর প্রবাহ বা কার্যকারণ নিরুদ্ধ হয় এবং সর্ব প্রকার দুঃখের নিরোধ হয় তারই নাম নির্বাণ। সংক্ষেপে, যাবতীয় দুঃখের নিরোধ বা নিবৃত্তি হওয়াকে 'নির্বাণ' বলে। তাই বলা হয়, 'নিব্বাণং পরমং সুখং' অর্থাৎ 'নির্বাণ পরম সুখ'।
প্রশ্নেল্লিখিত গাথাটির বাংলা অনুবাদ- 'জ্বলন্ত আগুন নিভে যাওয়ার মতো তৃষ্ণা ক্ষয় পায়। বিমুক্ত পুরুষের বিজ্ঞান নিরোধের সাথে সাথে তাঁর চিত্ত মোক্ষবোধ (বা মুক্তি) লাভ করে। এতে সেই বিমুক্ত পুরুষের পুনর্জন্ম সম্পূর্ণরূপে নিরোধ হয়।'
বিষয়টি নির্বাণের উদাহরণ। মানবজীবনকে প্রদীপের সাথে তুলনা করা যায়। লোভ, দ্বেষ, মোহ, কামনা-বাসনা, রাগ-অনুরাগ, মায়া এসব তৃষ্ণাজাত প্রবৃত্তির কারণে মানুষ বার বার জন্মগ্রহণ করে। এসমস্ত উপাদান ক্ষয় করা হলে দুঃখের কারণ জন্মনিরোধ বা নির্বাণ লাভ সম্ভব।
রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান এই পাঁচটি উপাদানকে বৌদ্ধ পরিভাষায় পঞ্চস্কন্ধ বলা হয়। পঞ্চস্কন্ধ বিদ্যমান অবস্থায় দুঃখসমূহের বিনাশ করে কোনো সাধকপুরুষ নির্বাণের জ্ঞান উপলব্ধি করলে তাকে বলে সোপাদিসেস নির্বাণ। জীবিত অর্হৎ সোপাদিসেস নির্বাণ লাভকরেন।
নির্বাণদর্শী মুক্ত পুরুষ পঞ্চস্কন্ধের বিনাশ করে যখন পরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন তখন তাকে বলে অনুপাদিসেস নির্বাণ। এ নির্বাণ হলো সম্পূর্ণভাবে নির্বাপিত হওয়া। এ নির্বাণপ্রাপ্ত ব্যক্তি পুনরায় প্রজ্বলিত হবেন না। তিনি সম্পূর্ণরূপে জন্মমৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছেন। তাই তিনি আর জন্মগ্রহণ করবেন না।
অনুপাদিসেস নির্বাণলোভী সম্পূর্ণরূপে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছেন। এ প্রকার নির্বাণের কোনো পরিণাম নেই, এ অবস্থা বর্ণনাতীত। এতে সুখ-দুঃখের উপশম হয়। সুখ-দুঃখের উপশমই পরম সুখ। অনন্ত সংসার প্রবাহের এখানেই অবসান ঘটে।
পরিবর্তনশীলতা কখনো সুখকর নয়, বরং দুঃখময়। মানুষের দেহ ও মন কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। সেজন্য আত্মার চিরস্থায়ী অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না। এজন্য বুদ্ধ বলেছেন, 'সংসার অনিত্য, দুঃখময় এবং অনাত্মা।'
নির্বাণের স্বরূপ সম্পর্কে 'মিলিন্দ প্রশ্ন' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, নির্বাণ অনির্বচনীয়, তুলনাবিহীন। স্থান-কাল-পাত্র, যুক্তি, প্রমাণ, কিংবা উপমা দ্বারা নির্বাণ প্রকাশযোগ্য নয়। নির্বাণ শান্ত সুখদায়ক।
আমি স্বয়ং জন্ম, জরা, ব্যাধি, শোক ইত্যাদির পরিণতি উপলব্ধি করেছি। এগুলো থেকে অজন্ম, অব্যাধি, অমৃত্যু, অশোক (শোকহীনতা), অক্লেশ ইত্যাদি জেনে নির্বাণ সাক্ষাৎ করেছি।"
বিশ্বের সকল বস্তু সংস্কৃত ও অসংস্কৃত ভেদে দু'রকম। যেসব বস্তুর কার্যকারণ আছে ও পরিবর্তনশীল তা সংস্কৃত। যেসব বস্তুর হেতু বা কার্যকারণ নেই তা হলো অসংস্কৃত, নির্বাণও অসংস্কৃত, অর্থাৎ কার্যকারণরহিত। এর পরিবর্তন নেই। তাই নির্বাণকে শান্ত এবং শাশ্বত বলা হয়েছে।
নির্বাণ কারণহীন। এর উৎপত্তি বা বিলয় কোনোটিই নেই। নির্বাণ ধ্রুব, নির্বাণ পরম সুখকর। এজন্য যা কিছু দৃষ্টিগোচর বা অদৃশ্য অথবা কল্পনা-বহির্ভূত তাদের মধ্যে নির্বাণ সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষের সাধনার মধ্যে এর চেয়ে উত্তম কাম্য আর কিছুই নেই। আর এ কারণেই ধ্যানী ও বিজ্ঞ পুরুষ নির্বাণলাভের জন্য নিরলস সাধনায় প্রবৃত্ত হন।
সম্যক জ্ঞানের দ্বারা বস্তুর গুণাগুণ সম্পূর্ণরূপে জানতে হয়। বুদ্ধের - নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে সংস্কারসমূহ বিনাশ করতে হয়। বস্তুগুণাগুণ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করলে তবেই নির্বাণ লাভ করা সম্ভব। প্রজ্ঞা ও ধ্যান ছাড়া নির্বাণ সাক্ষাৎ করা সম্ভব নয়।
লোভ, দ্বেষ, কামনা, বাসনার কারণে সৃষ্ট অকুশল, কর্ম থেকে বিরত হয়ে কুশল কর্মের মাধ্যমে শান্তিময় জগৎ নির্মাণ এবং জন্ম-মৃত্যু, জরা-ব্যাধির শৃঙ্খলে আবদ্ধ দুঃখময় জীবনপ্রবাহ থেকে মুক্তিলাভের জন্যে নির্বাণ সাধনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
শেষোক্ত কারণ তথা অবিদ্যার কারণে মানুষ অকুশল চেতনার - বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন প্রকার অপকর্মে লিপ্ত হয়। এতে অজ্ঞানী মানুষ নিজের ক্ষতি যেমন করে অন্যদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে সংসার ও জগতে শান্তি বিঘ্নিত হয়।
নির্বাণ সাধনায় রত ব্যক্তিকে সবসময় কুশল কর্ম করতে হয়। চারি আর্যসত্য সম্যকভাবে উপলব্ধি করে দুঃখের কারণ তৃষ্ণা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করতে হয়। অক্লান্ত সাধনায় লোভ-দ্বেষ-মোহহীন হয়ে অবিদ্যা দূর করতে হয়।
দেবতারা শুধু সুখ ভোগ করে। প্রেতরা শুধু দুঃখ ভোগ করে। পশু-পাখিরা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত। একমাত্র মানুষই এ-জগতে দুঃখ এবং সুখ উভয় প্রকার অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
মানুষ অপেক্ষা ইতর প্রাণীর জীবনধারণ কষ্টকর ও অনিশ্চিত, অকুশল কর্ম করলে ইতর প্রাণীরূপে জন্ম নিতে হবে। নির্বাণ লাভের ইচ্ছা ও চেতনা মনে জাগ্রত করে কুশলকর্ম সম্পাদন করলে ইতর কুলে জন্মের সম্ভাবনা ব্যাহত হয়। এজন্য 'নির্বাণ' সাধনা করা উচিত।
পরম সুখ নির্বাণ লাভের জন্য জন্ম-জন্মান্তর ব্যাপী কুশল কর্ম করে পুণ্যফল অর্জন করতে হয়। চারি আর্যসত্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানপ্রাপ্ত হতে হয়। অনুসরণ করতে হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করলে নির্বাণের পথে প্রবেশ সম্ভব।
তৃষ্ণাই দুঃখের কারণ। তৃষ্ণার ফলেই বার বার জন্মগ্রহণ করতে হয়। জন্ম নিলেই জরা, ব্যাধি, প্রিয়বিচ্ছেদ, অপ্রিয় সংযোগ, মৃত্যু ইত্যাদি বিবিধ প্রকার দুঃখ ভোগ করতে হয়। এজন্যে তৃষ্ণা থেকে মুক্তি লাভ করা সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বৌদ্ধদের পরম লক্ষ্য নির্বাণ।
তথাগত বুদ্ধ।
যে ধর্ম প্রত্যক্ষ করলে সবরকম দুঃখের নিরোধ বা নিবৃত্তি হয় তাকে নির্বাণ বলে।
সকল দুঃখের অন্ত সাধন অবস্থা।
ধনুকের তীর।
নিব্বানং পরমং সুখং-এর বাংলা অর্থ হলো নির্বাণ পরম সুখ।
নির্বাণে সবরকম দুঃখের নিরোধ বা নিবৃত্তি হয়।
রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান এই পাঁচটি উপাদানকে বৌদ্ধ পরিভাষায় পঞ্চস্কন্ধ বলা হয়।
পঞ্চস্কন্ধের উপাদানসমূহ হলো- রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান।
নির্বাণ দুই প্রকার।
পাঁচটি।
জীবিত অর্হৎ।
সোপাদিসেস নির্বাণ।
নির্বান সাক্ষাতকারী জীবিত অর্হৎ তৃষ্ণামুক্ত হন।
পঁয়তাল্লিশ বছর।
কুশীনগরের যমক শাল বৃক্ষের নিচে।
আশি বছর বয়সে।
চিত্ত সংযমের প্রধান উপায় হলো বুদ্ধের নির্দেশিত আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সাধনা, ব্রহ্মচর্য পালন এবং ধ্যান-সমাধির অনুশীলন কেরা
তৃষ্ণা থেকে দুঃখের উৎপত্তি হয়।
অবিদ্যা।
দুঃখের বিনাশ হয়।
নির্বাণ লাভ করলে তৃষ্ণার ক্ষয় হয়।
বুদ্ধের নির্দেশিত আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সাধনা হলো চিত্ত সংযমের উপায়।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করতে হয়।
মানুষের পক্ষে নির্বাণ লাভ সম্ভব।
বৌদ্ধদের পরম লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাণ যা তথাগত বুদ্ধ আবিষ্কৃত অন্যতম শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব। নির্বাণ হচ্ছে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খলমুক্ত, কার্যকারণ প্রবাহ বুদ্ধ এবং দুঃখমুক্ত এক সুখকর অবস্থা। নির্বাণ এমন এক অলৌকিক অবস্থা যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন অর্থাৎ লোকোত্তর অভিজ্ঞতা।
বৌদ্ধদের পরম লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাণ যা তথাগত বুদ্ধ আবিষ্কৃত অন্যতম শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব। নির্বাণ হচ্ছে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খলমুক্ত, কার্যকারণ প্রবাহ রুদ্ধ এবং দুঃখমুক্ত এক সুখকর অবস্থা। নির্বাণ এমন এক অলৌকিক অবস্থা যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন অর্থাৎ লোকোত্তর অভিজ্ঞতা।
নির্বাণ' শব্দের অর্থ 'নির্বাপিত হওয়া'। 'নি' উপসর্গের সঙ্গে 'রাণ' শব্দটি যুক্ত হয়ে 'নির্বাণ' শব্দটি ব্যুৎপন্ন হয়েছে। 'নি' উপসর্গটি অভাব নাই, ক্ষয়, শেষ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয় আর 'বাণ' শব্দটির আভিধানিক অর্থ ধনুকের তীর। বৌদ্ধশাস্ত্রে তৃষ্ণা বুঝাতে 'বাণ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অতএব 'নির্বাণ' বলতে তৃষ্ণার ক্ষয় বোঝায়।
যাবতীয় দুঃখের নিরোধ বা নিবৃত্তি হওয়াকে নির্বাণ বলে। তাই বলা হয়, নির্বাণ পরম সুখ।
বিশ্বের সকল বস্তু সংস্কৃত ও অসংস্কৃত ভেদে দুরকম। যেসব বস্তুর কার্যকারণ আছে ও পরিবর্তনশীল তা সংস্কৃত। যেসব বস্তুর কার্যকারণ নেই তা হলো অসংস্কৃত, নির্বাণও অসংস্কৃত অর্থাৎ কার্যকারণ রহিত। এর পরিবর্তন নেই তাই নির্বাণ শান্ত এবং শাশ্বত। সকল পার্থিব বস্তুর অস্থায়িত্ব বা পরিবর্তনশীলতা দুঃখময়। কিন্তু নির্বাণের আনন্দের স্থায়িত্ব অবিনশ্বরও এজন্য বুদ্ধ বলেছেন, 'নির্বাণ পরম সুখ'।
নির্বাণ লাড়ে মানুষ তৃষ্ণামুক্ত হয়, তার জন্ম-মৃত্যুর প্রবাহ নিবৃদ্ধ হয় বলে আর জন্মগ্রহণ করতে হয়না।
নির্বাণ হলো জ্বলন্ত আগুন নিভে যাওয়ার মতো তৃষ্ণা ক্ষয় হওয়া। বিমুক্ত পুরুষের বিজ্ঞান নিরোধের সাথে সাথে তাঁর চিত্ত মোক্ষবোধ বা মুক্তিলাভকরে। তাই সেই বিমুক্ত মহাপুরুষের পুনর্জন্ম নিরোধ হয় অর্থাৎ নির্বাণ লাভে পুনর্জন্ম নিরোধ হয়।
রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান এই পাঁচটি উপাদনকে বৌদ্ধ পরিভাষায় পঞ্চস্কন্ধ বলা হয়। পঞ্চস্কন্ধ বিদ্যমান অবস্থায় দুঃখসমূহের বিনাশ করে কোনো সাধকপুরুষ নির্বাণের জ্ঞান উপলব্ধি করলে তাকে বলে সোপাদিসেস নির্বাণ।
নির্বাণদর্শী মুক্ত পুরুষ পঞ্চস্কন্ধের বিনাশ করে যখন পরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন তখন তাকে 'অনুপাদিসেস নির্বাণ বলে। অর্থাৎ শারীরিক ধাতু বা পণ্যস্কন্ধসমূহ ত্যাগ করে জন্ম-মৃত্যুর নিরোধ অবস্থাই অনুপাদিসেস নির্বাণ। বুদ্ধত্ব লাভের পর গৌতম বুদ্ধ ৪৫ বছর ধর্ম প্রচার করেন। তারপর ৮০ বছর বয়সে কুশীনগরের যমকশাল বৃক্ষের নিচে অনুপাদিসেস নির্বাণ লাভ করেছিলেন।
ধর্মপদ গ্রন্থে নির্বাণ সম্পর্কে এরূপ উল্লেখ আছে- আরোগ্য পরমা লাভা, সন্তুটঠি পরমং ধনং, বিস্সাস পরমাঞাতি, নিব্বানং পরমং সুখং। অর্থাৎ আরোগ্য পরম লাভ, সন্তুষ্টি পরম ধন, বিশ্বাস জ্ঞাতি এবং নির্বাণ পরম সুখ।
নির্বাণ হচ্ছে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খলমুক্ত, কার্যকারণ প্রবাহ রুদ্ধ এবং দুঃখমুক্ত এক সুখকর অবস্থা। তাই নির্বাণকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়। নির্বাণ এক অলৌকিক অবস্থা, যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নির্বাণ কারণসম্ভূত নয় বিধায় অবিনশ্বর। নির্বাণ লাভের পর আর জন্মগ্রহণ করতে হয় না। যার ফলে আর দুঃখও ভোগ করতে হয় না। বুদ্ধ আবিষ্কৃত অন্যতম শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব হচ্ছে নির্বাণ। তাই বৌদ্ধদের পরম লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাণ।
মানুষ অপকর্মে লিপ্ত হয় তৃষ্ণার কারণে। আমাদের মনে রাগ, ঈর্ষা, মোহ, লোভ ইত্যাদি ক্ষতিকর প্রবৃত্তির উৎপত্তির কারণ হচ্ছে তৃষ্ণা। এই ক্ষতিকর প্রবৃত্তিগুলোই মানুষকে অপকর্মে লিপ্ত করে।
দুঃখপূর্ণ জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হবার জন্য নির্বাণ সাধনা করা প্রয়োজন।
নির্বাণ পরম সুখ। মানুষ এই পরম সুখ পেতে হলে তৃষ্ণার ক্ষয় করে সুখ পেতে হয়। অকুশল কর্ম থেকে বিরত থেকে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভের জন্য নির্বাণ সাধনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
নির্বাণ লাভের জন্য আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করতে হয়।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করলে নির্বাণের পথে প্রবেশ সম্ভব তাই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করতে হয়। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ মানুষকে সৎপথে চলতে নির্দেশনা দেয়। এই মার্গ অনুসরণ করেই নির্বাণ লাভ করা যায়।
Related Question
View Allতৃষ্ণা থেকে দুঃখের উৎপত্তি হয়।
নির্বাণ লাভের জন্য আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করতে হয়।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করলে নির্বাণের পথে প্রবেশ সম্ভব তাই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করতে হয়। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ মানুষকে সৎপথে চলতে নির্দেশনা দেয়। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করেই নির্বাণ লাভ করা যায়।
অনিল চাকমা শ্রমণ অবস্থায় বুদ্ধের নির্বাণ তত্ত্ব বুঝতে পারলেন। নির্বাণ শব্দের অর্থ 'নির্বাপিত হওয়া।' 'নি' উপসর্গের সঙ্গে 'বাণ' শব্দটি যুক্ত হয়ে 'নির্বাণ' শব্দটি ব্যুৎপন্ন হয়েছে। 'নি' উপসর্গটি অভাব, নাই, ক্ষয়, শেষ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'বাণ' শব্দটির আভিধানিক অর্থ ধনুকের তীর এবং বৌদ্ধশাস্ত্রে তৃষ্ণা বোঝাতে 'বাণ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অতএব, 'নির্বাণ' বলতে তৃষ্ণার ক্ষয় বোঝায়। আমাদের মনে রাগ, ঈর্ষা, মোহ, লোভ ইত্যাদি ক্ষতিকর প্রবৃত্তির উৎপত্তির কারণ হচ্ছে তৃষ্ণা বা কামনা। তৃষ্ণার কারণেই মানুষ বার বার জন্মগ্রহণ করে দুঃখভোগ করে। যিনি নির্বাণ সাক্ষাৎ করেন তিনি তৃষ্ণামুক্ত হন। তাঁর তৃষ্ণাজাত রাগ-দ্বেষ- মোহাগ্নি নির্বাপিত হয়। তাঁর জন্ম-মৃত্যুর প্রবাহ নিরুদ্ধ হয়। যার ফলে তিনি সর্বপ্রকার দুঃখ হতে মুক্ত হন।
উদ্দীপকের অনিল বিকাশ চাকমা সংসারের মায়া ত্যাগ করে বিহারের ভন্তের নিকট প্রব্রজ্যিত হয়ে তৃষ্ণার ক্ষয়, রোগ-দেহ-মোহ নির্বাপিত করা, জন্ম- মৃত্যুর প্রবাহ রোধ ইত্যাদি বিষয়ে জাগতিক জ্ঞান অর্জন করেন। শ্রমণ থেকে তিনি ভিক্ষুতে উপনীত হয়ে ত্রিপিটক গ্রন্থের জ্ঞান সাধনার মাধ্যমে বুদ্ধের নিব্বাণং পরমং সুখং এই বাণীটি বুঝতে সক্ষম হন। তাই বলা যায়, অনিল চাকমা শ্রমণ অবস্থায় বুদ্ধের নির্বাণ তত্ত্ব বুঝতে পারলেন।
ভিক্ষুত্ব লাভের পর অনিল চাকমার অর্জিত শিক্ষা 'নিব্বানং পরমং সুখং' অর্থাৎ 'নির্বাণ পরম সুখ'।
নির্বাণ এক লোকোত্তর অভিজ্ঞতা। সাধারণ উপলব্ধি বা ভাষা দিয়ে নির্বাণের প্রাপ্তি পরম সুখ বুঝতে পারা সম্ভব নয়। ধরা যাক কোনো ব্যক্তি জীবনে কখনো 'মিষ্টি' খায়নি। তাকে 'মিষ্টি'র স্বাদ কি শুধু বর্ণনা দিয়ে বোঝানো সম্ভব? অনুরূপভাবে নির্বাণ-এর প্রকৃত অবস্থা সাধারণের পক্ষে বোঝা কঠিন। যেমন- কোনো ব্যক্তির পক্ষে নিজ চেষ্টায় হিমালয় পর্বতে আরোহণ করা সম্ভব কিন্তু হিমালয় পর্বত নিয়ে এসে অন্যদের দেখানো অসম্ভব। একইভাবে সাধনার দ্বারা বুদ্ধ নির্দেশিত মার্গ অনুসরণ করে পরম প্রাপ্তি নির্বাণ সাক্ষাৎ সম্ভব কিন্তু এর অনির্বচনীয় স্বাদ সাধারণকে বোঝানো সম্ভব নয়। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে ন্যূনপক্ষে স্রোতাপত্তি ফল অর্জন না করলে নির্বাণের স্বরূপ অবগত হওয়া যায় না।
নির্বাণ সহজবোধ্য না হলেও বুদ্ধ নির্বাণ লাভের উপায় প্রদর্শন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে শিষ্যদের ধর্ম দেশনার মাধ্যমে তিনি নির্বাণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন,
বিঞঞানস্স নিরোধের তণহাক্য় বিমুক্তিনো,
পজ্জোতস্সবে নিব্বাণং বিমোক্খো হোতি চেতসো।
অর্থাৎ জ্বলন্ত আগুন নিভে যাওয়ার মতো তৃষ্ণা ক্ষয় পায়। বিমুক্ত পুরুষের বিজ্ঞান নিরোধের সাথে সাথে তাঁর চিত্ত মোক্ষবোধ (মুক্তি) লাভ করে। এতে সেই বিমুক্ত পুরুষের পুনর্জন্ম সম্পূর্ণরূপে নিরোধ হয়।
গৌতম বুদ্ধ পঁয়তাল্লিশ বছর যাবৎ ধর্ম প্রচার করেন।
নির্বাণ লাভে মানুষ তৃষ্ণামুক্ত হয়, তার জন্ম-মৃত্যুর প্রবাহ নিরূদ্ধ হয় বলে আর জন্মগ্রহণ করতে হয়না।
নির্বাণ হলো জ্বলন্ত আগুন নিভে যাওয়ার মতো তৃষ্ণা ক্ষয় হওয়া। বিমুক্ত পুরুষের বিজ্ঞান নিরোধের সাথে সাথে তাঁর চিত্ত মোক্ষবোধ বা মুক্তিলাভ করে। তাই সেই বিমুক্ত মহাপুরুষের পুনর্জন্ম নিরোধ হয় অর্থাৎ নির্বাণ লাভে পুনর্জন্ম নিরোধ হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!