ঘটনা-১: জনাব হাফিজ একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি কোনো ধরনের ঘুষ গ্রহণ বা দুর্নীতি করেন না। তিনি দেশকে ভালোবাসেন এবং দেশের উন্নতির জন্য নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন। ঘটনা-২: জনাব আরিফ একজন আইনজীবী। টাকার বিনিময়ে তিনি দুর্নীতিবাজ, অসৎ ও অন্যায়কারী ব্যক্তিদের সৎ ও নির্দোষ প্রমাণিত 'করে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ফলে তারা আরো বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে।
আল্লাহর একত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ও পরিচালিত হয় বলে ইসলামি সমাজব্যবস্থাকে তাওহিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা বলা হয়। তাওহিদ ইসলামি সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা, আইনপ্রণেতা এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে স্বীকার করাকে তাওহিদ বলে। তাওহিদে বিশ্বাস ছাড়া কোনো ব্যক্তিই মুমিন বা মুসলমান হতে পারে না। তাই ইসলামি সমাজের সব কর্মকাণ্ড এ মৌলিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও শিক্ষা বিস্তারে মুসলমানদের অবদান অপরিসীম। আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা বিস্তারের মহৎ কাজটি রাসুল (স) তাঁর নিজ গৃহ থেকে সর্বপ্রথম শুরু করেন। তিনি হযরত আরকাম (রা) এর বাড়িতে 'দারুল আরকাম' নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। রাসুল (স) মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববিকে উন্মুক্ত শিক্ষাকেন্দ্রে রূপ দেন। সাহাবিরাও শিক্ষা বিস্তারে বিরাট ভূমিকা রাখেন। আবু বকর (রা) কুরআন শরিফকে গ্রন্থাবদ্ধ করেন। উসমান (রা) কুরআন সংকলন করেন। উমর (রা) শিক্ষকদের সম্মানী নির্ধারণ করেন এবং শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে সাহাবিদের বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেছেন। উমর বিন আব্দুল আজিজ (রা)-এর সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে হাদিস সংকলন, বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন, ফিকহ সম্পাদনা পরিষদ গঠন করা হয়। আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে 'বায়তুল হিকমাহ' নামে একটি বিজ্ঞানাগার তৈরি করেন।
ইবনে সিনা, আল রাযি, ইবনে রুশদ, ইবনে আব্বাস, ইমাম গাযযালি (র) অসামান্য অবদান রাখেন। গণিতশাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান অবিস্মরণীয়। বীজগণিতের জনক মুসা আল খারিযমি। পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা-বিস্তার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলমানগণ অবদান রেখে গেছেন। তাদের দেখানো পথে বর্তমান বিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন গবেষণা ও অধ্যয়ন করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি সাধন করছেন।
বর্তমানে ইমামগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও শিক্ষা বিস্তারের কাজে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেন। মক্তবে পাঠদান, জুমার উদ্দীপকে শিক্ষক পাঠদানকালে শিক্ষার্জনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স) শিক্ষা অর্জনের যে তাগিদ দিয়েছেন তা উল্লেখ করেন এবং বর্তমান সময়ে এরই ধারবাহিকতায় মসজিদের ইমামগণও আল্লাহ ও রাসুল (স) এর মিশন বিভিন্নভাবে সমাজে পরিচালিত করতে পারে তার দিকেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
ইমামগণ শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মক্তব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যা মসজিদে অথবা মসজিদের বাইরেও পরিচালিত হতে পারে। যেখানে ছোট ছোট শিশুরা কুরআন, হাদিস, আদব-আখলাক, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারে। তাছাড়া বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র বা গণবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যার দ্বারা সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ হোক ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই শিক্ষা অর্জন করবে এবং নিরক্ষরতা দূর করবে। ইমাম সাহেব প্রতি শুক্রবার সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ের ওপর খুতবায় আলোচনা করতে পারেন এবং কুরআন ও হাদিসের আলোকে সমস্যার সমাধান করতে পারেন। ইমামগণ সেমিনার সিম্পোজিয়াম, পত্র-পত্রিকা, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমেও এই মহান কাজটি করতে পারেন। এভাবে তারা মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় কাজ থেকে যেমন বিরত রাখতে পারেন তেমনি শিক্ষা অর্জনে উৎসাহ প্রদান করে শিক্ষা বিস্তারে মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারেন।
মসজিদকে কেন্দ্র করে ইসলামি সমাজের সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় একে ইসলামি সমাজের কেন্দ্রবিন্দু বলা হয়। মসজিদকে কেন্দ্র করেই ইসলামি সমাজ গড়ে ওঠে ও পরিচালিত হয়। আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষকে ইমান-আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মসজিদের ভূমিকা অপরিসীম।
ঘটনা-১ এ দেশপ্রেম এবং কর্তব্যপরায়ণতার প্রতিফলন ঘটেছে। নিজের দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসাই দেশপ্রেম। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নাগরিক সবসময় দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। দেশের সংবিধান এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে তিনি জড়িত হন না। আবার অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে যথাযথভাবে পালন করাকে বলা হয় কর্তব্যপরায়ণতা। একজন কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি যেকোনো ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে নিষ্ঠার সাথে নিজের কর্তব্য পালন করে থাকেন। জনাব হাফিজের কর্মকাণ্ডে উল্লিখিত দুটি বিষয়েরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। উদ্দীপকের ঘটনা-১ এ উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা জনাব হাফিজ কোনো ধরনের ঘুষ গ্রহণ বা দুর্নীতি করেন না। তিনি দেশকে ভালোবাসেন এবং দেশের উন্নতির জন্য নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন। তার এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। তিনি একদিকে যেমন নিজের দেশকে ভালোবাসেন, অন্যদিকে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেও সচেতন। অবৈধভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের পেছনে না ছুটে কেবল দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির লক্ষ্যেই তিনি কাজ করেন। সুতরাং বলা যায়, জনাব হাফিজ একজন কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি এবং খাঁটি দেশপ্রেমিক।