'মুক্তি' গল্পে ফুটে উঠেছে দাস ব্যবস্থার করুণ ইতিহাস। দাস ব্যবস্থা মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। যেখানে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে সম্পূর্ণভাবে অন্য মানুষের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দাসদের নিজস্ব স্বাধীনতা, অধিকার ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার কোনো মূল্য ছিল না। তাদেরকে জোরপূর্বক কাজ করানো হতো এবং অনেক সময় অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। মূলত আফ্রিকার কালো মানুষদের দাস হিসেবে ব্যবহার করত শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা। বাজারে অন্য পণ্যের মতো কেনা-বেচা করা হতো দাসদের। 'মুক্তি' গল্পে কুন্টা ছিল একজন দাস। বাজারে তোলা হলে তাকে কেনার জন্য চারদিকে লোকজন এসে ভিড় করে। যুবক কুন্টাকে কেনার জন্য লোকজন তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করে। কারণ দাসরা ছিল বাজারের অন্য পণ্যের মতোই। যেকোনো পণ্য ক্রয় করতে গেলে ক্রেতা যেমন পণ্যটিকে ভালোভাবে যাচাই করে নেয় তেমনই দাস কুন্টাকেও কেনার জন্য শ্বেতাঙ্গ মালিকেরা তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করে নেয়।
তাই বলা যায়, দাস কুন্টাকে ক্রয় করার জন্য চারদিকের লোকজন এগিয়ে এসে তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করছিল।
অ্যালেক্স হ্যালির বিখ্যাত উপন্যাস 'Roots' এর বঙ্গানুবাদ করেন গীতি সেন। তাঁর অনুবাদকৃত গ্রন্থ থেকে অংশবিশেষ নিয়ে রচনা করা হয়েছে 'মুক্তি' গল্পটি। এখানে মুক্তি বলতে মূলত গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র দাস কুস্টার মুক্তিকে বোঝানো হয়েছে। আমেরিকান শ্বেতাঙ্গদের কাছে বন্দি তরুণ কুন্টা তার অসাধারণ বুদ্ধি, সাহস ও শক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে।
'মুক্তি' গল্পের কেন্দ্রে যে চরিত্র রয়েছে তার নাম কুন্টা। সে আফ্রিকার গাম্বিয়া দেশের জুফরে নামক গ্রামের অধিবাসী। তরুণ কুন্টাকে আমেরিকার সাদা মানুষেরা ধরে এনে দাস হিসেবে বাজারে তোলে। গল্পের পটভূমির সময়ে প্রচলিত দাস ব্যবস্থা ছিল মানব ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়। সেই সময়ে আফ্রিকার কালো মানুষদের তুলনা করা হতো পণ্যের সঙ্গে। পণ্যের মতোই তাদের বাজারে বিক্রি করা হতো। সাদা মানুষেরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে এই কালো মানুষদের ব্যবহার করত। অমানবিক নির্যাতন ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতো তাদের জীবন। তবে মাঝেমধ্যে ঘটনাক্রমে নিজের বুদ্ধিমত্তায় কোনো কোনো দাস তার দাসত্ব জীবন থেকে পালিয়ে মুক্তি পেত। সেরকমই একজন ভাগ্যবান ছিল কুন্টা। সাদা আমেরিকানরা কুন্টাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জামা-কাপড় পরিয়ে সভ্য করে তোলে। তারপর বাজারে তোলে বিক্রির জন্য। কুন্টাকে তুলনা করা হয়েছে সদ্য গাছ থেকে পেড়ে আনা তীক্ষ্ণ বৃদ্ধিসম্পন্ন বানরের সঙ্গে। যাকে সবকিছু শিখিয়ে নেওয়া যাবে। তরুণ কুন্টাকে সাড়ে আটশ ডলারে কিনে নিয়ে এক সাদা আমেরিকান বাড়ির দিকে যাত্রা করে। তবে কুন্টার মনের মধ্যে সর্বদা বিরাজ করেছে পালানোর চিন্তা। সে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে সর অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে গেছে। অযথা শক্তি ক্ষয় না করে সে সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে।
তার অসম ধৈর্যের গুণে সে একসময় সুযোগ পেয়ে যায়। সাদা লোকটি তাকে কিনে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরল তখন রাত্রিবেলা। সাদা লোকটি যখন গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে তখন সে প্রচণ্ড আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে গাড়িচালকের ওপর। সে প্রচন্ড পরাক্রমে হায়েনার শক্তিশালী চোয়ালের মতো কঠিন হাতে তার কণ্ঠনালি টিপে ধরল। একসময় গাড়িচালকের শক্তিহীন নিঃসাড় দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কুন্টা সেখান থেকে দ্রুতবেগে সরে পড়ে। খেতের অসমান কর্কশ জমির ওপর দিয়ে সে নিচু হয়ে দৌড়াতে থাকে। সেই সময় মুক্তির আনন্দে তার সর্বদেহ ও মন আতশবাজির মতো ফেটে পড়তে চাইছিল।
পরিশেষে তাই বলা যায়, তরুণ কুন্টা তার বুদ্ধি, শক্তি ও সাহস দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে। বুদ্ধি খাটিয়ে সাহস করে উদ্যোগ নিয়েছে বলেই সে একসময় উপভোগ করতে পেরেছে মুক্তির আনন্দ।
Related Question
View All'মুক্তি' গল্পে দাস ব্যবস্থার নির্মম দিকগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পৃথিবীতে এমন একটা জঘন্য সময় ছিল যখন মানুষ মানসিকতার দিক থেকে এতটাই নিকৃষ্ট ছিল যে, আফ্রিকার কালো মানুষগুলোকে ধরে এনে বন্দি করে রাখত। আর তাদেরকে বাজারে বিক্রি করার জন্য নিলামে তুলত। এ গল্পে আফ্রিকার গাম্বিয়া দেশের জুফরে নামক গ্রামের অধিবাসী কুন্টাকে আমেরিকানরা ধরে এনে বন্দি করে রাখে। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বন্দিও ছিল। পায়ে তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা। একদিন সকালে খাবার পর দুজন সাদা মানুষ একবোঝা জামা-কাপড় হাতে ঘরে ঢুকল। কুন্টা ও অন্য বন্দিরা জামা-কাপড় পরে বিমূঢ় হয়ে বসে ছিল। বাইরে লোকজনের কথাবার্তার কোলাহল শোনা যাচ্ছিল। সাদা মানুষ দুটো ফিরে এসে প্রথমে রাখা বন্দিদের মাঝে তিনজনকে বের করে নিয়ে গেল। তারপরেই বাইরের আওয়াজের ধরনটা বদলে গেল। বন্দিদের আসলে বাইরে নেওয়া হয়েছিল নিলামে তুলে বিক্রি করার জন্য। সাদা আমেরিকানরা কালো লোকগুলোকে পণ্যের মতোই বাজারে তুলে বিক্রির জন্য তাদের গুণ বর্ণনা করতে থাকে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে যেসব বন্দি তারা বিক্রির জন্য বাজারে তুলেছে তাদের স্বাস্থ্য নিখুঁত, আর কর্মশক্তিও অফুরন্ত।
"কুন্টার মধ্যে জাতিগত ও বর্ণগত নিপীড়ন থেকে মুক্ত হওয়ার তীব্র বাসনা প্রকাশিত হয়েছে।"- মন্তব্যটি পুরোপুরি সত্য। 'মুক্তি' গল্পে কুন্টা এক স্বাধীনতাকামী তরুণ যুবক। তাকে আফ্রিকার গাম্বিয়ার জুফরে নামক গ্রাম থেকে ধরে এনে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। সাদা আমেরিকানরাই তাকে ধরে এনে বিক্রি করে দেয় আরেক সাদা মানুষের কাছে। কুষ্টা ছিল তরুণ যুবক; তাই বাজারে তার মূল্যও ছিল বেশি। ফলে সাড়ে আটশ ডলারে তাকে বিক্রি করা হয়। তবে কুন্টা প্রতিটি মুহূর্তে পালিয়ে যেতে চেয়েছে তার প্রিয় জন্মভূমি জুফরেতে। সে কোনোমতেই দাস হিসেবে বন্দি থাকতে চায়নি। তার মনের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনের তীব্র বাসনা লক্ষ করা যায় গল্পজুড়ে।
'মুক্তি' গল্পে আফ্রিকান কালো নির্দোষ মানুষগুলোর প্রতি সাদা আমেরিকানদের জাতিগত ও বর্ণগত নিপীড়নের নির্মম চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। কুন্টা ও অন্য কালো মানুষগুলোকে কথিত সাদা মানুষগুলো ধরে এনে পশুর মতো শিকল দিয়ে বেঁধে বন্দি করে রাখে। কুন্টার শরীরে একসময় শিকলের বাঁধনে ঘা হয়ে যায়। তাদের ওপর সাদারা নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়ন করে, যা আলোচ্য গল্পের বিভিন্ন ঘটনায় ফুটে উঠেছে। কুন্টাদের যখন ডেকে ডেকে দাম বলে বিক্রির জন্য ঘোষণা করা হচ্ছিল তখন কুন্টা ভয়ে শিউরে উঠেছিল। তার মুখ বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছিল। নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। যখন চারজন সাদা মানুষ কুন্টাকে স্পর্শ করে তখন সে রাগে ভয়ে দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে। আর তখন সাদা অমানুষগুলো তার মাথায় প্রবল আঘাত করে তার বোধশক্তি লোপ করে দেয়।
কুন্টাকে যখন বিক্রির জন্য বাজারে তোলা হয় তখন সে দেখতে পায় সেখানে আরও কালো মানুষ লাইনে দাঁড়ানো। চারদিকে শত শত সাদা মানুষ হাঁ-করে তাকিয়ে আছে। আর সাদা মানুষগুলো কালো মানুষগুলোর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলতে থাকে তারা নাকি সদ্য গাছ থেকে পেড়ে আনা, বাঁদরের মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, আর তাদেরকে সবকিছুই শিখিয়ে নেওয়া যাবে। কালোদের প্রতি এমন নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রবল বাসনা লক্ষ করা যায় কুন্টার মধ্যে।
কুন্টা একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাহসী তরুণ। সে দাস হিসেবে থাকতে চায় না। প্রতি মুহূর্তে সে সাদা মানুষগুলোকে ঘৃণা করেছে। তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছে কখনো সরাসরি আবার কখনোবা গোপনে। বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি ছাড়া তার আর কোনো লক্ষ্য ছিল না। তাই প্রতিটি মুহূর্তে সে সুযোগ খুঁজেছে পালিয়ে যাওয়ার। যেকোনো মূল্যে যেকোনো উপায়ে সে এটি করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। তার কাছে মুক্তির আনন্দ ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্যই যেন ছিল না। ফলে সে তার বুদ্ধি, শক্তি ও সাহস দিয়ে স্বাধীন হওয়ার জন্য প্রবল চেষ্টা চালায়।
কুন্টাকে সাদা লোকগুলো যখন খাবার খেতে দেয় সেই খাবারও সে খায়নি। বারবার সে মুখ ফিরিয়ে নেয় সেই খাবার দেখে। অথচ পেটে তার ভীষণ খিদে ছিল। এখানে তার প্রবল ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। সে বুঝিয়েছে তাকে পশুর মতো বন্দি রেখে আবার খাবার দিয়ে সাদা লোকগুলো যে দরদ দেখাতে চায় তার বিন্দুমাত্র গুরুত্ব তার কাছে নেই। বরং সে চায় বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি। এভাবেই তার প্রতিটি কর্মকাণ্ড ও আচরণে জাতিগত ও বর্ণগত নিপীড়ন থেকে মুক্ত হওয়ার তীব্র বাসনা প্রকাশিত হয়েছে।
"তার প্রতি কুন্টার অনুনয়পূর্ণ চাহনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।"-এখানে কুন্টার ক্রেতার সঙ্গে আসা কালো লোকটিকে দেখে কুন্টার চাহনিকে বোঝানো হয়েছে। কুস্টার মতো কিছু কালো মানুষকে আফ্রিকার জুফরে গ্রাম থেকে ধরে এনে বন্দি করে রাখে সাদা আমেরিকানরা। কুন্টাদের ওপর তারা নির্মম নির্যাতন চালায়। শিকল পরিয়ে তাদেরকে বিক্রি করার জন্য বাজারে তোলা হয় আর চিৎকার করে তাদের দাম ঘোষণা করা হয়। সে এগুলো কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। যেকোনো মূল্যে সে বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হতে চায়। কেননা তার শরীর ছিল শিকলে বাঁধা। এমন অবস্থা দেখে কুন্টা খুবই অস্বস্তিতে ভোগে। কুন্টাকে একসময় সাড়ে আটশ ডলার দিয়ে কিনে নেয় এক সাদা আমেরিকান। সেই সাদা লোকটির সঙ্গে আসে একজন কালো লোক। আর তাকে দেখেই কুন্টা নতুন আশায় বুক বাঁধে। সে মনে করে লোকটি যেহেতু তার স্বজাতির তাই হয়তো সে কুন্টার প্রতি করুণা দেখাবে। কিন্তু লোকটি তাকে আশাহত করে। কেননা সেই কালো লোকটি কুন্টার প্রতি কোনো করুণা দেখায়নি। বরং সে লক্ষ্যহীন নির্বিকার দৃষ্টিতে কুন্টাকে শিকলসুদ্ধ টেনে একটা চার চাকার বাক্সের সামনে নিয়ে গেল। কালো লোকটা রূঢ়ভাবে কুন্টাকে বাক্সের মেঝেতে ঠেলে ফেলে দিয়ে শিকলটা কোথায় যেন আটকে দেয়। তাই তার প্রতি কুন্টার অনুনয়পূর্ণ চাহনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
দাস ব্যবস্থা বলতে মূলত সেই ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে মানুষকে পণ্য হিসেবে ক্রয়-বিক্রয় করা হয় এবং জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। এটি মানব ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় যা বিশেষভাবে প্রসারিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক যুগে। দাস ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে তাদের মাতৃভূমি থেকে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। দাস ব্যবস্থার সেই নির্মম চিত্রের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে 'মুক্তি' গল্পে।
কুন্টা নামের এক দাসের জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে 'মুক্তি' গল্পের কাহিনি। গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, মাতৃভূমি গাম্বিয়ার জুফরে নামক গ্রাম থেকে জোর করে ধরে এনে শিকলবন্দি করে রাখা হয়েছে কুন্টাকে। তার সর্বাঙ্গে নির্যাতনের চিহ্ন। জামা-কাপড় পরিয়ে সভ্য করে বাজারে তোলা হবে কুন্টাকে। সেখানে সাদা মানুষেরা পণ্যের মতো পরীক্ষা করে কিনে নেবে তাকে। তরুণ কুন্টাকে দেখে সাদা মানুষেরা বলে উঠেছে, "নিখুঁত স্বাস্থ্য। অফুরন্ত কর্মশক্তি।" অর্থাৎ তাকে দিয়ে সব ধরনের কাজ করানো যাবে। বাজারের মধ্যে শিকল হাতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় তাকে। চারদিকের লোকজন এসে তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করে। পণ্যের মতো যাচাই-বাছাই করে এক সাদা আমেরিকান তাকে সাড়ে আটশত ডলারে ক্রয় করে। মানুষের প্রতি মানুষ কতটা অমানবিক হলে এরূপ চিত্র দেখতে পাওয়া যায় তার প্রমাণ 'মুক্তি' গল্পটির প্রতিটি পাতায় ছড়িয়ে আছে। সেখানে কুন্টার প্রতি সাদা মানুষদের অমানবিক নির্যাতনের চিত্রই দাস ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
গাম্বিয়ার জুফরে নামক গ্রামের অধিবাসী কুন্টা সাদা মানুষদের পাশবিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। তাকে সব সময় শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে নির্যাতন করা হয়। তাকে যে খাবার দেওয়া হয় সেটাও একসময় এক কুকুর এসে খেয়ে যায়। সে পালাতে চায়। জীবনে আর কখনো সে যদি নিজ গ্রামে যেতে পারে তবে প্রত্যেক ঘরে ঘরে সাদা মানুষের এই অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার কাহিনি সে শোনাবে বলে সংকল্প করে। সে অসীম ধৈর্য, সাহস ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পালানোর সুযোগ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। একসময় সে তাতে সক্ষম হয়। মূলত দাস ব্যবস্থার নামে আমেরিকান সাদা মানুষেরা আফ্রিকার কালো মানুষদের ওপর যে পাশবিক নির্যাতন চালাত সেটিই তুলে ধরা হয়েছে 'মুক্তি' গল্পে।
তাই বলা যায়, মানব ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় দাস ব্যবস্থার নির্মম চিত্র তুলে ধরা হয়েছে 'মুক্তি' গল্পে।
'মুক্তি' গল্পে ফুটে উঠেছে দাস ব্যবস্থার করুণ ইতিহাস। দাস ব্যবস্থা মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। যেখানে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে সম্পূর্ণভাবে অন্য মানুষের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দাসদের নিজস্ব স্বাধীনতা, অধিকার ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার কোনো মূল্য ছিল না। তাদেরকে জোরপূর্বক কাজ করানো হতো এবং অনেক সময় অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। মূলত আফ্রিকার কালো মানুষদের দাস হিসেবে ব্যবহার করত শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা। বাজারে অন্য পণ্যের মতো কেনা-বেচা করা হতো দাসদের। 'মুক্তি' গল্পে কুন্টা ছিল একজন দাস। বাজারে তোলা হলে তাকে কেনার জন্য চারদিকে লোকজন এসে ভিড় করে। যুবক কুন্টাকে কেনার জন্য লোকজন তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করে। কারণ দাসরা ছিল বাজারের অন্য পণ্যের মতোই। যেকোনো পণ্য ক্রয় করতে গেলে ক্রেতা যেমন পণ্যটিকে ভালোভাবে যাচাই করে নেয় তেমনই দাস কুন্টাকেও কেনার জন্য শ্বেতাঙ্গ মালিকেরা তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করে নেয়।
তাই বলা যায়, দাস কুন্টাকে ক্রয় করার জন্য চারদিকের লোকজন এগিয়ে এসে তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করছিল।
অ্যালেক্স হ্যালির বিখ্যাত উপন্যাস 'Roots' এর বঙ্গানুবাদ করেন গীতি সেন। তাঁর অনুবাদকৃত গ্রন্থ থেকে অংশবিশেষ নিয়ে রচনা করা হয়েছে 'মুক্তি' গল্পটি। এখানে মুক্তি বলতে মূলত গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র দাস কুস্টার মুক্তিকে বোঝানো হয়েছে। আমেরিকান শ্বেতাঙ্গদের কাছে বন্দি তরুণ কুন্টা তার অসাধারণ বুদ্ধি, সাহস ও শক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে।
'মুক্তি' গল্পের কেন্দ্রে যে চরিত্র রয়েছে তার নাম কুন্টা। সে আফ্রিকার গাম্বিয়া দেশের জুফরে নামক গ্রামের অধিবাসী। তরুণ কুন্টাকে আমেরিকার সাদা মানুষেরা ধরে এনে দাস হিসেবে বাজারে তোলে। গল্পের পটভূমির সময়ে প্রচলিত দাস ব্যবস্থা ছিল মানব ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়। সেই সময়ে আফ্রিকার কালো মানুষদের তুলনা করা হতো পণ্যের সঙ্গে। পণ্যের মতোই তাদের বাজারে বিক্রি করা হতো। সাদা মানুষেরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে এই কালো মানুষদের ব্যবহার করত। অমানবিক নির্যাতন ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতো তাদের জীবন। তবে মাঝেমধ্যে ঘটনাক্রমে নিজের বুদ্ধিমত্তায় কোনো কোনো দাস তার দাসত্ব জীবন থেকে পালিয়ে মুক্তি পেত। সেরকমই একজন ভাগ্যবান ছিল কুন্টা। সাদা আমেরিকানরা কুন্টাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জামা-কাপড় পরিয়ে সভ্য করে তোলে। তারপর বাজারে তোলে বিক্রির জন্য। কুন্টাকে তুলনা করা হয়েছে সদ্য গাছ থেকে পেড়ে আনা তীক্ষ্ণ বৃদ্ধিসম্পন্ন বানরের সঙ্গে। যাকে সবকিছু শিখিয়ে নেওয়া যাবে। তরুণ কুন্টাকে সাড়ে আটশ ডলারে কিনে নিয়ে এক সাদা আমেরিকান বাড়ির দিকে যাত্রা করে। তবে কুন্টার মনের মধ্যে সর্বদা বিরাজ করেছে পালানোর চিন্তা। সে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে সর অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে গেছে। অযথা শক্তি ক্ষয় না করে সে সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে।
তার অসম ধৈর্যের গুণে সে একসময় সুযোগ পেয়ে যায়। সাদা লোকটি তাকে কিনে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরল তখন রাত্রিবেলা। সাদা লোকটি যখন গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে তখন সে প্রচণ্ড আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে গাড়িচালকের ওপর। সে প্রচন্ড পরাক্রমে হায়েনার শক্তিশালী চোয়ালের মতো কঠিন হাতে তার কণ্ঠনালি টিপে ধরল। একসময় গাড়িচালকের শক্তিহীন নিঃসাড় দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কুন্টা সেখান থেকে দ্রুতবেগে সরে পড়ে। খেতের অসমান কর্কশ জমির ওপর দিয়ে সে নিচু হয়ে দৌড়াতে থাকে। সেই সময় মুক্তির আনন্দে তার সর্বদেহ ও মন আতশবাজির মতো ফেটে পড়তে চাইছিল।
পরিশেষে তাই বলা যায়, তরুণ কুন্টা তার বুদ্ধি, শক্তি ও সাহস দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে। বুদ্ধি খাটিয়ে সাহস করে উদ্যোগ নিয়েছে বলেই সে একসময় উপভোগ করতে পেরেছে মুক্তির আনন্দ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!