সনাতন ধর্মের একক কোনো প্রতিষ্ঠাতা নেই। প্রাচীনকালের আর্যঋষিগণ ছিলেন এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা।
বিশ্ব সৃষ্টির সাথে সাথে হিন্দুধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুধর্ম অন্যতম প্রাচীন ধর্ম। এ ধর্মের প্রাচীন নাম সনাতন ধর্ম। এ সনাতন ধর্মের কোনো নির্দিষ্ট প্রবর্তকরূপে কোনো ব্যক্তিকে নির্দেশ করা যায় না। এ ধর্মের মূলে রয়েছেন ভগবান স্বয়ং। হিন্দুধর্ম বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। মানবসভ্যতায় প্রাচীন যুগে মানুষের মনে যখন ধর্মবোধ জেগে ওঠে, সেখান থেকে সনাতন ধর্মের বিকাশ শুরু হয়। সিন্ধু সভ্যতায় মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতায় নিদর্শন থেকে হিন্দুধর্মের পরিচয় ও ধারণা লাভ করা যায়। আর্যরা যখন এদেশে আসে তখন তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে সিন্ধু সভ্যতায় সংঘর্ষ বাঁধে। ফলে সিন্ধুসভ্যতার সাথে আর্য সভ্যতার একটি সমন্বয় ঘটে। এতে হিন্দুধর্মের চর্চার সাথে অর্যধর্মের বিশ্বাস মিলিত হয়ে একটা নতুন রূপ ধারণ করে। আর্যগণ সুপ্রাচীন সিন্ধুনদের তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করত। সেখানকার বিদেশিরা সিন্ধুকে হিন্দু উচ্চারণ করত। এই সিন্ধুনদের তীরবর্তী লোকদের ধর্মকে হিন্দুধর্ম বলে আখ্যায়িত করে।
সুতরাং সৃষ্টির সাথে সাথে হিন্দুধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ। প্রাচীন সনাতন ধর্মই হিন্দুধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করেছে। তবে সময়ের অগ্রগতিতে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে হিন্দুধর্ম একটি বিশেষ স্থান দখল করেছে। তাই হিন্দুধর্ম একটি বিকাশমান ধর্ম।
হিন্দুধর্মের বিকাশমান বৈশিষ্ট্যের তিনটি স্তরের মধ্যে প্রথমে আসে বৈদিক যুগ। বেদের মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবগণের উদ্দেশ্যে যাগযজ্ঞ করে অভীষ্ট লাভের প্রার্থনা করা হতো বৈদিক যুগে। যাগযজ্ঞের অনুশীলন করে আর্যগণ দুটি বস্তুর প্রতি প্রার্থনা জানাতেন শ্রী ও ধী। শ্রী অর্থাৎ ধন-ধান্য, বল-বিক্রম, যশ ইত্যাদি পার্থিব কাম্যবস্তু। আর ধী হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। এ দুটি চিন্তাধারার মধ্য দিয়েই হিন্দুধর্মের মূল তত্ত্বটি প্রকটিত হয়েছে। বৈদিক যুগের ঋষিদের ধর্মীয় চিন্তাচেতনায় জাগতিক ও পরমার্থিক উভয়বিধ কল্যাণ অর্জনের উদ্দেশ্য ছিল। বৈদিক যুগে ঋষিগণ ছিলেন সুখবাদী, জীবনবাদী। বৈদিক যুগের প্রার্থনায় দেখা যায় জীবনে সমৃদ্ধি, জীবের প্রতি স্নেহপ্রীতি এবং জগতের শান্তি কামনা। একে ঈশ্বরবাদ বলা হয়। এ যুগের জ্ঞানপ্রধান উপনিষদ ও দার্শনিক চিন্তার পর্যায়ে এসে তৎকালীন ঋষিগণ উপলব্ধি করেন, মোক্ষলাভই জীবনের উদ্দেশ্য এবং এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কাম্যকর্ম পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করতে হবে। এ স্তরে মুক্তিলাভের পথপ্রদর্শক হিসেবে বহু উপনিষদ গ্রন্থ রচনা হয়। বৈদিক যুগের ধর্মচিন্তায় কাম্যকর্ম মোক্ষদায়ক নয়। তাই বেদান্তের ব্রহ্মচিন্তা হিন্দুধর্মের চিন্তাজগতে এক পরিবর্তন আনয়ন করে। এভাবে সনাতন ধর্মের দুটি শাখা গড়ে ওঠে- একটি কর্মমার্গ এবং অপরটি জ্ঞানমার্গ।
প্রশ্নের উক্তিটি স্বামী বিবেকানন্দ প্রণীত। আধুনিক ধর্ম সংস্কারের যুগে স্বামী বিবেকানন্দের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি ছিলেন মহান সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের অনুগত শিষ্য। ঠাকুর রামকৃষ্ণের মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপিত হয়। এ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন নামে যুগ্ম প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী ভাবান্দোলন বা বেদান্ত আন্দোলন সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করছে। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী বা আদর্শ শুধু হিন্দুধর্মের প্রেক্ষাপটে নয়, বরং বিশ্ব মানবতার ক্ষেত্রেও সমানভাবে ক্রিয়াশীল। কিন্তু ধর্ম সংস্কারের এ যুগে স্বামী বিবেকানন্দের আগে ও পরে আরো অনেক মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে। ঊনবিংশ শতকে হিন্দুধর্মে তথা বাংলাদেশের হিন্দুধর্মে এক বিশেষ চিন্তাচেতনার বিকাশ লক্ষ করা যায়। একেশ্বরবাদী রাজা রামমোহন রায়, মাতৃসাধক শ্রীরামকৃষ্ণ, মতুয়াবাদের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুর, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর, ইসকন-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ, সৎসঙ্গ সংগঠন- এর প্রতিষ্ঠাতা ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, অযাচক আশ্রমের প্রণেতা স্বামী স্বরূপানন্দ, পরমহংস, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে ভূমিকা রাখা স্বামী • প্রণবানন্দ, বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী প্রমুখ মহাপুরুষের আবির্ভাবে হিন্দুধর্মে নানা ভাবধারা ও মতাদর্শের উপস্থিতি ঘটেছে। বিভিন্ন মত ও পথের বৈচিত্র্যের মাঝেও হিন্দুধর্মাবলম্বীগণ সনাতন বাবধারা বজায় রেখে চলছে। প্রশ্নের উক্তিতে স্বামী বিবেকানন্দের যে বাণী তুলে ধরা হয়েছে এর পাশাপাশি উপরিউক্ত সংস্কারকগণের মতবাদও হিন্দুধর্ম সংস্কারে জায়গা করে নিয়েছে।
Related Question
View Allভগবান স্বয়ং বা তাঁর কোনো দেব-দেবী মনুষ্যাদির মূর্তি ধারণ করে ভগবানের অপ্রাকৃত নিত্যধাম থেকে নেমে আসাকে অবতার বলা হয়। আর অবতার সম্পর্কে যে দার্শনিক চিন্তাভাবনা, তা অবতারবাদ নামে পরিচিত।
বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। ব্রহ্ম বা ঈশ্বর একাধিক নয়। এই যে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, তাকে একেশ্বরবাদ বলে। আবার অবতার ও দেব-দেবী একই ঈশ্বরের বিভিন্ন প্রকাশ, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় এ বিশ্বাসই একেশ্বরবাদ। সুতরাং একেশ্বরবাদ হিন্দুধর্মের একটি বিশ্বাস।
শংকর স্বামী স্বরূপানন্দের মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর শহরে শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংস বাংলাদেশের চাঁদপুর শহরে আবির্ভূত হন। তিনি 'অযাচক আশ্রম' এর প্রতিষ্ঠাতা। এ আশ্রমে অন্যের কাছ থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না; এরা নিজেদের অর্থের সংস্থান নিজেরাই করেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি স্বামী স্বরূপানন্দের আদর্শকে রূপদান করার লক্ষ্যে চরিত্র গঠন আন্দোলন শুরু হয়। এর মূল আবেদন, "আমি ভালো মানুষ হব এবং অপরকে ভালো হতে সহায়তা দিব।" শংকর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে অযাচক আশ্রমের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
উদ্দীপকের আলোচিত মহাপুরুষ হচ্ছেন শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংস। তিনি ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর শহরে আবির্ভূত হন। তিনি 'অযাচক আশ্রম' এর প্রতিষ্ঠাতা। অযাচক আশ্রমের বৈশিষ্ট্য হল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমবেত উপাসনায় চরিত্র, গঠন, সমাজ সংস্কার, ব্রহ্মচর্য স্বাবলম্বন ও জগতের কল্যাণের কাজে নিযুক্ত থাকা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে অর্থ যাচঞা না করা এ সংগঠনের আদর্শ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগিতায় ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি স্বামী স্বরূপানন্দের আদর্শকে রূপদান করার লক্ষ্যে চরিত্র গঠন আন্দোলন শুরু হয়। এর মূল আবেদন, "আমি ভালো মানুষ হব এবং অপরকে ভালো হতে সহায়তা দিব।" স্বামী স্বরূপানন্দের মতাদর্শ থেকে আমরা এ শিক্ষা পাই যে, সকলকে সমানভাবে ভালোবাসতে হবে। স্বামী স্বরূপানন্দ রচিত গ্রন্থাদি ও সংগীত সমাজের কল্যাণ সাধনে বিশেষ অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছে।
কারও অনিষ্ট কামনা না করে সকলকে মন থেকে ভালোবাসাকেই অহিংসা বলে।
হরিচাঁদ ঠাকুরের ধর্মনীতি থেকে মতুয়া ধর্মের উদ্ভব হলো। হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে আবির্ভূত হয়ে হিন্দু সমাজে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে এক হরিণামে যেতে থাকার আহ্বান জানান। এ ধর্মের মূলমন্ত্র হচ্ছে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হরিণামে মেতে থাকা। হরিণামই জগতে কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করতে আবশ্যক।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!