বৌদ্ধধর্মে নিয়ম ও শৃঙ্খলার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শীল নিয়ম-শৃঙ্খলার ভিত্তি। তাইবৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের শীল পালন করা একান্ত কর্তব্য। বৌদ্ধশাস্ত্রে গৃহী ও ভিক্ষুদের বিভিন্ন রকম শীল পালনের নির্দেশ আছে। সুন্দর ও পবিত্র জীবন গঠনের জন্য শীল পালন করতে হয়। এ অধ্যায়ে আমরা নিত্যপালনীয় শীল, শীল গ্রহণের নিয়মাবলি এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- শীল সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব;
- শীল পালনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব;
- বাংলা অর্থসহ পালি ভাষায় পঞ্চশীল বলতে পারব;
- পঞ্চশীল পালনের মাধ্যমে অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার উপায়সমূহ চিহ্নিত করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
নিরঞ্জন চাকমা সর্বদা নিত্যপালনীয় শীল পালন করে। এগুলোর মধ্যে প্রথম শীলটি থেকে সে জানতে পারে জীব হত্যা মহাপাপ। তাই সে কোনো জীবকে হত্যা বা আঘাত করে না।
'শীল' শব্দের অর্থ হচ্ছে স্বভাব বা চরিত্র। শীলের আরো অর্থ আছে। যেমন: নিয়ম, নীতি, সংযম, সদাচার, আশ্রয়, শৃঙ্খলা ইত্যাদি। কায়িক, বাচনিক ও মানসিক সংযমকে শীল বলা হয়। নৈতিক জীবন গঠনের জন্য শীল পালন অপরিহার্য। গৌতম বুদ্ধ মানুষের চরিত্র সুন্দর করার জন্য শীল পালনের নিয়ম প্রবর্তন করেছেন। দৈনন্দিন জীবনে গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত শীল পালনের মাধ্যমে আমরা নৈতিকতা অনুশীলন করতে পারি। যাঁরা শীল পালন করেন, তাঁদেরকে বলা হয় শীলবান।
বৌদ্ধধর্মে নানা রকম শীল রয়েছে। তার মধ্যে পঞ্চশীল গৃহীরা পালন করেন। যাঁরা উপোসথ গ্রহণ করেন তাঁরা অষ্টশীল পালন করেন। তাই অষ্টশীলকে উপোসথ শীলও বলা হয়। শ্রমণগণ দশশীল পালন করেন। এজন্য দশশীলকে প্রব্রজ্যাশীল বলা হয়।
অনুশীলনমূলক কাজ |
যে শীলগুলো প্রতিদিন পালন করতে হয়, সেগুলোকে নিত্যপালনীয় শীল বলা হয়। পঞ্চশীল নিত্যপালনীয় শীল। এগুলো পালনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় বা স্থান নেই। সব সময় সর্বত্র পালন করা যায়।
পঞ্চশীলের প্রথম শীলটি প্রানী হত্যা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। প্রানী হত্যা করলে জন্ম-জন্মান্তরে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। প্রত্যেকে নিজের জীবনকে ভালোবাসে। তাই কোনো প্রাণীকে আঘাত এবং হত্যা করা উচিত নয়। প্রথম শীলটি দ্বারা কেবলপ্রাণি হত্যা থেকে বিরত থাকা বোঝায় না। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রত্যেক প্রাণীর ক্ষতিসাধন হতে বিরত থাকার শিক্ষাও দেয়। এই শীলটি ছোট-বড়, হীন-উত্তম, দৃশ্য-অদৃশ্য সকল প্রানীকে রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করে। দ্বিতীয়টি চুরি বা অদত্ত বস্তু গ্রহণ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। চুরি একটি সামাজিক অপরাধও বটে। চুরি করলে সাজা এবং দন্ড ভোগ করতে হয়। সুনাম নষ্ট হয়। পরিবারে দুর্ভোগ নেমে আসে। তাই চুরি বা অদত্ত বস্তু গ্রহণ করা থেকে সকলের বিরত থাকা উচিত। শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীর বই, খাতা, কলম, পেনসিল প্রভৃতি না বলে গ্রহণ করা অনুচিত। পঞ্চশীলের দ্বিতীয় শীলটি মানুষকে কেবল চুরি বা অদত্ত বস্তু গ্রহণ থেকে বিরত রাখে না, অধিকন্তু সৎ উপায়ে নিজের পরিশ্রমে অর্জিত বস্তু বা অর্থের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতে শিক্ষা দেয়। লোভহীন জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
তৃতীয় শীলটি কামাচার বা ব্যভিচার থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। এই শীলটি মানুষকে অনৈতিক আচার-আচরণ পরিহারপূর্বক নৈতিক জীবনযাপন করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ হয়।
চতুর্থ শীলটি মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। মিথ্যাবাদীকে সকলে ঘৃণা করে, অপছন্দ করে এবং বিশ্বাস করে না। যারা মিথ্যা কথা বলে, তারা সর্বত্র নিন্দিত হয়। এই শীলটি মানুষকে কর্কশ, অপ্রিয়, অশ্লীল, কটু, অসার কথা, পরনিন্দা এবং সত্য গোপন করা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। ফলে কায়, বাক্য এবং মন পরিশুদ্ধ হয়।
পঞ্চম শীলটি সুরা ও মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে মানুষের চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। বিবেক, বুদ্ধি এবং হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। স্বাস্থ্য, ধন-সম্পদ এবং সম্মান নষ্ট হয়। মাদক গ্রহণকারী নানা রকম পাপকর্মে লিপ্ত থেকে মানুষের ক্ষতি সাধন করে। এমনকি দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রাণ হারায়। মাদক গ্রহণকারীকে কেউ পছন্দ করে না। তারা ইহকালে যেমন কষ্ট পায়, তেমনি মৃত্যুর পর নরক যন্ত্রণা ভোগ করে। মাদকদ্রব্যের মতো ধূমপানও স্বাস্থের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই সকলের মাদকদ্রব্য গ্রহণ এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকা উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
শীল হচ্ছে সমস্ত কুশল ধর্মের আদি। শীল রক্ষাকবচ। মানবজীবনে শীল অমূল্য সম্পদ। শীল পালন ব্যতীত নিজেকে কখনো নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। জীবনকে সুন্দর পথে পরিচালিত করা যায় না। নৈতিক জীবনযাপন করা যায় না। শীল পালন না করলে বিচার, বিবেচনা ও বুদ্ধি লোপ পায়। নিজের এবং অপরের মঙ্গল ও কল্যাণসাধনে শীলের মতো আর কিছুই নেই। শীল পালনের মাধ্যমে মন শান্ত হয়। মন শান্ত হলে সকল প্রকার অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়। এই শীল মানুষকে মহান ও শ্রেষ্ঠ করে তোলে। শীল পালনের মাধ্যমে পরিবারে যেমন শান্তি-শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়, তেমনিভাবে পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং সম্ভাবও সুদৃঢ় হয়। এর মাধ্যমে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। যা কুশল, সত্য এবং সুন্দর তা সবই শীলে রয়েছে। যাঁরা নিজের জীবনকে মহৎ করে তুলেছেন, তাঁরা সবাই শীল পালন করেছেন। সুতরাং শীল পালনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
অনুশীলনমূলক কাজ |
পঞ্চশীল গ্রহণ করার আগে অবশ্যই মুখ, হাত ও পা পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হয়। পরিষ্কার কাপড় পরতে হয়। এভাবে পঞ্চশীল গ্রহণ করলে মন পবিত্র হয়। শান্ত হয়। পঞ্চশীল গ্রহণ করার সময় করজোড়ে হাঁটু ভেঙে বসতে হয়।

পঞ্চশীল প্রার্থনা (পালি ও বাংলা)
পঞ্চশীল গ্রহণের পূর্বে ভিক্ষুর নিকট পঞ্চশীল প্রার্থনা করতে হয়। পালিতে প্রার্থনা গাথাটি এরূপ:
পঞ্চশীল প্রার্থনা (পালি)
ওকাস অহং ভন্তে তিসরণেনসহ পঞ্চসীলং ধম্মং যাচামি, অনুগ্রহং কত্বা সীলং দেথ মে ভন্তে।
দুতিযম্পি ওকাস অহং ভন্তে তিসরণেনসহ পঞ্চসীলং ধম্মং যাচামি, অনুগ্রহং কত্বা সীলং দেখ মে ভন্তে।
ততিযম্পি ওকাস অহং ভন্তে তিসরণেনসহ পঞ্চসীলং ধম্মং যাচামি, অনুগ্গহং কত্বা সীলং দেথ মে ভন্তে।
শেখার কৌশল |
বাংলা অনুবাদ
ভন্তে অবকাশপূর্বক সম্মতি প্রদান করুন। আমি ত্রিশরণসহ পঞ্চশীল ধর্ম প্রার্থনা করছি। ভন্তে দয়া করে আমাকে শীল প্রদান করুন।
দ্বিতীয়বার _________।
তৃতীয়বার _________।
ভিক্ষু: যমহং বদামি তং বদেথ (আমি যা বলছি তা বলুন)।
শীল গ্রহণকারী: আম ভন্তে (হ্যাঁ ভন্তে বলছি)
ভিক্ষু: নমো তস ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধস্স (আমি অর্হৎ সম্যক সম্বুদ্ধকে বন্দনা করছি)।
শীল গ্রহণকারী: নমো তস্স ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধস্স (তিনবার বলতে হবে)।
এরপর ভিক্ষু ত্রিশরণ গ্রহণ করতে বলবেন।
ত্রিশরণ
বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি (আমি বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করছি)।
ধম্মং সরণং গচ্ছামি (আমি ধর্মের শরণ গ্রহণ করছি)।
সংঘং সরণং গচ্ছামি (আমি সংঘের শরণ গ্রহণ করছি)।
দুতিযম্পি________।
ততিযম্পি _______।
ভিক্ষু: সরণা গমনং সম্পন্নং (শরণে গমন বা শরণ গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে)।
শীল প্রার্থনাকারী: আম ভন্তে (হ্যাঁ ভন্তে)।
তারপর ভিক্ষু পঞ্চশীল প্রদান করবেন এবং শীল গ্রহণকারী তা মুখে মুখে বলবেন।
পঞ্চশীল (পালি)
পাণাতিপাতা বেরমণী সিদ্ধাপদং সমাদিযামি।
অদিন্নাদানা বেরমণী সিৰ্ব্বাপদং সমাদিযামি।
কামেসু মিচ্ছাচারা বেরমণী সিদ্ধাপদং সমাদিযামি। মুসাবাদা বেরমণী সিঙ্গাপদং সমাদিযামি।
সুরা-মেরেয-মজ্জ পমাদঠানা বেরমণী সিস্থাপদং সমাদিযামি।
বাংলা অনুবাদ :
আমি প্রানী হত্যা থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি অদত্তবস্তু গ্রহণ থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি ব্যভিচার থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি মিথ্যাকথা বলা থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি সুরা এবং মাদকজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
অনুশীলনমূলক কাজ |
শীল পালনের সুফল অনেক। যেমন: শীল-
- হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা বলা ও মাদক গ্রহণ থেকে বিরত রাখে।
- মানুষের মনের কালিমা দূর করে।
- মনকে শান্ত ও সংযত করে।
- চরিত্র সুন্দর করে।
- কথা বলায় সংযত করে।
- বিনয়ী ও ভদ্র করে।
- অনৈতিক ও পাপকাজ হতে বিরত রাখে।
- সৎকাজে উৎসাহিত করে।
শীল পালনের সুফল সম্পর্কে বুদ্ধ বলেছেন, ফুলের গন্ধ কেবল বাতাসের অনুকূলে যায়, প্রতিকূলে যায় না। কিন্তু শীলবান ব্যক্তির প্রশংসা বাতাসের অনুকূলে যেমন যায়, তেমনি প্রতিকূলেও যায়। হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা ভাষণ, মাদকদ্রব্য গ্রহণ প্রভৃতি অকুশলকর্ম ব্যক্তিজীবনকে কলুষিত করে। কলুষিত ব্যক্তি পরিবার ও সমাজে নানারকম বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করে। অপর দিকে শীলবান ব্যক্তি সকল প্রকার অকুশল কর্ম হতে বিরত থাকেন। ফলে তাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন সুন্দর ও সুখময় হয়। তাই সকলের শীল পালন ও অনুশীলন করা উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |