চতুরার্য সত্য (ষষ্ঠ)

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা | NCTB BOOK
342

একদিন আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে সিদ্ধার্থ জগতের দুঃখমুক্তির উপায় অন্বেষণে গৃহত্যাগ করেন। তারপর ছয় বছর তপস্যার ফলে লাভ করেন বুদ্ধত্ব। আবিষ্কার করেন দুঃখ আর্যসত্য, দুঃখের কারণ আর্যসত্য, দুঃখ নিরোধ আর্যসত্য এবং দুঃখ নিরোধের উপায় আর্যসত্য। একে বৌদ্ধ পরিভাষায় চতুরার্য সত্য বলা হয়। চতুরার্য সত্য বৌদ্ধধর্মের মূলতত্ত্ব। বুদ্ধ পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের নিকট প্রথম চতুরার্য সত্য দেশনা করেন। চতুরার্য সত্য সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় মানুষ বারবার জন্মগ্রহণ করে দুঃখভোগ করে। এ সত্যকে ভালোভাবে বুঝতে পারলে পরম শান্তি নির্বাণ লাভ সম্ভব। এ অধ্যায়ে আমরা বৌদ্ধধর্মের মূলভিত্তি চতুরার্য সত্য সম্পর্কে পড়ব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • চতুরার্য সত্যের ধারণা দিতে পারব;
  • দুঃখসমূহ চিহ্নিত করতে পারব;
  • দুঃখের কারণ ও প্রকারভেদ বর্ণনা করতে পারব;
  • চতুরার্য সত্যের ধর্মীয় গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

সুজাতা মনে করে, মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ বুঝতে পারে না সুখের আড়ালেই দুঃখ থাকে। সুজাতা যে ব্যক্তির আদর্শ অনুসরণ করেন তিনি দুঃখকে আটটি ভাগে ভাগ করেছেন।

চতুরার্য সত্য পরিচিতি (পাঠ : ১)

253

চতুরার্য সত্য বুদ্ধের অনন্য উপলব্ধি। মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে মৃত্যুর পথে ধাবিত হয়। জন্ম এবং মৃত্যুর মাঝামাঝি সময়ে নানা অভিজ্ঞতা ও কাজের মধ্যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। তরুণ বয়সে সিদ্ধার্থ নগর দর্শনে বের হলে ব্যাধি এবং জরাগ্রস্ত মানুষকে দুঃখ ভোগ করতে দেখেন। একদল লোককে শোক করতে করতে মৃতদেহ নিয়ে যেতে দেখেন। জীবনের এরূপ পরিণতি দেখে তিনি উপলব্ধি করলেন জগৎ দুঃখময়। তারপর, সিদ্ধার্থ সংসারত্যাগী একজন সন্ন্যাসীকে দেখেন। সাথে থাকা সারথী ছন্দককে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'ঐ শান্ত-সৌম্য ব্যক্তিটি কে'? ছন্দক বললেন, ইনি শান্তি অন্বেষণে সংসার ত্যাগ করেছেন। সিদ্ধার্থও দুঃখমুক্তির উপায় অনুসন্ধানের জন্য গৃহত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে মানুষের দুঃখমুক্তির উপায় অন্বেষণে তিনি ছয় বছর কঠোর তপস্যা করে দুঃখমুক্তির উপায় চতুরার্য সত্য আবিষ্কার করেন। চতুরার্য সত্য হচ্ছে:

১. দুঃখ আর্যসত্য
২. দুঃখের কারণ আর্যসত্য
৩. দুঃখ নিরোধ আর্যসত্য
৪. দুঃখ নিরোধের উপায় আর্যসত্য।

অনুশীলনমূলক কাজ
চতুরার্য সত্য কী কী?

Content added By

চতুরার্য সত্যের ব্যাখ্যা (পাঠ : ২)

151

দুঃখ আর্যসত্য
জগৎ দুঃখময়। সুখ এখানে ক্ষণস্থায়ী। যা কিছু আমরা সুখ বলে জানি, তা সবই ক্ষণস্থায়ী। সুখের আকাঙ্ক্ষা আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এই ছুটে চলার মাঝে দুঃখই পাই বেশি। সুখ যেন পরশ পাথর, বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে যায়। মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ বুঝতে পারে না সুখের আড়ালেই দুঃখ রয়েছে। জ্ঞানের অভাবে আমরা দুঃখকে চিনতে পারি না। অজ্ঞতাই দুঃখকে চিনতে না পারার কারণ। সংসার চক্রে পরিভ্রমণ করে মানুষ দুঃখ ভোগ করে। দুঃখ অনেক প্রকার। বুদ্ধ সেগুলোকে প্রধানত আট ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা:
১. জন্ম দুঃখ
২. জরা দুঃখ
৩. ব্যাধি দুঃখ
৪. মৃত্যু দুঃখ
৫. অপ্রিয় সংযোগ দুঃখ
৬. প্রিয় বিচ্ছেদ দুঃখ
৭. ইন্সিত বস্তুর অপ্রাপ্তি দুঃখ এবং
৮. পঞ্চস্কন্ধময় এ দেহ ও মন দুঃখময়।
এ দুঃখগুলো চরম সত্য। দুঃখ সর্বজনীন। সকলকে কোনো না কোনোভাবে দুঃখ ভোগ করতে হয়। দুঃখ হতে কারো নিস্তার নেই। তাই বুদ্ধ এগুলোকে দুঃখ আর্যসত্য বলে অভিহিত করেছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবন নানা দুঃখে পূর্ণ। জীবিত মানুষ মাত্রেই নানারকম রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। বয়স বাড়ে, দাঁত পড়ে, দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে চলতে-ফিরতে কষ্ট হয়। একে বলে জরাগ্রস্ত হওয়া। বার্ধক্য আঘাত হানে। চুল পাকে। এমনি করে একদিন মৃত্যু আসে। একজনের মৃত্যু হলে প্রিয়জন শোক করে। এভাবে দুঃখের সমুদ্রে মানুষের জীবন ভাসমান।

অনুশীলনমূলক কাজ
দুঃখ আর্যসত্যে বর্ণিত দুঃখসমূহ উল্লেখ করো (দলীয় কাজ)।

দুঃখের কারণ আর্যসত্য
কারণ ছাড়া কোনো কার্যের উৎপত্তি হয় না। সবকিছুরই কারণ আছে। দুঃখ উৎপত্তিরও কারণ আছে। দুঃখ আছে জেনেও মানুষ মায়ার জালে আবদ্ধ হয়ে আরও দুঃখ ভোগ করে। জন্ম নিলেই দুঃখ ভোগ করতে হয়। তাহলে কী কারণে মানুষ জন্মগ্রহণ করে? জন্মের কারণ তৃষ্ণা। আর তৃষ্ণার কারণ অজ্ঞতা বা জ্ঞানের অভাব। অজ্ঞতার কারণে আমরা অসত্যকে সত্য, সত্যকে অসত্য মনে করি। ফলে পৃথিবীর রূপ, রস, স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ ইত্যাদিতে আকৃষ্ট হই এবং তা পাওয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষা উৎপন্ন হয়। পতঙ্গ যেমন আগুনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আগুনের কাছে যায় এবং আহত বা হতও হয়, তেমনি মানুষও মোহাচ্ছন্ন হয়ে বারবার দুঃখ ভোগ করে। জগতের ক্ষণস্থায়ী বস্তু পাওয়ার জন্য তীব্র বাসনা জাগ্রত হয়। এই আকাঙ্ক্ষার ফলেই আমরা বারবার জন্মগ্রহণ করি। কামনা, বাসনা, লোভ, অহংকার, মোহ, শোক-এ সবই তৃষ্ণা থেকে উৎপত্তি হয়। তৃষ্ণাই দুঃখের কারণ।

অনুশীলনমূলক কাজ দুঃখের কারণ কী?

দুঃখ নিরোধ আর্যসত্য
আমরা জেনেছি তৃষ্ণাই দুঃখের কারণ। তৃষ্ণার ফলেই আমরা বারবার জন্মগ্রহণ করি। জন্মগ্রহণ করে অসংখ্য দুঃখ ভোগ করি। সুতরাং তৃষ্ণাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দুঃখ নিরোধ সম্ভব। তৃষ্ণার ক্ষয় পুনর্জন্ম রোধ করে। তৃষ্ণার বিনাশ করাই দুঃখ নিরোধ আর্যসত্য।
দুঃখ নিরোধের উপায় আর্যসত্য
রোগ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ঔষধ খেতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চলতে হয়। সব সমস্যার সমাধান আছে। তথাগত বুদ্ধ কঠোর তপস্যা করে দুঃখ নিরোধের উপায়ও আবিষ্কার করেছেন, যা দুঃখ নিরোধের উপায় আর্যসত্য নামে পরিচিত। বুদ্ধ নির্দেশিত আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই দুঃখ নিরোধের উপায়। মার্গ অর্থ পথ। আটটি সত্য পথ অনুসরণ করে আমরা দুঃখ নিরোধ করতে পারি। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নিম্নরূপ:
১. সম্যক দৃষ্টি
২. সম্যক সংকল্প
৩. সম্যক বাক্য
৪. সম্যক কর্ম
৫. সম্যক জীবিকা
৬. সম্যক ব্যায়াম বা প্রচেষ্টা
৭. সম্যক স্মৃতি
৮. সম্যক সমাধি।

অনুশীলনমূলক কাজ
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ কী কী?

Content added || updated By

চতুরার্য সত্যের ধর্মীয় গুরুত্ব (পাঠ : ৩)

196

চতুরার্য সত্য বৌদ্ধধর্মের মূলভিত্তি। এই সত্যসমূহ বুঝতে না পারলে বৌদ্ধধর্মকে কখনো বোঝা যাবে না। বৌদ্ধধর্মের মূল লক্ষ্য দুঃখ হতে মুক্তি এবং পরম শান্তি নির্বাণ লাভ করা। দুঃখসমূহ কী কী, কী কারণে দুঃখ উৎপন্ন হয়, দুঃখের নিরোধ আছে কি না এবং দুঃখ নিরোধের উপায় প্রভৃতি সঠিকভাবে না জানলে দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়। তাই চতুরার্য সত্য সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকা দরকার। চতুরার্য সত্যের মাধ্যমে দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিরোধ এবং দুঃখ নিরোধের উপায় প্রভৃতি সম্পর্কে জানা যায়। চতুরার্য সত্য মতে, তৃষ্ণাই মানুষের দুঃখের কারণ। অজ্ঞতার কারণে তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। তৃষ্ণা হচ্ছে কোনো কিছু পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। চতুরার্য সত্য আমাদের লোভ, হিংসা, মোহ ও অকুশল কর্ম থেকে বিরত থাকার এবং দুঃখ হতে মুক্তির উপায় শিক্ষা দেয়। ফলে চতুরার্য সত্যের ধর্মীয় গুরুত্ব যে অপরিসীম, তা সহজে বোঝা যায়।

অনুশীলনমূলক কাজ
কেন চতুরার্য সত্য সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকা দরকার?

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...