সম্রাট অশোক ছিলেন একজন ভয়ঙ্কর এবং নির্দয় যোদ্ধা। তিনি অবন্তীতে দাক্ষার নিরসন করেন এবং উজ্জয়িনীতে রাজ অমাত্যদের বিদ্রোহ দমন করে শৌর্যবীর্ষের পরিচয় দিয়েছিলেন।
সম্রাট অশোক ধর্মপ্রচারের জন্য 'ধর্মমহামাত্র' নামে এক বিশেষ শ্রেণির রাজকর্মচারী নিযুক্ত করেন। তাঁরা নগরে-প্রান্তরে সর্বত্র ধর্মনীতি প্রচার করতেন।
সম্রাট অশোক পরমত সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ করে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মানুসারীদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
কলিঙ্গ যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে সম্রাট অশোকের মানস পরিবর্তন হয় এবং তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তখন অহিংসা, ভালোবাসা, সত্য, ন্যয় ও সহিষ্ণুতা হয় তাঁর আদর্শ। তিনি শান্তিকামী, ধার্মিক ও প্রজাবৎসল হয়ে ধর্ম ও ন্যায়ের সঙ্গে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। সম্রাট অশোকের এই জনহিতৈষী শাসন ব্যবস্থার জন্য বিশ্বের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ নৃপতি হন।
অশোক ভারতের বিখ্যাত সম্রাট ছিলেন। তিনি প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষ খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দ থেকে ২৩২ অব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। তাঁর পিতা রাজা বিন্দুসার ও মাতা শুভদ্রঙ্গী। অশোক ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান এবং সাহসী। কলিঙ্গ যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে তিনি বুদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং বৌদ্ধধর্ম প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁকে বিশ্বের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ নৃপতি বলা হয়।
প্রথমদিকে সম্রাট অশোক বদমেজাজি এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিলেন। কথিত আছে, তিনি সিংহাসনে আরোহণের জন্য ৯৯ জন ভ্রাতাকে হত্যা করেন। সিংহাসনে বসার পর রাজ্যজয়ের জন্য বিভিন্ন যুদ্ধ বিগ্রহ ও হত্যা করেন। কলিঙ্গ যুদ্ধে দেড় লক্ষ লোক বন্দি করে এক লক্ষ লোক হত্যা ও বহু আহত করা হয়। এরূপ নিষ্ঠুর প্রকৃতির জন্য তাকে 'চণ্ডাশোক' বলা হতো।
নিগ্রোধ শ্রমণের গাথার মর্মকথা হলো- "অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ, আর প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমত্ত ব্যক্তিরা অমরত্ব লাভকরেন, কিন্তু যাঁরা প্রমত্ত তারা বেঁচে থেকেও মৃতবৎ। এই সত্য জেনে যারা আর্যদের পথ অনুসরণ করেন সেই ধ্যাননিষ্ঠ, দৃঢ় পরাক্রমশীল, বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরম শান্তি নির্বাণ লাভ করেন।"
সম্রাট অশোক প্রথমদিকে অনেক বদমেজাজি ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির রাজা ছিলেন। কলিঙ্গ যুদ্ধ জয়ের পর রক্তপাত, মৃত্যুর বিভীষিকা এবং ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি দারুণভাবে মর্মাহত হন। অনুতাপ, অনুশোচনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তখন নিগ্রোধ শ্রমণের মুখে বুদ্ধবাণী শুনে তার মর্ম উপলব্ধি করেন এবং শ্রমণের নিকট বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন।
বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে সম্রাট অশোক বুদ্ধের উপাসকে পরিণত হন। সেদিন থেকে রাজ্যজ্যয়ের পরিবর্তে মানুষের অন্তর জয় করেন এবং ধর্ম বিজয়কে সাধনা হিসেবে নেন। প্রজাদের কল্যাণে সর্বদা নিবেদিত ছিলেন। সকল প্রাণীর প্রতি দশায়ীশীল ও মমত্বপূর্ণ আচরণ করতেন। অহিংসা, সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, দান ও সেবাদর্শে রাজ্য শাসন করতেন।
বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে সম্রাট অশোকের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। তিনি গৌতম বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ স্মরণীয় করে রাখার জন্য চুরাশি হাজার বিহার, চৈত্য, স্তূপ ও স্তম্ভ নির্মাণ করেন। বিহারের জন্য ভূমি দান করেন এবং ভিক্ষু শ্রবণদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। প্রজাদের ধর্মশিক্ষা প্রদানের জন্য স্থানে স্থানে, পর্বতগাত্রে, প্রস্তরস্তম্ভে ধর্মবাণী খোদিত করে রাখতেন।
সম্রাট অশোকের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম ভারতের সীমারেখা পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নিজের পুত্র মহেন্দ্রকে ভিক্ষু ও কন্যা সংঘমিত্রাকে ভিক্ষুণী ধর্মে দীক্ষা দান করে শ্রীলঙ্কার ধর্শ প্রচারর জন্য- প্রেরণ করেন। এছাড়াও তিনি শ্রীলঙ্কায় পবিত্র মহবোধির শাখা প্রেরণ করে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটান।
সম্রাট অশোক কেবল মানুষের কল্যাণেই ব্যস্ত ছিলেন না, সকল প্রাণী ও প্রকৃতির কল্যাণেও কাজ করেছিলেন। পরিবেশ সংরক্ষায় ও ওষুধের প্রয়োজনে তিনি রাজ্যের সর্বত্র গাছ লাগনোর ব্যবস্থা করেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনসাধারণের পিপাসা নিবারণের জন্য আট ক্রোশ অন্তর কূপ খনন করেছিলেন। এভাবে সবসময় সর্বজীবের কল্যাণে কাজ করে গেছেন।
অশোক নামকরণের একটি সুন্দর কাহিনি প্রচলিত আছে। ষড়যন্ত্র করে অশোকের মাতাকে পিতা বিন্দুসারের নিকট হতে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। ফলে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এতে অশোকের মাতা খুবই কষ্ট ভোগ করেন। তাঁদের মধ্যে পুনরায় সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয় এবং রানি এক পুত্রসন্তান জন্মদান করেন। খুশি হয়ে তখন তিনি বলতে থাকেন, এখন আমি শোকহীন। এজন্য পুত্রের নাম রাখা হয় অশোক।
নিগ্রোধ শ্রবণ ধম্মপদ গ্রন্থের 'অপ্রমাদ বর্গের' একটি গাথা সম্রাট অশোককে ব্যাখ্যা করে শোনান। "অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ, আর প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমত্ত ব্যক্তিরা অমরত্ব লাভ করেন, কিন্তু যারা প্রমত্ত তারা বেঁচে থেকেও মৃতবৎ। এ সত্য বিশেষরূপে জেনে যাঁরা অপ্রমত্ত হয়ে আর্যদের পথ অনুসরণ করেন, সেই ধ্যাননিষ্ঠ, সতত উদ্যোগী, দৃঢ় পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরম শান্তিরূপ নির্বাণ লাভ করেন।' বুদ্ধের এ ধর্মবাণী শোনা মাত্রই সম্রাট অশোকের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে উঠল এবং এ গাথার মাধ্যমে তিনি বুদ্ধের ধর্মবাণী উপলব্ধি করেন। অতঃপর তিনি নিগ্রোধ শ্রমণের কাছেই বৌদ্ধধর্ম দীক্ষা নেন।
সম্রাট অশোক তার ভ্রাতুষ্পুত্র নিগ্রোধ শ্রমণের নিকট বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়ী হয়েও সম্রাটের মনে কোনো সুখ ছিল না। সে অনুতাপ ও অনুশোচনায় ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সৌম্য, শান্ত ও সংযত ৭ বছরের এক শ্রমণকে ধীরগতিতে রাজ অঙ্গন দিয়ে যেতে দেখে তার প্রতি সম্রাটের শ্রদ্ধাবোধ জেড়ে ওঠে। তখন সম্রাট তার মুখে বুদ্ধের অমৃতময় ধর্মবাণী শুনতে চাইলেন। নিগ্রোধ শ্রমণ ধাপদ গ্রন্থের 'অপ্রমাদ বর্গের' একটি গাথা সম্রাট অশোককে শোনালে সম্রাটের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। ফলে তিনি সে গাথা শোনার পর নিগ্রোধ শ্রবণের কাছে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন।
বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার আগে সম্রাট অশোক চণ্ডাশোক নামে পরিচিত ছিলেন।
সম্রাট অশোক প্রথম জীবনে বদমেজাজী ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির রাজা ছিলেন, তাই তাকে চণ্ডাশোক বলা হতো। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধ উপাসকে পরিণত হন। রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্মবিজয়কে তিনি সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি অহিংসা, সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, দান, সেবা প্রভৃতি আদর্শ রাষ্ট্রনীতিতে গ্রহণ করে রাজ্য শাসন করতেন। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর, তিনি 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' পরিণত হন।
সম্রাট অশোকের সময় বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ভিক্ষু শ্রমণের লাভ-সৎকার বৃদ্ধি পায়। তখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের তীর্থিক সন্ন্যাসিগণ ভিক্ষুর ছদ্মবেশ ধারণ করে সঙ্ঘে প্রবেশ করে সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে থাকেন। তারা বৌদ্ধ বিনয় বিধান মানতেন না, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন না। সর্বদা ভোগবিলাসে মত্ত থাকতেন এবং নিজেদের মতবাদ বুদ্ধবাণী হিসেবে প্রচার করতেন। অবিনয়ী ভিক্ষুদের সঙ্ঘ থেকে বের করার জন্য সম্রাট অশোক মোগলী পুত্র তিষ্য থের'র নিকট প্রকৃত বুদ্ধ মতবাদ, জ্ঞাত হয়ে অবিনয়ী ছদ্মবেশধারী ভিক্ষুদের সংঘ হতে বহিষ্কার করেন। ফলে এভাবেই সংঘ পুনরায় বিশুদ্ধ হয়।
Related Question
View Allমগধ বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত।
নিগ্রোধ শ্রমণ সম্রাট অশোককে ধম্মপদ গ্রন্থের অপ্রমাদ বর্গের যে গাথাটি ব্যাখ্যা করে শুনিয়েছিলেন তার মমার্থ হলো, অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ আর প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমত্ত ব্যক্তিরা অমরত্ব লাভকরেন। কিন্তু যারা প্রমত্ত তারা বেঁচে থেকেও মৃতবৎ। এ সত্য বিশেষরূপে জেনে তাঁরা অপ্রমত্ত হয়ে আর্যদের পথ অনুসরণ করেন, সেই ধ্যাননিষ্ঠা, সতত উদ্যোগী, দৃঢ়পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরম শান্তিরূপ নির্বাণ লাভ করেন।
উদ্দীপকের রাজা জনবমের কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধধর্মের অনুসারী সম্রাট অশোকের সঙ্গে, সাদৃশ্যপূর্ণ। সম্রাট অশোক মৌর্য বংশের সম্রাট ছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান এবং সাহসী। ছোটবেলায় তিনি যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করেন। দুঃখসাহসী কাজ করতে তিনি খুবই পছন্দ করতেন। তিনি অবন্তীতে দাঙ্গা এবং রাজ অমাত্যদের বিদ্রোহ দমন করে তাঁর শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। পিতা বিন্দুসারের মৃত্যুর পর সম্রাট অশোক সিংহাসনে আরোহণ করেন। কথিত আছে যে, তিনি সিংহাসনে আরোহণের জন্য ৯৯ জন ভ্রাতাকে হত্যা করেন। সিংহাসনে আরোহণ করার 'পর থেকে তিনি রাজ্য বিস্তারের নেশায় মত্ত ছিলেন। তিনি বিভীষিকাময় এক যুদ্ধে কলিঙ্গ জয় করেন। যুদ্ধে জয়ী হলেও সম্রাট অশোক সুখী হন না। রাজ্য জয়ের বিনিময়ে দেখলেন রক্তপাত এবং মৃত্যুর বিভীষিকা এতে তিনি দারুণভাবে মর্মাহত হন। এরপর তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্মজয়ের সাধনায় মত্ত হন। এগুলো উদ্দীপকের রাজা জনবমের চরিত্র ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের রাজা জনবমের উক্তি। রাজ্য জয়ের চেয়ে ধর্মপ্রচার অতি শ্রেষ্ঠকর্ম। আলোচ্য কর্মটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন সম্রাট অশোক। সম্রাট প্রথমদিকে ভয়ঙ্কর এবং নির্দয় যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি লাভকরেন। কিন্তু কলিঙ্গ যুদ্ধের বিভীষিকার কথা চিন্তা করে নিগ্রোধ শ্রমণের নিকট বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি বৌদ্ধ উপাসকে পরিণত হন। সেদিন থেকেই তাঁর রাজ্য জয়ের পরিবর্তে মানুষের অন্তর জয় করার বাসনা জাগে। রাজ্য জয়ের প্রবল তৃষ্ণা মন থেকে মুছে ফেলেন। রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্ম বিজয়কে তিনি সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রজাদের কল্যাণে 'সর্বদা নিবেদিত থাকতেন। সবার প্রতি দয়াশীল আচরণ করতেন। সর্বপ্রাণীর প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম মমত্ববোধ। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' পরিণত হন। এমনকি 'দেবনাম প্রিয়দর্শী' উপাধি লাভ করেন।
অতএব বলা যায়, সত্যিকার অর্থে রাজ্য জয়ের চেয়ে ধর্মপ্রচারের কর্ম শ্রেষ্ঠ।
সম্রাট অশোক তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রমণ নিগ্রোধের নিকটে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন।
সম্রাট অশোক অহিংসা, সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, দান, সেবা প্রভৃতি আদর্শকে রাষ্ট্রনীতিতে গ্রহণ করে রাজ্য শাসন করতেন। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি 'চন্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' পরিণত হন। এছাড়া তিনি 'দেবনাম প্রিয়দর্শী' উপাধি লাভ করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!