বন্দনা (দ্বিতীয় অধ্যায়)

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা | NCTB BOOK
277

'বন্দনা' বৌদ্ধদের নিত্য পালনীয় একটি কর্ম। বন্দনা হলো গুণরাশি স্মরণ ও অনুকরণ করার প্রক্রিয়াবিশেষ। ধার্মিক, জ্ঞানী এবং গুণী ব্যক্তি বন্দনার যোগ্য। মানবচিত্ত সব সময় লোভ-দ্বেষ-মোহাদি পাপে লিপ্ত থাকে। বন্দনা মানুষের মনের কালিমা বিদূরিত করে এবং ত্রিরত্নের প্রতি শ্রদ্ধা জাগ্রত করে। বুদ্ধ বলেছেন, শ্রদ্ধার দ্বারা মহাপ্লাবন অতিক্রম করা যায়। মানবশিশুর বৃদ্ধির জন্য মাতৃদুগ্ধ যেমন খুবই দরকার, তেমনি চিত্তের বিকাশ লাভ করার জন্য প্রতিদিন বন্দনা করা আবশ্যক। এ অধ্যায়ে বন্দনার সুফল, নিয়মাবলি, দন্তধাতু, সপ্ত মহাস্থান এবং মাতৃ-পিতৃ বন্দনা সম্পর্কে পড়ব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • বন্দনা সম্পর্কে বলতে পারব;
  • বন্দনা করার নিয়মাবলি বর্ণনা করতে পারব;
  • বন্দনার সুফল ব্যাখ্যা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

কাকলীর অবাধ্যতা, অসাধুতা বুঝতে পেরে তার মা তাকে বিভিন্ন কৌশলে আরাধনার অভ্যাস করান। এখন তার চরিত্রে অসাধারণ মাধুর্য লাভ করল।

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

নরেশ বড়ুয়া ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সে তার এলাকার বয়স্ক লোকদের শ্রদ্ধা করে। এছাড়া সে তার পরিবারের লোকদের সাথে বিহার গিয়ে বন্দনা করে।

বুদ্ধের কথামতো বৌদ্ধরা চলে
বুদ্ধের প্রতিটি অঙ্গকে পর্যন্ত তারা সম্মান করে
সবাই বুদ্ধের মতো সাধু হতে চায়
বুদ্ধের বিভিন্ন অস্থি ছুঁয়ে তারা কাজ করে

বন্দনা ও বন্দনার সুফল (পাঠ : ১)

265

বন্দনা
'বন্দনা' শব্দের বিভিন্ন রকম অর্থ রয়েছে। যেমন: প্রণাম, নমস্কার, অভিবাদন, শ্রদ্ধা, ভক্তি, সম্মান, আনুগত্য স্বীকার, পূজা, প্রেম, শ্রদ্ধা নিবেদন, অভ্যর্থনা, আরাধনা, উপাসনা, স্তুতিগান ইত্যাদি। মূলত গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা, সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাঁদের গুণরাশির স্তুতি করাই হচ্ছে বন্দনা।
'বুদ্ধ' শব্দের অর্থ মহাজ্ঞানী। তিনি ছিলেন মানবপুত্র। তাঁকে মহামানব বলা হয়। তাছাড়া তিনি অসীম গুণরাশির অধিকারী ছিলেন। তাই আমরা বুদ্ধের বন্দনা করি। বন্দনার উদ্দেশ্য হলো বুদ্ধের অসীম গুণের স্তুতি বা প্রশংসা করা। বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে নিজের জীবনকে সুন্দর করা।
আমরা শুধু বুদ্ধকে বন্দনা করি না। বুদ্ধ প্রবর্তিত ধর্মকে বন্দনা করি। বুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত মহান সংখকেও বন্দনা করি। আমরা বুদ্ধের দন্তধাতু বন্দনা করি। সপ্ত মহাস্থানকে বন্দনা করি। বোধিবৃক্ষকে বন্দনা করি। চৈত্যকে বন্দনা করি। বিভিন্ন তীর্থস্থান ও পবিত্র স্থানকে বন্দনা করি। মা-বাবার বন্দনা করি। বন্দনা বৌদ্ধদের নিত্যপালনীয় কর্ম।
বন্দনা বৌদ্ধবিহারে কিংবা বাড়িতে বুদ্ধমূর্তির সামনে বসে করা যায়। বিহার যদি বাড়ির কাছে হয়, তাহলে বিহারে গিয়ে বন্দনা করলে ভালো হয়। আর বিহার যদি দূরে হয়, সে ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে বিহারে গিয়ে বন্দনা করা ভালো। মা-বাবা, ভাই-বোন এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে বন্দনা করা মঙ্গল। এ ধরনের বন্দনাকে সমবেত বন্দনা বলা হয়। সমবেত বন্দনার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর হয়। মায়া-মমতা বৃদ্ধি পায়। সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বের মনোভাব সুদৃঢ় হয়।

বন্দনার সুফল
মানবজীবনে বন্দনার প্রভাব অপরিসীম। বন্দনার সুফল অনেক। বন্দনার মাধ্যমে মন পবিত্র হয়। পুণ্য লাভ হয়। চিত্ত শুদ্ধ হয়। অশান্ত মন শান্ত ও সংযত হয়। লোভ, দ্বেষ এবং মোহ দূরীভূত হয়। অকুশল ও অন্যায় কাজ করার ইচ্ছা জাগে না। মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত হয় এবং সত্য কথা বলতে উৎসাহী হয়। মনে সৎ চিন্তা আসে। ভালো কাজে উৎসাহ আসে। ধৈর্য ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিপায়। অপরের মঙ্গল করার ইচ্ছা জাগে। উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়া যায়। ইহলোক এবং পরলোকে সুখ লাভ হয়। বন্দনার মাধ্যমে হৃদয়ে মৈত্রীভাব জাগ্রত হয়। তাই সুন্দর জীবন গঠনের জন্য প্রতিদিন বন্দনা করা উচিত।

অনুশীলনমূলক কাজ
বন্দনা শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করো।

Content added By

বন্দনার নিয়মাবলি (পাঠ : ২)

267

বন্দনা করার আগে এবং বন্দনা করার সময় বিভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। যেমন: বন্দনার আগে ভালো করে মুখ, হাত ও পা ধুয়ে নিতে হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করতে হয়। এতে দেহ ও মন পবিত্র হয়। পবিত্র দেহমনে বন্দনা করলে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। বন্দনার সময় বুদ্ধমূর্তি কিংবা বুদ্ধের ছবির সামনে হাঁটু ভেঙে বসতে হয়। তারপর দুই হাতের তালু যুক্ত করে মনোযোগ সহকারে সুর করে বন্দনাগাথা আবৃত্তি করতে হয়। আবৃত্তি স্পষ্ট হওয়া উচিত। প্রত্যেক বন্দনাগাথা আবৃত্তি করার পর ভূমিতে কপাল ঠেকিয়ে শ্রদ্ধা সহকারে প্রণাম নিবেদন করতে হয়।

এখন বুদ্ধের দন্তধাতু, সপ্ত মহাস্থান এবং মাতৃ-পিতৃ বন্দনা শিখব।

Content added By

বুদ্ধের দন্তধাতু বন্দনা (পাঠ : ৩)

209

বুদ্ধের বিভিন্ন অস্থিধাতু বৌদ্ধদের নিকট অতি পবিত্র। দন্তধাতু তন্মধ্যে অন্যতম। চারটি স্থানে বুদ্ধের দন্তধাতু যত্নসহকারে রক্ষিত আছে বলে জানা যায়। দন্তধাতু বন্দনার পালি গাথাটি নিম্নরূপ:
একা দাঠা তিদসপুরে, একা নাগপুরে অনু একা গান্ধার বিসযে, একাসি পুন সীহলে, চতসো তা মহাদাঠা নিব্বান রসদীপিকা পূজিতা নরদেবেহি, তাপি বন্দামি ধাতুযো।
বাংলা অনুবাদ: বুদ্ধের একটি দন্ত ত্রিদশালয়ে, একটি নাগলোকে, একটি গান্ধার রাজ্যে, একটি সিংহল দ্বীপে রয়েছে। নির্বাণ রস প্রদানকারী এ চারটি মহাদন্ত নর ও দেবগণের দ্বারা পূজিত। আমিও সেই চার দন্তধাতুকে ভক্তিসহকারে বন্দনা করছি।

অনুশীলনমূলক কাজ
বুদ্ধের দন্তধাতু বন্দনাটি সমবেতভাবে আবৃত্তি কর (দলীয় কাজ)।

Content added By

সপ্ত মহাস্থান বন্দনা (পাঠ : ৪)

436

সপ্ত মহাস্থান বন্দনা
বুদ্ধত্ব লাভের পর বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের পাশে সাতটি স্থানে ঊনপঞ্চাশ দিন অবস্থান করেন। সেসময় তিনি কখনো ধ্যানমগ্ন ছিলেন। কখনো পদচারণ করেছেন। কখনো তাঁর উদ্ভাবিত নবধর্ম সম্পর্কে চিন্তা করেছেন। বোধিবৃক্ষের চারিপাশে এ রকম সাতটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সাতটি স্থানকে সপ্ত মহাস্থান বলা হয়।
সপ্ত মহাস্থান হলো:
বোধিপালঙ্ক: বুদ্ধ যে আসনে বসে বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন তাকে বোধিপালঙ্ক বলা হয়।
অনিমেষ স্থান: বোধিপালঙ্ক থেকে কিছুটা উত্তর-পূর্ব কোণে অনিমেষ স্থান অবস্থিত। অনিমেষ স্থানে বসে বুদ্ধ সাত দিন ধরে এক পলকে বোধিবৃক্ষের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। এজন্য এ স্থান অনিমেষ চৈত্য নামে পরিচিত।
চংক্রমণ স্থান: বোধিপালঙ্ক ও অনিমেষ স্থানের মাঝখানে যে বেদিটি দেখা যায়, তা চক্রমণ (পদচারণ) স্থান নামে অভিহিত। বুদ্ধ এখানে চক্রমণ করেছিলেন বলে এরূপ নামকরণ হয়।
রত্নঘর: বোধিপালঙ্কের সোজা উত্তর-পশ্চিম পাশের সামান্য দূরে রত্নঘর স্থান অবস্থিত। বুদ্ধ এ স্থানে বসেই ধ্যান করেছিলেন।
অজপাল ন্যাগ্রোধ: এটি বোধিপালঙ্কের সোজা পূর্বদিকে এবং অনিমেষ স্থানের কিছু দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। ছাগল পালকেরা এ বৃক্ষের নিচে বসত বলেই এটি অজপাল বৃক্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে। বুদ্ধ এ স্থানে ধ্যান করতেন।
মুচলিন্দ স্থান: বোধিপালঙ্কের দক্ষিণ-পূর্বে এটি অবস্থিত। এখানে নাগরাজের বসবাস ছিল। মুচলিন্দ বৃক্ষের নিচে ধ্যান করার সময় নাগরাজ তাঁর দেহ দিয়ে বুদ্ধকে বেষ্টন করে মশা-মাছি, ঝড়-বৃষ্টি প্রভৃতি থেকে রক্ষা করেছিলেন।

রাজায়তন স্থান: বোধিপালঙ্কের সামান্য দক্ষিণ-পূর্বে এবং মুচলিন্দের উত্তর পাশে এটির অবস্থান। রাজায়তন নামে এক ধরনের পার্বত্য বৃক্ষ ছিল বলেই এটি রাজায়তন স্থান নামে পরিচিত। এখানেও বুদ্ধ সাত দিন যাবৎ ধ্যান করেন। বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই সপ্ত মহাস্থান বৌদ্ধদের নিকট অতি পবিত্র। তাই বৌদ্ধরা একাগ্রচিত্তে এই সপ্ত মহাস্থানকে বন্দনা নিবেদন করে। সপ্ত মহাস্থান বন্দনাগাথাটি নিম্নরূপ:


পঠমং বোধিপল্লঙ্কং, দুতিযং অনিমিসম্পি চ
ততিযং চক্রমণং সেফ্টং, চতুথং রতনঘরং
পঞ্চমং অজপালঞ্চ, মুচলিন্দঞ্চ ছট্টমং
সত্তমং রাজাযতনং, বন্দে তং বোধিপাদপং।

বাংলা অনুবাদ: প্রথম বোধিপালঙ্ক, দ্বিতীয় অনিমেষ স্থান, তৃতীয় চংক্রমণ স্থান, চতুর্থ রতনঘর স্থান, পঞ্চম অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষ, ষষ্ঠ মুচলিন্দ মূল, সপ্তম রাজায়তনসহ বোধিবৃক্ষকে আমি অবনত শিরে বন্দনা করছি।

অনুশীলনমূলক কাজ
সাতটি মহাস্থানের নাম লিখ।

Content added By

মাতৃ-পিতৃবন্দনা (পাঠ : ৫)

215

মাতা-পিতা সন্তান-সন্ততির নিকট পরম পূজনীয়। মাতা-পিতা না থাকলে আমরা এই অপরূপ পৃথিবীর সৌন্দর্য কখনো দেখতে পেতাম না। স্নেহময়ী মাতা পুত্র-কন্যাদের দশ মাস গর্ভে ধারণ করে সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেন। তারপর সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। পিতা সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণ এবং পরম মায়া- মমতায় লালন-পালন করেন। পিতা-মাতা সব সময় সন্তান-সন্ততির মঙ্গল কামনা করেন। এ মহান হিতকামী মাতা-পিতাকে বৌদ্ধরা শ্রদ্ধাচিত্তে বন্দনা জ্ঞাপন করেন। নিচে মাতৃ-পিতৃ বন্দনাগাথা দেওয়া হলো:

মাতৃ বন্দনা
কত্বান কাযে রুধিরং খীরং যা সিনেহ পূরিতা
পাযেত্বা মং সংবসি বন্দে তং মম মাতরং।

বাংলা অনুবাদ: যে জননী রক্তসঞ্জাত স্নেহসিক্ত স্তন্য পান করিয়ে আমাকে লালন-পালন করেছেন, সেই মমতাময়ী মাতাকে আমি বন্দনা করছি।]\

পিতৃ বন্দনা
দযায পরিপুগ্লোব জনকো যো পিতা মম
পোসেসি বুদ্ধিং কারেসি বন্দে তং পিতরং মম।

বাংলা অনুবাদ: দয়ায় পরিপূর্ণ যে পিতা আমাকে ভরণ-পোষণ করেছেন এবং আমার জ্ঞান-বুদ্ধি বিকশিত করেছেন, সেই পিতাকে আমি বন্দনা করছি

অনুশীলনমূলক কাজ
মাতৃ-পিতৃ বন্দনা আবৃত্তি কর (দলীয় কাজ)।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...