উত্তরঃ
Belt and Road Initiative (BRI) হলো চীনের একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ, যার মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সড়ক, রেলপথ, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত দুটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে-Silk Road Economic Belt এবং 21st-Century Maritime Silk Road। ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্যোগটি ঘোষণা করেন।
BRI বাস্তবায়িত হলে বিশ্বে সম্ভাব্য প্রভাব
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ : এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে নতুন বন্দর, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক রেলপথ, হাইওয়ে এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। এর ফলে পণ্য ও সেবা পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমবে, দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা আরও গতিশীল হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও BRI-সংযুক্ত পরিবহন করিডরগুলো বাণিজ্য ব্যয় কমানো ও বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখিয়েছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি : দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার অনেক উন্নয়নশীল দেশে অর্থ ও প্রযুক্তির অভাবে বড় অবকাঠামো নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। BRI-এর আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেগা সেতু, রেলপথ, বন্দর, মহাসড়ক ও শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়লে এসব দেশের অবকাঠামোগত ঘাটতি কমতে পারে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান : অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি BRI-এর মাধ্যমে শিল্প, ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা স্থানীয় উৎপাদকদের বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে এবং প্রযুক্তি ও শিল্প-সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। ফলে অংশগ্রহণকারী উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি : BRI- এর মাধ্যমে চীনের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক আরও গভীর হবে। এর ফলে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরগুলোতে চীনের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে চীন আরও শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করতে পারে। এ কারণেই BRI-কে চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হয়।
ঋণনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি : BRI-এর বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলো অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। কোনো প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় না এলে ঋণ পরিশোধে সমস্যা, আর্থিক চাপ বা অকার্যকর অবকাঠামো তৈরির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকও BRI-এর ক্ষেত্রে ঋণের স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।
বিকল্প বাণিজ্যপথ ও আর্থিক বহুমুখীকরণ : নতুন স্থল ও সমুদ্র বাণিজ্যপথ গড়ে উঠলে প্রচলিত বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিকল্প রুট তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ার ফলে ইউয়ানসহ স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থব্যবস্থায় বহুমুখিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিবেশগত ঝুঁকি ও টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ : বৃহৎ সড়ক, রেলপথ, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানি প্রকল্প নির্মাণের ফলে বন উজাড়, কার্বন নিঃসরণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ক্ষতি বাড়াতে পারে। তাই BRI প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
সার্বিকভাবে, BRI বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর সুফল সর্বাধিক করতে হলে ঋণের স্থায়িত্ব, প্রকল্পের স্বচ্ছতা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।