মধুরার অত্যাচারী রাজা কংস শ্রীকৃষ্ণকে হত্য করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। কংসের হাত থেকে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে বাঁচিয়েছেন। গোকুলের অন্য শিশুদেও বাঁচিয়েচেন এতে কংস আরও হিংস্র হয়ে উঠেন। তিনি গোকুলের লোকদের উপর অত্যাচার আরও বাড়িয়ে দেন। তাই গোপেরা যুকিত করে গোকুল ছেড়ে বৃন্দাবন চলে যান।
একদিন শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম এবং অন্যান্য গোপ বালকেরা গরু চরাচ্ছিলেন। তখন কংসের এক অনুচর বৎসাসুর বাছুরের রূপ ধরে শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার চেষ্টা করেন।
কেশব মিশ্র কাশ্মীরে এক বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন স্থানের পণ্ডিতদের শাস্ত্রবিচারে পরাজিত করে নবদ্বীপে আসেন। তিনি অহংকার করে বলতেন, "হয় তর্ক বিচার করুন।, না হয় জয়পত্র লিখে দিন।" এ সময় নিমাই পণ্ডিতের অনুরোধে কেশব পণ্ডিত শতাধিক শ্লোকে গঙ্গা স্তোত্র রচনা করেন। নিমাই পণ্ডিত শ্লোকের ভুল কোথায় তা সমালোচনা করেন। কেশব মিশ্র ভুল স্বীকার করেন। এভাবে কেশব মিশ্রের অংহকারের পতন হয়।
পশ্চিবঙ্গে প্রভু জগদ্বন্ধুর নামের মহাত্ম্য পরিব্যাপ্ত হলো। সেখানকার নিচু জাতি হিসাবে গন্য ডোমেরা প্রভুর প্রেরণায় উজ্জীবিত হলো। কোলকাতার ডোম পল্লির বাসিন্দাদের মধ্যে মহানাম সংকীর্তনের দল গড়ে উঠে। মানুষের অধিকার নিয়ে ডোমেরা মানুষরূপে মাথা উঁচু করে সমাজে চলার সাহস পায়। অসাধারণ পরিবর্তনে প্রভু জগদ্বন্ধুর এই অবদান চিরস্মরনীয়।
সারদা দেবীর জীবনী থেকে আমরা যে নৈতিক শিক্ষা পাই তা হলো ত্যাগ। ত্যাগ না করলে বড় কিছু হওয়া যায় না। যারা শুধু সংসারে আবদ্ধ থাকে, তারা জগতের জন্য কিছু করতে পারে না। মানুষ অসহিষ্ণু হলে সমাজে শান্তি আসবে না। জগতের সকলকে আপন করে ভালোবাসতে হবে। সাধন ভজন প্রথম বয়সেই করতে হবে। সারদা দেবীর এই শিক্ষা আমরা বাস্তবে কাজে লাগাতে পারি।
যারা সবসময় অপরের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেন। নিজের ক্ষতি হলেও অপরের মঙ্গল করেন। কেউ কেউ সংসারের সুখ ত্যাগ করে জগতের মঙ্গল সাধন করেন। তারা নিজেকে নিয়ে নয় বরং অপরকে নিয়ে ভাবেন। অপরের জন্য ব্যস্ত থাকেন। এঁরাই হলেন মহাপুরুষ বা মহীয়সী নারী।
মহাপুরুষ বা মহীয়সী নারীর জীবনচরিতই আদর্শ জীবনচরিত। এদের জীবনী থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। আমাদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়তে পারি। এঁদের পথ অনুসরণ করে আমরা জগতের মঙ্গল করতে পারি।
মথুরার অত্যাচারী রাজা কংস শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারেননি। তাঁর হাত থেকে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে বাঁচিয়েছেন, গোকুলের অন্য শিশুদেরও বাঁচিয়েছেন। এতে কংস আরও হিংস্র হয়ে উঠেন। তিনি গোকুলের লোকদের ওপর অত্যাচার আরও বাড়িয়ে দেন। তাই গোপেরা একদিন যুক্তি করে গোকুল ছেড়ে বৃন্দাবন চলে যান।
শ্রীকৃষ্ণ একদিন বলরাম এবং অন্যান্য গোপবালকের সাথে গরু চরাচ্ছিলেন। তখন কংসের এক অনুচর বাছুরের রূপ ধরে কৃষ্ণকে মারতে এলে শ্রীকৃষ্ণ তাকে চিনতে পারে। তখন শ্রীকৃষ্ণ বৎসাসুরের লেজ ও দুই পা ধরে জোরে এক গাছের ওপর আছড়ে ফেলেন। ফলে বৎসাসুর মারা যায়।
বৎসাসুর মারা গেলে কংস কৃষ্ণকে মারার জন্য বকাসুরকে পাঠালেন। শ্রীকৃষ্ণ একদিন গোপবালকদের সঙ্গে যমুনা নদীর তীরে খেলছিল। সবাই নদীর তীরে প্রকান্ড এক বকপাখি দেখতে পেল। কৃষ্ণ তার নিকট যেতেই বকাসুর তাঁকে গ্রাস করতে এগিয়ে এল। কৃষ্ণ তখন তার বিরাট ঠোঁট দুটো ধরে বিদীর্ণ করে ফেললেন। এর ফলে বকাসুর মারা গেল।
কৃষ্ণসহ গোপবালকেরা এক বনের ধারে খেলছিল। অঘাসুর আগে থেকেই সেখানে গিয়ে অজগরের রূপ ধরল এবং বিরাট হাঁ করে চুপচাপ পড়ে রইল। গোপবালকেরা বুঝতে পারেনি। তারা এটাকে গিরিগুহা মনে করে অজগরের মুখের মধ্যে ঢুকে পড়ে। কিন্তু কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন যে এটা অজগর রূপী অসুর। তখন তিনি অজগরের মুখের মধ্যে গিয়ে এমনভাবে দাঁড়ালেন যে অজগরের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। ফলে অঘাসুর মারা গেল এবং গোপবালকগণসহ কৃষ্ণ বেঁচে গেলেন।
কালীয় নাগ খাদ্য মনে করে শ্রীকৃষ্ণকে পেঁচিয়ে ধরে। কৃষ্ণও এমনভাবে কালীয়ের গলা চেপে ধরেন যে তার প্রাণ যায় যায়। তখন কালীয় বুঝতে পারে ইনি সাধারণ লোক নন। স্বয়ং ভগবান। তখন সে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং শ্রীকৃষ্ণ তাকে ক্ষমা করেন এবং তাকে এই হ্রদ থেকে চলে যেতে বলেন।
যমুনার তীরের বনভূমিতে হঠাৎ দাবানল জ্বলে ওঠে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। পালাবার কোনো পথ নেই। সবাই বাঁচার জন্য হাহাকার করছে। কৃষ্ণ তখন সকলকে অভয় দেন। তারপর ঐশ্বরিক বলে তিনি সেই দাবানল পান করেন। ফলে দাবানল থেকে সকলে রক্ষা পায়।
একদিন শ্রীকৃষ্ণের কথামতো গোপেরা ইন্দ্র পূজা না করে গোবর্ধন গিরির পূজা করার ফলে ইন্দ্ররাজ ক্ষেপে গেলেন। এবং ইন্দ্ররাজের আদেশে শুরু হলো তুমুল বজ্রও বৃষ্টিপাত। শ্রীকৃষ্ণ তখন তাঁর বাম হাতে কনিষ্ঠ আঙুল দ্বারা গোবর্ধন গিরিকে শূন্যে তুলে ধরলেন। সকল গোপ তাদের গরু-বাছুর এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে তার নিচে আশ্রয় নিলেন। এই গোবর্ধন গিরি ধারণ করার জন্যই কৃষ্ণের এক নাম গিরিধারী।
কৃষ্ণ তাঁর কৈশোরে বৎসরূপী অসুর, অজগর রূপী অঘাসুরকে বধ করে যে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করে। আবার কালীয় নাগকে হত্যা না করে ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ক্ষমার আদর্শও স্থাপন করেছেন। দাবাগ্নি পান ও গোবর্ধন ধারণের মধ্য দিয়ে সমাজের মঙ্গল সাধনের আদর্শ প্রকাশ করেছেন।
বাল্যকালে শ্রীচৈতন্যের নাম ছিল নিমাই। নিমাই ছিলেন খুবই চঞ্চল ও দুরন্ত। তবে খুব মেধাবী। অল্প বয়সে তার পিতার মৃত্যু হয়। এরপর মাতা শচীদেবী তাকে গঙ্গাদাস পন্ডিতের চতুষ্পাঠীতে ভর্তি করিয়ে দেন। তিনি অল্পকালের মধ্যে ব্যাকরণ, অলংকার, স্মৃতি ও ন্যায় শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
নিমাই প্রেমভক্তি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেন। নিমাই তার অনুসারীদের নিয়ে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে এমনকি গ্রামের পথে পথে কৃষ্ণনাম প্রচার করতে থাকেন। একদিন জগাই-মাধাই নামে মাতাল দুই ভাই নিমাই ও নিত্যানন্দকে আক্রমণ করেন। কিন্তু নিমাই প্রেমভক্তি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেন।
একসময় সংসারের প্রতি নিমাইয়ের মন একেবারেই উঠে যায়। তিনি সংসার ত্যাগ করার কথা ভাবেন। তারপর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের এক গভীর রাতে তিনি মা, স্ত্রী এবং ভক্তদের ছেড়ে গৃহত্যাগ করেন। কাটোয়ায় গিয়ে তিনি কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষা নেন। তখন তাঁর নতুন নাম হয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য, সংক্ষেপে শ্রীচৈতন্য।
নবদ্বীপে কেশব মিত্র ছিল বিখ্যাত পণ্ডিত। তিনি সগর্বে পণ্ডিতদের প্রতি ঘোষণা করেন, 'হয় তর্ক বিচার করুন, না হয় জয়পত্র লিখে দিন।' তখন পণ্ডিত সমাজ ভীত হয়ে পড়লেও তরুণ নিমাই পণ্ডিত বিনয়ের সঙ্গে এগিয়ে আসেন। নিমাই-এর অনুরোধে কেশব পণ্ডিত শতাধিক শ্লোকে গঙ্গাঙ্গেত্র রচনা করেন। এরপর নিমাই কোন শ্লোক কোথায় কী ভুল আছে তা ব্যাখ্যা করেন। নিমাইয়ের সমালোচনা শুনে উপস্থিত পণ্ডিতগণ বিস্মিত হয়ে যান। এ ঘটনার পর নবদ্বীপে নিমাইয়ের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি বৃদ্ধি পায়।
শ্রীচৈতন্য কোনো ভেদাভেদ মানেননি। তাঁর প্রেমভক্তির ধর্মে উচ্চ-নীচ, বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতার কোনো স্থান ছিল না। তিনি আচণ্ডালে স্নেহ বিতরণ করেছেন এবং সবাইকে বুকে স্থান দিয়েছেন। নিজে ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও চণ্ডালের সঙ্গে এক সারিতে বসে আহার গ্রহণ করেছেন। শুধু হিন্দুই নয়, তাঁর প্রেমভক্তির কাছে মুসলমান, খ্রিষ্টান ইত্যাদি জাতিভেদও ছিল না।
রাম প্রসাদ ছিলেন মাতৃসাধক। ব্রহ্মজ্ঞানে তিনি কালীর সাধনা করেন। কালীই ছিল তাঁর নিকট ঈশ্বর। হরি, ব্রহ্মা, শিব, দুর্গা সবই তিনি। তাই রামপ্রসাদ বলেছেন- কালী ব্রহ্ম জেনে মর্ম ধর্মাধর্ম সব ভুলেছি।
রামপ্রসাদ দুর্গাচরণ জমিদারের মুহুরির পদে যোগদান করেন। তাঁর কাজ ছিল হিসাব-নিকাশ রাখা। কিন্তু তাঁর মনে সবসময় মায়ের চিন্তা। তাই হিসাবের খাতায় তিনি মাতৃ সংগীত বা শ্যামা সংগীত রচনা করে চললেন। জমিদার এ খবর শুনে তার শ্যামাসংগীত পড়ে অত্যন্ত মুগ্ধ হলেন এবং বললেন তুমি বাড়ি ফিরে যাও মায়ের সাধনা কর আর শ্যামা সংগীত রচনা কর। তুমি যে ত্রিশ টাকা বেতন পেতে, তা তুমি নিয়মিত পাবে।
নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের অনুরোধে রামপ্রসাদ বিদ্যা সুন্দর নামে একটি কাব্য রচনা করেন। মহারাজা তাঁর সভাকবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরকে কাব্যটি পড়তে দেন। ভারতচন্দ্র কাব্যটি পড়ে অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী মহারাজা রামপ্রসাদকে কবিরঞ্জন উপাধিতে ভূষিত করেন।
শ্যামা মা কন্যারূপে রামপ্রসাদের নিকট ধরা দিয়েছিলেন। একদিন রামপ্রসাদ ঘরের বেড়া বাঁধছিলেন। অপর পাশ থেকে মেয়ে জগদীশ্বরী তাঁকে সাহায্য করছিল। একসময় জগদম্বরী খেলতে চলে যায়। তখন মা শ্যামা মেয়ের রূপ ধরে এসে রামপ্রসাদকে কাজে সাহায্য করেন।
সারদা দেবীর স্বামী শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাকে বলেন, ঈশ্বর সকলেরই অতি আপনার। যে তাঁকে মনে-প্রাণে ভালোবাসে, ডাকে, সেই তাঁর দেখা পায়। তুমি যদি ডাক, তুমিও তাঁর দেখা পাবে। তাঁর দেখা পাওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য। স্বামীর এই উপদেশ সারদা দেবীর অন্তর স্পর্শ করে। তিনি একে মন্ত্ররূপে গ্রহণ করে সাধনার পথে যাত্রা শুরু করেন।
সারদা দেবী স্বামীর চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে দক্ষিণেশ্বর পৌছান। দক্ষিণেশ্বর এসে তিনি স্বামীর সেবা যত্নে মন-প্রাণ ঢেলে দেন। স্বামীর সাধনায় যাতে কোনো রকম বিঘ্ন না ঘটে সে ব্যাপারে তিনি ছিলেন যত্নশীল। তিনি নিজেও স্বামীর উপদেশ মতো কাঠার সাধনায় মগ্ন হন। এর ফলে সকলের কাছে তাঁর নতুন পরিচয় হয় শ্রীমা বলে।
স্বামী বিবেকানন্দ শৈশবে ছিলেন খুবই দুরন্ত ও একরোখা। তবে খুব মেধাবী। লেখাপড়ায় খুব ভালো করতেন। পাশাপাশি খেলাধুলা ও গানবাজনায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নির্ভীক। তিনি তার সাথিদের সাথে সুযোগ পেলেই ধ্যান-ধ্যান খেলায় মেতে উঠতেন। কখনো একা-একাই ধ্যানমগ্ন হয়ে যেতেন। ধ্যান করাটা তাঁর একটা প্রিয় খেলা ছিল।
নরেন্দ্রনাথ বিএ পাস করার পর কেবল ঈশ্বর সম্পর্কে চিন্তা করেন। ঈশ্বর কি আছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তার দেখা হয় শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে। সাদাসিধে সাধক শ্রীরামকৃষ্ণকে তার ভালো লাগে। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি তার একটা ভক্তির ভাব জেগে ওঠে। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষা নেন। নরেন্দ্রনাথ হন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী। তখন তার নাম হয় বিবেকানন্দ।
স্বামী বিবেকানন্দ বক্তৃতার শুরুতে উপস্থিত সকলকে ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ বলে সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, হিন্দুধর্ম পৃথিবীর সকল ধর্মকে সমান সত্য মনে করে। সব ধর্মের লক্ষ্যই এক। নদীসমূহ যেমন এক সাগরে গিয়ে মিলিত হয়, তেমনি সকল ধর্মেরই লক্ষ্য এক ঈশ্বর লাভ। তাই বিবাদ নয়, সহায়তা, বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাব গ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।
স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোতে বক্তৃতাদানের পর ইউরোপের অন্যান্য দেশে বক্তৃতা দেন। ফলে ইউরোপের মানুষ হিন্দুধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারেন। অনেকে তাঁর পরম ভক্ত হয়ে যান। তাঁদের মধ্যে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিবেকানন্দের আদর্শে এতটাই উদ্বুদ্ধ হন যে, নিজের জন্মভূমি আয়ারল্যান্ড ছেড়ে ভারতবর্ষে চলে আসেন। বিবেকানন্দের কাছে তিনি দীক্ষা নেন। তখন তাঁর নাম হয় ভগিনী নিবেদিতা।
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরুদেব রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নামে একটি মঠ স্থাপন করেন। রামকৃষ্ণ মঠ। সাধারণভাবে এটি বেলুড় মঠ নামে পরিচিত। মানব সেবার আদর্শ নিয়ে এ মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। গুরুদেবের আদর্শ প্রচারের জন্য বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশনও প্রতিষ্ঠা করেন।
বিবেকানন্দ কেবল ঈশ্বর চিন্তা করতেন। ঈশ্বর কি আছে? তাকে কি দেখা যায় এরকম, প্রশ্ন মনে দেখা দিত। কারও কাছে এর সদুত্তর পান নি। এসময় কালীর সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে দেখা হয়। তাকেও বিবেকানন্দ একই প্রশ্ন করে। রামকৃষ্ণ বলেন হাঁ দেখেছি, যেমন তোকে দেখছি। চাইলে তোকেও দেখাতে পারি। শ্রীরামকৃষ্ণের এ সাদাসিধে ভাব দেখে স্বামী বিবেকানন্দের ভালো লাগে এবং তারপর থেকে রামকৃষ্ণের প্রতি তার ভক্তিভাব জেগে ওঠে।
বিবেকানন্দের জীবনী থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষা পাই যে, সততা ও নির্ভীকতা মানুষের দুটি শ্রেষ্ঠ গুণ। এছাড়া কেউ বড় হতে পারে না। পৃথিবীর সকল মানুষ এক জাতি। ধর্ম তাদের পৃথক হলেও সব ধর্মের ভিত্তি এক এবং তা হলো সত্য। পরোপকার, স্বাধীনতা- এগুলো ধর্মের অঙ্গ। পরাধীনতা ও পরাপীড়ন পাপ। মানুষকে ধর্মের কথা বলার আগে তার দরিদ্র মোচন করতে হবে। ধর্মাচার আগে শরীর সুস্থ ও বলবান রাখতে হবে। কারণ দুর্বল শরীরে শুধু ধর্ম নয়, কোনো কাজই ঠিকমতো করা যায় না।
ফরিদপুরের উপকণ্ঠে ছিল সাঁওতাল, বাগদী ও নমঃশূদ্রদের বাস। সমাজের দৃষ্টিতে তারা ছিল ঘৃণ্য ও অস্পৃশ্য। জগদ্বন্ধু একদিন বাগদীদের সর্দার রজনীকে ডেকে এনে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। প্রভু বললেন কে বলেছে তোমরা নীচু জাতি? মানুষের মধ্যে কোনো উঁচু-নীচু নেই। সবাই সমান। সবাই ঈশ্বরের সন্তান। তোমরা সবাই শ্রীহরির দাস। তোমাদের পাড়ার সকলে মোহান্ত বংশ। এভাবে মোহান্ত বংশের সৃষ্টি।
প্রভু জগদ্বন্ধু তার ভক্তদের নিয়ে নামকীর্তন করতেন। একদিন ভক্তদের নিয়ে ভ্রমণে বের হয়েছেন। ফরিদপুর শহরের অনতিদূরে এক জঙ্গলাকীর্ন জায়গায় এসে তিনি বললেন, এখানেই আমি শ্রী অঙ্গন প্রতিষ্ঠা করব। এরপর তাঁর অনুপ্রেরণায় ঐ স্থানেই শ্রী অঙ্গন প্রতিষ্ঠিত হলো। এই শ্রী অঙ্গনেই শুরু হয় প্রভুর গম্ভীর লীলা।
তপন তার সহপাঠীর টাকা চুরি করে ধরা পড়ে। সহপাঠীরা যখন তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আসে তখন ধর্ম শিক্ষক তাদেরকে কালীয় নাগের কাহিনীটি শোনান। এ কাহিনীর মধ্য দিয়ে ধর্ম শিক্ষক বোঝাতে সক্ষম হন যে, ক্ষমাই মহতের লক্ষণ। পাপকে ঘৃণা করা উচিত পাপীকে নয়। একথা শোনার পর বন্ধুরা তপনকে ক্ষমা করে বুকে টেনে নেয়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শৈশবেই অসুরদের হাত থেকে গোকুলের শিশুদের রক্ষা করেছেন। মথুরার অত্যাচারী রাজা কংস তাঁকে হত্যা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারেননি। আর তাই কংস আরও হিংস্র হয়ে উঠেন।
কংসের এক অনুচর বাছুরের রূপ ধরে কৃষ্ণকে মারতে বৃন্দাবন এলো। কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য সে গরু-বাছুরের সঙ্গে মিশে গেল। কিন্তু ভাগবান কৃষ্ণ ঠিকই তাকে চিনতে পেরেছিলেন। তাই তিনি বৎসাসুরের লেজ ও দু পা ধরে জোরে এক গাছের ওপর আছড়ে ফেলেন। আর এভাবেই বৎসাসুর মারা যায়।
পূজা না পেয়ে দেবরাজ ইন্দ্র ক্ষেপে গেলেন। তিনি মেঘসমূহকে আদেশ দিলেন তুমুল বজ্র ও বৃষ্টিপাত ঘটাতে। শুরু হল বজ্র ও বৃষ্টিপাত। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুন দ্বারা গোবর্ধন গিরিকে শূন্যে তুলে ধরলেন। ইন্দ্র বুঝতে পারলেন, স্বয়ং বিষ্ণু কৃষ্ণাবতাররূপে জন্ম নিয়ে এ কাজ করছেন। আর তাই ইন্দ্র কৃষ্ণের কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
জগন্নাথ মিশ্রের পৈতৃক বসত ছিল বাংলাদেশের বর্তমান সিলেট জেলায়। কিন্তু বিদ্যা শিক্ষার জন্য তিনি প্রথমে নবদ্বীপে গিয়েছিলেন। নবদ্বীপ হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি এলাকা। সেখানে তিনি শচীদেবীকে বিয়ে করে সংসার পাতেন। তাই তিনি নবদ্বীপে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
নিমাই-এর প্রথম স্ত্রী লক্ষ্মীদেবী নবদ্বীপে সর্পাঘাতে মারা যান। এতে নিমাই খুব আঘাত পান। সংসারের প্রতি তাঁর মন ওঠে যায়। ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে ধর্মানুরাগ প্রবল হয়ে ওঠে। আর তাই মা শচীদেবী নিমাইকে সনাতন পণ্ডিতের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেন।
সাধাসিধে সাধক শ্রীরামকৃষ্ণকে নরেন্দ্রনাথের ভালো লাগে। তাঁর প্রতি কেমন যেন একটা ভক্তির ভাব জেগে ওঠে। এক সময় শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট ত্যাগের দীক্ষা নেন তিনি। নরেন্দ্রনাথ হন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী। আর তাই তাঁর নাম হয় বিবেকানন্দ।
যুবকদের আগে শরীর গঠন করতে হবে। তারপর ধর্মচর্চা করবে। দুর্বল শরীরে ধর্মচর্চা করা হয় না। এমনকি, অন্য কোনো কাজও হয় না। এজন্য বিবেকানন্দের মতে, গীতা পড়ার আগে ফুটবল খেলতে হবে।
সংসারমুখী করানোর জন্য বিয়ে করানো হলেও রামপ্রসাদ সংসারমুখী হলেন না। মাতৃসাধনায় তাঁর মনোযোগ আরও বেড়ে গেল। সংসারের প্রতি তিনি অধিক উদাসীন হয়ে পড়লেন। এমন সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। ফলে সংসারের সমস্ত দায় এসে পড়ে তাঁর ওপর। তাই অর্থোপার্জনের জন্য তিনি একদিন কলকাতা যান।
জগতের সকল মানুষ এক রকম নয়। কেউ কেউ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সবসময় নিজের মঙ্গলের কথাই চিন্তা করে। এরা সাধারণ মানুষ। আবার কেউ কেউ আছেন এর বিপরীত। তাঁরা অপরের মঙ্গলের কথাও চিন্তা করেন। নিজের ক্ষতি হলেও অপরের মঙ্গল করেন। কেউ কেউ সংসারের সুখ ত্যাগ করে জগতের মঙ্গল সাধন করেন। এঁরা হলেন মহাপুরুষ বা মহীয়সী নারী। এঁদের জীবনচরিতই আদর্শ জীবনচরিত। এঁদের জীবনী থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। আমাদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়তে পারি। এঁদের পথ অনুসরণ করে আমরাও জগতের মঙ্গল করতে পারি। এ অধ্যায়ে এরূপ ছয়জন মহাপুরুষ ও মহীয়সী নারীর বর্ণনা করা হলো। এঁরা হলেন শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য, স্বামী বিবেকানন্দ, মা সারদা দেবী, সাধক রামপ্রসাদ এবং প্রভু জগদ্বন্ধু।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- শ্রীকৃষ্ণের বাল্য ও কৈশোরজীবনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনায় প্রীতি, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, জীবপ্রেমসহ বিভিন্ন আদর্শিক দিকের বর্ণনা করতে পারব
- নৈতিকতা গঠনে শ্রীচৈতন্যদেবের জীবন ও শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব
- নৈতিকতা গঠনে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব
- নৈতিকতা গঠনে মা সারদা দেবীর জীবন ও শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব
- নৈতিকতা গঠনে সাধক রামপ্রসাদের জীবন ও শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব
- নৈতিকতা গঠনে প্রভু জগদ্বন্ধুর জীবন ও শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
- মহাপুরুষ ও মহীয়সী নারীদের জীবনাদর্শের শিক্ষা নিজ জীবনাচরণে মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ হব।
Related Question
View Allযারা পরের কল্যাণ এবং জগতের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন তারাই হচ্ছেন মহাপুরুষ।
কৃষ্ণকে ভজন করতে জাতি ও কুলের বিচার করতে হয় না। বাণীটি বলেছেন শ্রীচৈতন্যদেব।
হিন্দু সমাজে তখন বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতা প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল। শূদ্র ও চণ্ডালদের সবাই ঘৃণা করত। কিন্তু কৃষ্ণ ভজনে উচ্চ-নীচ, বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতার কোনো স্থান ছিল না। এখানে ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও চন্ডালদের সাথে এক সারিতে বসে কৃষ্ণ নাম জপ করতে হতো।
শ্রীচৈতন্যদেবের নৈতিক আদর্শটি অধ্যাপিকা চিত্রলেখার আচরণের প্রতিফলিত হয়েছে।
শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর উদারতা ও ভালোবাসা দিয়ে নবদ্বীপবাসীকে আপন করে নিয়েছিলেন। উদ্দীপকের চিত্রলেখা দেবী তাঁর উদারতা ও ভালোরাসা দিয়ে সকলকে জয় করেছেন। শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন কৃষ্ণভক্ত। তিনি পথে পথে কৃষ্ণনাম প্রচার করতেন। অনেকে বাধা দেন। জগাই-মাধাই নামে মাতাল দুই ভাই একদিন চৈতন্যদেবকে আক্রমণ করে। কিন্তু চৈতন্যদেব তাঁর প্রেমভক্তি দিয়ে তিনি সবাইকে আপন করে নেন। তারা সকলে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে চৈতন্যদেবের প্রেমভক্তি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। চৈতন্যদেবের এসব আদর্শের কতকগুলো দিক অধ্যাপিকা চিত্রলেখার চরিত্রে লক্ষ করা যায়।
নিরহংকার আদর্শ সবাইকে আকৃষ্ট করে কথাটি বাস্তব সত্য।
উদ্দীপকের অধ্যাপিকা চিত্রলেখা একজন কৃষ্ণভক্ত। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও অমায়িক। তিনি জাগতিক ও আত্মিক উন্নয়নমূলক নানা গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি সন্তানদের অন্য বর্ণে বিয়ে দিয়ে এক দৃষ্টান্তমূলক নজির স্থাপন করেন। উদারতা ও ভালোবাসা দিয়ে তিনি সবার মন জয় করেন।
শ্রীচৈতন্যদেবও তাঁর কৃষ্ণভক্তি ও ভালোবাসা দিয়ে নদীয়াবাসীর মন জয় করেছিলেন। তিনি নবদ্বীতীর ঘরে ঘরে কৃষ্ণনাম প্রচার করেন। অনেকে তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু চৈতন্যদেব তাঁর প্রেমভক্তি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেন। তাঁর কাছে কোনো জাতিভেদ ছিল না। নিজে ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও চন্ডালদের সাথে এক সারিতে বসে আহার করেছেন। পরিশেষে একথা বলা যায়, উদ্দীপকের চিত্রলেখা দেবী ও শ্রীচৈতন্যদেব উভয়েই তাঁদের নিরহংকার আদর্শ দিয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করেছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দের দীক্ষাগুরু হচ্ছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব
প্রত্যেক জীবের সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন ঈশ্বর, অর্থাৎ প্রতিটি জীবের মধ্যে স্রষ্টা বিদ্যমান। সেহেতু জীবের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেম স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমের শামিল। সুতরাং স্রষ্টাকে পাবার শ্রেষ্ঠ পথ হচ্ছে তার সৃষ্ট জীবের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা। সেহেতু জীবে দয়া মানুষের ধর্মীয় কর্তব্য। স্বামী বিবেকানন্দ তাই বলেছেন, "জীব সেবাই ঈশ্বর সেবা।"
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!