উৎপাদনের উপকরণে বিশেষ করে কাঁচামাল ও শ্রম ইত্যাদির দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে যে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, তাই হলো ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি।
মুদ্রাস্ফীতির সময়ে করদাতা লাভবান হন। মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় করদাতা সুবিধা পায়। কারণ করের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও দ্রব্যসামগ্রীর হিসাবে তাদেরকে কম সম্পদ ত্যাগ করতে হয়। সুতরাং মুদ্রাস্ফীতির ফলে করের প্রকৃত ভার হ্রাস পায়। তাই বলা যায়, মুদ্রাস্ফীতির সময়ে করদাতা লাভবান হন।
মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপে বহুল প্রচলিত পদ্ধতির নাম ভোক্তার দাম বা মূল্য সূচক। ভোক্তার মূল্য সূচকে কতিপয় দ্রব্য ও সেবা ক্রয়ের ব্যয় পরিমাপ করা হয়। বর্তমান বছরের ব্যয়ের সাথে ভিত্তি বছরের ব্যয়ের তুলনা করে এ সূচক তৈরি করা হয়। ভিত্তি বছরের দামস্তরকে ১০০ ধরে সাধারণত ভোক্তার মূল্য সূচক যে হারে বৃদ্ধি পায় সে হারকে মুদ্রাস্ফীতির হার হিসেবে গণ্য করা হয়। উদ্দীপকের আলোকে x' দেশের ভোক্তার মূল্য সূচক (CPI) নিচে নির্ণয় করা হলো-
| ভোগ্য দ্রব্যের নাম | ২০১০ সাল | ২০১৪ সাল | |||
| পরিমাণ | দাম | ব্যয় | দাম | ব্যয় | |
| চাল | ৩৫ | ৩০ | ১০৫০ | ৩৮ | ১৩৩০ |
| গম | ১০ | ২৮ | ২৮০ | ৩২ | ৩২০ |
| চিনি | ৫ | ৩৫ | ১৭৫ | ৪৩ | ২১৫ |
| বিবিধ | ১২ | ২০ | ২৪০ | ২৪ | ২৮৮ |
| মোট ব্যয় | |||||
ভোক্তার মূল্য সূচক (CPI)
এখানে
= বর্তমান সময়ের দাম
= দ্রব্যের পরিমাণ
ভিত্তি বছরের দাম
ভোক্তার মূল্য সূচক = ১২৩.৩৮
অতএব বলা যায়, উদ্দীপকের 'X' দেশের ভোক্তার মূল্য সূচক ১২৩.৩৮।
সরকারের গৃহীত কার্যক্রমসমূহ দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা অর্জনে যেভাবে ভূমিকা রাখে উদ্দীপকের আলোকে নিচে তা ব্যাখ্যা করা হলো-
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকহার বৃদ্ধি করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ব্যাংকগুলোর ঋণপত্রের খরচ বেশি পড়ে বিধায় বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কম ঋণ গ্রহণ করে; ফলে তাদের ঋণ প্রদান ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসে। এমতাবস্থায় বেসরকারি ভোগ ও বিনিয়োগ প্রবণতা হ্রাসহেতু সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস পায় ও মূল্যস্তর হ্রাস পায়। মূল্যস্তর হ্রাসের ফলে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়।
মুদ্রাস্ফীতির সময় জনসাধারণকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা হ্রাস করা যায়। বিভিন্ন আমানতী হিসেবে সুদের হার কিছুটা বৃদ্ধি করে মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা যায়। এছাড়া বিভিন্ন ঋণপত্র বিক্রয়ের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত আয় তুলে নিয়ে স্বল্পকালে মুদ্রাস্ফীতির চাপ হ্রাস করা সম্ভব হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নগদ রির্জাভ বৃদ্ধির আইনগত বিধান প্রয়োগ করলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ভোগপ্রবণতা হ্রাস পায় এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসহেতু মূল্যস্তর হ্রাস পায় এর ফলে দ্রব্য মূল্যের স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়।
দ্রব্যসামগ্রীর দাম কমাতে হলে পরোক্ষ করের হার বৃদ্ধি না করে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য প্রত্যক্ষ করের আওতা বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়া দ্রব্যসামগ্রীর স্থিতিশীলতা আনতে সরকার ভ্যাট, আবগারি শুল্ক/কর, বিক্রয় কর ইত্যাদি হ্রাস করলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে ও মুদ্রাস্ফীতি রোধ হবে। ফলে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা অর্জিত হবে।
উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, উদ্দীপকে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমসমূহ দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা অর্জনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
Related Question
View Allদামস্তর বৃদ্ধির মাত্রা বা হার অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়।
সামগ্রিক চাহিদা সামগ্রিক যোগানের চেয়ে বেশি হলে দামস্তরের বৃদ্ধি ঘটে। দামস্তরের এ ধরনের বৃদ্ধিকে চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি বলে। সাধারণত দ্রব্যবাজারে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এ মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হয়। চাহিদা বৃদ্ধিজনিত। মুদ্রাস্ফীতি মূল্য বাড়ার প্রত্যাশা দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সংকোচনমুখী মুদ্রা এবং ফিসক্যাল নীতি অনুসরণ করার প্রয়োজন হয়।
উদ্দীপকে বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ।
সাধারণভাবে দেখা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশে সম্পদের স্বল্পতা, মূলধনের অভাব, প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত অর্থের যোগান দামস্তরের বৃদ্ধি ঘটায়। ফলে
মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশেও ঠিক একই অবস্থা বর্তমান।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর থেকে এ দেশে মুদ্রাস্ফীতি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৭.৩৫%। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের শেষে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৬.৪১%। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সার্বিকভাবে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫.৯২%-এ দাঁড়ায়। বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতির পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মজুদ ও চোরাচালানের খুব বেশি প্রভাব রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি সহনীয় রাখার জন্য সরকার রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
যেকোনো দেশে মুদ্রাস্ফীতি সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অপরিসীম। বাংলাদেশেও একই অবস্থা বিরাজমান। নিচে উক্ত বিষয়টির প্রভাব বিশ্লেষণ করা হলো-
মুদ্রাস্ফীতি পূর্ণ নিয়োগপূর্ব অবস্থায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ফলে মুনাফার প্রত্যাশা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা দেয়। কিন্তু পূর্ণ নিয়োগ-পরবর্তী অবস্থায় মুদ্রাস্ফীতি উৎপাদন ব্যাহত করে। মুদ্রাস্ফীতি উৎপাদনের মতো কর্মসংস্থানেও একই ধরনের প্রভাব ফেলে। যখন উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, তখন কর্মসংস্থান বা নিয়োগ বেশি থাকে, আবার উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান বা নিয়োগ কমে যায়।
মুদ্রাস্ফীতি আয় ও সম্পদ বণ্টনের উপর কখনও ইতিবাচক, আবার কখনও নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। আয় ও সম্পদের পূর্ণ বণ্টনে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে কেউ লাভবান, আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুদ্রাস্ফীতি দামস্তরের বৃদ্ধি ঘটানোর ফলে রপ্তানির পরিমাণ কমে যায়। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়। মুদ্রাস্ফীতির সময় কর, মুনাফা ইত্যাদি বৃদ্ধি পায় বলে সরকারি আয় বেড়ে যায়, আবার দামস্তর বৃদ্ধির কারণে সরকারি ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। মুদ্রাস্ফীতি সামাজিক শ্রেণি বিভাজনের সৃষ্টি করে, ফলে সমাজে ধনবৈষম্য, অর্থাৎ ধনী-দরিদ্র বিরোধ ও অসন্তোষ বিরাজ করে। কলকারখানার শ্রমিক-মালিক বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। সার্বিকভাবে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে সমাজজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। মুদ্রাস্ফীতি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে বলে রাজনৈতিক পরিবেশও বিঘ্নিত হয়।
সবশেষে বলা যায়, স্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির জন্য সমস্যা না হলেও ক্রমাগত দামস্তরের বৃদ্ধিতে অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিলে অর্থনীতিতে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়।
যে সূচকে কতিপয় দ্রব্য ও সেবা ক্রয়ের ব্যয় পরিমাপ করা হয়, তা-ই হলো ভোক্তার দাম সূচক।
বর্তমান বছরের ব্যয়ের সাথে ভিত্তি বছরের ব্যয়ের তুলনা করে ভোক্তার দাম সূচক তৈরি করা হয়। ভিত্তি বছরের দামস্তরকে ১০০ ধরে সাধারণত ভোক্তার দাম সূচক যে হারে বৃদ্ধি পায়, সে হারকে মুদ্রাস্ফীতির হার হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে
দাম সূচক (CPI) নিম্নরূপে হিসাব করা হয়-
ভোক্তার দাম সূচক (CPI)
এখানে,= বর্তমান সময়ের দাম,
= দ্রব্যের পরিমাণ,
= ভিত্তি বছরের দাম।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!