প্রাণীর বংশবৃদ্ধি প্রযুক্তি (পাঠ ৮)

সপ্তম শ্রেণি (মাধ্যমিক) - কৃষিশিক্ষা - কৃষি প্রযুক্তি | NCTB BOOK
811

প্রাণিসম্পদের মধ্যে হাঁস-মুরগি অন্যতম। সুতরাং এই পাঠে হাঁস-মুরগির বংশবৃদ্ধিতে ডিম ফোটানো ও প্রাকৃতিক উপায়ে বাচ্চা ফোটানোর প্রযুক্তির অবদান সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। ডিম ফোটানোর জন্য প্রথমত উর্বর ডিম দরকার। ডিম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যে সমস্ত বৈশিষ্ট্যের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন নিচে সেগুলো উল্লেখ করা হলো-
১। মসৃণ, মোটা ও শক্ত খোসার ডিম
২। স্বাভাবিক রঙের ডিম
৩। মাঝারি আকারের ডিম
৪। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ডিম
৫। ৫০-৬০ গ্রাম ওজনের ডিম
৬। ডিমের বয়স গ্রীষ্মকালে ৩-৪ দিন এবং শীতকালে ৭-১০ দিন

ডিম ফোটানো পদ্ধতি: ডিম ফোটানোর দুই ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। যেমন প্রাকৃতিক পদ্ধতি ও কৃত্রিম পদ্ধতি। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে হাঁস মুরগি দ্বারা ডিম ফোটানো হয়। গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে প্রাকৃতিক পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়। এতে অর্থের বিনিয়োগ লাগে না। অন্যদিকে তুষ পদ্ধতি বা ইনকিউবেটর পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ডিম ফোটানোর মাধ্যমে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়।

প্রাকৃতিক পদ্ধতি: মুরগির নিজের দেহের তাপ দিয়ে নিষিক্ত ডিম ফোটানোকে প্রাকৃতিক পদ্ধতি বলে। এ পদ্ধতি আমরা নিজেদের বাড়িতে দেখে থাকব। দেশি মুরগি কিছুদিন ডিম পাড়ার পর কুচে হয় এবং ডিমে তা দিতে আগ্রহী হয়। এরূপ মুরগিকে ১০-১২টি ডিম দিয়ে বসানো হয়। প্রথমত মুরগির জন্য ঝুড়িতে খড়কুটা দিয়ে একটি বাসা বানাতে হবে। বাসাটি ঘরের নির্জন কোণে রাখতে হবে। মুরগির বাসা ৩৫ সেমি ব্যাস এবং ১০ সেমি গভীর হবে। ডিমে বসানোর পূর্বে মুরগিকে ভালোভাবে খাওয়াতে হবে। মুরগির সামনে দানাদার খাবার ও পানি রাখতে হবে। ৮-১০ দিন পর ডিমগুলো সূর্যের আলোয় পরীক্ষা করতে হবে। ডিমের ভিতরে ভুণ থাকলে কালো দাগের মতো দেখাবে। ২১তম দিবসে ডিম থেকে বাচ্চা বেরিয়ে আসবে। বাচ্চারা প্রায় দুইমাস মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকে। এরপর বাচ্চারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে।

ইনকিউবেটর যন্ত্র দ্বারা ডিম ফোটানো পদ্ধতি: প্রাকৃতিক ও ইনকিউবেটর যন্ত্র দ্বারা ডিম ফোটাতে একই সময়ের প্রয়োজন হয়। এই পদ্ধতির সুবিধা হলো একসাথে অনেক সংখ্যক ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন করা যায়। এই পদ্ধতিতে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর সময় রোগ নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থ বাচ্চা উৎপাদন করা যায়। এই পদ্ধতিতে মুরগিগুলো ডিমে তা না দেওয়ার কারণে ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। তাই বাণিজ্যিকভাবে এই পদ্ধতি খামারিদের নিকট খুব জনপ্রিয়।

ইনকিউবেটর তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র। এতে শত থেকে লক্ষাধিক ডিম ফোটানো যায়।
ইনকিউবেটর যন্ত্র দ্বারা বাচ্চা ফোটানোর সময় নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ গুরুত্ব সহকারে অনুসরণ করতে হবে।

১। তাপমাত্রা: ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা ৯৯.৫-১০০.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উল্লেখ্য উপযুক্ত তাপমাত্রা না পেলে ভ্রুণের কোষ বিভাজন হবে না এবং ভ্রুণের মৃত্যু হবে।
২। আর্দ্রতা: ইনকিউবেটরের মধ্যে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ৬৫-৭০% এর মধ্যে রাখা হয়। ইনকিউবেটরে আর্দ্রতা কম থাকলে ডিম থেকে পানি বাষ্পায়িত হয়ে ভ্রুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৩। বায়ুপ্রবাহ: ভ্রুণের অক্সিজেন গ্রহণ এবং ডিম থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস বের হওয়ার জন্য বায়ুপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ইনকিউবেটরে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে অক্সিজেনের প্রবেশ এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড দূরীকরণের ব্যবস্থা থাকে। বায়ুপ্রবাহ না থাকলে ভ্রুণের মৃত্যু হয়।
৪। সেটিং ট্রেতে ডিম বসানো: সেটিং ট্রেতে ৫৫-৬০ গ্রাম ওজনের ডিম বসানো হয়। ডিমগুলোর মোটা অংশ উপরের দিকে এবং সরু অংশ নিচের দিকে থাকে। ইনকিউবেশন চলাকালীন সময়ে ডিমগুলো ৪৫ ডিগ্রি কৌণিক অবস্থানে থাকে।

৫। ডিম ঘুরানো: ডিমের সর্বদিকে সমানভাবে তাপ, আর্দ্রতা ও বায়ু প্রবাহ পাওয়ার জন্য ডিমগুলোকে দৈনিক ৩-৮ বার ঘুরানো হয়ে থাকে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা সম্পাদিত হয়ে থাকে।

৬। হ্যাচিং ট্রেতে ডিম স্থানান্তর: মুরগির ডিমের ক্ষেত্রে ১৮ দিন পর ডিমগুলোকে সেটিং ট্রে থেকে হ্যাচিং ট্রেতে স্থানান্তর করা হয়। হাঁসের ডিমের ক্ষেত্রে ২৫তম দিবসে সেটিং ট্রে থেকে হ্যাচিং ট্রেতে স্থানান্তর করা হয়। উল্লেখ্য সেটিং ট্রেতে বাচ্চা ফোটার কোনো সুযোগ নেই। হ্যাচিং ট্রেতে তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমিয়ে দিতে হবে।

৭। ডিম ক্যান্ডলিং করা: আলো দ্বারা ডিমের ভিতরের অংশ পর্যবেক্ষণ করাকে ক্যান্ডলিং বলে। ডিম বসানোর সাত দিন পর অনুর্বর ডিম ও মৃত ভ্রুণসহ ডিম পৃথক করার জন্য সকল ডিমকে ক্যান্ডলিং করা হয়। আবার ১৪তম দিবসেও ক্যান্ডলিং করে একই রকমভাবে মৃত ভ্রুণসহ ডিম পৃথক করা হয়। ভ্রুণসহ মৃত ডিম, পচা ডিম পৃথক না করলে ইনকিউবেটরের মধ্যে সুস্থ ডিম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়।

৮। ফিউমিগেশন: এটি রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে জীবাণু ধ্বংস করার একটি পদ্ধতি। এই ক্ষেত্রে ১০০ ঘনফুট জায়গার জন্য ৭০ সিসি ফরমালিন ও ৩৫ গ্রাম পটাশিয়াম পার ম্যাঙ্গানেট ব্যবহার করা হয়। এই মিশ্রণটি মাটির পাত্রে রেখে ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক মিশ্রণটি অত্যন্ত বিষাক্ত ধোঁয়া উৎপাদনের মাধ্যমে রোগজীবাণু ধ্বংস করে। তাই ব্যবহারের সময় দরজা জানালা বন্ধ করে সকলকেই দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করা উচিত।

কাজ: শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে আশেপাশের কোনো মুরগির খামার পরিদর্শন করবেন এবং পরিদর্শন শেষে শিক্ষার্থীরা দলীয়ভাবে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জমা দিবে।

নতুন শব্দ: ইনকিউবেটর, সেটিং ট্রে, হ্যাচিং ট্রে, ক্যান্ডলিং, ফিউমিগেশন

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...