বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দুই বান্ধবী ফারজানা ও কাকলি। পড়াশুনা শেষে একই ব্যাংকে একই সাথে একই পদে চাকরিতে জয়েন করে। চার বছর পর কাকলি পদোন্নতি পায়। এতে ফারজানা কিছুটা মনে কষ্ট পায়। কিছুদিন পর থেকে ফারজানা কাকলির বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু দোষ-ত্রুটি অন্য সহকর্মীদের নিকট বলে বেড়াতে লাগল। এতে অফিসের কর্মপরিবেশ কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়। একদিন তাদের অফিসের অফিস সহায়ক বৃদ্ধ হামিদা বেগম ফারজানা বেগমকে বলল 'আপা, কোনো অবস্থাতেই কাকলি আপার অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে কোনো সমালোচনা করা ঠিক নয়।'
(ক)
সিদক-এর অর্থ কী?
সিদক-এর অর্থ হলো- সত্যবাদিতা, সততা, সত্য কথা বলা, সত্য সাক্ষ্য দেওয়া ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে সৃষ্টির সেরা হিসেবে পাঠিয়েছেন। মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন সুন্দর আচার-আচরণ। মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের মাধ্যমে যেসব আচার- ব্যবহার, চালচলন এবং স্বভাবের প্রকাশ ঘটে সেসবের সমষ্টিই আখলাক। এটি শুধু মানুষের সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং জীবজন্তু, পশুপাখি, গাছপালা ও পরিবেশের সাথেও সুন্দর আচরণ প্রয়োজন।
মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার এবং সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে। কখনো আখলাক (আচরণ) প্রশংসনীয় হয় আবার কখনো নিন্দনীয় হয়। প্রশংসনীয় আচরণকে আখলাকে হামিদাহ্ বা সচ্চরিত্র বলে। আর নিন্দনীয় আচরণকে আখলাকে যামিমাহ্ বলে।
আখলাকে হামিদাহ্ বা প্রশংসনীয় আচরণগুলো হলো সত্যবাদিতা, পিতামাতার প্রতি উত্তম ব্যবহার, শিক্ষকদের সম্মান করা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সহপাঠীদের সাথে সদাচরণ, বড়োদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ছোটোদের প্রতি স্নেহ ইত্যাদি।
আখলাকে যামিমাহ্ বা নিন্দনীয় আচরণগুলো হলো মিথ্যা কথা বলা, পরনিন্দা করা, আমানতের খিয়ানত করা, গালি দেওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ইত্যাদি। প্রতিটি মানুষের আখলাকে হামিদাহ্ অর্জন ও আখলাকে যামিমাহ্ বর্জন করা উচিত। আমরা আখলাকে হামিদাহ্ অর্জন করব এবং আখলাকে যামিমাহ্ বর্জন করব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- আখলাকের ধারণা বর্ণনা করতে পারব।
- সদাচরণের ধারণা ও কতিপয় সদাচরণের গুরুত্ব ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করতে পারব।
- কতিপয় অসদাচরণের ধারণা, পরিণতি এবং এগুলো পরিহারের উপায় ব্যাখ্যা করতে পারব।
- ধূমপান ও মাদকাসক্তির ধারণা ও কুফল বর্ণনা করতে পারব।
- বাস্তব জীবনে সদাচরণে আগ্রহী হবো, অসদাচরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে উদ্বুদ্ধ হবো এবং নিকটতম ব্যক্তিদেরও বিরত থাকতে অনুপ্রাণিত করব।
- ধূমপান ও মাদকাসক্তিজনিত সামাজিক ক্ষতি এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে আগ্রহী হবো।
Related Question
View Allমানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের মাধ্যমে যেসব উত্তম আচার-ব্যবহার, চালচলন এবং স্বভাবের প্রকাশ পায় সেসবের সমষ্টিকে আখলাকে হামিদা বা উত্তম চরিত্র বলা হয়।
ফারজানার কর্মকাণ্ডে গিবত প্রকাশ পেয়েছে। কারণ সে তার বন্ধবী কাকলির বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু দোষত্রুটি অন্য সহকর্মীদের নিকট বলে বেড়ায়।
গিবত একটি সামাজিক অনাচার। কারও অগোচরে তার দোষত্রুটি অন্যের কাছে প্রকাশকে গিবত বলে। একে পরনিন্দাও বলা যায়। গিবত একটি ঘৃণিত ও জঘন্য কাজ। এটি কবিরা গুনাহ। এ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। রাসুল (স.) বলে, 'গিবত কী তা কি তোমরা জান?' লোকেরা উত্তরে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। রাসুল (স.) বললেন, গিবত হলো তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে তোমার এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে। জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, এটাও কি গিবত হবে? রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, 'তুমি যা বলো তা যদি তার মধ্যে থাকে তাহলেই গিবত হবে। আর তুমি যা বলো তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তা হবে 'বুহতান' বা অপবাদ।' (মুসলিম)
গিবত একটি নিন্দনীয় কাজ। গিবতের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঘৃণা ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে সমাজজীবনে ঝগড়া-ফাসাদসহ নানা অশান্তি সৃষ্টি হয়।
পবিত্র কুরআনুল করিমে গিবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
আল্লাহর বাণী : "তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে, নিশ্চয়ই তা তোমরা অপছন্দ করবে।" (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)
তাই ফারাজানার উচিত গিবত পরিহার করা এবং স্বাভাবিকভাবে কাকলির পদোন্নতিকে মেনে নেওয়া।
ফারজানা কাকলির দোষত্রুটি প্রকাশ করলে, হামিদা বেগম বলেন, "আপা, কোনো অবস্থাতেই কাকলি আপার অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে সমালোচনা করা ঠিক নয়।" হামিদা বেগমের এ বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষত্রুটি প্রকাশ করার নাম গিবত। গিবত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এটি কবিরাহ গুনাহ। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা একে অপরের গিবত করো না।" (সূরা আল 'হুজুরাত : ১২) গিবত একটি নিন্দনীয় কাজ। এর মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঘৃণা ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় এবং সমাজজীবনে ঝগড়া ফাসাদসহ নানা অশান্তি সৃষ্টি হয়। গিবত শোনাও পাপ, কেউ গিবত করলে 'তাকে এ জঘন্য কাজ হতে বিরত রাখা উচিত। আর এ কাজটিই হামিদা বেগম করেছেন। গিবত থেকে বিরত থাকলে কবিরাহ গুনাহ হতে বেঁচে থাকা যায়, অন্যের শত্রুতা হতে রক্ষা পাওয়া যায়। সর্বোপরি আল্লাহর রহমত পাওয়া যায়।
সুতরাং সবার উচিত গিবত হতে নিজেকে রক্ষা করা এবং গিবত চর্চা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা।
গিবত একটি সামাজিক অনাচার। কারও অগোচরে তার দোষত্রুটি অন্যের কাছে প্রকাশকে গিবত বলে।
আখলাকে হামিদাহ্ বা সচ্চরিত্র আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নিয়ামত। দুনিয়ায় আগত সকল নবি-রাসুলই উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। এছাড়াও পৃথিবীর স্মরণীয় ও বরণীয় মনীষিগণও উত্তম নৈতিক আদর্শ অনুশীলন করতেন। সচ্চরিত্রের মাধ্যমেই ইসলামের যাবতীয় সৌন্দর্য ফুটে ওে ওঠে। এছাড়া এর মাধ্যমে ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবন সুন্দর ও কল্যাণময় করা যায়। এজন্য আখলাকে হামিদাত্র বিশেষ প্রয়োজন।
আহমেদুল হক সাহেবের মন্তব্যটিতে সন্তানের আচরণে পিতামাতার প্রতি চরম অবজ্ঞা ও অবহেলা প্রকাশ পেয়েছে। কেননা পিতার মৃত্যুর খবর পেয়েও তার সন্তানেরা তাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য যায়নি।
পৃথিবীতে সন্তানের সবচেয়ে বড় আপনজন হলেন পিতামাতা। তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে সন্তানদের লালন-পালন করেন। তাই পিতামাতার প্রতি সদা আচরণ ও সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا.
অর্থ : “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩)
পিতামাতা বৃদ্ধ হলে সন্তানের উচিত তাদেরকে অধিকতর সেবাযত্ন করা। তাঁদেরকে ধমক না দেওয়া বা মনে কষ্ট পায় এরূপ কোনো কথা বা কাজ না করা। তাঁদের সাথে উত্তম ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا.
অর্থ: "যদি পিতামাতার একজন অথবা উভয়ে তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাঁদের প্রতি তুমি বিরক্তিসূচক শব্দ 'উহ্' উচ্চারণ করো না এবং তাঁদেরকে ধমক দিও না। তাঁদের সাথে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলো।” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩)
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, কতক মা-বাবা বৃদ্ধ বয়সে তার সন্তানদের অবহেলার শিকার হন। এমনকি নিজ বাড়ি হতে বিতাড়িত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয়। এমনই দেখা যায় উক্ত উদ্দীপকে। মূলত এরা সন্তান নামের কুলাঙ্গার। আর এ অবস্থার মূলে রয়েছে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও জীবনধারার সুস্পষ্ট প্রভাব।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!