হাসু মোড়লকে নিষ্ঠুর ও খারাপ লোক অর্থে কঠিন লোক বলেছে।
রহমত মোড়লের জন্য কাঁদতে চাইলে হাসু তাকে মন উজাড় করে কাঁদতে বলে। বলে মোড়ল একটা কঠিন লোক, যে সুবর্ণপুরের মানুষকে বড় জ্বালিয়েছে। কারও গরু কেড়ে নিয়েছে, কারও ধান লুট করে নিয়েছে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখলে হেসেছে। আর এ কারণেই নিষ্ঠুর ও খারাপ অর্থে হাসু মোড়লকে কঠিন লোক বলেছে।
চরিত্র পরিচিতি
নাম বয়স
মোড়ল ৫০
কবিরাজ ৬০
হাসু ৪৫
রহমত ২০
লোক ৪০
(প্রথম দৃশ্য)
[মোড়লের অসুখ । বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। কবিরাজ মোড়লের নাড়ি পরীক্ষা করছে। মোড়লের আত্মীয় হাসু মিয়া আর মোড়লের বিশ্বাসী চাকর রহমত আলী অসুখ নিয়ে কথা বলছে ।]
হাসু : রহমত, ও রহমত আলী।
হাসু : রহমত, ও রহমত আলী।
হাসু : ভালো করে শোনো, ঐ কবিরাজ যতই নাড়ি দেখুক, তোমার মোড়লের নিস্তার নাই ।
রহমত : অমন ভয় দেখাবেন না। তাহলে আমি হাউমাউ করে কাঁদতে লেগে যাব
হাসু : কাঁদ, মন উজাড় করে কাঁদ। তোমার মোড়ল একটা কঠিন লোক । আমাদের সুবর্ণপুরের মানুষকে বড় জ্বালিয়েছে। এর গরু কেড়ে, তার ধান লুট করে তোমার মোড়ল আজ ধনী। মানুষের কান্না দেখলে হাসে ।
রহমত : আর আজে-বাজে কথা বলবেন না। আপনি বাড়ি যান!
কবিরাজ : এত কোলাহল করো না। আমি রোগীর নাড়ি পরীক্ষা করছি।
রহমত : ও কবিরাজ, নাড়ি কী বলছে! মোড়ল বাঁচবে তো !
কবিরাজ : মূর্খের মতো কথা বল না। মানুষ এবং প্রাণী অমর নয়। আমি যা বলি মনোযোগ দিয়ে তাই শ্রবণ কর ।
হাসু : আমাকে বলুন। মোড়ল আমার মামাতো ভাই ।
রহমত : মোড়ল আমার মনিব ।
কবিরাজ : এই নিষ্ঠুর মোড়লকে যদি বাঁচাতে চাও, তাহলে একটি কঠিন কর্ম করতে হবে।
হাসু বাঘের চোখ আনতে হবে?
কবিরাজ : আরও কঠিন কাজ ।
রহমত : হিমালয় পাহাড় তুলে আনব?
কবিরাজ : পাহাড়, সমুদ্র, চন্দ্র, নক্ষত্র কিছুই আনতে হবে না ৷
মোড়ল : আর সহ্য করতে পারছি না। জ্বলে গেল। হাড় ভেঙে গেল। আমাকে বাঁচাও ।
কবিরাজ : শান্ত হও। ও রহমত, মোড়লের মুখে শরবত ঢেলে দাও।
(রহমত মোড়লকে শরবত দিচ্ছে।)
হাসু : ঐ মোড়ল জোর করে আমার মুরগি জবাই করে খেয়েছে। আমি আজ মুরগির দাম নিয়ে ছাড়ব।
মোড়ল : ভাই হাসু এদিকে এস, আমি সব দিয়ে দেব। আমাকে শান্তি এনে দাও।
কবিরাজ : মোড়ল, তুমি কি আর কোনোদিন মিথ্যা কথা বলবে?
মোড়ল : আর বলব না । এই তোমার মাথায় হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করছি, আর কোনোদিন মানুষের ওপর জবরদস্তি করব না। আমাকে ভালো করে দাও।
কবিরাজ : লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। আর কোনোদিন লোভ করবে?
মোড়ল : না । লোভ করব না, অত্যাচার করব না। আমাকে শান্তি দাও। সুখ দাও।
কবিরাজ : তাহলে মনের সুখে শুয়ে থাক, আমি ওষুধের কথা চিন্তা করি।
মোড়ল : সুখ কোথায় পাব? আমাকে সুখ এনে দাও।
হাসু : অন্যের মনে দুঃখ দিলে কোনোদিন সুখ পাবে না ।
মোড়ল : আমার কত টাকা, কত বড় বাড়ি! আমার মনে দুঃখ কেন?
কবিরাজ : চুপ কর। যত কোলাহল করবে তত দুঃখ বাড়বে। হাসু এদিকে এস, আমার কথা শ্রবণ কর ৷ মোড়লের ব্যামো ভালো হতে পারে, যদি...
রহমত : যদি কী?
কবিরাজ : যদি আজ রাত্রির মধ্যেই-
হাসু : কী করতে হবে?
কবিরাজ : যদি একটি ফতুয়া সংগ্রহ করতে পার।
রহমত : ফতুয়া?
কবিরাজ : হ্যাঁ, জামা । এই জামা হবে একজন সুখী মানুষের। তার জামাটা মোড়লের গায়ে দিলে, তৎক্ষণাৎ তার হাড় মড়মড় রোগ ভালো হবে ।
রহমত : এ তো খুব সোজা ওষুধ।
কবিরাজ : সোজা নয়, খুব কঠিন কাজ। যাও, সুখী মানুষকে খুঁজে দেখ । সুখী মানুষের জামা না হলে অসুখী মোড়ল বাঁচবে না।
মোড়ল : আমি বাঁচব । জামা এনে দাও, হাজার টাকা বখশিশ দেব।
(দ্বিতীয় দৃশ্য)
[বনের ধারে অন্ধকার রাত। চাঁদের ম্লান আলো। ছোট একটি কুঁড়েঘরের সামনে হাসু মিয়া ও রহমত গালে হাত দিয়ে ভাবছে।]
রহমত : কী তাজ্জব কথা, পাঁচ গ্রামে একজনও সুখী মানুষ পেলাম না। যাকেই ধরি, সেই বলে, না ভাই, আমি সুখী নই।
হাসু : আর তো সময় নাই ভাই, এখন বারোটা। সুখী মানুষ নাই, সুখী মানুষের জামাও নাই। মোড়ল তো তাহলে এবার মরবে।
রহমত : আহা রে, আমরা এখন কী করব! কোথায় একটা মানুষ পাব, যে কিনা—
হাসু : পাওয়া যাবে না। সুখী মানুষ পাওয়া যাবে না। সুখ বড় কঠিন জিনিস। এ দুনিয়াতে ধনী বলছে, আরও ধন দাও; ভিখারি বলছে, আরও ভিক্ষা দাও; পেটুক বলছে, আরও খাবার দাও । শুধু দাও আর দাও। সবাই অসুখী। কারও সুখ নেই।
রহমত : আমরাও বলছি, মোড়লের জন্য জামা দাও, আমাদের বখশিশ দাও। আমরাও অসুখী।
হাসু : চুপ চুপ! ঘরের মধ্যে কে যেন কথা বলছে।
রহমত : ভূত নাকি? চলেন, পালিয়ে যাই। ধরতে পারলে মাছভাজা করে খাবে।
হাসু : এই যে, ভাই। ঘরের মধ্যে কে কথা বলছ? বেরিয়ে এস।
রহমত : ভূতকে ডাকবেন না ।
[ঘর থেকে একজন লোক বেরিয়ে এলো ।]
লোক : তোমরা কে ভাই? কী চাও?
হাসু : আমরা খুব দুঃখী মানুষ । তুমি কে?
লোক : আমি একজন সুখী মানুষ।
হাসু : আঁ! তোমার কোনো দুঃখ নাই?
লোক : না। সারা দিন বনে বনে কাঠ কাটি। সেই কাঠ বাজারে বেচি। যা পাই, তাই দিয়ে চাল কিনি, ডাল কিনি। মনের সুখে খেয়ে-দেয়ে গান গাইতে গাইতে শুয়ে পড়ি। এক ঘুমেই রাত কাবার ।
হাসু : বনের মধ্যে একলা ঘরে তোমার ভয় করে না? যদি চোর আসে?
লোক : চোর আমার কী চুরি করবে?
হাসু : তোমার সোনাদানা, জামাজুতা?
(লোকটি প্রাণখোলা হাসি হাসছে)
রহমত : হা হা করে পাগলের মতো হাসছ কেন ভাই!
লোক : তোমাদের কথা শুনে হাসছি। চোরকে তখন বলব, নিয়ে যাও, আমার যা কিছু আছে নিয়ে যাও ।
হাসু : তুমি তাহলে সত্যিই সুখী মানুষ।
লোক : দুনিয়াতে আমার মতো সুখী কে? আমি সুখের রাজা। আমি মস্ত বড় বাদশা ।
রহমত : ও বাদশা ভাই, তোমার গায়ের জামা কোথায়? ঘরের মধ্যে রেখেছ? তোমাকে একশ টাকা দেব। জামাটা নিয়ে এস।
লোক : জামা!
রহমত : জামা মানে জামা! এই যে, আমাদের এই জামার মতো জিনিস। তোমাকে পাঁচশ টাকা দেব। জামাটা নিয়ে এস, মোড়লের খুব কষ্ট হচ্ছে।
লোক : আমার তো কোনো জামা নাই ভাই!
হাসু : মিছে কথা বল না।
লোক : মিছে বলব কেন? আমার ঘরে কিছু নাই। সেই জন্যই তো আমি সুখী মানুষ।
Related Question
View Allআয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে যারা চিকিৎসা করেন তাদের কবিরাজ বলে।
অন্যায়ভাবে হাসুর ও সুবর্ণপুর গ্রামের মানুষের কাছ থেকে সম্পদ লুট করে ধনী হওয়ার কারণে হাসু মোড়লের মৃত্যুকামনা করে।
'সুখী মানুষ' নাটিকায় মোড়ল চরিত্রটির কাজ হলো অন্যের জিনিস লুট করা, ঠকানো, সবকিছু জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া ইত্যাদি। মোড়ল একজন অত্যাচারী। মানুষের কান্না দেখে মোড়ল হাসে। আর হাসু চরিত্রটি সৎ ও সাহসী। অন্যায়কারীর শাস্তি প্রত্যাশায় সে মোড়লের মৃত্যু কামনা করে।
জোবেদ আলীর সঙ্গে 'সুখী মানুষ' নাটিকার সুখী মানুষের সুখের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে অনেক পাপ করে। সুখী হওয়ার জন্য নানা রকম অন্যায় করতেও দ্বিধা করে না। কিন্তু প্রকৃত সুখী হওয়া ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে।
উদ্দীপকের জোবেদ আলী এলাকার মানুষ অসুস্থ হলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তিনি তার শয্যা ছাড়েন না। অন্যের কোনো সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়ায় তার মন বসে না। তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে গাঁয়ের লোক চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে তাকে সুস্থ করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। সবার ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার দিক থেকে সে অত্যন্ত সুখী একজন মানুষ। 'সুখী মানুষ' নাটিকার সুখী মানুষটি সারাদিন বনে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে যা পায় তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। তার কোনো সম্পদ নেই, ফলে চোরের ভয় নেই বলে সে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। তার কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই, কারও সাথে দ্বন্দ্ব নেই বলে সে-ই প্রকৃত সুখী মানুষ। তাই বলা যায়, জোবেদ আলীর সঙ্গে 'সুখী মানুষ' গল্পের সুখী মানুষটির মিল রয়েছে সুখে থাকার দিক থেকে।
'মোড়ল যদি জোবেদ আলীর মতো হতেন তাহলে তার চিকিৎসার জন্য সুখী মানুষের জামা তালাশ করতে হতো না।'- উক্তিটি যথার্থ।
প্রচুর অর্থ-সম্পদ থাকার পরও অনেকে সুখী হতে পারে না। আবার কারও তা না থেকেও সে সুখী হতে পারে। অন্যের কল্যাণের মধ্যেই প্রকৃত সুখ নিহিত।
উদ্দীপকের জোবেদ আলী ও 'সুখী মানুষ' নাটিকার মোড়ল দুজন বিপরীত চরিত্রের লোক। জোবেদ আলী সৎ, জনদরদি। জনসেবার মধ্যে তিনি সুখ খুঁজে বেড়ান। আর মোড়ল মিথ্যা বলে, অন্যের সম্পদ গ্রাস করে, মানুষের কান্না শুনে হাসে। সুবর্ণপুরের মানুষ তার অত্যাচারে ক্লান্ত, অবসন্ন।
কেউ যখন সব মানুষের কল্যাণের জন্য নিজেকে সঁপে দেয় তখন স্রষ্টার কাছে এবং ওইসব মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠে, তখন তার সুখ ও শান্তির জন্য সে সবার কাছ থেকে দোয়া-আশীর্বাদ পেয়ে থাকে। আর যখন কেউ অন্যায়-অত্যাচারে অন্যকে কষ্ট দেয়, নিজেকে লোভ-লালসার মধ্যে নিমগ্ন রাখে, তখন কেউ তাকে পছন্দ করে না। তার জন্য সুখ ও শান্তি কামনা করে না। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথার্থ।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে যারা চিকিৎসা করেন তাদের কবিরাজ বলে।
অন্যায়ভাবে হাসুর ও সুবর্ণপুর গ্রামের মানুষের কাছ থেকে সম্পদ লুট করে ধনী হওয়ার কারণে হাসু মোড়লের মৃত্যুকামনা করে।
'সুখী মানুষ' নাটিকায় মোড়ল চরিত্রটির কাজ হলো অন্যের জিনিস লুট করা, ঠকানো, সবকিছু জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া ইত্যাদি। মোড়ল একজন অত্যাচারী। মানুষের কান্না দেখে মোড়ল হাসে। আর হাসু চরিত্রটি সৎ ও সাহসী। অন্যায়কারীর শাস্তি প্রত্যাশায় সে মোড়লের মৃত্যু কামনা করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!