'ইবাদত' আরবি শব্দ। এর অর্থ দাসত্ব, বন্দেগি, আনুগত্য ইত্যাদি। আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুলুল্লাহ (স.) প্রদর্শিত পন্থায় জীবন পরিচালিত করাকেই ইবাদত বলে।
সালাত, সাওম, যাকাত, হজ ইত্যাদি আমরা যেমনি ইবাদত হিসেবে পালন করে থাকি, তেমনি জীবনের প্রতিটি কাজ ইসলামি বিধি-বিধান মোতাবেক সম্পন্ন করাও ইবাদতের অংশ। আল্লাহ জিন ও মানবসন্তানকে তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহর নিকট বান্দার আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হচ্ছে সালাত। সালাতের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভ করতে পারে। সালাত হচ্ছে জান্নাতের চাবিকাঠি ও আল্লাহর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম। সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও গর্হিত কর্মকাণ্ড হতে বিরত রাখে।
জামাআত আরবি শব্দ। এর অর্থ একত্রিত হওয়া, সমবেত হওয়া প্রভৃতি। ইসলামি পরিভাষায়, নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় মুসলিম সম্প্রদায় ইমামের সঙ্গে একত্রিত হয়ে সালাত আদায় করাকে জামাআতে সালাত আদায় বলে।
ফরজ সালাত একাকী আদায় করার চেয়ে জামাআতে আদায় করার প্রতি বিশেষ তাগিদ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।” (সূরা আল-বাকারা : ৪৩) নবি করিম (স.) জামাআতে সালাত আদায়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, 'একাকী সালাত আদায় অপেক্ষা জামাআতে আদায় করলে সাতাশগুণ বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়।' (বুখারি ও মুসলিম)
জামাআতে সালাত আদায়কারীকে নবি করিম (স.) খুবই পছন্দ করতেন। তিনি নিজে কখনো জামাআত ত্যাগ করেননি। আবার কেউ জামাআতে উপস্থিত না হলে তিনি খোঁজ নিতেন এবং এতে মহানবি (স.) অসন্তুষ্ট হতেন। তাই আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন ও অধিক সাওয়াব পাওয়ার আশায় প্রত্যেক মুমিন বান্দাকে জামাআতে সালাত আদায় করতে হবে।
ইমাম অর্থ নেতা। যিনি সালাত পরিচালনা করেন, তিনিই ইমাম। অন্য কথায়, জামাআতে সালাত আদায়ের সময় মুসল্লিগণ (মুক্তাদি) যাকে অনুসরণ করে সালাত আদায় করে, তাকে ইমাম বলে।
ইমাম অর্থ নেতা। যিনি সালাত পরিচালনা করেন, তিনিই ইমাম। যার কিরাআত শুদ্ধ, সুন্দর ও ইসলামি জ্ঞান বেশি এবং বয়সে বড় তিনিই ইমাম হওয়ার যোগ্য। তাই একজন যোগ্য ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে নির্বাচন করা উচিত।
ইমামের কর্তব্য হচ্ছে সালাতে কাতার সোজা হলো কি না সেদিকে দৃষ্টি রাখা। মুসল্লিদের মধ্যে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। সৎ উপদেশ দেওয়া এবং মুসল্লিদের প্রতি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। ইমাম হিংসা, বিদ্বেষ, প্রবৃত্তির অনুসরণ ও ইসলাম বহির্ভুত কাজকর্ম থেকে দূরে থাকবেন। তাঁর উচিত মুসল্লিদের অবস্থা দেখে সালাতে তিয়াওয়াত দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত করা।
ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে ইমামকে অনুসরণপূর্বক যারা সালাত আদায় করে, তাঁদের মুক্তাদি বলা হয়। মুক্তাদি এই বলে সালাতের নিয়ত করবে যে, 'আমি এই ইমামের পিছনে সালাত আদায় করছি।'
মুক্তাদির কাজ হলো- সালাতের যাবতীয় কাজে মুক্তাদিকে ইমামের অনুসরণ করতে হবে। মুক্তাদিগণ ইমামের পিছনে দাঁড়াবে। যদি মুক্তাদি একজন হয় তবে ইমামের ডান দিকে দাঁড়াবে। যদি ইমাম তিলাওয়াতে ভুল করেন, তাহলে মুক্তাদি সংশোধন করে দেবে। আর যদি অন্য কোনো কাজে ভুল করেন, যেমন: দাঁড়ানোর পরিবর্তে বসে, বসার পরিবর্তে দাঁড়ায়, তবে 'সুবহানাল্লাহ্' বলে ইমামকে সংশোধন করে দেবে। (বুখারি)
যে ব্যক্তি নামাযে এক বা একাধিক রাকআত শেষ হওয়ার পর ইমামের সাথে জামাআতে অংশগ্রহণ করে, তাকে মাসুক বলে।
মুক্তাদি ইমামের পিছনে ইস্তেদা করার আগে যদি এক রাকআত ছুটে যায়, তবে ইমামের সালাম ফেরানোর পর দাঁড়িয়ে যাবে এবং ছুটে যাওয়া এক রাকআত একাকী সালাত আদায়ের ন্যায় আদায় করে নেবে।
দুই রাকআত ছুটে গেলে ইমামের সালাম ফেরানোর পর মুক্তাদি দাঁড়িয়ে যাবে এবং ছুটে যাওয়া দুই রাকআত যথানিয়মে আদায় করবে, যেভাবে ফজরের দুই রাকআত ফরজ সালাত একাকী আদায় করা হয়।
'মুসাফির' আরবি শব্দ। এর অর্থ ভ্রমণকারী। কমপক্ষে ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরবর্তী কোনো স্থানে যাওয়ার নিয়তে কোনো ব্যক্তি তার নিজ এলাকা/শহর থেকে বের হলে শরিয়তের পরিভাষায় তাকে মুসাফির বলে।
শরিয়তে মুসাফিরকে সংক্ষিপ্ত আকারে সালাত আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সংক্ষিপ্তকরণকে আরবিতে কসর বলা হয়। এমন ব্যক্তি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে কমপক্ষে পনেরো দিন অবস্থানের নিয়ত না করা পর্যন্ত তার জন্য মুসাফিরের হুকুম প্রযোজ্য হবে।
মুসাফিরের জন্য কসর সালাত আদায় করার অনুমতি আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহের গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবি (স.) বলেন: 'এটি একটি সাদাকা, যা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের (মুসাফিরদের) দান করেছেন। এ সাদাকা তোমরা গ্রহণ কর।' (বুখারি ও মুসলিম)
চার রাকআতবিশিষ্ট অর্থাৎ যোহর, আসর ও এশার ফরজ সালাত মুসাফির ব্যক্তি দুই রাকআত করে আদায় করবে। ফজর, মাগরিব ও বিতরের নামাযে কসর নেই। এগুলো পুরাপুরি আদায় করতে হবে। কিন্তু ইমাম যদি মুকিম (স্থায়ী) হয়, তাহলে সে ইমামের অনুসরণ করে পূর্ণ সালাত আদায় করবে।
রোগী বা অক্ষম ব্যক্তি যথানিয়মে সালাত আদায় করতে না পারলে, তার জন্য ইসলামে সহজ নিয়মের অনুমোদন রয়েছে। রোগীর সেই সহজ নিয়মে সালাত আদায়কে রুগ্ধ ব্যক্তির সালাত বলে।
সালাত এবং জুমুআ দুটিই আরবি শব্দ। প্রচলিত ভাষায় বলা হয় জুমার সালাত। শুক্রবার যোহরের সময়ে যোহরের সালাতের পরিবর্তে যে সালাত আদায় করা হয়, তাকে বলা হয় জুমার সালাত। প্রতি শুক্রবার জামে মসজিদে জুমার সালাত জামাআতে আদায় করা হয়।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ন্যায় প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান, স্বাধীন, মুসলিম পুরুষের উপর জুমার সালাত আদায় করা ফরজ। আর এর অস্বীকারকারী কাফির। অবহেলা করে কেউ এ সালাত আদায় না করলে সে ফাসিক হয়ে যাবে।
“হে মুমিনগণ। জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর, এটি তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” (সূরা আল-জুমুআ : ৯)
জুমার দিন সপ্তাহের উত্তম দিন। এদিনে হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। এদিনে তাঁর তওবা কবুল হয়। এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এদিন দোয়া কবুলের উত্তম দিন।
জুমার সালাত আদায় না করলে ইসলামে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। যেমন: মহানবি (স.) বলেন, 'যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে পর পর তিন জুমা ত্যাগ করে, তার অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয় এবং তার অন্তরকে মুনাফিকের অন্তরে পরিণত করে দেওয়া হয়।' (তিরমিযি)
জুমার সালাতে এলাকার লোকজন একত্রিত হয়। পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ হয় এবং কুশলাদি বিনিময়ের সুযোগ হয়। সুখে-দুঃখে একে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা করার সুযোগ হয়। ইমামের পিছনে সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুসল্লিগণ সালাত আদায় করে থাকে। ফলে সকলের মধ্যে সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে।
ঈদ আরবি শব্দ। এর অর্থ আনন্দ, উৎসব ইত্যাদি। ঈদের দিন হলো মুসলমানদের মহামিলন ও জাতীয় খুশির দিন। এ প্রসঙ্গে মহানবি (স.) বলেছেন, 'প্রত্যেক জাতিরই উৎসবের দিন আছে। আর আমাদের উৎসব হলো ঈদ।' (বুখারি ও মুসলিম)
ঈদ মানে আনন্দ। আর ফিতর অর্থ সাওম বা রোযা ভঙ্গ করা। ঈদুল ফিতর অর্থ সাওম ভঙ্গের আনন্দ। সুদীর্ঘ একটি মাস আল্লাহর নির্দেশমতো রোযা পালনের পর বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় এদিনে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে আনন্দ-উৎসব করে বলে একে ঈদুল ফিতর বলা হয়।
ঈদের দিন আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলের খোঁজখবর নিতে হয়। সাধ্যমতো তাদের বাসায় মিষ্টান্ন খাদ্য যেমন: পিঠা, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি খাবার পাঠাতে হয়। ধনী, গরিব, মিসকিন সকলের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে হয়। এতে সকলের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
ঈদুল ফিতরের দিন দুটি কাজ ওয়াজিব। যথা- ১. ফিতরা দেওয়া, ২. ঈদের দুই রাকআত সালাত ছয় তাকবিরের সাথে আদায় করা।
ঈদের দিনে চারটি সুন্নত কাজ হলো-
১. গোসল করা।
২. সুগন্ধী ব্যবহার করা।
৩. পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা।
৪. সালাত আদায়ের পূর্বে মিষ্টি জাতীয় খাদ্য খাওয়া।
ঈদের তাকবির বাংলা উচ্চারণ হলো- আল্লাহ আকবার আল্লাহ আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
বছরে দুই দিন মহান আল্লাহ মানুষের জন্য সম্মিলনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তার হিংসা বিদ্বেয়, ভেদাভেদ ইত্যাদি ভুলে গিয়ে প্রীতিবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। রমযানের রোযা পালনের মাধ্যমে মানুষের তৃষ্ণা-ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করে গরিবদের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে।
'ঈদুল আজহা' শব্দদ্বয় আরবি। প্রচলিত ভাষায় বলা হয় কুরবানির ঈদ। বিশ্ব মুসলিম জাতি ত্যাগের নিদর্শনস্বরূপ মহাসমারোহে পশু যবেহ করার মাধ্যমে জিলহজ মাসের দশম তারিখ যে উৎসব পালন করে থাকে তাকে ঈদুল আজহা বলে।
কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য রেখে এক ভাগ আত্মীয় ও প্রতিবেশীকে এবং এক ভাগ গরিব মিসকিনকে দিতে হয়। এতে ধনীদের সাথে গরিবরাও ঈদের আনন্দে অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়।
ঈদের দিনে আমরা ভেদাভেদ ভুলে যাব। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করব। একে অন্যের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেব, পরস্পরের সাথে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলব। একে অন্যের থেকে ভালোবাসার শিক্ষা গ্রহণ করব।
'সালাতুল জানাযা' দুটিই আরবি শব্দ। প্রচলিত ভাষায় বলা হয় জানাযার সালাত বা জানাযার নামায। মৃত ব্যক্তিকে সামনে রেখে কবরস্থ করার পূর্বে চার তাকবিরসহ যে সালাত আদায় করা হয়, তাকে জানাযার সালাত বলে।
আল্লাহুম্মাগফির লিহাইয়্যিনা ওয়া মায়ি্যতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া ছাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনসানা। আল্লাহুম্মা মান আহয়িয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলামি ওয়ামান তাওয়াফ্ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ ফাহু আলাল ইমান।
আল্লাহুম্মাজআলহা লানা ফারাতাঁও ওয়াজআল্দু লানা আজরাও ওয়া জুখরাঁও ওয়াজ আলহা লানা শাফিআতাঁও ওয়া মুশাফ্ ফাআন।
রমযান মাসে এশার সালাতের পর বিতরের পূর্বে যে সালাত আদায় করতে হয়, তাকে সালাতুত তারাবিহ বা তারাবিহের সালাত বলে। এ সালাত সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। নবি করিম (স.) নিজে এ সালাত আদায় করেছেন ও সাহাবিগণকে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
রমযান মাসে এশার সালাতের পর বিতরের পূর্বে যে সালাত আদায় করতে হয়, তাকে সালাতুত তারাবিহ বা তারাবিহের সালাত বলে। সুন্নত সালাত জামাআতে আদায়ের বিধান নেই। তবে তারাবিহের সালাত জামাআতে আদায় করা সুন্নত। তারাবিহের সালাত মোট বিশ রাকআত।
সুবহানাযিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি সুবহানাযিল ইযযাতি ওয়াল আজমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়ায়ে ওয়ালজাবারুতে। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাযি লাইয়ানাম্ ওয়ালাইয়ামুতু আবাদান আবাদা। সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়ারাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ।
তাহাজ্জুদ' আরবি শব্দ। এর অর্থ রাত জাগা, ঘুম থেকে ওঠা। মধ্যরাতের পর ঘুম থেকে ওঠে যে সালাত আদায় করতে হয়, তাকে তাহাজ্জুদের সালাত বলে। তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা সুন্নত।
গভীর রাতে আরামের ঘুম ত্যাগ করে বান্দা যখন আল্লাহর নৈকট্য ও রহমত পাওয়ার আশায় তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে, তখন আল্লাহ খুবই খুশি হন। তাহাজ্জুদ সালাতের মাধ্যমে বান্দার আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধিত হয়। এ সালাত আদায়ে পুণ্যময় জীবনের পথ প্রশস্ত হয়।
রাতের শেষার্ধে তাজাজ্জুদের সালাত আদায় করা উত্তম। এ সালাত পড়া সুন্নত। এ সালাত দুই রাকআত করে সুন্নত সালাতের নিয়মে আদায় করতে হয়। তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে কয়েকবার দরুদ পাঠ করা ভালো। এরপর বিতরের সালাত আদায় করা উত্তম।
ইশরাকের সালাত ফজরের পরে আদায় করতে হয়। ফজরের সালাত আদায় করে বিছানাতে বসে কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তাহলিল ও দরুদ পাঠরত অবস্থায় থাকা এবং এ সময়ে কথাবার্তা বা কাজকর্ম না করাই উত্তম। সূর্য সম্পূর্ণরূপে উঠে গেলে এ সালাত আদায় করতে হয়।
সালাতুল আওয়াবিন সুন্নতে যায়িদা। হাদিসে আওয়াবিন সালাতের অনেক ফজিলত বর্ণিত আছে। আওয়াবিন সালাত নিয়মিত আদায় করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়।
আওয়াবিনের সালাত মাগরিবের ফরজ ও দুই রাকআত সুন্নতের পর থেকে এশার ওয়াক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা যায়। আওয়াবিনের সালাত দুই রাকআত করে ছয় রাকআত পড়তে হয়। আমরা অধিক সাওয়াবের আশায় এ সুন্নত সালাত আদায়ে অভ্যস্ত হব।
সালাত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নিয়ামত ও কল্যাণপ্রস্ উপহার। সালাত মানুষকে সকল পাপাচার, অশ্লীলতা ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসের অন্ধমোহ থেকে মুক্ত ও পবিত্র রাখে। প্রকৃত সালাত আদায়কারী মসজিদের বাইরে কোলাহল এবং দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তেও কোনো অন্যায় কাজ করতে পারে না। সালাত আদায়ের মাধ্যমে ব্যক্তি তার নৈতিক শিক্ষা লাভ করে।
জামাআতের সাথে সালাত আদায় করার সামাজিক গুরুত্ব অনেক। ইমামের পিছনে সালাত আদায়ের অর্থ নেতার অনুসরণ। জামাআতে সালাত আদায়ের ফলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকে না। রাজা-প্রজা, 'ধনী-গরিব, ছোট-বড়, শিক্ষিত-অশিক্ষিত একই সারিতে দাঁড়ায়। এতে মুসলমানদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন ঘটে।
'সাওম' আরবি শব্দ। এর অর্থ বিরত থাকা। শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তের সাথে পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকে সাওম বা রোযা বলে।
ইসলামি পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তের সাথে পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকে সাওম বলে। রমযান মাসের রোযা পালন করা মুসলমানের উপর ফরজ। যে তা অস্বীকার করবে সে কাফির হবে।
সাওম ছয় প্রকার। যথা-
১. ফরজ রোযা
২. ওয়াজিব রোযা
৩. সুন্নত রোযা
৪. মুস্তাহাব রোযা
৫. নফল রোযা ও
৬. মাক্কুহ রোযা।
ওয়াজিব রোযা হলো কোনো কারণে রোযা পালনের মানত করলে তা পালন করা ওয়াজিব। কোনো নির্দিষ্ট দিনে রোযা পালনের মানত করলে সেদিনেই পালন করা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (স.) যেসব রোযা নিজে পালন' করেছেন এবং অন্যদের পালন করতে উৎসাহিত করেছেন, সেগুলো সুন্নত রোযা। আশুরা ও আরাফার দিনে রোযা পালন করা সুন্নত।
চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোযা পালন করা মুস্তাহাব। সপ্তাহের প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার এবং শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা পালন করা মুস্তাহাব।
ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব ছাড়া সকল প্রকার রোযা নফল। যেসব দিনে রোযা পালন করা মাকরুহ ও হারাম, ঐসব দিন ব্যতীত অন্য যেকোনো দিন রোযা রাখা নফল।
মাকরুহ দুই প্রকার। (১) মাকরুহ তাহরিমি, যা কার্যত হারাম রোযা। যেমন: দুই ঈদের দিনে ও জিলহজ মাসের ১১, ১২, ১৩ তারিখে রোযা পালন করা হারাম। (২) মাকরুহ তানযিহি, যা অপছন্দনীয় কাজ। যেমন: মুহাররাম মাসের ৯ বা ১১ তারিখে রোযা পালন না করে শুধু ১০ তারিখে পালন করা।
সাহারি' আরবি শব্দ। যা সাহারুন শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভকরেছে। এর অর্থ ভোর, প্রভাত ইত্যাদি। রমযান মাসে রোযা পালনের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিকের পূর্বে যে খাবার খাওয়া হয়, তাকে সাহারি বলে।
'ইফতার' আরবি শব্দ। এর অর্থ ভঙ্গ করা। ইসলামি পরিভাষায় সূর্যাস্তের পর নিয়তের সাথে হালাল বস্তু পানাহারের মাধ্যমে রোযা ভঙ্গ করাকে ইস্তার বলে।
ইস্তার করার দোয়াটি হলো-
اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ -
অর্থ : 'হে আল্লাহ! আপনার জন্য সাওম পালন করেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দ্বারাই ইফতার করলাম।'
যেসব কারণে সাওম ভঙ্গ হয় তার দুটি কারণ লেখা হলো-
১. ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেলার পর সাওম ভঙ্গ হয়েছে মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে।
২. কুলি করার সময় অনিচ্ছায় পানি পেটে গেলে।
সাওম মাকরুহ হওয়ার কারণ হলো- অন্যের গিবত অর্থাৎ দোষত্রুটি বর্ণনা করলে। মিথ্যা কথা বললে, অশ্লীল আচরণ বা গালমন্দ করলে। কুলি করার সময় গড়গড়া করলে। কারণ এতে গলার ভিতর পানি ঢুকে গিয়ে রোযা ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে। যথাসময়ে ইফতার না করলে। গরমরোধে গায়ে ঠান্ডা কাপড় জড়িয়ে রাখলে বা বারবার কুলি করলে।
কোনো কারণে অনিচ্ছায় যদি সাওম ভেঙে যায় কিংবা কোনো ওযরে তা পালন করা না হয়, তবে একটি সাওমের পরিবর্তে একটি সাওমই রাখতে হয়। একে কাযা সাওম বলে।
সাওম কাযা করার দুটি কারণ হলো-
১. সাওম পালনকারী রমযান মাসে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা সফরে থাকলে অথবা অন্য কোনো ওঘরের কারণে সাওম পালনে অপারগ হলে।
২. রাত মনে করে ভোরে পানাহার করলে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে মনে করে সূর্যাস্তের পূর্বে ইফতার করলে।
ইচ্ছাকৃতভাবে সাওম পালন না করলে বা সাওম রেখে বিনা কারণে ভেঙে ফেললে কাযা এবং কাফ্ফ্ফারা উভয়ই ফরজ হবে। কাফ্ফারা আদায় না করলে গুনাহগার হতে হবে।
'ইতিকাফ' আরবি শব্দ। এর অর্থ অবস্থান করা, আটকে থাকা। শরিয়তের পরিভাষায় সাংসারিক কাজকর্ম ও পরিবার থেকে আলাদা হয়ে মসজিদে ইবাদতের নিয়তে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়।
ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া। এলাকাবাসীর মধ্য থেকে একজন আদায় করলেই আদায় হয়ে যাবে। আর কেউ আদায় না করলে সকলেই দায়ী হবে।
রমযান মাসে লাইলাতুল কদর নামে একটি বরকতময় রাত আছে। যে রাত হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। রমযানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখে লাইলাতুল কদর খুঁজতে মহানবি (স.) নির্দেশ দিয়েছেন। এ সময় ইতিকাফ অবস্থায় থাকলে লাইলাতুল কদর লাভের সৌভাগ্য হতে পারে।
রমযানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফ করা সুন্নত। এর সর্বনিম্ন সময় একদিন একরাত। রমযান মাস ছাড়াও মুস্তাহাব ইতিকাফ যেকোনো সময় পালন করা যায়। স্ত্রীলোক নিজ ঘরে নির্দিস্ট স্থানে ইতিকাফ করতে পারেন।
ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের সালাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে সাওমের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে গরিব-দুঃখীদের সহযোগিতায় যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থসম্পদ দান করা হয়, তাকে সাদাকাতুল ফিতর বলে।
ঈদের সালাতের পূর্বে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। ঈদের দুই-একদিন আগে 'সাদাকাতুল ফিতর' আদায় করা যায়। তবে ঈদের সালাতের উদ্দেশ্যে ঈদের মাঠে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে 'সাদাকাতুল ফিতর' আদায় করা উত্তম।
সাওম (রোযা) পালনের মাধ্যমে বান্দা একদিকে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে, অপরদিকে তার নৈতিকতারও. বিশেষ উন্নয়ন ঘটায়। সাওমের অনেক নৈতিক শিক্ষার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো হলো- ১. সংযম, ২. সহমর্মিতা ও ৩. সহিষ্ণুতা।
রোযা মানুষকে এই সংযম শিক্ষা দেয়। মানুষের কুপ্রবৃত্তি তাকে তার খেয়ালখুশি মতো চলতে এবং সকল প্রকার অন্যায় কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। রমযানের সাওম এই অবাধ স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বৈধ পানাহার ও অন্যান্য জৈবিক চাহিদা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার শিক্ষা দেয়।
জামাআত আরবি শব্দ। এর অর্থ একত্রিত হওয়া, সমবেত হওয়া প্রভৃতি। ইসলামি পরিভাষায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় মুসলিম সম্প্রদায় ইমামের সহিত একত্রিত হয়ে সালাত আদায় করাকে জামাআতে 'সালাত আদায় বলে।
নবি করিম (স.) জামাআতে সালাত আদায়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, "একাকী সালাত আদায় অপেক্ষা জামাআতে আদায় করলে সাতাশ গুণ বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়।" (বুখারি ও মুসলিম)। জামাআতে সালাত আদায়কারীকে নবি করিম (স.) খুবই পছন্দ করতেন। তিনি নিজে কখনো জামাআত ত্যাগ করেননি। আবার কেউ জামাআতে উপস্থিত না হলে তিনি খোঁজ নিতেন এবং এতে তিনি (স.) অসন্তুষ্ট হতেন। তাই অধিক সাওয়াব পাওয়ার আশায় প্রত্যেক মুমিন বান্দাকে জামাআতে সালাত আদায় করতে হয়।
ইমামের কর্তব্য হচ্ছে সালাতে কাতার সোজা হলো কিনা সেদিকে দৃষ্টি রাখা। মুসল্লিদের মধ্যে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। সৎ উপদেশ দেওয়া এবং মুসল্লিদের প্রতি দায়িত্ব যথাযথ পালন করা। ইমাম হিংসা, বিদ্বেষ প্রবৃত্তির অনুসরণ ও ইসলাম বহির্ভূত কাজকর্ম থেকে দূরে থাকবেন। তাঁর উচিত মুসল্লিদের অবস্থা দেখে সালাতে তিলাওয়াত দীর্ঘ বা ছোট করা। মুসল্লিদের মধ্যে অনেকে বৃদ্ধ, রুগ্ধ, দুর্বল ও মুসাফির থাকতে পারে। তাই ইমামকে সকলের প্রতি লক্ষ রেখে সালাত আদায় করতে হবে।
ইমাম অর্থ নেতা। যিনি সালাত পরিচালনা করেন তিনিই ইমাম। ইমামের কর্তব্য হচ্ছে সালাতে কাতার সোজা হলো কি না সেদিকে দৃষ্টি রাখা। মুসল্লিদের মধ্যে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। সৎ উপদেশ দেওয়া এবং মুসল্লিদের প্রতি দায়িত্ব যথাযথ পালন করা। ইমাম হিংসা-বিদ্বেষ, প্রবৃত্তির অনুসরণ ও ইসলাম বহির্ভূত কাজকর্ম থেকে দূরে থাকবেন। তাঁর উচিত মুসল্লিদের অবস্থা দেখে সালাতে তিলাওয়াত দীর্ঘ বা ছোট করা। মুসল্লিদের মধ্যে অনেকে বৃদ্ধ, রুগ্ধ, দুর্বল ও মুসাফির থাকতে পারে, তাই ইমামকে সকলের প্রতি লক্ষ রেখে সালাত আদায় করতে হবে।
কমপক্ষে ৪৮ মাইল দূরবর্তী কোনো স্থানে যাওয়ার নিয়তে কোনো ব্যক্তি বাড়ি থেকে বের হলে শরিয়তের পরিভাষায় তাকে মুসাফির বলে। শরিয়তে মুসাফিরকে সংক্ষিপ্ত আকারে সালাত আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সংক্ষিপ্তকরণকে আরবিতে কসর বলে। মুসাফির অবস্থায় যোহর, আসর ও ইশার ফরজ সালাত কসর পড়তে হয়।
ঈদের দিনে কতকগুলো কাজ করা সুন্নাত। সে কাজগুলো নিম্নরূপ-
১. গোসল করা
২. সুগন্ধি ব্যবহার করা
৩. পবিত্র ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা
৪. সালাত আদায়ের পূর্বে মিষ্টিজাতীয় খাদ্য খাওয়া
৫. ময়দানে গিয়ে ঈদের সালাত আদায় করা
৬. ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবির বলতে বলতে যাওয়া
৭. এক রাস্তায় ঈদগাহে যাওয়া এবং অন্য রাস্তায় ফিরে আসা।
ঈদের দিন আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী সকলের খোঁজখবর নিতে হয়। সাধ্যমতো তাদের বাসায় মিস্টান্ন খাদ্য যেমন- পিঠা, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি খাবার পাঠাতে হয়। ধনী, গরিব, মিসকিন সকলের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে হয়। এতে সকলের মুখে হাঁসি ফুটে ওঠে। ঈদ আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে, আসে সীমাহীন প্রীতি, ভালোবাসা ও কল্যাণের সংবাদ নিয়ে। তাই ঈদকে যথাযথ মর্যাদায় উদ্যাপন করা মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য।
ঈদের দিন আমরা ভেদাভেদ ভুলে যাব। বড়দের সম্মান করব, ছোটদের স্নেহ দের। একে অন্যের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেব। পরস্পরের সাথে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলব। একে অপরকে ভালোবাসার শিক্ষা গ্রহণ করব। পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতায় আমাদের জীবনকে সুন্দর করে গঠন করার শিক্ষা গ্রহণ করব। তদুপরি সামাজিক সাম্যের শিক্ষা গ্রহণ করব।
মানুষ মরণশীল। প্রত্যেককেই একদিন না একদিন 'মরতে হবে। মৃত ব্যক্তির প্রতি জীবিতদের অনেক কর্তব্য আছে। মৃতকে গোসল দেওয়া, কাফন পরানো, তার ওপর জানাযার সালাত আদায় করা এবং সবশেষে তাকে কবরস্থ করা একান্ত জরুরি। মূলত জানাযার সালাত হলো মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া। যত বেশি লোক একত্রিত হয়ে দোয়া করবে ততই তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই জানাযার সালাতে লোক যত সংখ্যক বেশি হবে ততোই ভালো। কিন্তু লোকসংখ্যা বেশি হবার জন্য জানাযা বিলম্ব করা ঠিক নয়।
রমযান মাসে ইশার ফরজ ও দুই রাকাআত সুন্নাতের পর বিতরের পূর্বে তারাবিহের নিয়তে দুই রাকাআত করে মোট বিশ রাকাআত সালাত আদায় করতে হয়। প্রতি চার রাকাআত অন্তর বসে-বিশ্রাম নিতে হয়। তখন বিভিন্ন তাসবিহ পড়া যায়। তারাবিহের সালাত শেষ করে বিতরের সালাত রমযান মাসে জামাআতে আদায়-করার বিধান রয়েছে।
'তাহাজ্জুদ' আরবি শব্দ এর অর্থ রাত জাগা, ঘুম থেকে ওঠা। মধ্যরাতের পর ঘুম থেকে ওঠে যে সালাত আদায় করতে হয় তাকে তাহাজ্জুদের সালাত বলে। তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা সুন্নাত। এর গুরুত্ব অপরিসীম। নবি করিম (স.) প্রতিনিয়ত' সালাত আদায় করতেন এবং সাহাবিগণকেও আদায়ের জন্য উৎসাহিত করতেন। তাই মহানবি (স.)-এর ওপর তাহাজ্জুদ সালাত আদায়ের বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন, "রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করুন। এ সালাত আপনার জন্য অতিরিক্ত।” [বনি ইসরাইল: ৭৯] কোনো কারণে তাহাজ্জুদের সালাত ছুটে গেলে মহানবি (স.) দুপুরের আগেই আদায় করে নিতেন।
ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের সালাতের উদ্দেশ্যে, রওয়ানা হওয়ার পূর্বে গরিব-দুঃখীদের সহযোগিতায় (খাদ্যস্বরূপ) রোযার ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধনে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থসম্পদ দান করা হয় তাকে সাদাকাতুল ফিতর বলে।
ঈদের সালাতের পূর্বে নিসাব পরিমাণ মালের মালিকের সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। ঈদের দু-একদিন আগে 'সাদাকাতুল ফিতর' আদায় করা যায়। তবে ঈদের সালাতের উদ্দেশ্যে ঈদের মাঠে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে 'সাদাকাতুল ফিতর' আদায় করা উত্তম। ঈদের পর কেউ এটি আদায় করলে, আদায় হবে কিন্তু সাওয়াব কম হবে।
মানুষের মধ্যে যেমন মানবিক ভালো গুণ থাকে; তেমনি তার মধ্যে দৈহিক ও পাশবিক শক্তিও থাকে। পাশবিক শক্তি তাকে স্বেচ্ছাচারিতার পথে পরিচালিত করে। স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সমাজে অনাচার, কোন্দল, কলহ ও অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। তাই জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের স্বীয় প্রবৃত্তিকে সংযমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রয়োজন।
সালাতের ইমামের ন্যূনতম যোগ্যতা হবে যার কিরাআত শুদ্ধ, সুন্দর, যিনি ইসলামি জ্ঞান সমৃদ্ধ এবং বয়সে বড়। এছাড়া তাঁকে সঠিক আকিদা সম্পন্ন ও আমলদার হতে হবে। তবে ইমাম যদি সামাজিক নেতা বা রাজনৈতিক নেতা অর্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তাকে এসব গুণের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন হতে হবে। ইসলামি জ্ঞানের সাথে সাথে সাধারণ জ্ঞানেও যথেষ্ট পারদর্শী হতে হবে। যাতে হক ও বাতিলের পার্থক্য করতে পারে। তাকে সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি, সম্পর্কেও সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখতে হবে।
সফর একটি কষ্টকর বিষয়। তাই আল্লাহ তার মুসাফির বান্দার ওপর সালাত সংক্ষিপ্ত করার অনুমতি প্রদান করেছেন। আল্লাহর দেওয়া সকল সুযোগ-সুবিধা খুশি মনে গ্রহণ করা উচিত। কাজেই কোনো মুসাফির ব্যক্তি যদি ইচ্ছে করে যোহর, আসর বা ইশার ফরজ সালাত চার রাকাআত' আদায় করে, তবে আল্লাহর দেওয়া সুযোগ গ্রহণ না করায় গুনাহগার হবে। কিন্তু ইমাম যদি মুকিম (স্থায়ী) হয় তাহলে সে ইমামের অনুসরণ করে পূর্ণ সালাত আদায় করবে।
ইচ্ছাকৃত রোযা পালন না করলে বা রোযা রেখে বিনা কারণে ভেঙে ফেললে কাযা এবং কাফ্ফারা উভয়ই ফরজ হবে। সাওমের কাফফারা নিম্নরূপ-
১. একাধারে দুই মাস রোযা পালন করা;
২. এতে অক্ষম হলে ৬০ জন মিসকিনকে পরিতৃপ্তির সাথে দুই বেলা খাওয়ানো;
৩. একজন গোলামকে আযাদ করা।
একাধারে দুই মাস কাফ্ফারার রোযা আদায়কালীন যদি মাসে দুই একদিন বাদ পড়ে যায় তবে পূর্বের রোযা বাতিল হয়ে যাবে। পুনরায় নতুন করে দুই মাস রোযা পালন করতে হবে।
ঈদের সালাত অন্যান্য সালাতের মতোই অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সাথে আদায় করতে হয়। সালাত শেষে ইমাম সাহেব প্রদত্ত দুটো খুতবা শোনা ওয়াজিব।
ঈদ মানে আনন্দ। আর ফিতর অর্থ সাওম বা রোযা ভঙ্গ করা। ঈদুল ফিতর অর্থ সাওম ভঙ্গের আনন্দ। সুদীর্ঘ একটি মাস আল্লাহর নির্দেশমতো রোযা পালনের পর বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় এদিনে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে আনন্দ-উৎসব করে বলে একে ঈদুল ফিতর বলা হয়। রমযানের পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন মুসলমানগণ এ উৎসব পালন করে।
রুগ্ম ব্যক্তিকে হুঁশ থাকা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই সালাত আদায় করতে হবে। রোগ যত কঠিন হোক না কেন, সম্পূর্ণরূপে অপারগ না হলে সালাত ত্যাগ করা যাবে না। রোগীর দাঁড়াতে কষ্ট হলে বসে রুকু-সিজদার সাথে সালাত আদায় করবে। রুকু-সিজদা করতে অক্ষম হলে বসে ইশারায় সালাত আদায় করবে।
Related Question
View Allআল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুলুল্লাহ (স.) প্রদর্শিত পন্থায় জীবন পরিচালিত করাই ইবাদত।
'মুসাফির' আরবি শব্দ। এর অর্থ ভ্রমণকারী। কমপক্ষে ৪৮ মাইল দূরবর্তী কোনো স্থানে যাওয়ার নিয়তে কোনো ব্যক্তি বাড়ি থেকে বের হলে শরিয়তের পরিভাষায় তাকে মুসাফির বলে। এমন ব্যক্তি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে কমপক্ষে পনের দিন অবস্থানের নিয়ত না করা পর্যন্ত তার জন্য মুসাফিরের হুকুম প্রযোজ্য হবে।
জমির উদ্দিনের মনোভাবে ইসলামের ফরজ ইবাদত পালনে অবহেলা ও উদাসীনতা প্রকাশ পায়।
আমরা জানি, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ন্যায় প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান, স্বাধীন, মুসলিম পুরুষের ওপর জুমার সালাত আদায় করা ফরজ। আর এর অস্বীকারকারী কাফির। অবহেলা করে কেউ এ সালাত আদায় না করলে সে ফাসিক হয়ে যাবে।
জমির উদ্দিন সারাদিন মাঠে কাজ করেন। নামাযের সময় হলে খেতের পাশে কাপড় বিছিয়ে নামায আদায় করেন। জুমার দিনে মসজিদে না গিয়ে যোহর সালাত আদায় করেন। এক্ষেত্রে তিনি কাজের অজুহাত দাঁড় করান। সুতরাং জমির উদ্দিনের কাজকে আমরা ফিসক হিসেবে গণ্য করতে পারি। কারণ তিনি জুমার সালাত অস্বীকার করেননি। বরং কাজের ক্ষতি হবার কথা বলে নামাযে অবহেলা করেছেন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত জহির উদ্দিনের বক্তব্যটি হলো, "জুমার নামায আদায় করার জন্য শরিয়তের কিছু বিধান রয়েছে।" জুমার নামায বিষয়ে জহির উদ্দিনের এ বক্তব্য পাঠ্যবইয়ের আলোকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও যথার্থ।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ন্যায় প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান, স্বাধীন, মুসলিম পুরুষের ওপর জুমার সালাত আদায় করা ফরজ। জুমার ওয়াক্তে প্রথমে মসজিদে গিয়ে তাহিয়্যাতুল ওযু ও দুখুলুল মসজিদ দুই দুই রাকাআত করে নফল সালাত আদায় করতে হয়। ফরজের আগে চার রাকাআত কাবল্লাল জুমা ও পরে চার রাকাআত বা'দাল জুমা আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। জুমার সালাতের জন্য দুটি আযান দেওয়া হয়। প্রথম আযান মসজিদের বাইরে মিনারে, দ্বিতীয়টি মসজিদের ভিতরে ইমাম সাহেব খুতবা দিতে মিম্বরে বসলে দেওয়া হয়। জুমার দুই রাকাআত ফরজের পূর্বে ইমাম সাহেব মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দেন। মুসল্লিদের খুতবা শোনা ওয়াজিব। এ সময় কথা বলা, অনর্থক কিছু করা নিষেধ। খুতবা শেষে ইমামের সাথে দুই রাকাআত ফরজ সালাত অন্যান্য ফরজ সালাতের ন্যায় আদায় করতে হয়। জুমার ফরজের জন্য জামাআত শর্ত। জামাআত ছাড়া জুমার সালাত হয় না।
সুতরাং বলা যায়, পাঠ্যবইয়ের আলোকে জহির উদ্দিনের উল্লিখিত বক্তব্য যথার্থ।
যে ব্যক্তি এক বা একাধিক রাকাআত শেষ হওয়ার পর ইমামের সাথে জামাআতে অংশগ্রহণ করে তাকে মাসবুক বলে।
'মুসাফির' আরবি শব্দ। মুসাফিরের আভিধানিক অর্থ ভ্রমণকারী এবং শরিয়তের ভাষায় কমপক্ষে ৪৮ মাইল দূরবর্তী কোনো স্থানে যাওয়ার নিয়তে কোনো ব্যক্তি বাড়ি থেকে বের হলে এবং ১৫ দিনের কম অবস্থান করলে তাকে মুসাফির বলে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!