আজিমত শব্দের অর্থ দৃঢ়তা, প্রবল, ইচ্ছা, অনমনীয় প্রত্যয় ইত্যাদি।
রুখসাত বলতে কোনো বিষয়ে কথায় বা কাজে মুজতাহিদদের (গবেষক) একটি অংশের একমত হওয়াকে বোঝায়। রুখসাত-এর আভিধানিক অর্থ অবকাশ, ঐচ্ছিক বা হালকা। এটি ইজমার একটি রুকন। এর মাধ্যমে কোনো বিষয়ে মুজতাহিদদের একটি অংশ একমত হন এবং বাকিরা সে বিষয়ে মৌনতা অবলম্বন করেন। এমনকি এ বিষয়ে মতামত প্রকাশের নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত তারা কোনো আপত্তি উত্থাপন করেন না। বরং বিষয়টি জানার পর নেতিবাচক বক্তব্য না দিয়ে চুপ থাকেন। একে মৌনতামূলক ইজমাও বলা হয়।
উদ্দীপকের ঘটনা ইসলামি শরিয়তের তৃতীয় উৎস ইজমাকে নির্দেশ করে। মানবজীবনের চাহিদা এবং সমস্যা পরিবর্তনশীল। নতুনভাবে উদ্ভূত এসব চাহিদা ও সমস্যার সমাধান কুরআন ও হাদিসে সরাসরি পাওয়া নাও যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা ইজমার সুযোগ রেখেছেন। উদ্দীপকেও ইজমার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়।
উদ্দীপকে দেখা যায়, হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকালে ভণ্ডনবির আবির্ভাব ঘটে এবং অনেকে জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। এতে আবু বকর (রা) সব সাহাবাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাকাত অস্বীকারকারীদের হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যা ইজমার অন্তর্ভুক্ত। কেননা জাকাত অস্বীকারীদেরকে হত্যার ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা ছিল না। এছাড়া রাসুল (স) জীবিত থাকাকালীন সময়ে কোন সমস্যার দেখা দিলে মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে কিংবা রাসুল (স) নিজেই এর সমাধান প্রদান করতেন। কিন্তু রাসুল (স) ও সাহাবিগণের অবর্তমানে ইসলাম যখন ব্যাপক বিস্তারের দ্বারা দশ দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। তখন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্ভূত নানা সমস্যার সমাধান কুরআন ও হাদিসের মধ্যে যখন পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন ইসলামের তদানীন্তন প্রজ্ঞাবান ধারক ও বাহকেরা হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক রেখে ইজমা তথা ঐকমত্যের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান গ্রহণে রত হন। সুতরাং যুগের প্রয়োজনে নবোদ্ভাবিত সমস্যার সমাধানের জন্য ইজমার উৎপত্তি ঘটেছে।
উদ্দীপকের শেষাংশে যে ইজমাকে নির্দেশ করা হয়েছে অর্থাৎ সুকুতি ইজমা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে হানাফিরা প্রামাণ্য ও যৌক্তিক দলিল প্রদান করেছেন। সুকুতি ইজমা হলো মৌন সম্মতির মাধ্যমে সংঘটিত ইজমা।মুজতাহিদগণ যখন এক বা একাধিক ব্যক্তি হতে প্রকাশিত মতামত বা কাজের কোনোরূপ প্রতিবাদ না করে তার ওপর নীরব সমর্থন প্রদান করেন তখন তা ইজমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরূপ নীরব সমর্থনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইজমাই হলো ইজমায়ে সুকুতি। হানাফি আলেমগণ ইজমায়ে সুকুতিকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
উদ্দীপকে নির্দেশকৃত ইজমায়ে সুকুতির ব্যাপারে নিজেদের মতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য হানাফি আলেমগণ প্রথমে প্রামাণ্য দলিল প্রদান করেছেন। রাসুল (স)-এর ওফাতের পর আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর (রা) তাঁর খেলাফতের প্রথমদিকে জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আবু বকর (রা) এর ঘোষণার পর হযরত ওমর (রা) সহ বেশ কয়েকজন সাহাবি তাঁর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন আর কিছু সংখ্যক সাহাবি নীরব থেকে মৌনসম্মতি জ্ঞাপন করেন। যা ইজমায় সুকুতির গ্রহণযোগ্যতাকে প্রমানিত করে। এছাড়া যৌক্তিক দলিল হিসেবে হানাফি আলেমগণ বলেন নীরবতাই ঐকমত্যের প্রমাণ। যেহেতু ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও খারাপ কাজ হতে বাধা প্রদান না করা এবং এর ওপর চুপ থাকা একজন মুজতাহিদের পক্ষে সম্ভব নয়; আর এমনটি করা পাপাচারিতা। তাই এ ধরনের পাপচারিতা মুজতাহিদগণের ব্যাপারে আদৌ কল্পনা করা যায় না। তাই তাদের নীরব থাকা মানে সম্মতি জ্ঞাপন করা বোঝায়। তাই তাদের নীরব সম্মতির দ্বারা ইজমা সংঘটিত হতে পারে।
উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, ইজমায়ে সুকুতি গ্রহণযোগ্য এবং এটাও ইসলামি শরিয়তের মূলনীতির আওতাধীন, যা মাধ্যমে হুকুম বা বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।
Related Question
View All'নিফাক' অর্থ- কপটতা, ভণ্ডামি ইত্যাদি।
'হুরুফে মুকাত্তায়াত' বলতে কুরআনে সংযোজিত বিচ্ছিন্ন বর্ণসমূহকে বোঝায়। কুরআন মাজিদের মোট ২৯টি সুরার শুরুতে হুরুফে মুকাত্তায়াত রয়েছে। প্রত্যেক গ্রন্থেই কিছু গোপন বিষয় থাকে, আর আল- কুরআনের গোপন বিষয় হলো হরফে মুকাত্তায়াত। তাফসিরকারগণের মতে যেসব বর্ণের প্রকৃত অর্থ ও যথার্থ মর্ম আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবহিত নয় তাকেই 'হুরুফে মুকাত্তায়াত' বলে। যেমন- এর অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবগত নয়।
মিথ্যাচার করা মুনাফিকের স্বভাব। মুনাফিক বলতে তাদেরকে বোঝায়, যারা মৌখিকভাবে ইমানের ঘোষণা দেয়, নামাজ, রোজাও পালন করে, কিন্তু অন্তরে কুফরি পোষণ করে। এদের মুখের ভাষা এক রকম কিন্তু অন্তর অন্যরকম। উদ্দীপকের দৃশ্যপট-১ এ দেখা যায় রাইয়্যান এ স্বভাবের অধিকারী।
উদ্দীপকের রাইয়্যান মিথ্যাচারের মাধ্যমে মুনাফিকি করে। সুরা আল বাকারায় দ্বিতীয় রুকুতে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের করুণ পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন। মুনাফিকরা ইমান আনার কথা বলে আল্লাহ ও মুমিনদের ঠকাতে চায়। কিন্তু তাদের এ কাজের কারণে নিজেরাই ঠকে। তাদের এরূপ কাজের কারণে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকৃতপক্ষেই মুনাফিকদের অন্তরে থাকে নিফাক, কুফর, শিরকের ব্যাধি। তাদের এসব স্বভাবের কারণে পাপপ্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। তারা পৃথিবীতে অসম্মান ও অবিশ্বাসের পাত্রে পরিণত হয়। তাছাড়া পরকালীন জীবনেও তাদের কল্পনাতীত শাস্তি পেতে হবে। হাদিসেও নবি (স) মুনাফিকদের শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া মুনাফিকদের তিনটি গুণের মধ্যে মিথ্যাচার একটি। মিথ্যাচারকে মহানবি (স) সব পাপের মূল হিসেবে অবহিত করেছেন।
ওপরের আলোচনার আলোকে বলতে পারি, রাইয়্যান মিথ্যাচার করার মাধ্যমে মুনাফিকির স্বভাব পোষণ করছে। যার জন্য পরকালে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।
উম্মাহর ঐকমত্যের জন্য বর্তমানে ইজমার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইজমা হচ্ছে সমকালীন বিজ্ঞ আলেমদের কোনো বিষয়ের ওপর ঐকমত্য। ধর্মীয় বা পার্থিব যেকোনো বিষয়ের বিধান উদ্ভাবন, প্রবর্তন বা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেকোনো যুগের মুসলিম মুজতাহিদ আলেমদের ঐকমত্যের মাধ্যমেই ইজমা হয়ে থাকে।
উদ্দীপকের দৃশ্যপট-২ এ রফিক ইসলামিক স্টাডিজ নিয়ে অধ্যয়ন করার কারণে ইজমার ব্যাপারে জানতে পারে। সে মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যের জন্য উদগ্রীব। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন বৈপরীত্য মাসয়ালার সুন্দর সমাধানে ইজমার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইসলামি আইনের উৎসসমূহের মধ্যে কুরআন ও হাদিসের পরেই এর অবস্থান হওয়াতে এর দ্বারা শরিয়তের বিভিন্ন মাসয়ালা প্রণয়নে এর প্রয়োজন পড়ে। কুরআন ও হাদিসে যে পরিমাণ সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেকগুণ বেশি বিষয়ে কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান প্রবর্তন করতে ইজমার বিকল্প নেই। নবোদ্ভাবিত সব সমস্যার সমাধানে ইজমা অনিবার্য। তাছাড়া মহানবি (স) বলেছেন- 'আমার উম্মত বিভ্রান্তির ওপর এক হবে না।' রাসুল (স) এর এ বাণীর মধ্যেই ইজমার গুরুত্ব বিদ্যমান। কেননা রাসুল (স) নিজেই ইজমার প্রতি ইঙ্গিত করে আলেমদের ঐকমত্যে পৌঁছানোর উপদেশ দিয়েছেন।
ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, বর্তমান বিশ্বে নতুন নতুন যেসব ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে তা ইজমার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
রুখসাত অর্থ অবকাশ, ঐচ্ছিক বা হালকা।
যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ইজমা করতে পারবে। ইজমা সম্পাদনে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের 'আহলুল ইজমা' বলা হয়। রাসুল (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবিরা ছিলেন ইজমার আহল। কেননা রাসুলের পর তারাই ছিলেন ইসলামি শরিয়ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ, রাসুল (স)-এর পছন্দনীয় এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। সাহাবিদের যুগের পরে অভিজ্ঞ আলিমগণ ইজমা প্রদান করতে পারবেন। এভাবে শরিয়ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য মানুষ, যারা ইজমা প্রদান করলে তা শরিয়তের বিধানে পরিণত হবে সে ধরনের ব্যক্তি বা মানুষদের আহলুল ইজমা বা ইজমার আহল বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!