পৌরনীতি ও নাগরিকতাকে বলা হয় নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। কারণ নাগরিকতার সাথে জড়িত সকল বিষয় পৌরনীতিতে আলোচনা করা হয়। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের ‘পৌরনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ অধ্যায়ে পৌরনীতি ও নাগরিকতার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় যেমন- পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, সরকার ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
এ অধ্যায় পড়া শেষে আমরা-
পৌরনীতি ও নাগরিকতা বিষয়ে ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব
পৌরনীতি ও নাগরিকতা বিষয়ের পরিসর ও বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করতে পারব
পৌরনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে পারব।
রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতা হলো সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্র গঠনের চারটি মৌলিক উপাদানের (জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার, সার্বভৌমত্ব) মধ্যে সার্বভৌমত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সার্বভৌমত্ব শব্দটি ল্যাটিন 'Superanus' শব্দ থেকে উদ্ভব হয়েছে। যার ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Sovereignty'। এর অর্থ চরম ক্ষমতা। সার্বভৌম ক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা বিধান করা হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলেই রাষ্ট্র দেশের ভেতরে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারির মাধ্যমে সকল সংঘ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব আরোপ এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আর বাহ্যিক ক্ষমতা বলে রাষ্ট্র সকল প্রকার বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত রাখে। সার্বভৌম শক্তির ওপর রাষ্ট্রের স্থিতি নির্ভরশীল।
'ক' রাষ্ট্র কর্তৃক 'গ' রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়া রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি, প্রয়োগ মতবাদকে সমর্থন করে। বল প্রয়োগ মতবাদের মূল বক্তব্য হলো- বল বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে এবং শক্তির জোরে রাষ্ট্র টিকে আছে। এ মতবাদে বলা হয়, সমাজের বলশালী ব্যক্তিরা যুদ্ধ-বিগ্রহ বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বলের ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র সৃষ্টি এবং শাসনকাজ পরিচালনা করে। স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম (David Hume), ইংরেজ আইনজীবী এডওয়ার্ড জেংকস (Edward Jenks) প্রমুখ বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের সমর্থক। এ সম্পর্কে এডওয়ার্ড জেংকস বলেন- 'ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, আধুনিক সকল রাষ্ট্রব্যবস্থা সার্থক রণকৌশলের ফলশ্রুতি'। উদ্দীপকে দেখা যায়, 'ক' তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল রাষ্ট্র 'গ'-কে যুদ্ধে পরাজিত করে দখল করে নেয়, যা রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কাজেই বলা যায়, 'ক' রাষ্ট্র কর্তৃক 'গ' রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়া রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদকে সমর্থন করে।
'খ' শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদের প্রতিফলন ঘটেছে, যা রাষ্ট্র সৃষ্টির মতবাদগুলোর মধ্যে অধিক যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য। ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদের মূল বক্তব্য হলো রাষ্ট্র কোনো একটি বিশেষ কারণে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। যেসব উপাদানের কার্যকারিতার ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে সেগুলো হলো- সংস্কৃতির বন্ধন, রক্তের বন্ধন, ধর্মের বন্ধন, যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা এবং কার্যকলাপ ইত্যাদি। রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মতবাদটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ড. গার্নার (Dr. James Wilford Garner) বলেন, 'রাষ্ট্র বিধাতার সৃষ্টি নয়, বল প্রয়োগের মাধ্যমেও সৃষ্টি হয়নি; বরং ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে'। উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, 'খ' তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং এক সময় সবগুলো রাষ্ট্র মিলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করে। এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে 'খ' রাষ্ট্রের শক্তিশালী হওয়ার দিকটি ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদকে ইঙ্গিত করে। উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য। আর এ মতবাদের মধ্যেই রাষ্ট্রের উৎপত্তির সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
আত্মসংযমের শিক্ষা পরিবারের শিক্ষামূলক কাজ। পরিবারকে সমাজজীবনের শাশ্বত বিদ্যালয় বলা হয়। পরিবারেই একটি শিশু বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়। মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের পারস্পরিক সহায়তায় সততা, শিষ্টাচার, উদারতা, আত্মসংযম, নিয়মানুবর্তিতা, বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদেরকে ভালোবাসা ইত্যাদি মানবিক গুণ শিক্ষা লাভের প্রথম সুযোগ ঘটে পরিবারে। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক নিজেকে সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে রেখে সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন, সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, রাষ্ট্রের আইন মান্য করা প্রভৃতি করতে পারে।