আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী অগবার্নের মতানুযায়ী সংস্কৃতির ধরনসমূহ হচ্ছে, বস্তুগত সংস্কৃতি ও অবস্তুগত সংস্কৃতি।
সংস্কৃতি একটি জীবনপ্রণালি কেননা এটি সমাজ জীবনের আচার-অনুষ্ঠান, শিল্পকলা, কাব্য, নিয়মনীতি, ধ্যানধারণা ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত।
আমরা জানি, সংস্কৃতি মানুষের সামাজিক জীবন সংশ্লিষ্ট কার্যপ্রণালিকে পরিচালিত করে। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস, কলা, নৈতিকতা, আইন, প্রথা এবং অন্যান্য অভ্যাস ও দক্ষতা সবই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। আর এ জন্যই বলা হয় যে, সংস্কৃতি একটি জীবনপ্রণালি ।
ছকে '?' চিহ্নিত স্থানের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান শাস্ত্রটি যথাযথ। কারণ, উদ্দীপকের ছকে উল্লেখিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অজিত কুমার সেন, অধ্যাপক এ কে নাজমুল করিম, ফরাসি সামাজিক নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্লদ লেভি স্ট্রস এবং ড. পেরি বেসাইনি বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান শাস্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষাদানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের নীতিশাস্ত্র এবং মনোবিজ্ঞানের সাথে সমাজবিজ্ঞানের কিছু বিষয়বস্তু পড়ানো শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৯-৪০ শিক্ষাবর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স কোর্সের ৫ম পত্র হিসেবে 'Element of Sociology' শিরোনামে সমাজবিজ্ঞানের পাঠ দান শুরু করা হয়। এ সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সমাজবিজ্ঞান কোর্সটির দায়িত্ব অর্পিত হয় বিভাগের রিডার অধ্যাপক অজিত কুমার সেনের হাতে। ১৯৫২ সালে অধ্যাপক অজিত কুমার সেন কলকাতা চলে যাওয়ায় সমাজবিজ্ঞান কোর্সটি পড়ানোর দায়িত্ব অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিমের ওপর ন্যস্ত হয়।
১৯৫৪ সালে ফরাসি সামাজিক নৃবিজ্ঞানী ও ইউনেস্কো বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্লদ লেভি স্ট্রস বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান পঠন-পাঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসলে অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিম এবং অধ্যাপক অজিত কুমার সেন তার সাথে দেখা করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠায় ইউনেস্কোর সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেন। এরই ফলশ্রুতিতে ক্লদ লেভি স্ট্রসের সক্রিয় আগ্রহ ও ইউনেস্কোর সহযোগিতায় ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'সমাজবিজ্ঞান' নামে স্বতন্ত্র বিভাগ চালু হয়।
স্বতন্ত্র বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৭ সালে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে ফরাসি সামাজিক নৃবিজ্ঞানী ও ইউনেস্কো বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. পেরি বেসাইনিকে নিযুক্ত করা হয়। তিনি ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি সমাজবিজ্ঞানের কার্যকর একটি সিলেবাস প্রণয়ন করেন। উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট যে, ছকে উল্লেখিত শিক্ষাবিদরা বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ছকে '?' চিহ্নিত স্থানে সমাজবিজ্ঞান শাস্ত্রটি যথাযথ।
প্রশ্নে উক্ত বিজ্ঞান বলতে সমাজবিজ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে ছকে বর্ণিত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে নাজমুল করিমের অবদান সর্বাধিক।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞানকে একটি আলাদা বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিমের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৫৪ সালে ফরাসি ইউনেস্কো বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্লদ লেভি স্ট্রস বাংলাদেশ সফরে আসার পর অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিম এবং অধ্যাপক অজিত কুমার সেন তার সাথে দেখা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইউনেস্কোর সহযোগিতা কামনা করেন। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম 'সমাজবিজ্ঞান' নামে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিম সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সমাজবিজ্ঞান বিভাগে যোগদানকারী বাঙালি শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিম সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন। অধ্যাপক নাজমুল করিম হলেন প্রথম বাঙালি যিনি সমাজবিজ্ঞানের ওপর সর্বপ্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন। তার লিখিত "Changing Society in India, Pakistan, Bangladesh' গ্রন্থটি সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পুস্তক হিসেবে এখনও সবার কাছে সমাদৃত। তার লিখিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'The Dynamics of Bangladesh Society', 'Social Life of the Tiparas', 'সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষণ" ইত্যাদি। বস্তুত অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিম ও তার ছাত্র- ছাত্রীদের ঐকান্তিক সাধনার ফলেই এদেশে সমাজবিজ্ঞানের পঠন -পাঠন ও আলোচনা বিস্তৃতি লাভ করেছে। সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে বিভাগীয় যাদুঘর প্রতিষ্ঠা, মনোগ্রাফ লেখার ব্যবস্থা, গ্রামীণ প্রশ্নমালা পূরণের কার্যক্রম সবই তার অবদান।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, ছকে উল্লেখিত চারজন শিক্ষাবিদই বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান পাঠের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে অবদান রাখলেও অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিম সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছেন।
Related Question
View Allচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাজবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে সমাজের মানুষের অবদান ও অধিকার সম্পর্কে জানা যায়। শুধু সামাজিক অধিকারই নয়, সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কেও সমাজবিজ্ঞান আমাদের জ্ঞান দান করে। আর সে কারণেই বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন জনসংখ্যা সমস্যা, নিরক্ষরতা, অপরাধ ইত্যাদি মোকাবিলায় সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য। বস্তুত সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করা ও সমাধানের দিক নির্দেশনা দেওয়া আমাদের সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এসব কর্তব্য পালনের জন্য অর্থাৎ সমাজ সংস্কারের জন্য সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন।
উদ্দীপকে বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারার পরিচয় ফুটে উঠেছে। কেননা ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান পাঠ শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞান নামে একটি নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উক্ত বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞান চর্চা শুরু হয়। এছাড়া বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের জনক এ কে নাজমুল করিম ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন যা উদ্দীপকে বর্ণিত 'ক' দেশের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
উত্ত দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা একটিমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে- বক্তব্যটি আমি সমর্থন করি না। এর সপক্ষের যুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন শুরু হলেও পরবর্তীতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এটি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৪ সালের ২৪ আগস্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন শুরু হয়। ১৯৭০ সালে এখানে সম্মান কোর্স চালু হয়। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭০ সালে সমাজতত্ত্ব নামক আলাদা একটি বিভাগের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে সিলেটে অবস্থিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়। এর পরবর্তী দশকে ২০০২ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া ২০১২ সাল থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কিছু কলেজে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর স্তরে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হচ্ছে।
সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এ বিষয়ে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও অবদান রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞান মানবতাবাদী বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃত।
পঠন পরিসর ও উদ্দেশ্যের কারণে সমাজবিজ্ঞানকে মানবতাবাদী প্রায়োগিক বিজ্ঞান বলা হয়।
সামাজিক প্রয়োজন ও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার আলোকেই সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা প্রবাহিত হয়। উদাহরণস্বরূপ পরিবারের কথা বলা যায়, পরিবার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- একক পরিবার, যৌথ পরিবার, পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, মাতৃতান্ত্রিক পরিবার ইত্যাদি। সমাজবিজ্ঞান সবধরনের পরিবারকেই স্বীকৃতি দেয়। আর এ কারণেই সমাজবিজ্ঞান মানবতাবাদী প্রায়োগিক বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!