আকাইদ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হলো আকিদাহ। আকিদাহ অর্থ বিশ্বাস। আর আকাইদ শব্দের অর্থ বিশ্বাসমালা। ইসলামের সর্বপ্রথম বিষয় হলো আকাইদ। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর উপর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করাকেই আকাইদ বলা হয়।
আকাইদের সবগুলো বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করলে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, আসমানি কিতাব, ফেরেশতা, তাকদির ইত্যাদির উপর বিশ্বাস স্থাপন করার নাম আকাইদ। যে এসব বিষয়ে বিশ্বাস করে, সে-ই ইসলামে প্রবেশকারী বা মুসলিম।
তাওহিদ শব্দের অর্থ একত্ববাদ। মহান আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করার নামই হলো তাওহিদ। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা এক। তার কোনো শরিক নেই। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনিই আমাদের রক্ষক, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রিজিকদাতা। তিনি অনাদি ও অনন্ত। মনে প্রাণে এরূপ বিশ্বাস করাকেই তাওহিদ বলা হয়।
আকাইদের সর্বপ্রথম ও. সর্বপ্রধান বিষয় হলো তাওহিদ। তাওহিদে বিশ্বাসের মাধ্যমেই মানুষ ইমান ও ইসলামে প্রবেশ করে। তাওহিদে বা একত্ববাদে বিশ্বাসের পর আকাইদের অন্যান্য বিষয় বিশ্বাস করতে হয়।
মানবজাতির হিদায়াতের জন্য দুনিয়াতে অনেক নবি-রাসুল আগমন করেছেন। তাঁরা সকলেই তাওহিদের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন। তাঁদের সকলের দাওয়াতের মূল বাণী ছিল 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু বাবা অর্থাৎ 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ বা মাবুদ নেই।'
ইসলামের সকল বিধি-বিধান তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাওহিদের পরিপন্থি কোনো বিধান ইসলামে নেই। সালাত, যাকাত, সাওম, হজসহ অন্যান্য সকল ইবাদতই এক আল্লাহর জন্য করতে হয়। কোনো কিছু চাইতে হলেও এক আল্লাহর নিকট চাইতে হয়। এটাই ইসলামের শিক্ষা।
ইসলামে তাওহিদের গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ার কারণ হলো ইসলামের সকল বিধি-বিধান তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাওহিদের পরিপন্থী কোনো বিধান ইসলামে নেই। কোনো কিছু চাইতে হলেও এক আল্লাহ নিকট চাইতে হয়। তাই বলা যায়, ইসলামে তাওহিদের গুরুত্ব অপরিসীম।
তাওহিদে বিশ্বাস মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা এনে দেয়। কেননা তাওহিদ মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দান করে। দুনিয়ার কাজকর্মের জন্য মানুষকে পরকালে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে এ শিক্ষা তাওহিদের মাধ্যমেই লাভ করা যায়। এ শিক্ষা দ্বারা মানুষ অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকে। এর ফলে সে আখিরাতে সফলতা লাভ করতে পারে।
দুনিয়ার জীবনেও তাওহিদে বিশ্বাসের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাওহিদে বিশ্বাসীগণ শুধু আল্লাহ তায়ালার সামনে মাথানত করে। অন্য কারো সামনে মাথা নত করে না। ফলে তাওহিদে বিশ্বাস মানুষের মধ্যে আত্মসম্মান ও আত্মসচেতনতা জাগিয়ে তোলে।
তাওহিদে বিশ্বাস না করলে মানুষ বিপথগামী হয়ে যায়। সে গাছপালা, পশু-পাখি, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদির নিকট মাথা নত করে। নানা মূর্তির পূজা করতে থাকে। ফলে মানুষের আত্মমর্যাদা বিনষ্ট হয়।
সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রা মহান আল্লাহ। মহাজগতের নিয়ম-শৃঙ্খলা তারই দান। পৃথিবীর সকল কিছুর স্রস্টাও তিনিই। পশু-পাখি, গাছপালাসহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রকও তিনি। আল্লাহ তায়ালাই সবকিছু করেন।
তাওহিদ বা একত্ববাদের তাৎপর্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে সূরা আল-মু'মিনূন এর ৯১নং আয়াতে। উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন- "আর তার (আল্লাহর) সাথে কোনো ইলাহ নেই। যদি তা থাকত, তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত।” (সূরা আল-মু'মিনুন : ৯১)
নৈতিকতা হলো উত্তম নীতির অনুসরণ। অর্থাৎ কথাবার্তা, আচার-আচরণে উত্তম আদর্শ ও নীতির অনুসরণ করাকেই নৈতিকতা বলা হয়।
তাওহিদ ও নৈতিকতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তাওহিদের শিক্ষা মানুষকে ইসলামি নৈতিকতার দিকে পরিচালনা করে। যে ব্যক্তি তাওহিদে বিশ্বাসী, সে নৈতিক ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হয়ে থাকে।
তাওহিদের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহ তায়ালাকে একক সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা। পাশাপাশি আল্লাহ তার গুণাবলিতেও একক এরূপ বিশ্বাস করা তাওহিদের মূল শিক্ষা।
তাওহিদ আমাদের আল্লাহ তায়ালার নানা গুণের পরিচয় দান করে। যেমন- আল্লাহ তায়ালা রাহমান, রাহিম, করিম, গাফফার, রাযযাক, খালিক, মালিক, রব ইত্যাদি।
তাওহিদে বিশ্বাসী মানুষ আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো সৃষ্টির নিকট মাথা নত করে না। কারো আনুগত্য করে না। বরং মানুষ হিসেবে নিজ মর্যাদা রক্ষায় সচেতন থাকে। অপরদিকে, অবিশ্বাসীরা সকল কিছুর নিকট ভরসা করে, মাথা নত করে।
কুফর আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ অস্বীকার করা, অবিশ্বাস করা, গোপন করা, ঢেকে রাখা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের কোনো একটির প্রতি অবিশ্বাস করাকে কুফর বলে।
ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের কোনো একটির প্রতি অবিশ্বাস করাকে কুফর বলে। যে ব্যক্তি কুফরে লিপ্ত হয়, তাকে বলা হয় কাফির।
কুফরের নানা দিক রয়েছে। তার মধ্যে দুটি দিক হলো-
১. আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করা।
২. ইমানের অন্যান্য মৌলিক বিষয়কেও অস্বীকার করা। যথা: নবি-রাসুল, আসমানি কিতাব, ফেরেশতা, পরকাল, তাকদির, পুনরুত্থান, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদিকে অবিশ্বাস করাও কুফর।
কুফরের কুফল ও পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আখিরাতে কাফিরদের স্থান হবে জাহান্নাম। সেখানে তারা যন্ত্রণাদায়ক কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর যারা কুফরি করে এবং আমার নিদর্শনগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।" (সূরা আল-বাকারা: ৩৯)
শিরক শব্দের অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, সমকক্ষ মনে করা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করাকে শিরক বলে। অপর কোনো কিছুকে আল্লাহ তায়ালার সমতুল্য বা সমকক্ষ বলে বিশ্বাস করাও শিরক।
ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করাকে শিরক বলে। যে ব্যক্তি শিরক করে, তাকে বলা হয় মুশরিক।
শিরক প্রধানত তিন প্রকার। যথা-
১. আল্লাহ তায়ালার সত্তার সাথে শিরক।
২. আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিতে অংশীদার সাব্যস্ত করা।
৩. আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে শিরক করা।
আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ হচ্ছে শিরক, পৃথিবীতে যত প্রকার যুলুম আছে শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় যুলুম বা পাপ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই শিরক চরম যুলুম।” (সূরা লুকমান: ১৩)
শিরক মানুষের মর্যাদাহানিকর কর্মও বটে। কেননা মানুষ হলো সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহ তায়ালা সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। অথচ মুশরিকরা শিরকে লিপ্ত হয়ে অন্য সৃষ্টির কাছে মাথা নত করে। ফলে মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। এজন্যই কুরআন মজিদে শিরককে সবচেয়ে বড় যুলুম বলা হয়েছে।
শিরকের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আল্লাহ তায়ালা শিরকের অপরাধ ক্ষমা করেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তা ব্যতীত অন্য যেকোনো পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা আন-নিসা: ১১৬)
ইমান মুফাস্সাল-এর বাংলা উচ্চারণ হলো- আমানতু বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি, ওয়া কুতুবিহি, ওয়া রুসুলিহি, ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি, ওয়াল কাদরি খাইরিহি ওয়া শাররিহি মিনাল্লাহি তাআলা ওয়াল বা'সি বা'দাল মাউত।
ইমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস। আর মুফাসসাল অর্থ বিস্তারিত। ইমান মুফাস্সাল অর্থ বিস্তারিত বিশ্বাস। বিস্তারিতভাবে ইমানের বিষয়গুলোর কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথকভাবে সবকটি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা জরুরি।
ইমানের সর্বপ্রথম বিষয় হলো মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাসই ইমানের মূল। আমরা আল্লাহ তায়ালার তাওহিদ বা একত্ববাদে বিশ্বাস করব। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি ব্যতীত অন্য কেউ-ই ইবাদতের যোগ্য নয়।
ফেরেশতাগণ আল্লাহর এক বিশেষ সৃষ্টি। তাঁরা নূরের তৈরি। তাঁরা সর্বদা আল্লাহ তায়ালার যিকির ও তাসবিহ পাঠে রত থাকেন। তাঁদের সংখ্যা অগণিত। আল্লাহ তায়ালার হুকুম ব্যতীত তারা কোনো কাজই করেন না।
আল্লাহর নির্দেশ পালনই ফেরেশতাদের একমাত্র কাজ। -ফেরেশতাগণের মধ্যে চারজন রয়েছে নেতৃস্থানীয়। তারা হলেন-
১. হযরত জিবরাইল (আ.)
২. হযরত মিকাইল (আ.)
৩: হযরত আযরাইল (আ.)
৪. হযরত ইসরাফিল (আ.)।
ইমানের তৃতীয় বিষয় হলো আসমানি কিতাব। আল্লাহ তায়ালা বহু আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন। এগুলো সবই আল্লাহর কালাম বা বাণী। তিনি নবি-রাসুলগণের মাধ্যমে এ কিতাবগুলো মানুষের নিকট পৌঁছিয়েছেন। এসব কিতাব মানবজাতির জন্য আলোস্বরূপ। এসবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানি কিতাব হলো আল-কুরআন।
আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস ইমানের অন্যতম গরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুনিয়ার জীবনই মানুষের শেষ নয়। বরং আখিরাতের জীবনও রয়েছে। আখিরাত হলো পরকাল্। মৃত্যুর পর পরই এ জীবনের শুরু। মানুষ সেখানে দুনিয়ার ভালো কাজের জন্য জান্নাত লাভ করবে এবং মন্দ কাজের জন্য জাহান্নাম পাবে।
ইমানের ষষ্ঠ বিষয় হলো তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস। তাকদিরকে আমরা ভাগ্য বা নিয়তি বলে থাকি। সবকিছুর তাকদিরই আল্লাহর হাতে। আল্লাহ তায়ালাই তাকদিরের নিয়ন্ত্রক। তাকদিরের ভালো-মন্দ যাই ঘটুক, সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে। সুতরাং আমরা তাকদিরে বিশ্বাস করব এবং ভালো ফল লাভের জন্য চেষ্টা করব।
ইমানের সর্বশেষ বিষয় হলো পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস। মৃত্যু একটি অনিবার্য সত্য। সকল জীবিত প্রাণীকেই মরতে হবে। আবার এমন একসময় আসবে, যখন আল্লাহ তায়ালা সবকিছু ধ্বংস করে দেবেন। পৃথিবীর কোনো কিছুই সেদিন অবশিষ্ট থাকবে না। কেবল আল্লাহ তায়ালাই থাকবেন। এরপর একসময় আল্লাহ তায়ালা পুনরায় সবাইকে জীবিত করবেন। মৃত্যুর পর পুনরায় এ জীবিত হওয়াকেই পুনরুত্থান বলে।
আসমা শব্দটি শব্দের অর্থ নামসমূহ। আর হুসনা শব্দের অর্থ সুন্দর। আর আসমাউল হুসনা অর্থ সুন্দর নামসমূহ। আল্লাহ তায়ালা সকল গুণের অধিকারী। তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা, দয়াবান, ক্ষমাশীল, শান্তিদাতা ও পরাক্রমশালী। আল্লাহ তায়ালার গুণের প্রত্যেকটির পৃথক পৃথক নাম রয়েছে। এ নামগুলোকেই একত্রে আসমাউল হুসনা বলা হয়।
উত্তম গুণাবলি অর্জনে আল্লাহ তায়ালার যেসব গুণবাচক নাম উৎসাহিত করে তা হলো- আল্লাহ পাক দয়ালু, আমরাও সকলের প্রতি দয়া করব, তিনি ন্যায়পরায়ণ, আমরাও সকল ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ হব। তিনি রিজিকদাতা। আমরাও ক্ষুধার্তকে অন্ন দেব। আল্লাহ তায়ালা পরম ধৈর্যশীল। আমরাও বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করব। এভাবে আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামসমূহ আমাদেরকে উত্তম চরিত্রবান হতে উৎসাহিত করে।
হায়্যুন শব্দের অর্থ চিরঞ্জীব। যিনি চিরকাল ধরে জীবিত। আল্লাহ হায়্যুন অর্থ আল্লাহ চিরঞ্জীব। তিনি চিরকাল ধরে আছেন, থাকবেন। যখন কোনো কিছুই ছিল না, তখনও তিনি ছিলেন। আবার কিয়ামতে যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, তখনও তিনিই থাকবেন। তার কোনো ক্ষয় নেই, রোগ-শোক, দুঃখ-জরা, তন্দ্রা-নিদ্রা কিছুই নেই।
কায়্যুমুন শব্দের অর্থ চিরস্থায়ী, চিরবিরাজমান, চিরবিদ্যমান, সবকিছুর ধারক সত্তা। ইসলামি পরিভাষায় সৃষ্টির তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে সত্তা অনাদি ও অনন্তকালব্যাপী বিরাজমান, তিনিই কাইয়্যুম। অন্য কথায় আপন সত্তার জন্য যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন অথচ সকল সত্তার ধারক, এরূপ সত্তাকে কাইয়্যুম বলা হয়।
আল্লাহু কাৰ্য্যুমুন অর্থ আল্লাহ চিরস্থায়ী। তিনিই সবকিছুর ধারক। তিনি বিশ্ববিধাতা। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। আসমান-জমিনের সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণাধীন।
আল্লাহ তায়ালা চিরবিরাজমান। তিনি সবসময় বিদ্যমান। তিনি অনাদি-অনন্ত। তিনি সবকিছু জানেন। পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু তারই নিয়ন্ত্রণে। তিনি ব্যতীত আর কোনো চিরবিরাজমান সত্তা নেই।
খাবিরুন অর্থ সম্যক অবহিত। আল্লাহ খাবিরুন অর্থ আল্লাহ তায়ালা সবকিছু সম্যক অবহিত, সবকিছু জানেন। কোনো কিছুই তার নিকট অজানা নয়। আমরা যা বলি বা করি সবই তিনি জানেন। আসমান-জমিনও এ বিশ্বজগতের এমন কোনো জিনিস নেই যা তার জ্ঞানের বাইরে। তিনি সবকিছু জানেন।
রিসালাত অর্থ বার্তা, সংবাদবহন, চিঠি, খবর পৌঁছানো ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার বাণী ও পরিচয় মানুষের নিকট পৌঁছানোর দায়িত্বকে রিসালাত বলে।
রিসালাতে বিশ্বাস না করলে মুমিন হওয়া যায় না। রিসালাতে বিশ্বাস করা ইমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাওহিদে বিশ্বাস করার সাথে সাথে আমাদের রিসালাতেও বিশ্বাস করতে হবে।
আমাদের কাছে আল্লাহ তায়ালার বাণী নবি-রাসুলগণ পৌঁছে দিতেন। নবি-রাসুলগণ রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা ছিলেন আল্লাহ তায়ালা ও মানবজাতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী। তাঁদের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহ তায়ালার সঠিক পরিচয় পাই। তাঁরাই আমাদের নিকট মহান আল্লাহর বাণী নিয়ে এসেছেন।
ওহি (وَجُيّ) আরবি শব্দ। এর অর্থ ইশারা, ইঙ্গিত, গোপন কথা ইত্যাদি। সাধারণত কোনো ব্যক্তির নিকট গোপনে প্রেরিত সংবাদকে ওহি বলা হয়।
ইসলামি পরিভাষায় ওহি হলো- মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবি-রাসুলগণের নিকট প্রেরিত সংবাদ বা বাণীকে ওহি বলা হয়। যেমন-আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর উপর আল-কুরআন নাজিল করেছেন। সুতরাং আল-কুরআন হলো ওহি।
আল্লাহ তায়ালা নানাভাবে নবি-রাসুলগণের নিকট ওহি প্রেরণ করতেন। নিচে ওহি প্রেরণের একটি পদ্ধতি লেখা হলো-
ফেরেশতার মাধ্যমে: আল্লাহ তায়ালা তার বাণী ফেরেশতার মাধ্যমে নবি-রাসুলগণের নিকট পৌঁছাতেন। যেমন- হযরত জিবরাইল (আ.) হলেন প্রধান ওহিবাহক ফেরেশতা। তিনি নবি-রাসুলগণের নিকট আল্লাহ তায়ালার বাণী নিয়ে হাজির হতেন।
ওহি প্রধানত দুই প্রকার। যথা-
১. ওহি মাতলু : অর্থাৎ যে ওহি তিলাওয়াত করা হয়।
২. ওহি গায়র মাতলু: অর্থাৎ যে ওহি তিলাওয়াত করা হয় না।
ওহি গায়র মাতলু হলো যে ওহি তিলাওয়াত করা হয় না। যেমন- হাদিস শরিফ। হাদিস শরিফ সালাতে তিলাওয়াত করা হয় না। এজন্য একে ওহি গায়র মাতলু বলে।
ওহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওহি সরাসরি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নাজিল হয়। এটা হলো অকাট্য জ্ঞান। এতে কোনোরূপ ভুলত্রুটি নেই। ওহির সংবাদ সকল প্রকার সন্দেহের উর্ধ্বে। ওহি সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল উৎস। ওহির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সকল প্রকার জ্ঞান দান করেন।
আখিরাত অর্থ পরকাল। পরকাল হলো ইহকালের বা দুনিয়ার জীবনের পরের জীবন। দুনিয়ার জীবনই মানুষের শেষ জীবন নয়। বরং মানুষের জন্য আর একটি জীবন রয়েছে। সে জীবনই পরকালীন জীবন। পরকালীন জীবন অনন্ত। এ জীবনের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।
দুনিয়া হলো আমল করার স্থান। আখিরাত হলো ফলভোগের স্থান। সেখানে মানুষ কোনো আমল করতে পারবে না। বরং দুনিয়াতে মানুষ যেরূপ আমল করেছে সেরূপ ফল ভোগ করবে। দুনিয়াতে যে ব্যক্তি ইমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, সে আখিরাতে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করবে। তাঁর আবাসস্থল হবে চিরশান্তির স্থান জান্নাত। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি ইমান আনবে না এবং অন্যায় ও খারাপ কাজ করবে, আখিরাতে সে শাস্তি ভোগ করবে।
আখিরাতে বিশ্বাস করলে মানবজীবন সুন্দর হয়। মানুষ উত্তম চরিত্রবান হিসেবে গড়ে ওঠে। আখিরাতে বিশ্বাস মানুষকে সব ধরনের খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। এ বিশ্বাসের ফলে মানুষ কোনোরূপ অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি, মিথ্যাচার, অশ্লীল কাজকর্ম করতে পারে না।
সিরাত শব্দের অর্থ পথ, রাস্তা, পুল, পদ্ধতি ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায়, সিরাত হলো জাহান্নামের উপর স্থাপিত একটি পুল। এ পুল পার হয়ে জান্নাতিগণ জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আখিরাতে সকল মানুষকেই এ পুলের উপর আরোহণ করে তা অতিক্রম করতে হবে।
জাহান্নামিদের জন্য সিরাত অত্যন্ত ভয়াবহ স্থান। তাদের জন্য সিরাত হবে চুলের চাইতেও সূক্ষ্ম এবং তরবারি অপেক্ষা ধারালো। সেখানে কোনো আলো থাকবে না। বরং সিরাত হবে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এমন অবস্থায় তারা সিরাতে আরোহণ করবে। তারা কিছুতেই সিরাত অতিক্রম করতে পারবে না। বরং তাদের হাত-পা কেটে তারা জাহান্নামে পতিত হবে।
মিযান অর্থ দাড়িপাল্লা, তুলাদণ্ড, মানদণ্ড বা পরিমাপ করার যন্ত্র। ইসলামি পরিভাষায়, যে পরিমাপক যন্ত্রের দ্বারা কিয়ামতের দিন মানুষের পাপপুণ্যকে ওজন করা হবে, তাকে মিযান বলা হয়।
মিযানের দুটি পাল্লাতে মানুষের সকল আমল ওজন করা হবে। এর এক পাল্লায় থাকবে পুণ্য এবং অন্য পাল্লায় উঠানো হবে পাপ। যে ব্যক্তির পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে সে হবে জান্নাতি। আর যে ব্যক্তির পুণ্যের পাল্লা হালকা হবে এবং পাপের পাল্লা ভারী হবে, সে জাহান্নামি হবে।
আকাইদের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয় হলো তাওহিদ। তাওহিদে বিশ্বাসের মাধ্যমেই মানুষ ইমান ও ইসলামে প্রবেশ করে। তাওহিদে বা একত্ববাদে বিশ্বাসের পর আকাইদের অন্যান্য বিষয়ে বিশ্বাস করতে হয়। তাই তাওহিদে বিশ্বাস মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাওহিদে বিশ্বাসীগণ শুধু আল্লাহ তায়ালার সামনে মাথা নত করে। অন্য কারও সামনে সে মাথানত করে না। পক্ষান্তরে, তাওহিদে বিশ্বাস না করলে মানুষ বিপথগামী হয়ে যায়। সে গাছপালা, পশুপাখি, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদির নিকট মাথানত করে। নানা মূর্তির পূজা করে থাকে। ফলে মানুষের আত্মমর্যাদা বিনষ্ট হয়। তাওহিদে বিশ্বাস মানুষের মধ্যে আত্মসম্মান ও আত্মসচেতনতা জাগিয়ে তোলে। তাই দুনিয়ার জীবনে তাওহিদে বিশ্বাসের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
একাধিক স্রষ্টা থাকলে তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিকে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতেন। যেমন- আগুনের স্রষ্টা আগুন নিয়ে পৃথক হয়ে পড়তেন। অতঃপর সমস্ত কিছুকে আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে দিয়ে তার নিজ ক্ষমতার প্রকাশ করতেন। তেমনি মহাসাগরের স্রষ্টা সারা পৃথিবী তার সৃষ্টি দ্বারা ডুবিয়ে দিতে চাইতেন। এভাবে স্রষ্টাগণ নিজ নিজ সৃষ্টি দ্বারা অন্যের ওপর বিজয়ী হতে চাইতেন। ফলে আমাদের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যেত। পৃথিবীর সকল কিছুই ধ্বংস হয়ে যেত।
কুফর আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ অস্বীকার করা, অবিশ্বাস করা, গোপন করা, ঢেকে রাখা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের কোনো একটির প্রতি অবিশ্বাস করাকে কুফর বলে। যেমন- আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করা। ইমানের মৌলিক অন্যান্য বিশ্বাসকে অস্বীকার করা। যথা- নবি-রাসুল, আসমানি কিতাব, ফেরেশতা, পরকাল, তাকদির, পুনরুত্থান, সিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদিকে অবিশ্বাস করাও কুফর।
শিরক শব্দের অর্থ অংশীদার করা, সমকক্ষ মনে করা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার করাকে শিরক বলে। অপর কোনোকিছুকে আল্লাহ তায়ালার সমতুল্য বা সমকক্ষ মনে করাও শিরক। যে ব্যক্তি শিরক করে তাকে বলা হয় মুশরিক।
মৃত্যু একটি অনিবার্য সত্য। সকল জীবিত প্রাণীকেই মরতে হবে। আবার এমন একসময় আসবে যখন আল্লাহ তায়ালা সবকিছু ধ্বংস করে দেবেন। পৃথিবীর কোনোকিছুই সেদিন অবশিষ্ট থাকবে না। কেবল আল্লাহ তায়ালাই বাকি থাকবেন। এরপর একসময় আল্লাহ তায়ালা পুনরায় সবাইকে জীবিত করবেন। মৃত্যুর পর পুনরায় এ জীবিত হওয়াকেই পুনরুত্থান বলে।
হায়্যূন শব্দের অর্থ চিরঞ্জীব। যিনি চিরকাল ধরে জীবিত। আল্লাহ্ হায়্যুন অর্থ আল্লাহ চিরঞ্জীব। তিনি চিরকাল ধরে আছেন, থাকবেন। যখন কোনোকিছুই ছিল না তখনো তিনি ছিলেন। আবার কিয়ামতে যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে তখনও তিনি থাকবেন। তাঁর কোনো ক্ষয় নেই, রোগ-শোক, দুঃখ-জরা, তন্দ্রা-নিদ্রা কিছুই নেই। কোনোরূপ ধ্বংস তাকে স্পর্শও করতে পারে না। তিনি সকল ক্ষয় ও ধ্বংস থেকে মুক্ত।
রিসালাত অর্থ বার্তা, সংবাদবহন, চিঠি, খবর পৌছানো ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহর বাণী ও পরিচয় মানুষের নিকট পৌঁছানোর দায়িত্বকে রিসালাত বলে।
ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার বাণী ও পরিচয় মানুষের নিকট পৌঁছানোর দায়িত্বকে রিসালাত বলে। রিসালাতে বিশ্বাস করা ইমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাওহিদে বিশ্বাস করার সাথে সাথে আমাদের রিসালাতেও বিশ্বাস করতে হবে। কেননা রিসালাতে বিশ্বাস না করলে মুমিন হওয়া যায় না। সুতরাং রিসালাত ও নবি-রাসুলগণের ওপর বিশ্বাস করা অপরিহার্য।
নবি-রাসুলগণ রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা ছিলেন আল্লাহ তায়ালা ও মানবজাতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী। তাঁদের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহ তায়ালার সঠিক পরিচয় পাই। তাঁরাই আমাদের নিকট মহান আল্লাহর বাণী নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধ, বিধিবিধান বর্ণনা করেছেন। সুতরাং রিসালাত ও নবি-রাসুলগণের ওপর রিশ্বাস করা অপরিহার্য।
ওহি আরবি শব্দ। এর অর্থ ইশারা, ইঙ্গিত, গোপন কথা ইত্যাদি। সাধারণত কোনো ব্যক্তির নিকট গোপনে প্রেরিত সংবাদকে ওহি বলা হয়। ইসলামি পরিভাষায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবি-রাসুলগণের নিকট প্রেরিত সংবাদ বা বাণীকে ওহি বলা হয়। যেমন- আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর আল-কুরআন নাযিল করেছেন। সুতরাং আল-কুরআন হলো এক প্রকার ওহি।
সিরাত শব্দের অর্থ পথ, রাস্তা, পুল, পদ্ধতি ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় সিরাত হলো জাহান্নামের ওপর স্থাপিত একটি পুল। এ পুল পার হয়ে জান্নাতিগণ জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আখিরাতে সকল মানুষকেই এ পুলের ওপর আরোহণ করে তা অতিক্রম করতে হবে। যে নেক আমল করবে মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে যাওয়ার অনুমতি দেবেন। জান্নাতিগণ সিরাতের ওপর দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। সেখানে ইমান ও নেক আমল ব্যতীত আর কোনো আলো থাকবে না। জান্নাতিগণের মধ্যে আমাদের প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) সর্বপ্রথম সিরাত অতিক্রম করে জান্নাতে প্রবেশ কররেন।
জাহান্নামিদের জন্য সিরাত হবে অত্যন্ত ভয়াবহ স্থান। তাদের জন্য সিরাত হবে চুলের চাইতেও সূক্ষ্ম এবং তরবারি অপেক্ষা ধারালো। সেখানে কোনো আলো থাকবে না। পুরো সিরাত হবে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এমন অবস্থায় তারা সিরাতে আরোহণ করবে। তারা কিছুতেই সিরাত অতিক্রম করতে পারবে না। বরং তাদের হাত-পা কেটে তারা জাহান্নামে পতিত হবে।
মিযান অর্থ দাঁড়িপাল্লা, তুলাদণ্ড, মানদন্ড বা পরিমাপ করার যন্ত্র। ইসলামি পরিভাষায়, যে পরিমাপক যন্ত্রের দ্বারা কিয়ামতের দিন মানুষের পাপপুণ্যকে ওজন করা হবে তাকে মিযান বলে। আমরা নিশ্চয়ই দাঁড়িপাল্লা দেখেছি। এর দুটি পাল্লা থাকে এবং মাঝে একটি দন্ড থাকে। এগুলোর মাধ্যমে আমরা নানা জিনিস পরিমাপ করে থাকি। মিযানও তেমনি একটি মানদণ্ড। এর দুটি পাল্লাতে মানুষের সকল আমল ওজন করা হবে। এর এক পাল্লায় থাকবে পুণ্য এবং অন্য পাল্লায় উঠানো হবে পাপ। যে ব্যক্তির পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে সে হবে জান্নাতি। আর যে ব্যক্তির পুণ্যের পাল্লা হালকা হবে ও পাপের পাল্লা ভারী হবে সে হবে জাহান্নামি।
তাওহিদ অর্থ একত্ববাদ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সত্তা ও গুণাবলিতে এক ও অদ্বিতীয়- এ বিশ্বাসকে তাওহিদ বলা হয়। আর নৈতিকতা হলো নীতিমূলক, নীতি সম্বন্ধীয় অর্থাৎ কথাবার্তা, আচার-আচরণে নীতির অনুসরণ করাকেই নৈতিকতা বলা হয়। তাওহিদ ও নৈতিকতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তাওহিদের শিক্ষা মানুষকে নৈতিকতার দিকে পরিচালনা করে। যে ব্যক্তি তাওহিদে বিশ্বাসী সে নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হয়ে থাকে।
আল্লাহু কাইয়্যুমুন অর্থ আল্লাহ চিরস্থায়ী। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা তাঁর আপন সত্তার জন্য কারও মুখাপেক্ষী নন অথচ সকল সত্তার তিনি ধারক। তাই তিনি চিরস্থায়ী।
আল্লাহ তায়ালা মহাপরাক্রমশালী, দন্ডদানকারী এটি পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৪নং আয়াত। এ আয়াতে মহান আল্লাহর প্রবল ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে-আল্লাহ তায়ালা অসীম ক্ষমতাধর। কেউ তাঁকে অপারগ করতে পারে না। তাঁর সাথে ধোঁকা-প্রতারণা করতে পারে না। কেউ তাঁর কৌশল বা পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে পারে না। তিনি যা চান তাই হয়। তাঁর কুদরত বা ক্ষমতার মোকাবিলা করার শক্তি কারও নেই। তিনি যাকে ইচ্ছা অপমানিত ও লাঞ্ছিত করতে পারেন। দুনিয়ার বড় বড় ক্ষমতাবানদের তিনি ক্ষুদ্র প্রাণী বা বস্তু দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। যেমন তিনি ফেরাউনকে পানি দ্বারা, নমরুদকে মশা দ্বারা, আবরাহাকে ছোট ছোট পাখি দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাঁকে অস্বীকারকারী কেউই তাঁর আযাব বা শাস্তি থেকে বাঁচতে পারেনি। ভবিষ্যতেও পারবে না।
কুফর আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ অস্বীকার করা, অবিশ্বাস করা, গোপন করা, ঢেকে রাখা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের কোনো একটির প্রতি অবিশ্বাস করাকে কুফর বলে। যে ব্যক্তি কুফরে লিপ্ত হয় তাকে বলা হয় কাফির।
আকাইদ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হলো আকিদাহ, যার অর্থ বিশ্বাস। ইসলামের সর্বপ্রথম বিষয় হলো আকাইদ। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর ওপর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করাকেই আকাইদ বলা হয়। অর্থাৎ তাওহিদ, 'রিসালাত, আখিরাত, আসমানি কিতাব, ফেরেশতা ইত্যাদি বিষয়ে বিশ্বাস করার নাম আকাইদ।
তাওহিদ শব্দের অর্থ একত্ববাদ। মহান আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করার নামই হলো তাওহিদ। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা এক। তাঁর কোনো শরিক নেই, তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনিই আমাদের রক্ষক, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রিযিকদাতা। তিনি অনাদি অনন্ত। তাঁর সমকক্ষ বা সমতুল্য কিছুই নেই। তিনিই একমাত্র মাবুদ। সকল প্রশংসা ও ইবাদত একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য। মনেপ্রাণে এরূপ বিশ্বাসকেই তাওহিদ বলা হয়।
শিরকের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্যায় আচরণ করে। কেননা আল্লাহ তায়ালাই মানুষের একমাত্র স্রষ্টা। সকল ইবাদত ও প্রশংসা লাভের হকদারও তিনি। শিরকের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর ইবাদত করে। ফলে আল্লাহর সাথে চরম অন্যায় করা হয়। অন্যদিকে, শিরক মানবতাবিরোধী অপরাধও বটে। কেননা মানুষ হলো সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহ তায়ালা সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। অথচ মুশরিকরা শিরকে লিপ্ত হয়ে অন্য সৃষ্টির কাছে মাথানত করে। ফলে মানুষের মর্যাদাও ক্ষুণ্ণ হয়। আর এজন্যই কুরআন মাজিদে শিরককে সবচেয়ে বড় জুলুম বলা হয়েছে।
আকাইদ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হলো আকিদাহ। আকিদাহ অর্থ বিশ্বাস। আর আকাইদ শব্দের অর্থ বিশ্বাসমালা। ইসলামের সর্বপ্রথম বিষয় হলো আকাইদ। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর উপর মনে প্রাণে বিশ্বাস করাকেই আকাইদ বলা হয়। আকাইদের সবগুলো বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করলে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, আসমানি কিতাব, ফেরেশতা, তাকদির ইত্যাদির উপর বিশ্বাস স্থাপন করার নাম আকাইদ। যে এসব বিষয়ে বিশ্বাস করে, সে-ই ইসলামে প্রবেশকারী বা মুসলিম।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- তাওহিদের স্বরূপ, গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারব।
- কুফরের পরিচয়, কুফল ও পরিণতি বর্ণনা করতে পারব।
- শিরকের পরিচয়, কুফল ও পরিণতি বর্ণনা করতে পারব।
- বাস্তব জীবনে কুফর ও শিরক পরিহার করার উপায়সমূহ বলতে পারব।
- ইমান মুফাস্সাল (ইমানের বিস্তারিত পরিচয়) অর্থসহ শুদ্ধভাবে পড়তে, বলতে এবং এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারব।
- আল্লাহর কয়েকটি গুণবাচক নাম ও এসবের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারব।
- আল্লাহর গুণবাচক নাম সম্পর্কিত গুণসমূহ নিজ আচরণে প্রতিফলনের উপায় বর্ণনা করতে পারব।
- রিসালাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে পারব।
- ওহির পরিচয় ও এর উপর বিশ্বাস স্থাপনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- আখিরাতে বিশ্বাসের গুরুত্ব এবং সিরাত ও মিযানের পরিচয় বর্ণনা করতে পারব।
- আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে নৈতিক জীবনযাপনের উপায় বলতে পারব।
- নৈতিক জীবনযাপনে তাওহিদের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারব।
Related Question
View Allতাওহিদ হলো মহান আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা।
আখিরাতে বিশ্বাস ইমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুনিয়ার জীবনই মানুষের শেষ নয়। বরং আখিরাতের জীবনও রয়েছে। মৃত্যুর পরপরই এ জীবনের শুরু। মানুষ সেখানে দুনিয়ার ভালো কাজের জন্য জান্নাত লাভ করবে এবং মন্দ কাজের জন্য জাহান্নাম পাবে। আখিরাতে অবিশ্বাস করলে মানুষ ইমানদার হতে পারে না। তাই আখিরাতে বিশ্বাস করা অপরিহার্য। আর এজন্যই মুত্তাকি আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।
নামাযের প্রতি রাজা মিয়ার মনোভাব ইসলামের দৃষ্টিতে কুফরির শামিল।
আমরা জানি, আল্লাহ তায়ালা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের কোনো একটির অবিশ্বাস করাকে কুফর বলে। যেমন- ইসলামের মৌলিক ও ফরজ ইবাদতগুলোকে অস্বীকার করা কুফর। নামায যেহেতু ইসলামের একটি মৌলিক ও ফরজ ইবাদত সেহেতু এটি অস্বীকার করা কুফরি।
উদ্দীপকটি পাঠ করে আমরা জানতে পারি যে, সমাজপতি রাজা মিয়া তার প্রকল্পে কর্মরত জনাব ফরিদ উদ্দিনকে নামায পড়তে নিষেধ করে বলেন, নামায আবার কিসের জন্য, কাজ কর তাহলেই সুখ পাবে। এজন্য রাজা মিয়ার মনোভাব ইসলামের দৃষ্টিতে কুফরির শামিল।
আখিরাতে বিশ্বাস ফরিদ উদ্দিনকে নামাযে দৃঢ় ও দায়িত্বশীল করে তুলেছে।
দুনিয়াতে যে ব্যক্তি ইমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে সে আখিরাতে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করবে। তাঁর আবাসস্থল হবে চিরশান্তির জান্নাত। অন্যদিকে যে ব্যক্তি ইমান আনবে না এবং অন্যায় ও খারাপ কাজ করবে সে আখিরাতে শাস্তি ভোগ করবে। সর্বোপরি আখিরাতে বিশ্বাস করলে মানবজীবন সুন্দর হয়। মানুষ উত্তম চরিত্রবান হিসেবে গড়ে ওঠে। আখিরাতে বিশ্বাস মানুষকে সবধরনের খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং সৎ ও দায়িত্বশীল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
ফরিদ উদ্দিন বিশ্বাস করে যে, দুনিয়া হলো আমল করার স্থান। আখিরাত হলো ফলভোগের স্থান। আখিরাতে মানুষ কোনো আমল করতে পারবে না। বরং দুনিয়াতে মানুষ যেরূপ আমল করেছে সেরূপ ফল ভোগ করবে।
সুতরাং বলা যায়, যে মূল বিশ্বাসের ফলে ফরিদ উদ্দিন নামাযে দৃঢ় ও দায়িত্বশীল, সেটি হলো আখিরাতে বিশ্বাস।
আসমাউল হুসনা' অর্থ সুন্দর নামসমূহ। আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামসমূহকেই 'আসমাউল হুসনা' বলা হয়।
আল্লাহ তায়ালা অতুলনীয়। তাঁর সত্তা যেমন অনাদি ও অনন্ত, তাঁর গুণাবলিও তেমনি অনাদি ও অনন্ত। আল্লাহ তায়ালা সকল গুণের অধিকারী। আল্লাহ তায়ালার এসব গুণ নানা শব্দে নানা উপাধিতে আখ্যায়িত করা হয়। এসব গুণের প্রত্যেকটির পৃথক পৃথক নাম রয়েছে। তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা, দয়াবান, ক্ষমাশীল, শান্তিদাতা ও পরাক্রমশালী। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান; তিনিই মালিক। এ প্রসঙ্গেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে এবং বলা হয়েছে "কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।"
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!