একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন হচ্ছে সংবিধান।
মুসলিম লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক আচরণ ও দমননীতির প্রতিবাদ করা এবং পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অগণতান্ত্রিক আচরণ করতে থাকে। তারা অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন, সংস্কৃতি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই বাঙালিদের প্রতি সীমাহীন বৈষম্যমূলক আচরণ করে। এসময় জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী, আবুল হাশিম, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ অনেকে মুসলিম লীগের নীতির প্রতিবাদ করতে থাকেন এবং এদেশের জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য একটি গণমুখী রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ উদ্দেশ্যেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
যুক্তফ্রন্টের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের চক্রান্তের ফলে যুক্তফ্রন্টের জয়ের পরও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারকে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে এই প্রদেশে একটি সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ আসে। কিন্তু মুসলিম লীগ ও কেন্দ্রীয় সরকারের চক্রান্তে এবং সর্বোপরি যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংখ্যালঘু সংসদ সদস্যদের বার বার সমর্থন বদলের কারণে ঘন ঘন সরকার বদল হতে থাকে। মাত্র চার বছরে সাতটি মন্ত্রিসভার পতন ঘটে এবং তিনবার গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। উপরন্তু এই সময় বিরোধী দলের আক্রমণে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সীমিত হয়ে আসে পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের দিন। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ৮ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করে। তিন সপ্তাহ পর ইস্কান্দার মির্জা নিজেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে জেনারেল আইয়ুব খান সংসদীয় সরকার ও সংবিধানের অবসান ঘটিয়ে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন এবং ব্যর্থ হয় পূর্ববাংলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
উদ্দীপকে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিলো মূলত উপরে উল্লিখিত কারণে। তাই বলা যায়, নিজেদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের চক্রান্তের ফলেই যুক্তফ্রন্টের জয়েও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
যুক্তফ্রন্ট জোট ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো।
পূর্ববাংলার গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। এই ইশতেহারের বিশেষ দফাগুলো ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা এবং মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করা। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ববাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসন প্রদান করা এবং বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা। পূর্ববাংলার প্রধান অর্থনীতি কৃষির উন্নতির জন্য সমবায় কৃষিব্যবস্থার প্রবর্তন ও পাটশিল্পকে জাতীয়করণ করা। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা এবং সকল বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্য করা। ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা ছিলো তৎকালীন সময়ের গণমানুষের বিশেষ দাবি। এছাড়া ৫২'র ভাষা আন্দোলনে বীর শহিদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণ, লবণের কারখানা স্থাপন এবং শিল্প ও খাদ্যশিল্পে দেশকে স্বাবলম্বী করার কথাও এই ইশতেহারের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তাছাড়া আইন পরিষদের মেয়াদ বৃদ্ধি না করে তিন মাসের মধ্যে শূন্যপদের জন্য উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করার উল্লেখও ছিলো যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে।
পরিশেষে বলা যায়, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল পূর্ববাংলার সর্বসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আর এই ইশতেহারের জন্যই যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সকল মানুষের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিল।
Related Question
View Allআওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী।
মুসলিম লীগের অগণতান্ত্রিক আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সংস্কারপন্থীরা আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ে তোলেন।
দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম লীগের এক অংশ যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, সংস্কারপন্থি ছিল তাদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি মদদপুষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল অপর অংশ নানাভাবে দমন-নিপীড়ন চালাতে থাকে। ফলে সংস্কারবাদীরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন ইত্যাদি দাবি নিয়ে গড়ে তোলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ।
উদ্দীপকে সবুজনগর অঞ্চলে ছোট দলগুলো স্বাধীনতাপূর্ব ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে একতাবদ্ধ হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন ছিল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পূর্ব বাংলায় ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের শাসনের চরম ব্যর্থতার ফলে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, নেজামে ইসলামী মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয় ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর। তারা জনগণের অশা- আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ৩০৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। আর ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সবুজনগর অঞ্চলের ছোট দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের শিক্ষারই প্রতিফলন।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের মাধ্যমে "ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী হলেই নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায় না" এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচন ছিল মুসলিম লীগের অন্যায় ও বৈষম্যমূলক, ব্যর্থ শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। বাঙালি জাতি এ নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম লীগকে বুঝিয়ে দেয় যে, তারা পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগকে আর চায় না। তারা যুক্তফ্রন্টের তরুণ নেতৃত্বের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। তারা ক্ষমতাসীন অত্যাচারীদের প্রতি ধিক্কার জানিয়েছিল তাদের ভোটের মাধ্যমে। তারা বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানি ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা বাঙালির প্রকৃত মুক্ত সম্ভব নয়। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আদর্শের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার জনগণ স্বায়ত্তশাসনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে।
মুসলিম লীগ ক্ষমতাশীল ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল হয়েও ১৯৫৪ 'সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়। তাই বলা যায়, ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী হলেই নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায় না, এ বিষয়টি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের দ্বারা প্রমাণিত হয়।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন।
১৯৪৮ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে বাংলা ভাষা আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-এর প্রতিবাদ করেন। পরবর্তীতে আরবি হরফে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্রের জাল হিসেবে বাংলা ভাষা সংস্কারের নামে ১৯৪৯ সালের মার্চে 'পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি' গঠন করা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!