পৌরনীতি ও নাগরিকতা নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। কারণ নাগরিকতার সাথে জড়িত সকল বিষয় পৌরনীতিতে আলোচনা করা হয়। নাগরিকের জীবন ও কার্যাবলি যতদূর বিস্তৃত, পৌরনীতির আলোচনার পরিধি ও বিষয়বস্তুও ততদূর প্রসারিত।
পৌরনীতির ইংরেজি শব্দ সিভিক্স (Civics)। সিভিক্স শব্দটি 'দুটি ল্যাটিন শব্দ সিভিস (Civis) এবং সিভিটাস (Civitas) থেকে এসেছে। সিভিস শব্দের অর্থ নাগরিক (Citizen) আর সিভিটাস শব্দের অর্থ নগররাষ্ট্র (City State)। সুতরাং উৎপত্তিগত অর্থে পৌরনীতি হলো নাগরিক ও নগররাষ্ট্র বিষয়ক বিজ্ঞান।
প্রাচীন গ্রিসে ছোট ছোট অঞ্চল নিয়ে যে রাষ্ট্র গড়ে উঠত তাকে নগররাষ্ট্র বলে। নগররাষ্ট্রে যারা রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণ করত তাদেরকে বলা হতো নাগরিক। এথেন্স, স্পার্টা, মেগেরা, রোডস প্রভৃতি ছিল প্রা.িন গ্রিসের উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্র।
প্রাচীন গ্রিসে নাগরিক ও নগররাষ্ট্র ছিল অবিচ্ছেদ্য। ঐ সময় গ্রিসে ছোট ছোট অঞ্চল নিয়ে গড়ে উঠে নগররাষ্ট্র। প্রাচীন গ্রিসে এক একটি নগরকে কেন্দ্র করে এক একটি রাষ্ট্র গঠিত হতো। শুধু পুরুষশ্রেণি রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত। দাস, মহিলা ও বিদেশিদের এ সুযোগ ছিল না।
প্রাচীন গ্রিসে কেবলমাত্র পুরুষদের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সে সময় শুধু পুরুষশ্রেণি রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত। অর্থাৎ, নাগরিকতার ধারণায় যারা রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত, কেবলমাত্র তারাই নাগরিক হিসেবে গণ্য হতো। এক্ষেত্রে দাস, মহিলা ও বিদেশিরা রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। আর তাই প্রাচীন গ্রিসে পুরুষরা নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতো।
একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে সতেরোশ' এবং আঠারোশ' শতাব্দীতে আধুনিক রাষ্ট্র বর্তমান রূপ লাভ করেছে। দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় ১৮০৭ সালে এবং নারীরা ভোটাধিকার পায় ১৯১৯ সালে। আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হয় সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে, একটি সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডে, একটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে, যেখানে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থা, সুসংগঠিত প্রশাসন এবং সরকার গঠনের মাধ্যমে নাগরিকদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়।
আধুনিক রাষ্ট্র পুলিশ ও সেনাবাহিনী গঠন করে জনগণকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করে। আধুনিক রাষ্ট্র নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার প্রদান করে। আধুনিক রাষ্ট্রে সকল নাগরিক সমানভারে সকল অধিকার ভোগ করে। এভাবে আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার হচ্ছে।
প্রাচীনকালে গ্রিস ও এথেন্সে নগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল নগররাষ্ট্র। এসব নগররাষ্ট্রের স্থলে আধুনিককালে বৃহৎ আকারের জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন- বাংলাদেশের ক্ষেত্রফল ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার এবং জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী লোকসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি।
নাগরিকত্ব বা নাগরিকতা হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র বা জাতির একজন আইনস্বীকৃত সদস্য হিসেবে পাওয়া কোনো ব্যক্তির পদমর্যাদা। অন্যভাবে বলা যায়, যেকোনো অঞ্চলের অধিবাসীর সে অঞ্চলে বসবাস করার স্বীকৃতি ও তার ভিত্তিতে যেসব সুবিধা ও দায়িত্ব বর্তায় তার সমষ্টিকে নাগরিকতা বলে। মূলত রাষ্ট্র প্রদত্ত নাগরিকের মর্যাদাকে নাগরিকতা বলা হয়।
পৌরনীতির সংজ্ঞায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ই. এম. হোয়াইট যথার্থই বলেছেন, "পৌরনীতি হলো জ্ঞানের সেই মূল্যবান শাখা, যা নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবতার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।"
বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে পৌরনীতিকে দু'টি অর্থে আলোচনা করা যায়। যথা- ব্যাপক অর্থে, পৌরনীতি নাগরিকতার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। যেমন- অধিকার ও কর্তব্য, সামাজিক ও 'রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিকতার স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়, নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সংকীর্ণ অর্থে, অধিকার ও কর্তব্য পৌরনীতির বিষয়বস্তু।
ব্যাপক অর্থে পৌরনীতি নাগরিকতার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। যেমন- অধিকার ও কর্তব্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিকতার স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়, নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ইত্যাদি।
নাগরিক, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের আচরণ ও কার্যাবলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যে বিষয়টি আদর্শ নাগরিক জীবন সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে, তাকে পৌরনীতি বলা হয়।
রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা যেমন রাষ্ট্রপ্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মৌলিক অধিকার ভোগ করি, তেমনি আমাদেরকেও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। যেমন- রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, আইন মান্য করা, সঠিক সময়ে কর প্রদান করা, সন্তানদের শিক্ষিত করা, রাষ্ট্রের সেবা করা, সততার সাথে ভোটদান ইত্যাদি।
পৌরনীতি ও নাগরিকতা আদর্শ নাগরিক জীবনের দিকনির্দেশনা দেয় বলে বিষয়টি পাঠ করা প্রয়োজন। তাছাড়া পৌরনীতি ও নাগরিকতা নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য, সুনাগরিকের বৈশিষ্ট্য, প্রতিবন্ধকতা এবং তা দূর করার উপায় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। তাই অধিকার এবং কর্তব্য সচেতন সুনাগরিক হয়ে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের পৌরনীতি ও নাগরিকতা বিষয়টি পাঠ করা প্রয়োজন।
আমরা যেখানে বাস করি, সেখানে আমাদেরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান; যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ইত্যাদি। ঠিক তেমনি নাগরিককে কেন্দ্র করে জাতীয় পর্যায়ে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের গঠন, কার্যাবলি, অবদান এবং নাগরিকের সাথে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নিয়ে পৌরনীতি ও নাগরিকতা বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
পরিবার বলতে সমাজ স্বীকৃত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রীর একত্রে বসবাস করাকে বোঝায়। অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এক বা একাধিক পুরুষ ও মহিলা, তাদের সন্তানাদি, পিতামাতা এবং অন্যান্য পরিজন নিয়ে যে সংগঠন গড়ে তোলে তাকে পরিবার বলে। মূলত পরিবার হলো স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গঠিত ক্ষুদ্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো সময়টায় পরিবারের সদস্য হিসেবে অতিবাহিত করতে হয়। এরকম এক একটি পরিবারকে নিয়ে গঠিত হয় সমাজ। এ পরিবারই সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই সমাজের ভিত্তি রচিত হয়েছে। তাই বলা যায়, পরিবার একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
মানুষ স্বভাবতই সঙ্গপ্রিয়। অন্যের সহযোগিতা ছাড়া মানুষের পক্ষে জীবনধারণ করা সম্ভব নয়। বেঁচে থাকার জন্য মানুষের স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার দরকার হয়। আর পরিবার গঠনের মাধ্যমে এগুলো মানুষ পেয়ে যায়। আর এ কারণে মানুষ পরিবার গঠন করে।
বংশ গণনা ও নেতৃত্বের ভিত্তিতে পরিবারকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়; যথা- পিতৃতান্ত্রিক ও মাতৃতান্ত্রিক। পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে সন্তানেরা পিতার বংশ পরিচয়ে পরিচিত হয় এবং পিতা পরিবারের নেতৃত্ব দেন। আমাদের দেশে এ ধরনের পরিবারই বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে মায়ের বংশ পরিচয়ে সন্তানেরা পরিচিত হয় এবং মা পরিবারের নেতৃত্ব দেন। গারো সমাজে এ ধরনের পরিবার দেখা যায়।
যে পরিবারের নেতৃত্ব যখন কোনো পিতা, স্বামী বা বয়স্ক পুরুষের ওপর ন্যস্ত থাকে তখন তাকে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার বলে। পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে সন্তানরা পিতার বংশ পরিচয়ে পরিচিত হয়। এ, ধরনের পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ পুরুষের ওপর ন্যস্ত থাকে। আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবারই পিতৃতান্ত্রিক পরিবার।
যে পরিবারে একজন নারী 'বা মা-ই প্রধান থাকে তাকে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার বলে। মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে মায়ের বংশ পরিচয়ে সন্তানরা পরিচিত হয়। এ পরিবারে মায়ের মতামতকে পরিবারের সবাই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এছাড়া এ ধরনের পরিবারে মেয়েরাই শুধুমাত্র সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়। আমাদের দেশে গারোদের মধ্যে এ ধরনের পরিবার দেখা যায়।
বৈবাহিক সূত্রের ভিত্তিতে তিন ধরনের পরিবার লক্ষ করা যায়। যথা- ১. একপত্নীক, ২. বহুপত্নীক ও ৩. বহুপতি পরিবার। একপত্নীক পরিবারে একজন স্বামীর একজন স্ত্রী থাকে। আর বহুপত্নীক পারবারে একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকে। আমাদের সমাজের আলিকাংশ পরিবার একপত্নীক হলেও বহুপত্নীক পরিবার কদাচিৎ দেখা যায়। বহুপতি পরিবারে একজন স্ত্রীর একাধিক স্বামী থাকে। বাংলাদেশে এ ধরনের পরিবার দেখা যায় না।
আমাদের মা-বাবা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলেই আমরা অন্যগ্রহণ করেছি এবং তাদের দ্বারা লালিত-পালিত হচ্ছি। অতএব, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন করা পরিবারের অন্যতম কাজ। পরিবারের এ ধরনের কাজকে জৈবিক কাজ বলা হয়।
শিক্ষালাভের সুযোগ প্রথম পরিবারে সংগঠিত হয়। শিশুর প্রায় সকলেই বিদ্যালয়ে যাওয়ার পূর্বেই পরিবারে বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়। তাছাড়া মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পারস্পরিক সহায়তায় সততা, শিষ্টাচার, উদারতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলি শিক্ষা লাভের প্রথম সুযোগ পরিবারেই সৃষ্টি হয়। তাই বলা যায়; শিক্ষালাভের প্রথম সুযোগ পরিবারেই ঘটে।
আমরা অনেকেই বিদ্যালয়ে যাওয়ার পূর্বে পরিবারে বর্ণমালার সাথে পরিচিত হই। এছাড়াও মা-বাবা ও ভাই-বোনদের সহায়তায় সততা, শিষ্টাচার, উদারতা, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলি শিক্ষালাভের প্রথম সুযোগ পরিবারেই সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ পরিবারেই শিশুর যাবতীয় প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। এজন্যই পরিবারকে জীবনের প্রথম পাঠশালা বলা হয়।
যেসব কাজের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকে সেগুলোকেই পরিবারের অর্থনৈতিক কাজ বলে। পরিবারকে কেন্দ্র করে কুটির শিল্প, মৎস্য চাষ, কৃষিকাজ, পশুপালন ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজ সম্পাদিত হয়। আর এভাবেই বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে পরিবার সকল অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করে থাকে।
পরিবারে সাধারণত মা-বাবা কিংবা বড় ভাই-বোন অভভাবকের ভূমিকা পালন করে। ছোটরা তাদের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলে। তারা ছোটদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেন। তাছাড়া তারা বৃদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেন, যা ছোটদের সুনাগরিক হতে সাহায্য করে। এভাবে পারিবারিক শিক্ষা ও নিয়ম সেনে চলার মাধ্যমে পরিবারেই শিশুর রাজনৈতিক শিক্ষা শুরু হয়। এ শিক্ষা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় জীবনে কাজে লাগে।
পৌরনীতি পাঠ নাগরিকগণকে বুদ্ধিমান, বিবেকবান, আত্মসংযমী ও নিষ্ঠাবান করে তোলে। পৌরনীতি পাঠের ফলে নাগরিকগণের মধ্যে বাক্তিস্বার্থ পরিহার করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠে। তাছাড়া পৌরনীতির পাঠ নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ বৃদ্ধি করে। এভাবে পৌরনীতি মানুষকে সুসভ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে এবং সুনাগরিকতার শিক্ষাদান করে।
পারিবারিক শিক্ষা ও নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে পরিবারে শিশুর রাজনৈতিক শিক্ষা শুরু হয়। এ শিক্ষা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় জীবনে কাজে লাগে। এভাবে বড়োদের রাজনৈতিক আলোচনা শুনে ও সে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে আমরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি।
পরিবার মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মানসিক চাহিদা পূরণ করে। নিজের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে ভাগাভাগি করে প্রশান্তি লাভকরা যায়। তাছাড়া পরিবার থেকে শিশু উদারতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা প্রভৃতি গুণগুলো অর্জন করে যা তাদের মানসিক দিককে সমৃদ্ধ করে।
পরিবারের সদস্যদের সাথে গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা, গান-বাজনা, টিভি দেখা, বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা বিনোদন লাভ করি। এগুলোই পরিবারের বিনোদনমূলক কাজ। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে পরিবারের উল্লিখিত এসব কাজগুলো কিছুটা হ্রাস পেলেও সদস্যদের সর্বাধিক কল্যাণ সাধনে পরিবারের এসব কাজের গুরুত্ব অপরিসীম।
সমাজ বলতে সেই সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠীকে বোঝায় যারা কোনো সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একত্রিত হয়। অর্থাৎ একদল লোক যখন সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, তখনই সমাজ গঠিত হয়। বস্তুত মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজে বসবাস করে এবং সামাজিক পরিবেশেই সে নিজেকে বিকশিত করে।
সমাজের ধারণাটি বিশ্লেষণ করলে এর প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এগুলো হচ্ছে- (ক) বহুলোকের সংঘবদ্ধভাবে বসবাস এবং (খ) ওই সংঘবদ্ধতার পেছনে থাকবে অভিন্ন উদ্দেশ্য। সমাজকে সভ্য জীবনযাপনের আদর্শ স্থান মনে করে বলে মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে সমাজ গড়ে তোলে। তাছাড়া সমাজের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য হলো- ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা, নির্ভরশীলতা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য ইত্যাদি।
মানুষকে নিয়ে সমাজ গড়ে ওঠে। সমাজ মানুষের বহুমুখী প্রয়োজন মিটিয়ে উন্নত ও নিরাপদ সামাজিক জীবনদান করে। সমাজের মধ্যেই মানুষের মানবীয় গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। তাছাড়া মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজে বসবাস করে এবং সামাজিক পরিবেশেই সে নিজেকে বিকশিত করে। এসব কারণে সমাজকে সভ্য জীবনযাপনের আদর্শ স্থান বলে মনে করা হয়।
আজন্ম কাল থেকে মানুষ সমাজে বসবাস করে আসছে। সমাজের সাথে মানুষের সম্পর্ক তাই অবিচ্ছেদ্য। নিজেদের প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে প্রাচীনকালে মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ গড়ে তোলে। কারণ একাকী কোনো প্রয়োজন পূরণ করা মানুষের সাধ্যে ছিল না। তাছাড়া সামাজিক পরিবেশ মানুষের মানবীয় গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটায়। এসব কারণে মানুষকে সামাজিক জীব বলা হয়।
রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি রাষ্ট্রেরই আছে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং জনসংখ্যা। এছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আরও আছে সরকার এবং সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী আর সরকার এর বাস্তবায়নকারী। রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে অধ্যাপক গার্নার বলেন, 'সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী, সুসংগঠিত সরকারের প্রতি স্বভাবজাতভাবে আনুগত্যশীল, বহিঃশত্রুর নিয়ন্ত্রণ হতে মুক্ত স্বাধীন জনসমষ্টিকে রাষ্ট্র বলে।'
রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কারণ এটি একটি রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে গঠিত ও সুসংহত। যা জনগণের স্বার্থ রক্ষা, শাসনব্যবস্থা পরিচালনা এবং নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করে। তাছাড়া রাষ্ট্রের মাধ্যমে আইন, বিচার, সরকারব্যবস্থা ও প্রশাসন কার্যকর করা হয়। যা সামাজিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করে। তাই রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়।
রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের সকল মানুষই কোনো না কোনো রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্র ছাড়া নাগরিক জীবনের বিকাশ সাধন অসম্ভব ব্যাপার। মানবসমাজের রাজনৈতিক সচেতনতাবোধ থেকেই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বর্তমানের রাষ্ট্র বহুযুগের বিবর্তনের ফল। ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রের উপাদান ৪টি। যথা- ১. জনসমষ্টি, ২. নির্দিষ্ট ভূখন্ড, ৩. সরকার ও ৪. সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে এ উপাদানগুলোর কোনোটি যদি বিদ্যমান না থাকে তাহলে তাকে রাষ্ট্র বলা যাবে না। তাই রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে চারটি উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ।
জনসমষ্টিকে রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য উপাদান বলা হয়। রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এর চারটি উপাদান হলো- জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব। এর মধ্যে অপরিহার্য উপাদান হলো জনসমষ্টি। কেননা ভূখণ্ডে একটি জনসমষ্টি স্থায়িভাবে বসবাস করলেই রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে। অর্থাৎ জনসমষ্টি ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এ কারণে রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য উপাদান হলো জনসমষ্টি।
ভূখণ্ড বলতে একটি রাষ্ট্রের স্থলভাগ, জলভাগ ও আকাশসীমাকে বোঝায়। রাষ্ট্র গঠনের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আবশ্যক। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ছোটো বা বড়ো হতে পারে। যেমন- বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার। গণচীন, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রভৃতি রাষ্ট্রের আয়তন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বড়।
সরকার বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, শাসন পরিচালনা ও বিচার প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত। সরকার রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকার ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হয় না। সরকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সরকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।
রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরকার। সরকার ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্যাবলি সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র যদি হয় মানবদেহ, তবে সরকার হলো তার মস্তিষ্ক। কেননা, সরকারই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চা করে এবং রাষ্ট্রের অন্যসব উপাদানকে নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতার ওপরই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্ধারিত হয়। আর এসব কারণেই 'সরকার' রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পরিগণিত হয়।
রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌম শব্দ দ্বারা চরম ও চূড়ান্ত ক্ষমতাকে বোঝায়। সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গঠন পূর্ণতা পায়। এ ক্ষমতা রাষ্ট্রকে অন্যান্য সংস্থা থেকে পৃথক করে। সার্বভৌমের আদেশ বা আইন মানতে সকলেই বাধ্য। এ কারণে সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান বলা হয়।
সার্বভৌমত্বের দিক দুইটি। যথা- অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব। অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারির মাধ্যমে ব্যক্তি ও সংস্থার ওপর কর্তৃত্ব করে। অন্যদিকে, বাহ্যিক সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত রাখে।
একটি রাষ্ট্রের চারটি উপাদান অপরিহার্য। যথা- ১. জনসমষ্টি, ২. নির্দিষ্ট ভূখন্ড, ৩. সরকার ও ৪. সার্বভৌমত্ব। এ উপাদানগুলোর কোনোটি যদি কোনো অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান না থাকে, তবে তাকে রাষ্ট্র বলা যাবে না। সে অর্থে চট্টগ্রাম রাষ্ট্র নয়। কারণ চট্টগ্রামে জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখন্ড ও সরকারব্যবস্থা থাকলেও সার্বভৌমত্ব নেই। আর সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা অপরিহার্য উপাদান এবং প্রধান শর্ত। তাই চট্টগ্রামকে রাষ্ট্র বলা যাবে না।
একটি রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতাবলে অন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকতে পারে। সার্বভৌমত্ব একটি রাষ্ট্রের চরম, চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং রাষ্ট্র গঠনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাহ্যিক সার্বভৌমত্বের দ্বারাই রাষ্ট্র ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষাসহ বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকে।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত দুটি মতবাদ হলো-
১. ঐশী মতবাদ: এ মতবাদে স্রষ্টা স্বয়ং রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন এবং রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য শাসক প্রেরণা করেছেন।
২. বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদ: এ মতবাদ বল বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে এবং শক্তির জোরে রাষ্ট্র টিকে আছে।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত দুটি মতবাদ হলো-
১. সামাজিক চুক্তি মতবাদ: এ মতবাদের মূলকথা হলো সমাজে বসবাসকারী জনগণের পারস্পরিক চুক্তির ফলে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
২. ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ: এ মতবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ঐশী মতবাদকে বিপজ্জনক, অগণতান্ত্রিক ও অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করেছেন। এ মতবাদে শাসক রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং তিনি তার কাজের জন্য একমাত্র স্রষ্টা বা বিধাতার নিকট দায়ী, জনগণের নিকট নয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এ মতবাদকে বিপজ্জনক, অগণতান্ত্রিক ও অযৌক্তিক বলে সমালোচনার কারণ হলো যেখানে জনগণের নিকট শাসক দায়ী থাকে না, সেখানে স্বৈরশাসন সৃষ্টি হয়।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের মূল বক্তব্য হলো বল বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে এবং শক্তির জোরে রাষ্ট্র টিকে আছে। সমাজের বলশালী ব্যক্তিরা যুদ্ধবিগ্রহ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বলের ওপর নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের ভিতর দিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এবং শাসনকার্য পরিচালনা করে। এ মতবাদ অনুযায়ী সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এভাবেই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
রাষ্ট্রের উৎপত্তিসংক্রান্ত বলপ্রয়োগ মতবাদ অনুসারে, শক্তির জোরে রাষ্ট্র টিকে আছে। কেননা, সমাজের বলশালী ব্যক্তিরা যুদ্ধবিগ্রহ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বলের ওপর নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এবং ক্ষমতার প্রয়োগেই রাষ্ট্র টিকে আছে।
বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদে বলা হয়, সমাজের বলশালী ব্যক্তিরা যুদ্ধবিগ্রহ বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বলের ওপর নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এবং শাসনকার্য পরিচালনা করে। সমালোচকরা বলেন, শক্তির মাধ্যমেই যদি রাষ্ট্র টিকে থাকত তাহলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামরিক দিকে থেকে দুর্বল রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারত না। এসব কারণে সমালোচকরা এ মতবাদকে অযৌক্তিক, ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সামাজিক চুক্তি মতবাদের মূলকথা হলো- সমাজে বসবাসকারী জনগণের পারস্পরিক চুক্তির ফলে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এ মতবাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বে মানুষ প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলত এবং প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। কিন্তু প্রকৃতির রাজ্যে আইন অমান্য করলে, শাস্তি দেওয়ার কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না। ফলে সামাজিক জীবনে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে মানুষ চুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তার বিনিময়ে স্থায়ীভাবে শাসকের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে।
সামাজিক চুক্তি মতবাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বসবাস করত। কিন্তু প্রকৃতির রাজ্যে আইন অমান্য করলে শাস্তি দেওয়ার কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না বলে সামাজিক জীবনে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। প্রকৃতির রাজ্যের এ অরাজকতাপূর্ণ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে রাজ্য সৃষ্টি করে এবং নিরাপত্তার বিনিময়ে নিজেদের ওপর শাসন করার জন্য স্থায়ীভাবে শাসকের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে।
রাষ্ট্র হচ্ছে মানবসমাজের বিভিন্ন ক্রমবিবর্তনের ফল। রাষ্ট্রের উৎপত্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব উপাদানের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক অন্যতম। আদিম সমাজে রক্তের সম্পর্ক মানুষকে একত্রে বসবাস করার মূল প্রেরণা, দান করে। এর ফলে গড়ে ওঠে পরিবার। পরিবার থেকে গোত্র। গোত্র থেকে উপজাতি। উপজাতি থেকে জাতি। এভাবে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্র উৎপত্তি লাভ করেছে।
ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদে রাষ্ট্রের সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এ মতবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো একটি বিশেষ কারণে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি বরং দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। এজন্য রাষ্ট্র উৎপত্তির ক্ষেত্রে বিবর্তনমূলক মতবাদ সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য। তাই এ মতবাদে রাষ্ট্রের উৎপত্তির সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
রাষ্ট্র উৎপত্তির সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য মতবাদ হলো ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ। ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি বরং দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। এ মতবাদে রাষ্ট্রের উৎপত্তির সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তাই এ মতবাদকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য মতবাদ বলা হয়।
সরকারের কাজ সম্পাদনের জন্য সরকারের তিনটি বিভাগ রয়েছে। যথা- আইনবিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। আইন বিভাগ দেশের প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করে, সেই আইন প্রয়োগ করে শাসন বিভাগ সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করে এবং বিচার বিভাগ অপরাধীকে শাস্তি দেয় এবং নিরপরাধীকে মুক্তি দিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।
রাষ্ট্র পরিবর্তনশীল নয়, কিন্তু সরকার পরিবর্তনশীল। তাই রাষ্ট্রকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারকে অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান বলা হয়। জনগণের চাহিদার কারণে এবং রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে সরকার পরিবর্তিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো পরিবর্তন হয় না। এজন্যই বলা হয়, রাষ্ট্র একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সরকার একটি অস্থায়ী ও পরিবর্তনশীল প্রতিষ্ঠান।
পৌরনীতিকে নাগরিকতাবিষয়ক বিজ্ঞান বলা হয়।
রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের পৌরনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
পৌরনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ Civics.
Civics শব্দটি ল্যাটিন Civis এবং Civitas থেকে এসেছে।
Civis শব্দের অর্থ নাগরিক।
Civitas (সিভিটাস) শব্দের অর্থ নগররাষ্ট্র।
প্রাচীন গ্রিসে নাগরিক ও নগররাষ্ট্র অবিচ্ছেদ্য ছিল।
প্রাচীন গ্রিসে ছোট ছোট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে যে শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠেছিল তাকে নগররাষ্ট্র বলে।
যে শাসনব্যবস্থায় নাগরিকরা সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে সরকারি কার্যাবলি অর্থাৎ প্রশাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে তাকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলে।
নগররাষ্ট্রে যারা রাষ্ট্রীয় কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করত তাদের নাগরিক বলা হতো।
আধুনিক রাষ্ট্র রূপ লাভ করেছে সতেরোশ এবং আঠারোশ শতাব্দীতে।
দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় ১৮০৭ সালে।
নারীরা ভোটাধিকার পায় ১৯১৯ সালে।
বর্তমানে বৃহৎ আকারের জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি।
ই.এম হোয়াইট ব্রিটিশ দার্শনিক।'
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ই. এম হোয়াইট প্রদত্ত পৌরনীতির সংজ্ঞাটি হচ্ছে- 'পৌরনীতি হলো জ্ঞানের সেই মূল্যবান শাখা, যা নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবতার সাথে জড়িত, সকল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।'
পৌরনীতি বলতে সেই শাস্ত্রকে বোঝায়, যা নাগরিক ও নাগরিকতার সাথে সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়ের ধারাবাহিক পর্যালোচনা করে।
নাগরিক, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের আচরণ ও কার্যাবলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যে বিষয়টি আদর্শ নাগরিক জীবন সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে তাকে 'পৌরনীতি ও নাগরিকতা' বলা হয়।
রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে।
সঠিক সময়ে আমাদের কর প্রদান করা উচিত।
নাগরিক জীবনকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ইত্যাদি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান।
কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।
পৌরনীতি ও নাগরিকতা বিষয়টি নাগরিক জীবনের দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
পরিবার হচ্ছে সমাজের প্রাচীনতম ক্ষুদ্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এক বা একাধিক পুরুষ ও মহিলা, তাদের সন্তানাদি, পিতামাতা এবং অন্যান্য পরিজন নিয়ে যে সংগঠন গড়ে ওঠে, তাকে পরিবার বলে।
ম্যাকাইভারের মতে, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের জন্য সংগঠিত ক্ষুদ্রবর্গকে পরিবার বলে।
"সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের জন্য সংগঠিত ক্ষুদ্রবর্গকে পরিবার বলে।"- উক্তিটি ম্যাকাইভারের।
তিনটি নীতির ভিত্তিতে পরিবারের শ্রেণিবিভাগ করা যায়।
বংশ গণনা ও নেতৃত্বের ভিত্তিতে পরিবারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; যথা- পিতৃতান্ত্রিক ও মাতৃতান্ত্রিক পরিবার।
যে পরিবারে সন্তানেরা পিতার পরিচয়ে পরিচিত হয় এবং পিতা পরিবারের নেতৃত্ব দেয় তাকে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার বলে।
পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে সন্তানরা পিতার পরিচয়ে পরিচিত হয়।
যে পরিবারে মা-ই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সেই পরিবারই মাতৃতান্ত্রিক পরিবার।
মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে মা নেতৃত্ব দেন।
আমাদের-দেশে গারোদের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার দেখা যায়।
পারিবারিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিবার দুই প্রকার। যথা- ১. একক পরিবার ও ২. যৌথ পরিবার।
স্বামী-স্ত্রী ও তাদের অবিবাহিত সন্তান-সন্ততি নিয়ে গঠিত পরিবারকে একক পরিবার বলে।
যে পরিবারে বাবা-মা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি ও তাদের সন্তানাদি সকলে একত্রে একই পরিবারে একজনের নেতৃত্বে বসবাস করে, তাকে যৌথ পরিবার বলে।
যৌথ পরিবারে মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি ও অন্যান্য পরিজন একত্রে বাস করে।
বৈবাহিক সূত্রের ভিত্তিতে পরিবার তিন প্রকার।
যে পরিবারে একজন পুরুষের মাত্র একজন স্ত্রী থাকে তাকে একপত্নীক পরিবার বলে।
একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকলে তাকে বহুপত্নীক পরিবার বলে।
যে পরিবারে একজন স্ত্রীর একাধিক স্বামী থাকে সে পরিবারকে বহুপতি পরিবার বলে।
সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন করাকে পরিবারের জৈবিক কাজ বলে।
সততার শিক্ষা মানুষ প্রথম পরিবার থেকে পায়।
শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারে শুরু হয়।
পরিবারে বাবা-মা কিংবা বড় ভাইবোন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন।
একদল জনগোষ্ঠী যখন সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, তখন তাকে সমাজ বলা হয়।
একদল লোক যখন সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করে তখনই সমাজ গঠিত হয়।
সমাজের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য। যথা- ১. বহুলোকের সংঘবদ্ধভাবে বসবাস এবং ২. ওই সংঘবদ্ধতার পিছনে থাকে সাধারণ উদ্দেশ্য।
সমাজ মানুষকে উন্নত ও সামাজিক জীবন দান করে।
সমাজের মধ্যে মানুষের মানবীয় গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে।
সমাজকে সভ্য জীবনযাপনের আদর্শ স্থান বলে মনে করা হয়।
সমাজ সম্পর্কে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন, 'মানুষ স্বভাবগত সামাজিক জীব, যে সমাজে বাস করে না, সে হয় পশু, না হয় দেবতা।
মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজে বসবাস করে।
রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সুসংগঠিত সরকার, সার্বভৌম আধিপত্য এবং স্থায়িভাবে বসবাসকারী জনসমষ্টি রয়েছে তাকে রাষ্ট্র বলে।
রাষ্ট্র চারটি উপাদান নিয়ে গঠিত হয়। যথা- ১. জনসমষ্টি, ২. নির্দিষ্ট ভূখন্ড, ৩. সরকার ও ৪. সার্বভৌমত্ব।
রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য উপাদান হলো জনসমষ্টি।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি।
ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১২১ কোটি।
ব্রুনাইয়ের জনসংখ্যা প্রায় চার লাখ।
নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা পরিবেষ্টিত স্থলভাগ, সমুদ্রসীমা ও আকাশসীমাকে ভূখণ্ড বলে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্থল সীমানা চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহল বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডে ১০,০৫০.৬১ একর জমি যোগ হয়েছে।
আন্তজার্তিক আদালতে সমুদ্রসীমা মামলার রায় বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার আয়তন ১৯,৪৬৭ বর্গ কি. মি. বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমুদ্র অঞ্চলে বর্তমানে ১,১৮,৮১৩ বর্গ কি. মি. বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সরকার ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না।
রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্য সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
রাষ্ট্রের চরম, পরম ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে সার্বভৌমত্ব বলে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা হলো সার্বভৌমত্ব।
সার্বভৌমত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের চরম, পরম ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা।
সার্বভৌমত্বের দুটি দিক রয়েছে। এগুলো হলো- অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক।
রাষ্ট্রের উৎপত্তিসংক্রান্ত মতবাদ ৪টি; যথা- ১. ঐশী মতবাদ, ২. বলপ্রয়োগ স্বতবাদ, ৩. সামাজিক মতবাদ ও ৪. ঐতিহাসিক মতবাদ।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন মতবাদ হলো ঐশী মতবাদ।
ঐশী মতবাদে শাসক তার কাজের জন্য স্রষ্টার নিকট দায়ী থাকেন।
ঐশী মতবাদ অনুসারে শাসক জনগণের নিকট দায়ী নয়।
ঐশী মতবাদকে বিধাতার সৃষ্টিমূলক মতবাদও বলা হয়।
ঐশী মতবাদে শাসক একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান ও ধর্মীয় প্রধান।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ঐশী মতবাদকে অগণতান্ত্রিক ও অযৌক্তিক বলেছেন।
ঐশী মতবাদে স্বৈরশাসক সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের মূল বক্তব্য হলো বল বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে এবং শক্তির জোরে রাষ্ট্র টিকে আছে।
সামাজিক চুক্তি মতবাদের মূলকথা হলো সমাজে বসবাসকারী জনগণের পারস্পরিক চুক্তির ফলে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবস সামাজিক চুক্তি মতবাদের সমর্থক ছিলেন।
জন লক ও জ্যাঁ জ্যাক রুশো সামাজিক চুক্তি মতবাদের সমর্থক ছিলেন।
রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বাস করত।
উক্তিটি ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
রাষ্ট্রের উৎপত্তিসংক্রান্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতবাদ হলো ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ।
সরকার ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হয় না।
সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সরকার তিন ধরনের কাজ সম্পাদন করে।
দেশের প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করে আইন বিভাগ।
সরকারের শাসন বিভাগ আইন প্রয়োগ করে।
সরকার বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, শাসন পরিচালনা ও বিচার প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার বলতে জনগণকে বোঝায়।
সরকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।
আমিই রাষ্ট্র'- উক্তিটি ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই-এর।
রাষ্ট্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।
সরকার 'অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান।
সার্বভৌম বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী প্রতিষ্ঠান হলো রাষ্ট্র।
সার্বভৌম ক্ষমতার বাস্তবায়নকারী হলো সরকার।
রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা।
নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নাগরিক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার ক্রিয়াকলাপ নিয়ে এ শাস্ত্র অনুশীলন চালায়। নাগরিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের সাথে জড়িত ঘটনাবলি ও কার্যকলাপ এ শাস্ত্রে আলোচিত হয়। নাগরিক', জীবনের, নৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা সার্বিক দিকের আলোচনা পৌরনীতির বিষয়বস্তু। ফলে নাগরিক ও নাগরিক জীবনের সাথে জড়িত সকল বিষয় যেহেতু এ শাস্ত্রে আলোচিত হয় সেহেতু পৌরনীতিকে যথার্থই নাগরিকতাবিষয়ক বিজ্ঞান বলা হয়।
সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য নাগরিক জ্ঞান প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই রাষ্ট্রের প্রতি কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। এ দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো জানার জন্য একজন নাগরিকের নাগরিকতাবিষয়ক জ্ঞান থাকতে হবে। নাগরিক জ্ঞান নাগরিকগণকে বুদ্ধিমান, বিবেকবান, আত্মসংযমী ও নিষ্ঠাবান করে তুলে। মানুষকে সুসভ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নাগরিক জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
প্রাচীন গ্রিসে নাগরিক ও নগররাষ্ট্র ছিল অবিচ্ছেদ্য। যারা রাষ্ট্রীয় কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করতো তাদের নাগরিক বলা হতো। কিন্তু দাস, মহিলা ও বিদেশি রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না বিধায় তাদের নাগরিক বলা হতো না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নাগরিকত্বের ধারণায় অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে নাগরিক 'হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বে ব্যক্তিত্বে কোনো পার্থক্য করা হয় না।
পৌরনীতি ও সুশাসনের পাঠ নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ বৃদ্ধি করে। পৌরনীতি ও সুশাসনের পাঠ নাগরিকদের মধ্যে নিজের ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থ পরিহার করে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা সৃষ্টি করে। পৌরনীতির জ্ঞান মানুষের গাঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস, সংকীর্ণতা, দীনতা, কুসংস্কার, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি দূরীভূত করে এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে মানুষকে সুস্থ ও সুন্দর সমাজজীবন গঠনের শিক্ষা দেয়।
মানুষের সংঘবদ্ধ জীবনযাপনের মূলভিত্তি হচ্ছে পরিবার। একটি শিশুকে উপযুক্ত শিক্ষাদানের মাধ্যমে ব্যক্তিত্ববান এবং সামাজিক মানুষে পরিণত করার ক্ষেত্রে পরিবার সার্বিক ভূমিকা পালন করে বলে পরিবারকে একটি ক্ষুদ্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলে। পরিবারকে বাদ দিয়ে কোনো মানুষের পক্ষে সুস্থ, সুন্দর সামাজিক জীবন গড়ে তোলা সম্ভব হয় না। সমাজে চলাফেরার নীতি, সামাজিক ধ্যানধারণা প্রভৃতির শিক্ষা শিশুরা পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে। এমনকি রাজনৈতিক দীক্ষা গ্রহণও পরিবারের মধ্যে আরম্ভ হয়। আর উক্ত শিক্ষা সমাজে সঠিকভাবে চলতে একজন মানুষকে সাহায্য করে। তাই পরিবারকে ক্ষুদ্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়।
যে পরিবারে একজন নারী বা মা-ই প্রধান থাকে তাকে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার বলে। মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে মায়ের বংশ পরিচয়ে সন্তানরা পরিচিত হয়। মা পরিবারে নেতৃত্ব দেন এবং মায়ের মতামতকে পরিবারে সবাই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এছাড়া এ ধরনের পরিবারের মেয়েরাই শুধুমাত্র সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়। সাধারণত এরূপ পরিবারের পাত্র স্বীয় পরিবার ছেড়ে পাত্রীর পরিবারভুক্ত হয়ে বসবাস করে। আমাদের দেশে গারোদের মধ্যে এ ধরনের পরিবার দেখা যায়।
বর্তমানে বিভিন্ন কারণে একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগরায়ণ ও শিল্পায়ন একক পরিবার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া শিল্প বিপ্লব, কৃষিনির্ভরতা হ্রাস, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মানসিক দ্বন্দ্ব ও মতের অমিল, আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি, শ্রমের গতিশীলতা, শিক্ষার প্রসার প্রভৃতি কারণে যৌথ পরিবারের সদস্যরা পৃথক হয়ে নতুন ও একক পরিবার গঠনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। আর এসব কারণেই বর্তমানে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে।
পরিবারের যেসব কার্যাবলির সাহায্যে মানবশিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই পরিবারের সদস্যদের নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করে তাই পরিবারের শিক্ষামূলক কাজ। পরিবার হলো শিশুর অন্যতম শিক্ষাদান কেন্দ্র। জন্মের পর শিশু গৃহেই প্রাথমিক শিক্ষালাভ করে। তাছাড়া বাবা-মা, ভাইবোন ও অন্যান্য সদস্যদের পারস্পরিক সহায়তায়, সততা, শিষ্টাচার, নিয়মানুবর্তিতা প্রভৃতি মানবিক শিক্ষালাভ পারিবারিকভাবেই সৃষ্টি হয়। পরিবার থেকেই আমরা সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য, সহনশীলতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা পাই, যা আমাদের সুনাগরিক হতে সাহায্য করে। তাছাড়া রাজনৈতিক শিক্ষাও আমরা পরিবার থেকে পাই। এসব কারণে পরিবারকে শাশ্বত বিদ্যালয় বলা হয়।
শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার শুরু পরিবারেই হয় বলে পরিবারকে শাশ্বত বিদ্যালয় বলা হয়। শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার পূর্বেই পরিবারে বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়। তাছাড়া বাবা-মা, ভাইবোন ও পরিবারের অন্য সদস্যদের পারস্পরিক সহায়তায় সততা, শিষ্টাচার, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলির শিক্ষালাভের সুযোগ পরিবারেই ঘটে।
পরিবারের রাজনৈতিক কাজ হলো এর সদস্যদের মাঝে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক শিক্ষাদান করা। পরিবারে সাধারণত মা-বাবা কিংবা বড় ভাই-বোন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে আর ছোটরা তাদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে। পরিবারের সদস্যরা বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযমের শিক্ষালাভ করে ও তা চর্চা করে থাকে। এভাবে পারিবারিক শিক্ষা ও নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমেই শিশুর রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় জীবনে কাজে লাগে।
আত্মসংযমের শিক্ষা পরিবারের রাজনৈতিক কাজ। আমরা ছোটরা সাধারণত পরিবারের বাবা-মা কিংবা বড় ভাইবোনের আদেশ-নির্দেশ অনুসরণ করি। তারাও আমাদের বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেন, যা আমাদের সুনাগরিক হতে সাহায্য করে। এভাবে পারিবারিক শিক্ষা ও নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে পরিবারেই শিশুর রাজনৈতিক শিক্ষা শুরু হয়।
মানুষকে নিয়ে সমাজ গড়ে ওঠে। আর সমাজ মানুষের বহুমুখী প্রয়োজন মিটিয়ে উন্নত ও নিরাপদ সামাজিক জীবনদান করে। সমাজের মধ্যেই মানুষের মানবীয় গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। সমাজকে সভ্য জীবনযাপনের আদর্শ স্থান মনে করে বলে মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই সমাজ গড়ে তোলে। বস্তুত মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজে বসবাস করে এবং সামাজিক পরিবেশেই সে নিজেকে বিকশিত করে। এসব কারণেই বলা যায়, সমাজের সাথে মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
সমাজ বলতে সেই সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা কোনো সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একত্রিত হয়। মানবজীবনে এ সমাজের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ মানুষকে নিয়ে গড়ে ওঠে সমাজ। সমাজ মানুষের বহুমুখী প্রয়োজন মিটিয়ে উন্নত ও নিরাপদ সামাজিক জীবন দান করে। সমাজের মধ্যেই মানুষের মানবীয় গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। সমাজকে সভ্য জীবনযাপনের আদর্শ স্থান বলে গণ্য করা হয় বলে সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
মানুষ সামাজিক জীব। নিজেদের প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে প্রাচীনকালে মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ গড়ে তোলে। কারণ একাকী কোনো প্রয়োজন পূরণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাছাড়া সামাজিক পরিবেশ মানুষের মানবীয় গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটায়। এসব কারণে মানুষ সমাজে বসবাস করে।
রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরকার। সরকার ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্যাবলি সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি হয় মানবদেহ, তবে সরকার হলো তার মস্তিষ্ক। সরকারই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চা করে। সরকারের পরিচালিত পথেই রাষ্ট্র এগিয়ে চলে। সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতার ওপরই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্ধারিত হয়। আর এসব কারণেই 'সরকার' রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ-উপাদান হিসেবে পরিগণিত হয়।
সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবায়নকারী উপাদান। সরকার ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্যাবলি সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি হয় মানবদেহ, তবে সরকার হলো তার মস্তিষ্ক। কেননা, সরকারই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চা করে এবং সরকারের পরিচালিত পথেই রাষ্ট্র এগিয়ে চলে। সরকারের' সফলতা বা ব্যর্থতার ওপরই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্ধারিত হয়। আর তাই সরকার ছাড়া রাষ্ট্র চলতে পারে না।
সরকার হলো রাষ্ট্র গঠনের সেই অপরিহার্য উপাদান যার সাহায্যে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে থাকে। রাষ্ট্র যদি হয় মানবদেহ, তবে সরকার হলো তার মস্তিষ্ক। কেননা, সরকারই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চা করে। সরকারের পরিচালিত পথেই রাষ্ট্র এগিয়ে চলে। সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতার ওপরই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্ধারিত হয়। আর এসব কারণেই সরকারকে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি বলা হয়।
সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের চরম ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা। এর দুটি দিক রয়েছে। যথা- অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব। অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারির মাধ্যমে ব্যক্তি ও সংস্থার ওপর কর্তৃত্ব করে। অন্যদিকে, বাহিক সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত রাখে।
রাষ্ট্র গঠনের মুখ্য উপাদান হলো সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌম শব্দ দ্বারা চরম ও চূড়ান্ত ক্ষমতাকে বোঝায়। সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গঠন পূর্ণতা পায়। এ ক্ষমতা রাষ্ট্রকে অন্যান্য সংস্থা থেকে পৃথক করে। সার্বভৌমের আদেশই হলো আইন। সার্বভৌমের আদেশ বা আইন মানতে সকলেই বাধ্য। এ কারণে সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা বলা হয় কেননা সার্বভৌমত্ব সেই চূড়ান্ত ক্ষমতা যা রাষ্ট্রকে অন্যান্য সংস্থা থেকে পৃথক করে। সার্বভৌমত্ব হলো সেই শক্তি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছা ছাড়া অন্য কোনো ইচ্ছা দ্বারা আইনসংগতভাবে প্রভাবিত হয় না। সার্বভৌম আইন মানতে সকলেই বাধ্য থাকে। সার্বভৌমের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার প্রয়োগে রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং বাহ্যিক সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে বহিঃশত্রুর হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকে। মোটকথা, রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্বের উর্ধ্বে কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। তাই সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা বলা হয়।
রাষ্ট্র হলো একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। একটি রাষ্ট্রের চারটি উপাদান অপরিহার্য। যথা- ১. জনসমষ্টি, ২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ৩. সরকার . ও ৪. সার্বভৌমত্ব। এ উপাদানগুলোর কোনোটি যদি কোনো অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান না থাকে, তবে তাকে রাষ্ট্র বলা যাবে না। সে অর্থে খুলনা রাষ্ট্র নয়। কারণ খুলনার জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও সরকারব্যবস্থা থাকলেও সার্বভৌমত্ব নেই। আর সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা অপরিহার্য উপাদান এবং প্রধান শর্ত। তাই খুলনা রাষ্ট্র নয়।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত মতবাদসমূহের মধ্যে ঐশী মতবাদ সবচেয়ে পুরাতন মতবাদ। এ মতবাদের মৌলিক ধারণা এমন যে, বিধাতা বা স্রষ্টা স্বয়ং রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন এবং রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি শাসক প্রেরণ করেছেন। শাসক তাঁর প্রতিনিধি এবং তিনি তাঁর কাজের জন্য একমাত্র স্রষ্টা যা বিধাতার নিকট দায়ী;. কিন্তু জনগণের নিকট নয়। এ মতবাদ অনুসারে শাসক একাধারে যেমন রাষ্ট্রপ্রধান এবং অন্যদিকে তিনিই আবার ধর্মীয় প্রধান। এ মতবাদকে বিধাতার সৃষ্টিমূলক মতবাদও বলা হয়।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত বিধাতার সৃষ্টিমূলক মতবাদ হলো ঐশী মতবাদ। এ মতবাদ অনুসারে, বিধাতা বা স্রষ্টা স্বয়ং রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন এবং রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনিই শাসক প্রেরণ করেন। এজন্য এ মতবাদকে বিধাতার সৃষ্টিমূলক মতবাদ বলা হয়। এ মতবাদে আরও বলা হয়, শাসক স্রষ্টার প্রেরিত। তাই শাসক কেবল বিধাতার নিকট দায়ী, জনগণের কাছে নয়। আর শাসক যেহেতু স্রষ্টার নির্দেশে কাজ করেন, তাই শাসকের নির্দেশ অমান্য করার অর্থ বিধাতার নির্দেশ অমান্য করা। এটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরনো মতবাদ।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য মতবাদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হলো বিবর্তনমূলক মতবাদ। ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি বরং দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে রক্তের বন্ধন, ধর্মের বন্ধন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা ও কার্যকলাপের মাধ্যমে। এ মতবাদে রাষ্ট্রের উৎপত্তির সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এজন্য রাষ্ট্রের বিবর্তনমূলক মতবাদ সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য।
ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো একটি বিশেষ কারণে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি বরং দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। রক্তের বন্ধন, ধর্মের বন্ধন, যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা ও কার্যকলাপের মাধ্যমে। এজন্য রাষ্ট্র উৎপত্তির ক্ষেত্রে বিবর্তনমূলক মতবাদ সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য। কেননা এ মতবাদে রাষ্ট্রের উৎপত্তির সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
Related Question
View Allফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো (Jean Jacques Rousseau) রাষ্ট্র সৃষ্টির সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রবর্তক ছিলেন।
রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতা হলো সার্বভৌমত্ব।
রাষ্ট্র গঠনের চারটি মৌলিক উপাদানের (জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার, সার্বভৌমত্ব) মধ্যে সার্বভৌমত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সার্বভৌমত্ব শব্দটি ল্যাটিন 'Superanus' শব্দ থেকে উদ্ভব হয়েছে। যার ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Sovereignty'। এর অর্থ চরম ক্ষমতা। সার্বভৌম ক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা বিধান করা হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলেই রাষ্ট্র দেশের ভেতরে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারির মাধ্যমে সকল সংঘ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব আরোপ এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আর বাহ্যিক ক্ষমতা বলে রাষ্ট্র সকল প্রকার বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত রাখে।
সার্বভৌম শক্তির ওপর রাষ্ট্রের স্থিতি নির্ভরশীল।
'ক' রাষ্ট্র কর্তৃক 'গ' রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়া রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি, প্রয়োগ মতবাদকে সমর্থন করে।
বল প্রয়োগ মতবাদের মূল বক্তব্য হলো- বল বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে এবং শক্তির জোরে রাষ্ট্র টিকে আছে। এ মতবাদে বলা হয়, সমাজের বলশালী ব্যক্তিরা যুদ্ধ-বিগ্রহ বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বলের ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র সৃষ্টি এবং শাসনকাজ পরিচালনা করে। স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম (David Hume), ইংরেজ আইনজীবী এডওয়ার্ড জেংকস (Edward Jenks) প্রমুখ বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের সমর্থক। এ সম্পর্কে এডওয়ার্ড জেংকস বলেন- 'ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, আধুনিক সকল রাষ্ট্রব্যবস্থা সার্থক রণকৌশলের ফলশ্রুতি'।
উদ্দীপকে দেখা যায়, 'ক' তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল রাষ্ট্র 'গ'-কে যুদ্ধে পরাজিত করে দখল করে নেয়, যা রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কাজেই বলা যায়, 'ক' রাষ্ট্র কর্তৃক 'গ' রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়া রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদকে সমর্থন করে।
'খ' শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদের প্রতিফলন ঘটেছে, যা রাষ্ট্র সৃষ্টির মতবাদগুলোর মধ্যে অধিক যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য।
ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদের মূল বক্তব্য হলো রাষ্ট্র কোনো একটি বিশেষ কারণে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। যেসব উপাদানের কার্যকারিতার ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে সেগুলো হলো- সংস্কৃতির বন্ধন, রক্তের বন্ধন, ধর্মের বন্ধন, যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা এবং কার্যকলাপ ইত্যাদি। রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মতবাদটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ড. গার্নার (Dr. James Wilford Garner) বলেন, 'রাষ্ট্র বিধাতার সৃষ্টি নয়, বল প্রয়োগের মাধ্যমেও সৃষ্টি হয়নি; বরং ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে'।
উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, 'খ' তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং এক সময় সবগুলো রাষ্ট্র মিলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করে। এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে 'খ' রাষ্ট্রের শক্তিশালী হওয়ার দিকটি ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদকে ইঙ্গিত করে।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য। আর এ মতবাদের মধ্যেই রাষ্ট্রের উৎপত্তির সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
পারিবারিক কাঠামো অনুযায়ী পরিবার দুই প্রকার। যথা- ১. একক ও ২. যৌথ পরিবার।
আত্মসংযমের শিক্ষা পরিবারের শিক্ষামূলক কাজ।
পরিবারকে সমাজজীবনের শাশ্বত বিদ্যালয় বলা হয়। পরিবারেই একটি শিশু বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়। মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের পারস্পরিক সহায়তায় সততা, শিষ্টাচার, উদারতা, আত্মসংযম, নিয়মানুবর্তিতা, বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদেরকে ভালোবাসা ইত্যাদি মানবিক গুণ শিক্ষা লাভের প্রথম সুযোগ ঘটে পরিবারে। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক নিজেকে সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে রেখে সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন, সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, রাষ্ট্রের আইন মান্য করা প্রভৃতি করতে পারে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!