আবদুর রহমানের সাথে লেখকের একটি গভীর মানবিকতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আবদুর রহমানের সহজ-সরল, উদার মানবিকতা ও নৈতিক গুণ লেখককে মুগ্ধ করেছে। তাই লেখক তাকে পরম বান্ধব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
সমাজে আমরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। যখন কেউ বিপদে পড়ে, তখন অন্যরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে, যা একটি পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করে। কিন্তু মাঝে মাঝে জীবনে এমন কিছু মানুষ চলে আসে যারা তাদের ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতা দ্বারা মন জয় করে নেয়। 'কাবুলের শেষ প্রহরে' ভ্রমণকাহিনির আবদুর রহমানও তেমনই একজন ব্যক্তি যার উদার, হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ লেখককে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। আফগানিস্তানে লেখকের প্রথম পরিচয় হয় এই আবদুর রহমানের সাথে। আবার শেষ দিনে সেই আবদুর রহমানই তাঁকে বিদায় জানায়। মাঝে সমস্ত উৎসবে, ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে এমনকি শেষ বিদায়কে শশ্মান ধরলে, সেই শ্মশানেও সে লেখকের পাশে পাশে কাঁদছিল। লেখক মনে করেন, স্বয়ং চাণক্য যে কয়টা পরীক্ষার উল্লেখ করেছেন আবদুর রহমান সব কয়টাই উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই তাকে লেখক পরম বান্ধব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
মানুষের প্রতি মানুষের যে কারণে সহানুভূতি ও দয়ালু হতে অনুপ্রেরণা দেয় ও তাগিদ জাগ্রত করে, চির আপন বলে মনে হয়, আবদুর রহমান সেসব গুণের অধিকারী ছিল বলেই লেখক তাকে আত্মজন, পরম বন্ধু হিসেবে বরণ করে নেন।
একজন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী, বিনম্র ও নিঃস্বার্থ মানুষ হিসেবে আবদুর রহমানের পাগড়ি ও হৃদয়কে লেখকের কাছে বরফের চেয়েও শুভ্রতর মনে হয়েছে।
কাবুলের শেষ প্রহরে' সৈয়দ মুর মুজতবা আলীর একটি বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি। এটি আফগানিস্তানের কাবুল শহরে অবস্থানকালে তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার অংশবিশেষ। আফগান সরকারের শিক্ষা বিভাগে কাজ করার সময় লেখক কাবুলে অবস্থান করছিলেন। তখন তাঁর গৃহপরিচারক হিসেবে আবদুর রহমান নামের একজনকে নিযুক্ত করা হয়। আবদুর রহমান ছিল শান্ত, সহজ-সরল, বিনম্র ও দায়িত্বশীল মানুষ। তার দায়িত্বজ্ঞান ছিল প্রবল। তার সঙ্গে লেখকের ভালো একটি মানবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রভু-ভৃত্যের বাইরে গিয়ে সবাই যে মানুষ, প্রত্যেকেরই প্রত্যেককে ভালো রাখার যে দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তা লেখক ও আবদুর রহমানের সম্পর্কে দেখা যায়। আবদুর রহমান তার সরলতা, নিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা লেখকের মনে স্থান পায়। কেননা, গৃহকর্ম ছাড়াও লেখকের সার্বিক দেখভালের প্রতিও ছিল তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। কাবুলে যখন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তখনও আবদুর রহমান লেখককে একা ফেলে চলে যায়নি। চরম খাদ্য সংকটেও লেখক ও আবদুর রহমান অল্প খাবার ভাগ করে খেতেন। নিরাপত্তার স্বার্থে লেখক দেশে ফেরার টিকিট পেলে আবদুর রহমানের মনে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তার চোখে জল আসে। বিমানবন্দরেও দেখা যায় আবদুর রহমান বিমানকে ভয় পায়। তাই সে বারবার বলতে থাকে- "তোমাকে খোদার হাতে সোপর্দ করলাম।" অর্থাৎ লেখকের যাতে কল্যাণ হয় তাই সে বারবার খোদাতালার কাছে তাঁকে সঁপে দিতে থাকে।
একজন হতদরিদ্র ভৃত্য যার কাজ কেবলই দায়িত্ব পালন করা, সেখানে দেখা যায়- আবদুর রহমান কেবলই দায়িত্বই পালন করেনি, বরং উদার মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সে লেখককে সব কাজে সাহায্যের পাশাপাশি স্বচ্ছ হৃদয়ের দ্বারা লেখকের মনেও জায়গা করে নিয়েছে।
আফগানিস্তানে প্রথম পরিচয়ের সেই আফগান আবদুর রহমান শেষ দিনের বিদায় বেলায়ও লেখকের পাশে পাশে ছিল। বহুদিন ধরে সাবান না থাকায় তার পাগড়িটি ময়লা হয়ে গেছে অর্থাৎ আবদুর রহমান হতদরিদ্র। কিন্তু মনের দিক থেকে আবদুর রহমান অতীব দ্ব५ হৃদয়ের অধিকারী। উদারতা, ভালোবাসা, মানবিক দৃষ্টিকোণ ও দায়িত্বশীলতায় আবদুর রহমানের হৃদয় লেখকের কাছে তাই চতুর্দিকের সাদা বরফের চেয়েও শুভ্রতম মনে হয়েছে।
Related Question
View Allবিদায়ের সময় যে মানসিক কষ্ট বা যন্ত্রণা অনুভূত হয়, তা যে মৃত্যুর মতো গভীর এবং অবর্ণনীয় হতে পারে সেটাই উদ্ধৃতাংশটিতে বোঝানো হয়েছে।
যখন কোনো প্রিয় ব্যক্তি বা অমূল্য কিছু ছেড়ে চলে যেতে হয়, তখন তা এমন এক অনুভূতির সৃষ্টি করে যা মৃত্যুযন্ত্রণার সাথে তুলনীয়।
বিদায়ের কষ্ট এমনভাবে তীব্র হতে পারে, যেন তা এক ধরনের ছোটো মৃত্যু বা খণ্ডমৃত্যু। 'কাবুলের শেষ প্রহরে' ভ্রমণকাহিনিটিতে লেখকের কাবুল শহরে অবস্থানকালের কিছু ঘটনার বর্ণনা পাই। তাঁর গৃহপরিচারক আবদুর রহমানের সাথে তাঁর একটা মানবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিছুদিন পর কাবুলে হঠাৎ করেই এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে খাবার-দাবারসহ নিরাপত্তাজনিত সংকটও দেখা দেয়। লেখকের এই কঠিন সময়েও আবদুর রহমান সব সময় তাঁর পাশে পাশে ছিল। লেখককে যখন নিরাপত্তার স্বার্থে কাবুল ত্যাগ করতে হয়, তখন তিনি বেদনাহত হন। আবদুর রহমানের মতো মানুষদের সঙ্গে তাঁর যে একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, এতে সবাইকে তাঁর আত্মজন মনে হতে লাগল। ফলে এদেরকে ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সময় তাঁর মনে হচ্ছিল- তাঁর সত্তাকে যেন কেউ দ্বিখন্ডিত করে ফেলেছে।
'কাবুলের শেষ প্রহরে' ভ্রমণকাহিনিটি সৈয়দ মুজতবা আলীর 'দেশে-বিদেশে' গ্রন্থের শেষ পরিচ্ছেদ থেকে নেওয়া হয়েছে। আফগানিস্তান সরকারের শিক্ষা বিভাগে কাজ করার সময় লেখক কিছুদিন কাবুলে অবস্থান করেন। সেখানে থাকাকালে তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া কিছু অভিজ্ঞতার কথা তিনি এখানে তুলে ধরেছেন গভীর অনুভূতি দিয়ে।
কাবুল শহরে অবস্থানকালে আবদুর রহমান নামের এক গৃহপরিচারক লেখকের দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। সে ছিল খুবই বিনয়ী, উদার ও নিষ্ঠাবান। গৃহকর্ম ছাড়াও লেখকের দেখভালের প্রতিও তার বিশেষ নজর ছিল। তার সঙ্গে লেখকের একটি গভীর মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কিছুদিন পর কাবুলে হঠাৎ এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে খাবার-দাবারসহ সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে মানুষ নিরাপত্তার স্বার্থে দেশত্যাগ করতে শুরু করে। লেখকও বিমানের একটি টিকিট পান। দেশে ফেরার আগে বিদায় বেলায় আবদুর রহমানের সাথে লেখকের একটি আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। আবদুর রহমান কাবুলে সব সময় লেখকের পাশে পাশে ছিল। তাঁর সব ক্ষেত্রে খেয়াল রেখে চলত। বিদায়ের সময় সে তাই এতটাই কষ্ট পায় যে, কোনো কথা না বলে চুপ হয়ে যায়। বিমানে ওঠার সময় অশ্রুসিক্ত নয়নে লেখককে বারবার বলতে থাকে- 'র খুদা সম্পূর্দমৎ, সায়েব।' অর্থাৎ তোমাকে খোদার হাতে সোপর্দ করলাম। বিমানকে সে প্রচন্ড ভয় পায়। তাই সে লেখকের জন্য খোদার কাছে আরও বেশি দোয়া প্রার্থনা করতে থাকে। লেখকেরও আবদুর রহমানের প্রতি অদ্ভুত এক মায়া জন্মায়। তাকে তাঁর একান্ত আত্মজন বলে মনে হয়। ফলে তাকে ছেড়ে যেতে মনে হচ্ছিল- কেউ যেন তাঁর সত্তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। লেখকের মনে হতে থাকে "প্রত্যেক বিদায় গ্রহণে রয়েছে খণ্ড-মৃত্যু।" কেননা, সকল উৎসবে, ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে সব সময় সে লেখকের পাশে পাশে ছিল। তাই তাকে লেখকের পরম বান্ধব মনে হয়।
দয়া, উদারতা, মানুষের প্রতি মানুষের পরম স্নেহ-ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই 'কাবুলের শেষ প্রহরে' ভ্রমণকাহিনিটি। মানুষের প্রতি শুদ্ধতম ভালোবাসার জন্য দেশ, কাল বা জাতি-ধর্ম-বর্ণ যে মুখ্য বিষয় নয়, তাই এখানে উঠে এসেছে। একজন বিদেশি হয়েও আবদুর রহমান লেখকের প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছে তা অসাধারণ। তেমনই একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েও বিদেশি, গরিব এক গৃহপরিচারকের প্রতি লেখকের যে উদারতা, মানবিকতার প্রকাশ ঘটেছে তা অসামান্য। এজন্যই আফগানিস্তানে লেখকের অনেক উচ্চপদস্থ বন্ধু থাকা সত্ত্বেও আবদুর রহমানকেই তিনি পরম বান্ধব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর মনে হয়েছে- চতুর্দিকের এত শুভ্র বরফের চেয়েও আবদুর রহমানের পাগড়ি শুভ্রতর ও হৃদয় শুভ্রতম। অর্থাৎ মনের দিক থেকে আবদুর রহমান অনেক বেশি উদার ও মানবিকতার অধিকারী।
আবদুর রহমানের সাথে লেখকের একটি গভীর মানবিকতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আবদুর রহমানের সহজ-সরল, উদার মানবিকতা ও নৈতিক গুণ লেখককে মুগ্ধ করেছে। তাই লেখক তাকে পরম বান্ধব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
সমাজে আমরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। যখন কেউ বিপদে পড়ে, তখন অন্যরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে, যা একটি পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করে। কিন্তু মাঝে মাঝে জীবনে এমন কিছু মানুষ চলে আসে যারা তাদের ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতা দ্বারা মন জয় করে নেয়। 'কাবুলের শেষ প্রহরে' ভ্রমণকাহিনির আবদুর রহমানও তেমনই একজন ব্যক্তি যার উদার, হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ লেখককে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। আফগানিস্তানে লেখকের প্রথম পরিচয় হয় এই আবদুর রহমানের সাথে। আবার শেষ দিনে সেই আবদুর রহমানই তাঁকে বিদায় জানায়। মাঝে সমস্ত উৎসবে, ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে এমনকি শেষ বিদায়কে শশ্মান ধরলে, সেই শ্মশানেও সে লেখকের পাশে পাশে কাঁদছিল। লেখক মনে করেন, স্বয়ং চাণক্য যে কয়টা পরীক্ষার উল্লেখ করেছেন আবদুর রহমান সব কয়টাই উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই তাকে লেখক পরম বান্ধব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
মানুষের প্রতি মানুষের যে কারণে সহানুভূতি ও দয়ালু হতে অনুপ্রেরণা দেয় ও তাগিদ জাগ্রত করে, চির আপন বলে মনে হয়, আবদুর রহমান সেসব গুণের অধিকারী ছিল বলেই লেখক তাকে আত্মজন, পরম বন্ধু হিসেবে বরণ করে নেন।
একজন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী, বিনম্র ও নিঃস্বার্থ মানুষ হিসেবে আবদুর রহমানের পাগড়ি ও হৃদয়কে লেখকের কাছে বরফের চেয়েও শুভ্রতর মনে হয়েছে।
কাবুলের শেষ প্রহরে' সৈয়দ মুর মুজতবা আলীর একটি বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি। এটি আফগানিস্তানের কাবুল শহরে অবস্থানকালে তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার অংশবিশেষ। আফগান সরকারের শিক্ষা বিভাগে কাজ করার সময় লেখক কাবুলে অবস্থান করছিলেন। তখন তাঁর গৃহপরিচারক হিসেবে আবদুর রহমান নামের একজনকে নিযুক্ত করা হয়। আবদুর রহমান ছিল শান্ত, সহজ-সরল, বিনম্র ও দায়িত্বশীল মানুষ। তার দায়িত্বজ্ঞান ছিল প্রবল। তার সঙ্গে লেখকের ভালো একটি মানবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রভু-ভৃত্যের বাইরে গিয়ে সবাই যে মানুষ, প্রত্যেকেরই প্রত্যেককে ভালো রাখার যে দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তা লেখক ও আবদুর রহমানের সম্পর্কে দেখা যায়। আবদুর রহমান তার সরলতা, নিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা লেখকের মনে স্থান পায়। কেননা, গৃহকর্ম ছাড়াও লেখকের সার্বিক দেখভালের প্রতিও ছিল তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। কাবুলে যখন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তখনও আবদুর রহমান লেখককে একা ফেলে চলে যায়নি। চরম খাদ্য সংকটেও লেখক ও আবদুর রহমান অল্প খাবার ভাগ করে খেতেন। নিরাপত্তার স্বার্থে লেখক দেশে ফেরার টিকিট পেলে আবদুর রহমানের মনে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তার চোখে জল আসে। বিমানবন্দরেও দেখা যায় আবদুর রহমান বিমানকে ভয় পায়। তাই সে বারবার বলতে থাকে- "তোমাকে খোদার হাতে সোপর্দ করলাম।" অর্থাৎ লেখকের যাতে কল্যাণ হয় তাই সে বারবার খোদাতালার কাছে তাঁকে সঁপে দিতে থাকে।
একজন হতদরিদ্র ভৃত্য যার কাজ কেবলই দায়িত্ব পালন করা, সেখানে দেখা যায়- আবদুর রহমান কেবলই দায়িত্বই পালন করেনি, বরং উদার মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সে লেখককে সব কাজে সাহায্যের পাশাপাশি স্বচ্ছ হৃদয়ের দ্বারা লেখকের মনেও জায়গা করে নিয়েছে।
আফগানিস্তানে প্রথম পরিচয়ের সেই আফগান আবদুর রহমান শেষ দিনের বিদায় বেলায়ও লেখকের পাশে পাশে ছিল। বহুদিন ধরে সাবান না থাকায় তার পাগড়িটি ময়লা হয়ে গেছে অর্থাৎ আবদুর রহমান হতদরিদ্র। কিন্তু মনের দিক থেকে আবদুর রহমান অতীব দ্ব५ হৃদয়ের অধিকারী। উদারতা, ভালোবাসা, মানবিক দৃষ্টিকোণ ও দায়িত্বশীলতায় আবদুর রহমানের হৃদয় লেখকের কাছে তাই চতুর্দিকের সাদা বরফের চেয়েও শুভ্রতম মনে হয়েছে।
বেদনাহত মন নিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে আছে বলে আবদুর রহমান কথা বলতে পারছে না। তাই সে চুপ করে থাকাটাই পছন্দ করছে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর 'কাবুলের শেষ প্রহরে' একটি ভ্রমণ-কাহিনিমূলক রচনা। কর্মসূত্রে তিনি যখন আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছিলেন তখনকার একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রচনাটি লিখিত। এ সময় আবদুর রহমান নামের এক গৃহপরিচারক লেখকের দেখভাল করত। প্রভু-ভৃত্যের বাইরেও যে মানুষে মানুষে একটি উদার মানবিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে রচনাটি এর জ্বলন্ত উদাহরণ। আবদুর রহমান লেখকের প্রতি ছিল অতি যত্নশীল। একসময় দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য লেখককে নিজ দেশে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু চলে যেতে হবে জেনে আবদুর রহমান শোকাহত হয়। সে লেখকের দুহাত নিজের চোখের ওপর চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। রাস্তায় চলার সময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য লেখক দু'একবার তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু আবদুর রহমান অশ্রুসিক্ত, বেদনাহত হওয়ায় কিছুই বলতে পারে না। তাই চুপ করে থাকে।
আবদুর রহমান ও লেখকের মধ্যকার উদার মানবিক মূল্যবোধের সম্পর্কই বিদায়বেলায় এক আবেগঘন অবস্থার সৃষ্টি করে যা সকল মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পৃথিবীর সকল মানুষই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমান। পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষ বসবাস করুক না কেন, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার, মর্যাদা এবং অনুভূতিগুলো অভিন্ন। মানুষ যদি এই সাধারণ মানবিক মূল্যবোধ উপলব্ধি করে, তাহলে জাতি, ধর্ম বা শ্রেণি নির্বিশেষে সবাইকেই ভালোবাসা সম্ভব।
প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কটি চিরকালই সাধারণত হুকুম দেওয়া ও হুকুম পালনের হয়ে থাকে। সেখানে পারস্পরিক অধিকার ও মর্যাদার দিকটি একপাক্ষিক হয়। অথচ গৃহপরিচারককেও একজন মানুষ হিসেবে সম্মান দেওয়া, তার ব্যক্তিগত সময়, স্থান ও অনুভূতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব গড়ে তোলা মানুষের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। সৈয়দ মুজতবা আলী 'কাবুলের শেষ প্রহরে' নামক গল্পটিতে এমনই এক ঘটনার সন্নিবেশ করেছেন, যেখানে লেখক ও একজন আফগান গৃহপরিচারকের মধ্যে এক অটুট হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। আবদুর রহমান নামক এই গৃহপরিচারক লেখকের প্রতি গভীর স্নেহ-ভালোবাসার স্বাক্ষর রেখেছে। লেখক তার প্রতি গভীর সহানুভূতি, সম্মান ও মানবিক ছিলেন বলেই আবদুর রহমান লেখককে এতটা আপন ভেবে নিয়েছে। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে দেশত্যাগের প্রয়োজন হলে আবদুর রহমান বেদনায় অশ্রুসিক্ত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে লেখক কথা বলতে চাইলেও আবদুর রহমান কথা বলতে পারে না। লেখকও বেদনাহত হন। আবদুর রহমানের সাথে তাঁর এই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের ফলে তাকে লেখকের আত্মজন মনে হয়। চলে যাওয়ার সময় লেখকের মনে হচ্ছিল তাঁর সত্তাকে যেন কেউ দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। আবার বিমানে ওঠার সময় আবদুর রহমান লেখকের মঙ্গলের জন্য বারবার তাঁকে খোদাতায়ালার কাছে সোপর্দ করছিল। ফলে আবদুর রহমান লেখকের মনে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নেয়। আফগানিস্তানে লেখকের প্রথম দিন থেকে বিদায়ের মুহূর্ত পর্যন্ত সে লেখকের পাশে পাশে ছিল। ফলে আবদুর রহমান হয়ে ওঠে লেখকের পরম বান্ধব, প্রবাস বন্ধু। আবদুর রহমানের সততা, নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা আর উদার মানবিক মূল্যবোধের জন্য তার পাগড়িকে শুভ্রতর এবং হৃদয়কে লেখক সাদা বরফের চেয়েও শুভ্রতম মনে হয়। এভাবেই একজন গৃহপরিচারকের সাথে লেখকের একটি মানবিক সম্পর্কের বন্ধন গড়ে ওঠে।
একটি সুন্দর, পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাপূর্ণ মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমেই একজন গৃহপরিচারকের সাথে একটি শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, যা একে অন্যের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে সহাবস্থান করতে সহায়তা করে। 'কাবুলের শেষ প্রহরে' গল্পটিতে এরই বিশেষ চিত্রের প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!