'নগররাষ্ট্র' একটি প্রাচীন ধারণা। আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে প্রাচীন গ্রিসে নগররাষ্ট্রের ধারণার উদ্ভব হয়। তখন গ্রিসে নগরকেন্দ্রিক ছোট ছোট যেসব রাষ্ট্র ছিল তাকে নগররাষ্ট্র বলা হতো। এসব নগররাষ্ট্র যারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করত তাদের ভোটাধিকার ছিল এবং তারাই নাগরিক হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের পরিক্রমায় নগররাষ্ট্র আজ জাতীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে প্রাচীন গ্রিসে নাগরিক ও নাগরিকতার ধারণার উদ্ভব হয়। বস্তুত গ্রিসে প্লেটো ও এরিস্টটলের হাত ধরেই নাগরিক ও নাগরিকতার বিকাশ শুরু হয়। তবে সময়ের পরিক্রমায় নাগরিকতার ধারণা আজ অনেক মানবিক হয়ে উঠেছে।
যে ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে, রাষ্ট্র প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালন করে তাকে ওই রাষ্ট্রের নাগরিক বলে। আমরা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। তাই আমরা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের নাগরিক।
আধুনিককালে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার, স্থায়ীভাবে বসবাস ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নাগরিকতা নির্ধারিত হয়। বর্তমানে নাগরিক হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কোনো পার্থক্য করা হয় না। একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সব ব্যক্তিই নাগরিক। তাই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে, স্থায়ীভাবে বসবাস ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নাগরিক হওয়া যায়।
যে ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে, রাষ্ট্রপ্রদত্ত অধিকার ভোগ করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালন করে তাকে নাগরিক বলে। আর নাগরিক হিসেবে ব্যক্তি যে মর্যাদা ও সম্মান পেয়ে থাকে তাকে নাগরিকতা বলে। বস্তুত নাগরিক হলো ব্যক্তির পরিচয় এবং নাগরিকতা হলো তার মর্যাদা।
আমরা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, শিক্ষা গ্রহণ, ভোটাধিকার প্রয়োগ, ব্যবসায় বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি এবং রাষ্ট্র আরোপিত কর, ট্যাক্স, খাজনা পরিশোধ করছি। তাই আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।
নাগরিক ও নাগরিকতাকে কেউ কেউ একই অর্থে ব্যবহার করে। আসলে এ দুটোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে। নাগরিক হলো ব্যক্তির পরিচয়, যেমন আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আর রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ব্যক্তি যে মর্যাদা ও সম্মান পেয়ে থাকে তাকে নাগরিকতা বলে। মূলত নাগরিক ব্যক্তির একটি শাব্দিক পরিচয় অন্যদিকে নাগরিকতা একটি দৃশ্যমান পরিচয়।
নাগরিকতা অর্জনের পদ্ধতি দুটি। যেমন- ক. জন্মসূত্র ও খ. অনুমোদন সূত্র। জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের ক্ষেত্রে দুটি নীতি অনুসরণ করা হয়। যথা- ১. জন্মনীতি ও ২. জন্মস্থান নীতি। আবার, অনুমোদন সূত্রে নাগরিকতা অর্জনের ক্ষেত্রে ৭টি শর্তের কথা উল্লেখ করা থাকলেও রাষ্ট্রভেদে এসব শর্ত ভিন্ন হতে পারে।
জন্মনীতি অনুযায়ী পিতামাতার নাগরিকতা দ্বারা সন্তানের নাগরিকতা নির্ধারিত হয়। এক্ষেত্রে শিশু যে দেশে বা যেখানেই জন্ম গ্রহণ করুক না কেন, পিতামাতার নাগরিকতা দ্বারা সন্তানের - নাগরিকতা নির্ধারিত হয়। যেমন- বাংলাদেশের কোনো দম্পতি যদি যুক্তরাজ্যে গিয়ে কোনো সন্তান জন্ম দেয় তাহলেও সে সন্তান জন্মনীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিকতা লাভ করবে। কেননা তার পিতামাতা বাংলাদেশের নাগরিক।
জন্মস্থান নীতি অনুসারে পিতা-মাতা যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেন, সন্তান যে রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করবে সে ঐ রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জন করবে। যেমন- কোনো বাংলাদেশি পিতা-মাতার সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে, সে সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করবে। মজার বিষয় হলো এক্ষেত্রে মা-বাবার সন্তান অন্য দেশের জাহাজে বা দূতাবাসে জন্মগ্রহণ করলেও জাহাজ বা দূতাবাস যে দেশের, সন্তান ওই দেশের নাগরিক হবে।
আমি জন্মনীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের নাগরিক। এ নীতি অনুযায়ী পিতা-মাতা যে দেশের নাগরিক তাদের সন্তানও সেই দেশের নাগরিকত্ব লাভ করে। আমার পিতা-মাতা যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিক তাই আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক।
জন্মনীতি অনুযায়ী শিশু কোথায়, কোন রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করল সেটি বিবেচ্য নয়। সন্তানের পিতামাতা যে দেশের নাগরিক সন্তানও সে দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করবে। অন্যদিকে, জন্মস্থান নীতি অনুযায়ী পিতা-মাতা যে দেশের নাগরিক হোক না কেন, সন্তান যে রাষ্ট্রে বা যে রাষ্ট্রের জাহাজ বা দূতাবাসে জন্মগ্রহণ করবে সে ওই রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জন করবে।
জন্মস্থান নীতি অনুসারে পিতামাতা যে দেশের নাগরিকই হোক না কেন সন্তান যে রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করবে সে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে। যেমন- বাংলাদেশের কোনো পিতামাতার সন্তান যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অথবা মার্কিন জাহাজে কিংবা মার্কিন দূতাবাসে ভূমিষ্ঠ হয় তবে সে সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বলে গণ্য হবে।
জন্মনীতির বাইরে কতকগুলো শর্ত পালনের মাধ্যমে এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জন করলে তাকে অনুমোদন সূত্রে নাগরিক বলা হয়। ব্যক্তি যদি কোনো রাষ্ট্রের আরোপিত শর্তের এক বা একাধিক শর্ত পূরণ করে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে এবং আবেদন ওই রাষ্ট্রের সরকার কর্তৃক গৃহীত হলে সে অনুমোদন সূত্রে নাগরিকে পরিণত হয়। এছাড়া মানবিক কারণেও অনেক রাষ্ট্র নাগরিকত্ব অনুমোদন করে থাকে।
অনুমোদন সূত্রে নাগরিকতা অর্জনের ৭টি শর্ত হলো- ১. সেই রাষ্ট্রের নাগরিককে বিয়ে করা, ২. সরকারি চাকরি করা; ৩. সততার পরিচয় দেওয়া ও ৪. সে রাষ্ট্রের ভাষা জানা, ৫. সম্পত্তি ক্রয় করা ৬. দীর্ঘদিন বসবাস করা, ৭. সেনাবাহিনীতে যোগদান করা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রের দুটি দিক অর্থাৎ জন্মনীতি ও জন্মস্থান নীতি অনুসরণ করা হয়। এ নীতি অনুযায়ী কোনো মার্কিন নাগরিকের শিশুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অন্যদিকে, অন্য কোনো দেশের পিতা-মাতার সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ সেই সন্তান জন্মস্থান নীতি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন নীতির ভিত্তিতেও নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।
যখন কোনো দেশের নাগরিক রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় কারণে নিজ দেশে নিরাপত্তাহীনতাবোধ করে অন্য দেশে আশ্রয় লাভের জন্য এবং আবেদন করে তখন মানবিক কারণে রাষ্ট্র আবেদনটি বিবেচনায় এনে নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ দেয়। বিশ্বে মানবিক কারণে নাগরিকতা লাভের অসংখ্য নজির আছে।
একজন ব্যক্তির একই সঙ্গে দুটি রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জনকে দ্বৈত নাগরিকতা বলে। জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের দুটি নীতি থাকায় এবং দেশভেদে নাগরিকতা অর্জনের পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকতা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন বাংলাদেশের কোনো পিতা-মাতার সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে জন্মনীতি অনুসারে শিশুটি বাংলাদেশের নাগরিক। আবার জন্মস্থান নীতি অনুসারে সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের দুটি নীতি থাকায় দ্বৈত নাগরিকতার সৃষ্টি হয়। যেমন- বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের সন্তান আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করলে জন্মনীতি অনুযায়ী শিশুটি বাংলাদেশের নাগরিক আবার জন্মস্থান নীতি অনুযায়ী সে আমেরিকার নাগরিক। এভাবে দ্বৈত নাগরিকতা সৃষ্টি হয়।
আমাদের মধ্যে যে বুদ্ধিমান, যে ন্যায়-অন্যায়, সৎ-অসৎ বুঝতে পারে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে, আর যে পরমত সহিষ্ণু, আত্মসংযমী এবং দেশ ও জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে সে নাগরিককেই সুনাগরিক বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে একজন সুনাগরিক পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতি তার দায়িত্বশীলতা ও অধিকারসমূহ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন থাকে।
সুনাগরিকের দুটি গুণ হলো-
১. বুদ্ধি: বুদ্ধি নাগরিকের অন্যতম গুণ। এর মাধ্যমে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
২. বিবেক: বিবেক হলো নাগরিকের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এর মাধ্যমে নাগরিকগণ ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বুঝে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আত্মসংযম নাগরিকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। আত্মসংযমী নাগরিক নিজেকে সকল প্রকার লোভ-লালসার উর্ধ্বে রেখে সততার সাথে নিজের সকল প্রকার দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ সমাজের বৃহত্তম স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করার নাম আত্মসংযম। আত্মসংযমী-নাগরিকগণ অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। ফলে সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সুবাতাস বইতে থাকে।
রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সুনাগরিক নয়। আমাদের মধ্যে যিনি বুদ্ধির মাধ্যমে সহজে সকল সমস্যার সমাধান করতে পারে, যিনি বিবেক বিবেচনার মাধ্যমে ন্যায়-অন্যায়, সৎ-অসৎ বুঝতে পারে এবং অসৎ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখে এবং আত্মসংযমের মাধ্যমে বৃহৎ স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে তিনিই সুনাগরিকে পরিণত হন।
নাগরিক ও সুনাগরিকের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো জন্মের পর পরই যেকোনো শিশু সাংবিধানিক বা আইনী ক্ষমতাবলে নাগরিক হয়। পক্ষান্তরে, ওই নাগরিককেই ধীরে ধীরে সুনাগরিক হয়ে উঠতে হয়। তাই বলা যায়, সব ব্যক্তিই কোনো না কোনোভাবে নাগরিক কিন্তু সব - ব্যক্তিই সুনাগরিক নয়। সুনাগরিক রাষ্ট্রের সম্পদ।
সুনাগরিক রাষ্ট্রের সম্পদ। সুনাগরিক বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম নামক মহৎ গুণে গুণান্বিত। ফলে একজন নাগরিক সৎ-অসৎ এর মধ্যে যেমন পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে তেমনি তার বিবেক দ্বারা কোনটি তার করণীয়, কোনটি বর্জনীয় তা ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারে। সুনাগরিক নিজের স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়। ফলে দেশ ও জাতি পৌঁছে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। এভাবে একজন সুনাগরিক রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হয়।
বুদ্ধিমান নাগরিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বুদ্ধিমান নাগরিক পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুমুখী সমস্যা চিহ্নিত করে সহজে সমাধান করতে পারে। নাগরিকের বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সফলতা। তাই বুদ্ধিমান নাগরিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
অধিকার হলো সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত কতকগুলো সুযোগ-সুবিধা, যা ভোগের মাধ্যমে নাগরিকের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। অধিকারের মূল লক্ষ্য ব্যক্তির সর্বজনীন কল্যাণ সাধন। রাষ্ট্রের নাগরিকদের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অধিকার অপরিহার্য।
মানুষের বিবেক এবং সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে উদ্ভূত অধিকারকে নৈতিক অধিকার বলে। যেমন- দুর্বলের সাহায্য লাভের অধিকার নৈতিক অধিকার। এটি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণয়ন করা হয় না যার ফলে এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তাছাড়া নৈতিক অধিকার ভঙ্গকারীকে কোনো শাস্তি দেওয়া যায় না। তবে সুস্থ-সুন্দর সমাজ গঠনে এ অধিকারের গুরুত্ব অধিক।
যেসব অধিকার রাষ্ট্রের আইন কর্তৃক স্বীকৃত ও অনুমোদিত সেগুলোকে আইনগত অধিকার বলে। যেমন- মত প্রকাশের অধিকার, নির্বাচনে ভোটাধিকার, ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকার ইত্যাদি।
আইনগত অধিকারকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১. সামাজিক অধিকার: জীবন রক্ষার, চলাফেরার, মত প্রকাশের, সম্পত্তি লাভের ও ধর্মচর্চার অধিকার।
২. রাজনৈতিক অধিকার: নির্বাচনে ভোটাধিকার, নির্বাচিত হওয়া, সরকারি চাকরি লাভের অধিকার।
৩. অর্থনৈতিক অধিকার: যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার, ন্যায্য মজুরি লাভের, অবকাশ লাভের অধিকার।
সমাজে সুখ-শান্তিতে বসবাস করার জন্য আমরা যে সকল অধিকার ভোগ করি তাকে সামাজিক অধিকার বলে। স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও মত প্রকাশের অধিকার একটি সামাজিক অধিকার।
যেসব অধিকার ভোগের বিনিময়ে নাগরিকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় তাকে রাজনৈতিক অধিকার বলে। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, নির্বাচনে ভোটাধিকার রাজনৈতিক অধিকারের উদাহরণ।
জীবনধারণ করা এবং জীবনকে উন্নত ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রপ্রদত্ত অধিকারকে অর্থনৈতিক অধিকার বলে। যেমন-যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার অধিকার, ন্যায্য মজুরি লাভের অধিকার, অবকাশ লাভের অধিকার, শ্রমিক সংঘ গঠনের অধিকার ইত্যাদি।
নৈতিক অধিকার মানুষের বিবেক এবং সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে আসে। যেমন- দুর্বলের সাহায্য লাভের অধিকার একটি নৈতিক অধিকার। তবে নৈতিক অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণয়ন করা হয় না। তাছাড়া এ অধিকার ভঙ্গকারীকে কোনো প্রকার শাস্তি প্রদানেরও বিধান নেই। আর সেজন্যই নৈতিক অধিকারের আইনগত ভিত্তি নেই।
'তথ্য অধিকার আইন' অর্থ কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে তথ্য প্রাপ্তির অধিকার বাস্তবায়ন সম্পর্কিত আইন। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন একটি যুগান্তকারী আইন। ৫ এপ্রিল, ২০০৯ তারিখে এ আইনটি পাসের ফলে জনগণ তা জেনে নিজেদের অধিকার যেমন ভোগ করতে পারবে, তেমনি সেসব প্রতিষ্ঠানের কাজের ওপর নজরদারি স্থাপন করে তাদের কাজকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও সত্যনিষ্ঠ করে তুলতে পারবে। জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩০ মার্চ ২০০৯ তারিখে তথ্য অধিকার আইন বিল জাতীয় সংসদে পাশ হয়। এরপর ৫ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে তথ্য অধিকার আইন রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনের ফলে তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেকোনো ব্যক্তির নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। রাষ্ট্রের তথ্য ভাণ্ডার হালনাগাদ থাকে। তথ্যের অবাধ প্রবাহের ফলে জনগণ ও সরকারের মধ্যে সন্দেহ দূর হয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি করে।
অধিকার ভোগ করতে গিয়ে নাগরিকরা যেসব দায়িত্ব পালন করে তাকে নাগরিক কর্তব্য বলে। কর্তব্য পালন ব্যতীত অধিকার ভোগ করা প্রত্যাশিত নয়। রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা, সততার সাথে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা, নিয়মিত কর প্রদান করা, আইন মান্য করা এবং রাষ্ট্রপ্রদত্ত অন্যান্য দায়িত্ব পালন নাগরিকের কর্তব্য।
নাগরিকের কর্তব্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. নৈতিক কর্তব্য: যে কর্তব্য মানুষের বিবেক এবং ন্যায়বোধ থেকে আসে তাকে নৈতিক কর্তব্য বলে। যেমন- নিজে শিক্ষিত হওয়া, সন্তানদের শিক্ষিত করা; সততার সাথে ভোটদান ইত্যাদি।
২. আইনগত কর্তব্য রাষ্ট্রের আইন দ্বারা আরোপিত কর্তব্যকে আইনগত কর্তব্য বলে। যেমন- রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, আইন মান্য ও কর প্রদান করা ইত্যাদি।
নৈতিক কর্তব্য মানুষের বিবেক ও ন্যায়বোধ থেকে আসে। যেমন- নিজে শিক্ষিত হওয়া ও সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলা। সাহস ও সততার সাথে ভোটদান, বিশ্বমানবতায় এগিয়ে আসা। এসব কর্তব্য রাষ্ট্রের আইন দ্বারা আরোপিত নয়। তাই এই কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে শাস্তি দেওয়া যায় না। তবে সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ়করণ, পারস্পরিক সুখ-শান্তি নিশ্চিত করতে নৈতিক কর্তব্য বিশেষ ভূমিকা রাখে।
কয়েকটি নৈতিক কর্তব্য হচ্ছে-
ক. নিজে শিক্ষিত হওয়া,
খ. সন্তানদের শিক্ষিত করা,
গ. সততার সাথে ভোটদান করা,
ঘ. রাষ্ট্রের সেবা করা এবং
ঙ. বিশ্বমানবতার সাহায্যে এগিয়ে আসা ইত্যাদি।
রাষ্ট্রের আইন দ্বারা আরোপিত কর্তব্যকে আইনগত কর্তব্য বলে। নাগরিকদের আইনগত কর্তব্য অবশ্যই পালন করতে হয়। এ কর্তব্য পালনে ব্যর্থ শাস্তি পেতে হয়। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, আইন মান্য ও কর প্রদান করা নাগরিকের আইনগত কর্তব্য। আইনগত কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করলে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে গভীর মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, রাষ্ট্রীয় মূলনীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ইত্যাদি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ। অন্যভাবে বলা যায়, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, সংহতি ও সমৃদ্ধি লাভের জন্য প্রয়োজনবোধে নিজের জীবন উৎসর্গ করার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন।
আইন হলো সমাজস্বীকৃত ও রাষ্ট্র অনুমোদিত নিয়মকানুন, যা 'মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর দেশের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে আইনবিরোধী কাজ করলে সমাজ ও জীবন হয়ে ওঠে অরাজকতাপূর্ণ। নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করে। সুতরাং নাগরিকদের আইন মান্য করা কর্তব্য।
অধিকার ও কর্তব্য পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। কোনো নাগরিক তার অধিকার দাবি করলে অবশ্যই কর্তব্য পালন করতে হবে। কর্তব্য পালন ব্যতীত কখনো অধিকার নিশ্চিত করা যায় না। নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া অধিকার কিন্তু নাগরিকগণ যদি কর পরিশোধ না করে তবে কোনোভাবেই তা নিশ্চিত করা যায় না। কেননা কর বা ট্যাক্সের অর্থেই কেবল স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায়। তাই বলা যায়, -অধিকার ও কর্তব্য যেন একই বৃন্তের দুটি ফুল।
প্রাচীন গ্রিসে ছোট ছোট অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নগররাষ্ট্র বলে।
প্রাচীন গ্রিসে ছোট ছোট অঞ্চল নিয়ে নগররাষ্ট্র গড়ে উঠত।
যে ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রে স্থায়িভাবে বসবাস করে, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে, রাষ্ট্রপ্রদত্ত অধিকার ভোগ করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালন করে তাকে নাগরিক বলে।
রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ব্যক্তি যে মর্যাদা ও সম্মান পেয়ে থাকে তাকে নাগরিকতা বলে।
নাগরিকের মর্যাদা হলো নাগরিকতা।
নাগরিকতা অর্জনের দুটি পদ্ধতি রয়েছে। যথা- ১. জন্মসূত্র ও ২. অনুমোদন সূত্র।
জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের ক্ষেত্রে দুটি নীতি অনুসরণ করা হয়।
যে নীতি অনুযায়ী পিতা-মাতার নাগরিকতা দ্বারা সন্তানের নাগরিকতা নির্ধারিত হয় সে নীতিকেই জন্মনীতি বলে।
কানাডায় জন্মস্থান নীতির ভিত্তিতে নাগরিকতা অর্জিত হয়।
কতকগুলো শর্ত পালনের মাধ্যমে এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জন করলে তাকে অনুমোদন সূত্রে নাগরিকতা বলা হয়।
নাগরিকতা অর্জনে দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো অনুমোদন সূত্র। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অনুমোদন সাপেক্ষে নাগরিকতা লাভ করা।
একজন ব্যক্তির একই সঙ্গে দুটি রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জনকে দ্বৈত নাগরিকতা বলে।
বাংলাদেশ নাগরিকতা নির্ধারণে জন্মনীতি অনুসরণ করে।
নাগরিকতা নির্ধারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জন্মনীতি ও জন্মস্থান উভয় নীতি অনুসরণ করে।
যে নাগরিকের মধ্যে বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম এই তিনটি - গুণ বিদ্যমান থাকে তাকে সুনাগরিক বলে।
সুনাগরিকের গুণ ৩টি।
নাগরিকের অন্যতম গুণ হলো বুদ্ধি। বুদ্ধিমান নাগরিক পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুমুখী সমস্যা চিহ্নিত করে এবং সমাধানের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।
বুদ্ধিমান নাগরিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিবেকবোধসম্পন্ন হতে হবে।
সুনাগরিকের শ্রেষ্ঠ গুণ হলো আত্মসংযম।
অধিকার হলো সমাজ ও রাষ্ট্রকর্তৃক স্বীকৃত কতকগুলো সুযোগ-সুবিধা, যা ভোগের মাধ্যমে নাগরিকের ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয়।
অধিকারের মূল লক্ষ্য ব্যক্তির সর্বজনীন কল্যাণ সাধন।
অধিকার প্রধানত দুই প্রকার। যথা- নৈতিক অধিকার ও আইনগত অধিকার।
যে অধিকার মানুষের বিবেক ও সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ হতে উৎসারিত এবং যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই তাকেই নৈতিক অধিকার বলে।
যেসব অধিকার রাষ্ট্রের আইন কর্তৃক স্বীকৃত ও অনুমোদিত সেগুলোকে আইনগত অধিকার বলে।
নাগরিক জীবনের বিকাশ এবং ব্যক্তিত্বের উৎকর্ষের জন্য রাষ্ট্রকে যে সকল অধিকার সংরক্ষণ করতে হয় তাকে সামাজিক অধিকার বলে।
জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য জাতীয় সংসদে ৩০ মার্চ ২০০৯ তারিখে তথ্য অধিকার সংক্রান্ত একটি বিল অনুমোদন করে।
জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালে যে আইনটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে তাই তথ্য অধিকার আইন।
তথ্য অধিকার আইনটি ২০০৯ সালের ৫ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে।
'তথ্য' হচ্ছে কোনো কর্তৃপক্ষের গঠন, কাঠামো ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত যেকোনো স্মারক, বই, নকশা, দলিল, ফিল্ম, ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত যেকোনো ইনস্ট্রুমেন্ট, যান্ত্রিকভাবে পাঠযোগ্য দলিলাদি এবং ভৌতিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য নির্বিশেষে অন্য যেকোনো তথ্যবহুল বস্তু বা এর প্রতিলিপি।
'তথ্য অধিকার' অর্থ কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে তথ্য প্রাপ্তির অধিকার।
আইনের বিধান সাপেক্ষে কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারই হলো তথ্য অধিকার।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুরোধপ্রাপ্তির তারিখ থেকে অনধিক ২০ কার্য দিবসের মধ্যে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহ করবেন।
রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার ভোগের বিনিময়ে নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করাকে কর্তব্য বলে।
নাগরিকের কর্তব্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. নৈতিক কর্তব্য ও ২. আইনগত কর্তব্য।
নাগরিকগণ তাদের বিবেক এবং সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে যেসব কর্তব্য পালন করে তাকে নৈতিক কর্তব্য বলে।
রাষ্ট্রের আইন দ্বারা আরোপিত কর্তব্যই আইনগত কর্তব্য।
নৈতিক কর্তব্য মানুষের বিবেক এবং সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে আসে।
রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, আইন মান্য ও কর প্রদান করা ইত্যাদি আইনগত কর্তব্য।
আইনগত কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে শাস্তি পেতে হয়।
নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন করা হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সরকার নাগরিকদের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আরোপ করে।
অধিকার ভোগ করতে হলে কর্তব্য পালন করতে হয়।
অধিকার ভোগের মধ্যে কর্তব্য নিহিত থাকে?
একজনের অধিকার বলতে অন্যজনের কর্তব্য নির্দেশ করে?
আমরা রাষ্ট্রপ্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করি।
অধিকার ও কর্তব্য সমাজবোধ থেকে উৎপত্তি লাভ করে।
সুনাগরিক রাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কেননা, সুনাগরিক মাত্রই বুদ্ধিদীপ্ত, বিবেকবান ও আত্মসংযমী। বুদ্ধিমান নাগরিকরা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও বাহ্যিক প্রতিটি সমস্যার উপর্যুক্ত সমাধান করে থাকে। বিবেকবান হওয়ায় নাগরিক অন্যায় থেকে বিরত থেকে সব কর্তব্য পালন করে। অন্যদিকে, আত্মসংযমী হওয়ায় সুনাগরিক দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব প্রভৃতির ঊর্ধ্বে থেকে বৃহৎ স্বার্থে সজাগ থাকে। আর এভাবেই সুনাগরিক সমাজকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে বলেই সুনাগরিক হলো রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
নাগরিক এবং নাগরিকতা একই অর্থে ব্যবহার করা যায় না। কারণ নাগরিক ও নাগরিকতার উৎস অভিন্ন হলেও এদের অর্থগত পার্থক্য রয়েছে। নাগরিক ও নাগরিকতাকে কেউ কেউ একই অর্থে ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ঠিক নয়। নাগরিক হলো ব্যক্তির পরিচয়। যেমন আমাদের পরিচয় আমরা বাংলাদেশে নাগরিক। আর রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ব্যক্তি যে মর্যাদা ও সম্মান পেয়ে থাকে তাকে নাগরিকতা বলে।
নাগরিকতা অর্জনে বাংলাদেশ জন্মনীতি' অনুসরণ করে। এ নীতি অনুযায়ী পিতা-মাতার নাগরিকতা দ্বারা সন্তানের নাগরিকতা নির্ধারিত হয়। এ ক্ষেত্রে শিশু যে দেশে বা যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, পিতা-মাতার নাগরিকতা দ্বারা সন্তানের নাগরিকতা নির্ধারিত হয়। যেমন- বাংলাদেশের কোনো এক দম্পতি যুক্তরাজ্যে গিয়ে একটি সন্তান জন্ম দান করলেন। এ নীতি অনুসারে ওই সন্তান বাংলাদেশের নাগরিকতা লাভ করবে। কারণ তার পিতা-মাতা বাংলাদেশের নাগরিক।
নাগরিকতা নির্ধারণের একটি পদ্ধতি হলো জন্মস্থান নীতি। এ নীতি অনুযায়ী পিতামাতা যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেন, সন্তান যে রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করে সে ওই রাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করবে। যেমন- কোনো বাংলাদেশি পিতা-মাতার সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে, সেই সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করবে। এক্ষেত্রে নাগরিকতা নির্ধারণে রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমেরিকা, কানাডাসহ অল্প কয়েকটি দেশ এ নীতির মাধ্যমে নাগরিকতা নির্ধারণ করে।
কোনো ব্যক্তির একই সাথে দুটি রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়াকে দ্বৈত নাগরিকতা বলে। জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের দুটি নীতি থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকতা সৃষ্টি হয়। যেমন-বাংলাদেশে নাগরিকতা নির্ধারণে জন্মনীতি অনুসরণ করে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জন্মনীতি ও জন্মস্থান উভয় নীতি অনুসরণ করে। কাজেই বাংলাদেশি পিতামাতার সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে সে জন্মস্থান নীতি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। আবার জন্মনীতি অনুযায়ী সে বাংলাদেশেরও নাগরিক।
রাষ্ট্রে বসবাসকারী যে ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রদত্ত নাগরিক অধিকার ভোগ করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালন করে তাকে নাগরিক বলে। অপরদিকে, নাগরিকদের মধ্যে যে নাগরিক বুদ্ধিমান, সকল সমস্যা অতি সহজে সমাধান করে, যার বিবেক আছে সে ন্যায়-অন্যায়, সৎ-অসৎ বুঝতে পারে, যে আত্মসংযমী অর্থাৎ বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে তাকে সুনাগরিক বলে। এ গুণগুলো না থাকলেও একজন নাগরিক হতে পারে, কিন্তু নাগরিককে সুনাগরিক হতে হলে অবশ্যই এ গুণগুলো থাকতে হবে। তাই বলা যায়, সকল সুনাগরিকই নাগরিক কিন্তু সকল নাগরিক সুনাগরিক নয়।
বুদ্ধিমান নাগরিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কারণ বুদ্ধি নাগরিককে সুনাগরিকে পরিণত করে। বুদ্ধি সুনাগরিকের অন্যতম গুণ। বুদ্ধিমান নাগরিক পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুমুখী সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। সুনাগরিকের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সফলতা। তাই বুদ্ধিমান নাগরিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রতিটি রাষ্ট্রের উচিত নাগরিকদের যথাযথ শিক্ষাদানের মাধ্যমে বুদ্ধিমান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
বুদ্ধি সুনাগরিকের অন্যতম গুণ। বুদ্ধিমান নাগরিক পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুমুখী সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। সুনাগরিকের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সফলতা। তাই বুদ্ধিমান নাগরিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এ কারণে সুনাগরিক হওয়ার জন্য বুদ্ধির প্রয়োজন হয়।
বিবেক সুনাগরিকের বিশেষ গুণ। বিবেকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সুনাগরিক সর্বদা দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে থাকে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে জাগ্রতশক্তি হিসেবে বিবেকসম্পন্ন মানুষ সোচ্চার থাকে। অনাচার, অন্যায় ও দুঃশাসন হতে দেশকে বাঁচাতে হলে বিবেকসম্পন্ন শাসকের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু দেশ যদি বিবেকসম্পন্ন সুনাগরিকের অধিকারী না হয় তাহলে বিবেকসম্পন্ন শাসক পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিবেকসম্পন্ন সুনাগরিক সৃষ্টি করা।
সুনাগরিকের অন্যতম গুণ হচ্ছে আত্মসংযম। আত্মসংযম-এর অর্থ নিজেকে সকল প্রকার লোড-লালসার ঊর্ধ্বে রেখে সৎ ও নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করার নাম আত্মসংযম। আত্মসংযমী ব্যক্তি স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং অন্যের মতামত প্রকাশেও নিজেকে সংযত রাখেন। তাছাড়া আত্মসংযমকারী নাগরিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের উর্ধ্বে থাকেন।
অধিকার হলো সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত কতকগুলো সুযোগ-সুবিধা যা ভোগের মাধ্যমে নাগরিকের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। অধিকার ব্যতীত মানুষ তার ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারেন না। অধিকারের মূল লক্ষ্য ব্যক্তির সর্বজনীন কল্যাণ সাধন করা। নাগরিকের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অধিকার গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের বিবেক এবং সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে উদ্ভূত অধিকারকে নৈতিক অধিকার বলে। যেমন- ভিক্ষুকের ভিক্ষা পাবার অধিকার বা দুর্বলের সাহায্য লাভের অধিকার। নৈতিক অধিকার রাষ্ট্রের শক্তি দ্বারা প্রবর্তিত হয় না। এ অধিকার ভঙ্গ হলে অধিকার ভঙ্গকারীকে কোনোরূপ শাস্তি দেওয়া হয় না। সমাজকর্তৃক ব্যক্তির কাজের সমালোচনা করাই তার শাস্তি। নৈতিক অধিকার বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। বিভিন্ন ব্যক্তির নিকটও তা ভিন্ন।
নৈতিক অধিকারের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই বলে নৈতিক অধিকার ভঙ্গকারীকে শাস্তি দেওয়া যায় না। মানুষের বিবেক এবং সামাজিক নৈতিকতা বা ন্যায়বোধ থেকে উদ্ভূত অধিকারকে নৈতিক অধিকার বলে। নৈতিক অধিকার বলতে আমরা সেসব অধিকারকে বুঝি যা সমাজের নৈতিকতাবোধ বা ন্যায়বোধ থেকে উদ্ভূত। যেমন-ভিক্ষুকের ভিক্ষা পাবার অধিকার বা দুর্বলের সাহায্য লাভের অধিকার। নৈতিক অধিকার রাষ্ট্রের আইন দ্বারা প্রবর্তিত হয় না। এজন্য এ অধিকার ভঙ্গ হলে অধিকার ভঙ্গকারীকে কোনোরূপ শাস্তি দেওয়া হয় না।
জনগণের অধিকার রক্ষায় তথ্য অধিকার আইন একটি যুগান্তকারী আইন। তথ্য অধিকার আইন অর্থ কোনো কর্তৃপক্ষ থেকে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার বাস্তবায়ন সম্পর্কিত আইন। ৫ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে এই আইনটি চালু হওয়ার পূর্বে যেসব তথ্য গোপন ছিল, জনগণ তা জেনে নিজেদের অধিকার যেমন ভোগ করতে পারবে, তেমনি সেসব প্রতিষ্ঠানের কাজের ওপর নজরদারি স্থাপন করে তাদের কাজকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও সত্যনিষ্ঠ করে তুলতে পারবে। তাই বলা যায়, জনগণের অধিকার রক্ষায় তথ্য অধিকার আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন একটি যুগান্তকারী আইন। তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য ৫ এপ্রিল, ২০০৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে এবং এ আইনটি সর্বসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হয়। এ আইনটি চালু হওয়ার পূর্বে যেসব তথ্য গোপন ছিল, এখন জনগণ তা জেনে নিজেদের অধিকার যেমন ভোগ করতে পারবে, তেমনি সেসব প্রতিষ্ঠানের কাজের ওপর নজরদারি স্থাপন করা দরকার তাদের কাজকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও সত্যনিষ্ঠ করে তোলা সম্ভব হবে। জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতএব একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, তথ্য অধিকার আইন ব্যতীত জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা কল্পনা করা যায় না।
রাষ্ট্রপ্রদত্ত অধিকার ভোগের বিনিময়ে নাগরিক যে দায়িত্ব পালন করে তাকে নাগরিকের কর্তব্য বলে। কর্তব্য বলতে করণীয় কাজ বোঝায়। নাগরিকের যেমন অধিকার আছে তেমনি রাষ্ট্রের জন্য কিছু কর্তব্যও রয়েছে। কর্তব্য পালন না করে অধিকার ভোগ করা যায় না। একজন নাগরিক রাষ্ট্রের নিকট হতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বা অধিকার পেয়ে থাকে। তাই রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা, নিয়মিত কর প্রদান করা, আইন মান্য করা এবং রাষ্ট্রপ্রদত্ত অন্যান্য দায়িত্ব পালন নাগরিকদের কর্তব্য। অধিকার ভোগ করতে যেয়ে নাগরিকরা যেসব দায়িত্ব পালন করে, তাকে কর্তব্য বলে।
প্রতিটি রাষ্ট্রেই নাগরিকদের যেমন কিছু অধিকার থাকে তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের কিছু কর্তব্যও থাকে। কর্তব্য পালন ব্যতীত অধিকার ভোগ অপ্রত্যাশিত বিষয়। রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা আরোপিত কর্তব্যকে আইনগত কর্তব্য বলে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, আইন মান্য করা, কর প্রদান করা ইত্যাদি নাগরিকের আইনগত কর্তব্য। নাগরিকগণ এসব আইনগত কর্তব্য এড়াতে পারে না। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, সংহতি ও সমৃদ্ধি লাভের জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন উৎসর্গ করার অর্থ হলো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, রাষ্ট্রীয় মূলনীতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন হলো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ। আর এ জাতীয় কর্তব্য আইন দ্বারা সিদ্ধ। তাই বলা যায়, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন হচ্ছে আইনগত কর্তব্য।
আমাদের জীবন, সম্পত্তি, স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হচ্ছে আইন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আইনের অবর্তমানে সমাজ ও জীবন হয়ে ওঠে অরাজকতাপূর্ণ। আইনবিহীন সমাজ, রাষ্ট্র ও নাগরিক জীবন কিছুই কল্পনা করা যায় না। নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করে। এসব. কারণে নাগরিকদের আইন মান্য করা কর্তব্য।
শাস্তির ভয়ে নাগরিককে আইন মানতে হয়। আইন হচ্ছে সমাজস্বীকৃত এবং রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত নিয়মকানুন যা মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আইনবিরোধী কোনো কাজের জন্য শাস্তি পেতে হয়। আর শাস্তির ভয়েই মানুষ আইনবিরোধী কোনো কাজ এবং অপরাধ থেকে বিরত থাকে। এছাড়া রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতেও নাগরিককে আইন মেনে চলতে হয়।
রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো সার্বভৌমত্ব অটুট রেখে নাগরিক জীবনের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। কর হচ্ছে সেই অর্থের যোগান। যেহেতু করের বিনিময়ে নাগরিক রাষ্ট্রীয় সুযোগ ভোগ করে, তাই অধিকার ভোগের জন্য নিয়মিত কর প্রদান করতে হয়।
রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো সার্বভৌমত্ব অটুট রেখে নাগরিক জীবনের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। কর হচ্ছে সেই অর্থের যোগান। যেহেতু করের বিনিময়ে নাগরিক রাষ্ট্রীয় সুযোগ ভোগ করে, তাই অধিকার ভোগের পাশাপাশি নিয়মিত কর প্রদান করা নাগরিকের কর্তব্য।
অধিকার ও কর্তব্য উভয়ের উৎপত্তি মানুষের সমাজবোধ থেকে। আমরা সমাজকর্তৃক স্বীকৃত কিছু অধিকার ভোগ করি। এ অধিকার ভোগের বিনিময়ে আমরা সমাজের কল্যাণের জন্য কিছু কর্তব্য পালন করি। সমাজের বাইরে অধিকার ও কর্তব্যের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। অধিকারের সৃষ্টি হয় সামাজিক কল্যাণবোধের চেতনা থেকে।
প্রত্যেক ব্যক্তিকে কোনো (রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক) অধিকার ভোগ করতে গিয়ে তাকে যথাযথ কর্তব্য পালন করতে হয়। পক্ষান্তরে, কর্তব্য পালন করতে গিয়ে অধিকার ফিরে আসে। তাই বলা যায়, অধিকার ও কর্তব্য একে অপরের পরিপূরক এবং ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত।
অধিকার ও কর্তব্য উভয়ের উৎপত্তি মানুষের সমাজবোধ থেকে। আমরা সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত কিছু অধিকার ভোগ করি। এ অধিকার ভোগের বিনিময়ে আমরা সমাজের কল্যাণের জন্য কিছু কর্তব্য পালন করি। সমাজের বাইরে অধিকার ও কর্তব্যের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। অধিকারের সৃষ্টি হয় সামাজিক কল্যাণবোধের চেতনা থেকে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে কোনো (রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক) অধিকার ভোগ করতে গিয়ে তাকে যথাযথ কর্তব্য পালন করতে হয়। পক্ষান্তরে কর্তব্য পালন করতে গিয়ে অধিকার ফিরে আসে। তাই বলা যায়, অধিকার ও কর্তব্য একে অপরের পরিপূরক।
অধিকার ভোগ করতে হলে কর্তব্য পালন করতে হয়। অধিকার ও কর্তব্য শব্দ দুটি ভিন্ন হলেও এদের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভোটদান নাগরিকের অধিকার, আর ভোটাধিকার প্রয়োগ নাগরিকের কর্তব্য। একটি ভোগ করলে অন্যটি পালন করতে হয়। অধিকার ভোগের মধ্যে কর্তব্য নিহিত থাকে।
আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে আমরা প্রত্যেকে কিছু অধিকার ভোগ এবং কর্তব্য পালন করি। আবার কতগুলো গুণের অধিকারী হয়ে আমরা সুনাগরিকে পরিণত হতে পারি । সুনাগরিক রাষ্ট্রের সম্পদ । আমাদের প্রত্যেকের সুনাগরিকতার শিক্ষা লাভ করা অত্যাবশ্যক । এ অধ্যায়ে নাগরিক ও নাগরিকতার ধারণা, নাগরিকতা অর্জনের উপায়, দ্বৈত নাগরিকতা, সুনাগরিকের ধারণা ও বৈশিষ্ট্য, নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে । এ অধ্যায় পড়া শেষে আমরা-
♦ নাগরিক ও নাগরিকতার ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব
♦ নাগরিকতা অর্জনের উপায় বর্ণনা করতে পারব
♦ দ্বৈত নাগরিকতা ব্যাখ্যা করতে পারব
♦ সুনাগরিকতার ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব
♦ নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের ধারণা বর্ণনা করতে পারব
♦ নাগরিক অধিকার ও কর্তব্যের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারব
♦ নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আগ্রহী হব ।
Related Question
View Allপ্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে প্রাচীন গ্রিসে নাগরিক ধারণার উদ্ভব হয়।
একজন ব্যক্তির একই সঙ্গে দুটি রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জনকে দ্বৈত নাগরিকতা বলে। সাধারণত একজন ব্যক্তি একটি রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জনের সুযোগ পায়।
তবে জন্মসূত্রসহ নাগরিকতা অর্জনের একাধিক নীতি থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকতা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন- বাংলাদেশ নাগরিকতা নির্ধারণে জন্মনীতি অনুসরণ করে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জন্ম ও জন্মস্থান উভয় নীতি অনুসরণ করে। কাজেই বাংলাদেশি কোনো পিতা-মাতার সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে জন্মস্থান নীতি অনুযায়ী সে ঐ রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করবে। আবার জন্মনীতি অনুযায়ী সে বাংলাদেশের নাগরিকতাও অর্জন করবে। বিনিয়োগ, অভিবাসন ইত্যাদি উপায়ে অনুমোদনসূত্রেও এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকতা অর্জন করতে পারে। এভাবে দ্বৈত নাগরিকতার সৃষ্টি হয়।
উদ্দীপকে উল্লিখিত 'ক' ইউনিয়নের নাগরিকদের মধ্যে নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য পালনের বিষয়টি লক্ষ করা যায়।'
অধিকার ভোগ করতে হলে রাষ্ট্রের নাগরিকদের যেসব দায়িত্ব পালন করতে হয় সেগুলোই কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত। নাগরিকের কর্তব্য প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। যথা- নৈতিক ও আইনগত কর্তব্য। ব্যক্তির বিবেক এবং সামাজিক নৈতিকতা বোধ থেকে যে কর্তব্য জন্ম নেয় এবং যা নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে, তাকে নৈতিক কর্তব্য বলে। যেমন: নিজে শিক্ষিত হওয়া এবং সন্তানদের শিক্ষিত করা, সততার সাথে ভোট দেওয়া, রাষ্ট্রের সেবা করা, বিশ্বমানবতার সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
উদ্দীপকের 'ক' ইউনিয়নের নাগরিকরা নৈতিক কর্তব্য পালন করেছেন। কেননা তারা ইউনিয়নের নির্বাচনে 'X' ও 'Y' ব্যক্তির মধ্য থেকে 'X' ব্যক্তিকে সৎ ও যোগ্য বলে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছেন। তাদের এই কাজের সাথে নাগরিকের অন্যতম নৈতিক কর্তব্য সততার সাথে ভোট দেওয়ার সাদৃশ্য রয়েছে। সুতরাং বলা যায়, 'ক' ইউনিয়নের নাগরিকদের মধ্যে নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য পালনের প্রতিফলন ঘটেছে।
উদ্দীপকের 'ক' ইউনিয়নের চেয়ারম্যান 'X' ব্যক্তি যে সততা ও কর্তব্যপরায়ণতা দেখিয়েছেন তার আলোকে তাকে সুনাগরিক বলা যুক্তিসঙ্গত।
রাষ্ট্রের সব নাগরিককে সুনাগরিক বলা যায় না। এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট গুণের অধিকারী হতে হয়। ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ লর্ড ব্রাইস (Lord James Bryce) 'The Hindrances to Good Citizenship' (১৯০৯) গ্রন্থে সুনাগরিকের তিনটি মৌলিক গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা: বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম। খ্যাতিমান এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, একজন ব্যক্তিকে সুনাগরিক হতে হলে এ তিনটি গুণের অধিকারী হতে হবে। একজন নাগরিক বুদ্ধিমান, বিবেকবান ও সংযমী হলেই কেবল রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে এর উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।
উদ্দীপকের 'ক' ইউনিয়নের চেয়ারম্যান 'X' ব্যক্তির মধ্যে বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম এ তিনটি গুণই উপস্থিত। বুদ্ধিমান বলেই স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি যোগ্য লোককে বেছে নিয়েছেন। পাশাপাশি বিবেকবোধসম্পন্ন হওয়ার কারণে তিনি নিজের ভাইয়ের ছেলে প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তার আত্মসংযমেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। কেননা চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলেই নিজের ভাইয়ের ছেলেকে শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে উপেক্ষা করে বৃহত্তর স্বার্থে যোগ্য প্রার্থীকেই নিয়োগ দেন। সুতরাং আমরা বলতে পারি, উদ্দীপকের 'X' ব্যক্তি একজন সুনাগরিক।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত তথ্য অধিকার আইনটি ৫ এপ্রিল, ২০০৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে।
নাগরিকের অধিকার হলো সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত কতগুলো সুযোগ-সুবিধা, যা ভোগের মাধ্যমে নাগরিকের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে।
অধিকার ব্যতীত মানুষ তার ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারে না। অধিকারের মূল লক্ষ্য ব্যক্তির সর্বজনীন কল্যাণ সাধন। রাষ্ট্রের নাগরিকদের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অধিকার অপরিহার্য।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!