যে কোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা কর:

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আমাদের করণীয় (প্রবন্ধ রচনা কর)

Created: 1 year ago | Updated: 8 months ago
Updated: 8 months ago
Ans :

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আমাদের করণীয়

সুচনাঃ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধ হলো ১৯৭১ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত বাংলার মানুষের একটি বিপ্লব ও সশস্ত্র সংগ্রাম। বাঙালির আবহমান কালের ইতিহাসের এক মাইলফলক ১৯৭১। এক মহিমান্বিত ইতিহাস রচিত হয়েছে ১৯৭১ সালে। স্বাধীনত প্রতিটি মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। পাকিস্তানিদের অধীনে দাস হয়ে থাকতে চায়নি বাঙালির। তক্ত, অশ্রু আর অপরিসীম আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে একাত্তরে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। আর বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অভ্যুদয় হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধ তাই আমাদের জাতীয় জীবনে এক অহংকার, গৌরবের এক বীরত্বগাঁথা।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট:

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেয় জরত ও পাকিস্তান নামের দুইটি পৃথক রাষ্ট্র। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ছিল দুটি অংশ পশ্চিম পাকিস্ক্রন আর পূর্ব পাকিস্তান। স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক-বেসামরিক ও রাজনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে বৈষন্যে জর্জরিত করতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানকে। শিল্প কারখানার কাঁচামালের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান নির্ভর করতো পূর্ব পাকিস্তানের ওপর। পুজিবাদী অাবধারায় শ্রমিকদের অল্প বেতন দিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অপরদিকে উৎপাদনের কাজ করাহত। অপরদিকে রাজস্ব থেকে আয়, রপ্তানি আয় প্রভৃতির সিংহভাগ বায় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় যেখানে ৯৫% ব্যয় হতে, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় ব্যয় হতো মাত্র ৫ শতাংশ।

পরবর্তীতে ১৯৭০ এর নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কোনোভাবে বাঙালির হাতে শাসনভার ভুলে দিতে চায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অভাব, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবহেলা, মৌলিক নাগরিক অধিকারে হস্তক্ষেপসহ সকল প্রকার বৈষম্য স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের দাবিকে জোরালো করে তোলে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ

বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয়তাকদের সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই। তৎকালীন পাকিস্তনের ৫৬ শতাংশেরই বাস ছিল পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু, শাসন ক্ষমতার চাবিকাঠি কুক্ষিগত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ক্রমেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর- শাসন শোষণের স্বরুপ পূর্ববাংলার জনগণের সামনে স্পষ্ট হতে থাকে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই শতকর ৫৬ জনের মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানি শাসকরা শতকর ৭ ভাগ লোকের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা পূর্ব বাংলার মানুষের মাঝে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ১৫৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ববাংলার প্রতিবাদী জনত দেশের যুক্তিমন্ত্রে দীক্ষা নেন। জামা ও সংস্কৃতির ওপর এই আঘাতের পরই বাঙালি বুঝতে পারে তাদের স্বাতন্ত্রাকে। তারা বাঙালি জাতি এই পরিচয় তাদের মধ্যে দৃঢ় হতে শুরু করে।

দেশ মাতৃকার কল্যাণে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে এসময় গঠিত হয় বেশ কিছু সংগঠন। ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬৬ এর শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ১৯৬৬ এর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯ এর গণঅভুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে ১৬৭ টি আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়, এই প্রভোকটি ঘটনার মাধ্যমে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটে এবং ১৯৭১ সাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সেই জান্তীয়তাবাদ চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করে।

স্বাধীনতার ডাক

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। বরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরকার তখন ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর ফলে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতায় উন্মুখ দশ লক্ষাধিক মানুষের সামনে বজ্রকণ্ঠে যোষণা করেন। "আজ বাংলার মানুষ মুক্তি। চায়, বংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। গণসূর্যের মধ্য কাঁপিয়ে কবি শুনিয়েছিলেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:

"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, 

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" 

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

এরপর থেকেই গড়ে ওঠে তীব্র অসহযোগ আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সৃষ্টি হয়েছিল অননা এক ইতিহাস। তাঁর সেই ১৯ মিনিটের বক্তবোই স্বাধীনতার বীজ লুকায়িত ছিল।

২৫ এ মার্চের কালরাত্রি এবং স্বাধীনতার ঘোষণা

নির্বাচনে এমন বিপুল জয়ের পরেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। এরই মধ্যে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে আসতে থাকে অস্ত্র আর সামরিক বাহিনী। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নয়, মাটি চাই বলে হানাদার বাহিনীকে নির্দেশ প্রদান করে ঢাকা আগ করে পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য গণহত্যার হোতা ইয়াহিয়া খান।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারেই শুরু হয় ইতিহাসের ঘূপিত হত্যাযজ্ঞ, যা অপারেশন সার্চ লাইট নামে পরিচিত। এ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায় নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। ভার নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

মধ্যরাতের পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেফতারের পূর্বেই অর্থাৎ ২৯৬ এ মার্চের প্রথম প্রহরে গোপন তারবার্তায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার স্বাক্ষরিত ঘোষণাবার্তাটি তৎকালীন ইপিআর এর ট্রান্সমিটারের সাহায্যে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়। এরপর চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ ও ২৭ এ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৬শে মার্চ দুপুরে এম এ হান্নান ও চট্টগ্রামের কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম।

মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধ

১২ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে সিলেটের তেলিয়াপাড়র চা বাগানে কর্নেল এম এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য পুরো দেশকে ১৯ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এর সর্বাধিনায়ক। জুন মাসের শেষের দিকে গেরিলারা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আগস্টে গঠিত নৌ কমান্ডে বীরত্ব ও কৃতিত্বের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। ৩ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাঙালিদের সাথে ভারতীয় সেনারাও যোগ দেয়। মিলিতভাবে গঠিত হয় মিত্রবাহিনি।

মুজিবনগর সরকার গঠন

১০ এপ্রিল ১৯৭১ কুষ্টিয়ার বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতল ইউনিয়নের ভবের পাড়া গ্রামের আম্রকাননে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। এই জায়গার নতুন নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। তাই এই সরকারকে বলা হয় মুজিবনগর সরকার। সে সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে, রাষ্ট্রপতি শাসিত এই সরকার ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এই দিনই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। পরবর্তীতে এই ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক পদক্ষেপ ছিল মুজিবনগর সরকার গঠন। এই সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাপী জনসমর্থন আদায়ে এই সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও জনযুদ্ধ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালানোর পর বাঞ্জলি ছাত্র, জনতা, পুলিশ, ইপিআরসহ সর্বস্তরের মানুষ সাহসিকতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গনে শহিদ হন, আবার অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। মাতৃভূমির প্রতি তাই মুক্তিযোদ্ধাদের এ ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। এদেশের মানুষ চিরকাল জাতির এই সূর্য সন্তানদের মনে রাখবে। মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মাত্র, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ভূমিকা নেয়।

মুক্তিসংগ্রাম ও কৃষক

আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষ, এদেশের কৃষক শ্রমিকগণ যে ভূমিকা রেখেছিলেন স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছিল, তারা অস্ত্রহাতে যেমন ছিলেন যুদ্ধের মাঠে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরেও প্রতিরাধে ও সশস্ত্র অবরোধে অংশ নিয়েছিলেন ব্যাপকভাবে। মুক্তিসংগ্রাম ধারণার মধ্যে দুটি উপাদান আছে। একটি হলো জাতীয় মুক্তি এবং অন্যটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, শ্রেণিগত শোষণমুক্তি। আর এই মুক্তির মন্ত্রক দিল আমাদের কৃষকসমাজ। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন গ্রামের সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ। প্রাদের বীরত্বগাথা ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়। সুদীর্য বন্ধনার পথ পেরিয়ে এসে তারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছেন। তাই যে হাতে তারা লাজল ঠেলেছেন, ধান কেটেছেন, নৌকার দাড় টেনেছেন, জীবিকার জন্য প্রাণান্ত শ্রম দিয়েছেন সে হত তাদের উদ্যত হয়েছি শত্রুর মোকাবিলায়।

মুক্তিযুদ্ধ ও ছাত্র সমাজ

মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অহঙ্কার করার মতো। একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্রদের সংখ্যা ছিল বেশি। গোটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। দেশের সব আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এদেশের দ্বাত্র সমাজ। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের অবদানের কথা বলতে গেলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা, সোপট্রিক স্বাধীনতা ভাস্কর্য। বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ ও ৬৪ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে করনগার্ড হিসেবে তৎকালীন মাত্রসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক দল

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগই সর্বপ্রথম পূর্ববাংলার জনগণকে স্বাধিকার আন্দোলনে সংগঠিত করে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়েই এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। বস্তুত, তিনি দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ ছাড়াও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ন্যাপ (জসানী), ন্যাপ (মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় কংগ্রেস ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকবাহিনীর সমর্থনে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপিসহ কতিপয় বিপথগামী রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে।

মুক্তিযুদ্ধ ও গণমাধ্যম

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে এবং জনমত গঠনে দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, মুজিবনগর সরকার ও প্রবাসী বাঙালিদের প্রকাশিত পত্রপত্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহতয়, ধর্ষণ, ধ্বংসলীলা, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, শরণার্থী শিবিরের বর্ণনা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। যুদ্ধের সময়ে দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ, মনোবল বৃদ্ধিসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পী- সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ও অবদান ছিল খুবই প্রশংসনীয়। পত্রপত্রিকায় লেখা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ, দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, আবৃত্তি, নাটক, কাথিকা, জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'চরমপত্র ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ত করেছে।

মুক্তিযুদ্ধে নারী

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর আশগ্রহণ ও সহযোগিতা ছিল অনন্য অনবদ্য। নারী সক্রিয় ছিল কখনও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে, কখনো বা যুদ্ধক্ষেত্রের আড়ালে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন এমন নারীর সংখ্যা অসংখ্য। অজানা-অচেনা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেক শুশ্রুষা করেছেন বহু নারী। চরম দুঃসময়ে পাকিস্তানি হানাদারের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। অনেক সময়ে শত্রুর কাছে নিজেদের সম্ভ্রম এবং প্রাণও দিতে হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিদের অবদান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিরা সর্বতোভাবে পাশে ছিলেন। বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিভিন্ন দেশে তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের কাছে ছুটে গিয়েছেন। তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন। পাকিস্তানকে অস্ত্র, গোলাবারুদ সরবরাহ না করতে বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের নিকট আবেদন করেছেন। এক্ষেত্রে ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব

১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের কাহিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়। প্ররত সে সময় এক কোটিরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়ে বিশ্বজনমত তৈরিতে এগিয়ে এসেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দেয়। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের বিরোধিতা করলেও সে দেশের জনগণ বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়। তাদের প্রতিরোধের মুখে মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিটলস এর জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় পণ্ডিত রবি শংকর 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এর আয়োজন করেছিলেন। ফরাসি সাহিত্যিক আন্দ্রে মারোখা, জ্যা পল সাত্রে সহ অনেকেই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে যৌথ বাহিনী

১৯৭১ সালে যুদ্ধের প্রায় শেষদিকে ২১ নভেম্বর এরতীয় পূর্বাঞ্চল কমান্ডার লে. জে জগজিৎ সিং অরোরার অধিনায়কত্বে ঘোষিত হয় বাংলাদেশ ভারত যৌথ কমান্ড। ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী মিত্রবাহিনী নাম নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুক্ত হওয়া ভারতীয় বিমান হামলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি ও যৌথবাহিনীর দুর্বার প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখে পশ্চিমা হানাদার বাহিনী যখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তখন পরাজয় নিশ্চিত জেনে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে এ দেশের সূর্য সন্তানদের ওপর। আর এ কাজে তাদেরকে সাহায্য করে তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর আল শামস কাহিনী। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী দেশের মুক্তিকামী ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনকারী শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে প্রহর করা হয়। তাদের বেশিরভাগের ক্ষত বিক্ষত মৃতদেহ রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়।

আত্মসমর্পণ এবং বাঙালির বিজয়

সংগ্রামী বাঙালি আর মিত্র বাহিনীর সাথে যুদ্ধে হানাদার বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদয়নে অথাৎ, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ৯৩০০০ সৈন্য নিয়ে জেনারেল নিয়াজি সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান জগজিৎ সিং আরোরার নিকট আত্মসমর্পণ  করেন। এসময় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন গ্রুপ কাপ্টেন একে খন্দকার। এর মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের।

"রক্তের অফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, 

শকুনে খেয়েছে যারে সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা। 

স্বাধীনতা, সে আমার স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন- 

স্বাধীনতা, সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।"

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ক্ষুপ্তদারিদ্র-অশিক্ষা-কুসংস্কার থেকে মুক্ত অসাম্প্রদায়িক একটি দেশের বঙ্গবন্ধু যার নাম দিয়েছিলেন 'সোনার বাংলা'। এই সোনার বাংলা গঠনের চেতনাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। নতুন প্রজন্মের কাছে এই চেতনাকে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কেনন উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এই চেতনার কোনো বিকল্প নেই।

উপসংহার

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির অহংকার। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ জাতিকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র এনে দেয়। এই স্বাধীনত ত্রিশ লক্ষ ভাইয়ের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত, লক্ষ মা-কেনের সমভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া। তাই এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের নিবেদিতপ্রাণ হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানো যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকদের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কর্তব্যবোধে, ন্যায়নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাংলাদেশের যথার্থ অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব।

1 year ago

প্রবন্ধ রচনা

লেখক তার নিজের কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে কোনো মননশীল ভাব কিংবা তথ্য বা তত্ত্ব উপযুক্ত ভাষার মাধ্যমে যুক্তি পরম্পরায় উপস্থাপনের মাধ্যমে যে নাতিদীর্ঘ সাহিত্য রচনা করেন তাকে প্রবন্ধ রচনা বলে। এর সাধারণত তিনটি অংশ থাকে। যথা:

০১। ভূমিকা: ভূমিকা হচ্ছে প্রবন্ধের প্রারম্ভিক অংশ যেখানে লেখার মূল বিষয়গত ভাবের প্রতিফলন ঘটে। ভূমিকা যত আকর্ষণীয় হবে রচনাটিও পাঠকের কাছে ততো হৃদয়গ্রাহী হবে। ভূমিকাতে অপ্রাসঙ্গিক ও অনাবশ্যক বিষয়ের অবতারণা করা উচিত নয়।

০২। মূল অংশ: এ অংশে প্রবন্ধের মূল বক্তব্য উপস্থাপিত হবে। পরিবেশনের আগে বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় সংকেত (Points) এ ভাগ করে নিতে হবে। সংকেতের বিস্তার কতখানি হবে তা ভাব প্রকাশের পূর্ণতার ওপর নির্ভরশীল। এর আয়তনগত কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপ নেই।

০৩। উপসংহার: এটি প্রবন্ধের সিদ্ধান্তমূলক বা সমাপ্তিসূচক অংশ। এখানে লেখক তার আলোচনার সিদ্ধান্তে উপনীত হন এবং তার নিজস্ব অভিমত বা আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন।

Content added By

Related Question

View More
No answer found.
Answer the Question and earn rewards! 🏆✨ <br> Provide correct answer to Question, help learners, and get rewarded for your contributions! 💡💰'
Ans
No answer found.
Answer the Question and earn rewards! 🏆✨ <br> Provide correct answer to Question, help learners, and get rewarded for your contributions! 💡💰'
Ans
No answer found.
Answer the Question and earn rewards! 🏆✨ <br> Provide correct answer to Question, help learners, and get rewarded for your contributions! 💡💰'
Ans
No answer found.
Answer the Question and earn rewards! 🏆✨ <br> Provide correct answer to Question, help learners, and get rewarded for your contributions! 💡💰'
Ans
No answer found.
Answer the Question and earn rewards! 🏆✨ <br> Provide correct answer to Question, help learners, and get rewarded for your contributions! 💡💰'
Ans
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...