দ্বিজাতি তত্ত্ব হলো মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রবর্তিত একটি তত্ত্ব, যেখানে ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান জাতিকে আলাদা দুটি জাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
জাতিসংঘ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর স্বীকৃতি দেওয়ায় বর্তমানে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলা হয়।
মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ হয়েছিলেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকে। সেদিন বাঙালি জাতি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তার মূল্যায়নের জন্য জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সর্বসম্মতিক্রমে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দান করে। ২০১০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।
দৃশ্য-১ বাংলাদেশের ইতিহাসের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাকে ইঙ্গিত করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এ যুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর শাসনের নামে শোষণ-নির্যাতন চালাতে থাকে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে বাঙালিদের আন্দোলন করতে হয়, যা ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় পূর্ব বাংলার নাগরিকদের রাজনৈতিক চেতনা আরও বৃদ্ধি করে। এরপর ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা দাবি জনগণের মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করে।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বাংলার মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে আপসহীন আন্দোলন গড়ে তোলে, যার প্রতিফলন ঘটে ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে। এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি শুরু করে। এতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। এরই এক পর্যায়ে বাঙালি জাতিকে চূড়ান্তভাবে দমন করার লক্ষ্যে পাক-বাহিনী ২৫শে মার্চ রাতে এদেশের নিরীহ জনগণের ওপর জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালায় এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগে ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও নির্যাতনের প্রতিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়েই বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল।
দৃশ্য ২-এর পরিণতি হলো দৃশ্য ৩ অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের চূড়ান্ত পরিণতি হলো ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় অর্জন। 4
... ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বাঙালির জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। এদিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন- "ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”
এ ভাষণে তিনি প্রতিরোধ সংগ্রাম, যুদ্ধের কলা-কৌশল এবং শত্রু মোকাবিলার উপায় সম্পর্কেও দিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন। মূলত বঙ্গবন্ধুর এ জ্বালাময়ী ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়েই সাত কোটি নিরীহ বাঙালি রাতারাতি যোদ্ধায় পরিণত হয় এবং পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর হানাদার পাকবাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজী রেসকোর্স ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। বাংলার মানুষ অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয়।
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ জনগণকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আর এ কারণেই 'দৃশ্য-৩' এর ঘটনায় 'দৃশ্য-২' এর ঘটনার প্রভাব অর্থাৎ ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের ঘটনার ওপর ৭ই মার্চের ভাষণের প্রভাব বিদ্যমান।
Related Question
View Allআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় ২১শে ফেব্রুয়ারি।
দ্বিজাতি তত্ত্ব ব্রিটিশ ভারতকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করার একটি রাজনৈতিক মতবাদ। এর ভিত্তিতেই ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলমান অধিবাসীরা দুটি আলাদা জাতি- এটাই দ্বিজাতি তত্ত্বের মূল কথা। ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্বের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি বলেন, "ভারতের হিন্দু ও মুসলমানরা দুটি আলাদা জাতি। তাদের জীবন দর্শন, ধর্মীয় আদর্শ ও সামাজিক রীতিনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।” জিন্নাহ এ যুক্তি দিয়ে ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি করেন। তার এ যুক্তিই উপমহাদেশের ইতিহাসে 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' নামে পরিচিত।
উপরের ছবিটি আমাদের ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত।
উপরের ছবিতে একটি মিছিলের একাংশ দেখা যাচ্ছে। ছাত্রজনতা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করছে। এ ছবির সাথে ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের মিছিলের সাদৃশ্য রয়েছে। পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ জন অধিবাসীর মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠী সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা যে আন্দোলন শুরু করে, তা-ই ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত।
পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর প্রতিবাদে পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক নেতৃত্বে, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র নেতৃত্বের সমন্বয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। কয়েক বছর ধরে চলা এ আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সমাবেশ ও মিছিল করে। পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে শহিদ হন। অতঃপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়।
ছবির লোকগুলোর চেতনাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দিতে- সক্ষম হয়- এ উক্তিটির পক্ষের যুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
ভাষা আন্দোলন তখনকার পূর্ব বাংলা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে প্রথম অধিকার সচেতন করে তোলে। বাঙালি জাতি তার স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ের ব্যাপারে নতুন করে সচেতন হয়ে ওঠে। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর থেকেই বাঙালিরা বুঝতে পারে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা এতে পূরণ হচ্ছে না। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মুসলিম লীগের ভরাডুবি এবং বিরোধী জোট যুক্তফ্রন্টের বিজয় পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকে আরও শানিত করে। পাকিস্তানি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মাতৃভাষাকেন্দ্রিক ভাষা আন্দোলনের ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয়ের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটে।
ভাষা আন্দোলনের জের ধরেই ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী সবাই পাকিস্তানিদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালিদের মধ্যে যে জোরালো অধিকারবোধের সৃষ্টি হয় তা এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিবর্তনকে এগিয়ে নেয়। এর ধারাবাহিকতায়ই ধাপে ধাপে আসে পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরুদ্ধে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও '৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় পাওয়া আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পাকিস্তানি শাসকচক্র মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
সুতরাং বলা যায়, ছবির লোকগুলোর চেতনা তথা ভাষা আন্দোলনের চেতনাই কালক্রমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দিতে সক্ষম হয়।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন।
গেরিলা যুদ্ধ একটি বিশেষ রণকৌশল।
গেরিলা যুদ্ধের মূলকথা হচ্ছে বৃহৎ ও নিয়মিত শত্রুবাহিনীর ওপর, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ, যার উদ্দেশ্য হলো বৃহত্তর বাহিনীকে হয়রানি, নাজেহাল এবং সম্ভব হলে নির্মূল করা। শক্তির পার্থক্যের কারণে গেরিলা যোদ্ধারা যথাসম্ভব সম্মুখযুদ্ধ এড়িয়ে চলে। পেশাদার সেনাদের বদলে সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে আক্রমণের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা পদ্ধতিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। গেরিলাদের মধ্যে ছাত্র ও কৃষকের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!