'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা আলোচনা করুন।

Updated: 11 months ago
উত্তরঃ

প্রমথ চৌধুরী তাঁর কালজয়ী প্রবন্ধ 'সাহিত্যে খেলা'-য় সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি সাহিত্যের নিছক ব্যবহারিক উপযোগিতা বা নীতিশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এর ভূমিকার বিরোধিতা করে এর স্বকীয় আনন্দ ও সৌন্দর্যময় দিকটির ওপর জোর দিয়েছেন।

চৌধুরী মনে করতেন, সাহিত্য জীবনের প্রত্যক্ষ কোনো উপকারে আসে না। তিনি সেই ধারণা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন যেখানে সাহিত্যকে নীতিশিক্ষা প্রদানের, সমাজ সংস্কারের কিংবা কোনো বিশেষ মতবাদ প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য যদি জ্ঞান বিতরণ বা উপকার করা হয়, তাহলে তা সাহিত্য থাকে না, প্রবন্ধ বা শাস্ত্র হয়ে ওঠে।

তিনি সাহিত্যকে 'খেলা'র সঙ্গে তুলনা করেছেন। খেলার মূল উদ্দেশ্য যেমন খেলা করাই, কোনো প্রত্যক্ষ ফল লাভ নয়, তেমনি সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হলো পাঠককে অনাবিল আনন্দ দেওয়া, তার রুচির পরিমার্জন করা এবং তার মনোজগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা। এ খেলা আত্মার খেলা, বুদ্ধির খেলা, যাতে মানুষের মন মুক্তি পায় এবং নন্দনতাত্ত্বিক আনন্দ লাভ করে।

প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্যের প্রধান ধর্ম হলো 'রস' সৃষ্টি করা। রস অর্থাৎ আনন্দ। সাহিত্যিক যখন নিছক আনন্দের জন্য রচনা করেন, তখনই তা প্রকৃত সাহিত্য হয়ে ওঠে। যখন এর মধ্যে উপদেশ, নীতি অথবা কোনো সামাজিক বার্তা প্রদানের চেষ্টা করা হয়, তখন তা তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারায়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, সাহিত্যিক যদি পাঠকের মনোরঞ্জন করতে না পারেন, তবে তাঁর লেখা ব্যর্থ।

উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলা সাহিত্যে যে আধুনিকতার জোয়ার এসেছিল, প্রমথ চৌধুরীর এই অভিমত তারই ফলশ্রুতি। তিনি রোমান্টিক ভাবাবেগ এবং ভিক্টোরীয় যুগের নীতিবাদী প্রবণতাকে অতিক্রম করে শিল্পকলা ও সাহিত্যের নিজস্বতা এবং স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর এ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বাংলা সাহিত্যের আধুনিকায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যকে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে দেখেছেন, যার উদ্দেশ্য হলো কেবল আনন্দ দান এবং বুদ্ধির পরিশীলন ঘটানো। তাঁর এই অভিমত বাংলা সাহিত্যে নতুন চিন্তাধারার জন্ম দেয় এবং সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিরাচরিত ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
1.5k

প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)

বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক ও বিদ্রূপাত্মক প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী। তীক্ষ্ণ মননশীলতা, বাকচাতুর্যের চমৎকারিত্ব এবং বুদ্ধির অসিচালনা ছিল তাঁর ভাষাগত বিশেষত্ব। তিনি ১৮৯৯ সালে রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ বাংলা প্রথম সিভিলিয়ান সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বাংলা গদ্যে চলিত রীতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেন।

  • প্রমথ চৌধুরী ৭ আগস্ট, ১৮৬৮ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস- পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রাম।
  • তাকে বলা হয় বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক ও বিদ্রূপাত্মক প্রাবন্ধিক।
  • প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যিক ছদ্মনাম-বীরবল।
  • প্রমথ চৌধুরীর প্রথম প্রবন্ধ 'জয়দেব' ১৮৯৩ সালে 'সাধনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
  • 'হালখাতা' ('ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশ- ১৯০২), এ গদ্য /প্রবন্ধ রচনায় তিনি প্রথম চলিত রীতির প্রয়োগ ঘটান।বাংলা কা
  • ব্যে তিনিই প্রথম ইতালীয় সনেটের প্রবর্তন করেন।
  • তিনি 'সবুজপত্র' (১৯১৪), 'বিশ্বভারতী পত্রিকা' সম্পাদনা করেন।
  • তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ সালে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন। উল্লেখ্য, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নিজ মাতার নামে এ পদক প্রবর্তন করেন।
  • তিনি ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ সালে (১৬ ভাদ্র, ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ) শান্তিনিকেতনে মারা যান।

চলিত রীতিতে রচিত তাঁর প্রথম গদ্যরচনাঃ

'হালখাতা' (১৯০২): এটি 'ভারতী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। [বাজারের অধিকাংশ বইয়ে লেখা যে, চলিত ভাষায় রচিত প্রমথ চৌধুরীর প্রথম গ্রন্থ 'বীরবলের হালখাতা'। প্রকৃতপক্ষে এটি হবে 'হালখাতা'। কারণ, 'বীরবলের হালখাতা' প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে আর 'হালখাতা' গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে। (সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান)]। উল্লেখ্য, চলিত ভাষায় রচিত প্রথম গ্রন্থ কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরের অপশনে 'হালখাতা' না থাকলে 'বীরবলের হালখাতা' উত্তর দিতে হবে। কারণ, অধিকাংশ প্রশ্নকর্তা বিগত সালের পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো নতুন প্রশ্নে অপশনসহ হুবহু তুলে দেয়।

প্রমথ চৌধুরী রচিত অন্যান্য সাহিত্যকর্মগুলো:

প্রবন্ধগ্রন্থ: 'তেল-নুন-লড়ি' (১৯০৬), 'বীরবলের হালখাতা' (১৯১৬), 'নানাকথা' (১৯১৯), 'আমাদের শিক্ষা' (১৯২০), 'রায়তের কথা' (১৯২৬), 'নানাচর্চা' (১৯৩২), 'আত্মকথা' (১৯৪৬), 'প্রবন্ধ সংগ্রহ' (১ম খণ্ড- ১৯৫২, ২য় খণ্ড- ১৯৫৩)।

কাব্যগ্রন্থ: 'সনেট পঞ্চাশৎ' (১৯১৩), 'পদচারণ' (১৯১৯)।

গল্পগ্রন্থ: 'চার ইয়ারি কথা' (১৯১৬), 'আহুতি' (১৯১৯), 'নীললোহিত ও গল্পসংগ্রহ' (১৯৪১)।

প্রবন্ধ: 'যৌবনে দাও রাজটীকা', 'বই পড়া', 'সাহিত্যে খেলা', 'ভাষার কথা'।

'বই পড়া' ও 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধ ২টি অবশ্যই পড়তে হবে। কারণ, এ দুটি প্রবন্ধ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে।

বিখ্যাত উক্তি

বই পড়াআমরা সাহিত্যের রস উপভোগ করতে প্রস্তুত নই; কিন্তু শিক্ষার ফল লাভের জন্য আমরা সকলে উদ্বাহু।
ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়।
জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয়, এ সত্য তো প্রত্যক্ষ।
যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী।
সাহিত্যের মধ্যেই আমাদের জাত মানুষ হবে।
সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।
দেহের মৃত্যুর রেজিস্টারি রাখা হয়, আত্মার মৃত্যুর হয় না।
আমি লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের ওপরে স্থান দিই। লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল।
খেলা সাহিত্যেযিনি গড়তে জানেন, তিনি শিবও গড়তে পারেন বাঁদরও গড়তে পারেন।
মন উচুতেও উঠতে চায়, নিচুতেও নামতে চায়।
শিল্পরাজ্যে খেলা করবার প্রবৃত্তির ন্যায় অধিকারও বড়ো-ছোটো সকলেরই সমান আছে।
এ পৃথিবীতে একমাত্র খেলার ময়দানে ব্রাহ্মণ শূদ্রের প্রভেদ নেই।
যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি-পাওনার আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, জুয়াখেলা।
গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না।।
সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারো মনোরঞ্জন করা নয়।
কাব্যজগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা।
কবির নিজের মনের পরিপূর্ণতা হতেই সাহিত্যের উৎপত্তি।
সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।
ভাষার কথাভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, উল্টোটা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে।

Related Question

View All
উত্তরঃ প্যারীচাঁদ মিত্র
আলালের ঘরের দুলাল

বাংলা কথ্যরীতিতে রচিত প্রথম গ্রন্থ হলো প্যারীচাঁদ মিত্রের 'আলালের ঘরের দুলাল'। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রচনা। এর পূর্বে বাংলা গদ্য সাহিত্য প্রধানত সংস্কৃত প্রভাবিত সাধু ভাষায় লেখা হতো। প্যারীচাঁদ মিত্র প্রচলিত কথ্যভাষা বা 'আলালী ভাষা' ব্যবহার করে একটি নতুন ধারার সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে চলিত রীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উপন্যাসে তৎকালীন বাঙালি সমাজের বাস্তব চিত্র, বিশেষ করে বিত্তবান পরিবারের সন্তানদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও তাদের পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
556
উত্তরঃ

বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী।

PRONAY TIRKI
PRONAY TIRKI
2 years ago
227
উত্তরঃ

বীরবল প্রমথ চৌধুরী লেখকের ছদ্মনাম।

399
274
উত্তরঃ

প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যিক ছদ্মনাম ছিল বীরবল।

PRONAY TIRKI
PRONAY TIRKI
2 years ago
243
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews