বাদশাহর নামে ঘুড়িতে নানারকম ব্যঙ্গাত্মক কথা লেখা হয় বলে বাদশাহ ঘুড়ি ওড়ানো ও তৈরি নিষিদ্ধ করে রাজ্যে আইন জারি করলেন।
'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে রাজ্যের বাদশাহকে নিয়ে চারদিকে ব্যঙ্গাত্মক নানান কথা ছড়িয়ে পড়ে। আর এ কথাগুলো ছড়ানো হয় ঘুড়িতে লেখার মাধ্যমে। কারা যেন ঘুড়িতে রাজার নামে উলটা-পালটা কথা লিখে বিভিন্ন মানুষের বাড়ির উঠানে ফেলে রাখে। ফলে বাদশাহ রেগে যান এবং এর একটি বিহিত করবেন বলে ঠিক করেন। তাই তিনি তাঁর রাজ্যে ঘুড়ি ওড়ানো ও তৈরি করা দুইটিই বন্ধ ঘোষণা করেন। কেউ এ দুইটি কাজ করলে তার হাত কেটে দেওয়া হবে মর্মে আইন জারি করেন।
অর্থাৎ, বাদশাহ নিজের মান-সম্মান রক্ষার জন্য এবং তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করার জন্য ঘুড়ি ওড়ানো ও তৈরি নিষিদ্ধ করে রাজ্যে কঠোর আইন জারি করেছিলেন।
লেখক মাহমুদুল হক তাঁর 'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে হাস্যরসের মাধ্যমে দুষ্টলোকের স্বাভাবিক পতন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও জয় তুলে ধরেছেন। এখানে দুষ্টলোক হিসেবে বাদশাহ ও উজিরকে এবং সাধারণ মানুষ হিসেবে রাজ্যের ছোটো ছেলেদেরকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাজ্যে ঘুড়ি তৈরি ও ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হলেও ছেলেরা তাদের বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে পুনরায় আকাশে ঘুড়ি ওড়াবার সুযোগ পেয়েছিল।
'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে বাদশাহ শমশের আলী তাঁর নামে ঘুড়িতে ব্যঙ্গাত্মক পদ্য লেখার কারণে রাজ্যে ঘুড়ি তৈরি ও ওড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আইন জারি করেছিলেন। এরপর ছেলেরা প্রথমে কলাপাতার তৈরি গোল গোল বস্তু ঘুড়ির মতো ওড়ানো শুরু করে। তখন তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তারা যুক্তি দেয় যে, যা ওড়ে তার সবকিছুই ঘুড়ি নয়। তাহলে তো উড়োজাহাজ, পাখি, তুলা, ধুলা সবকিছুকেই ঘুড়ি বলতে হবে। তাদের কথা শুনে বাদশাহ চিন্তায় পড়ে যান।
বাদশাহ এ সমস্যার সমাধানে পণ্ডিতকে 'ঘুড়ি' শব্দের অর্থ খোঁজার দায়িত্ব দেন। পণ্ডিতকে সাহায্য করার জন্য ছেলেরাও তার সাথে যায়। পণ্ডিত অর্থ খোঁজার জন্য তাঁর দশমুনে এক বান্ডিল গড়িয়ে গড়িয়ে মেলে ধরেন। তিনি এটির সামনের দিক ধরে থাকেন, আর ছেলেরা তা ঠেলতে ঠেলতে পিছনের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু ছেলেরা একসময় এটি ছেড়ে দেয়, আর এর ধাক্কা খেয়ে পণ্ডিত গিয়ে পড়েন সমুদ্রে।
এরপর ছেলেরা তাদের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলটির প্রয়োগ ঘটায়, তারা বাদশাহকে অভিযোগ করে পণ্ডিত কাজ না করে সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়েছেন। তখন বাদশাহ তাঁর বিশ্বস্ত উজির আক্কেল আলীকে পণ্ডিতের খোঁজ নিতে পাঠান। কিন্তু পণ্ডিত নিজের ব্যর্থতা স্বীকার না করে উলটো উজিরকে বলেন যে, তিনি বিদ্যার সমুদ্রে 'ঘুড়ি' শব্দের অর্থ খুঁজছেন।
তখন বোকা উজির বাদশাহর সামনে নিজের বাহাদুরি দেখানোর জন্য নিজেও সমুদ্রের মাঝখানে ঘুড়ির অর্থ খুঁজতে নেমে পড়ে এবং ডুবে যায়। পন্ডিত ও উজিরের এ বেহাল অবস্থা করার পর ছেলেরা দল বেঁধে শাহিমহলের ময়দানে আবার ঘুড়ি ওড়াতে যায়। 'ঘুড়ি' শব্দের অর্থ না জানার কারণে বাদশাহও আর তাদের বাধা দিতে পারেন না।
এভাবেই 'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে হেলেরা অত্যন্ত সুকৌশলে বাদশাহ ও তাঁর সহচরদের পরাজিত করে পুনরায় আকাশে ঘুড়ি ওড়াবার সুযোগ আদায় করে নিয়েছিল।

এক দেশে ছিলেন এক বাদশাহ। হাতি-ঘোড়া সেপাই-সাস্ত্রি কোনোকিছুরই তাঁর অভাব ছিল না। বাদশাহর নাম শমশের আলীজান।
কোনো এক সময় বাদশাহ খুব অসুবিধায় পড়লেন। তাঁর নামের সঙ্গে মিলে যায় রাজ্যে এমন লোকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়।
ছুতোর, কামার, গাছকাটা শিউলি এদের সকলের নামও শমশের। গোটা রাজ্য শমশেরময় হয়ে আছে এককথায়। তাই বাদশাহ একদিন উজির-নাজির, পাত্র-মিত্র, সভাসদ সবাইকে ডেকে দরবারে ঘোষণা করলেন- আমার ক্ষমতা তোমাদের সকলের চেয়ে খুব কম করে হলেও তিন গুণ বেশি; সুতরাং আজ থেকে আমার নামকে তিন দিয়ে গুণ করে ঠিক এইভাবে উচ্চারণ করতে হবে-
শমশের
শমশের
শমশের আলীজান
এই ঘোষণায় বিশেষ করে উজির আক্কেল আলী খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন, 'বাদশাহ নামদার দীর্ঘজীবী হউন।'
উজির আক্কেল আলী ছিলেন বাদশার সবচেয়ে প্রিয় পাত্র। তাঁর ওপর বাদশাহর বিশ্বাসও অগাধ। বাদশাহ ধরে নিয়ে আসতে বললে তিনি বেঁধে নিয়ে আসেন। বাদশাহ হাঁচলে-কাশলে তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
একদিন হয়েছে কি, বাদশাহ উজিরকে সঙ্গে নিয়ে তিনমহল প্রাসাদের পাশ কাটিয়ে হাওয়া খেয়ে বেরোবার সময় দেখেন প্রাচীরের গায়ে একরাশ হিজিবিজি লেখা। বাদশাহ বললেন, 'দাঁড়াও, পড়ে দেখা যাক।'
আক্কেল আলী আক্কেল আলী
দেব তোরে কী,
ঘুমের ঘোরে চাঁদিতে তোর
গাঁট্টা মেরেছি।
উজির গরগর করতে করতে বললেন, 'এ্যাঁ, এ কি সত্যি কথা?'
বাদশাহ বললেন, 'খেপেচো নাকি। কেউ ঠাট্টা করে লিখেছে আর কি!'
বাদশার কথা শেষ হতে না-হতেই উজির চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, 'কী সব্বোনাশ! ওই দেখুন বাদশাহ
নামদার, বাঁ দিকের প্রাচীরে আপনার নামেও কী কথা সব লিখে রেখেছে।'
বটে বটে, বলে বাদশাহ পড়ে দেখলেন-
শমশের
শমশের
শমশের আলীজান,
আমরুল
জামরুল
কচু ঘেঁচু সবই খান।
শমশের
শমশের
শমশের আলীজান,
খিটখিটে
মিটমিটে
শকুনের মতো জান।
রাগে আগুন হয়ে বাদশাহ বললেন, 'দেখেছ কী ওটা? আমার জান বলে শকুনের মতো। এ্যা এত বড়ো কতা!' উজির বললেন, 'শূলে চড়াব বাদশাহ নামদার, শূলে চড়াব! যদি না-পারি আমার নাম আক্কেল আলীই নয়। ইশ, কী বিচ্ছিরি কতা!'
এরপর অন্যান্য দিনের মতো বাদশাহ দরবারে বসলেন। বললেন, 'কার কী আর্জি আছে পেশ করো।' নাজির উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'বাদশাহ নামদার, আমার নামদার, আমার বাড়ির উঠোনে আজ সকালে একটা ঘুড়ি উড়ে এসে পড়েছিল, তাতে সব বাজে বাজে পদ্য লেখা।'
বাদশাহ গম্ভীরভাবে বললেন, 'কী লেখা ছিল? উজির আবৃত্তি করে বললেন-
শমশের শের নয়
লেজকাটা হনুমান,
বিড়ালের ডাক শুনে
দেন তিনি পিটটান।
কাঁঠালের মতো মাথা
আক্কেল আলীটার
ঘাসখেগো বুদ্ধি এন্তার এন্তার।
সকলে গাম্ভীর্য বজায় রাখবার জন্য মুখ নিচু করে থাকল।
সভাসদদের মধ্যে থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে সোজাসুজি আবৃত্তি করতে শুরু করে দিলেন-
তিনগুণ শমশের পেল্লায় ভুঁড়ি
দশগুণ বোকামিতে দেয় হামাগুড়ি।
খাঁদানেকো টাকমাথা আবলুশ কাঠ
বিশগুণ লোভে টেকো ঘোরে মাঠ-ঘাট।
বাদশাহ খেপে উঠে বললেন, 'তার মানে? তোমরা সব পাল্লা দিচ্ছ নাকি?'
সভাসদ বললেন, 'বাদশাহ নামদার বেয়াদবি মাফ করবেন, আজ সকালে আমার বাড়ির সামনেও একটা ঘুড়ি এসে পড়ে, তাতে লেখা ছিল ওইসব।'
বাদশাহ বিরক্ত হয়ে সেদিনকার মতো দরবার ভেঙে দিলেন।
পরদিন উজির দরবারের দিকে আসবার পথে দেখেন গাছের ডালে ঝুলছে রঙিন এবং বেশ বড়ো একটা ঘুড়ি।
ঘুড়িটার ওপর রং দিয়ে তাঁর মুখ খুব বিশ্রীভাবে আঁকা। আর তাতে লেখা:
আক্কেল আলী উজির বটে
কুলোপানা কান
পেটের পিলে বাড়ছে কেবল
গোলায় বাড়ে ধান।
উজির তক্ষুনি বাদশাহর কাছে ছুটলেন। বললেন, 'কাঁহাতক আর সহ্য করা যায় বাদশাহ নামদার, একটা বিহিত কত্তেই হবে।' বাদশাহ বললেন, 'আজ থেকে রাজ্যময় আইন জারি করা গেল, ঘুড়ি ওড়ানো আর তৈরি করা দুটোই বনদো। যারা মানবে না, তাদের হাত কেটে দেওয়া হবে, হাত।' উজির বললেন, 'খাসা আইন হয়েছে বাদশাহ নামদার। এইবার বাছাধনেরা জব্দ হবে, অ্যাঁ!'
পরদিন দেখা গেল শাহিমহলের সামনের ময়দানে রাজ্যের যত ছেলেপিলেরা শুকনো কলাপাতার তৈরি গোল গোল কী সব ঘুড়ির মতো ওড়াচ্ছে।
বাদশাহ হাঁক পেড়ে বললেন, 'ধরো ওদের, হাত কেটে দাও ওদের সকলের। বাদশাহর হুকুমে ছেলেদের সবাইকে গরুবাঁধা করে ধরে আনা হলো।' বাদশাহ চিৎকার করে বললেন, 'তোমরা আমার হুকুম অমান্য করে ঘুড়ি উড়িয়েচ কেন?'
তাদের মধ্যে থেকে একজন চটপটে গোছের জবাব দিল, 'আমরা ঘুড়ি ওড়াইনি। ঘুড়ি তো চারকোণওয়ালা কাগজের তৈরি হয়।'
বাদশাহ বললেন, 'যা ওড়ে তাই ঘুড়ি। ছেলেটি খুব আশ্চর্য হয়ে বললে- তা হলে পাখি, তুলো, ধুলো, হাওয়ার জাহাজ সবই কি ঘুড়ি? পাখিদের উড়তে দিচ্ছেন কেন? ওদেরও বারণ করে দিন।'
বাদশাহ গর্জন করে বললেন, 'চোপরও! ব্যাপারটা গন্ডগোলের ঠেকছে। ঠিক হায়, পণ্ডিত কই!'
পণ্ডিত এসে বললেন, 'বাদশাহ নামদার, বই তো অন্যরকম কথা বলে। যাহা ঘুরঘুর করে ওড়ে তা-ই ঘুড়ি।'
ছেলেটি চোখ বড়ো বড়ো করে বললে, 'ঘুরঘুর করে আবার কিছু ওড়ে নাকি। আপনি কিছুই জানেন না দেখছি!
ওড়ে তো পতপত করে আর ফুরফুর করে ঘোরে।'
পণ্ডিত বললেন, 'থামো দিকি, বেশি ফ্যাচোর ফ্যাচোর কোচ্চো কেন বাপু। তা বাদশাহ নামদার একটু সময় লাগবে, বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে হবে কিনা।'
বাদশাহ বললেন, 'বেশি সময় দিতে পারব না। এক্ষুনি নতিপত্তোর হাতড়ে দ্যাকো। এটা বিহিত কত্তেই হবে।' পণ্ডিত বললেন, 'এ কি আর গোলায় ধান জমানো বাদশাহ নামদার, এ হলো গিয়ে আপনার দশমুনে অভিধান ঘাঁটাঘাঁটির ব্যাপার, সময় দিতেই হবে।'
বাদশাহ একটা আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, 'দিলাম। এক ঘণ্টা।'
চটপটে ছেলেটি পণ্ডিতকে বললে, 'চলুন আমরাও আপনাকে সাহায্য করব।'
পণ্ডিত বকবক করতে করতে ওদের সবাইকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেলেন। ঘরের ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে বের করে নিয়ে এলেন দশমুনে এক বান্ডিল। তারপর বিড়বিড় করে আঙুল গুনে বললেন, 'ক খ গঘ-ঘ-য়ে ঘুড়ি। সব্বোনাশ করেছে! এ যে ব্যানজোন বনের চার নম্বার। গোটা তাড়াটাই খুলতে হবে। ঘুড়ি শব্দ্যে পাওয়া যাবে এক্কেবারে সেই গোড়ার দিকে।'
ছেলেরা সবাই বললে, 'আপনি বুড়ো মানুষ, টানা-হ্যাঁচড়া আপনার শরীরে কুলোবে না। আপনি সামনের দিকটা ধরে থাকুন আমরা সবাই মিলে বান্ডিলটা পিছনের দিকে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি, তা হলেই চট করে খোলা হয়ে যাবে।'
ছেলেরা সবাই একযোগে বান্ডিলটা ঠেলতে ঠেলতে গড়িয়ে পিছনের দিকে নিয়ে চলল। পণ্ডিত ধরে বসে রইলেন সামনের দিকটা।
তারপর হলো কি, বান্ডিলটা ঠেলতে ঠেলতে ছেলেরা একসময়ে হাঁপিয়ে পড়ল, কেননা সেটা ছিল বিরাট। ওজনেও দশ মণের সমান। তাই না পেরে একসময় সবাই ছেড়ে দিল। এক পলকে সড়সড় করে সেটা আগের মতো আবার জড়িয়ে গিয়ে এক ধাক্কায় পণ্ডিতকে ছুড়ে দিলে সামনের সমুদ্রে।
ছেলেরা সবাই তক্ষুনি বাদশাহর কাছে ছুটে গিয়ে নালিশ জানাল। বললে, ‘বাদশাহ নামদার, দেখুন পণ্ডিতের কী কাণ্ড! আমাদের বললে তোদের নিয়েই যত অনর্থ, তোরাই অভিধান ঘেঁটে বের কর ঘুড়ি মানে কী, আমি ততক্ষণে একটু সাঁতরে আসি। তারপর তিনি সেই যে সাঁতরাতে গিয়েছেন এখন পর্যন্ত ফেরার নামটি নেই।’
বাদশাহ বললেন, 'যত সব বায়নাক্কা। আক্কেল আলী দ্যাকো দিকি কী ব্যাপার!'
উজির সাগর পাড়ে গিয়ে দেখেন পণ্ডিত রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছেন। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, 'এই বুঝি আপনার অভিধান ঘাঁটা?'
পণ্ডিত হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে পাড়ে উঠে এসে বললেন, 'বুঝলেন কিনা, বিদ্যা হলো সমুদ্দুর, তাই একটু ঘেঁটে দেখছিলাম আর কি।'
উজির বললেন, ‘তা পেলেন কিছু?’
পণ্ডিত বললেন, 'পেলাম আর কই। বুড়ো মানুষ, আপনাদের মতো দেহও নেই, ক্ষমতায়ও কুলালো না। ঘুড়ি শব্দাটা একেবারে তলদেশে কি-না, ওটা খুঁজে আনা যার-তার কম্মো নয়।'
উজির কী যেন ভাবলেন। তার মনে হলো বাদশার জন্যে তিনি কী না করতে পারেন। বিদ্যাসমুদ্দুরের তলদেশ থেকে ঘুড়ি শব্দের অর্থ খুঁজে আনা তো সহজ কাজ। বরং বাহাদুরি দেখানোর এই এক সুযোগ। বাদশাহ নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন।
তিনি বললেন, 'কোথায় দেখিয়ে দিন।'
পণ্ডিত বললেন, 'মাঝিদের বলুন, ওরা মাঝখানে গিয়ে ঠিক জায়গামতোই ঝুপ করে নামিয়ে দেবে।'
উজির বললেন, 'ঠিক হ্যাঁয়!'
জেলেনৌকার মাঝিরা তাদের ডিঙিতে করে সমুদ্দুরের একেবারে মাঝখানে গিয়ে চ্যাংদোলা করে উজির আক্কেল আলীকে ঝুপ করে ছেড়ে দিল। উজির আক্কেল আলী সেই যে সমুদ্দুরের তলদেশে ঘুড়ির অর্থ আনতে গেলেন আর ফিরলেন না।
ছেলেরা দল বেঁধে শাহিমহলের ময়দানে ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে সুর ধরল-
উজির গেলেন রসাতলে
বাদশাগেলেন ঘরে
নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে
মাথা ঠুকে মরে।
ঢ্যাম কুড়কুড়, ঢ্যাম কুড়কুড়
তা ধিন ধিনতা ধিন
পদ্য লেখার জোরেই কেবল
এল সুখের দিন।
Related Question
View Allচোপরও! ব্যাপারটা গন্ডগোলের ঠেকছে।'- উক্তিটি বাদশা শমশের আলীজানের।
দশমুনে বান্ডিল ঠেলতে গিয়ে ছেলেরা হাঁপিয়ে পড়ল।
পদ্য লেখার জোরে' গল্পে বাদশা শমশের আলীজান 'ঘুড়ি' শব্দের অর্থ খুঁজে দেখার জন্য পণ্ডিতকে নথিপত্র হাতড়ে দেখতে বলেন। পণ্ডিত তখন ছেলেদের নিয়ে নিজের ঘরে যান এবং ঘরের ভিতর থেকে দশমুনে এক বান্ডিল বের করে আনেন। তিনি আঙুল গুণে বলেন- "ঘুড়ি' শব্দ পাওয়া যাবে একেবারে গোড়ার দিকে, আমার শরীরে কুলাবে না।' তখন পিছনে গড়িয়ে নিয়ে সেই বান্ডিলটা ঠেলতে ঠেলতে ছেলেরা একসময় হাঁপিয়ে পড়ল।
উদ্দীপকের ভজহরি চরিত্রটি 'পদ্য লেখার জোরে' গল্পের উজির আক্কেল আলী চরিত্রকে ইঙ্গিত করে।
জীবনে চলার পথে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ধীরস্থির হয়ে সেসব সমস্যার সমাধান করতে হয়। তা হলেই জীবনে সাফল্য আসে।
উদ্দীপকে বাবুর চাকর ভজহরির বোকামির দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। সে কোনো বিষয় গভীরভাবে ভাবতে পারে না। নৌকায় বেশি লোক ওঠার কারণে নৌকা ডুবে যাওয়ার ভয়ে পুঁটলিটা মাথায় নিয়ে বসেছে। এতে যে নৌকার বোঝার ওজন কমবে না তা সে বুঝতে পারেনি। তেমনই 'পদ্য লেখার জোরে' গল্পের উজির আক্কেল আলীও বাদশা শমশের আলীজানের বোকামি বুঝতে পারেননি। তিনি তাকে, সমর্থন দিয়েছেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত রাজাকে খুশি করার জন্য পণ্ডিতের কথামতো মাঝিদের সাহায্যে সমুদ্রের মাঝখানে নেমে ঘুড়ির অর্থ সন্ধান করতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন।
উদ্দীপকের বিষয়বস্তু 'পদ্য লেখার জোরে' গল্পের একটি বিশেষ দিককেই নির্দেশ করে, পুরো বিষয়কে নয়।"- মন্তব্যটি যথার্থ।
জীবনে চলতে গেলে সমস্যা আসবেই। তাই সমস্যাকে ভয় না করে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। সামান্য বিষয়ে অসামান্য আয়োজন বা উদ্ভট চিন্তা থেকে বিরত থাকতে হবে।
উদ্দীপকের বাবুর চাকর ভজহরি যে কাজ করেছে তা এক ধরনের বোকামি। এমন না বুঝে কাজ করলে সমস্যার সমাধান না হয়ে অন্য এক সমস্যা তৈরি হয়। এ বিষয়টি 'পদ্য লেখার জোরে' গল্পের আক্কেল আলীর আক্কেলহীন কর্মকান্ডের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। উদ্দীপকের চাকরকে যেমন বুদ্ধিমান বলা যায় না তেমনই গল্পের আক্কেল আলীকেও আক্কেলসম্পন্ন মানুষ বলা যায় না। এ দিকটি ছাড়া গল্পের অন্য কোনো দিক উদ্দীপকে নেই।
পদ্য লেখার জোরে' গল্পে দেশের আরও লোকের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় নিজের নামকে তিনগুণ করে বলার জন্য বাদশা শমশের আলীজানের হুকুম জারি, আক্কেল আলীর সমর্থন, বাদশা ও উজিরকে নিয়ে কবিতা লেখা, ঘুড়ি শব্দের অর্থ খুঁজতে গিয়ে পণ্ডিত ও ছেলেদের ভোগান্তি ইত্যাদি বিষয় রয়েছে। এসব বিষয় উদ্দীপকে নেই। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে রাজ্যের অনেক লোকের নাম রাজার নামের সঙ্গে মিলে যায় বলে রাজা অসুবিধায় পড়লেন।
'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে হাস্যরসের মাধ্যমে দুষ্টলোকের স্বাভাবিক পতন তুলে ধরা হয়েছে। গল্পটির ঘটনা আবর্তিত হয়েছে বাদশাহকে ঘিরে। তিনি কোনো একসময় তাঁর নাম নিয়ে খুব অসুবিধায় পড়েন। কারণ, তাঁর নামের সাথে মিলে যায় রাজ্যে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। বাদশাহর নাম শমশের আলীজান। আবার ছুতোর, কামার, গাছকাটা শিউলি এদের সবার নামও শমশের। এককথায় গোটা রাজ্য যেন শমশেরময় হয়ে আছে। ফলে নামের মাধ্যমে রাজার ক্ষমতা, প্রভাব ও গাম্ভীর্য প্রকাশ পাচ্ছিল না বিধায় বাদশাহ তাঁর নাম নিয়ে চিন্তিত হয়ে যান।
অর্থাৎ, রাজ্যের সাধারণ মানুষের নামের সাথে নিজের নামের সাদৃশ্য থাকায় বাদশাহ অসুবিধায় পড়েছিলেন।
'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে লেখক মাহমুদুল হক হাস্যরসাত্মকভাবে দুষ্টলোকের স্বাভাবিক পতন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও জয় তুলে ধরেছেন। গল্পটির একটি অন্যতম চরিত্র হলো উজির আক্কেল আলী। লেখক এই চরিত্রটিকে বাদশাহর প্রিয় পাত্র ও চাটুকার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে বাদশাহ শমশের আলীজানের মোসাহেব হলো উজির আক্কেল আলী। সে অত্যন্ত ধুরন্ধর ও চাটুকার। বাদশাহর নাম তিনবার উচ্চারণের ঘোষণায় অন্যরা ঠাট্টা করলেও সে খুব খুশি হয় এবং বাদশাহর প্রশংসা করে। চাটুকারিতার মাধ্যমেই সে বাদশাহর সবচেয়ে প্রিয় পাত্র বিশ্বস্ত ব্যক্তি হয়ে ওঠে। উজিরকে বাদশাহ কাউকে ধরে আনতে বললে সে বেঁধে আনে। বাদশাহ হাঁচলে-কাশলে সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। বাদশাহর ন্যায়-অন্যায়, ভালো-খারাপ সব সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে উজির তাকে সমর্থন জানায়।
'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে উজির আক্কেল আলী চরিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত মেরুদণ্ডহীন একটি চরিত্র। তার নিজস্ব কোনো মতামত বা সিদ্ধান্ত নেই। বাদশাহর হ্যাঁ তে হ্যাঁ বলা এবং বাদশাহর তোষামোদ করাই তার প্রধান কাজ। তবে শেষ পর্যন্ত বাদশাহর সামনে বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টাই উজিরের ধ্বংসের কারণ হয়ে যায়। সে সমুদ্রের তলদেশ থেকে ঘুড়ি শব্দের অর্থ খুঁজে আনতে গিয়ে ডুবে মারা পড়ে। এক্ষেত্রে গল্পটিতে তোষামোদে ব্যস্ত উজিরের বোকামো ও বিবেচনাবোধের অভাবও পরিলক্ষিত হয়।
সুতরাং, উপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, 'পদ্য লেখার জোরে' গল্পে উজির আক্কেল আলী একাধারে চাটুকার, বোকা ও অবিবেচক একটি চরিত্র।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!