জীবাত্মা পরমাত্মার অংশবিশেষ।
আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। আত্মা নিত্যবস্তু ও নিরাকার। একই পরমাত্মা বহু আত্মারূপে জীবদেহের মধ্যে অবস্থান করে। জীবদেহের বিনাশ আছে। কিন্তু আত্মার বিনাশ নেই। জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশবিশেষ। তাই পরমাত্মার ন্যায় জীবাত্মা জন্মমৃত্যুহীন এবং শাশ্বত। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, আত্মা জন্মেন না, মরেন না।
আমাদের চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং এ বৈচিত্র্যময় পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর। তিনি তাঁর সৃষ্টি ও সৌন্দর্যের মধ্যে অবস্থান করেন। নিরাকার ঈশ্বর অনল অর্থাৎ অগ্নি, বায়ু ও চির সুনীল আকাশে আছেন। এর অর্থ হচ্ছে অগ্নির যে দাহিকাশক্তি তা ঈশ্বরের শক্তি। বায়ু ঈশ্বরেরই সৃষ্টি। বায়ুর যে গতি, তার মূলে রয়েছে ঈশ্বরের শক্তি। আমাদের মাথার উপরে যে সুনীল আকাশ, ঈশ্বর সেখানেও আছেন নীলিমা সৌন্দর্যরূপে। একইভাবে ভূধরে মানে পর্বতের দৃঢ়তা, উচ্চতা ও মৌনতার মধ্যেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। আবার ঈশ্বর আছেন জলের গভীরতায়। তিনি বৃক্ষ, লতা, মেঘ, চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজির মধ্যেও বিরাজিত আছেন। এসব কিছুই তাঁর সৃষ্টি। তিনি তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে অবস্থান করছেন। তিনি তাঁর সকল সৃষ্টিকে নিজের মহিমা ও সৌন্দর্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বরের সৌন্দর্যেই সকল কিছু সুন্দর। তার শক্তিতেই সকল কিছু শক্তিমান। প্রকৃতির রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। তবে এসব বৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে গভীর ঐক্য, যেমন- ঋতুচক্রের আবর্তন, দিনরাত্রির পালাবদল, গ্রহদের আপন কক্ষপথে একই নিয়মে ঘুরে চলা। এসব ঐক্য ও শৃঙ্খলার মূলে রয়েছেন ঈশ্বর। তিনি জীবজগৎ যেমন সৃষ্টি করেছেন তেমনি সেগুলোতে ঐক্যও দান করেছেন। তিনি সকল কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন। (i) নং উদ্দীপক থেকে আমি এটাই ধারণা করি যে, সকল সৃষ্টির মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিদ্যমান।
(ii) নং উদ্দীপকের শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আলোচ্য উদ্দীপকের শ্লোকটি হলো-
অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ।
অহমাদিশ্চ মধ্যঞ্জ ভূতানামন্ত এব চ।
এর সরলার্থ হলো : হে অর্জুন! আমি সকল প্রাণীর হৃদয়স্থিত আত্মা। আমি ভূত- সকলের আদি, মধ্য ও অন্ত।
শ্লোকটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিচে তুলে ধরা হলো-
শ্লোকে আদি বলতে জীবজগতের উৎপত্তি, মধ্য বলতে তাঁদের স্থিতি এবং অন্ত বলতে তাদের মৃত্যু বোঝানো হয়েছে। ঈশ্বরই জীবের মধ্যে আত্মারূপে অবস্থান করেন। পৃথিবীর সকল সৃষ্টির মূলেও রয়েছেন তিনি। ঈশ্বর জীবের সকল সৃষ্টি ও সৌন্দর্যের মধ্যে নিরাকাররূপে অবস্থান করেন। তাই ঈশ্বরকে জীবজ্ঞানে সেবা করা উচিত। আমাদের এ বৈচিত্র্যময় পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর। তিনি সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁকে বলা হয় পরমাত্মা। তিনি এক ও অদ্বিতীয় হলেও তাঁর সৃষ্ট সব জীবের মধ্যে তিনি আত্মারূপে অবস্থান করেন। তখন তাকে বলা হয় জীবাত্মা। এজন্য জীবসেবা করলে ঈশ্বর সেবা করা হয়। ঈশ্বর সবার মাঝেই বিরাজমান। কবি রজনীকান্ত সেনের ভাষায়-
আছ অনল - অনিলে চির নভোনীলে
ভূধর সলিল গহনে
আছ বিটপী লতায় জলদের গায়
শশী তারকায় তপনে।
অর্থাৎ ঈশ্বর আছেন সবখানে। সকল জীব ঈশ্বরেরই এক প্রত্যক্ষ প্রকাশ। এ কারণেই হিন্দুধর্মে বলা হয় যত্র জীবঃ তত্র শিবঃ। তাই কোনো জীবকেই তুচ্ছ ভাবার বা অবহেলা করার কোনো কারণ নেই। হিন্দুধর্ম মানুষের মঙ্গল ও জীবজগতের কল্যাণে নিবেদিত। উক্ত শ্লোকটিতে এ বিষয়ের মাহাত্ম্যই বর্ণিত হয়েছে।
Related Question
View Allব্রহ্ম থেকে প্রকৃতি এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
সৃষ্টির আদিতে এ মহাবিশ্ব ছিল না। তখন সব ছিল অন্ধকার। তারপর এলো আলো, জল এবং জলের পরে পৃথিবী। পৃথিবীর পরে এলো গাছপালা, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু, মানুষ প্রভৃতি। ঈশ্বরই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তাই ঈশ্বরকে আদি শক্তি বলা হয়।
হিন্দুধর্মগ্রন্থ হলো বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি। মৌমিতার মা গীতা ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য তুলে ধরেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জীবাত্মা সম্পর্কে বলেছেন-
"জীবাত্মা জন্মেন না মরেন না। ইনি নিত্য বিদ্যমান? ইনি জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাণ। শরীরের বিনাশ ঘটলেও ইনি বিনষ্ট হন না।” উদ্দীপকের মৌমিতার মা প্রিয় ঠাকুরদার কষ্ট দূর করার জন্য মৌমিতাকে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আলোচ্য অংশটুকুর মাধ্যমেই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
মৌমিতা উপলব্ধি করল নিজের প্রকৃত স্বরূপকে। চৈতন্যস্বরূপ আত্মারূপে উপলব্ধি না করা পর্যন্ত প্রত্যেক জীবাত্মা জন্ম-মৃত্যু চকে আবর্তিত হতে থাকে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে-
'বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহাতি নরোৎপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা ন্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।' (২/২২)
সরলার্থ : মানুষ যেমন পুরাতন কাপড় পরিত্যাগ করে নতুন কাপড় পরিধান করে, আত্মাও তেমনি পুরাতন দেহ পরিত্যাগ করে নতুন দেহে প্রবেশ করে। আত্মার দেহ পরিবর্তনকে জন্ম ও মৃত্যু বলে। দেহকে আশ্রয় করে আত্মার অভিযাত্রা। আবার আত্মাকে লাভ করে দেহ সজীব। আত্মার জন্ম ও মৃত্যু নেই। মৌমিতা তা উপলব্ধি করতে পেরে, শ্রদ্ধায় ঈশ্বরের প্রতি মাথা নত করে।
পরমাত্মা আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন।
আত্মা নিত্যবস্তু ও নিরাকার। আত্মার সৃষ্টি বা বিনাশ নেই। একই পরমাত্মা বহু আত্মারূপে জীবদেহের মধ্যে অবস্থান করে। জীবদেহের বিনাশ আছে। কিন্তু আত্মার বিনাশ নেই। কারণ জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশবিশেষ। পরমাত্মার সব গুণই জীবাত্মায় বিদ্যমান। তাই পরমাত্মার ন্যায় জীবাত্মার সৃষ্টি বা বিনাশ নেই।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!