প্রমথ চৌধুরী তাঁর কালজয়ী প্রবন্ধ 'সাহিত্যে খেলা'-য় সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি সাহিত্যের নিছক ব্যবহারিক উপযোগিতা বা নীতিশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এর ভূমিকার বিরোধিতা করে এর স্বকীয় আনন্দ ও সৌন্দর্যময় দিকটির ওপর জোর দিয়েছেন।
চৌধুরী মনে করতেন, সাহিত্য জীবনের প্রত্যক্ষ কোনো উপকারে আসে না। তিনি সেই ধারণা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন যেখানে সাহিত্যকে নীতিশিক্ষা প্রদানের, সমাজ সংস্কারের কিংবা কোনো বিশেষ মতবাদ প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য যদি জ্ঞান বিতরণ বা উপকার করা হয়, তাহলে তা সাহিত্য থাকে না, প্রবন্ধ বা শাস্ত্র হয়ে ওঠে।
তিনি সাহিত্যকে 'খেলা'র সঙ্গে তুলনা করেছেন। খেলার মূল উদ্দেশ্য যেমন খেলা করাই, কোনো প্রত্যক্ষ ফল লাভ নয়, তেমনি সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হলো পাঠককে অনাবিল আনন্দ দেওয়া, তার রুচির পরিমার্জন করা এবং তার মনোজগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা। এ খেলা আত্মার খেলা, বুদ্ধির খেলা, যাতে মানুষের মন মুক্তি পায় এবং নন্দনতাত্ত্বিক আনন্দ লাভ করে।
প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্যের প্রধান ধর্ম হলো 'রস' সৃষ্টি করা। রস অর্থাৎ আনন্দ। সাহিত্যিক যখন নিছক আনন্দের জন্য রচনা করেন, তখনই তা প্রকৃত সাহিত্য হয়ে ওঠে। যখন এর মধ্যে উপদেশ, নীতি অথবা কোনো সামাজিক বার্তা প্রদানের চেষ্টা করা হয়, তখন তা তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারায়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, সাহিত্যিক যদি পাঠকের মনোরঞ্জন করতে না পারেন, তবে তাঁর লেখা ব্যর্থ।
উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলা সাহিত্যে যে আধুনিকতার জোয়ার এসেছিল, প্রমথ চৌধুরীর এই অভিমত তারই ফলশ্রুতি। তিনি রোমান্টিক ভাবাবেগ এবং ভিক্টোরীয় যুগের নীতিবাদী প্রবণতাকে অতিক্রম করে শিল্পকলা ও সাহিত্যের নিজস্বতা এবং স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর এ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বাংলা সাহিত্যের আধুনিকায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যকে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে দেখেছেন, যার উদ্দেশ্য হলো কেবল আনন্দ দান এবং বুদ্ধির পরিশীলন ঘটানো। তাঁর এই অভিমত বাংলা সাহিত্যে নতুন চিন্তাধারার জন্ম দেয় এবং সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিরাচরিত ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়, যা আজও প্রাসঙ্গিক।
বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক ও বিদ্রূপাত্মক প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী। তীক্ষ্ণ মননশীলতা, বাকচাতুর্যের চমৎকারিত্ব এবং বুদ্ধির অসিচালনা ছিল তাঁর ভাষাগত বিশেষত্ব। তিনি ১৮৯৯ সালে রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ বাংলা প্রথম সিভিলিয়ান সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বাংলা গদ্যে চলিত রীতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেন।
প্রমথ চৌধুরী ৭ আগস্ট, ১৮৬৮ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস- পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রাম।
তাকে বলা হয় বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক ও বিদ্রূপাত্মক প্রাবন্ধিক।
প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যিক ছদ্মনাম-বীরবল।
প্রমথ চৌধুরীর প্রথম প্রবন্ধ 'জয়দেব' ১৮৯৩ সালে 'সাধনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
'হালখাতা' ('ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশ- ১৯০২), এ গদ্য /প্রবন্ধ রচনায় তিনি প্রথম চলিত রীতির প্রয়োগ ঘটান।বাংলা কা
ব্যে তিনিই প্রথম ইতালীয় সনেটের প্রবর্তন করেন।
তিনি 'সবুজপত্র' (১৯১৪), 'বিশ্বভারতী পত্রিকা' সম্পাদনা করেন।
তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ সালে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন। উল্লেখ্য, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নিজ মাতার নামে এ পদক প্রবর্তন করেন।
তিনি ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ সালে (১৬ ভাদ্র, ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ) শান্তিনিকেতনে মারা যান।
চলিত রীতিতে রচিত তাঁর প্রথম গদ্যরচনাঃ
'হালখাতা' (১৯০২): এটি 'ভারতী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। [বাজারের অধিকাংশ বইয়ে লেখা যে, চলিত ভাষায় রচিত প্রমথ চৌধুরীর প্রথম গ্রন্থ 'বীরবলের হালখাতা'। প্রকৃতপক্ষে এটি হবে 'হালখাতা'। কারণ, 'বীরবলের হালখাতা' প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে আর 'হালখাতা' গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে। (সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান)]। উল্লেখ্য, চলিত ভাষায় রচিত প্রথম গ্রন্থ কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরের অপশনে 'হালখাতা' না থাকলে 'বীরবলের হালখাতা' উত্তর দিতে হবে। কারণ, অধিকাংশ প্রশ্নকর্তা বিগত সালের পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো নতুন প্রশ্নে অপশনসহ হুবহু তুলে দেয়।
বাংলা কথ্যরীতিতে রচিত প্রথম গ্রন্থ হলো প্যারীচাঁদ মিত্রের 'আলালের ঘরের দুলাল'। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রচনা। এর পূর্বে বাংলা গদ্য সাহিত্য প্রধানত সংস্কৃত প্রভাবিত সাধু ভাষায় লেখা হতো। প্যারীচাঁদ মিত্র প্রচলিত কথ্যভাষা বা 'আলালী ভাষা' ব্যবহার করে একটি নতুন ধারার সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে চলিত রীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উপন্যাসে তৎকালীন বাঙালি সমাজের বাস্তব চিত্র, বিশেষ করে বিত্তবান পরিবারের সন্তানদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও তাদের পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।